মৃণাল শতপথী-র নভেলা–অলিভ কচ্ছপের দল

Spread This
মৃণাল শতপথী

মৃণাল শতপথী

অলিভ কচ্ছপের দল

এক দু-বার বলেছে মা, মাথা ধরে থাকে । শুনিনি । শোনা হয় না । পরে মনে হয়েছে, মা নিজের কথাটা ঠিক করে শোনাতে জানে না । নানান কথার ভিড়ে নগণ্য, নিজের ক্ষুদ্র অভাব অভিযোগ রাখে,যা খেয়াল রাখা দুঃসাধ্য । হয়তো মা একটা গল্প বলছিল । মায়ের গল্প গ্রামের ঘর গেরস্থালির । গ্রামছাড়া ছেলেকে শোনায়-
কচি-র বাড়ির আট বছরের ছেলেটার জলডুবি হয়েছে, কচি রে, তোর কচিদা, মনে আছে ? তার ঠাকুমা ছেলেটার পিঠে তেল মাখাচ্ছিল । তেলের বাটিটা ভেতরে রাখতে গিয়ে ফিরে এসে দেখে, নেই । দড়ির খাটে ডাঁই করা কাঁথাপত্তর তুলে রোদে দিতে গেছে । কচিদের বাড়ির পেছন দিকটায় আগাছাভরা ডোবা, এক মানুষ জল । ঘরে টিউবওয়েল, সরকারি টাকায় বাথরুম, বাড়ির বউরা পুকুরে যায় না তেমন । ছেলেমেয়েরাও কলতলায় চান সারে । ছেলেটা সেদিন ডোবায় কেন গিয়েছিল, রহস্য । এই যে রহস্যের কথা মা বলে, আসল ঘটনায় তেমন রহস্য থাকে কিনা জানবার উপায় নেই, কিন্তু মা একটা রহস্য জিইয়ে রাখে ।…বাচ্চাটা পুকুরে নামতে গিয়ে পা হড়কে তলিয়ে গেল, সাঁতার জানিস না, তুই যাবি কেন !… মা ছেলেটার সঙ্গে কাল্পনিক সংলাপ বলে । জলে ডুবে যাবার পর ছেলেটা অপরাধীর মতো উঠে এসে দাঁড়িয়েছে মায়ের কাছে,তার মাথার চুল থেকে টপটপ জল ঝরছে, মা তার বিচার করছে ।… জলে আঁকুপাঁকু করছে একটু বাতাসের জন্য, আহা রে, তার ঠাকুমা কাছেই কাঁথা মেলছে দড়িতে,অথচ জানতেই পারছে না । অবাক কী বলতো, বাচ্চাটার সেদিনই বা পুকুরে নাইবার ইচ্ছে হল কেন? কীসে টানল তাকে, মরণ ?
মা এভাবেই তার রহস্যের সমাধানে পৌঁছয় । আর এইসব কথার মাঝে মা চা করতে যায় । বলে, মাথাটা ধরেছে, ইদানীং প্রায়ই তার এমন মাথা ধরে । বলা গল্পটার রেশ তখনও ফুরোয়নি, মা তার নিজের কথাটাকে এমন অবহেলায় ছেড়ে দিয়ে যায়, গুরুত্বহীন । সেদিনের কথার পর হয়তো কেটে গেছে আরও একটি মাস ।
