হাসান মুস্তাফিজ-এর গল্প

হাসান মুস্তাফিজ

হাসান মুস্তাফিজ

৩০ সেপ্টেম্বর “SOS”

সো, বাংলাদেশের প্রথম আবিষ্কৃত, আলোচিত এবং জনপ্রিয় সাইকোর একমাত্র দুঃখ, সে আর মগাবাজারের “পুষ্প কর্নার” নামের দোকানে আর যেতে পারবে না। এইজন্যেই সে বিশ্বসাইকোদের কাতারে পড়বে। আবার নাও পড়তে পারে, তাকে নিয়ে যে কোনো ধর্ষণের রেকর্ড নাই। সব ঘেঁটে দেখা যায় তার সব মেয়ে বন্ধুও তাকে ঘিন্না করে। কোনো সোশ্যাল গ্যাদারিংয়ে সে ছিল না। এতে অবশ্য তার নিষ্পাপত্ব প্রকাশ পায় না, এতে প্রকাশ পায়, সে একজন কাপুরুষ।

সো, সে একজন সাইক (ওহ সরি,টাইপিং মিস্টেক)।  

আস্তে আস্তে প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হচ্ছে। কোনো নারী আর গৃহিণী থাকে না। সেক্ষেত্রে প্রতিটি বাংলাদেশি ফ্যামিলির স্বামীর মাথায় সেন্স এসেছে যে, বাথরুমেও এয়ার ফ্রেশনার লাগে। এগুলো অধিকাংশই মায়ানমারের পণ্য। কিন্তু তাই বলে টিভিতে টয়লেট ক্লিনার লিকুইডের অ্যাড কমেনি। আবার এসব ইনোভেটিভ চেঞ্জও আনেনি। পিছিয়ে আছে কিছুতে।

চ্যারিটির কাজ প্রশংসনীয়। প্রাণীর খাদ্য সরবরাহ বাড়ছে। আর প্রাণী বলতে কুকুরকুলের কথা আসছে। তাদের জন্য গরুর ভুনা দিয়ে খিচুড়ি রান্না হয়। সেগুলা অবশ্যই সুস্বাদু হবে কারণ খাওয়ার পরও কুকুরগুলো পলিথিন চাটতে থাকে। সেদিক দিয়ে বলা যায়, পরিবেশ রক্ষার কমনসেন্স এদের হয়নি। কোনো কুকুর অভুক্ত থাকতে পারবে না এদেশে। হয়ত এসব স্বেচ্ছাসেবকরাও বুঝে গেছে, মানুষের চেয়ে কুকুরের ক্ষুধার্তনাদ আরও বেশি।  

চাঁদমারিরা জানে, পুনরুজ্জীবন আসছে। 

মুখোশ বানানো লাগবে আবার, বুঝাতে হবে সবাই ভালো। সবাই স্মার্ট, আধুনিক, স্বাধীন এবং আরো কিছু….

এই দেশটায় ভালো বোটানিক্যাল গার্ডেন নেই। সরীসৃপদের ব্যাপারে কেউ জানে না।

কোনো বাংলাদেশি ফিল্ম ডাইরেক্টর এখনও ম্যানহোলের ভিতরের দৃশ্য কিংবা ম্যানহোলের তলে কীভাবে টিকটিকি বিচরণ করে সেসব তাদের সিনেমায় আনতে পারেনি।

কিন্তু “The Third Man” তাদের প্রিয় সিনেমা হয়ত, কারণ তারা ওরসন ওয়েলেসের নাম সেভাবে নেয় না।

(মনোলোভা) 

তিনি, সিরাজ সরকার, বেশিক্ষণ হয়নি অপেক্ষা করছেন যে। মেডিকেল সেন্টারটা দুই সপ্তাহের জন্য বুকিং করা হয়েছে। চেয়ারগুলো কাঠের, কোনো পেরেক নেই যেটা লুজ ফিটিং বা চাইলে খুলে হাতে লুকিয়ে রাখা যাবে। টেবিল ফ্যান আছে সাথে। সিরাজ সরকার এই প্রথম আফসোস করতে লাগলেন তার কেন কোনো ছেলেমানুষী বদভ্যাস নেই। সময় কাটতে চায় না।

ছেলেটার ফটোগ্রাফ দেখেছেন দুই বছর আগে। তখন তার বয়স ২১ বছর ছিল। ছেলের গড়ন দেখে বুঝা যায়, সে ওজন কমানোর চেষ্টা করছিল। তাই থুতনিটা বেমানান লাগছিল ফটোগ্রাফে। কিন্তু ঘাড় বা গলা স্লিম লেগেছে আর কোমর একটু ঝুলে থাকবেই, স্বাভাবিক।

বাংলাদেশে তাকে নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে। এটা আসলে এই দেশটির ভাগ্য। অবশেষে তারা এমন কাউকে পেলো, মানে সে কিন্তু ভিলেন, সামাজিক ভিজিল্যান্ট কারোর মতে। এইবার বাংলাদেশ বলতে পারবে যে তাদের দেশ থেকেও সিরিয়াস একটা সাইকো এসেছে। গডফাদার বা মবগোষ্ঠী আফ্রিকাতেও থাকে। পূর্ব-পশ্চিম জনপদ “The Godfather” মুভি দেখে ফেলেছে। যেইসব বাংলাদেশী মানুষ আসলেই একটু রাজনীতি বুঝতে চায় যেখানে কন্সপিরেসি থিওরি আর মতবাদের পার্থক্য আছে, যারা কথায় কথায় বলে না “ইসরায়েল ধ্বংস হয়ে যাবে ” কিংবা ফিলিস্তিনের গণহত্যার যথার্থভাবে শিশুহত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে এবং যারা Al Capone কে চিনে, তারা এই ছেলেকে পাত্তা দিবে না,

ওর নাম হাসিন মাহবুব, সে আসছে জানা গেল।

ক্যামেরাম্যান বলল — আমরা লাইভে যাচ্ছি দশ সেকেন্ডের মধ্যে

সিরাজ সরকার কিছু বলার আগেই হাসিন বলে উঠলো — দাঁড়ান, আমার কথা আছে।

সে ঝুঁকতে পারলো না, শিকল দিয়ে চেয়ারের সাথে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে।

মাহবুব বলল — মনোলোভাতে কী বলবেন আমাকে নিয়ে?

