নীল মুখার্জী-র গল্প

নীল মুখার্জি

নীল মুখার্জী

আর্টিক্যাল

বেশ কয়েকযুগ ধরে সবাই একটা যেকোনো রেনেসাঁর অপেক্ষা করছি… সেটা রাজনীতি, প্রেম, শিল্পে, সমাজব্যবস্থায় হোক বা ধর… এই সামান্য চায়ের কাপটায়। একটা রিপিটেড সাইকেলে আবিস্কারহীন টুকে যাচ্ছি, তাই তোর মৌলিকতা ব্যাপারটা এখন ‘পার্স্পেক্টিভ’ এ এসে দাঁড়িয়েছে। একই জিনিস আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি। এই দ্যাখ, জাস্ট এই কথা গুলো যখন বাড়ি গিয়ে নিজের মত করে লিখবি, দেখবি সেটাও ঠিক নিজের মত না, বরং পছন্দের কারুর মত লিখছিস। শেষ কয়েকবছর ধরে নতুন লেখায় শালা পুরোনো ক্লাসিক পড়ছি, আজকের কলেজ ফেরৎ যোগেন চৌধুরীর উত্তরসুরিরা আর্ট গ্যালারি জুড়ে রেমব্রা আঁকছে ।
চায়ের কাপের ফুঁ দিতে দিতে অরিন্দম বলে চলল, তুই তো সাংবাদিকতা করিস, তোর কোন স্বাধীনতাটা আছে? না বিষয় না তোর মতামত। বিষয় পূর্বনির্ধারিত …আর লেখাটার যেটুকু নিজের মত ছক ভাঙা গোছের ভাবছিস সেটা এডিটে কাটা পড়বে। তাই বলছি (চায়ের কাপে একটি সশব্দে চুমুক দিয়ে) সময় বাঁচাতে আগে থেকে একটা বেস্ট প্রাকটিস ঠিক করে রাখিস কোন কোন জিনিস আলোচনার বাইরে রাখবি। অরিন্দম মাথা ঝাঁকিয়ে কি একটা বিড়বিড় করতে লাগলো।
যে সময়টায় শিঞ্জিনী নোট নিচ্ছিল, অরিন্দম চায়ে চুমুক দিতে দিতে শিঞ্জিনীর শরীরটা মন দিয়ে দেখছিল। ছিপছিপে চেহারায় একটু ভারী বুক, বয়স পঁচিশের কাছাকাছি হওয়া উচিৎ, সাংবাদিক হিসেবে যথেষ্ট শান্ত ও ভালো শ্রোতা। তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত বিষয় হল, অসম্ভব সুন্দর নাক ও মুখের গড়ন ও হাসি, ঠিক সরাসরি না হলেও একটা আবছা মিল আছে নন্দিতার সঙ্গে। অরিন্দম আজকাল খুব ঘন ঘন ইন্টারভিউ দেয়, তাই আগে সেরকম প্রস্তুতি নিতে হয়না তবে আজকে বলবার সময় একটু আফশোসই করছে, একটু কয়েকটা বই ঘেঁটে নিলে আরো কয়েকটা জ্ঞান গর্ভ বাণী বা রেফারেন্স দিতে পারতো, হয়তো শিঞ্জিনীকেও একটু ইমপ্রেসড করা যেত। সাংবাদিক যখন একটু সেপিওসেক্সুয়াল তো হওয়া উচিৎ। শিঞ্জিনী মাথা তুলে বলল, সরি রেকর্ডারটা কালকে বৃষ্টিতে ভিজে খারাপ হয়ে গেছে, আর খুব তাড়াতাড়ি লিখতে পারিনা, একটু সময় লাগছে। আচ্ছা অরিন্দমদা, আজকাল একটু আধটু তোমার লেখালিখি দেখলেও বহুদিন হয়ে গেছে তোমার নতুন কোন পেইন্টিং দেখা যাচ্ছে না, ব্যাপারটা কি?