মায়ের মাথা ধরার কারণ খুঁজি । বছর কয়েক চশমা পরছে । ডাক্তার দিয়েছে । চশমাপরা মায়ের দিকে প্রথমদিন তাকিয়ে থেকেছি । প্রতিদিনের চেনা মা একজন অচেনা মহিলা হয়ে ঘরের কাজ করে যাচ্ছে ! শুরুতে কানে ব্যথার অজুহাতে প্রায়শই চশমা খুলে রাখতো । তারপর একসময় চশমাটাই নিয়ম হয়ে যায় । সমস্যা হয়তো পাওয়ারে । ডাক্তার দেখাতে হবে এই ভাবনার পর কেটে যাবে আরও কিছুকাল । মাসকয়েক পর আবার এক সন্ধ্যায় দেখা হবে মায়ের সঙ্গে । খাবার টেবিলে এসে পড়া কম ওয়াটের এলইডি বাল্ব । বাইরে কুয়োতলার অন্ধকার থেকে ঝিঁঝিঁ ডাকছে । মা থালায় ভাত বেড়ে দিতে দিতে আরেকটা গল্প শোনাবে । ঝন্টু খাসকিলের বউয়ের আজব মৃত্যুর গল্প ।…
বিকেলে দেখা হল রে বউটার সঙ্গে । দোকানে সওদা করে ফিরছে । ঝিঙে মাচাটার কাছে দাঁড়িয়ে কথা হল, ঘর-সংসারের কথা । ছোট মেয়ে, তার লেখাপড়ার কথা । লেখাপড়া করলে মেয়েদের এখন অনেক সুযোগ, সে শুনেছে । আরেকটা বছর দুইয়ের দুধের শিশু ।ঝন্টু খাসকিল বলেছে, সকালে উঠে ঘর ঝাঁটিয়ে বউ আবার শুয়ে পড়ে। ঝন্টু ভাত খেয়ে কাজে বেরোবে, সেই রান্নাটুকুরও জোর নেই । ঝন্টু ভাত রেঁধে, খেয়ে বউয়ের খাবার ঢাকা দিয়ে এসে দেখে ঘুমন্ত বউয়ের বুকে উপুড় হয়ে দুধ খাচ্ছে বাচ্চাটা । ঝন্টু ডাকে, সাড় নেই । ঘুমের ভেতর দিয়ে চিরঘুমের দেশে চলে গেছে । কোন অসুখ বিসুখের খবর নেই, এমন নিঃসাড়ে জলজ্যান্ত মানুষ চলে যেতে পারে !… মা অবধারিতভাবে থামবে খানিক তারপর তার প্রশ্নগুলো ছেড়ে দেবে, শেষবারের মতো বিছানায় শুতে যাবার আগে সে ঝন্টুকে বলেছিল, কার দোকানে কতো ধার আছে, সেগুলো মেটাতে হবে । কেন ? শেষ সময়ে হঠাৎ কোথায় দু-পাঁচ টাকা ধারের কথা মনে হবে কেন ?…আমি জানি মৃত্যুটা অস্বাভাবিক, এমনটা সচরাচর দেখা যায় না কিন্তু দোকানে বাকি থাকা টাকার কথায় কোন রহস্য নেই যা মা তৈরি করার চেষ্টা করছে । বউটা মারা না গেলে সেই কথাগুলোই সাধারণ ঘরকন্নার কথা হিসেবে থেকে যেতো, কে মাথা ঘামাতো ? মা আসলে এই সাধারণ মৃত্যুগুলোকে বড় পার্সপেক্টিভে ধরতে চায়, কেন কে জানে । বরং ভাবি, সেই দুধের শিশুটার কথা, অথবা যে বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে ঝন্টু খাসকিলের বউয়ের স্বপ্ন ছিল ।
খালি মৃত্যুর কথা বলো কেন?
বাইরে থাকিস, খবরই রাখিস না, এখানে চুপচাপ কেমন মানুষ মরে যায়, নিঃসাড়ে…
কতদিন দেখা নেই মায়ের সঙ্গে । ফোন করে । সেদিন বলল, কোন এক সমুদ্রের বালিতীরে উঠে এসেছে হাজার কচ্ছপের দল । ডিম পাড়তে । বহুকাল পর নাকি । টিভিতে দেখিয়েছে ।
যাক, এ গল্পটা মৃত্যুর নয় !
মা হাসে ।
কবে যে বাড়ি যেতে পারবো মা ?
