সুকান্তি দত্ত-র প্রবন্ধ

Spread This
সুকান্তি দত্ত

সুকান্তি দত্ত

আমাদের প্রকৃতির করিয়া রাখিয়ো

প্রথম গল্প ‘লালজুতো’ বা প্রথম উপন্যাস ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ থেকেই কমলকুমার অন্যরকম, গতানুগতিকতার পথে হাঁটেন নি। কিন্তু তাঁর লেখকজীবন যত এগিয়েছে, নিজেকে এমন এক অনন্য পথের যাত্রী করে তুলেছেন যে পাঠকের পথটিও হয়ে উঠেছে আরও দুর্গম, দুর্ভেদ্য। ‘লালজুতো’ বা ‘জল’ গল্পের কমলকুমার আর ‘দ্বাদশ মৃত্তিকা’ বা ‘খেলার আরম্ভ’র কমলকুমারে অনেক ফারাক। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র সঙ্গে আঙ্গিকের দুর্গমতায় তুলনীয় নয় সুহাসিনীর পমেটম’ কিংবা ‘শ্যাম নৌকা’র মতো উপন্যাস। তাঁর প্রথম দিকের কয়েকটি গল্পে বা শেষের দিকে ‘বাবু’ বা ‘আমোদ বোষ্টুমির’র মতো দু-একটি গল্পে যে কাহিনিরেখা বা ঘটনাপরম্পরাকে অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে পারেন পাঠক, তাঁর বাদবাকি প্রায় সব গল্পেই তা অনুপস্থিত। ইশারা আর সংকেতময় বাক্য প্রবাহ, বলা আর না-বলা কথার আলোছায়া, সূক্ষ্ম চিত্রধর্মীতা, কাব্যভাষার বিমূর্ততা আর কখনও কখনও মাটির গন্ধমাখা অসামান্য সংলাপ— এভাবেই বয়ে চলেছে তাঁর গল্প-উপন্যাস।
তিনি লিখেছিলেন, “ঠাকুর বলেছেন, ‘কথা ইশারা বটে’। এই ইশারা পরমপৰ্য্যায় যাহা ওতপ্রোত বাচনিক সত্তা তাহা দেখা দেয়, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য সুহাসিনীর পমেটম বা শ্যাম নৌকা আমার শত চেষ্টা সত্ত্বেও অনেককেই আনন্দ দেয় নাই। ঘটনাপ্রবাহকে আমি লেখার উপজীব্য বলিয়া ধরি না…।”১ জীবিতকালে স্ত্রী দয়াময়ী-সহ উনিশজন পাঠককে নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন তিনি,২ বিশ্বাস করতেন লেখকের দায়িত্ব থাকে পাঠক তৈরি করায়,৩ তাই তাঁর লেখা রসগ্রহণ করতে হলে পাঠককেও সাহিত্যগতভাবে চর্চিত হয়ে উঠতে হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ অনুরাগী ছিলেন কমলকুমার, তার পাঠক যেন শ্রীরামকৃষ্ণের গল্পের সেই কাঠুরে, যে কাঠ কাটতে কাটতে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করে তবেই চন্দনবনের সন্ধান পায়। তার পরবর্তী প্রজন্মের একজন সামান্য কথাকার বা পাঠক হিসেবে সেই চন্দনবনের সন্ধান পেয়েছি কি না জানি না, তবে চন্দনের সুবাস কিছু পেয়েছি, সেটুকুই নিবেদন করি।
উপন্যাস নয়, আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি তাঁর গল্প নিয়ে। বলা ভালো তাঁর মনন-অনুভবের একটি বিশেষ দিককে নিয়ে, যা তার প্রায় সব গল্পকেই আজও প্রাসঙ্গিক ও দীপ্তিময় করে রেখেছে। সেই বিশেষ দিকটি হল ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে প্রত্যাখান এবং প্রাগাধুনিক দেশজ ভাবধারার উপস্থাপন, যার কয়েকটি মূল লক্ষণ প্রকৃতি-প্রেম, প্রকৃতিকে দেবজ্ঞান, ঐতিহ্যগত আচার-সংস্কার ও ঈশ্বর চেতনা, সরলতা, বিশ্বাস ও বিস্ময়।
যুক্তিবল-মন্ত্রবল-বিজ্ঞানবলে বলীয়ান ঔপনিবেশিক আধুনিকতার প্রতাপ ধ্বংস করে দেয় প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতভূমির জনজীবনের অনেকাংশে সম্পৃক্ত সরলতা-বিশ্বাস-বিস্ময়। কমলকুমার তার দিনলিপিতে (১৪ জুলাই, ১৯৭৮) স্তাঁদালের একটি উপন্যাস প্রসঙ্গে লিখেছেন, “Survival of the fittest কথাটা বঙ্গীয় জীবনে কবে আসিয়াছিল জানি না, ছেলেবেলায় ঐ পদটি খুব শুনিতাম! কথাটা আমার আলস্যকে নষ্ট করিত, সেই যে ভেরান্ডা গাছের তলায় দাঁড়াইয়া থাকা, চৌরঙ্গীতে স্তম্ভিত হইয়া জনপ্রবাহ দেখা  — ছোটোখাট কত না দৃশ্য ঘটনায় মন আকর্ষিত হইত। ঐ কথা বাদ সাধিল।… আমার পাশে আর কেউ নাই— সকলেই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী। বন্ধন বলিয়া যাহা তাহা নস্যাৎ হইল। স্নেহ মায়া মমতার কিছু নাই।”৪
