ফুয়াদ হাসান-এর কবিতা

Spread This
ফুয়াদ হাসান

ফুয়াদ হাসান

হলুদ টিকিট 

টিকিট ছাড়া উঠে গেলাম দৌড়ানো ট্রেনে
টিটি এলে এ বগি থেকে ও-কামরা ঘুরি
টয়লেটের পাশে যে খালি সিট রয়েছে
বসতে চাই না তাতে, ঘুম চলে আসলে
 
ফতেপুর এলে যাকে ডেকে দিতে বলেছিল,
ঘাড়ে মাথা রেখে আমার, কী শান্তিঘুম তাঁর
ইচ্ছে হলো না জাগাতে, স্টপেজ পেরিয়ে যায়
জানালায় শ্রাবণরাগিনী গুলাম আলী খাঁর!
 
আমি যে ট্রেনে 
কাটা পড়ার 
অপেক্ষায়, 
সে আসবে না
 
পাহাড়ের শেষ চেকপোস্টে ঐ ত্রিপুরা ছেলেটিকে
নামিয়ে সন্ধ্যার আরো গভীরে ছুটেছে সেনাদল।
বাইরে কুয়াশা, মেয়েটির হাতে চেককালো মাফলার 
চাইলেই জানালা দিয়ে ডেকে দিয়ে দিতে পারতো!
 
হাতঘড়ি স্লো,পালিয়েছে ট্রেন।
টিকিটঘরে বসে ভাবছি
এ মুহূর্তে মৃত্যু হলেও
পাঁচটা মিনিট হাতে থাকবে!
 
কোন তাড়া নেই, সোনার বাংলা ছেড়ে চলে গেলে
উঠে যাব কোন লোকাল বগিতে, যখন ইচ্ছে
সে গন্তব্যে পৌঁছাক অথবা ঠায় বসে থাক
কস্মিনকালে না পৌঁছালে খুব বেশি ক্ষতি নেই
 
অচেনা লোকটি থেকে পানি চেয়ে কুলকুচি শেষে
পাশের যাত্রীকে জানালা বন্ধ করুন, যা ধুলোবালি  
আর কারো দেশলাইয়ে ধরিয়ে সিগারেট, ডুবে 
গেলেন পেছনসিট থেকে ধার করা পত্রিকাখোলসে 
 
কিছু শেখায়নি এ কলাভবন, ক্লাসঘর, সেমিনার
পিয়ানোর সুর বোনা সারি সারি অপাঠ্য বইয়েরা
 
ঝুপড়িঘরে জলকাদা-চা বৃষ্টিমাখা বান্ধবিরা নিয়ে
অলস অজগরের মত চলে গেল ভার্সিটি এক্সপ্রেস
 
রেলসড়কের পাশে লাইনধরা বস্তিজন–দিনের 
আলো থাকতে সবকাজ সেরে নেয়, নৈশভোজও।
শীতের রাতগুলো বড় দীর্ঘ, নিশাচর ট্রেন চিৎকারে 
ঘুম ভেঙে গেলে, সঙ্গম ছাড়া নেই কোন বিনোদন।
 
পাতাবিছানো পথ, সামনে পিছনে নিচে উপরে নানা 
রঙের পাতা না তেজপাতা লাল-খয়েরি-ছাই! চালক 
কিছু দেখতে না পেয়ে গান চালিয়ে দিয়ে নেমে গেলেন। 
পথশিশুরা পাতাপাহাড় গড়ে লাগিয়ে দেয় আগুন। 
 
ডেমো মোটেও ভালো লাগে না, কল্পনার ট্রেনের সাথে 
ভীষণতর অমিল তার ; একে তো কম কামরা, ভাড়া 
চরম, দ্রুত এগোয়… আগেভাগে অফিস পৌঁছালে তবে
আজকাল যে কেউই কিছু খারাপ মনে করতে পারে!
 
শিরা-উপশিরা দিয়ে ট্রেন দ্রুতলয়ে চলে যায়
কোথাও থামে না, কোন স্টেশন নেই জংশন, 
প্লাটফর্ম, কুলি, যাত্রীছাউনি, টিকিট চেকার
 
মগজে বাজছে কুহু ঝিকঝিক ধ্বনির তেহাই
 
অপু-দূর্গারূপে কেউ আর ছুটে আসবে না
দূরদেশী ধুলোফুল রেখে ট্রেন ফিরে যায়
অপেক্ষায় না থাকুক, একজন দিগম্বর
উন্মাদ পাহারা দেয় প্লাটফর্ম নিশিদিশি 
 
