শান্তা মুখোপাধ্যায়-এর গল্প

শান্তা মুখোপাধ্যায়

শান্তা মুখোপাধ্যায়

দংষ্ট্রা 

একতলার প্রশস্ত চাতালে ব্রজবাসিনী সবে মোক্ষম চাঁটির ঘায়ে এক রক্ত পিপাসু মশক-শিরোমণিকে হত্যা করে পরম পরিতৃপ্তি ভরে দেহাবশেষটি ভুমিতে নিক্ষেপ করছিলেন, তখনই মোক্ষদা দাসী ভয়ঙ্কর বার্তাটি নিয়ে এল। এমনিতে চৈত্র সন্ধ্যায় মৃদু মন্দ বাতাস বইছে, গরম তত যেন অনভূত হয় না। সেই হেতু ভজার মা পাখা নিয়ে বসে থাকলেও তাকে হাত নেড়ে বাতাস করতে বারণ করেছিলেন ব্রজবাসিনী। কিন্তু এখন গ্রীষ্মের খরতাপবোধে গায়ের কাপড়খানাও রাখা যেন অসহ্য হয়ে উঠল। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ এই সময়ে অন্দরমহলে কাজ বিশেষ থাকে না। নিত্যপূজার ঘরে  ধুপ দীপ দেওয়া হয়েছে। জ্ঞাতির বড় তরফের বিধবা বৌ নিত্যবালার ভাগ ছিল আজকে। এসব হিসাব তো ব্রজবাসিনীকেই রাখতে হয়! চারবছর আগের ওলাওঠায় এবাড়ির সোমত্থ পুরুষেরা স্বর্গের পথ ধরলে ব্রজেনই অভিভাবক হয়ে বসল। ব্রজেনেরই বা কত বয়স, তখন? সদ্য কালেজ থেকে পাশ দিয়ে বেরিয়েছে।  কালেজে পড়া এখন রেওয়াজ, তাই। নইলে দত্ত বাড়ি  কি ভাতের অভাব, যে ভাতের জন্য পাশ দিতে হবে! তবে ব্রজেন ছেলে ভাল। সংসারে নজর আছে। মা জেঠিমাদের মাথায় করে রাখে, ভাইদের খেয়াল রাখে, দুই বোনের বিয়ে দিয়েছে। ছোটটি নেহাতই সিকনিঝরা বালখিল্য। বাপের মৃত্যুকালে মাস কয়েকের ছিল। তবে ব্রজেন যে আজ মাতব্বর হয়ে উঠতে পেরেছে, সেটা কার জন্য? ব্রজবাসিনীর জন্যই তো! সেটা সবাই জানে। এ সংসারের আসল মাথা ব্রজবাসিনীই। সেটুকুর জোরেই এই দীর্ঘ বৈধব্য পার করে চলেছেন ব্রজবাসিনী। মোক্ষদার কথায় ব্রজবাসিনীর বর্তুলাকার চোখ আরো সুবর্তুল হয়ে উঠল। ভজার মার হাত থেকে পাখা ঠক করে পড়ে গেল। ব্রজবাসিনী বললেন, “কী বললি?” মোক্ষদা বলল, “মা কালীর দিব্বি,   বোটোকখানা ঘরে দা’বাবুরা এই কতাই বলচে, নিজে শুনে এলুম গো!  বিশ্বেস না হয় নিজে গিয়ে দ্যাকো না!” কথাটার গুরুভারে ত্রস্ত ব্রজবাসিনী আর সইতে পারলেন না। বললেন, “কী বললি মাগি? আমি যাব বোটোকখানা ঘরে তোর বাবুদের আসরে! জাত কূল ধম্ম আর রাকলি না!” মোক্ষদা ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে উত্তেজনার বসে কী ভুল করে ফেলেছে! তাড়াতাড়ি নিজের কানে হাত দিয়ে ওঠ বোস করতে করতে বলে, “ঠাউরুণ বড্ড বেভুল হোয়ে গ্যাচে! এবারটির মতন ক্ষ্যামাঘেন্না করে দ্যাও!” বৈঠকখানা ঘরে ব্রজেনদের আড্ডায় কী হচ্ছে না হচ্ছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানার জন্য ব্রজবাসিনী মোক্ষনদাকে নিযুক্ত করেছেন এবং এরজন্য মোক্ষদার উপরি পাওনা হয়। মোক্ষদা ওঠবোস না করে পারে! ঠাকরুনকে চটালে কালকেই এই ভার অন্য কেউ পেয়ে যাবে। দত্তবাড়ির মেয়েমহলে দাসী বাঁদীর ত অভাব নেই! তবে অন্য কেউ নিযুক্ত হলেই যে কাজটা সুসমাধা করতে পারবে, এমনটা নয়। যেমন ভজার মা। কিছু খবর তো আনতে পারবেই না, উলটে ব্রজেনের কাছে ধরা পড়ে ঠ্যাঙার বাড়ি খেয়ে ফিরবে। তাই ব্রজবাসিনীরও মোক্ষদাকে ক্ষমা না করে উপায় নেই। দশ না পেরোতেই ব্রজবাসিনী বললেন, “থাক, হোয়েচে! আর ধ্যাস্টামো কোরতে হবে না! তা বলি, মোক্ষদা, কতাটা সত্যি?”  মোক্ষদা বলে, “তিন সত্যি, ঠাউরুণ! তিনসত্যি!” উঠোনের কোন থেকে একটা টিকটিকি ডেকে উঠতেই ভজার মা বলল, “তিনসত্যি পড়ে গেল গো!” ব্রজবাসিনীর উত্তেজিত গলার আওয়াজ পেয়ে পায়ে পায়ে এসে দাঁড়িয়েছে বড়বৌ গিরিজা, মেজবৌ আলোশশী, সেজবৌ তারাসুন্দরী, ছোটবৌ কুসুমবালা। চারবছর আগে একসঙ্গে এদের সবারই কপাল পুড়েছে। এখন হরির চরণ ধরে যে ক’দিন বাঁচা! তবে এ কি বাঁচা! জীয়ন্তে মরা!
পায়ে পায়ে এসে দাঁড়িয়েছে ব্রজেনের বৌ সুহাসিনী। সে সার্থক নাম্নী বটে! হাসি তার মুখে লেগেই আছে, আর সেটাই মাঝে মাঝে অসহ্য হয়ে ওঠে তার শ্বশ্রূকূলের কাছে। পিসিশাশুড়ি ব্রজবাসিনী এজন্য মুখ ঝামটা দিতে ছাড়েন না! “ তোর দেকি মুকে হাসি আর ধরে না! সোয়ামী খুব সুখ দেয়, নাকি? ভদ্দর ঘরের বৌএর এত বেহায়াপনা ভালো নয়। বলি, বাপের ঘরে কিচুই কি শেকায় নি? দেওয়া থোয়া নাহয় করেচে কঞ্জুষের মতন, সহবত শিক্কায়ও কঞ্জুষি? ” সুহাসিনীর হাসি মিলিয়ে যায়। অধোবদনে দৌড়ে পালায়।  আজ এহেন পরিস্থিতির উদ্ভব না হওয়ায় সে দাঁড়িয়ে রইল। ব্রজেনের বিবাহিত বোন সুধাময়ী এখনও রজদর্শন হয় নি বলে শ্বশুরঘর করতে যায় নি। সেও এসে দাঁড়ায়। বাড়িতে আশ্রিত সংখ্যাও কম নয়। তারাও ভিড় জমায়। চাকরাণীদের মহল থেকেও দাসীরা আমদানি হতে থাকে। অন্য দিন এমন জমায়েত হলে বিল্বমঙ্গল কি বিদ্যাসুন্দর পড়া হয়। ব্রজেনের মেজ ভাই উপেন লায়েক হয়েছে। হিন্দু কালেজে পড়তে যায়। বাড়িতে মাস্টার আসে তাকে পড়াতে। সেই উপেন পড়ে শোনায়, আর মহিলাকুল ভাব অনুযায়ী হেসে কেঁদে আকুল হয়। কিন্তু আজ উপেনের দেখা নেই। তাহলে কি এমন ঘটল যে তাবৎ রমণীকূল এই চৈত্র সন্ধ্যায় চাতাল বিলাসী! ব্রজবাসিনীর গলা সকলের ফিসফাসের উপর দিয়ে বয়ে গেল। “কি অশৈরণ কতা!” ব্রজবাসিনীর বড়দার দ্বিতীয়পক্ষ গিরিজা বলে, “কি কতা গ ঠাকুরঝি?” ব্রজবাসিনী বলেন, “ছ্যা ছ্যা, এমন কতা শোনাও পাপ! গঙ্গাজলে চ্যান কোরতে হবে এই সন্দেবেলা!” খুব গুরুতর কিছু একটা হয়েছে সবাই বুঝতে পারে, কিন্তু কি যে সেটা ঠাহর করে উঠতে পারে না। ব্রজেনের বোন সুধাময়ী এবার বলে ওঠে, “অ পিসি বল না, কী হোয়েচে?” ব্রজবাসিনী বলেন, “সে পাপ আমি মুকে উশ্চারণ কোরতে পারব না। মোক্ষদা, তুই বল।