সিরাজ সরকার মাথা নাড়লেন। কোনো মনোলোভা তিনি ভেবে আসেননি।

মাহবুব হেসে বলল — আমি বর্তমানে একজন জনপ্রিয় সাইকো, আপনার উচিত আমার ইন্টারভিউ সেভাবে নেওয়া। চাইলেই আপনি অন্যান্য সিরিয়াল কিলার বা সাইকোদের ইন্টারভিউ দেখে নিতে পারতেন…

ক্যামেরাম্যান বলতে লাগল — ৩,২,১…

মাহবুব জানতো না যে সিরাজ সরকার একজন ব্যর্থ এবং পাবলিসিস্ট কবি।

সিরাজ সরকার বলতে লাগলেন — এদেশের পবিত্রতার একমাত্র সাক্ষী আমাদের ঋতু। এইবারের বসন্ত অন্যান্য সব বসন্তের মতোই সুরভিত, আনন্দিত এবং পূর্বনির্দেশক স্পন্দিত…

এভাবে সিরাজ সরকার বলে যেতে লাগলেন। ক্যামেরাম্যান ওদিকে ইশারা করছেন থামতে। ২৫ মিনিটের মধ্যে পাঁচমিনিটই এসব বলতে থাকলে বিশাল ট্রল শুরু হয়ে যাবে। সিরাজ সরকার মোটে ৫ লাইনে মাহবুবের পরিচয় দিয়ে দিলেন। “চলুন দর্শক… ” বলে তিনি মাহবুবের দিকে ঘুরতেই লক্ষ্য করলেন মাহবুবের মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছে। সে কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা না করেই বলল — কয়টা কবিতার বই ছেপেছিলেন?

গার্ডরা হেসে উঠলো। সিরাজ সরকার ফ্লোরে তাকিয়ে বললেন — তিনটা।

মাহবুব বলতে লাগল — আমার ইন্টারভিউ অনেকেই নিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি শর্ত দিয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে কেউ যদি জার্নালিজমে পুলিৎজার জিততে পারে, তাহলে একমাত্র তাকেই ইন্টারভিউ দিব।

কিন্তু বুঝতেই পারছেন, আমার দাবির পরিসীমা কতদূর।

তবে আপনাকে ভালো লেগেছে আমার।

সিরাজ সরকার সুযোগটা নিলেন। কড়া গলায় বললেন — তুমি আমাকে পছন্দ করলেও বুঝোই তো, অন্য সবার মতো আমি তোমাকে ঘিন্না করি।

মাহবুব কিছুক্ষণ থেমে বলল — আপনি এই ধরনের কথার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন, না?

হ্যাঁ, আমাকে আপনি ঘিন্না করতে পারেন। তবে এই কথাটা ভুল, সবাই আমাকে ঘিন্না করে না। আমি অলরেডি এই দেশের একজন কাল্ট আইকন। এখন আমি যদি সেই পর্যায়ের ওমন আসামি হতাম, তাহলে হয়ত তাদের মতো এই ট্যাগটা বাতিল করে দিতাম, কিন্তু আমি তা না। আমি সেল্ফ ডিফেন্স করতে যেয়ে খুনী হয়ে গিয়েছি।

সিরাজ সরকার এবার ক্ষেপে গেলেন এবং কথা বলার সময়ে তার মুখ থেকে থুতু পর্যন্ত বেরিয়ে গেল। সেই অবস্থাতেই শোনা গেল ক্যামেরাম্যান বলছে — এই ফারুক, ওকে একটা টিস্যু দিয়ে আয় না, কী বিচ্ছিরি লাগছে… ( ধরে নেওয়া যেতে পারে, এটা একটা মিমস)

— সেল্ফ ডিফেন্স মানে? তুমি হাসান মুস্তাফিজকে খুন করেছো। এটা সেল্ফ ডিফেন্স? কীভাবে সেল্ফ ডিফেন্স? ঘাড়ে একদম জায়গা বরাবর কলম দিয়ে এমন স্ট্যাব করেছো যে সে হসপিটালে নেওয়ার আগেই মারা গেছেন। কী ভাবো নিজেকে?

মাহবুব কোন ফাঁক দিয়ে গার্ডের কাছে সিগারেট চেয়েছে সিরাজ সরকার সেটাও খেয়াল করেননি।

— ভাই, শোনেন তো।

সিরাজ সরকার বুঝলেন ওনার এই প্রকাশভঙ্গি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়নি। এরমধ্যেই বিরতিতে চলে গেছে। কেরইআরের জন্য এটা বিরাট একটা স্ক্যান্ডাল হয়ে গেল।

মোবারক রিপন বলতে লাগল — ভাই, আপনাকে এসব কথা কে বলতে বলেছে? ২ সপ্তাহ সময় হাতে, আপনাকে কেউ এ ধরনের প্রশ্ন করতে বলা হয়নি।

সিরাজ সরকার ওয়াসার নোংরা পানির মতো বললেন — হাসান মুস্তাফিজ বাংলাদেশের প্রথম কবি যে টি.এস.এলিয়ট প্রাইজ জিতেছিল।

— তো কী হয়েছে? সামনে আরও পাবে। এইসব পুরষ্কার বাংলাদেশের কারোরই যায় আসে না। যেসব প্রশ্নের জন্য ভালো ভিউয়ারস পাওয়া যাবে সেইসব প্রশ্ন করেন।

— ৩,২,১…

” একটা প্রশ্ন করি?” মাহবুব বলল।

সিরাজ সরকার তাকালেন।

— মায়ানমার থেকে আর হাতি বাংলাদেশে এসেছে?

— জানা নেই।

মাহবুব অপটিমিস্টিকভাবে বলতে লাগল — অন্য দেশের প্রাণীও বুঝে এই দেশের মানুষ অতিথি ভালোবাসে। প্রাণীরা বুঝে অন্য দেশে যা আছে, এই দেশে এসে তার কিছুই পাবে না। তাও আসে। রামপালে ওমন একটা দূর্ঘটনা হল, কিন্তু খেয়াল করেন, ভারত থেকে বাঘ আসা থামেনি। ওদের গলায় আবার ট্র‍্যাকিং কলার পরিয়ে রাখা হয়েছে। কীসব গবেষণা যে তারা করে।

সিরাজ সরকার এবারও প্রশ্ন করতে পারলেন না কারণ মাহবুব বলতে লাগল — মায়ানমারের সাথে যুদ্ধ হলে খারাপ হয় না।

সিরাজ সরকার মোবারকের দিকে তাকালেন। সে ইশারা দিচ্ছে চালিয়ে যান।

সিরাজ সরকার সিম্বলটা ধরতে পারলেন না। বোরিং প্রশ্ন করে ফেললেন — তোমার বাবা, মা কেমন ছিলেন?