পাশ্চাত্যের দীপায়ন আর আধুনিকতা কেড়ে নিয়েছে আমাদের সরলতা-বিশ্বাস-স্নেহ-মমতা, সকলেই আমরা পরস্পরের প্রতিযোগী। কমলকুমারের প্রথম গল্প ‘লালজুতো’র দুটি কিশোর-কিশোরী যেন সেই স্নেহ-মমতা-সরলতা আর বিস্ময়ের প্রতীক। কিশোর নীতিশ নিজের জন্য জুতো কিনতে গিয়ে ‘ছোট্ট ছোট্ট দুটি জুতো, কোমল লাল চামড়ার’ দেখে অজানা মধুর আনন্দে ভেসে গিয়ে কিনে নিয়ে এল সেই জুতো জোড়া। আর সেটি ঘিরে নীতীশ আর গৌরীর বিস্ময়, মধুর কল্পনা, সুপ্ত পিতৃ-মাতৃ স্নেহ– “নীতীশ বিস্ময় ভরে দেখে ভাবছিল একি! পাশের বাড়িতে তখন সেতারে চলছিল তিলক-কামোদের জোড়— তারই ঘন ঝংকার ভেসে আসছিল। ওই সংগীত এবং এই জীবনের মহাসঙ্গীত তাদের দুজনকে আড়াল করে রাখলে, হিংস্র বাস্তবের রাজ্য থেকে। … গৌরীর হৃদয়ের ভিতর দিয়ে, ওই লাল জুতো পরে, নীতীশ টলমল করে চলল, আর— গৌরী চলতে শুরু করলে, নীতীশের হৃদয়ের মধ্যে দিয়ে পথ করে। আচম্বিতে সশব্দে জুতোজোড়াকে চুম্বন করলে।”
‘মতিলাল পাদরী’ গল্পেও মতিলালের ঝড়-বাদলের রাতে গির্জাঘরে শিশুটির জন্ম ঘিরে সরল বিশ্বাস- “বালকের মতো চেয়ে থেকে, সেই একই বিশ্বাসের কথা পাদরী সরল মনে বললেন, ‘কে জন্মাল তা জানিস না হে।” আবার শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার পরও তার খাঁটি খ্রিস্টান-বিশ্বাস থেকে সরতে পারেন না— “পাদরী নিজের বুকে যেন লাথি মেরে লাফ দিয়ে উঠেই দৌড়ে শিশুর কাছে গিয়ে আছড়ে পড়লেন। শুধু তার ছোট দেহে মুখ ঘষতে ঘষতে ক্ষীণস্বরে বললেন, ‘ও প্রাণ, প্রাণ’। তার হাটুতে মুখখানি বুলাতে বুলাতে চোখের জলে ধোয়াতে ধোয়াতে বললেন, “আমি সত্যই ক্রিশ্চান নাই গো বাপ!”
‘আর চোখে জল’– গল্পটি শুরু করছেন কমলকুমার– মাধবায় নমঃ জয় রামকৃষ্ণ। এখানে এক সরল আন্তরিকতা বলিব যাহা যে, যখন তিনি প্রথম উহা ঐ কব্জিবন্ধতে দেখিয়াছিলেন, যাহা তাঁহাকে আকৃষ্ট করে, তাহা পার্ক স্ট্রীটের মোড়ে ঘটিয়াছিল। পুরো গল্প জুড়েই ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বিপ্রতীপে সরল আন্তরিকতার সঙ্গে জড়িত বিস্ময়— রহস্যময়তা-বিশ্বাস-এর দ্বান্দ্বিক উপস্থাপন কমলকুমারীয় গদ্যে— “এখানে, তিনি অন্যমনস্ক, তিনি খুব গ্রাম্য।… কিন্তু কখনই বিচার করিবার সময় পান নাই কেন যে ঐ। শুধু স্থানই তাঁহাকে স্পর্শ করিয়া থাকে, এবং এই মাত্র যে তিনি, স্ট্রেঞ্জ! নিশ্চয় বলিয়াছেন; যাহা, যে শব্দ! ইদানীংকার ব্যবহারিক বিজ্ঞান পরিশোভিত জীবনের মধ্যে খুবই প্রাচীনতার! ইহার আরও বিশেষ গভীরে আর একটি সংজ্ঞা আছে, তাহা হইল রহস্যময়! এখন মিঃ … যিনি কর্মের পুত্তুলি, (যাঁহার শনিবারটি ভারী শতচ্ছিন্নভাবে সাধিত হইয়া থাকে) তাঁহার দ্বারা ঐ অন্যমনা হওয়া আশ্চৰ্য্য এবং ইহার পরক্ষণেই তিনি অস্বস্তিকর শ্বাস, একটি দীর্ঘ ও বিলম্বিত, ত্যাগ করেন।” ‘লুপ্ত পূজাবিধি গল্পেও ছোট ছোট চীনে মাটির পুতুলকে নিয়ে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহতা বুঝানোর চেষ্টা ঘিরে বালক-বালিকাদের সত্যিই ওগুলিকে মৃত শিশু ভেবে নেওয়ার বিশ্বাস ও আধুনিকতাবাদী অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বকে মূর্ত করেন কমলকুমার। কয়েকটি উদাহরণ মাত্র, তার আরও বহু গল্পেই ছড়িয়ে আছে সরলতা-বিশ্বাস-বিস্ময়ের উপস্থাপন ও তার আক্রান্ত-ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আখ্যান।
জড়বস্তুকে অচেতন না ভেবে চেতন ভাবা, প্রকৃতিকে দেবজ্ঞান করা, জড়প্রকৃতিকে প্রাণ-কল্পনা, পশুপাখি-কীটপতঙ্গে দেবত্ব বা মনুষ্যত্ব আরোপ-প্রাগাধুনিক ভারতভূমিতে, শুধু ভারতেই কেন, সারা পৃথিবী জুড়েই আধুনিকপর্ব যুগে প্রবলভাবে এই কল্পনা-বিশ্বাস ছিল। কমলকুমারের গল্পেও বারেবারে এই ধারণাটি ফিরে ফিরে আসে আর কখনওবা আধুনিকতার চাপে বিধ্বস্ত হয়। ‘লালজুতো’-গল্পে যেমন এই লালজুতোটিকেই শিশুকল্পনায় চুমো খায় গৌরী, ‘লুপ্ত পূজাবিধি’-তেও চিনামাটির পুতুল ঘিরে বালিকাদের শিশু-কল্পনা। এ গল্পে, “বালিকারা পাখীদের মতো গ্রীবা আন্দোলন করত কথাতে উন্মত্ত রহিয়াছে, একজন পুতুলটি নিবিড়ভাবে দেখিতে থাকিয়া চুম্বন সহকারে বলিল কি মিষ্টি ভাই, ইহার পর আপন হস্তের ফিকে রুমাল পুতুলকে পরাইয়া সকলকে প্রদর্শিয়া কহিল– দেখ এখন কেমন সুন্দর দেখাইতেছে! আর আর