“ মোক্ষদা বলে, “বোটোকখানায় বলচেল দেশে নাকি হুজুক উটেচে!” হুজুক তো উঠেই আছে।গুরু আসার হুজুক, লোহা সোনা করার হুজুক, কে নবাব আসার হুজুক… হুজুকের কি আর শেষ আছে! তবে নবনব হুজুক আপাত শান্ত জীবনে উন্মাদনার সৃষ্টি করে এবং সেই রসদে কিছুদিন রসেবশে বাঁচা যায়। মহিলাকুল হুজুকের গন্ধে চনমনে হয়ে উঠল। সেজবৌ তারাসুন্দরী বল, “মোক্ষদা, হেঁয়ালি রেকে খোলসা করে বল, তো কিসের হুজুক?” মোক্ষদা এবার আর রাখঢাক নাকরেই বলল, “বেদবার বে’র হুজুক! কে একটা বিদ্যেসাগর নাকি সরকারের ঠেঞে আইন বার করে নিয়েচে, বেদবার আবার বে হবে।এর জন্য বিদ্যেসাগর নাকি হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়াচ্চে, বেদবা দেকলেই ধরে বে দে দিচ্চে!” বলাই বাহুল্য বিষয়টি যতটুকু বৈঠকখানা ঘর থেকে মোক্ষদার কানে গেছিল, মোক্ষদা আপন কল্পনায় তাকে আরেকটু পল্লবিত করতে ছাড়ে নি।
এতটা কেউ আন্দাজও করতে পারে নি! বিধবার দল ছিটকে উঠল। অন্দরমহলের চাতালে ঘোমটার অত বালাই নেই। মহিলারা গরম লাগলে পা ছড়িয়ে কাপড়খানা হাঁটুর উপর পর্যন্ত তুলে দিয়ে হাতপাখার বাতাস খায়। কিন্তু একথা শোনার পর গিরিজা আধহাত ঘোমটা টেনে দিল, যেন এখুনি বিদ্যাসাগরের মুখমুখি পড়ে যাবে। দেখাদেখি অন্য বিধবারাও। সকলে বলে উঠল, “ কী অশৈরণ কতা! ছিঃ শুনলেও পাপ!” মোক্ষদা বলল, “আমি ক’দিন থেকেই গুজগুজ শুনচিলুম। বলে নিকি একটা বেদবার বে’ হয়েও গেচে! সিসচন্দ না কে একটা করেচে! সেই বেদবার মা মাগি নাকি যত নষ্টের গোরা! মরে যেতে পারল নে! বেধবা মেয়ের আবার বে দেকবে নিজে বেদবা হয়ে! বলি, দিনকালই বা কি পড়ল! চোক গেলে গেল না গ অমন বে’ দেকার আগে!” সকলের নানাবিধ মত বিনিময়ে চাতাল মুখর হয়ে উঠল। এমন সময় ব্রজেনের বৌ সুধাময়ী বলে উঠল, “কেন তোমরা এমন বলচ! খুড়ি জেঠিদের কষ্ট দেকে আমার বুক ফাটে! নাহয় হলই বেদবার আবার বে! খুড়ি জেঠিদের নাহয় তাও বলতে নেই, বয়স হয়েচে, আমাদের লীলাবতীর কতা ভাব! একাদশীর নিরম্বু উপোস দিতে পারে!” কোনওমতে শুনছিলেন ব্রজবাসিনী। আর সহ্য হল না। চুলের মুঠি ধরে ঠাস ঠাস করে ঘা লাগাতে লাগাতে বলতে লাগলেন, “হারামজাদী! তোমার জিব আমি ছিঁড়ে নোব! যত বড় মুক নয় তত বড় কতা! হাভাতের ঘরের মেয়ে আনলে এমনই হয়! বিয়ের আসরেই যকন শুনলাম বরযাত্রদের দেকানোর জন্যি মাত্র বাহান্নপদ করেচে তখনই জানি এদের চালচুলো বলতে নেই! খাবে ত সেই চাকরবাকররা। কুটুমরা ত দাঁতেও কাটবে না! রিত মেনে শুধু দেকবে! পুরুষ মানুষ! তারা বিয়ের আসরে একটু ঢুকু ঢুকু করে। তা চাকরবাকরদের সামনে কোনও ইজ্জত রইল দত্তবাড়ির!” সুহাসিনীর এমন অপমান গাসহা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এখনও তার হজম হয় না। শক্ত হয়ে থাকে। এহেন ঘটনার পর যে যার ঘরে চলে যায়। মোক্ষদার হাতে আরো তুরুপের তাস ছিল। সেটা আবার কবে দেখাবে ভাবতে থাকে।
রাত্রে খাবার পর গিরিজা ঘরে ঢোকে। বিধবা মানুষের আবার রাতের খাবার! ফলারই চলে। অস্বচ্ছ মশারীর ঘেরাটোপে আলোশশী ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রদীপ নিভিয়ে দেয় গিরিজা। পুবের জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ে। জানলার গরাদ ধরে দাঁড়ায় গিরিজা। মনে হয় এই গরাদই মেয়েদের জীবনের ঠিকানা। ব্রজেনের বড়জ্যাঠার দ্বিতীয়পক্ষ হওয়ায় গিরিজার বয়স কুড়িও পেরোয় নি এখনও। গিরিজার সতীনপুতেরাই তার থেকে বড়। তাদের সামনে বেরোতে লজ্জা করে গিরিজার।বাপ মরতে তারা ভিনু হয়েছে, তাই সামনে পড়ার দায় ণেই আর! স্বামীসুখ বলতে কী বোঝায় তাও ভালো করে বুঝতে পারে নি বয়স্ক স্বামীর থেকে। গিরিজা জানে গত জন্মের পাপের ফলে এই জন্মে বৈধব্যযোগ। কেউ খন্ডাতে পারবে না! এ জন্মে পাপের ভাগী না হলে আগামী জন্মে স্বামী পুত্র নিয়ে অক্ষয় সংসার। কেমন হবে সে সংসার? গিরিজা কল্পনা করতে থাকে। সিঁথিতে সিঁদূর টানে বড়করে। পায়ে আলতা। সীতাহার, পাটিহার… ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্কের মত তোরঙ্গ থেকে বার করে আনে বিয়ের লাল চেলিখানা। সাদা সিঁথেয়ই চেলি পরে, সীতাহার পরে আবার জানলার গরাদ ধরে দাঁড়ায়। সন্ধেবেলার কথাগুলো মনে অচেনা ঢেউ তোলে। কে সেই বিদ্যাসাগর! বিধবাদের যা কিছু আগামী জন্মের জন্য তোলা, তাকে এ জন্মে টেনে আনার সাহস করেন? এ জন্মেই হতে পারে? বিধবাদেরও হতে পারে?