মাহবুব এইবার পা নামিয়ে বসলো। — খুব ভালো মানুষ ছিলেন তারা, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বাবা মা। কোনো অভাবে রাখেননি আমাকে। লোয়ার মিডলক্লাস হয়েও এত শান্তিতে ছিলাম আমরা। বিশেষ করে ২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত। তিনবেলার খাবার, সপ্তাহে তিনবার মুরগি সব ছিল। আমি আবার প্রাণের চকলেট ব্রেড ভালোবাসতাম। বাবা আনতেন মনে করে। বাবা আমার ওজন কমানোর জন্য একটা ইলিপটিকাল মেশিনও কিনে এনেছিলেন।

সিরাজ সরকার বললেন — বুঝতে পারছি।

এইবার মাহবুব সরাসরি তাকিয়ে বলল — আমার বাবা-মা তাদের চাকরির ক্যারিয়ারে জীবনেও একটা টাকা ঘুষ খাননি। ট্যুর করে আমার বাবা তার পুরা শরীর ধ্বংস করে ফেলেছেন। কাজে মনের মধ্যে আমার বাবা-মাকে নিয়ে যা ভাববেন, তা যেন নিষ্পাপ থাকে,

সন্তানের পাপের জন্য দায়ী বাপ-মা নয় কখনো।

সিরাজ সরকার সাথে সাথে বললেন — আর তোমার বোনেরা?

মাহবুবও সময় নিল না — তারা আমার দেখা দুনিয়ার সবচেয়ে স্বার্থপর মানুষ।

সিরাজ সরকার খাতায় এই লেখাটা আন্ডারলাইন করলেন। একটা কোটেশন পাওয়া গেল অবশেষে।

— এই প্রশ্ন কেন করলেন আমাকে?

সিরাজ সরকার হেসে ফেলে বললেন — সেটা জানার দরকার আছে তোমার? আর নিজের ফ্যামিলি নিয়ে কেন এত দুশ্চিন্তা তোমার? যেভাবে ডুবিয়ে দেওয়া দরকার, সেটা তো তুমিই ভালোমতো করে ফেলেছো। তোমার বোনদের বিয়ে ভেঙে গেছে, পুলিশি মনিটারিংয়ে তাদের জীবন পার হচ্ছে। তোমার ভক্তকুলই তো তোমার বাসায় যেয়ে ঢিল, পাটকেল ছুঁড়ে আসে।

গার্ড তার হাত ঠোঁটের উপর চেপে বুঝাতে লাগল এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করতে।

কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে,

হাসিন মাহবুব বলতে লাগল — এই হচ্ছে আপনাদের উদ্দেশ্য। আপনাদের লাইফ গোলই হল কীভাবে জনপ্রিয় হওয়া যায় সেটা। আপনার কোনো মেধাই নেই যেটার দ্বারা আপনি আমাকে পার্সোনাল এটাক না করে পুরা ব্যাপারটা এককেন্দ্রিক করে আমাকে অন্যদের সামনে তুলে ধরবেন। আপনারা কী মনে করেন, সচেতনার জন্য আপনারা এই ইন্টারভিউ নিচ্ছেন? আমি বুঝি না কিছু? এই ইন্টারভিউ আপনারা ছাপাবেন বিনোদন পাতায়। একটা সস্তা নায়িকার পাশে এটা ছাপিয়ে দিবেন। আর সেই ধরনের পশু হয়ে আপনি মনে করেন আপনার অধিকার আছে আমাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার?

কী ভাবেন নিজেকে? কেন সবাই আমাকে এমন ভাবে? কেউ কি চায় না আমাকে বুঝতে? আমি কি চাইসিলাম নিজেকে গোপন রাখতে?…

মাহবুব বেশি দুলছিল। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখায় দে চেয়ারসহ ফ্লোরে পড়ে গেল। গার্ডরা এই সুযোগ ছাড়লো না। কাঠের ব্যাটন দিয়ে পেটানো শুরু করে দিল।

সিরাজ সরকার দাঁড়িয়ে বললেন — শালার মাথায় মারেন।

মোবারক খুব খুশি হল

পরেরদিন মাহবুবের মাথা বেল করে দেওয়া হল। ছয়টা সেলাই লেগেছে।

★★★

ঢাকার মোটামুটি সব কাক ভিজে যাচ্ছে। কোনো রান্নাঘরের জানালার কার্নিশে তারা আশ্রয় পাচ্ছে না।

খিঁচুড়ি আর গরু ভুনা হচ্ছে।

এক টুকরা গরুর মাংস জীবনের একটা অংশের সমান।

হাসিন মাহবুব অন্যদিনের চেয়ে আজ একটু নিস্তেজ। বেল মাথা চকচক করছে। পোশাক আর নেই, তাই একটা পাঞ্জাবি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। এই পাঞ্জাবিটা একজন কুমির ব্যবসায়ীর ছিল।

সিরাজ সরকার বললেন — কেমন আছো?

মাহবুব উত্তর দিল না।

সিরাজ সরকার কনফেশন টাইপ কথাবার্তার তাড়নায় বললেন — তোমাকে কাল যেভাবে এটাক করেছি, সেটা উচিত হয়নি।

মাহবুব বলল — আচ্ছা।

সিরাজ সরকার ভেবে দেখলেন ওর সাথে এখনও বাংলাদেশের বর্তমান কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়নি। সেসব আলোচনা করাই যায়। পরে ভেবে নেওয়া যাবে সেগুলো প্রচার করা হবে কিনা।

জিজ্ঞাসা করলেন — প্রাক্তন আর বর্তমান মেয়রের দুই বছরের রেষারেষি এখনও থামেনি।

মাহবুব তাকিয়ে বলল — কারণ মেয়র আনিসুল হক আর নেই। আপনার মনেহয় এখন কোনো বিভাগের মেয়র ওত সাহস নিয়ে বলতে পারবেন ” দুই-চারটা লোক বাইরে দাঁড়িয়ে হইচই করলো, আমরা ঘরের ভিতরে ঢুকে গেলাম। হবে না এটা” কিংবা ” একসাথে আসেন। একসাথে দাঁড়াই”। অন্য অংশের মেয়র সেইদিক দিয়ে একটু কালচার। একটা মন্দিরের পূজোতে উনি খুব সুন্দর ঢোল বাজিয়েছিলেন। সেই ভিডিওটা আমার এখনও দেখতে ইচ্ছা করে।

সিরাজ সরকার পিছনে তাকালেন। মোবারক ইশারা দিচ্ছে চালিয়ে যান।

সিরাজ সরকার বললেন — তুমি এসব মনে রেখেছো?

