স্বপন পাণ্ডা-র গল্প

swapan panda

স্বপন পাণ্ডা

অথ বাশুলী দেবী মাহাত্ম্য

মহা অঘটন! সকাল সকাল মন্দির চাতালে কিসের তাজা রক্ত! মানুষের না পশুর? কোন্‌ মানুষ কোন্‌ পশু কোথায় সে? কে জানে? ভোর থেকে গাঁ তোলপাড়! একটু পরেই গ্রামসভার মিটিং। মিটিং করেও কি আদৌ জানা যাবে, এ রক্ত কার, কোত্থেকে এল, না কি কারও শয়তানি? কোন্‌ শয়তান? কার বুকের পাটা এমন? পার পাবে না পার পাবে না। বিরাট জাগ্রত দেবী কিন্তু মা বাশুলী। ঠিক আছে, আপাতত পদ্মবিলের কাদামাটি তুলে চাপ চাপ জমাট রক্তের দাগগুলি ঘিরে দেওয়া যাক –– মাতব্বরদের এই সিদ্ধান্ত শোনা মাত্র ছেলে ছেলেছোকরারা নেমে পড়ে বিলে, ডুব দিয়ে দিয়ে কাদা তুলে ঘিরে দিতে থাকে রক্তলাঞ্ছিত চাতাল।
 বিলের কাদা তুলতে গিয়ে কেউ কেউ দু চারটে চিংড়িও পেয়ে যায় আর টুক করে বারমুডার পকেটে চালান করে দেয়। একদল আবার পুরো ব্যাপারটা র ভিডিও তুলতে থাকে, জিও–র রবরবা। গর্ভগৃহ থেকে ঘোমটার আড়াল থেকে সিঁদুরলেপা বাশুলী মা সব দেখতে থাকে, কিন্তু কিচ্ছুটি বলে না। দেবীর মুখটা দেখেন যুধিষ্ঠিরকা, কেমন গুমসুম হয়ে আছে ! মায়ের হেবি খারাপ লেগেছে কিন্তু ––– পুজুরিবাড়ির ছোট ছেলে রাধে মিশ্রের এই কথাটি মাঠেই মারা যায়; কেউ ওর জবাব দেয় না, যুধিষ্ঠির ঠাণ্ডা চোখে শুধু তাকায় তারপর ইতিকর্তব্য স্থির করতে ডেকে নেয় তারই ভাইপো পঞ্চায়েত প্রধান তপন মণ্ডলকে। সঙ্গে জুটে যায় আরও আরও লোকজন। সে, বাশুলীর সেবাইত বংশ, পণ্ডিত পুরুষোত্তম মিশ্রের বংশধর অথচ তাকে, রাধে মিশ্রকে কেউ ডাকলেও না, কিছু পুছলেও না। মনমরা হয়ে সে মা বাশুলীর দিকে তাকিয়ে থাকে –– হয়তো বিড়বিড়িয়ে বলতে থাকে, মাগো, আমি তোর পুজো করি, সন্ধ্যারতি দি, প্রদীপ জ্বালি, দু বেলা আমারই হাতে খাও তুমি। তোমার ঘরের চাবি দেখ আমারই হেপাজতে, আমাকেই তো সকাল সকাল খবর দিল কেদার প্রামাণিক –– রাধে ঠাকুর মন্দিরে দেখ গিয়ে নির্ঘাৎ মার্ডার হয়ে গেছে, যা রক্ত বাপ রে বাপ কী দিন এল কী দিন!