কতক্ষণ গেছে হুঁশ নেই গিরিজার। আলোশশী গিরিজার সম্পর্কে ছোট হলে কি হবে, বয়সে দশ বছরের বড়। আলোশশী কখন জেগে গেছে, টের পায় নি গিরিজা। মশারির বাইরে এসে আলোশশী ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে গিরিজার দিকে। তারপর কোনওরকমে বলে, “দিদি!” গলার স্বরে কি ছিল গিরিজা সঠিক বুঝতে পারে না। ধিক্কার, না মিনতি। গিরিজার মরমে মরে যেতে ইচ্ছে করে। তাড়াতাড়ি এসে আলোশশীর হাত দুটো ধরে বলে, “কাউকে বলিস নি, মেজ, আমার গা ছুঁয়ে বল,কাউকে বলবি না!” আলোশশী বড় মায়াভরা চোখে গিরিজার দিকে চায়। মেয়েটা স্বামী সুখ পায় নি। স্বামীসুখ বলতে কি আলোশশীই পেয়েছিল? স্বামী সুখ মানে হাতের সুখ হলে সে সুখ আলোশশী পুরাদস্তুর পেয়েছিল একথা বলা যায়। অজান্তেই কপালের কাটা দাগটায় হাত চলে যায় আলোশশীর। পানে চুন বেশি পড়ে যাবার অপরাধে কাঁসার ঘটি ছুঁড়ে মেরেছিল। গলগল করে রক্ত বেরচ্ছিল, কেউ ছুটে আসে নি। ব্রজবাসিনী চিৎকার করে বলেছিলেন, “যেমন কম্ম তেমন ফল!” ভজার মা রাতের আঁধারে চুপি চুপি পিদিমের তেল লাগিয়ে দিয়েছিল। সন্তানাদিও কম নয় আলোশশীর। চার ছেলের দুই ছেলেই আঁতুর পেরোয় নি। ছোটছেলে নিরুদ্দেশ বেশ ক’বছর হল। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি। বড়ছেলে দত্তবাড়ির ধারা বজায় রেখে ফি সন্ধ্যায় আতর মেখে জুরি গাড়ি হাঁকিয়ে রাঁঢ়বাড়ি যায়। দিনমানে টলতে টলতে ফিরে বেবাক ঘুমায়। নইলে সে তো পরিবারের কর্তা হতে পারত! তা না, কর্তা হল সেজগিন্নীর বড়ছেলে ব্রজেন! ব্রজেন ছেলে ভালো, নিজের মায়ের মতই সম্মান করে তাকে, কিন্তু কোথায় যেন একটু বাজে! আলোশশীর বড়বৌ থাকে বাপের বাড়ি। আনার নামও নেই। ব্রজবাসিনীও কিছু বলেন না এ নিয়ে। কে না জানে, ব্রজবাসিনীর কথাই শেষ কথা এ সংসারে! আলোশশীর মনে হয় মেয়েদের সংসারটা মাকড়শার জাল বোনার মত। নিজে বোনে, কিন্তু নিজে জালে বাঁধা পড়ে না।
রাত্রে ব্রজেন ঘরে এসে দ্যাখে সুহাসিনীর গালে কালশিটা। ব্রজেন ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “কোতায় লাগালে?” সুহাসিনী উত্তর দেয় না। ব্রজেন আলতো হাতে চিবুক তুলে ধরতেই কোন বাধা না মেনে ঝর ঝর করে জল এসে ভিজিয়ে দেয় ব্রজেনের আঙুল। ব্রজেন বলে, “একি! চোকে জল? কানচ কেন? বাপের বাড়ির জন্য মন কেমন করচে? কিন্তু বে’ হলে মেয়েদের স্বামীর ঘরই তো করতে হয়, বল? বেশি মন খারাপ করলে না হয় দুদিন থেকে এস বাপের বাড়ি থেকে। তবে দুদিনই, তার বেশি নয় কিন্তু!” সুহাসিনী ভাবে তার কি ভাগ্য! এমন দেবতার মত স্বামী ক’জন পায়! এই স্বামী ছেড়ে বাপের বাড়ি যাবার কথা  সুহাসিনী ভাবতে পারে না। সুহাসিনী  তাড়াতাড়ি বলে, “না, না সেকতা নয়। পিসি ঠাউরুণ…” আর বলতে পারে না। এবার ফোঁপাতে থাকে। সদ্য চোদ্দয় পরা সুহাসিনী সংসারের কটুতায় এখনও পোক্ত হতে পারে নি। ব্রজেন বলে, “কী হয়েছে, পিসিমা মেরেচেন? কেন? তুমি তো দোষ করার মেয়ে নও!” সুহাসিনী বলে, “আপনারা নাকি বোটোকখানা ঘরে বেদবার বে’ নিয়ে কতা বলচিলেন?” ব্রজেন বলল, “কে বলল তোমায়?” সুহাসিনী বলল, “আমায় একা কেন, হাটের মাঝে ত বললে মোক্ষদা!” ব্রজেন বলল, “একবার লাঠির বাড়ি খেয়ে শিক্ষা হয় নি দেকচি মোক্ষদার! হ্যাঁ, বলেচি ত বেদবা বিয়ের কতা! কী হল তাতে? বিদ্যেসাগর মশাই কত কাজ করচেন , জান? বেদবাদের দুক্ষু চোকে দেকা যায় না…” সুহাসিনী এবার একটু সাহস করে বলে, “সেই কতাই ত আমি বলেচিলুম। বেদবাদের বে’ হলে কী ক্ষেতি! তাইতে…” আর বলতে পারে না সুহাসিনী। আবার ফোঁপাতে থাকে। ব্রজেন বুকে টেনে নেয় সুহাসিনীকে। তারপর গাঢ় গলায় বলে, “যে যা বলচে বলুক, তুমি এমনটাই থাকবে। কেমন?” সুহাসিনী বাধ্য মেয়ের মত ঘাড় নাড়তেই কুড়ি বছরের পৌরুষ তার প্রাবল্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুহাসিনীর উপর। সুহাসিনী জানে কোনও কোনও ব্যথা ভালোবাসার।
ব্রজবাসিনী সন্ধে ইস্তক বিভ্রান্ত হয়ে আছেন একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আজন্ম সংস্কারের বাঁধন মনে কু গাইছে। ব্রজেন এ কি সঙ্গে পড়ল! এরা ধম্ম বলে কিছু রাখল না! কালই দুপুরে খাবার সময় কথাটা পাড়তে হবে। দুপুরের খাওয়ার দেখাশোনা ব্রজবাসসিনীই করেন। ব্রজেন কুড়ি বছরের হলে কি হবে, ঘরের মালিক তো! তার খুড়িমা জেঠিমাদের মধ্যে গিরিজা ব্রজেনের সামনে বেরোয় না। অন্যদের অত আড়াল নেই, তবে জ্ঞাত গুষ্টির আর কেউ না কেউ পংক্তি ভোজনে বসেই। তখন আলোশশী দেওয়া থোওয়া করে। আঁশ পদগুলো ছুঁতে ইচ্ছে করে না আলোশশীর! কিন্তু কপাল! ওলাওঠায় এবাড়ির সধবা সংখ্যা এত কমে গেছে! সধবা বলতে তো ব্রজেনের বৌ, ব্রজেনের বোন আর দুএকজন জ্ঞাতি। তাদের দিয়ে দেওয়া থোওয়া করা ব্রজবাসিনী পছন্দ করেন না। কাকে কি দিতে হবে কোনও জ্ঞান আছে? বড় মাছের মাথা হয়ত দিয়ে বসবে এলেবেলে কোনও জ্ঞাতির পাতে! দুবেলা খাওয়া জোটানোর ভার দত্তবাড়ি নিয়েছে বটে, তাবলে মাছের মাথা খাওয়ানোর ভার তো নয়! কিম্বা পায়েসের জামবাটি ব্রজেনের বদলে আর কারো সামনে বসে যাবে। তখন তো আর “একেনে দাও” বলা যায় না। তাই যে দেওয়া থোওয়া বোঝে, তাকেই ভার দেন ব্রজবাসিনী। আলোশশী আঁশ হেঁশেল ছোঁওয়ার পর একবার চান করে নেয়। তারপর নিরিমিষ হেঁশেলে ব্রজবাসিনীকে খাইয়ে জায়েরা সবাই মিলে খেতে বসে। ছোলা দেওয়া আমের খোসার আচার বা ইঁচড়ের আচার পাথরের বাটিতে বার করে রাখে। যে যেমন পারে খেতে খেতে হাতে করে পাতে তুলে নায়। বাকিটা আলোশশী খায়। সবাই জানে আলোশশীর আচারের প্রতি দুর্বলতা। মুখে বলে, “সকড়ি হয়ে গেছে, এ তো আর রাকা যায় না!” খাওয়া হয়ে গেলে ঝি রা এসে বাসন গুছিয়ে পুকুরঘাটে যাবে, এঁটো পাড়বে। তারপর নিজেরা খেতে বসবে। সকালেই গিন্নী মাপমত ভাঁড়ার বার করে দেন ওদের। ওদের হেঁশেল আলাদা। পাত গোছানোর সময় লোভনীয় কিছু পড়ে থাকলে আলাদা করে রেখে দেয়। নিজেরা খাবার সময় খেয়ে নেয়। বাবুদের গিন্নীমায়েদের পাতের এঁটো। ওতে দোষ হয় না! অন্নদাতা বলে কথা!
