পুরোনো মলাট।হিরণ মিত্র- চির-র রাত-দুপুর

Spread This
হিরণ মিত্র

হিরণ মিত্র

চির-র রাত- দুপুর

চির-র অনেক সমস্যা। চির ঘাড়টা নীচু করে, কপালটা টিপে ধরে একটু ঝুঁকে কিছুই না ভেবে চুপচাপ বসে আছে। সবাই ভাবছে চির গভীর চিন্তায় মগ্ন। কিন্তু, না, চির কিছুই ভাবছে না। এই না-ভাবা অবস্থাটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। গভীর ভাবে ভাবনা-শূন্যতায় ভাসমান শরীর। অনেক শব্দ কথা আলো এসে শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। চির কিছুটা দেখছে, কিছু শুনছে, কিছুটা স্পর্শ করছে। কিন্তু বেশ দূর হতে। আর ভাবনার তীব্রতা ক্রমাগত তীর ছাড়াচ্ছে। আস্তে আস্তে তীর দূ—রে চলে যায়। একটা দোলা জলের ঢেউ-এর দোলা খেতে থাকে ভাবনা। শরীরটা স্পর্শ নিয়ে দুলতে দুলতে চলে যাচ্ছে।
                  এ এক অসম্ভব অনুভব।
        চির কতক্ষণ ওইভাবে ছিল জানা নেইকো। হয়তো বেশিক্ষণ নয়। অথবা অনন্ত। এই সময়। এই সময় বোধ। এই সময়ের ছায়া। এই সময় বয়ে যাওয়া। সময়ের মধ্যে আমরা যতি চিহ্নের মতো ক্রমাগত লুকোচুরি খেলে যাই। এদিকে দাঁড়ি পড়ল তো ওই পাঁচিলের ফাঁক হতে একটা কমা উঁকি মারে। সেমিকোলন একটু হতাশ। কারণ তাকে তো প্রায় চুপচাপ স্থির থাকতে হয়। এ-সবের মধ্যে প্রশ্ন চিহ্নটাই বড়ো বেয়াড়া। হাঁ করে থাকে। প্রশ্ন করে। তার পর বোবা চাউনি। কোলন-এর একটু গুঁতিয়ে ঢুকে পড়ার স্বভাব, তাও উপায়ান্তর না দেখে একটু জায়গা দিতেই হয়। এর মধ্যে চির দাঁড়ি নিয়ে দাঁড় টানতে বড়ো ভালোবাসে। কথায় কথায় দাঁড়ি। সময়কে যেন চিজ-এর টুকরোর মতো টুকরো টুকরো করে পরিবেশন করা। এক-একটা টুপটাপ মুখে ফেলে দেওয়া।
                     এবার চির স্নানে যাবে।
        স্নানের ঘরে চির-র মাথার উপর যখন ঝাঁঝরির জল চারিদিক ছড়িয়ে পড়ে, মাথাটা নীচু ক’রে, তখন মনে হয় জলের দানাগুলো অজস্র উল্কাপিণ্ডের মতো দ্রুত ধেয়ে যাচ্ছে কোন্ এক অজানা আকর্ষণে। রাতের বাসে হেডলাইটের আলোর দিকে যেভাবে অজস্র পোকামাকড় ধেয়ে আসে সার্সির দিকে। চির স্নানের কথা ভুলে জলের ফোঁটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জল ঝিরঝিরে শরীরের খাঁজে-খাঁজে ধেয়ে যায়। বুকের লোম জলের বুদ্বুদ ধরে থাকে। এই স্নানের সময় হাত দুটো একটা অদ্ভুত ভঙ্গি ক’রে বেড় পাকাতে পাকাতে পিঠের পেটের তালুতে চেটোয় জল মর্দনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