এখন আসিস না, চারপাশে অসুখ ।
‘অপরাজিত’ ছবির অপুর মা-কে মনে পড়ে । ডোবার পাড়টাই পায়ে চলা মাটির রাস্তা । বারবার দেখানো হয় পথটাকে । কী শূন্য, কী একা ! সেই পথ ধরে কোন সন্তানের ছায়া হেঁটে আসে না, তবু অলীক তৃষ্ণা নিয়ে চেয়ে থাকে সর্বজয়া।
কী করে বোঝাই মা, শৈশবের অন্য কোন ঘোরের ভেতর কপালে একটা হাত এসে না রাখলে, পৃথিবীর কতটা জ্বর কোনদিনই যে জানা হবে না ।
আবছা ছোটবেলায় আমার একটা বিয়ে হয়েছিল মা। খুব বর্ষায় কুন্ডু-পুকুর উপচে জল নেমে আসতো কুলিপথে, কলকল শব্দে জলের তোড় যে পথে গিয়ে মিশে যেতো অন্য পুকুরে, সেখানে এক মস্ত তেঁতুলগাছের ছায়ান্ধকারে ছাদনাতলা হয়েছিল । শাঁখ বাজেনি, উলু ছিল না, সন্ধেপোকার কটকট আর ঝোপেঝাড়ে কয়েকটা জোনাকির দপদপ কেবল । দিনের আলো একেবারে নিভে যাওয়ার আগে সারতে হবে বিয়ে । দুজনের হাতে ছিল গন্ধটগরে গাঁথা মালা । কনের মাথায় ছিল লাল গামছার ঘোমটা । দুষ্টু দাদা দুজন কানে ফিসফিস করল,মালা বদল হলেই বিয়ে ! আমরা একে অপরকে মালা পরালাম আর বিয়ে হয়ে গেল ! ভোজ হল, একটা করে মাছ-লজেন্স আর ছেঁড়া কাগজে মোড়া ঝাল চানাচুর । বিয়ে বিয়ে খেলা। কী উত্তেজনা ! বয়সে একটু বড়রা এসব খেলা আমাদের দিয়ে লুকিয়ে খেলাতো আর মজা দেখতো । সেই বিয়ে না বোঝা বয়সেও ঘোরলাগা, ভয় মেশা। ধুলোখেলার পুঁচকে মেয়েটি বিশেষ হয়ে গেল । লজ্জায় সে আর কাছে ঘেঁষে না তারপর, আমিও না। সইরা আঙুল তুলে দেখায়, ঐ যে তোর বর ! বরকে লজ্জা পেতে হয় সে জেনেছিল । কুচুটে দাদারা আবার কানে ফিসফিস করে, বউকে ঘরে নিয়ে যাবি না? যাবো, বড় হই ! সেই বয়সেই বুঝেছিলাম, তা হয় না, কীসে যেন বাধা । আরও পরে বুঝেছি,বামুনঘরের ছেলের সঙ্গে নিচুজাতের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার খেলাটা আসলে ছিল এক মধুর শোধের । জাতের হীনন্মন্যতা এভাবেই এক সমতার মজা নেয় ।
জানি না তো, বলিসনি কোনদিন।
 একদিন সত্যি বিয়ে হল আমার কনের।শৈশবের খেলা কবেই ধুয়েমুছে গেছে তখন । এককাঁড়ি সিঁদুর মাথায় শিব-শীতলা মন্দিরে পেতলের জাঁতি ছুঁইয়ে বরের পাশে রিকশায় বসে হাসিমুখে চলে গেল । তখন তো তার বয়স তেরো চোদ্দ সবে । ভেতরে কোন জ্বালাপোড়া মতো করেছিল কিনা আজ আর মনে পড়ে না ।
আমি এ সংসারে এসেছিলাম পনেরো বছর বয়সে ।
 বিয়ের ঠিক দু-তিনবছরের মাথায় মেয়েটির গায়ে কেরোসিন ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় । খবরটা পাই তারও কয়েকমাস পর বাড়ি এলে । তখন আমি বাইরে ইসকুলে । তুমি যেমন করে গ্রামের প্রতিটা মৃত্যুর খবর দাও, কুন্ডুবাড়ির ছোটমেয়েকে শ্বশুরবাড়ির লোক কেমন হাঁ-মুখে অ্যাসিড ঢেলে মেরেছিল, তার বয়স তখন কত মা? মেরেকেটে ষোলো । তারপর একদিন এই খবরটা । তারা নিচুজাতের ছিল, তাই খুব বড় খবর ছিল না হয়তো । তোমার মনে হয়েছিল সে মেয়েকে আমি চিনি না ।
 আঁধারঘন তেঁতুল তলায় একা দাঁড়িয়ে শুনেছি সন্ধেপোকার কটকট, ঝোপেঝাড়ে জোনাকির দপদপ, আরেকবার ।
 হ্যাঁ, মনে পড়েছে । গাঁ-ঘরে হতগরীব ঘরে মেয়েদের এমন টুপ করে মরে যাওয়া গা সওয়া। তার মা আছাড়ি পিছাড়ি দিয়ে কাঁদল কদিন । তারপর আবার ঢেঁকির পাড় দিতে আসতে শুরু করল নিয়মিত । বাপটা কাঁদল না,বিরাট চেহারা লোকটা গুম মেরে গেল সারাজীবন ।