খাওয়া দাওয়ার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ রোজই অনুষ্ঠিত হয় একই ভাবে। একইভাবে ব্রজবাসিনী পাখা নিয়ে হাওয়া করতে বসেন। ব্রজেনের খাওয়ার তদারকি করতে করতে বলেন, “মাচের মাতাটা ফেলে উটচিস যে! ওমা! পায়েসের বাটি ধরলি নে! মাতা খাও বাবা, পায়েসটা একটু মুকে দ্যাও, খুড়িমা কত যদন করে তোমার জন্যি বানিয়েচে!” ব্রজেন কোনও দিন হয়ত একখাবলা তুলে মুখে দেয়, কোনওদিন দৃকপাত না করে উঠে যায়। এই সময়েই ব্রজবাসিনী দুটো কথা বলেন ব্রজেনের সঙ্গে। যদিও ব্রজেন বিষয় আশয় ভালই সামলাচ্ছে, তবু তেমন জ্ঞাতির উপস্থিতি না থাকলে দু চারটা বৈষয়িক কথাও বলে থাকেন। কার বিয়ে দিতে হবে, কার শ্বশুরবাড়ি তত্ত্ব পাঠাতে হবে, কার শ্বশুরবাড়ি থেকে তত্ত্ব এসেছে সেসব কথাও ব্রজেনকে তাঁর বলা চাই। এই যেমন ক’দিন হল উপেনের বিয়ের কথাটা মাথায় ঘুর ঘুর করছে। চোদ্দ বছরের হল। কালেজে যাচ্ছে। এইবেলা বিয়েটা দিয়ে দিলেই হয়। চাদ্দিকে যা হাওয়া লেগেছে! কিন্তু হুট করে বলাটা ব্রজবাসিনীর স্বভাব নয়। যেমন কালকের শোনা কথায় আজই হুট করে ব্রজেনকে শাসন করতে যাবেন না ব্রজবাসিনী। আরো খবর যোগাড় করতে হবে। মোক্ষদা যেমন যোগাড় করছে করুক, কিন্তু উপেনকে ধরতে হবে। বাবা বাছা বলে বার করে আনতে হবে চাদ্দিকের খবর। ছোকরা কালেজ যায়, খবর রাখবে নিশ্চয়। সন্ধেবেলা গল্পের আসরে উপেনকে ডেকে নিতে হবে।
সন্ধে বেলা মেয়েমহল চাতালে বসে আছে। ধুনো দেওয়া হয়েছে, তবু বিনবিনে মশা। যে যখন পারছে চটাস চটাস করে মারছে। উপেনকে ডেকে আনা হল। আলোশশী বলল, “আজ কি বিদ্যা সুন্দর শোনাবে?” বিদ্যা সুন্দরে আদিরসের প্রাধান্য বেশি! কান লাল হয়ে যায় আলোশশীর! তবু শোনবার কি অমোঘ টান অনুভব করে! ব্রজবাসিনী বলেন, “সে হবে’খন। বলি বাবা উপিন, চাদ্দিকে যে রোল উটেচে বেদবার আবার বে দেবে, সত্যি?” এই একটা ব্যাপারে চারিদিকে এমন সাজ সাজ রব পড়ে গেচে উপেন জানবে না! তাদের কালেজে কম তর্ক হয়েছে এই  নিয়ে? উপেন সোৎসাহে বলতে থাকে, “হ্যাঁ গো, পিসঠাউরুণ! বিদ্যাসাগর মশাই আইন পাশ করিয়েচেন তো! পেথম বেদবা বিয়েও দিয়েই ছাড়লেন!” মোক্ষদা দাসী বলে উঠল, “ছ্যা! ছ্যা! জাত ধম্ম কিচু রাখলে না! কে সিসচন্দ না কি বে করেচে! এই কলকেতায় বসেই? সমাজের বড়মানুষেরা কিচু বলচে নাগো!” উপেন বলল, “শ্রীশ চন্দ্র করেচেন তো বে। বিদ্যাসাগর মশাই নিজে ডাঁড়িয়ে ঠেঞে বে’ দিয়েচেন। আর সিঙ্গীদের ছেলে নাকি ট্যাকা দিয়েচে।“ ব্রজবাসিনী বলেন, “কালে কালে কত কি দেকব! বেদবার বে, তাতে আবার ট্যাকা দেয় সিঙ্গী বাড়ির ধিঙ্গী! সে মাগীরই বলিহারি! নোলা সকসক কচ্চে সোয়ামী নে’ ঘর করার জন্যি! ঘেন্নায় মরে যাই! দেকবি, এই আমি বলে রাকলুম, বচর ঘুরবে না, ওলাউটোয় মরবে ওর সোয়ামী!” আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে সুহাসিনী! বলতে চায়, “ শাপমিন্যি দিচ্চেন কেন পিসীমা?” কালকের গায়ে গতরে ব্যাথার কথা মনে রেখে আর বলতে পারে না। কিন্তু উপেন প্রতিবাদ না করে পারে না। বলে, “পিসীমা, এত এত বেদবা এত কষ্টে আচে, তাদের একটা গতি হবে, এ কি ভাল কাজ নয়? তবে শাপান্ত করচ কেন?” ব্রজবাসিনী বলেন, “ছি ছি! বেদবার বে কোনও হিঁদু শাস্তরে আচে? উটপটাং কে বলে দেল, আর সরকার দুকলম লিকে আইন করে দেল! সমাজ মানবে কেন! হিঁদুর ঘরে বেদবা হয় গত জন্মের পাপের ফলে। এজন্মেও পাপে ডুবলে পরকাল আর কি থাগবে?” উপেন বলে, “শাস্তর দেকেই তো বিদ্যাসাগর বলেচেন বেদবার বে অশৈরণ নয়! নইলে আইন হত? শাস্তরের পালটা যুক্তি দে’ কেউ আটকাতে পেরেচে বিদ্যাসাগরকে? শুধু শুধু ওনার নামে কুচ্ছো করছে!” কেচ্ছার নামে এক বয়স্ক আত্মীয়ার বেশ উৎসাহ। বলল, “কি কুচ্ছো করচে?” উপেন বলল, “ এই তো ঈশ্বর গুপ্ত মশায় লিকেচেন, অত বড় কবি কিন্তু কি ভাষা!” বয়স্ক মহিলাটি আবার বলল, “ কি লিকেচেন?” উপেন গড়্গড় করে বলে চলল,
“বাধিয়াছে দলাদলি, লাগিয়াছে গোল,
বিধবার বিয়ে হবে বাজিয়াছে ঢোল।
কোথা বা করিচে লোক শুধু হেউ হেউ,
কোথা বা বাঘের পিছে লাগিয়াছে ফেউ
অনেকেই এত মত লতেছে বিধান
“অক্ষত যোনির” বটে বিবাহ-বিধান।
কেহ বলে ক্ষতাক্ষত কে বা আর বাছে?
একেবারে তরে যায় যত রাঁড়ী আছে।“
মোক্ষদা হ্যা হ্যা করে হেসে ওঠে। হাততালি দিয়ে বলে, “জব্বর বলেচ বটে ছোটবাবু। ক্ষতাক্ষত কে বা আর বাছে!” মেয়েমহলে উপেন গড়গড়িয়ে কাব্য পড়ে দেয় বা এই কবিতাটা বলে দিল। কিন্তু মোক্ষদার অশ্লীলতায় কান লাল হয়ে ওঠে উপেনের। বলে, “আমি লিকিনি। আমি কবিতা লিকতে পারি না।“ মোক্ষদা আবার বলতে চায়, “ওই হল।“ ততক্ষণে উপেন গটগট করে আসর ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে উঠে গেছে। ব্রজবাসিনীর উদ্দেশ্য পুরো সাধিত না হওয়ায় বেদম চটে মোক্ষদাকে গাল পাড়তে লাগলেন, “তুই থামবি হারামজাদী মাগী! ঘটে বুদ্ধি আচে এক আনাও? দত্ত বাড়ির ছেলে লিকবে এমন কোবতে! এর চে’ রাঁঢ় বাড়ি গে ঢলানিগিরি করা ভালো!” সুহাসিনীর ফাঁপর ফাঁপর লাগে। আসর ভেঙে যায়।