 কথাটা তো মিথ্যে নয়। কেদার, বাড়িতে নির্মল গ্রাম যোজনার পায়খানা থাকলেও ভোর ভোর বাশুলীমায়ের মন্দির দেখে পদ্মবিলের হাওয়া খেতে খেতে পশ্চিমের পোড়ো জংলা শাসমলদের ভিটেয় বসে রোজ প্রাতঃকৃত্যটি সমাপন করে। আজও করেছে, তবে আজ তার স্যাঙাৎ রাধাকিষ্ট খাটুয়া আসেনি। তখন ঝুঁজকো বেলা, ভালো করে ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেনি সে। সক্কালের কাজটি সেরে বিলে পা–হাত পাখলে মায়ের চাতালে মাথাটি ঠুকতে গিয়ে আঁতকে ওঠে ––– রক্ত? তারপর রাধেকে খবরটুকু দিয়েই সে রক্ত রক্ত বলে ছোটে মণ্ডল পাড়ার দিকে; আর পাড়ায় পাড়ায় সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে ––– বাশুলী মায়ের থানে রক্ত, দেবী মন্দিরের চাতালে ব্লাড ––– অনেকে ছুটে এসে আশ পাশের ঝোপঝাড়ে লাঠি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখতে থাকে, একদল ছুটে যায় পদ্মবিলের দক্ষিণ–পশ্চিম পাড়ে, ওদিকেই একটু জঙ্গলমতো, যদি কিছু লাশ–টাস … সবাই নিরেশ হয়ে আবার চাতালে জমা হয়, নাঃ এদিক উদিক বিলের জলে ঝোপে জঙ্গলে মাঠে কোথাও কোনো বডি–মডি নেই। রক্তের দাগ চাতালের তলায় আশপাশ কোত্থাও নেই। শুধু চাপ চাপ বাসি রক্ত জমাট; তার ওপর এখন অতীব সব পাজি মাছির দল বসছে শুষছে উড়ে যাচ্ছে। খুব বিচ্ছিরি দৃশ্য। এ কীসের রক্ত? কীসের ব্লাড ?
 তপন মণ্ডল তারই একদা সহপাঠী রাধেকে ধমকায় ––– মন্দির খুলি রেখেচিস ক্যানো, বন্ধ কর। সালার রক্তখেকো মাছি ঢুকে যাবে নে? মায়ের মুখি যেয়ে বসবে নে? যা যা বন্ধ কর। যুধিষ্ঠির মণ্ডল কটমট করে লাল চোখে রাধেকে নীরবে ধিক্কার দেয় –– রাধে যেন শুনতে পায় ––– নেহাৎ পুরুষোত্তমের বংশে জম্ম নিইচিস, চাঁড়াল কোথাকার, নাইলে এক লাথ মেরে তোকে চাতাল থে বিলে ছুঁড়ে ফেলতাম। রাধেও কম যায়না; মন্দিরে তালা লাগিয়ে চাতাল থেকে নেমে, অ্যা মা কি বদরক্তের গন্ধ গো, বলে, এক দলা থুতু লাল মোরামের রাস্তায় থুক করে ফেলে দিয়ে হাঁটা লাগায় আর বিড় বিড় করে ––– অ্যাকদিন নয় বাজারে দেকিচিস মাল খাচ্ছিলাম, সেই থেকে কাকা তোমার আচার–ব্যভার বদলি গেল। বামুন বলি কি একটু কারণও খাব না, সব তোমরা গিলবে? আর তপনা, পার্টিতে ঢুকে তোর হেবি র‍্যালা দেকচি, সালা ইংলিশে ফেল করে করে পড়াই ছেড়ে দিলি, এখন চাদ্দিকে খাবলা মাচ্ছিস কে না জানে! আহা! মায়ের মুখে মাছি বসবে নে? কত মাতৃভক্তি হুঁxz ওই চাতালে, একেবারে মায়ের ছামুতে বসেই তো রাতে মালের আসর জমাস, জানি না নাকি? সবাই সব জানে, মাও রোজ তোরে দেখে, ওই যে ন্যাতা হইছিস কেউ তোরে কিচ্ছুটি বলবে না —সব সালার ভেড়ুয়াপার্টি!