আঁকছিনা তাই দেখা যাচ্ছেনা, আজকাল ফরমায়েশি আঁকা না আঁকলে একটা আঁকিয়ের ঘর চালানো সম্ভব না, আজকের কলকাতায় কটা মানুষ ব্রেক ইভেন কস্ট দিয়েও পেইন্টিং কেনে বলতো? তাই আর্টিস্ট এখন পেশাদারি গ্রাফিক্সের কাজ করছে বা আঁকার টিউশন পড়াচ্ছে,মুচকি হেসে অরিন্দম বলল, আমি পারিও না আর সুযোগও নেই তাই মাঝেমাঝে আঁকি কোন থিম ক্যাফে ট্যাফে থেকে রিকুয়েস্ট এলে। অরিন্দম আরো কয়েকটি কথা খুব আস্তে আস্তে বলল, শোনা গেলো না। শিঞ্জিনী চেয়ারটা একটু এগিয়ে নিয়ে এসে বসে বলল, হ্যাঁ কি বলছিলে শুনতে পেলাম না। অরিন্দম শিঞ্জিনীর দিকে ফিরে আবার যতটা দেখা যায় পর্যবেক্ষণ করে বলতে শুরু করল। লেখা লিখি টুকটাক করতাম ছোট থেকেই, ওরকম লেখা সব বাঙালিই লিখতে পারে। আজকাল একটু নামডাক হয়েছে বলে লেখা গুলো ছাপে, তাই গোটা দশেক লোকে জানতে পারছে। না লিখলেও হত, নতুন কিছু তো বলছিনা, ওই সবার মতোই সবাই যেটা অলরেডি জানে, চারদিকে দেখছে সেটাই লিখে দি। এই ধর, কেউ দু হাজার বছর পর মাটি খুঁড়ে কলকাতা শহরটা পেল। মানুষ কী ভাবছে বা কী জানতো সেটা তো জানা যাবেনা, হয়তো দু চারটি লেখা পাঠোদ্ধার করে বোঝা যাবে। তখন ধর সাহিত্য জিনিসটাই পৃথিবী থেকে লোপাট হয়ে গেছে। তাই ওদের কথা ভেবে সোজা কয়েকটা ফ্যাক্ট পর পর সাজিয়ে লিখে দি। কাঁচা ঘটনা… তোদের সাংবাদিকতার মত, না সরি ওটা আবার আজকাল ফিকশনাল লিটারেচরে বেশ দখল বানিয়েছে। অরিন্দম থামলো, নিশ্বাস ছেড়ে চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে শিঞ্জিনীর দিকে তাকিয়ে থাকলো। অনেক ফালতু কথা বলছে, এর থেকে অনেক ছোট,স্মার্ট, হিউমারাস উত্তর দেওয়া যায়। মেয়েটা হাসছেও না। নাহ।, একটা ছোট ব্রেক চাই। শিঞ্জিনীর দিকে বিরতির ইশারা করে পকেটের ভেতর কি একটা খুঁজতে খুঁজতে অরিন্দম টয়লেটের দিকে এগিয়ে গেল।
 ২
অরিন্দমদা এটা একদম মাথার ওপর দিয়ে গেল। শিঞ্জিনী হেসে বলল।
যাক আঁকা বুঝতে না পারলেও, অন্তত মেয়েটাকে আরেকবার হাসতে দেখতে পেয়েছে বলে খুশি হল অরিন্দম। ঘরটা অনেকটা পুরোনো বাড়ির বাসনের ঘরের মত, ছোট-অন্ধকার, একটা স্যাতস্যাতে হলদেটে চুন সুরকির দেওয়ালে ধুলো-ঝুল মাখা অনেকগুলো ক্যানভাস ঝুলছে। ঘরের লম্বালম্বি দেওয়ালে একটাই গ্রিল দেওয়া ছোট জানালা, সেখান থেকে দিনের আলো ঢুকছে। শিঞ্জিনী জানালার দিকে ফিরে তাকিয়ে ছিল, ওর শরীরে ধাক্কা খেয়ে আলো ওর অবয়ব গঠন করছিল। অরিন্দম স্থির ভাবে শিঞ্জিনীর ছায়ার দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল।
কি গো বল।
এটা একটা সুতো। অরিন্দম তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে বলল।
সুতো?