রাত্রে ব্রজবাসিনী ভাবতে থাকেন ব্রজেনকে কি বলবেন। এ অনাচারে ব্রজেন যেন কোনওভাবেই না জড়িয়ে পড়ে! রাত আরো ঘন হলে ভজার মার হাত থেকে তালপাতার পাখা খসে পড়ে যায়। তুলে নিয়ে আবার বাতাস করতে থাকে। গরমের কারণে ব্রজবাসিনী  গায়ের কাপড় আর রাখেন নি।পরনের কাপড়খানাও ঊরু পর্যন্ত তোলা। ঘরে পিদিম নেই। জানলার গরাদ এড়িয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। চাঁদের আলো ব্রজবাসিনীর শিথিল, পৃথুল স্তনভার, কুঞ্চিত ত্বকে কোনও কাব্যিক মায়া তৈরি করতে পারে না! সেদিকে তাকিয়েই বোধহয় ব্রজবাসিনীর মনে পড়তে থাকে বহু বহু বছর আগের চাঁদের মায়ার কথা! তখন কাকা, জ্যাঠারা পৃথগন্ন হয় নি। ব্রজবাসিনী সদ্য বিধবা হয়ে বাপেরবাড়ি ফিরে এসেছেন। কতই বা বয়স তখন? ষোল? চাঁদের মায়ায় মাথার ঠিক রাখতে পারে নি জেঠতুতো বড়দা! ব্রজবাসিনীই কি পেরেছিলেন? চরম উত্তেজনায়ও ছিটকে যেতে চেয়েছিলেন! পাপ! পাপ! পুরুষ মানুষ সাপটে ধরে রেখেছিল! ব্রজবাসিনীর মনে হয়, পুরুষ মানুষ যখন খায়, মাছের মাথার মত চিবিয়ে চুষে রস গিলে নেয়। ছিবড়ে পড়ে থাকে। দাদার কিন্তু বউ ছিল, বারমহলে বাঁধা মেয়েছেলে ছিল। ব্রজবাসিনীর কি ছিল? আদিগন্ত তৃষ্ণা? নইলে আঘাটার জল না বাদার জল খেয়াল থাকে না! মেয়েদের খেয়াল না রাখলে চলবে কেন! ব্রজবাসিনীর কলঙ্ক গিন্নীর কাছে জানাজানি হয়ে যেতেই দড়ি লাফানো চলল। তাতেও খালাস না হতে নাড়ি ছাড়ানোর জোলাপ। দুদিন অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন ব্রজবাসিনী। দাসীমহলে। বাড়িতে কানাঘুষো হয়েছিল ঠিকই, আবার চাপাও পড়ে গেছিল। কাঁচা বয়সের বিধবাদের একটু আধটু ওরকম হয়, সবাই জানে। ভাগ্য ভালো বাড়ির মধ্যেই! মেয়ে কূলে কলঙ্ক লেপে বেরিয়ে গেলে কি হত! আজ এত দিন পরে সেসব কথা মনে আসছে কেন ব্রজবাসিনীর! এখন কেই বা জানে সেসব দিনের কথা! এখন এবাড়িতে ব্রজবাসিনীর হুকুমেই চলে সব কিছু! কত প্রতাপ! এখন সেই সব দিনের কথা ভেবে দুর্বল হয়ে পড়লে চলে! দুর্বল হচ্ছেন না ব্রজবাসিনী।মনে হচ্ছে সেদিন বিদ্যেসাগর মশাই থাকলে কি ব্রজবাসিনীও আবার শাঁখা সিঁদূর পতিসুখ পেতেন? ভজার মার হাত থেকে পাখা পড়ে যেতেই হুঁশ ফিরে এল ব্রজবাসিনীর। না, নিজে যে সুখ পান নি আর কোন বিধবা পাক, সেটা মেনে নিতে পারবেন না ব্রজবাসিনী। সমস্ত কোমলতা মুছে গিয়ে কর্কশ হয়ে উঠলেন ব্রজবাসিনী। ভজার মাকে চিমটি কেটে বললেন, “গতরখাকী মাগী! সন্ধে হল কি ঢুলুনি! বলি দত্ত বাড়ি মাইনেটা কি মাগনা?” ভজার মা শশব্যাস্তে হাওয়া করতে থাকে।
  পরেরদিন দুপুরের খাবার সময় ব্রজবাসিনী কথাটা পাড়েন। বলেন, “বলি বাবা বজেন, উপিনের বে’টা এবার দিয়ে দিতে হয়! লায়েক হয়েছে ছেলে! চোদ্দয় পড়ল! আর ফেলে রাকা ঠিক না। তুমি মত করলে আমার গঙ্গাজলের মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ দেকতে পারি। পালটি ঘর, দেবে থোবে ভাল!” ব্রজেন বলল, “পিসীমা, তুমি আমার মনের কতাটাই যে বললে! আমিও ভাবচিলুম উপিনের বে’ দোব। পাত্রী একটা ঠিকও করেচি, তুমি যেন অমত কোর না।“ ব্রজবাসিনী বললেন, “তুমি ঠিক করেচ, তা আমার অমত করার কি আচে! তা পাত্রী কোতাকার?” ব্রজেন বলল, “কেষ্টনগরের মেয়ে। দশ চলচে একন। পাঁচে বে হয়েছেল পঞ্চাশ বচরের ঘাটের মড়ার সাতে। আটে বেদবা হয়ে বাড়ি ফিরে এসেচে। বিদ্যেসাগর মশাই দেকে এসেচেন। সুলক্ষণা মেয়ে, কোনও দোষ নেই।“ ব্রজবাসিনীর হাতের তালপাখা মাছের ঝোলের বাটিতে লেগে বাটি উল্টে ব্রজবাসিনীর থানখানা আঁশ ঝোলে মাখামাখি করে দিল। ব্রজবাসিনী চিল চিৎকার করে উঠলেন, “তুই এ বাড়িতে বেদবার বে দিয়ে আনবি! আমার মরা মুখ দেখবিরে পোড়ারমুখো!” মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে কপাল ঠুকতে লাগলেন। ব্রজেন দৃকপাত না করে উঠে চলে গেল।  একাসনে উপেনও বসেছিল খেতে। উপেন প্রথমে হতভম্ব হয়ে রইল। তারই হবে বেধবা মেয়ের সঙ্গে বে? কেমন ঘিনঘিনে লাগছে না! খাওয়া লন্ডভন্ড হয়ে গেছে দেখে এঁটো হাত ধুতে যেতে যেতে উপেনের ঘিনঘিনে ভাবটা চলে গেল। মনে হল, বেশ হবে কিন্তু! নিউজপেপারে নাম বেরোবে! কালেজে বেশ তালেবর হয়ে ওঠা যাবে। এ পর্যন্ত ভাবতে পেরেই উপেনের মাথা থেকে “ক্ষতাক্ষত কে আর বাছে!” লাইনটা বেমালুম গায়েব হয়ে গেল! উপেন বেশ ফুরুফুরে বোধ করতে লাগল।
ব্রজেন সেই যে খাওয়া ফেলে উঠে গেছে, তিনদিন হল আর খাওয়ানো যায় নি। ব্রজবাসিনীও শয্যা নিয়েছেন।বাড়ির লোকের হয়েছে জ্বালা! গন্ডায় গন্ডায় রাঁধা হচ্ছে, সাধা হচ্চে, খাওয়া হচ্চে না। শুকনো মুড়ি চিঁড়ে চিবিয়ে পিত্তটুকু রাখা আর কি! তিনদিনের মাথায় ব্রজবাসিনী আর থাকতে পারলেন না! শুয়ে শুয়েই হুকুম দিলেন ব্রজেনকে ডাকার জন্য। বললেন, “তাকে একবার বল, আমার সময় এসে গেচে। একবার চোকের দ্যাকা দেকে মরতে চাই।“ সন্ধের মুখে মুখে ব্রজেন এলো। বল, “বালাইষাট! তুমি মরবে কেন, মরুক তোমার শত্তুর! কিন্তু পিসী না খেয়ে  আমি বোদহয় আর বাঁচব না!” বন্ধুদের অনুগ্রহে প্রাপ্ত মটন চপ পেটের মধ্যে মৃদু প্রতিবাদ করে উঠল। ব্রজবাসিনী ব্যস্ত হয়ে বললেন, “অ্যাই কে আচিস? বজেনকে শরবত দে!” ব্রজেন পিসীমার পাশে বসে শরবত খেয়ে পিসিমার পায়ে হাত বোলাতে বলাতে বলল, “আমি কি তোমার কাচে কোনওদিনও কিচু চেয়েচি? আজ এটুকু দ্যাও! সিঙ্গীরা মাতার ওপর নেত্য করে বেড়াবে, তুমি কি দত্তদের এই অপমান্যি চাও?” ব্রজবাসিনী ভেবে রেখেছিলেন কি জ্বালাময়ী ভাষায় ব্রজেনকে নিজের মা, খুড়ি, জেঠিদের বে দিতে বলবেন। কিন্তু ইচ্ছে করল না। ব্রজবাসিনী পাশ ফিরে শুলেন। একথা ঠিক ব্রজেনের কোনও দোষ নেই, নেশাভাঙ নেই, মদ মেয়েমানুষের ফুর্তি নেই।  অথচ এগুলো থাকলেই বোধহয় দত্তবাড়িএর ছেলে হিসাবে চিনতে সুবিধা হত ব্রজসুন্দরীর। একটা কথা  চাইছে যখন মুখফুটে…
    উপেনের বিয়ে হয়ে গেল। কাগজে নামও বেরোল উপেনের। বিদ্যাসাগর মশাই বর কনেকে আশীর্বাদ করলেন। কনের বাড়ির তেমন সঙ্গতি নেই। দেওয়া থোওয়া তেমন করতে পারে নি। তবে বরযাত্রীদের সবার জন্য শান্তিপুর থেকে “বেঁচে থাকুক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে” পাড়ের ধুতি আনিয়ে দিয়েছেন। সেটি বড় পছন্দ হয়েছে উপেনের। কাগজে নাম বেরিয়েছে, তায় এই ধুতি পরে কালেজে গেলে বন্ধুদের চোখে মাতব্বর হয়ে উঠবে উপেন। বর কনে নিয়ে বারদালানে এসে দাঁড়ালে কেউ বেরোল না। দাসীমহলের পাঁচ এয়োস্ত্রী বরণ করে ঘরে ঢোকাল। সানাই নয়, উলু নয়… ব্যথাটা প্রাণে বাজলেও কালেজে খাতিরদারির পরিমাণ ভেবে উপেন ব্যাথাটাকে পাত্তা দিল না একদম। ব্রজেন মেয়েমহলের ব্যাপারে কোনোদিনই মাথা ঘামায় না। আজও ঘামাল না। বৈঠকখানা ঘরে ইয়ার