   অতীব পবিত্র আমাদের এই বংশীধরপুরের বাশুলী দেবীর মন্দিরথান। সময়ের বালি–ঢেউ কত কত বার বয়ে গেল, কত ঝড় বজ্র বিদ্যুৎ চমকে চমকে চলে গেল, কত শীত বর্ষা বসন্ত এল আর চলেও গেল, মন্দিরের দরজা একদিনও বন্ধ থাকেনি। এগরা বাজার থেকে আমাদের এই গ্রাম, খুব দূরে নয়, মেরে কেটে হয়তো আগের আগের লোকজনের হিসেবে কোশ দুই–তিন, আমরা এখন বলি তিন সাড়ে তিন মাইল ––– সবই চলত আন্দাজে। গাঁয়ে যখন বছর দশ আগে কারেন্ট এসে পড়ল, তখনই লাইন টানার লোকজন মাপজোক করল খুঁটি পুঁতল, তারাই এক সন্ধ্যায় এই মন্দিরথানে মিটিং–এ এসে জানাল বাজার থেকে মাঠে মাঠে এ গ্রাম মাত্র দু মাইলের একটু মাত্র বেশি, আর রাস্তার হিসেবে প্রায় ডবল সাড়ে তিন মাইল। হট্টনাগর মহাদেবজীউর মন্দির বাজারের উত্তরে, আর দক্ষিণে, বাজারের শেষসীমায় দুর্গামণ্ডপ। মণ্ডপের পাশ দিয়ে যে রাস্তা পশ্চিম মুখো হাঁটা দিয়েছে, সেই হল আমাদের গাঁয়ের রাস্তা। রাস্তাটি আধ মাইলটাক পশ্চিমে সোজা গিয়ে বাঁক নিয়েছে দক্ষিণে, ওই বাঁকের মুখ থেকেই দেখা যায় ডান দিকের বিশাল মাঠের বিস্তার; ওই মাঠের শেষে আমাদের গাঁয়ের শুরু, শুরু হবার মুখেই পদ্মবিলের পাশটিতে দাঁড়িয়ে থাকেন দুধসাদা বাশুলী দেবীর মন্দির। বাঁ দিকে গায়ে-গায়ে তিনটি ছোট গ্রাম ––– মালিপাটনা, বসন্তপুর আর বংশীধরপুর লাগোয়া নিমপুকুর। বসন্তপুর থেকেই দেখা যায় মন্দির চূড়ার রূপোর বজ্র আর পাশ দিয়ে পত পত করে উড়ছে বাশুলীর ধ্বজা। মেঘবৃষ্টির দিনে ওই বজ্রধ্বজ, কলেজ–ফেরতা ছেলে–মেয়েদের কাছে হয়তো বেশ অপরূপ ছবি ছবি কবিতা কবিতা লাগলেও লাগতেও পারে।
  নিমপুকুর আর বংশীধর পুরের মধ্যিখানে, একটি নালা আছে, লোকে বলেন গাং নালা। নালার মধ্যে এসে মিশেছে পদ্মবিলের নিকাশি সোঁতা। একসময়, অবশ্য কোন্‌ সে সময়, কেউ দেখেনি, শুধু শুনেছে, মা গঙ্গা নাকি ভরা বর্ষায় মাটির তলা দিয়ে বহে বহে এই নালায় প্রকট হতেন, বাশুলী নাকি তাঁর অনেক অনেক আদ্যিকালের মিতেন, বছরে একবারটি তাকে দেখা দিয়ে, পদ্মবিলটি গঙ্গাজলে ভরে দিয়ে সমুদ্রের দিকে হাঁটা দিতেন। সদানীর এই বিলের জলই আজও গঙ্গাজল–জ্ঞানে বাশুলীদেবীর পুজোয় লাগে, শুধু তাই নয়, বিশ–পঞ্চাশ গাঁয়ের লোক এসে ঘড়া ঘড়া এই পদ্ম বিলের গঙ্গাজল বয়ে নিয়ে যায়। এতদঞ্চলে পুরুত মশায়রা এই জল দিয়েই সর্বশুদ্ধিমন্ত্র আওড়ায় – গঙ্গে চ যমুনেচৈব … । এ দেশ গঙ্গাদেশ নয়, পুকুর ডোবা বিল আর দু চারটি শুকনো সোঁতা নালার দেশ। লোকে বোধহয় তাই গাংনালা আর পদ্মবিলের মধ্যে গঙ্গাকে স্মৃতিতে ধরে রেখে দিয়েছে।