হ্যাঁ সহজ করে বললে একটা সুতো, সেটা নামতে নামতে নদী, তারপর নদী-উপনদী – শাখা প্রশাখা নদী দিয়ে বোনা একটা সোয়েটার। নিচে সেই সোয়েটার থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা সুতো। এবার সেটায় যদি টান মারিস, আবার সে সোয়েটার থেকে নদী বা নদী থেকে সুতো হয়ে যাবে।
হুম! মূল নদীটা খয়েরি রঙের কেন?
যা বাব্বা, সমতলে নদী তো খয়েরি রঙেরই হয়, তার ওপর দিয়ে জল বয়ে যায়, আর জলে আকাশের নীল রঙের রিফ্লেকশন। এই ঘরে তো আকাশ নেই… যাগ্গে এটা ঠিক খয়েরি না এটা হল ওই কি বলে… আইফেল টাওয়ার ব্রাউন।
সেটা কি? যে রং দিয়ে আইফেল টাওয়ার রঙ করা হয়েছে? শিঞ্জিনী পেন দিয়ে চশমাটা সেট করল।
হ্যাঁ অনেকটা তাই, তবে আইফেল টাওয়ারের জন্যই রংটার সৃষ্টি। একদম সিলিব্রিটি রং।
শিঞ্জিনী দেওয়ালের গায়ে ঝুলতে থাকা একটা ছোট চৌকো ক্যানভাসের দিকে এগিয়ে গেল, আর এই ছবিটা?এটাতো একটা গির্জার বেল ? শিঞ্জিনী ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে পেছনে কিছু লেখা আছে কিনা দেখতে গেল।
অরিন্দম প্রায় হাত থেকে ছবিটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল, খুব সাবধান, এটা যে সে ঘন্টা না। একবার যদি বেজে যায় হুলুস্থুলু কান্ড হয়ে যাবে। শিঞ্জিনী নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আবার নোটবুকটা বার করল। এই ছবিটা কি একটু বল তাহলে।
এটা সান রানিয়েরি। বিশ্বাসঘাতকদের প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড দেবার সময় শহরের লোক জড় করতে বাজানো হয়। অরিন্দম ছবিটা আগের জায়গায় রেখে জিজ্ঞেস করলো – আচ্ছা শিঞ্জিনী হঠাৎ আমার ইন্টারভিউ কেন? দেশে কি খবর কম পড়েছে? পাতা যদি ভরাতেই না পারিস, কয়েকটা পাতা কমিয়ে দে না, মানুষের হয়রানি কমবে, পয়সা বাঁচবে, কত গাছ বেঁচে যাবে বলতো?
শিঞ্জিনী হেসে বলল, ওই যে বললে, বিষয় বস্তু পূর্ব নির্ধারিত। আচ্ছা তোমার বাড়ির ছাদে একটা টেরেস গার্ডেন ছিলনা? শিঞ্জিনী ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করলো।
হ্যাঁ, ঠিক গার্ডেন না, বেশ কিছু গাছ ছিল। আসলে নন্দিতার গাছ নিয়ে কারবার আর অর্কিডখুব ভালোবাসে, আর আমি ওদের নাম দিতাম।
অর্কিডের নাম রেখেছিলে, বেশ, বোলো কয়েকটা যদি আরো কিছুটা পাতা ভরাতে পারি। শিঞ্জিনী হেসে উঠল।
অরিন্দম জানালাটার দিকে এগিয়ে গেল। অস্পষ্ট ভাবে বলতে শুরু করল, আক্যাম্পটার নাম ছিল দ্য বার্নিং জিরাফ, আক্যাম্প দেখেছিস কখনো? একটু হলদে বেসের ওপর লালচে কয়েকটা দাগ, জিরাফের টেক্সচারের মত।
বেশ তবে বার্নিং জিরাফ কেন?