— কাকে?

— মেয়র আনিসুল হককে?

মাহবুব একটু কাতরে উঠলো।

কিন্তু থামলো না। বলল — উনি মারা যাবার পর ওনার কাফনের পাশে যেসব পলিটিশিয়ানরা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের চেহারা আপনি দেখেছিলেন? সবার চেহারায় মৃত্যুভয়ের চেয়ে জেলাসি বেশি ছিল। তাছাড়া এখনও লোকে কোটেশন দিয়ে বলে ” এমন মেয়র আর আসবে না”। এটা সোজা ব্যাপার না।

ওনার “বাংলায় ৩৫ উত্তর করে ৩৪ পাওয়া” গল্পটা সব টিনেজার এখন জানে।

তবে ঘটেছে উল্টা, কেউ এখন বাংলা পড়ে না।

সিরাজ সরকার পারলেন না। ক্যামেরার পিছনের সবাই হেসে উঠলো। এমনকি গার্ডরাও।

মাহবুব মাঝ দিয়ে পানি চাইলো।

সিরাজ সরকার সিগারেট অফার করতে যেয়ে থেমে গেলেন। নিজেও আর ধরালেন না।

সিরাজ সরকার পারমিশন চাইলেন — তোমার নিজের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারি?

— জি, করেন।

সিরাজ সরকার কী প্রশ্ন করবেন বুঝতে পারলেন না। কী বিষয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করবেন। মোবারকের দিকে তাকালেন। সেও বুঝতে পারছেন না। উনি শ্বাস নিতে যাওয়ার সময়ে দেখলেন গার্ড বাঁকা করে বুঝাচ্ছে।

সিরাজ সরকার না ভেবে বলে ফেললেন — মেয়েদের সাথে তোমার ভাব ছিল না কেন?

মাহবুবকে দেখে মনে হল সে একটু রিলাক্সড হচ্ছে। সে হেসে বলল — হয়েছে কিছু, পরে হয়নি। তারা কবিতা আর ভালোবাসে না।

— তাই?

— হ্যাঁ।

সিরাজ সরকার বললেন — তুমি সবসময় মেয়েদের ব্যাপারে অনেককিছু বলতে তোমার বন্ধুদের কাছে। সেসব কেন বলতে?

মাহবুব একবার তাকালো। ক্যামেরাটা এবার ফোকাস করা হল। মাহবুবের চোখ একটু ঘোলা দেখাচ্ছে।

— কী বলব আপনাকে এই বিষয়ে?

সিরাজ সরকার বললেন — যা তোমার মন চায়।

মাহবুব একটু নিস্তার পেয়ে বলল — আমি নিজে জনপ্রিয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়া ছেলে। কাজে আমি যে জনপ্রিয় ধারায় মেয়েদের মুগ্ধ করতে যাইনি, তা না। আমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু পরে দেখলাম, অন্য সবার হচ্ছে, খালি আমার হচ্ছে না। আমি অন্য সবার কথায় নিজের চশমার ফ্রেম কতবার পাল্টিয়েছি হিসাব নেই। মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলে সব বিষয় তাদের কেন্দ্র করে তুলতে হয়, সেটাও আমি করেছি। আবার প্যান্ট একটু নিচে পরা, আর শার্ট ছোট গায়ে দেওয়া, যাতে নিচু হলে দামি আন্ডারওয়্যার দেখা যায় সেটাও করেছি।  কিন্তু পরে দেখি, তাও হয়নি। মাঝ দিয়ে আমি কিছু ভালো সক্রেটিয়ান গল্প পেয়েছি।

সিরাজ সরকার বললেন — তোমার কী মনেহয় কেন এমন হল না?

এবার মাহবুব হা হা করে হেসে উঠলো।

— জানেন, এই দেশে কোনো বাচ্চার উপর মুরব্বির প্রভাব কখনো ছিল না।

ছোট থাকতে যখন কারোর বাসায় গিয়েছি, “রাগ কমানোর দোয়া” “বাথরুমে যাওয়ার দোয়া” “ঘুমানোর দোয়া” “বারবার বলুন বিসমিল্লাহ ” এসব পোস্টার দেখেছি।

আমার সাথের এক ছেলে, মতিঝিল কলোনিতে আমরা একসাথে বড় হয়েছি, সেই ছেলে একবার একজন ভদ্রলোক, কমদামের সস্তা প্যাকেটজাত আচার খেয়েছিলেন হয়ত, তিনি লাল থুতু ফেলেছিলেন রাস্তায়।

ছেলেটা সমস্ত ঘিন্না নিয়ে বলেছিল — ছিঃ,হারাম কাজ করে আসছে।

সেই ছেলে যদিও এখন সিগারেট খায় না, সিগারেট তো মেথররাও খায়।

সে খায় এখন দামি দামি ব্র‍্যান্ডের এলকোহল। বাড়ির ছাদ থেকে নামার সময়ে সে ল্যাংচায় পড়ে যাচ্ছিল, এসব হচ্ছে তাদের লোমহর্ষক গল্প।

তাদের লাইফ বলে বোরিং নয়, তাদের এত ফ্রেন্ড। যখন যেখানে ইচ্ছা তারা যেয়ে ফূর্তি করে আসতে পারে। তাদের রাজকন্যার অভাব নেই।

অবশ্য তাদেরকে নিজস্ব রাজকন্যাদের সাথে দেখতে ভালোই লাগত।

সিরাজ সরকার শকড এবং থমকে সিগারেট ধরিয়ে ফেলেন।

— তারপর বলো।

— কাজে আমি দাবি করতে পারি না আমি সবসময় ভালো ছিলাম। আমি এখনো লোভী। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে আমি নিজের সব ডিসায়ার এখন সাপ্রেসড করতে পারি।

সিরাজ সরকার বললেন — এ ধরনের আচরণের জন্য কারা দায়ী তোমার মতে? ফ্যামিলি?