 এগরা বাজার থেকে হেলতে দুলতে বেঁকতে বেঁকতে এই মোরামের রাস্তা মন্দির চাতালের পাশটি দিয়ে বিনীত ভাবে এবার সোজা ঢুকে পড়ে গাঁয়ে। মা বাশুলী নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয় হয়ে, বামুন পাড়া, মণ্ডলপাড়া, পরামানিক পাড়া, গাঁ–শেষের আরও দু চার ঘর হাড়ি বাউরি ডোম বাগ্‌দিদের ঘর–উঠোনের পাশ দিয়ে নেমে রাস্তাটি চলে গেছে দক্ষিণের মাঠে, মাঠের ওপারে বাসুদেবপুর। ওই গাঁয়ের সঙ্গে এ গাঁয়ের দু চার ঘর আত্মীয়াদি থাকলেও দুই গাঁয়ের তেমন সদ্ভাব নেই। বরং নিমপুকুর বসন্তপুর বা মালিপাটনাদি ছোট তিনটি গ্রাম বংশীধরপুরকে বড় দাদাটির মতো মান্য করে। এরা আমাদের পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যেই।
 পঞ্চায়েতের কথা যখন থেকে থেকে উঠছে, তাহলে খোলসা করে রাখা মন্দ নয় যে, আমরা, মানে এইসব গাঁয়ের লোকজন যখন যে পার্টি আসেন, সেদিকেই মাথাটি হেলিয়ে দি। একসময় খুব গাই বাছুর উঠল, তো আমরা বাছুর হয়ে গেলাম। জোড়া বলদ, তো আমরা বলদ হলাম, বটগাছ এল তো আমরা ঝুরি বেয়ে উঠে পড়লাম। লন্ঠন এল, তো জ্বালিয়ে দিলাম; ধান শিষ দুলে উঠল তো দা বাগিয়ে কাটতে লাগলাম, কাটা হাত নাচতে নাচতে বললে ভোট দে, দিলাম। ঘাস ফুল ফুটতে শুরু করল তো অমনি আমরা ফুল তুলতে নেমে পড়লাম। এখন আবার ইদিক উদিক একটা পদ্ম পদ্ম ভাব, যদি ফোটে, সে তখন আমরাও … না থাক। এই বেশ আমরা ভালো আছি, এখন আমরা ফুল তুলি ফুল তুলি ফুল তুলি …। দু চার ঘর অবশ্য এমন সব গাঁয়েই হয়তো থাকে যারা দা ধরেছে তো ধরেই আছে, বটগাছে উঠল তো আর নামার নামটি নেই, বাছুর বলদ হয়ে জাবনা কাটছে তো শালা কেটেই যাচ্ছে, কারেন্ট এসে গেল, হাতে হাতে পকেটে পকেটে ঝিলিক মারছে জিও, তবু লন্ঠন জ্বালিয়ে বসে আছে। থাকুকগে। এসব পার্টি পলিটিকস আসবে যাবে, যাবে আসবে — কিন্তু আমরা জানি — চিরকাল থাকবে আমাদের এই পদ্মবিল আর বাশুলী মায়ের থান। এখানে মার্ডার করে লাশ গায়েব করে দেবে সেটি হচ্ছে না বাবা।
 তা মিটিং শুরু করা যাক তাইলে, চাতালের পাশের অতি বৃদ্ধ এক অশ্বত্থ গাছ আছেন, তার তলায় মধ্যমণিটি হয়ে বসে যুধিষ্ঠির গলা সাফ করে বললে, শুরু করেন … কেদার কই কেদার। কেদার যা দেখেছে বললে। তপন ঝামেলা শুরু করে ––– সরকার থে টাকা নিয়ে তুমি নিল্লজ্জ কোথাকার সকাল সকাল মাঠে হাগতে গিয়েছিলে কেন? এ খবর একবারটি রটলে আর দেকতে হবেনে। পায়খানা–মায়খানা ভেঙে গলায় গামছা পাকিয়ে পাকিয়ে গবমেন্ট তোমার থে টাকা