দোস্তদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল। মোক্ষদা উঁকি মারতে এসেছিল, তাকে ডজন ডজন লুচি, ছোলার ডাল, আলু কুমড়োর ছক্কা, সন্দেশ আর রাবড়ির  ফরমাস হল। বন্ধুদের খ্যঁটনের দায়িত্ব মেয়েমহলের বিবেচনায় ফেলে রাখা  উচিত কাজ হবে না। বন্ধুরা হ্লাদিতচিত্তে লুচি মিষ্টির ভোজ সহকারে বিধবাবিবাহের বিরুদ্ধপক্ষীয়দের মুন্ডপাত করতে লাগল। একজন বলল, “পারলেন, রাজা রাধাকান্তদেব পারলেন? ছত্তিরিশ হাজার লোকের সই জোগাড় করে বড়লাটকে চিঠি দিলেন। কি? না বিধবা বিবাহ সমাজ মানবে না! হুঁ হুঁ এই আমরা সমাজের মুকের উপুর দে’ বেদবা বে দে’ নিয়ে এলাম!” নানারকম রঙ্গ তামাশায় বৈথকখানা যখন উচ্ছ্বসিত, তখন অন্দরমহলে অন্য রঙ্গ তামাশা চলছিল। উপেন বৌ নিয়ে ব্রজবাসিনীকে প্রণাম করতে যেতেই ব্রজবাসিনী বাধা দিলেন। বললেন, “থাক, হয়েছে। বেদবার মাতা ভত্তি সিঁদূর, আর তার পেন্নাম নেব আমি?” দশ বছরের বালিকা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সুহাসিনী এগিয়ে এসে বালিকার হাত ধরে বলে, “এসো বোন। ভাই ঠাকুরপো, তোমার ঘরে যাও। আজ কাল রাত্তির। বৌএর মুখ দ্যাখে না।“ বালিকাকে নিজের ঘরে এনে পালঙ্কে বসায় সুহাসিনী। চিবুকটা ধরে বলে, “ এ যে দেখি পদ্ম! তবে স্থলপদ্ম! কি নাম ভাই তোমার?” বালিকা বলে, “বিধুমুখী।“ সুহাসিনী বলে, “বিধু মানে চাঁদ। আমি জানি। আমার বর আমায় শিকিয়েছে। আমাকে একটু একটু পড়তে লিকতে শিকিয়েছে। তোমাকেও তোমার সোয়ামী শেকাবে, দেকো।“ বিধুমুখী আতঙ্কিত হয়ে বলে, “ না, না, আমি লেখাপড়া আর শিকব না। একটু একটু আমি লিকতে পড়তে শিকেচিলাম। তাইতো…” বলেই খেয়াল পড়ে সে আর বিধবা নয়। সদ্য বৈধব্য ঘোচানোর পর সেইকথা মুখে আনতে পারল না বিধুমুখী।
ব্রজবাসিনী বিধুমুখীর উপর এতটুকু সদয় হতে পারেন না। ওঁর নির্দেশে বউ উপেনের কাছেও শোবে না। নিজে পাশে নিয়ে শোন। সকাল না হতেই দাসি বাঁদীদের দিয়েও যে কাজ করানো হয় না, তা করার হুকুম দেন বিধুমুখীকে। উঠোন ঝাঁট দেওয়া, গোবর লেপা কোন বউকে করতে হয়! পুকুরঘাটে বাসনও মাজতে পাঠান। আর মোক্ষদা পায়ের উপর পা তুলে ফোড়ন কাটে। ভাতের পাতে মাপমত ভাত কে খায় দত্ত বাড়িতে? বিধুমুখীর পাতে দুমুঠোর বেশি ভাত নেই। মাছ জোটে না। বিধুমুখীর চন্দ্রবদন কালো হয়ে গেছে। সুহাসিনীর সহ্য হয় না। চুপি চুপি নিজের ভাগের চিঁড়ে মুড়ি বেশি করে নিয়ে নিজের ঘরে ডেকে খাইয়ে দেয় বিধুমুখীকে। বিধুমুখী বলে, “দিদি, মেয়েজেবনটাই যন্তন্নার। তুমি ছিলে বলে তাই তরে যাচ্ছি! দ্যাক, আমি বেদবা থেকে সদবা হলাম, সিঁতির সঁদূরটুকু বাদে আর কি বদল হল, বল?” সুহাসিনীর বুক ফেটে যায়! রাত্রে স্বামীর কাছে গল্প করে বিধুমুখীর কষ্টের কথা। ব্রজেন শোনে, হুঁ, হাঁ দেয়, কিন্তু আর কিছু বলে না। তার বিধবা বিবাহ দেওয়ার কথা ছিল, সে দিয়েছে। এবার সে বিধবা সধবা হয়ে মাছ পাচ্ছে কি না সে কি পুরুষ মানুষ দেখবে? সুহাসিনী তাও হাল ছাড়ে না! বলে, “বৌটা স্বামীসঙ্গ তো করুক! এ কেমন ধারা বিয়ের পর আলাদা আলাদা রাখা! বিয়ে তো ভগমানের ঘরে ঠিক করা থাকে। তা যকন হয়ে গেচে তকন দুটিকে এও কষ্ট দেওয়া কেন বাপু!” ব্রজেন হাই তুলে বলে, “দোষ নিও না, বৌমার রজদশশন হয়েচে কি? রজ দশশন না হলে সোয়ামীর ঘর করবে আবার কি?” এই যুক্তিটা সুহাসিনী ফেলতে পারে না।
রোজ সকালে পোষা পাখিকে ছোলা খাওয়ায় সুহাসিনী। দোতলার বারান্দায়। তখন একতলার চাতালে তুমুল ব্যস্ততা চলে। আঁশ হেঁশেলের সামনে মাছ কোটা চলে, একদিকে বড় শিলে মশলা পিষে কাঁসার বড় বগী থালায় ভাগা দিয়ে দিয়ে তুলে রাখে। উনুনের ধোঁয়ায় চারিদিক ঢেকে যায়। যারা মাচ্ছ কোটে, বা বাটনা করে তারা কেশে মরে যায়। এরই মাঝখান দিয়ে মেয়েরা পায়খানা যায়। খাটা পায়খানা, নোংরার হদ্দ। কাজ সেরে পুকুরে ডুব দিয়ে ভিজে কাপড়ে জলের ফোঁটা ফেলতে ফেলতে ফেরে। সেদিন বিধুমুখীও সেরকমই গেছিল। ফেরার পথে নাকি চান করে নি, কাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। সেই অপরাধে  ব্রজবাসিনী   চ্যালাকাঠ নিয়ে বিধুমুখীকে শিক্ষা দিতে লেগেছেন। বিধুমুখীর আর্তনাদ, “আমি নেয়ে এসেচি গো, আমায় আর মেরো না! ও পিসীমা আপনার পায়ে পড়ি…” সুহাসিনী সহ আরও দু চারজন মেয়ে দোতলার বারান্দায় স্থির হয়ে যায়। সুহাসিনী বলে, “বেচারার কপালটাই খারাপ। ও পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, খাটা পায়খানায় প্রথম দিন গিয়ে কি ঘেন্না! কি ঘেন্না! চারবার চ্যান করেছিল। সে না নেয়ে চলে আসবে!” জ্ঞাতি একজন বলে ওঠে, “পিসীমা ওকে দুচক্কে দেকতে পারে না!” গোলমাল শুনে উপেনও বেরিয়ে এসেছিল। নিচে চাতালে গোলমাল হয়ই। কিন্তু আর্তনাদ কেন? উপেনকে দেখে সুহাসিনী বলে, “তোমার বউএর ধোলাই হচ্চে! তুমি পুরুষমানুষ হয়ে বারেন্ডায় ডাঁইড়ে দেকচ ঠাকুরপো?” উপেন বড় দমে যায়। বউ কি জিনিস জানবার সুযোগ হল কই? বন্ধুরাও কত কি জিজ্ঞাসা করে, নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলে, উপেনকে চুপ করে থাকতে হয়। সেদিন তো উমাশঙ্কর বলেই বসল, “ও বৌএর কতা বলবে কি! ওর যা ঝোলায় আচে, তোদের আচে কি? ওর বৌ তো বেদবা!” অন্যরা হই হই করে উঠেছিল। “ছি। ছি! বৌ বেদবা আবার কি? বৌ তো উপেনের বিয়ে করা বৌ! কত বড় বুকের পাটা উপেনের, বেদবা বে’ করে দেকিয়েচে! উপেন, তুমি ভাই ঐ আহাম্মকটার কতায় কিচু মনে কোর না।“ উপেনের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে ওঠে। এখন যেমন বিধুমুখীর হেনস্থায় উপেনের মনে হচ্ছে ছুটে  গিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে বিধুমুখীকে। কিন্তু বাড়ির বড়দের মুখের উপর কিছু বলা বা করা এ বাড়ির শিক্ষা নয়।