          চির জলের ধারায় শীতল হয়ে জল ত্যাগ করতে থাকে। ওর মনে পড়ে যায় এর নানা বিড়ম্বনার কথা। যেমন ধরা যাক একটা উঁচু ঢিবির ধারে দাঁড়িয়ে হচ্ছে। ও নীচে দাঁড়িয়ে। জলটা গড়াতে গড়াতে ওরই পায়ে এসে ভেজাতে চাইছে। আর ও ততই লাফিয়ে লাফিয়ে পা সরিয়ে নিয়ে জায়গা পাল্টাচ্ছে। অথবা উঁচু টিলার ধারে দাঁড়িয়ে। এলোমেলো হাওয়া গা-পা ভেজানোর চেষ্টা করছে। তাকে এড়ানোর জন্য বারবার শরীর ঘোরাতে হয়। তার সঙ্গে আড়াল বে-আড়াল হয়ে যায়। অথবা কলেজে দেওয়ালে অক্ষর লেখা, ওর  ছোট ছেলের সাথে মাঝে মাঝে তলোয়ার যুদ্ধ চলে। বাঁকানো জলের ধারা কাটা-কুটিতে মেতে যায় কিছুক্ষণ কমোডের সাদা গহ্বরে।
              এখন আমরা জানতে পারি, চির বিবাহিত। এবং ওর একটা পুত্র সন্তান আছে। যদিও খুবই ছোটো। এই সন্তান ধারণ-এর ব্যাপারটাও ওর কাছে খুবই অদ্ভুত মনে হয়। তার হাবভাব সব ওর সাথে জলজ্যান্ত হেঁটে হেঁটে ফেরে। কারণ ওর ছোটোবেলাটা একটা ধূসর স্বপ্নভাঙা ছবির মতো আধো আলোতে ভরা। কিছু শোনা কথা, কিছু শোনা ছবি। কিন্তু আজকের ঘটনায় ধরা ছবি এসব নিয়ে ওর ওই থেমে যাওয়া বয়স। আজ অ্যাকশন রিপ্লের মতো সামনে ভেসে ওঠে। একটা স্লো মোশন-এ ধরা গতি, আস্তে আস্তে হাত ঘুরিয়ে কোমর বেঁকিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে ঘরে দৌড়ে ছুটে যাচ্ছে। চির তাকিয়ে থাকে।
একটা উত্তপ্ত আঙ্গুল ওর চুলে বিলি কেটে যায়। খিল খিল হাসি, উঃ লাগছে। ছাড়্ ছাড়্। এই, দ্যাখো না। আমায় কোনো কাজ করতে দিচ্ছে না। বেশ হয়েছে। আরও লাই দিয়ে মাথায় তোলো। যত বলি একটু বাবার মতো হও। নাহলে ছেলেরা মানবে কী করে। ওর স্ত্রী ও-ঘর থেকে চেঁচিয়ে যায়। চির ওর মধ্যে হেসে যাচ্ছে। কেমন একটা দুধেলা দুপুর তার নেশা। একটা শৈশব গন্ধ সব ওকে ঘিরে ধরে। তাই শত- অশান্তিতেও ওরই ওই ভঙ্গি কিছুতেই পাল্টায় না।
                   কখন ছেলেটা হুটোপাটিতে ক্লান্ত ঘুমিয়ে পড়ে। আস্তে করে পাঁজাকোলা করে চির ওকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। একটা হাল্কা চাদর ঢেকে দেয়। চাদরের উপর দিয়ে ওর পেলব শরীরটা একটু ছুঁয়ে নেয়।
                  চির-র মশারিটা নৌকোর পালের মতো ফ্যানের হাওয়ায় দুলে যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে একটা তেরছা আলো ওই পালে ঠিকরে ঠিকরে চলে যাচ্ছে। রেমব্রান্টের মতো একপেশে হলুদ আলো ঘরটায় ছবি ধরে রেখেছে। এর মাঝে অন্ধকারে চোখ জ্বলার মতো একটা জোনাকি ঢুকে পড়ে। মশারিতে বসে। বসে উড়তে থাকে। চির সেই বাদাড়ে চলে যায়। যেখানে শত শত জোনাকি চোখ শাকচুন্নীর মতো এলো চুলে পা ছড়িয়ে পুকুরপাড়ে উকুন বেছে যায়। একমনে। অন্ধকার শান্ত দুপুরের