খিঁচে বার করবে বলে দিলাম। গাঁয়ের সবচেয়ে বুড়োমানুষ দুঃশাসন গিরি তাদের থামায়, বাকিরা তামাশা থেমে গেলে দুঃখ পায়। তারা হয়তো ভাবে ––– কেদারব্যাটার অনেক কাঁচা টাকা আসছে, লিজের পুকুরে যা মাছ লাফালাফি করছে, একটু প্যাঁচে পড়ুক না। যুধিষ্ঠির আবার সভার নড়বড়ে হালটি ধরে সোজা ঢুকে পড়ে ––– অতি প্রাচীন আমাদের এই মাতৃমন্দির, তস্য পবিত্রতা রক্ষা আমাদিগের কর্তব্যাকর্তব্য, কে বা কাহারা এত দুঃসাহস দেখাইতে আছে যে বাশুলীর থানে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটাইয়া ছাতি ফুলাইয়া বাহিরে ঘুরিতে আছে? তাহারা কি জানে নাই, মা কী করিতে পারে না পারে? একটা ফচকে মতো ছোকরা ফিসফিস করে পাশের জনকে বলছিল, ঠিক কী বলছিল জানা যায় না; তবে তাতে যুধিষ্ঠিরের এই সব কথার দিকে সে তার অবিশ্বাস ও হাস্য ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছিল। তপন, তার কাকাকে থামিয়ে বিড়ির শেষ টান দিয়ে বলতে ওঠে। তার কথা ছোকরাদের মনে খানিক রঙ ধরায়।
 তপনের বক্তৃতা থেকে ছেঁকে তুলে বলা যায়, সে গাঁয়ের শুধু ভালো ভালো আর ভালো চায়। তার পার্টি তার গবমেন্ট কারও ভালো ছাড়া আর কিচ্ছুটি চায়নাক। তারা যা কিছু পবিত্র, যা কিছু মহান যা কিছু সুন্দর আর পুরাতন, এই মা বাশুলীর মন্দিরের মতো, তার অসম্মান হতে দেবে না, দিতে পারে না। (এই পর্যন্ত শুনে ছোকরারা মজা পায়, কেউ কেউ অবশ্য হাল্কা করে বলে ওঠে –– আর ভাটাসনি বাপ কী কত্তে চাস সেইটে বল। এ তোর ভোট মিটিং নাকি!) তপনের ভাষণ চলতেই থাকে ––– যে বা যারা কাল রাতে মায়ের এই মন্দিরথান অপবিত্র করে গেল, তাদের শাস্তি দিতে হবে, এমন শাস্তি যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। (এসব শুনে প্রাচীনদের মনে পড়ে খগেন সামন্তকে এই অশ্বত্থের তলায় শুইয়ে বুকে বাঁশ আড়াআড়ি চাপিয়ে জাঁক দেওয়া হয়েছিল; আর মুখ থেকে বলকে বলকে রক্ত উঠছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত গাঁয়ের লোক যা শুনতে চাইছিল, সেই ‘সত্য’ উঠে এল না। এখানেই মরে পড়েছিল খগেন। তারা কেউ কেউ খগেনের সেই রক্তাক্ত মুখ, তার বাসি মড়া হয়ে পড়ে থাকা, সব দেখতে পাচ্ছিল; শুনতে পাচ্ছিল খগেনের বৌ বাচ্চাদের হাহাকার চীৎকার কান্না –– তারা কেঁপে কেঁপে উঠছিল।) এই প্রথম নিজের কথা থামিয়ে তপন জানতে চায় ––– আপনারা দশজন কী বলেন? শাগরিদদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, তোরা কিছু বল্‌ রে। তারা কিছু বলে না, কখনও বলে না। তারা শুধু কাজ করে আর দাদার হুকুম তামিল করে। রাধের দিকে তাকিয়ে একটু সম্মানের ভাব ফুটিয়ে তপন জানতে চায় ––– কি রে তুই কিছু বল, তুই হলি কিনা মায়ের পুজুরি।