 তুমি জানো, আমি যে গ্রামের স্কুলে পড়াই সেখান থেকে বিদ্যেসাগরের গ্রাম পনেরো কিলোমিটার মতো মোটে । কলকাতা শহর থেকে সেই সময় আসতেন । নিজের গ্রাম, তার আশেপাশের গ্রাম, ক্ষীরপাই,চন্দ্রকোনা,শ্রীপুর, কামারপুকুর,রামজীবনপুর,মায়াপুর, মলয়পুর,কেশবপুর, পাতিহাল, এমন কত, পায়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে স্কুল তৈরি করছেন, মেয়েদের স্কুল । রৌদ্রে হাঁটছেন, বর্ষায় ভিজে চলেছেন, রাতে ঘর না পেলে গাছের তলায় শুয়ে পড়ছেন ।
 আহা সে মানুষটা…
 তাঁর এক বাল্যসঙ্গী ছিল ক্ষেত্রমণি।তার অল্পে বিয়ে, অল্পে বিধবা । এইটুকু মেয়ে একাদশীতে নির্জলা । সে রাতে ভাত মুখে দিতে পারেননি কিশোর ঈশ্বর, থালা ঠেলে উঠে গিয়েছিলেন । ক্ষেত্রমণিও বাঁচেনি, এমন কত শত, একটুখানি অল্প স্বল্প জীবন নিয়ে অকালে ফুরনো পুতুলখেলার মেয়েরা । অনেক পরে তিনি যখন বাড়ি আসতেন,গ্রামের বাল্যবিধবাদের জন্য খাবার আনতেন । একেকবার এমন হয়, একাদশী পড়ে যায়, খাবার দিতে পারেন না । তারপর নক্ষত্র বিচার করে আসতেন, একাদশী পড়বে না এমন দিনে । বিদ্যেসাগরের মা আকুল হয়ে জানতে চাইতেন, শাস্ত্রে কি এর কোন বিচার নেই ঈশ্বর? এভাবে এই ছোট ছোট মেয়েরা, তাদের কতজনকে যে আমি কোলে কাঁখে করেছি রে, এমন অঘোরে মরে যাবে সব?
  আমাদের গ্রাম থেকে বিদ্যাসাগরের গ্রাম কতো দূরে রে?
  খুব দূরে নয় তো মা ।
কবেকার পড়া বই,পুরো গল্পটা হয়তো মনে নেই, কিন্তু কোন একটা জায়গা মনে থেকে গেছে । অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে হঠাৎ কোন এক সময় ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মত ঝলসে উঠল । সারাজীবনে এমন অঢেল সঞ্চয় । সমগ্রটা মনে থাকে না, সমগ্রের একটুখানি, এই বইয়ের একটু, সেই বইয়ের একটু, সেই যে গল্পটার খানিকটা, উপন্যাসের ঘটনাটা, ভুলে যাওয়া গানের এক দুই কলি, গুনগুন, যখন তখন, গাদা গাদা দেখা সিনেমার একটু একটু মনে রাখার দৃশ্য, আর কয়েক দশকের জীবনে একটু একটু স্মৃতি । তা নিয়েই এখনকার আমিটা । তার বাইরে বিশাল একটা স্মৃতির জীবন বিস্মৃত হয়ে থাকে । অন্ধকারে, কুয়াশায়,আবছায়ায় । এই মনে রাখাগুলো, আর সেই ভুলে যাওয়াগুলো মিলে গিয়ে সম্পূর্ণ আমিটা । আরও জীবন এগোলে সেই কুয়াশার অতীত থেকে, ভুলে যাওয়াগুলো থেকে কয়েক টুকরো আবার উঠে আসবে । তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ।
 দু-ঘন্টা ধরে হয়তো একটা ছবি দেখলাম,মাথা থেকে পুরোটাই চলে গেল, একটা দৃশ্য শুধু নিঃসাড়ে থেকে গেছে, ঘুমের মধ্যে টের পেলাম । এক বিকেলে আঠারো মাসের বাচ্চাকে পাথরে বসিয়ে সমুদ্রে স্নানে নেমেছে বাবা-মা,তারপর উত্তাল ঢেউয়ে দুজনেই তলিয়ে গেছে । বাচ্চাটা পাথরে বসে তাকিয়ে আছে । একের পর এক তীরে আছড়ে পড়ছে ঢেউ । বাচ্চাটা তাকিয়ে আছে । ভয়াবহ সাগর রাগে গজরাচ্ছে, ছুটে এসে মাথা খুঁড়ছে, ভেঙে তছনছ হয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে । সন্ধে নামছে । একটি শিশুর ছায়া পাথরে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চল । অপেক্ষা কি এরকম? মহাসাগরের দিকে মুখ করে শিশুর মত বসে থাকা?
