সোমনাথ ঘোষাল-এর গল্প

Spread This
সোমনাথ ঘোষাল

সোমনাথ ঘোষাল

মাথা   

মনজিত কুণ্ডু বাঘে নিল মুণ্ডু কাকে নিল ঠ্যাং ড্যাডং ড্যাডং ড্যাং…
মনজিত হাঁটতে থাকে একটা রাস্তার আড়াআড়ি। ঝিমোনো দোকানগুলোতে দেখতে থাকে, একটা ভালো মাথা। সস্তায় যদি একটা ভালো মাথা পাওয়া যায়! মনজিত জানে ওর মাথাটা খুব একটা কাজের নয়। দেখতেও কেমন যেন! আয়নার সামনে নিজেকে মাথা ছাড়াই ভাবে।
ইতিহাস স্যার একবার, একশোতে সাড়ে ছয় পাওয়ার পর সবার সামনে বলেছিল, মাথাটা কেটে ফেল। এই মাথা রাখিস না। হাসির রোলকল হয়। মনজিতও হাসছিল। ভুল বলেননি স্যার! কণিষ্ক’র স্কন্ধকাটা ছবি দেখিয়ে স্যার বলেছিলেন, উনি সম্রাট ছিলেন। তুই মাথা কাটা মুণ্ডু…
গতমাসে কাজটা গেছে। বইয়ের দোকানের। সাত হাজার টাকা মাইনে। সেখানেও সবাই মাথামোটা বলত। মনজিত জানে, ওর জন্য বইপত্তর নয়। বই মাথায় করে বইতে ভালোবাসে। নামিদামি লেখক সাহিত্যিক এলে, চা, মিষ্টি, শিঙাড়া এনে দিত। সেই ফাঁকে, হাঁ করে মাছি গেলার মতন কঠিন কঠিন কথা গিলে নিত।
এই সমস্ত কথাগুলো মাথায় তুলে মনজিত দোকান ফেরত, গড়ের মাঠে বাদাম খেতে খেতে ভাবত, একটা দামি মাথা খুব দরকার। বাবা কোনোমতে একটা সরকারি চাকরি জুটিয়েছিল। মনজিত একবার বাবার সঙ্গে অফিসের বড়বাবুর কাছে যায়। মাধ্যমিক পাশ করে। বড়বাবু মজা করেই একটা অঙ্ক দিয়ে বলেন, এটা করে দেখাও তো খোকা। ওর ঘাবড়ে গিয়ে প্রায় পেন ভেঙে ফেলার অবস্থা। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ঘামতে থাকে। তোতলায়। বড়বাবু হেসে বাবাকে বলেন, আরে কুণ্ডু তোমার ছেলের তো দেখছি মুণ্ডুই নেই কাজ করবে কী করে…
মনজিত বাদামের খোসা ওড়াতে থাকে। রোজ রাত করে একটা খেলনাওলা আসে চা খেতে। আর মাঝে মধ্যে শিউলি আসে। মেয়ে সেজে। মনজিতকে খেলনাওলা চেনে দুবছর। শেয়ালদা থেকে শেষ ট্রেনে বাড়ি ফিরে যায়। আর ধর্মতলা থেকে হাঁটতে হাঁটতে বউবাজার। খেলনাওলাকে অনেকদিন ধরেই বলে রেখেছে একটা ভালো দেখে চাইনিজ মাথা দিতে। কারণ চাইনিজ মাল বাজারে খুব চলে। খেলনাওলাও বিড়ি খেতে খেতে রোজ বলে, হ্যাঁ অডার দিয়েছি। মাথা এলো বলে। মনজিত মাথার অপেক্ষা করতে থাকে। যদি মাথাটা পালটানো যায়! এর আগে তিন চারটে ডাক্তারের কাছে গেছিল। তারা সবাই বললো মাথার ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু মাথা পালটানো যাবে না! ওটা নাকি মনের অসুখ। মনের মাথা ঠিক হলেই আসল মাথা ঠিক হবে। ওষুধও খেলো। কিন্তু কাজ হয়নি। শিউলি বলে, মেয়ে সেজে থাকতে মাথা লাগবে না। পেছন লাগিয়ে মাথায় টাকা আসবে। মনজিত বুঝতে পারে না। বলে, ওসব পোঁদের কথা বোলো না! শিউলি বলে, তুই বাল। গান্ডু মাথা। তোমার দাঁড়ায় না। তোমার বাল হবে। শিউলি একবার ঝোপের আড়ালে কচলে দিয়েছিল। মনজিত পঞ্চাশ টাকা দেয়। সেই একবার। শিউলির অনেকগুলো মাথা ধরা আছে। রোজ টাকা আসে সেইসব মাথা থেকে।