মেয়েরা সকলে দেখিল কি সুন্দর, লাভলি, ঈস, খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে কি মিষ্টি! ইহা প্রায় নাচিতে থাকিয়া ঘোষণা করিল এবং যে ইহাও যে কি নিষ্ঠুর ইহাকে ঐ মৃতদের মধ্যে রাখিয়াছিল, কি নিষ্ঠুর! কি ভাগ্যবতী তুই ভাই! সত্য কি ভাগ্যবতী। আমি কখনও উহারে মানে সকল সময় উহারে বুকে রাখিব। এক মুহূর্ত ছাড়িব না, একটু বড় হইলে মানে পরে উহার বিবাহ দিব গায়ে-হলুদ লাচে তোমরা আসিবে।” আর গল্পের শেষ পংক্তিটি বালিকাদের বিশ্বাস-কল্পনার বিপরীতে স্কুলের শিক্ষকের ওগুলিকে পুতুল ছাড়া অন্য কিছু না-ভাবার অবিশ্বাসী উচ্চারণ— “শিক্ষক হাতে হাত মুড়িয়া সব শুনিবার পর, হুইসিল বাজাইলেন, লাইন কর, ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দাও মৃত শিশুকে… ত্বরা কর।” জড় প্রকৃতি ও মনুষ্যেতর জীবে দেবত্ব বা মনুষ্যত্ব আরোপের প্রাচীন ধারণা উপস্থাপনের চমৎকার একটি নমুনা ‘আর চোখে জল’ গল্পে দেখি।
“সব কিছু ঐ বয়েসে, সব অঙ্কের যোগ শিক্ষার বয়েসে মানিতে হইবে সমস্ততে আত্মভাব। দরজাতে যদি আঘাত পাইল তবে দরজাতে পদাঘাত করে।
আহ মা যিনি খুব সাদা মনোভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিদ্যমান তাহাকে একই ভাবিতে, সবই যে জঙ্গম বুঝিতে শিখাইলেন। উহাতে লাগিল নমস্কার কর। ও! আমার মা ‘কেশব করু করুণা দীনে কুঞ্জ কাননচারী’ (গানটি দেশ রাগে) শিখাইলেন আর ঠাকুরের বইতে আছে: শিশু বলিতেছে, যে সে ফড়িং ধরিবে, যে তখন বৃক্ষ-পত্র আন্দোলিত, ফড়িং সেই পত্রে বসিয়া, সেই শিশু পত্ররে শাসন করে, এই চোপ আমি ফড়িং ধরিব।”
ছোট একটি গল্প ‘পিঙ্গলাবৎ’, আঙুরী এক নাচনী, সে তার মনের মানুষের জন্য অপেক্ষা করে, নিজেকে বধূ রূপে কল্পনা করে, বুলবুলি পাখি ডেকেছিল ‘চিঠি আসবে’ সে চিঠির প্রতীক্ষায় থাকে গভীর বিশ্বাসে, পাতার শব্দে চমকে উঠে ভাবে সেই মানুষটি বুঝি এল! আঙুরীর ভাবনা-কল্পনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত দেশজ ঐতিহ্যগত আচার-সংস্কার আর প্রকৃতি, বস্তুত আঙুরী যেন প্রকৃতিতেই মিশে আছে! কী অপূর্ব বর্ণনা কমলকুমারের— “আঙুরী স্পষ্ট দেখিতে পায় কে যেন আসিয়াছে, চমকাইয়া দরজার দিকে চাহিল। কেন নহে! হাওয়ায় একটি শুষ্ক পাতা দরজার চৌকাঠ অতিক্রম করিল। আঙুরী তাহার ভুলের জন্য হাসিতে পারিল না। সংক্রোধে বলিতে পারিল না, মর মিনসে। বরং তাহার সহিত এ পৃথিবীর আন্তরিক পরিচয় হইল। সে ভাবিল, মানুষের পায়ের আওয়াজ পাতার মধ্যে থাকে না, পাতার আওয়াজ মানুষের পায়ে থাকে! এটুকু প্রশ্ন করিয়া সে হাতের হলুদের দিকে চাহিয়া দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া আবার গা মাড়িতে লাগিল। দিনের মধ্যে কতবারই সে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়াছে। শ্বাসের মধ্যে ইস্টিশনের গন্ধ পাইয়াছে। কারণ যে আসিবে রেলেই আসিবে। আশায় আশায় আঙুরীয় গায়ে গা লাগিয়া যাইতেছে, ঈগল নখখৃত ইঁন্দুরের মতই সমস্ত গা ছিঁ ছিঁ শব্দ করিতেছে। সে প্রতীক্ষা করিতেছিল।”
কমলকুমার যে লিখিলেন, ‘মানুষের পায়ের আওয়াজ পাতার মধ্যে থাকে না, পাতার আওয়াজ মানুষের পায়ে থাকে!’— এই বাক্যটিই যেন ধ্রুবপদ হয়ে তার অধিকাংশ গল্পেই ছড়িয়ে আছে। যান্ত্রিক বস্তুতান্ত্রিক আধুনিকতার সর্বগ্রাসী ক্ষুধায় আজ দাউদাউ জ্বলছে জল-জমি-জঙ্গল-নদী-পাহাড়। পৃথিবীর অস্তিত্বই বিপন্ন হতে বসেছে, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশ আন্দোলন হয়ে উঠছে তীব্রতর, রাষ্ট্রপ্রধানরা সম্মেলনে বসেছেন পরিবেশ বাঁচিয়ে উন্নয়নের পথ খুঁজতে আর কমলকুমার অনেক আগেই বণিকসভ্যতা মুনাফাসভ্যতাজাত আধুনিকতাবাদী যে-চিন্তাধারা প্রকৃতিকে শুধু নিষ্ঠুরভাবে দোহন করতে চায় তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, ভারতবর্ষীয় দেশজ চিন্তাধারা তথা শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবাদর্শ থেকেই তিনি রসদ সংগ্রহ করে নিয়েছেন।