কবরনিশীথ এক্সপ্রেসে যারা ওঠে তারা আর
কোনদিকে তাকায় না। জানালার বাইরে কে আজ 
বৃষ্টিসজল, কারা এলো মেঘাস্পদ বিদায়
জানাতে বা আসলো না,তাতে কিছু যায় আসবে না
 
লাইনধরা কফিনসারি মনেহচ্ছে বগিগুচ্ছ।
কোন একটি দুর্ঘটনা তাদের একসুতায় গেঁথে 
নিয়েছে, সেনাদল সেলুট শেষে ঐ বগিসমগ্রকে 
নিয়ে যাচ্ছে দূরে আলাদা আলাদা এক গন্তব্যে
 
কড়িপোকাটি আটকে গিয়েছিল; চলন্ত গাড়ি থেকে 
কোনভাবে নামতে পারছে না। একটিবার জানলার ভাঙা 
ফ্রেমে আবার যাত্রী লাগেজে, সিলিঙ-ফ্যানে তো পাঁজরপকেটে,ওড়নার ভাঁজে। যেভাবে হোক, সে কিন্তু নামবে।
 
রেলওয়ে হাইস্কুলের সামনে প্রীতিলতার আবক্ষ 
ম্যুরাল, এক্ষণ ফেটে পড়বে চেতনা-আগুনে যেন
দৃষ্টির রাইফেল তাক করে আছে ইউরোপিয়ান 
ক্লাবে,বুঝি আচমকা চালাবে গুলি কিন্তু বল কাকে!
 
হিপহপ শুনতে-শুনতে ট্রেনকেই চাপা দিয়েছিল সে
বিচ্ছিন্ন মাথা থেকে খসেনি হেডফোন, মিউজিকও 
বেশ বেজে চলেছে, কত্থক নাচের মূদ্রায় ঝরছে 
রক্ত–মৃদুলয়ে, বামপাশের কানটির দুদিক বেয়ে।
 
ষোলশহর জংশন ফেলে কতবার বটতলী স্টেশন
চলে গেছি তোমার আরেকটু সঙ্গ পেতে, ভার্সিটি ফেরত
সান্ধ্যট্রেনে অন্ধকার ঘন হলে যদি একা কাছে আসা
যেত! এ দীর্ঘ দাম্পত্যে সত্যি বলতে আসতে পারিনি একচুলও। 
 
রেললাইন যেখানে শেষ হয়ে গেছে, দীর্ঘসময় পড়ে
রয়েছে অচল বগি, সামান্য দূরে মধ্যদুপুরে ভাঙা 
চৌকাঠে বসে পাঁচঘুঁটি খেলছে স্কুল বয়েসি মেয়েরা 
তাদের একজনের বিয়ে কাল, হাতদু’খানা মেহেদি রাঙা
 
দুর্ঘটনায় নিহতজন ক্ষতিপূরণ বাবদ দশহাজার টাকা
পাবে পকেটে যদি টিকিট থাকে–ব্রিটিশ রেলআইনে, আর বিচ্ছিন্ন
দেহের মত ছেঁড়া পকেটে দুর্গন্ধময় গোলাপরক্ত ছাড়া কিচ্ছুটি
না থাকে, তবে! ইংরেজরা কতকিছুই না শিখিয়েছে আমাদেরকে 
 
এমন ঝিরিঝিরি বৃষ্টিকুয়াশায় এখন আর দেখা যাচ্ছে না কিছুই, আধকাটা পাহাড়, রেলিঙভাঙা সেতু, নিচের মরাজল, কারখানার ধোঁয়া
চিলেকোঠার ছাদে ভেজা শাড়ি, ময়লা কাগজ কার্নিশে, টবে মানিপ্ল্যান্ট,
রেলের শব্দে যে ছেলেটা প্রতিদিন দৌড়ে বেলকনিতে চলে আসে–তাকেও। 
 
প্রতিবার দেখা হতো, নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে উঠত,
যেত সব কম্পার্টমেন্টে, মেয়ের বিয়ের জন্যে টাকা
চাইতো–কাতর ভঙ্গিতে। বহুদিন আগের ঘটনা…
কী-বল, এখনও আসে, আজো বিয়ে হয়নি মেয়েটির!
 