   দিন বয়ে যায়। সকালগুলো ব্যস্ততায়, দুপুরগুলো পায়রার ডাকের মায়ায়, বিকেলগুলো ফেরিওলার ডাকে, সন্ধেগুলো চাতালের আসরে কেটে যেতে থাকে। উপেন কালেজ যায়, ব্রজেনের বৈঠকখানা ঘরে দেশোদ্ধার চলে। বিধুমুখী লাথি ঝ্যাঁটা খেতে খেতে মাথায় একটু বেড়ে উঠে বারোয় পড়ে। সুহাসিনীর বাপের বাড়ি থেকে তেল সন্দেশ দিয়ে তত্ত্ব আসে। বড় কাঁসার পরাত, তার উপর বড় কলসি ভরা সরষের তেল। বড় বড় কাঠের বারকোষে সন্দেশ। তেল সন্দেশের তত্ত্ব মানেই সুহাসিনী বাপের বাড়ী যাবে মা হতে। এমনই রীতি। কিন্তু ব্রজবাসিনী ছাড়েন না। মেয়ের বাড়ি বলল, অমনি হুট করে পাঠালে বরের বাড়ির মান ইজ্জত কিছু থাকে! ভারী পেট নিয়ে সুহাসিনী নড়াচড়া করতে পারে না।
কিছুদিন পরে সুহাসিনী বাপের বাড়ি চলে যেতে বিধুমুখীর অবস্থা আরো খারাপ হল। ব্রজবাসিনীর একটা সুপ্ত বাসনা ছিল। বেদবা বে’ দে এনেচ, বেশ! এরপর খাটিয়ে খাটিয়ে না খেতে দিয়ে এমন হাল করব যে বেটি আপনিই মরে যাবে! তখন ছেলের আবার বে’ দিলেই হল! ভেতরে ভেতরে সুহাসিনী বিধুমুখীকে খাবার দাবার দেয়, সে জানতে বাকি নেই ব্রজবাসিনীর। সেইজন্য সুহাসিনীকে দেখলেই ওঁর মনে পড়ে যেত ব্রজেনের আবার বিয়ে দেবার কথা! সতীনকাঁটা দিয়ে থোঁতা মুখ ভোঁতা করার হুমকি প্রায়ই দিয়ে থাকেন। সুহাসিনী এইখানে বড্ড দমে যেত! কে জানে! পুরুষ মানুষের মন! সত্যিই  যদি আবার একটা বে’ করে আনে? এত পুন্যিপুকুর করেছে ছোটবেলা থেকে সব কি বিফলে যাবে? ভিতরে ভিতরে চাপা উতকন্ঠা নিয়ে যাবার আগেরদিন রাত্রে ব্রজেনকে দিয়ে সতীন না আনার শপথ করিয়েছিল। তাও মনের মধ্যে খচখচানি ভয় নিয়ে পরের দিন বাপের বাড়ি গেছিল সুহাসিনী। যাবার আগে বিধুমুখীকে চুপি চুপি একটা চাবি  দিয়েছিল। ভাঁড়ারের। ফিসফিস করে বলেছিল, “পিস ঠাউরুণ আমি বিয়ে হয়ে আসার পরই এই ভাঁড়ারের চাবি আমার আঁচলে বেঁদে দে’ চিলেন। একন মনে নাই বোহহয়। রাত্রে খুব খিদে পেলে দুটো খাস, বোন…” দুজনে গলা জড়াজড়ি করে হাপুস নয়নে কেঁদেছিল। বিধুমুখী বলেছিল, “ তোমার সোনার কপাল দিদি। ভগমানের কাচে পাত্থনা করি অমন সোনারই থাক চেরকাল। সোনার চাঁদ ছেলে নিয়ে এস গো তুমি। শুভ কাজে যাচ্চ, একন চোকের জল ফেলে না!”
সুহাসিনী চলে যেতে বিধুমুখীর অবস্থা সত্যিই খারাপ হয়ে উঠল। খিদের জ্বালা আর সইতে পারে না… একরাত্রে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে চুপি চুপি সেই চাবি নিয়ে ভাঁড়ার খুলে সবে এক সানকি মুড়ি নিয়ে বসেছে, ব্রজবাসিনী ভয়ঙ্করী মূর্তিতে উদয় হলেন। ঘুমের চটকা ভাঙতেই পাশে নেই দেখেই সারাবাড়ি খুঁজে ভাঁড়ারে এসেছেন। বামাল সমেত চোর ধরা পড়লে তার কি অবস্থা হয়? চিৎকারে আকাশ ফাটিয়ে কিল, চড়, লাথি কষাতে লাগলেন ব্রজবাসিনী। বাড়ির মেয়েরা ঘুম ভেঙে উঠে এসে নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না! ব্রজবাসিনী একবার করে মারছেন আর একবার করে ব্যাখ্যানা দিচ্ছেন। “বেদবা মেয়েছেলে, রাঁঢ় হতে পারলি নে? ভদ্দর বাড়িতে বৌ হবার সাদ! কি নোলা ছিঃ! কেউ বলুক, ওকে আমি খাবার কিচু কম দিই! মাগী রাত্তিরবেলা ভাঁড়ার খুলে মুড়ি নে বসেচে! গু খেগোর বংশ! মরতে পারিস না হারামজাদী? আমার হাড়মাস জ্বালিয়ে খেলে!” মারের চোটে বিধুমুখী উঠোনে এলিয়ে পড়তেই উপেনের কি যেন হয়ে গেল! বাঘের মত ব্রজবাসিনীর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, “খবরদার! আমার বউকে মারবে না বলচি!” ব্রজবাসিনী গালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন, “কালে কালে কত দেকব! বলে, মারবে না! কি ডাইনি মেয়েছেলে! বরকে কেমন বশ করেচে দেকেচ! তাও তো পাশে শুতে দেই নি! তাতেই এই! বেদবার বে হলে সে বরকে এমন ভেড়া করেই রাকে!” সমবেত ভিড়ের সবার মুখের দিকে তাকিয়ে যখন ব্রজবাসিনীর মনে হল বশীকরণ তত্ত্ব কাজ করেছে, তখন খুব ঠান্ডা গলায় বলে উঠলেন, “তুই তোর বউকে নে যা না! কে বারণ করেচে? খাওয়া, পরা, তেল মালিশ কর, আমরা কি কিচু বলতে যাব? নিজের পয়সায় কর!” ব্রজেন এত হুলুস্থুলের মধ্যেও মেয়েমহলের ঝামেলায় ঢুকবে না বলে চুপ করে ছিল। এবার আর না বলে পারে না। বলে, “পিসীমা, দত্তদের বাপ ঠাকুর্দার জমানো পয়সায় তুমিও খাও, আমরাও খাই। তবে ও কি যুক্তিতে খাবে না বলতে পার? ওকে নিজের পয়সায় খেতে হবে? তাহলে এই বাড়ির প্রত্যেকেই পথ দেখুক। অনেক হয়েচে! বেদবা বে’ তে আপত্তি বলে বে’ হবার পর কি কান্ডটাই না করে চলেচ পিসীমা! যদি একবারও খপর পাই যে বৌমা না খেয়ে আচে, তবে… ” ব্রজবাসিনী চিৎকার দিলেন, “আমাকে তুই রাস্তা দেকাস, বজেন? ঐ একটা বেদবা মাগীর জন্য! ও হো হো ভগমান, আমারে তুলে নাও, তুলে নাও!”
ভগবান ব্রজবাসিনীকে তুললেন না। উপেন বিধুমুখীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে এলো। সেবা শুশ্রূষা কিছুই জানে না! সুহাসিনীর অভাব বোধ করতে লাগল উপেন। কিছু পরে উপেনের চোখ একটু লেগে এসেছিল।আওয়াজ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল। চুপিসারে গিরিজা এসেছে। চোখে মুখে জলের ছিটা দিতে জ্ঞান ফিরল কিন্তু ব্যথায় কোঁকাতে লাগল। কাটা জায়গা গুলোতে কাপড়ের পটি বেঁধে দিল গিরিজা। তারপর দেওরপোর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি বজেনের ঘরে যাও বরং। আমি ওর কাছে আছি। দুদিন গিরিজার অক্লান্ত সেবায় উঠে বসতে পারল বিধুমুখী। কিন্তু ততদিনে বিধুমুখী নারী হয়ে গেছে। সেও গিরিজাই ব্যবস্থা করেছে। তার রজস্বলা দশা শেষ হলে স্নান সারা হলে খাবার ঘরে ধরে ধরে নিয়ে গেল গিরিজা। কিছুতেই  যাবে না বিধুমুখী। ঝরঝর করে কাঁদে আর বলে, “জেঠি, আমার মরণই ভাল!” গিরিজা বলে, “তাহলে কবেই ত আমাকে যমের দোরে চলে যেতে হত! সোমসারে অমন হয়! কেউ রাগ করে, কেউ ভালোবাসে… এই ফাঁকে তোর বরটিকে পাওয়া হল তো?” বিধুমুখী লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয়! সবার মাঝ থেকে পাঁজা করে তুলে এনেছিলেন ভাবলেই বিধুমুখীর হৃৎপিন্ড যেন লাফ দিয়ে মুখের কাছে চলে আসে! এত ভাগ্য তার!