মাহবুব বলল — দেখেন, ফ্যামিলিতে একটা বাচ্চা সবসময় ঝগড়া বা ফাটাফাটি দেখবে। স্বামী বউকে পিটাচ্ছে তাও দেখবে।

কিন্তু দেখেন, আমি যখন জন্মেছি তখন কিছু পরিবর্তন এসেছে। নারীদের সম্মানের ব্যাপারটা বউ পেটানো স্বামীও এখন অকপটে স্বীকার করে। সে বাধ্য। কোনো নারী এখন গৃহিণী হতে চায় না । যে করেই হোক সে উপার্জন করতে চায়। স্বামী জানে, ট্র‍্যাডিশন অনুযায়ী মার খাওয়া বউ মাস শেষে তার বেতনের টাকা তার হাতে তুলে দিবে। টাকার মূল্য অনেক।

আমি এরজন্য প্রধানত দায়ী করি জনপ্রিয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে। যেমন…

পানি এসে গেল। পাঁচ মিনিট ব্রেক।

মাহবুব বলল — কী নিয়ে কথা হচ্ছিল?

সিরাজ সরকার পিছনে, সামনে তাকালেন। সবাই ভুলে গেছে।

মাহবুব বলতে লাগল — রাত হলে কলোনিতে সব নাইটগার্ড হুইসেল দিতে থাকত।

বেতন নিতে আসার সময়ে কার্ডে লেখা — ওত নং সেক্টর কমান্ডার।

আহারে, সেই যোদ্ধা তারা। ওদিকে তাদের লাঠি কিনে দেওয়ার টাকাই কেউ দিত না।

গার্ড ছাড়া সবাই হেসে উঠলো।

সিরাজ সরকার দ্রুত বলে উঠলেন — ওহ হ্যাঁ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বলছিলে…

মাহবুব বলল — আমি হাসান মুস্তাফিজ সাহেবকে কীভাবে খুন করেছি সেটা তো জানতে চাইলেন না।

সিরাজ সরকার ভেবে বললেন — রিমান্ডে তো বলেছো অনেককিছু।

মাহবুব মাথা নামিয়ে বলল — আসলে জানেন, হ্যাঁ আমার উদ্দেশ্য ছিল খুন করার। কিন্তু ওনাকে দেখে আমি সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলি। কিন্তু অন্য সবার মতো অটোগ্রাফ নিতে যাই। কিন্তু ওনার বউটাকে দেখে আমি বলে ফেলি — প্রথম ঘরের সন্তানের জন্য তো কিছু রেখে গেলেন না আপনি, সব আপনার আপনার পরের ঘরের সৎ মেয়ে আর ছেলের জন্য রেখে গেলেন। আপনি নিজে ভালোবাসা আর সাম্য নিয়ে কথা বলেন ভিতরে এসব করছেন। আপনার নিজেকে ভণ্ড মনে হয় না?

আমি বুঝিনি উনি এত ক্ষেপে যাবেন। একটা ঘুষি বসিয়ে দিলেন আমাকে। আরও তো মেরেছেন। আমি খেয়াল করিনি যে আমাকে কলম যে ফেরত দিয়েছেন, ক্যাপ লাগাননি।

আমি “Casino” সিনেমাটায় দেখেছিলাম কীভাবে কলম দিয়ে মানুষ মারে। কিন্তু সেদিন বাস্তবে প্রথম দেখলাম। আমি নিজেই তো ঘটালাম। এমন জায়গায় মেরেছি যে উনি গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করতে লাগলেন — আমি মারা যাচ্ছি।

ওনার মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিলো।

কিন্তু কেউ একটা অ্যাম্বুলেন্স কল করেনি। ওনার বউ চিৎকার করছিলেন।

এখন দেখেন শেষমেশ দায়ী আমি। দুনিয়ায় কোনো পাবলিক প্লেসে খুনের সময়ে দেখেছেন যে এত মার্ডার রিলেটেড ভিডিও ক্লিপ মিডিয়ায় আছে? কত এঙ্গেল থেকে। জন লেননকে খুন করার এত বছর চলে গেল। সেটারও তো এত নেই।

সিরাজ সরকার বললেন — তুমি স্বীকার করছো তাহলে যে তুমি খুন করেছো?

হাসিন মাহবুব চুপ হয়ে গেলেন।

— আপনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে জানতে চাচ্ছিলেন।

— হু, বলো।

মাহবুব হেলান দিতে পারলো না। সেই অংশটাও সে ভায়োলেন্স কাজে ইউজ করতে পারে।

— যখন টিনেজাররা একাডেমিক প্লেসে যায় সেটা ঐ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তাকে মানবিক করা।

এইযে, মতিঝিল, ময়মনসিংহ, শ্রীমঙ্গলের যে নামকরা উচ্চ-মাধ্যমিক কলেজ, একমাত্র কলেজ যেটা এখনও দেশে ভর্তি এক্সাম নেয়, তারা জরিপ করে দেখেছে, কত ছেলে তারা এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রডিউস করেছে যারা রেপিস্ট, ওয়াইফ-বিটার, দুর্নীতিবাজ আর খুনী?

সিরাজ সরকার বললেন — তুমিও তো সেখানকার।

— হ্যাঁ, আমিও তো ঐ গ্রুপে পড়ি।

আপনি নিজে ভেবে দেখেন, গত ৮ বছরে এই প্রতিষ্ঠান থেকে যত ছেলে বের হয়েছে সেখানে কত খুনী ছিল।

ভেবে দেখেন, ক্যাম্পাসে থাকাকালে তারা একটা ছাত্রকে হোস্টেলে পিটিয়ে মেরে ফেলল। এখন ক্যাম্পাসে মারামারি করে ছাত্র আহত হবেই। রোনাল্ড রিগ্যান যখন ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়র ছিলেন তখনও এমন হয়েছিল।

ওনার রেসপন্স উক্তিটা আপনার জানা আছে?