মতো। খাওয়ার পর একটা বিশ্রামের মতো। শাকচুন্নীর আজ তেমন কোনো কাজ নেই। ওর কর্তা আজ এ গাঁ ছেড়ে দূরের গাঁয়ে ছেলেপুলেদের ভয় দেখাতে গেছে। কেন যে ওই-সব ও করে। ক’রে যে কী লাভ হয়। এ-সব শাঁকচুন্নি ভেবে যায়। তার চেয়ে দু-চারটে উপকার টুপকার করলেও তো ভূতেদের সুনাম হয়। আসলে ভূত হয়ে যাওয়ার পর ওই সুনামে আর কোনো ভক্তি থাকে না। ওটা জীয়নদের মোহ। মরণে নামই কী আর সুনামই কী। আর ও তো দেখেছে মরার পর পাওনাদার উইল-বঞ্চিত এরাই বেশি কাঁদে। আর সবাই কেমন গদগদ সুখ্যাতি করে যায়। তারপর সব ম’লো। যেমন ওর এখন মনে পড়ল ও যখন বেঁচে ছিল তখন ওর এক বন্ধু একবার বাড়ি-বাড়ি আপিসে আপিসে ফোন করে তার নিজেরই মরার খবর দিতে থাকে: জানো ও না মারা গেছে। আর ও প্রান্ত থেকে শুনে যেত কে কেমন শক পায়, বা নিশ্চিন্ত বোধ করে, যাক, বাঁচা গেল। ব্যাটাটা তা হলে গেছে। এই-সব আর-কি। শাকচুন্নী চিল্লিয়ে ওর পিড়িং-কে ডাকে। দেখে শাঁ শাঁ করে পুকুরের উপর দিয়ে পিড়িং জল না ছুঁয়ে ছুটে আসছে। আসলে ও ওই তাল গাছগুলোর মাথায় দোল খাচ্ছিল। ও ধমকায় পিড়িংকে। বেশ তো তাল গাছের মাথায় পাতাগুলো তালপাতার হাওয়া দিচ্ছে। গাঁ ভরে, তার মধ্যে তুই আবার ওস্তাদি মারতে গেছিস্ কেন রে। তোর কি কোনোদিন আক্কেল হবে না। বলেই ভাবল আরে ওর তো এখনও মনুষ্য স্বভাব গেলো না। আক্কেল? সে তো শক্তটক্ত ব্যাপার যার ওঠে আক্কেল দাঁত। ওদের আবার আদিখ্যেতা কিসের। যাক্ গে, নে, দ্যাখ তো তোর বাবা ভূতটা কোন্ গাঁয়ে গেল। মরেও শান্তি নেই। সংসারটা এখানেও তাড়া করছে।
              চির ভাবে ও যখন মরবে তখন ওর আপিসের বড়বাবুও মরে সেই ফাইল নিয়ে দাঁতখিচিয়ে যাবেন। এখন নয় আপিস ছুটি হয়ে গেলে ফাইল ড্রয়ার-বন্দী করে পালানো যায়। তা মরলে তো আর আপিসের পর ছুটি মিলবে না। অনন্ত আপিস। তার বড়োবাবু মেজোবাবু, ছোটবাবু কর্তারা সবাই মিলে আমার ফাইল আমার ফাইল বলে সারাক্ষণ চেঁচিয়ে যাবে নিশ্চয়ই।
               অ্যাই অ্যাই, কী কী হল, ঘুমের ঘোরে বকছ কেন? ওর স্ত্রী ঠেলা দেয় ওর শরীরে। একটা গোঙানিতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিছু বুঝে উঠতে পারে না। কী স্বপ্ন দেখছিল কে জানে? একটু একটু মনে করার চেষ্টা করে। নাঃ কী একটা আবছা আবছা ভূতুড়ে ছবি এসে মিলিয়ে যায়। ও ঘুম আনার জন্য একশো সংখ্যাটাকে পিছন থেকে গুণতে শুরু করে। মানে একশো, নিরানব্বই, আটানব্বই—এইরকম। এইভাবে আস্তে আস্তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, টের পায় তখনই যখন ও দেখে ও স্বপ্নে জেগে উঠেছে। বাঃ বেশ তো ফুরফুরে