ভাগ্য সত্যিই প্রসন্ন হয়েছে বিধুমুখীর। ব্রজবাসিনী সংসারের সাতে পাঁচে বিশেষ থাকেন না। আলোশশীর পরিচালনায় সংসার চলছে। বিধুমুখী সংসারে শাশুড়িদের পায়ে পায়ে ঘোরে, খাটে। রাত্রে উপেন ঘরে এলে অজানা জগত মুক্ত হয়ে যায়। উপেন প্রথমদিন তাকে পড়াতে গেছিল। বলেছিল, “মেয়েরা মুখ্যু থাগলেই সোমসার এমন হবে। তুমি আমার কাচে পড়বে।“ তারপর অবাক হয়ে দেখেছিল বিধুমুখী সামান্য হলেও লিখতে পড়তে জানে। উপেন তাকে পড়ে শোনায় শকুন্তলা, তারপর ব্যাখ্যা করে। বিধুমুখী বলে, “ছেলেরা অমনই হয়। মেয়েদের ভালোবাসে, তারপর ভুলে যায়!” উপেন বলে, “আর মেয়েরা যেন কোন শাস্তি দিতে জানে না!” বিধুমুখী বলে, “জানেনাই তো!” উপেন বলে, “সীতা রামকে ত্যাগ দেয় নি?” বিধুমুখী বলে, “ছি ছি ও কি কতা! সীতা ত্যাগ দেবেন কেন! সীতা পাতাল প্রবেশ করেচিলেন।“ উপেন বলে, “সে ছেড়ে যাওয়া নয়? ত্যাগ দেওয়া নয়?” এমন গল্পে তাদের রাত কেটে যায়। সকালে নিদ্রিত স্বামীর তৃপ্ত মুখ দেখে দরজা খুলে বাইরে এসে ভাবে, কি আলো!
খবর আসে সুহাসিনীর ছেলে হয়েছে। বিধুমুখীও যেন কি একটা টের পাচ্ছে। গিরিজাকে বলে। ফিসফাস করে কথাটা ছড়িয়ে পড়ে অন্দর মহলে। ব্রজবসিনী আর সংসার উদাসীন থাকতে পারেন না!  বংশে বাতি দেবে সধবা হওয়া বিধবা! এটা কিছুতেই মানা যায় না। তাঁদের আমল হলে দড়ি লাফ দেওয়ানো যেত। কিন্তু সেদিন দত্তদের দুই ছেলের যে রূপ দেখেছেন, তাতে সে সম্ভবনা বিরল। তবে সম্ভবনা কি আর একটা। মোক্ষদা থাকতে উপায়ও বের হয়ে যায়। বেদেনীদের ডেরা কোথায় মোক্ষদার নখদর্পণে। চৈত্র শেষের আবহাওয়া। সন্ধের পর ঠান্ডা বাতাস দিলে যেন প্রাণটা জুড়ায়। এ সময় পোয়াতির গরম লাগে বেশি, জানেন ব্রজবাসিনী। আলোশশীকে একটু শরবত বানানোর কথা বলেন ব্রজবাসিনী। শরবত পারলে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতেন ব্রজবাসিনী, কিন্তু সেটা খারাপ দেখায়। শরবত বানানো হলে সব বৌ ঝিদের শরবত খাবার জন্য ডাক পাঠান। সন্ধের পর মহিলামহল আর বসে না সেই ঘটনার পর থেকে। উপেনকে আর কাব্য পড়ে দেবার কথা বলা যায় না! পরনিন্দা পরচর্চা তো ঘরে ঘরেই চলে, তাছাড়া কে কার দলে  হিসাব করে বলতে হয়! তাই সন্ধের আসর উঠে গেছে। আজ ব্রজবাসিনী আবার ডেকে পাঠাতে বৌ ঝি দের প্রাণে একটু বাতাস লাগল! সবাই জড়ো হল একে একে। বিধুমুখীও গেল। গিরিজা শিখিয়েছে, সংসারে মন্দ ভুলতে হয়। কাঁসার গেলাসে বেলের পানা বেড়ে বেড়ে দিচ্ছেন আলোশশী। মোক্ষদা এগিয়ে দিচ্ছে বৌ ঝিদের। বিধুমুখীকেও একগেলাস দিল মোক্ষদা।
উপেন ঘরেই ছিল। মেয়েদের জটলা দ্যাখে তার আবার ভয় হল। সে বিধুমুখীর নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগল! বৌ ঝিরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। “ঐ দ্যাক, তোর বর তোকে চোক্কে হারাচ্চে!” বিধুমুখী লজ্জা পেল। আবার চলেও এলো। নইলে মানুষটা অনর্থ করবে জানা আছে। ঘরে ঢুকতেই উপেন বলল, “কি খেজুড়ে হচ্চিল ওখেনে?” বিধুমুখী বলল, “শরবত খাবার নেমতন্ন।“ উপেন বলল, “বা, বা, বেশ! বেশ! দাও তবে খাই! বলে বিধুমুখীর হাত থেকে গেলাসখানা নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিল। কিছুক্ষণ পর থেকে উপেন ছটফট করতে লাগল, মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোতে লাগল! বিধুমুখী আর্তনাদ করে গিরিজাকে ডাকতে দৌড়ে গেল। ডাক্তার এল আরো একঘন্টা পরে। ব্রজেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এক্সপায়ার্ড!” কিন্তু এ তো স্বাভাবিক ব্যাপার নয়, তাই পুলিশে খবর দিতে হবে। ব্রজেন আমতা আমতা করতে লাগল, “পুলিশ… আমাদের বংশ…” ডাক্তার নির্বিকার হাঁটা লাগালেন। এবারে উঠোণে বসে বাড়ি মাথায় করলেন ব্রজবাসিনী। “তকনই জানতুম বেদবার বে’ দেলে আবারও বেদবা হয়! রাক্ষুসী মাগী! একটা খেয়ে শান্তি হয় নি, আমাদের বংশেরটাকে বিষ দিয়ে মারলে গো!” বিধুমুখী ঘটনার অভিঘাতে পাথর হয়ে গেছিল। কিন্তু এই অভিযোগ শোনার পর হাউ হাউ করে বলে উঠল,  “কি বলচেন, পিসীঠাকরুণ! আমি ওনাকে বিষ দিয়ে মেরিচি?” ব্রজবাসিনী দ্বিগুন চিৎকার করে উঠলেন। “হ্যাঁ, শরবতে বিষ দিয়ে মেরিচিস! শরবত তো সবাই খেল, কার কিচু হল না, আমাদের ছেলেটাই মরল? ঘরে শরবত কে নিয়ে গেচিল, তুই তো? যেতে বিষ মিশিয়েচিস শয়তানী! একন আবার ন্যাকা সাজা হচ্চে! বজেন, পুলিশে খপর দে! এই ডাইনি মাগিকে পুলিশে ধরিয়ে দে!”  বলে কেমন যেন টলতে টলতে ব্রজবাসিনী নিজের ঘরে এসে দোর এঁটে দিলেন।
সবাই যে যার মত বুঝে নিল। পুলিশ এসে দেখল সবার ঘরের দরজা বন্ধ। উপেনের ঘরের দরজা হাট করে খোলা। পুলিশ ঢুকে দেখল পালঙ্কে উপেনের মৃতদেহ, ঘরে কেউ নেই। “পালিয়েছে!” কেউ একজন বলল। পুলিশ ব্রজেনকে বলল আমরা সারাবাড়ি তল্লাশি চালাব। সারা বাড়িতে কোত্থাও পাওয়া গেল না সদ্য কিশোরী পোয়াতি বিধুমুখীকে। রাতের অন্ধকারে পুকুরঘাট, বাগান খোঁজা মুশকিল, তবু মশাল জ্বালিয়ে পুকুরঘাটে গেল কয়েকজন পুলিশ। পুকুরঘাটের পাশের আমগাছে পাওয়া গেল বিধুমুখীকে। ঝুলছে।
দিন পেরিয়ে আঁধার নামলেও উঠোনে মেলে রাখা উপেনের ধুতিটা কেউ তোলে নি। “বেঁচে থাকুক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে” পাড়ের সাদা ধুতিটা ঘন অন্ধকারের মধ্যে মনে হতে লাগল যেন দংষ্ট্রা বার করে ভেঙচি কাটছে!
শেয়ার করুন