কমলকুমারের অসাধারণ একটি গল্প ‘বাগান কেয়ারি’। ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে প্রত্যাখানের দর্শনটি এ-গল্পে অসামান্য দক্ষতায় চিত্রিত হয়েছে। বনজঙ্গল উচ্ছেদ করে একটি শিল্পনগরীর পত্তন হচ্ছে, ঠিকাদারেরা গ্রাম থেকে মজুর নিয়ে আসছে, আর একদিন ওখানেই এক মজুরের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল — ‘ঐ বেচারার মরদেহ পত্তনটির একান্তে পড়িয়াছিল— যাহার প্রতি ছটাক জমিতে কৰ্ম্মকুশলতা গোঁয়ার। ঐ সাড়হীন দেহের পাশ দিয়া লৌহ শিকল দ্রুতবেগে চলিয়াছে— আর কিছু দূরে ত খুব স্ফীত রবার বা অন্য পদার্থের জলের পাইপ কম্পিত দেখা যায়, আরও যে ঐ পাইপের গাত্রের সূক্ষ্ম ছিদ্র ভেদিয়া ফিনকি দিয়া জলে ঠিকরাইয়া উঠিয়াছে তাহাও; এবং এই সংস্থানের কয়েক রশি দূরে বন হাসিল করার শব্দ ক্রমাগত হইতেছিল। কখনও কুঠার কখনও বা করাতের শব্দ!’ আর সেই মৃত্যু ঘিরে ঠিকাদার, অন্যান্য মজুর, মজুরদের মনোরঞ্জনকারী খেমটায়ালি, ঠিকাদারের সরকার বা মানেজার, দাসীবর্গ, অভিজাত ঘরের বিবিধ বয়সী মহিলা, ইঞ্জিনিয়ার, লোধারমনী ও বালক, কনৌজী ব্রাহ্মণ পুরোহিত, অতি প্রাচীন বৃদ্ধের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া-কথোপকথন ভর করে গল্পটি ডানা মেলতে থাকে। মজুরটি মরেছে কি মরেনি, কীভাবে মরল, তার সৎকার কীভাবে হবে, তার জাত কী ইত্যাদি নানা সূত্র ধরে গল্প এগোয়। ঠিকাদার ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে, ‘খেল, শালা বুঝিয়াছি আমার ফুরণ-এর কাজকে বানচাল করিবার ষড়যন্ত্র। কামচোট্টা সকল… খেল পাইয়াছ! বুঝ, আমার চুল রোদ লাগিয়া পাকিয়াছে না, শালা হিসাবের বেলায় দেখা যাইবে।’ ডাক্তার এসে জানায় সত্যিই মৃত্যু হয়েছে, এবার তার সৎকার কীভাবে হবে, জাত তো জানা নেই, কে ছোঁবে! ওদিকে মৃত্যু নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা চলে ইঞ্জিনিয়ার সহ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে, এক অধস্থন সহকারী বলে, ‘আমার ধৃষ্টতা মাপ করিবেন— স্যার আমাকে যদি বলিতে আজ্ঞা করেন, তবে বলি, স্যার মৃত্যু কি কেহই বলিতে পারে না, স্যার মৃত্যু! জীবতত্ত্ব কিছু বলে না; মৃত্য সম্পর্কে, মজা এই যে সবাই বলিতে গিয়া আত্মা বিষয়ে আলোচনা করে! অথচ পুরাণে শুনি আছে যে যমকে পরম সুন্দর দেখিতে, যমের সৌন্দর্য্যের কাছে কেহ দাঁড়াইতে পারে না, যমই মৃত্যু! ওদিকে শিল্পনগরী তৈরি হওয়ার পর এখানে এক ক্রোড়পতি পরিবারের কারখানা তৈরি হবে, তার ভিত্তিপুজো চলছে, অভিজাত রমণীরা ধান-দূর্বা ছড়িয়ে গান গায়,
“যতদূর বুঝা যায় এ গীতের সহিত ভিত্তি স্থাপনের কোন সম্পর্ক নাই, বরং বরষার আহ্বান ছিল— উপমা রূপে কি না জানি না— বরষা আসুক, একবেণী হইয়া তোমার অপেক্ষায় সমস্ত চরাচর আছেন, ঐ খরার পথ রোধ কর, দিক সুপ্রসন্ন হউক চরাচর ঝামরিয়া উঠুক! এস বরষা ভয় নাই আমরা তোমাকে পথ দেখাইব।
ইহাতে বুঝায়, যে তাহাদের আশা ভরসা লক্ষ্য— বরষার প্রার্থনা। যাহাতে লোক চরাচর আনন্দদায়ক হয়। এই সরল কামনা লইয়া মন যুগ যুগান্তর পার হইয়াছে, প্রকৃতি আমাদের হাসি কান্নার সূত্র হউক, তাহারে এড়াইয়া আমরা যাইব না, অর্থাৎ আমাদের জন্ম মৃত্যু সুখ দুঃখ কিছু সে নিজে; আমাদের কোন দেমাক নাই যে কোন প্রশ্ন করিব। নিয়তিকে কোন মূঢ় প্রশ্ন করে! আমাদের জিজ্ঞাসা নাই! এস বরষা আমাদের মধ্য দিয়া তুমি প্রকট হও।’ একদিকে বরষার গান, বৃদ্ধা লোধা রমণীর নানা আচার-সংস্কার, অন্যদিকে নানা কোম্পানির কর্মীমহলের বর্ণনা, ‘এখানে বিবিধ কর্ম্মতৎপর যন্ত্রাদির ইতঃমধ্য দিয়ো এখানে সেখানে, বিভিন্ন সংস্থার চৌহদ্দীতে চমৎকার পোষাকে মনোহর দর্শণ অতীব উচ্চপদস্থ কর্মীগণ, ইহাদের মুখের চাপা নিঃসংশয় উচ্চারণে প্রায় ইত্যকার পদ ফুট কাটিতে আছে: লেবার, পৃশিসন ইউলেজ, ডিসম্যান্টল, হয়েস্ট প্লান, সাইট, আউট পুল, ইনস্টল, প্লান্ট, কমপ্লেক্স। রাফলি! দূর হইতে ইহাদের ছোট দলকে প্রত্যক্ষিতে বড় কৌতুকপ্রদ— কত রকমারি ইহাদের অভিব্যক্তি। ইহারা ভারতকে সমৃদ্ধশালী করিবার ভার লইয়াছে— অবশ্য পরোক্ষে!”