সিরাজ সরকার আফসোস করে বললেন — না।

— আমার কিন্তু ওনাকে ভালো লাগে। আমারও মনে নেই।

যাই হোক, তো সেটাই আরকি। আচ্ছা, খুনের ব্যাপার তো গেল। এখন আসেন অন্য বিষয়ে।

আগে যখন মফস্বল বা গ্রাম থেকে ছেলেরা সেই কলেজে পড়তে আসতো, তাদের একটা লক্ষ্য ছিল। তাদের লক্ষ্য থাকত তারা কীভাবে একজন প্রধান সারির ইনটেলেকচুয়াল হবে। কিন্তু এখন এসে তারা যত ধরনের সস্তা সব ক্লাবে বা সংঘে ঢুকে। এবং তারা মডার্ন হ্যারাসমেন্ট এত সুন্দর করে এডপ্ট করে রে ভাই।

কত মেয়ের পবিত্র ভার্জিনিটি তারা নষ্ট করেছে। এরা জানোয়ার। এদের বাপ মরলে আমার কষ্ট লাগে না। আমার ক্লাসমেটদের কথাই ভাবেন। আমরা দুই বছর আর ডিপ্রেশনের প্রথম ছয়মাস ওদের সাথে অনেক ভাব ছিল। পরের দুই মাসে আমি যখন ওদের নিজ দিক থেকে জবাবদিহি করার সবধরনের ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি, আমি তখন সবার অপ্রিয় হয়ে যাই। এসব শুয়োরদের মধ্যে একটা কনসেপ্ট হচ্ছে, প্রাইভেট ভার্সিটিতে খালি সেক্স হয়। বুঝতে পারছেন এরা কত নির্লজ্জ? তারা ঐ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, মা নিয়ে তারা অনেক কিছু শুনেছে সেখান থেকে।

তারা এসব নিয়ে ফান করে।

এখন একটা মেয়ের জেলডা বড়, জিনেরভা ছোট এটা নিয়ে ফান করা হয়ত যায়। শারীরিক ডিফোর্মেটি অনেক ক্ষেত্রে ফান করার মতোই। কিন্তু যখন আপনি সেক্সুয়ালিটি আর নিজেকে বিক্রি দেওয়াকে তাচ্ছিল্য করছেন, বুঝতে হবে সে দোযখের পাঙ্ক।

এরকম এক ছেলের জন্যেই অরোরা বুঝতে পারেনি আমি ওকে কত ভালোবাসতাম।

সিরাজ সরকার এড়াতে পারলেন না। “অরোরাকে”।

মাহবুব মুচকি হেসে উঠলো। বলল — শুনবেন নাকি?

— বলো।

প্রশান্তি নিয়ে মাহবুব বলতে লাগল — একটা মিসম্যানেজমেন্টের মধ্যে দিয়ে ওর সাথে আমার পরিচয়। কিন্তু বুঝলেন আমাদের ক্লিকটা সেই ছিল। যখন আমাকে কেউ বুঝেনি, আমার কবিতা ভালো ছিল না, তখন ঐ ছিল একমাত্র যে আমাকে দয়া করেছিল।

প্রতি রাতে সে ম্যাসেজ দিত কিছু লিখেছি কিনা।

উত্তর নেগেটিভ হলে সে ফোন দিতেই থাকতো। যতক্ষণ না আমি লিখে ওকে না দেখাতাম, ও ছাড়তো না আমাকে।

মাঝে মাঝে ও ফোন দিয়ে বলত — ভয় লাগছে।

বলে কান্না শুরু। মা নেই যে। মাকে মনে পড়ে এবং সব ধরনের স্মৃতি সে আমাকে বলতো।

কিন্তু ওকেও আমি পাইনি ওভাবে। কারণ সেও জানোয়ারের পাল্লায় ছিল। খেয়ে ছেড়ে দিসে ওকে।

সিরাজ সরকার জিজ্ঞাসা করলেন — পরে পাওনি?

মাহবুব আনন্দ নিয়ে বলল — পেয়েছি তো। একমাস আমরা ছিলাম একসাথে। জানেন, জানকে নিকনেমে ডাকা এই প্রসেসটা এখনও আছে। কিন্তু ওকে আমি বলে এত সুন্দরভাবে অরোনা ডাকতাম যে ও বলতো আমি যেন আর ওকে অন্যকিছু দিয়ে না ডাকি।

সেই গ্রেইট ডিপ্রেশনের টাইমে আমি অসুস্থ শুনে আমার প্রিয় খাবার লাল শাক ও রান্না করে নিয়ে এসেছিল।

আইরিশ কমেডি নিয়ে আগ্রহ দেখে আমাকে দামি মোটা পুরা আইরিশ কমেডি কালেকশন কিনে দিয়েছিল।

বুঝলেন, আমার নারী খেতে ইচ্ছা করে না, পান করতে ইচ্ছা করে।

ওর মাধ্যমেই সেই তৃষ্ণা আমার প্রথম মিটে। একটা রেস্টুরেন্টে আমি ওর জেলডা আর জিনেরভা চুষে দেখেছিলাম। আমার বাম কানটায় ও যে পালিশ দিয়েছিল।

আমার ছোট পামেলা পর্যন্ত জেগে উঠেছিল।

কিন্তু জানেন, আমার ওর ফ্যানি একবারও ধরতে ইচ্ছা করেনি। কারণ সেটা খাওয়া, পান করা নয়।

আমার এই সততা ও ভালোবাসতো।

— পরে?

— পরে তো আর টিকলো না। কিন্তু যখন টিকলো না আমি ভেবে দেখলাম আমি নিজের সব আদর্শকে অস্বীকার করেছি।

আমি ভেবে দেখলাম সেই মফস্বলের জানোয়ারদের চেয়েও আমি কত বড় শয়তান। আমি জানি এসব ঠিক না, অথচ আমি নিজেকে সেসবে বিলিয়ে দিয়েছি।

ভেবে দেখেন আমি কত অভাগা। বাংলার তিন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার নারীদের নিয়ে বিভিন্নভাবে লিখেছে। এখন ধরেন তাদের লেখায় বেশ্যা, জমিদাররা নৃত্যশিল্পীদের সাথে কী ছিল লিখেছেন। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল সম্মান বৃদ্ধি করার। আর আমরা নিলাম যে আচ্ছা এভাবে তাহলে পাওয়া যায়।

এখন ভেবে দেখেন এই মানসিকতার মানুষরা এখন লেখক হচ্ছে।

আমিও সেই পর্যায়ের। এরপরেই অবশ্য আমি আবার সেই বাচ্চাকালের খঁজ উপায়ে মেয়েদের সাথে কথা বলা শুরু করি।

জোর করে তাদের গল্প, কবিতা দিতাম। তখন আমি খুঁজে পাই স্মিতাকে।

সিরাজ সরকার এইবার হেসে বললেন — হ্যাঁ জানি, হাসান মুস্তাফিজ পর্ব শেষ করে তো তুমি ওর বাসার সামনে যেয়ে জোরে জোরে নাম ধরে ডাকছিলে।

মাহবুব হেসে ফেলে বলল — আমার সবসময় একটা ফ্যান্টাসি ছিল ” A streetcar named desire ” সিনেমাটার একটা দৃশ্য সুযোগমতো কপি মারব।

সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম।

সবাই হেসে দিল।

সিরাজ সরকার বললেন — আচ্ছা, তারপর?