 রাধে সরাসরি জানতে চায় ––– পুজোর সময় হয়ে এল, সকালে ফুল তুলে মন্দিরে রেখে গেছে, এখন সভা বলুক ওই অপবিত্র চাতাল ছোঁয়া মন্দিরে আজ পুজো হবে তো? সভা একটু থম মেরে যায়। তপন চালাকি করে বলটি গড়িয়ে দেয় কাকার দিকে। কাকা, ধূর্ত যুধিষ্ঠির বলটি হেড করে দেয় প্রবীণ দুঃশাসন গিরির দিকে। গিরি কাশতে কাশতে ধুঁকতে ধুঁকতে বক্তৃতা শুরু করে ––– এই যে কাণ্ড ঘটিল, কী করিয়া কী হইল, সে এক মা জননীই জ্ঞাত আছেন। প্রতিবিধান আমাদিগের জানা নাই। আমি প্রাচীন। এই অশথ বৃক্ষের ন্যায় সুপ্রাচীনও বলিতে পারো। অনেক আমার বয়স, কত পার্টি আসিল গেল, কত সরকার পড়িল উঠিল, গাঁয়ে খুনখারাবাও কম তো দেখি নাই। তবে দিনেকের তরেও মায়ের মন্দিরের দরজা বন্ধ হইতে দেখি নাইক।
তপন অধৈর্য হয়ে বলে ––– ডাইরেক্ট বল কাকা পুজো হবে তো?
দুঃশাসন : পুজো হোক বাবা পুজো বন্ধ ভালো না।
তপন : ব্যস কথা শেষ। কাকা আমাদিগের মধ্যে মুরুব্বি। তার কথা শেষ কথা। রাধের দিকে তাকিয়ে বললে ––– বুঝলি? ভালো করে আজ স্পেশাল পুজো চড়া, এই নে, একটি একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দেয় সে; লাফিয়ে উঠে ছোঁ মেরে প্রায় টাকাটা তালুবন্দী করে রাধেশ্যাম মিশ্র। তপনকে এখন তার বেশ ভালো লাগে। এই না হলে শালার নেতা!
যুধিষ্ঠির : তাইলে ভাইপো থানায় কি একটা খবর দিবি নাকি, কে কী করি গেল, সত্যটা তো জানলি ভালো, নাকি?
তপন :থানারে যে বলবো একটা হাসির ব্যাপার হয়ে যাবে কিন্তু কাকা। আমরা তো কোনো বডি পাইনিক, পেয়েছি কি?
সবাই : পাইনি, বডি আমরা পাইনি পাইনি পাইনি।
তপন :তাহলে? শাগরেদদের দিকে চোখ টিপে কেদারের দিকে তাক করে বল বাড়ায় সে –– কেদারদা তোমাকেই তো অ্যারেস্ট করবে গো, মহা হ্যাঙ্গাম, আমি কিন্তু দাদা সামলাতে পারবনি।
কেদার :আমি তো ভাইটি শুধু রক্ত দেখিচি, কে বা কারা এসব করল, কীই বা করল সেসব তো দেখি নাই।
তপন :পুলিশ ওইগুলি দেখে না দাদা, এসে বলবে কে? কে ফার্স্ট দেখেছে ––– এইটাই রুল … কী করবে?
কেদার :আমারে ছাড়ান দে ভাই?
তপন :ছাড়ান দে বললে কি আর সব ছাড়ান যায়, তোমরা কী বলছ?
সবাই :আমরা কিছু বলি না, আমরা কাজ করি। কেদার পরামানিকের পুকুরে মাছ লাফাতিছে –– ইয়াব্বড় বড় কাতলা …
তপন :হয়ে যাক …
সবাই :কী হবে ডাইরেক্ট অ্যাকশান বলি দাও তপনদা ডাইরেক্ট …..