পুলিশ আসে, যে মরেছে সে কি ক্রিমিনাল, তবে তো ময়না তদন্ত করতে হয়। ক্রিমিনাল তবে তো দুষমন। ‘দুষমন ঘোষণা হইতেই প্রস্তরীভূত সকল কিছু দর্প সহকারে চলিতে আরম্ভ করিয়াছে, ঘোর নিনাদে সিটি, ভোঁ ইত্যাদি বাজিয়া উঠিল, লোকে অঞ্জলি ভরিয়া জল পান করিল, আকাশে বিবিধ রঙের তারকাটা ফুলঝরা হাউই ছুটিল; প্রেম ডাকাডাকি হাসি যাবতীয় মানুষোচিত কিছু খাত পাইল। আঃ বাঁচিলাম! দুষমন উহা আমাদের উঠা বসা জগতের, উহাতে কোন রক্তশোষণকারী রহস্য নাই— মানুষ সে কে, সে কি!’
মানুষ সে কে, সে কি! প্রকৃতিকে গ্রাস করার ঔদ্ধত্য মানুষ পরিচয়কে ক্রমশ লুপ্ত করে দিচ্ছে। ঔপনিবেশিক শিক্ষা-মালিক-মজুর-ঠিকাদার-ক্রিমিনাল-ইঞ্জিনিয়ার-জীবনবীমা-কারখানা-শিল্পনগরী ইত্যাদির তলায় চাপা পড়ে গেছে মানুষ! আর কমলকুমার গল্পে এনেছেন এক অতি প্রাচীন বৃদ্ধকে, এই বৃদ্ধই যেন প্রাগাধুনিক ভারতাত্মার প্রতীক, আবহমান কালের ভারতবর্ষের প্রতীক, গল্পের প্রথম থেকেই যিনি ওই মৃত মানুষটির প্রতি মমতাময়, সহানুভূতিশীল, তিনিই দারোগাকে বলেন, “..সব কাজের পর সৎকার যেন হয়, আমার লোক যাইবে। শত টাকা ব্যয় হউক! এই কথা দিন যে ব্যবস্থা করিয়া দিবেন, আহা বেচারা না জানি কোথায় উহার দেশ গাঁ হা ভগবান! হা কাল তুমি কোথায় যে কাহার জন্য দাঁড়াইয়া আছ!
ও মৃত্যু কোন বনস্থলীর গভীরে অথবা তুষারমৌলী গিরিশৃঙ্গে কিংবা বুদ্বুদের অন্তরীক্ষে বেচারা মানুষের উত্তর লইয়া তুমি অপেক্ষা করিতে আছ তাহা আমরা জানিতে চাহিনা, আমাদের জিজ্ঞাসা নাই; আমাদের ঔদ্ধত্য নাই! আমরা আমাদের এই ছন্ধময়গীতে সব সুখ লাভ করি— কোথাও জড়তা নাই অন্ধকার নাই! ঐ পুরাতন বর্ষার গীতে আমাদের ক্ৰিয়াকৰ্ম্ম সুন্দরভাবে সুসম্পন্ন হউক। জানিও আমরা তোমাদের প্রভুতাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করি। তুমি আমাদের প্রকৃতির করিয়া রাখিও।”
আমাদের প্রকৃতির করিয়া রাখিও! – এ প্রার্থনা কমলকুমারের বহু গল্পেই ব্যপ্ত হয়ে আছে আর এরই সঙ্গে আছে ঈশ্বরচেতনা, পাশ্চাত্যের দীপায়ন যে-ঈশ্বরচেতনাকে অস্বীকার করতে চায়। সে-চাওয়া ভালো কি মন্দ, সে প্রশ্ন হয়তো বিতর্কিত, কিন্তু এখানে কমলকুমারের গল্প-বৈশিষ্ট্যের কথাই বলতে চাইছি। ওই অতি প্রচীন বৃদ্ধের মতো ‘জল’ গল্পের ফজলেও গভীর ঈশ্বরবিশ্বাস বা ঈশ্বরবিশ্বাসে পাপ-পুণ্যের দ্বন্দ্ব, ‘মতিলাল পাদরী’ গল্পের পাদরি কিংবা ‘রুক্মিনীকুমার’ গল্পের গঙ্গামণি বা রুক্মিনীকুমার সহ আরও বহু চরিত্রের ঐতিহ্যগত আচার-সংস্কার ও ঈশ্বরচেতনাকে উপস্থাপন করেছেন কমলকুমার।
একটি তর্ক উঠতেই পারে, পাশ্চাত্যের দীপায়নের সবকিছুই কি বর্জনীয় ? আর প্রাগাধুনিক ভারতীয় চিন্তাধারা কি সব অন্ধতা-জড়তা-শোষণ-বঞ্চণা মুক্ত? কমলকুমারও অনুভব করেছিলেন আমাদের এই প্রাচীন সভ্যতাশ্রিত জীবনপ্রণালীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে নানা অন্ধতা-যন্ত্রণা-দীর্ঘশ্বাস, সেই ফাঁকফোকর দিয়েই একটু একটু করে ডালপালা বিস্তার করেছে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার প্রতাপ। সেই অন্ধতা-যন্ত্রণার বহু লক্ষণকে তিনি চিহ্নিত করেছেন নানা গল্পে— ‘বাগানকেরিয়া’র জাতপাতের অন্ধতা থেকে ‘জল’ কিংবা ‘নিম অন্নপূর্ণা’র অসহনীয় দারিদ্র কিংবা পিঙ্গলাবৎ’ গল্পের ‘বিরাজী’ চরিত্রটি। আঙুরী যখন বিরাজীকে বলে, তোমার বর কখনো চিঠি লিখেছে, তখন কমলকুমারের বর্ণনায়— “বিরাজী একথায় বিস্মিত হইল, তাহার যে চক্ষু আছে এবং তাহা স্ফীত হয়, এখন তাহা বুঝা গেল। তাহার দেহ হইতে নিদ্রার ভূত ছাড়িয়া গেল। সে নিজের বিশীর্ণ বক্ষদ্বয় চাপিয়া ধরিল। জীবনের পরিহাস কাহার জন্য কোথায় লুকাইয়া আছে, তাহা কে জানে, বিরাজীর বুকের মধ্যে বাছুর ছোটাছুটি করিতে লাগিল, তাহার শুষ্ক রুক্ষ সন্ন্যাসীর জটার মত চক্ষু বাহিয়া জল গড়াইয়া আসিল। … বিরাজী শতচ্ছিন্ন আঁচলটি তুলিয়া চোখের জল মুছিতে গিয়া স্থির করিয়া কহিল— ‘আমার বিটি ছানা গো’ তাহার ঠোঁট কাঁপিতে লাগিত তাহার দৃষ্টিস্থির নিশ্বাস রুদ্ধ হইল সে সুষুপ্তি অন্তর্হিত হইল।
আঙুরী যেনবা তাহার সহিত গলা মিলাইয়া সেই কথা বলিয়াছিল। সত্যই মেয়েরা অসহায়। কে তাহাদের খবর করিবে? জন্তুটা যখন জন্তু তাহারও তো রক্ত আছে? সে যখন খায়। স্ত্রীলোক যখন বিছানায়। তাহাদের কে আপনার ভাবিবে? এক রোগ ছাড়া। আঙুরী দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিল। ক্ষোভে দুঃখে নিজের পেটে একটি ঘুঁসি মারিল। বিরাজী যেন নিজেকে সামলাইতে পারিতেছিল না, সে কোন মতে দ্রুত পদে ঘরখানিতে ঢুকিয়া একটি গভীর নিশ্বাস লইল। সে এখানকার নিঃশ্বাস লইয়া এখানে ঘুমায়।” এইভাবে কোনো কোনো গল্পে প্রাগাধুনিক ভারতবর্ষের সামন্ততান্ত্রিক অন্ধকারে নারীর অসহায় অবস্থান, নিদারুণ অসম্মান-অত্যাচারের কথা লিপিবদ্ধ করে রেখে যান তিনি! তমসাচ্ছন্ন জমিদারি ব্যবস্থা-বাবু কালচার-সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি নিয়ে অনেক পরের দিকে লেখা একটি খুব উল্লেখযোগ্য গল্প ‘বাবু’, যেখানে ভাষা-গদ্য ব্যবহারে কমলকুমার অনেক সহজ সুবোধ্য।
আমার খুবই প্রিয় একটি গল্প ‘প্রিনসেস’, এ গল্পেও কমলকুমার একইসঙ্গে প্রত্যাখান করেন সামন্ততান্ত্রিক অন্ধকার ও ঔপনিবেশিক আধুনিকতা। পলাতক কমিউনিস্ট কর্মী দেবকুমার ও দেশীয় রাজ্যের এক রাজকুমারী ঘটনাচক্রে একটি প্রথম শ্রেণির কামরায় রেলযাত্রা করছে, টুকরো টুকরো সংলাপ-ঘটনা মতামত বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তাদের ভালোবাসা হল, মন ছুঁয়ে যাওয়া এই গল্পেও কমিউনিস্ট কর্মীর মুখ দিয়েই মার্কসীয় সাম্যবাদকে আবহমানকালের হিন্দুত্ব-সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটেই উপস্থাপন করান। দেবকুমার কমিউনিস্ট শুনে যখন রাজকুমারী হিংস্র হয়ে উঠল, সেই অংশটি, একটু বড় উদ্ধৃতি হয়ে গেলেও, পাঠকের সামনে উপস্থিত করার লোভ সামলানো গেল না!
“দেবকুমার বুঝিয়ে দেওয়ার সুরে বললে, বেশ তুমি ভেবে দেখ, আমরা সবাই সমান হবো, এতে তোমার কি আপত্তি থাকতে পারে?
ঝাঁঝালো সুরে বললে, এক হবো মানে ?