মাহবুব সংকোচ করে বলতে লাগল — তারপর তো ভাই ( খুব কানে লাগল এটা সিরাজ সরকারের) সব এম্বেরেসিং ঘটনা। মেয়েটা আমার চেয়ে ভালোই ছোট। সেইজন্যেই ওর পবিত্রতায় আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল অনেকে মডার্নিজম নিয়ে অনেক কিছু বলা সত্ত্বেও।

বুঝলেন, ম্যাসেজ দিতাম , প্রথম তিনদিন উত্তর দেয়নি। কিন্তু আমি যেদিন বাংলাদেশের একজন প্রধান কবিকে নিয়ে একটা সমালোচনা ওকে পড়তে পাঠাই, সেদিন ও উত্তর দেয়। ঐটাই আসলে আমার শেষ লেখা যেটা দৈনিক পত্রিকায় বের হয়েছিল, আবার প্রথম।

এরপরে বাংলাদেশের কোনো শুয়োর নোয়াম চমস্কির সাথে যা করলো, সেটা নিয়েও কথা বললাম। ভালোই লাগত।

পরে জানলাম ও আমার এক ক্লাসমেটের ছোটবোন। তাকে আবার আমি ভয় পাই। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ আমি রেসপেক্ট করি কিন্তু পুরা সাপোর্ট করতে পারি না। কিন্তু মেয়ে আমার প্রতি নরম ও দয়ালু ছিল।

এখন বুঝেনই তো, মডার্ন যুগ, সেই তালে চলা লাগে। মেয়েকে ইমপ্রেস করার জন্য আমি এনিমে দেখতে শুরু করি, যদিও আমার এসব সহ্য হত না। টোটাল বোরডাম মনে হত।

স্মিতাকে দেখানোর ইচ্ছা ছিল আমি মানুষটা ভালো। আমি সে আসলেই মেয়েদের ওভাবে স্বর্গের হুর ভাবি। তাই ঠিক করি ওকে রেমন্ড কার্ভারের স্টোরি কালেকশন গিফট করব।

কিন্তু ভাই (খুব লাগে কানে) দুনিয়া যে এত জঘন্য, এখন তো ঢাকাও খুব ময়লা দেশ। বৃষ্টি পড়লে সেনসরি গন্ধের চেয়ে গলি থেকে গলির গুয়ের গন্ধ বেশি পাওয়া যায়। এতই পেট খারাপ এই দেশটার। আবার বসবাসের যোগ্য নয় এমন তালিকায় তো ঢাকাই এইবার প্রথম হল।

মানে যাই হোক, আমাকে চিনে না তাই সে নিবে না। কাজে চেনানোর একমাত্র উপায় হল এনিমে দেখা। কড়া এনিমে দেখতাম।যত ধরনের। ওর সাথে যখন এসব কথা বলতাম খুব জমতো আসরটা।

সেই থেকে আমি বুঝি, মেয়েটার বোধশক্তি আছে। যে এনিমে এত জনপ্রিয় এবং মানুষ অন্ধভাবে সেটার সবকিছুর প্রশংসা করে সেখানে মেয়েটা আমাকে এভাবে বলতো যে এইখানে এই ভুল, এই দৃশ্য ভালো হয়নি, এই এন্ডিং ভালো হয়নি।

বলেন, আমার মতো একটা ছেলেকে তেজস্ক্রিয় করে দেওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট নয়?

মাহবুব উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। সিরাজ সরকার মাথা নাড়লেন।

মাহবুব বলতে লাগল — সো, আমি বুঝে যাচ্ছিলাম যে আমাদের দেখা হবে। ওদিকে আমি ওর কিছু ক্লোজ মানুষদের রাজনৈতিক কনসেপ্ট নিয়ে জ্ঞানার্জন করে ফেলেছিলাম।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিনে ওর জন্মদিন।

আমি দাওয়াত পাই।

” উফ” ক্যামেরার পিছন থেকে শোনা গেল।

সিরাজ সরকার থামলেন না। জানতে চাইলেন — তারপর?

— এরপরেই তো মগবাজারের আড়ং উড়ে গেল।

এবার সবাই নড়েচড়ে উঠলো।

মাহবুব বলল — জানতে চান?

— হু অবশ্যই।

এটা সবাই বলল।

— আড়ংয়ের কয়েক বিল্ডিং পরেই অরোরার বাসা। ভাই বুঝলেন ( এখন সুন্দর লাগছে)…

সিরাজ সরকার থামিয়ে দিলেন — এই দাঁড়াও, তাহলে তুমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলাকে একভাবে দোষারোপ করছো?

মাহবুব অকপটে বলল — টিচার রেপ করার পরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দায় নেয়নি, এমনকি সুইসাইডের পরে, ৫৩ বছর হয়ে গেছে। কাজে হ্যাঁ, দায়ী করি।

আচ্ছা, আমার ব্যাংক একাউন্টে কত টাকা আছে জানেন? মুনাফা ছাড়া?

— দেখে আসব নে, হু তো মগবাজার?

মাহবুব আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল।

— ভাই ( কী মধুর), হয়েছে ছাড়াছাড়ি, কিন্তু ভালোবাসি, এখনো যে। ওর সাথে আমি সবসময় ওরসন ওয়েলসকে নিয়ে আলাপ করতাম। আমি কেমনে ভুলি এসব?