চারিদিকটা। কিন্তু শাকচুন্নীটা গেলো কোথায়। আর তার জোনাকি! না ও অন্যপ্রদেশে আছে। ও একটা ছুটন্ত ট্রেনের মধ্যে একা বসে। বাইরে দেখছে জ্যোৎস্নায় মাঠ ধুয়ে আছে। বালতি বালতি জ্যোৎস্নাকে একজন ক্ষেত-খামারগুলোয় ঢেলে ছড়িয়ে দিয়েছে। দিয়ে আবার জ্যোৎস্না দিয়েই নিকিয়ে দিচ্ছে ওই দূরের ক্ষেতের মাঝে স্থির থাকা ওই উঠোন। জ্যোৎস্না-ধোওয়া উঠানের কী বাহার! জ্যোৎস্নায় আঙুল চুবিয়ে আবার আঁক কেটে দেয় নকশার আঁক উঠোনময়। আবেশে ভরা সেই দৃশ্য। একটা কলাগাছ ওই জ্যোৎস্নায় বিধবার মতো মাঝমাঠে মাথা নেড়ে যায়। ধীরে ধীরে। হঠাৎ দেখে চমকে যেতে হয়। চির-র মনে পড়ে যায় ওর এক দেড়েল বন্ধু ছিল যার জ্যোৎস্না-আলোয় চোখ জ্বালা করত। সে কীরে বাবা, জ্যোৎস্নায় কি জ্যোৎস্না-চশমা পরব নাকি? না না, ছাড়্ ও-সব ন্যাকামি। চল্ বেরিয়ে পড়ি। ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’ মার্কা হয় একটু হেঁটে আসি। হাত ধরাধরি ক’রে। এই রকমই একটা রাত্রে একটা আধাপাহাড়ি জ্যোৎস্না রাতে ঝোপঝাড় পাশে রেখে চির আর তার কয়েকজন বন্ধুবান্ধবী হাল্কা দুলকি চালে হেঁটে ফিরছে রাত-বাংলোর দিকে। এমন সময় একটা কোথায় ফেউ ডেকে উঠল। একজন ব’লে ওঠে, ফেউ এর পিছে পিছে বাঘ আসে। ও তাই! গলাটা কি একটু কেঁপে গেল? তবুও মনে বল নিয়ে সবাই হাঁটতে শুরু করল। হয়তো একটু আগের চেয়ে সামান্য দ্রুত। ভয়টা তো পেলে চলবে না। এমন সময় ধুপ করে একটা ভারী কিছুর পড়ার আওয়াজ হল পাশের ঝোপে। আর হঠাৎ একজন কে দেখা গেল তীর বেগে ছুটে আসছে অন্ধকারের মধ্য হতে। আর চেঁচিয়ে বলে, পালাও। তখন কোথায় গেলো জ্যোৎস্নারাতে সবার বনে যাওয়া। কোথায় চোখ জ্বালা ধরা। সবাই দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে সামনে দৌড়াতে থাকে। তার মধ্যে দেখা যায় চির তার বান্ধবীকে ফেলেই দ্রুত লম্বা লম্বা পা ফেলে ছুটে চলেছে। ওটা যে ওর জন্যই ওই নাটক করা হয়েছিল, ও কিছুক্ষণ ছোটার পর একা মাঠের মাঝে টের পায়। সবাই তখন হাসিতে জ্যোৎস্না লুটোয়। তুই এমনি করে ওকে ফেলে পালালি! ওকে যদি বাঘে খেত? অ্যাঁ। তখন চাচা আপন প্রাণ বাঁচা গোছের দৌড়। এইভাবেই কি আমরা সবাই একে ওকে ফেলে আপন-আপনাদের ফেলে ওই ধুপধাপ আওয়াজে একা ছুটে চলেছি? ঘুমের মধ্যে চির ঘেমে ওঠে। পাশে পাশে হাত দিয়ে দিয়ে বুঝে উঠতে চায় আর কেউ আছে কিনা?
               তখনও জোনাকিটা মশারির মাথায় জ্বলজ্বল করছে। আবার দেখা গেলো ওর জোড়াটাও কোথা থেকে এসে জুটে গেছে।
দুজনে আঁধার ঘরে জোনাকি জাগিয়ে যায়।
                   এ মাথা ও মাথা।