— এক হবো… হ্যাঁ, এক হবো, খাওয়ায় দাওয়ায়, আচারে ব্যবহারে, বেশে বাসে, প্রতি মুহূর্ত্তে মুহূর্ত্তে, অণুতে অণুতে আমরা এক হবো— প্রকটিত হয়ে উঠবে তোমার আমার সম্বন্ধ, মানুষে মানুষে সম্বন্ধ, চিরকালের, চিরদিনের, আজকের, এই সময়ের। ভবিষ্যতের মানুষের কাছে আমরা তাদের লজ্জার কারণ হবো না। চণ্ডীদাসের বইখানা তুলে বললে, এই কবি বলেছেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’–– তোমার আমার সম্বন্ধ সত্য।
–- তুমি ভগবান মান ?
–- লক্ষবার মানি…
–- আমি মানি না।
— তুমি ভগবান মান না ? … beast!
-– হতে পারে… কিন্তু আমি মানি না। তোমাদের জীবনের পক্ষে God is good logic no doubt!
— তুমি… তারপর নিজেকে জয় করে বললে, তুমি ভুলে যাচ্ছ যে তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ।
— জানি, মানি তুমি রাজকন্যা। কিন্তু এ কথাত আমি বলছি, গরীবরা বলছে, মুমূর্ষুরা বলছে, না হলে, দাসীটাও যা তুমিও তাই, আমিও তাই, আমরা মানুষ। যদি ভগবানকে সত্যই মানতে তা হলে আমাকে, একে দূরে ঠেলতে পারতে না। কারণ আমরা সবাই সেই অমৃতের সন্তান ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ… তুমি তো মস্ত নাস্তিক! মস্ত অহিন্দু!
–– এত বড় স্পর্ধা তোমার! তুমি আমায় অহিন্দু নাস্তিক বলছো ?
— ভুলে যেওনা, হিন্দুর ধর্ম, তার কর্তব্যসীমা, সীমাবদ্ধ আত্মসুখের নয়— বৃহত্তর সম্ভাবনার দিকে তার লক্ষ্য; ব্যক্তিগত সীমার বাইরে, একত্বর অনুভবে, তার মন্ত্র সর্বভূতে ভগবান; নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ায় তার আত্মসুখ তার আনন্দ —
—তুমি যাও তোমার কথা আমি শুনতে চাই না।
ঠোঁট তার কাঁপতে লাগল রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে; হেরে যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণায় বললে, যাও তোমার নিজের জায়গায়। …প্রচণ্ডভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে, ব্যঙ্গের ভঙ্গিতে বললে, ওই দুর্গন্ধময় জামা পরে, কুঁড়ে ঘরে থাকবো আমি — ষ্টেটের প্রিনসেস্।
— মিথ্যা তোমার অহঙ্কার, যে টাকা তুমি জমিয়েছ তাতে সবাই ভাল পরবে ভাল খাবে। মানুষের প্রয়োজনের অধিক এককণা যদি কেউ বাঁধে তাকে বলব চোর। তুমি কি দেখতে পারো, সহ্য করতে পারো, অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আমি আত্মাহীন, পথে পথে ঘুরছি! দেখতে পারো?
– না…
– দেখতে পারো সবাইকে ?
– হ্যাঁ… বলেই মনে পড়লো এর আগে সে তো বলেছে “না”– সে কি প্রকাশ করে ফেলল, নিজেকে? বিধর্মীর কাছে। লজ্জিত হয়ে বললে, এতো তোমার কথা নয়। বিদেশের কথা, তুমি —
–– বিদেশের কথা নয়, আমার কথা, বেদের কথা বলে উদাত্ত ধ্যান-গম্ভীর স্বরে আবৃত্তি করতে লাগলো, সংগচ্ছধবং সংবদধবং সংবোমনাং সিজনাতাং। দেবভগং যথাপূৰ্বে সংজানানাহউপাসতে।। সমানোমন্ত্রঃ সমিতি সমানা নবোহবিষা জুহামি, সমনী বহ আকৃতি সমানাহৃদয়ানিবঃ, সমানন্ত বো মনোযথাবঃ সুহাসতি।।” এভাবেই কমলকুমার একটু একটু করে তার বীক্ষাভূমিতে দাঁড় করান পাঠককে। আধুনিকতার আগ্রাসনে সরলতা-বিস্ময়-বিশ্বাস-ঐতিহ্য-প্রকৃতির সংকট ও দ্বন্দ্ব, মানবিক মূল্যবোধের বিনাশ ও তা থেকে পরিত্রাণের সংগ্রাম। কমলকুমার এমন এক লেখক যার গল্প নানা দিক থেকে আলোচনা সম্ভব। আর একটি গল্পের কথা উল্লেখ করেই আলোচনা শেষ করব, গল্পটি হল ‘বাগান পরিধি’। ‘সুহাসিনীর পমেটম’ উপন্যাসে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা প্রত্যাখানের সূত্র ধরেই ‘সুন্দর কী’ এই অনুসন্ধান করেছিলেন দেশজ ভাবধারায়, কারণ ‘সুন্দর’ তো দেশ-কাল-সভ্যতা-দর্শন-ব্যক্তিরুচি ভেদে ভিন্ন, এক দেশে যা সুন্দর বলে মান্য হয় অন্যদেশে তা নাও হতে পারে, ধর্ম-জাতি-শিক্ষাভেদে সৌন্দর্যের নানা উপলব্ধি-অনুভব সম্ভব। সেই অনুসন্ধানের একটি ঝলক খুঁজে পাওয়া যায় ‘বাগান পরিধি’ গল্পে। এক রমণী একদা স্বামী-সন্তান সহ সংসারে ছিলেন, তখন তাকে এক যুবক পাশের বাড়ি থেকে লুকিয়ে দেখতেন, পরে সেই রমণী