তপন :ভাবতিছি দাঁড়া।
  এইটি খুব বিপজ্জনক। তপন, তপনরা যখন বলে ভাবছি, সে এক মহা দুর্ভাবনা। গোটা সভাকে যেন ও তালুবন্দী করে খেলছে। সামনে পদ্মবিলের ওপর দিয়ে এক ঝাঁক বনটিয়া উড়ে গেল, সূর্যদেবতা মায়ের চাতালে চৈত্রশেষের চড়া রোদ ঢেলে দিচ্ছেন, গর্ভমন্দিরের চূড়ায় ঝিকঝিক করছে বাশুলীর বজ্র, উড়ছে তাঁর ধ্বজা। রক্ত আর লাল নেই,কালো শক্ত ভাব ধরেছে ––– মাছির পর এখন লাখ লাখ পিঁপড়ে পিঁপড়ানিরা রক্তের ছোট ছোট ডেলা মুখে করে গর্ভমন্দিরের ছায়া ছায়া পেছন দিকটিতে যাচ্ছে আসছে; ওখানে ওই শীতল মহানিমের তলায় কোটরে ওদের বাসা। ওরা মন্দিরের গুড় বাতাসা দধি দুগ্ধ ক্ষীরাদির নিত্য সেবক।
 কেদার ভয়ে ভয়ে ভেতরে টলছে, আর তখনি তাকে খেলিয়ে খেলিয়ে একেবারে পেড়ে ফেলে তপন ––– ভাই সকল, এই মায়ের মন্দির যে বা যারা অপবিত্র করি গেল, তাদের আমরা একদিন ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝি নিব। পালিয়ে যাবি কোথায়। সবদিকি আমাদের নজর আছে। আমার মনে হচ্ছে বিরোধীরা আশপাশের গাঁয়ে ঘাপটি মারি আছে, আমাদের গাঁয়ের বদনাম কিছুতেই করতি পারতিছে না, আমাদের পার্টি আমাদের গবমেন্ট আমাদের গ্রাম আমাদের মায়ের মন্দির সবকিছুরে একসাথে জড়িয়ে ওরা ঘোটালা করতিছে ––– এ রক্ত ওই সকল বিরোধীদের চক্রান্ত। প্রিয় ভায়েরা, পুলিশ ডাকলি দশ গাঁয়ে খবর ছুটবে, শালার পুলিশই ছড়িয়ে দেবে। নাঃ, তা হতি দিয়া যায় না। সবাই হাত লাগাও। এক্ষুনি এক্ষুনি। বালতি আনো। মায়ের মন্দির চাতাল ধুয়ে দাও দিকি ।
দুঃশাসন :এই ভালো হল বাপ,কী বুদ্ধি তুমার। ধুয়ে দাও বাবাসকল, আমাদের পদ্মবিল সদানীর। ইহার জল গঙ্গাজলসম অতি পবিত্র। আমিও এক অঞ্জলি জল দিয়া এই অপবিত্র মন্দিরের চাতাল শুদ্ধ করিব।
   তপন হাসতে থাকে, কেদারের দিকে তাকিয়ে বলে দেয় দাদা, ছেলেপুলেরা যাতিছে, তুমি শুধু বেশি নয়, একটি মণ মাছ দাও, বাকিটুকু পার্টি থেকি আমি ম্যানেজ করব’খুনি। ওর অনুরোধ তো আর অনুরোধ নয়, নির্দেশ। কেদার বম মেরে যায়,––– এক মণ? তপন জানায়, আর একটি কথা বলতে গেলেই সে দু মণ চেয়ে বসবে।
  কিন্তু, কেদার কি তাই চায়? না না না দুব দুব মাছ দুব ইয়াব্বড় ক্যাতলা দুব বাপ আমার ।
তপন : বেশ। সভা শেষ। আজ রাত্তিরি ইস্কুলে গোটা গাঁয়ের নিমন্তন ––– গরম গরম ভাত আর দিশি কাতলার ঝোল।
সবাই, জয় মা বাশুলীর জয়, বাশুলী মাঈকি জয় বলে এবার পদ্মবিল দাপাতে থাকে। গর্ভগৃহে ঘোমটার ফাঁক থেকে মা, বাশুলী মা তাঁর ধেড়ে খোকাদের কাণ্ড দেখে তো হেসেই খুন!
শেয়ার করুন