আমি জানার পর থামতে পারিনি, কতভাবে ওর কাজিনদের ম্যাসেজ দিয়েছি। নম্বর আর একাউন্ট এসব দিয়ে তো সরাসরি যোগাযোগ করা যাবে না মানুষটার সাথে, নিয়মে নেই।

পরে আমি সেই রাতে মগবাজার চলে যাই, যেয়ে দেখি রাস্তা বন্ধ। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ দিয়ে ভর্তি। তাই গলিতে ঢুকে পড়ি। ওর বিল্ডিংয়ের সামনে আমার যেতেই হবে। ঢুকে দেখি সব রেস্টুরেন্ট মোমবাতি জ্বালিয়ে ব্যবসা করছে, কী লোভ।

রেললাইন পেরিয়ে অবশেষে ওর বিল্ডিংয়ের সামনে পৌঁছাই। না, অন্যান্য সব বিল্ডিংয়ের গ্লাস পর্যন্ত ফেটে যায় ওমন বিস্ফোরণের শব্দের জন্য, কিন্তু সেই বিল্ডিং ঠিক আছে, খালি বিদ্যুত সংযোগ বন্ধ। হায়রে ভাই ( একটু বেমানান) কীযে শান্তি লাগসিল। কিন্তু ফোন চেক করে দেখি ওর মামাতো বোন ম্যাসেজ দিয়ে রাখসে ও ঠিক আছে কিন্তু আমি যেন আর এসব না করি আর যোগাযোগের চেষ্টা না করি।

আপনিই বলেন, আমি কি এত খারাপ ছিলাম? এই ধরনের ট্রিটমেন্ট আমার ভাগ্যে ছিল? আমার দোষটাও কেউ আজপর্যন্ত…

সেইদিনই আমি ঠিক করি হিচহাইক করব। বাবার মানিব্যাগ থেকে সব টাকা সরিয়ে ফেলি। হ্যাঁ, হাসান মুস্তাফিজের দালালির প্রতি প্রতিশোধ…

মোবারক বলে উঠলো — ভাই ক্ষিধা লাগসে।

সিরাজ সরকার বললেন — আমি আবার আসব।

সেটা আমাদের শেষ দেখা হবে।

★★★

মাহবুব আজ অনেক হাসিখুশি। জেলের পোশাকে ফিরে গেলেও সে আজ শেভ করেছে।

সিরাজ সরকার জিজ্ঞাসা করলেন — কেমন আছো, হাসিন?

মাহবুব নেড়ে উঠে বলল — হাম একদাম ফার্স্ট ক্লাস হে, হাম বাংলাদেশি হে।

আচ্ছা, শুনলাম বাংলাদেশে বলে প্রথম ফিমেইল সিরিয়াল কিলার খুঁজে পাওয়া গিয়েছে?

সে বলে আমাকে বিয়ে করতে চায়?

সিরাজ সরকার কানে তুললেন না।

বললেন — অরোরার খবর এনেছি।

মাহবুব বললেন — ভাই, ঘিন্নার কথা আর কত তুলবেন? বাদ দেন না, স্মিতাকে কীভাবে বই দিয়েছিলাম শুনবেন? শালার ওয়েটার আমার…

সিরাজ সরকার জোর দিয়ে বললেন — হাসিন, তোমাকে শুনতে হবে।

মাহবুব হতাশ হয়ে বলল — আচ্ছা, বলেন ও আমাকে কতখানি ঘিন্না করে।

— সেই সুযোগ নেই, ও মারা গেছে।

হাসিন মাহবুব, মুখ হাঁ, পায়ের স্যান্ডেল খুলে গেছে, তাকালো।

সিরাজ সরকার বলল — রিমান্ডে তো তুমি ওভাবে বলোনি, তাই পুলিশ আর খোঁজ নেয়নি। আমি ইনভেস্টিগেট করেছি ব্যাপারটা। ও আড়ংয়ে ছিল। ধানমন্ডিতে ওর মামির বাসায় ও বলে আসে যে বন্ধুদের সাথে নিউমার্কেট যাচ্ছে। সেখান থেকে ও কীভাবে মগবাজারের আড়ং গেল জানি না। মূলত ও সেখানেই ছিল।

বিস্ফোরণের দুই মিনিট আগেও অরোরা ওর মামিকে ফোন দিয়ে বলেছিল সে নিউ মার্কেটে। একরাত পরেও ও বাসায় না আসলে পরে ফ্যামিলি পুলিশের কাছে যায়।

গতকাল ঘোষণা করা হয়েছে, ও মৃত। যেই জায়গায় বিস্ফোরণ হয়, ও সেইখানেই ছিল, ডিএনএ টেস্ট তাই বলে।

হাসিন মাহবুবের হাত বাঁধা শিকল দিয়ে চেয়ারের সাথে। মুখ ঢাকার সুযোগ নেই।

কান্না সবাই দেখবে।

অনেকক্ষণ পর, বলল — মামি না, ও ডাকতো মামিমা বলে।

ভদ্রমহিলা ওকে খুব আদর করতো।

সিরাজ সরকার উত্তর দিলেন না।

মাহবুব বলতে লাগল — মেয়েটা আমাকে আসলেই শ্রদ্ধা করতো।

আমিই ওকে বলেছিলাম ওর হিজাবের ব্যবসায় যে কাপড় ইউজ করে সেটা চেঞ্জ করতে, আর সাথে অন্যান্য প্রোডাক্ট যদি পারে…

আমি আড়ংয়ের ডিজাইন দেখে আসতে বলেছিলাম।

হায়রে, আমার কথা শুনেই মরলো।

সিরাজ সরকার বললেন — না দেখো আসলে…

হাসিন মাহবুব না শুনেই বলল — জানেন রুমির একটা কবিতা আছে।

কেউ যদি অন্য কাউকে আল্লাহ এবং নিজেকে ছাড়াও সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, আল্লাহ সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে নিজের কাছে নিয়ে নেন।

ও মারা গেল আমার জন্য।

এইবার হাসিন মাহবুব পুরাপুরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল — হ্যাঁ, আমি খুনী। আমি অরোরাকে নিজে খুন করেছি।

মোবারক বলে উঠলো — কাট, কাট।

ঠিকই বিনোদনের পাতায় ওর ইন্টারভিউটা প্রকাশিত হয়েছিল। নায়িকা ভিক্টিমটি কোনো অভিযোগ করার সুযোগ পায়নি। পুলিশ ততদিনে সব কাল্ট মুভমেন্ট দমন করে ফেলেছে। বাংলাদেশের প্রথম বাংলাদেশি ফিমেইল সিরিয়াল কিলারের ফাঁসিও হয়ে গেছে।

ইন্টারভিউটার শিরোনাম ছিল — ” হ্যাঁ, আমি খুনী”

অরোরা বা স্মিতার কোনো অংশই দেওয়া হয়নি। এডিট করেছেন সম্পাদক।

শেয়ার করুন