যাহ, বার্নিং জিরাফতো বিখ্যাত ছবি রে…দালির আঁকা। সিভিল ওয়ারের সময় ওরকম গুলিয়ে দেওয়া ছবি ইতিহাসে খুব কম আছে। সামনে একটা নারীর দেহ বেয়ে সিঁড়ির মত ড্রয়ার বেরিয়ে আছে, পেছনে আরেকটি মেয়ে অস্ত্র হাতে, আর তার অন্যদিকে একটি জিরাফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুড়ছে।
অরিন্দম শিঞ্জিনীর দিকে ফিরে বলল, জানিস দালি ফ্রয়েডের অসম্ভব গুনগ্রাহী ছিলেন। ওনার অনেক পেইন্টিং ফ্রয়েডিয়ান সাইকোএনালিটিক্স এর ওপর আঁকা, তাও আবার সিভিল ওয়ারের মত কঠিন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে। সেটাই তো বলছিলাম, আজকে আমাদের দেশের পরিস্থিতি আরো ভয়ঙ্কর, একটা প্যাসিভ সিভিল ওয়ার জোনে দাঁড়িয়ে যুব সমাজ একটা মধ্যযুগীয় ক্ষয়িষ্ণু মানসিকতাকে প্রমোট করছে, আর বক্তব্যহীন, অর্থহীন, একটি উলঙ্গ শিল্পের বারবার জন্ম দিচ্ছে সে ক্যানভাস হোক বা পাতায়…এর থেকে কিছু গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতো। কিছুক্ষন নীরবতার পর শিঞ্জিনীর দিকে তাকিয়ে বলল- যাগ্গে সেসব, তো আরেকটা ভেনাস স্লিপার ছিল নন্দিতার ওটার একটা সহজ নাম ছিল বার্থ অফ ভেনাস, বত্তিচেল্লির সেই ।
অরিন্দমদা চল একটু খেয়ে নি কিছু, তারপর বাকিটা শেষ করা যাবে। শিঞ্জিনী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।
ছবির একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে,তেলতুলিরং তাদের ঘনত্ব, তাদের চলার পথ, তাদের বয়স,বার্দ্ধক্য মিলিয়ে আলাদা আলাদা গন্ধ, আমি চোখ বন্ধ করে নিজের ছবি চিনতে পারি। আমার ‘আত্মহনন’ ছবির গন্ধ অনেকটা ক্রাইসেনথিমাম ফুলের মত। কিভাবে ওই কালোমৃত্যুর গন্ধ এতো সুন্দর হয়ে উঠলো জানিনা। ছবির গন্ধ আর ছবির বিষয় মেলানো এক ভীষণ কঠিন কাজ। অরিন্দম এক দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। এই ঘর টা অনেক খোলামেলা, এখানে তিনদিকের জানালা দিয়ে আলো আসে। ঘরের কোনে একটা বয়স্ক মানুষ অনেক্ষন ধরে খবরের কাগজটা ভাঁজ করে ধরার চেষ্টা করছে।
শিঞ্জিনী চশমাটা মুছে খাতা পেন টেবিলে রেখে হাসি মুখে অরিন্দমের দিকে তাকালো। বেশ অরিন্দমদা, এখন কি ভাবে সময় কাটে, কি কাজ করছো?
অরিন্দম, গুন্ গুন্ করে একটা গান গাইতে গাইতে অন্যদিকে তাকিয়েই বলল, ব্লক, পুরো ব্লক মাথায় কিছু আসছেনা। লোকজনের লেখাটেখা পড়ছি, তাও ফাঁকা। বিষয় আছে, কিন্তু গোছাতে পারছিনা। আমার আগে বহু মানুষ কেওস এঁকে গেছে। একটা গোটা জন্রে হয়ে গেছে। তাই নতুন করে…
শিঞ্জিনী নোটবুক থেকে চোখ তুলে গলা খাঁকরে বলল – কিছু লেখালিখি?
দ্য পারসিস্টেন্স অব মেমোরি বলে দালির একটা ছবি আছে। সাররিয়াল আর্টের ওপর বেশ সাস্পিসাস একটা কাজ। দালি এক্সপ্লেন করে যাননি, তো পাবলিক গবেষণা করতে বসেছে। নেই কাজ তো খৈ ভাজ। আমিও সেটা নিয়ে যা পেরেছি লিখেছি, লেখাটা খুঁজেও পাচ্ছিনা। আবার লিখবো হয়তো, এবার অবশ্য অন্যরকম কিছু লিখে ফেলব। আচ্ছা তুই কিছু বল তোর সম্পর্কে। তুই এই ফালতু লোকজনের বোকা বোকা ইন্টারভিউ নেওয়া ছাড়া কি করিস?