মনজিত মাঝরাতে ল্যাম্পপোস্টের আলোতে নিজের মাথায় হাত বোলায়। এখন কোনোরকমে সামান্য যেটুকু বাবার টাকা আছে সেটা দিয়েই চলে। ভাগের বাড়িতে দুটো ঘর পেয়েছে। কিন্তু সেই বাড়িতে থাকা যায় না। ঢুকলেই পেচ্ছাপের গন্ধ। স্যাঁতস্যাঁতে। বর্ষায় আরও পচে গেছে বাড়িটা। সারাদিন বাড়িতে খিস্তি। গতবছর মা’ও মরে গেল। এখন মনজিত একাই। বইয়ের মালিক গতমাস থেকে আসতে মানা করেছে। আগে তবুও কলেজ স্ট্রিট থেকে গড়ের মাঠ ছিল। এখন তাও নেই।
কিছুদিন আগে ভিড় ট্রেনে পা পিছলে খেলনাওলা তার মাথাটা হারিয়েছে। সেইসব চাইনিজ খেলনায় নাকি রক্ত মাখামাখি ছিল। শিউলি ঝোপের ভেতর থেকে হাসতে হাসতে বললো। আজকে অনেকদিন পর মনজিত সেই খেনলাওলার খোঁজে এসেছিল। দুপুরে ডাল ভাত আর ডিম সেদ্ধ খেয়ে, পাঁচ টাকার বাদাম নিয়ে হাঁটতে শুরু করে গড়ের মাঠের দিকে। ঠিক সন্ধের মুখে, শিউলি ধরা মাথা নিয়ে ঝোপের আড়ালে যায়। মনজিত তখন একটু জোরেই বলে, খেলনাওলা কি এখন আসছে? শিউলির উত্তরে, মনজিত বুঝতে পারে না, কী বলবে! হাসিও পায় না। সম্রাট কণিষ্কের মতন কাটা মাথা খেলনাওলারও ভাবতে পারে না… মাঠের মাঝখানে বসে থাকে। অনেকেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। তাদের মাথা নিয়ে। মনজিত ভাবে, তার আর মাথা পাওয়া হল না! শিউলি কাজ সেরে এসে বলে, শোন চাপ নিস না। তোর জন্য ভালো মাথা আমি জোগাড় করে দেব। আমার কাছে আরও অনেক মাথা আছে। যারা মাথা কিনে দিতে পারে। তুই চল আমার সঙ্গে। মনজিত বলে, আমার কাজ চলে গেছে। টাকা নেই। শিউলি হাত চিপে বলে টাকা আমি দেব। তুই চল। মনজিত ছিটকে বেরিয়ে দৌড়োতে থাকে। শিউলির কাঁচা খিস্তি আস্তে আস্তে কানে হালকা হয়ে আসে। ধর্মতলার মোড়ে এসে হাঁপায়। রাত প্রায় দশটা। বন্ধ শহরে কেউ নেই। পাগল, ভিখারি, কুকুর আর পুলিশ ছাড়া।
মনজিত সোজা সেন্ট্রাল এভিনিউ ধরে এগিয়ে যায়। মাথার ভেতর চলতে থাকে সমস্ত অতীতের জামাকাপড়। চেনা মুখ। অনেকটা দূরে ঝাপসা হয়ে আসে। একটা বাচ্চা ছেলে সে তার মাথা নিয়ে মনে হয় খেলছে। ফুটপাতে। সঙ্গে অনেকগুলো খেলনা! মনজিত গতি বাড়ায়। সামনে গিয়ে দেখতে পায় ওরই মাথা নিয়ে বাচ্চাটা খেলা করছে… মনজিত হাসতে থাকে। পকেট থেকে একটা দশ টাকার কয়েন বের করে মনজিতের মাথার পাশে রাখে। তারপর হাসতে হাসতে বাড়ির গলিতে ঢুকে মানি ব্যাগ থেকে নিজের ছবিটা দেখার জন্য বের করে। দেখে মাথাটা নেই!