বুঝেছি,পিঁপড়েদের দেখেই তোমরা রেলগাড়ি বানিয়েছ?
যাত্রিক কেউ মালবাহী, দ্রুতগামী সামনের জন তবে
ইঞ্জিনগাড়ি! কী সহজে পথ বন বাদাড় ডিঙিয়ে চলে
যায় পাহাড়ি ঢেরায়, তোমাদের ট্রেন এখনও যা পারেনি।
 
লম্বা শুঁড়অলা এমনই কোন এক লাল কাঁকড়াবিছে বেডকভারে আঙুল নামক বুলেটট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়ছিল। উঠে যাচ্ছে বালিশের পাহাড়ে তো নেমে পড়ছে পিষ্ট ম্যাট্রেসের গহীনে–কেমন নির্ভীক, অবিচল মেরুদণ্ডপথ বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, নাকের সুড়ঙ্গে,কানের গর্তে, আবার উরুর ভ্রুতে, পায়ুপথের মথে।
 
ইস্টিশান পৌঁছানোর পূর্বেই কলাগাছের টা-টা জানিয়ে বিদায়
নিচ্ছে ট্রেন, তাকে বেমালুম পিঠ দেখিয়ে আমিও ফিরে আসি বাড়ি
ঘাম মুছে ফেলি মায়ের আঁচলে, বুবু মহাখুশি, বাবা মৃদু হাসে, প্রত্যাবর্তনের কোন লজ্জা নেই, অস্থির কোকিলা ডাকে আশেপাশে।
 
লোকোমাস্টার হতে চেয়েছিল আজ বনগাঁর স্কুল মাস্টার,
স্টেশন পৌঁছানোর পূর্বেই ট্রেন ছেড়ে গেল ট্রান্সলেশনটা
ছাত্রদেরকে কর দেখি বলে তাকিয়ে রয়েছে মাঠ ফেলে দূরে
চলিষ্ণু রেলগাড়িটির দিকে যতক্ষণ না কুয়াশায় মিশে 
 
বাসে চড়লে মায়ের বমি হতো। ট্রেন ছিল আমাদের
নিঃসঙ্গ যাত্রাসঙ্গী। বাড়িতে গেছি  নিয়মিত
ভাইবোনসহ, ফিরেছি শহরে। মাঝপথে নেমে একা
বাঁশি কিনতে হারিয়ে গিয়েছিলাম, ঐ একটিবারই।
 
ভৈরব নদ পার হতে সুর বাজে ভৈরবী 
ফিরতি আবেগে মীড় হয়ে ওঠে আশাবরী
তারারা জ্বললে উদারাও তারা মেঘমল্লার
কত রাগ জানে রেলঅনুরাগ বেহাগ সেতার
 
ফেলে যাচ্ছি পাহাড়ি নদী ধূসর মাঠ গ্রাম ও শহর
দোচালা ঘর পেয়ারা গাছ ফেলে যাচ্ছি চেনা কবর
ছিঁড়ে যাচ্ছি কাঁটাতারের বেড়া পথও যেখানে শেষ  
আর ফিরবো না কোনদিন ছেড়ে যাচ্ছি প্রিয় স্বদেশ
 
রেল কি জেল না কনডেমন্ড সেল, হাতকড়া লাগানো
দুপাশে পুলিশ আর তাদের খোচর, রাতজাগা
বাতি মনে হবে চর! বাকি যাত্রীরা সংশয় নিয়ে
তাকিয়ে, লোকটিও বুঝি তাদের সন্দেহ করছে আজ! 
 
সব ঘরে একজন করে ঘরছাড়া থাকে
সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে বাঁচতে চায়
তারপরও পারে ভুলতে যন্ত্রণাকে
একাকী কী মনে করে শেষ ট্রেনে উঠে যায়
 
সত্যি, খুব একটা তাড়া নেই আমার
অচেনা লোক, তুমি চাইলে বলতে পার
জীবনের গতানুগতিক দুঃখকথা
যদিও সব আগে বলেছ অনেককেই 
 
চলতে শুরু করলে আমার ভেতর থেকেও বের হয়ে 
আসে একটি দানব–স্থুল, ক্রূর, কুৎসিত মাঝে মধ্যে
ভাবি, সে-ই তবে লুপ্ত হওয়া আলাদিনের দৈত্য, 
 
লোকাল ট্রেনের ভোঁসভাস শব্দে বারবার বাচ্চার ঘুম ভেঙে যায়
 
বিশ্বইস্তেমার আখেরি মোনাজাত শেষে লোকজন
ফিরছে তুরাগ প্রান্ত থেকে। কামরা-দরজা-জানালা ছাদ
ইঞ্জিন খালি নেই, টুপি-কোর্তার সাথে ট্রেনও সাদা;
বৈকুণ্ঠনিবাস জংশন ছাড়া একজনও কি নামবে