শিঞ্জিনী ভেবে বলল – কিছু না ওই রান্না করি। মানে ওই মশলা পাতি এদিক ওদিক এদেশ ওদেশ করে আলাদা কিছু ফিউশন টাইপের রান্না করার চেষ্টা করি। তাও খুব একটা সময় পাইনা।
বাহ্ বেশ, কোন নামটাম আছে রান্না গুলোর?
নামি রান্না না,ওই যা খুশি একটা বানিয়ে খেয়ে ফেলি, দ্বিতীয়বার রান্না করার মত কিছু একটা বানালে নাম টাম রাখা যাবে। আচ্ছা তোমার ওই ছবিটার কি হল?
কোনটা?
নামটা দাঁড়াও, শিঞ্জিনী নোটবুকের পাতা উল্টে একটা পাতায় এসে থামলো – হ্যাঁ, বসন্তসেনা।
অরিন্দম উঠে বসে সোজা শিঞ্জিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, জানিনা, আমার কাছে নেই, নন্দিতার কাছেও দিয়ে যায়নি বোধহয়, থাকবে কারুর ঘরের গুদামে বা ছিঁড়ে খুঁড়ে কেউ ফেলে দিয়েছে।
ছবিটার কোন ছবি তোলা নেই।
ছবির ছবি আমি তুলি না, কেউ তুলে থাকলে তোদেরই জানা উচিৎ।
আমি দেখিনি কখনো, এতো ঘটনা যে ছবিকে নিয়ে, সেই ছবিটাই জাস্ট নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, কেমন একটা আফশোষ লাগে। ছবিতে হোমোসেক্সুয়ালিটি ছিল, ব্যাস এটুকু খবরে ছিল।
ধুৎ, হোমোসেক্সুয়ালিটি, আমার বিষয়টা নিয়ে একটা সিরিজ অফ পেইন্টিং আছে, আচ্ছা তোর মা কখনো তোর ঠোঁটে চুমু খেয়েছে?
শিঞ্জিনী একটু থতমত খেয়ে , না কেন খাবে, বলে মুচকি হেসে ফেলল।
খেয়ে থাকতেই পারে, তখন তুই হয়তো খুব ছোট, তাই মনে নেই। কখনো দেখিসনি সন্তানদের মা-বাবা রা আদর করে ঠোঁটে চুমু খায়?
হ্যাঁ সেটা দেখেছি।
সেটা কি সেক্সুয়ালিটি? কোন যৌন আবেদন সেটায় থাকে? যখন দূর্গা প্রতিমার শরীর তৈরী করা হয়, শিল্পী যখন নিজের দুহাত দিয়ে বুকের গঠন তৈরী করে, তাতে কোন সেক্সুয়ালিটি থাকে?
শিঞ্জিনী উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে থাকলো।
আমার ছবিতে ছোট্ট একটি মেয়ের ঠোঁটে মায়ের চুমু ছিল। ব্যাস, সেখানে স্বরস্বতী, লক্ষী, দূর্গা এনে একটা যাচ্ছেতাই মানে করে বাকি কাজটা তারাই করে নিল। জানিস সিস্টিন চ্যাপেলের সিলিঙে মিকেলেঞ্জেলো দুটি পুরুষের চুম্বন এঁকে রেখে গেছেন। জানিনা তারা প্রাচীন না আমরা, হয়তো এখনো সময়ের সরলরেখার গতির অভিমুখ বুঝতে পারিনা। আমরাই হয়তো রোজ প্রাচীনতর হচ্ছি। ফ্রান্সে মোহাম্মদের কার্টুন আঁকায়। …কি যেন নাম?