অভাব দারিদ্রের তাড়নার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কোনো বড়লোক পুরুষবন্ধুর আশ্রয়ে আছেন, তিনি নিজেকে অপরূপ সুন্দরী মনে করেন এবং কোন এক অনুষ্ঠানে সেই যুবকটির সঙ্গে দেখা হয়, তারা একসঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় বসলেন, আলাপ শুরু হল, পুরোনো কথা– সেই লুকিয়ে দেখার কথা উঠল, রমণীটি ভাবছেন তার দৈহিক রূপলাবণ্য সৌন্দর্যে বুঝি মুগ্ধ পুরুষটি, “…যুবক মৃদুহাস্যে কহিল, বিলাত হইতে প্রত্যাবর্তনের পর যদিও জানি পিসেমহাশয় তাহার অংশ আমি থাকার মধ্যেই বিক্রয় করিয়াছিলেন অন্য শরিকের কাছে। সেই শরিকের বাড়ি যাইতে ইচ্ছা হয় কিন্তু… আমার ভারী ভালো লাগিত। এখানে রমনী স্বীয় হাতব্যাগ খুলিয়া ছোট আয়না সেই গোপনতার অধিকারিণীকে একবার নেহারিতে সুদারুণ উদ্দীপনা দেখা দিল, প্রকাশ্যে বলিলেন বাবা, বলেন কি? আমি এমন কি… বলিয়া কপট হায়াতে নিজেকে ধিক্কারিয়া অন্য দিকে মুখ ফিরাইলেন। এমন বুঝাইলেন যে তাঁহার জাতজমন মান সম্ভ্রম ধ্বংস হইয়াছে।”
কিন্তু যুবকটি জানান রমণীর রূপলাবণ্য নয় তাদের জীবনযাত্রা দেখতেন তিনি, রমণীটি আহত হলেন শুনে, কিন্তু যুবকটি বলে চলে, “সবথেকে আমার কোন ব্যাপারটা খুব ভালো লাগিয়াছিল জানেন, অবশ্য যদি আজ্ঞা দেন তো বলি, একটু থামিয়া যুবক কহিল, সে দৃশ্য! আঃ!
আপনার স্বামী অফিস যাইবার সময় খাওয়ার পর আপনি বারান্দায় কোলে শিশু; হঠাৎ একটু ঘুরিয়া দাঁড়াইলেন, তিনি বেশ করিয়া মুখ মুছিতেছিলেন। আমি ধন্য কি সুন্দর সুন্দর! কত যে বলিতে পারি ইহার জন্য মনে করিতে হয় না, আপনি, আপনার স্বামী, ছেলে-মেয়ে। আমি বুঝাইতে পারিব না। অদ্ভুত এক আনন্দের স্তরে লইয়া গিয়াছে মাঝে মাঝে আমি আহা বলিয়া উঠি।”
কমলকুমারের সৌন্দর্য-চেতনার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত সরল জীবনযাপন, মায়া-মমতা-স্নেহ এবং পারস্পরিক বিশ্বাস, যে মায়া-মমতা-বিশ্বাসই দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী আধুনিকতাকে তিনি সমর্থন করেননি। মানবীবিদ্যার দিক থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গির হয়তো অন্যরকম সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু কমলকুমার বারে বারে তাঁর গল্পে নারীর চিরাচরিত স্বামী-সন্তান নিয়ে কল্যাণময়ী স্নেহময়ী গৃহকত্রীর ভূমিকায় দেখতে চেয়েছেন। আগেই উল্লেখ করেছি সংসারে নারীর অবমাননা তার নজর এড়ায়নি। কিন্তু সার্বিকভাবে পাশ্চাত্য আধুনিকতার স্পর্শে কল্যাণময়ী স্নেহময়ী রূপটি থেকে নারীর নির্বাসন তিনি মেনে নিতে পারেন নি, তার কারণও ওই তার দেশজ ভাবাদর্শ।
একবিংশ শতকের দ্বিতীয় শতকে সেই ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, উত্তর আধুনিকতার গ্রাস আরও সর্বব্যাপী, ভয়ানক! প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট করে ধ্বংসের কিনারায় মানব সমাজ। সমষ্টিজীবন থেকে বহুদূরে আমরা ক্রমশ আরও একলা, নিঃসঙ্গ, রিক্ত! পণ্যপৃথিবীর যান্ত্রিক যুক্তিশাসনের কারাগারে বন্দি আমাদের কান্না আর দীর্ঘশ্বাস। সেও এখন পণ্য?
তাই কমলকুমার আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এখন। অন্ধ বিশ্বাস নয়, কিন্তু প্রকৃতি-লগ্নতা আর সমষ্টিজীবনের উষ্ণতা থেকে আসা গভীর মানবিক মূল্যবোধের বিশ্বাস-সরলতা-বিস্ময়-মমতা ছাড়া কি মানুষ বাঁচতে পারবে?
কমলকুমারের মতোই উচ্চারণ করতে ইচ্ছে হয়, আমাদের প্রকৃতির করিয়া রাখিয়ো!
সূত্র নির্দেশ:
[গল্পের সব উদ্ধৃতি, গল্পসমগ্র, কমলকুমার মজুমদার, আনন্দ, জুন, ২০১৪]
১. ‘পরিপ্রেক্ষিত’, অগ্রন্থিত কমলকুমার, অবভাস, ডিসেম্বর, ২০১১, পৃ.-১৫
২. দয়াময়ী মজুমদার, ‘যে মায়া রহিয়া গেল’, আমার স্বামী কমলকুমার, আদম, জানুয়ারি, ২০১২, পৃ.-৭৩।
৩, দয়াময়ী মজুমদার, ‘আমাদের কথা’, আমার স্বামী কমলকুমার, আদম, জানুয়ারি, ২০১২, পৃ.-২৯।
৪. ‘দিনলিপি’, অগ্রন্থিত কমলকুমার মজুমদার, অবভাস, ডিসেম্বর, ২০১১, পৃ.-২৬।