শার্লি এবদো, শিঞ্জিনী লিখতে লিখতে বলল।
ঠিক, ওদের গোটা অফিসটাকেই সমস্ত শিল্পী সমেত গণহত্যা করল জানোয়ারগুলো। অরিন্দম উত্তেজিত হয়ে উঠে বসল। ভয় দেখিয়ে শ্রদ্ধা বাগানো যায়? এটা উল্টে উস্কানি। শিল্পের প্রথম হ্যালটাই হল দুঃসাহস… ধৃষ্টতা। একদিন কোটি কোটি মানুষ হজরতের ছবি আঁকবে, ওকে নিয়ে হাজার রকম পার্সপেক্টিভ আর্ট হবে, কজন কে মারবে? এই তো কি একটা কমিউনিটি ব্ল্যাক জেসাস, গে জেসাস, মেয়ে জেসাস আঁকছে, ভ্যাটিক্যান কি ছিঁড়ে নিচ্ছে? সরি পার্ডন মাই ল্যাংগুয়েজ। অরিন্দম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
শিঞ্জিনী একটু চুপ করে থাকলো। তারপর টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা তুলে চুমুক দিয়ে বলল, অরিন্দমদা, এবার বেরোবো। নন্দিতাদির সঙ্গে কথা হয়? অন্যদিকে তাকিয়েই অরিন্দম বলল – না।
বয়স্ক মানুষটা কাগজের একটি সরকারি বিজ্ঞাপনে ‘ভারত সরকার কর্তৃক প্রচারিত’ বাক্যটির প্রচারিত শব্দটি কেটে প্রতারিত বানিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে হাসছে।
অরিন্দম, শিঞ্জিনীর নোটবুকেরর দিকে ইশারা করে বলল, কখনো ঐটা ছাড়া একা একা আসতে পারিস, মনোলোগ বলতেও ভালো লাগেনা আর মানুষের পড়তে ভালো লাগেনা।
নিশ্চয়ই চেষ্টা করব, এই একটা ছবি তুলবো তোমার, শিঞ্জিনী মোবাইলটা তুলল অরিন্দমের দিকে।
সেকি, এই অবস্থায়? আচ্ছা দাঁড়া! একটু মুখটা ধুয়ে,পাঞ্জাবিটা পরে আসি।
অরিন্দম হন্তদন্ত চলে যাবার পর শিঞ্জিনী অরিন্দমের গোটা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো। প্রায় সমস্ত দেওয়াল জুড়ে আঁকিবুঁকি কাটা, কোথাও স্কেচ, কোথাও ছোট্ট রঙিন মিনিয়েচার। ঘরের একমাত্র জানালার নিচে কয়েকটা কাগজ দেওয়ালে কোলাজ করে আটকানো। শিঞ্জিনী ঝুঁকে পড়ার চেষ্টা করল, পুরোনো কাগজের কাট আউট।
১৮ই জানুয়ারি ২০১৯
“হিন্দু দেবদেবী নিয়ে বিতর্কিত ছবি আঁকার জন্য অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের ছবির প্রদর্শনীতে ভাংচুর। শিল্পী মনে করছেন এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ঘটনা।”
 ১৪ই মার্চ ২০১৯
“পরিবেশবিদ নন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে ওনার স্বামী চিত্র শিল্পী ও প্রাবন্ধিক অরিন্দম চ্যাটার্জি কে , গতকাল রাতে তাঁর বাড়ি থেকে বালিগঞ্জ থানার পুলিশ গ্রেপ্তার করে, জানা গেছে উনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। অত্যাধিক মদ্যপান ও নিয়ন্ত্রণহীন নারীসঙ্গের কারণে ওনার কিছু বছর আগেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের পরেও অরিন্দম বাবু নিজের স্টিডিয়োতে আসতেন। বেশ কিছু মাস রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে কাটানোর পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায়, নন্দিতাদেবী অভিযোগ করেন বলে জানা যাচ্ছে। “২৬শে জুন, ২০১
“মানসিক চিকিৎসালয়ে স্থান হল বর্তমান সময়ের অন্যতম চিত্রশিল্পী ও সমালোচক অরিন্দম চ্যাটার্জির, জানা যাচ্ছে উনি নিউরোস্থিনিয়া রোগে আক্রান্ত “
১৭ই জুলাই, ২০১৯
“নিউরোস্থিনিয়া মিলিয়ে দিল এডভার্ড মুনখ আর অরিন্দম চ্যাটার্জিকে”
শেষ আর্টিক্যাল কাট আউটটি মাঝ বরাবর কেটে লাল তুলি দিয়ে ন্যাকাচো লেখা।
শেয়ার করুন