 পুরো গল্পটা নয়, একটি লাইন কেবল । নীল শার্ট পরে অফিসে বেরিয়ে যাচ্ছে বাবা । ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তার শিশুকন্যা হাত নাড়ছে । সেই হাতনাড়ায় বাবার সন্ধেবেলা ফিরে আসার আশ্বাস । বাবা আর ফিরে এল না, কোনদিন না।বছরের পর বছর পার হয় । মেয়েটি স্কুল থেকে, কলেজ থেকে, জীবনের আরেক অথৈয়ে পাড়ি দেয়, অথচ আমি কেবল দেখতে পাই,তার সময়টা সেই গ্রিলঘেরা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে একা, শূন্য, হাত নাড়ছে ।
 একটিই প্রিয় কলম ছিল স্কুলবেলায় । ঘনঘোর বর্ষায় হাত থেকে পড়ে সেটা খালের জলে ভেসে যায় । তারপর রোজ স্কুলে যেতে আসতে সেই খালপাড়ের জলে তাকিয়ে থাকা । উলটো দিক থেকে জল বয়ে এলে আমার কলমটা ফিরে আসবে এই ভুল আশায় । একটি কলমের দুঃখ আমার গোটা জীবনের । আর কোন কলম প্রিয়ই হল না !
 তোমারও এমন ছোট ছোট অপেক্ষা ছিল?যৌথ সংসারের হেঁসেল ঠেলার সন্ধে সকালে অপেক্ষাগুলো কেউ মুখ তুলে দেখেইনি । সেই অপেক্ষাগুলিকে আমার ল্যাপটপের মনিটরে জমা মিহি ধুলোর মত মনে হয় । স্ক্রিনে আলো থাকলে দেখা যায় না । তাকে ঘুম পাড়ালে অন্ধকার মনিটরের গায়ে ধুলোর স্তর লেগে থাকে দেখা যায় । তাতে আঙুল বোলালে ছবি আঁকা হয় ! কত যে ছবি !
 এখন এই বয়সে এসে একটা ফুলগাছের চারার জন্য অপেক্ষা থাকে তোমার, আমাকে আনতে বলো । ভুলে যাই । তোমার যে ফুলের শখ হতে পারে সেটাই বিশ্বাস হয় না ! কোথাও সবাই মিলে বেড়াতে গেলে তুমি একা আলাদা হয়ে অন্যদিকে চলে যাও, পাখির ডাক শোনো কান পেতে । কাউকে কাছে ঘেঁষতে দাও না তখন, কেউ যেতে চাইলে রেগে ওঠো । এই নির্জনতার অপেক্ষা থাকতে পারে তোমার ভেবেছি আগে?
 ঘরভরা ছেলে,বউমা, নাতি নাতনির মধ্যে বসে হঠাৎ গেয়ে বসলে কোন একটা গানের কয়েক কলি । ভুল কথায়,বেসুরে।সবাই হাসি চাপছে প্রাণপণ ! অথচ তুমি নির্বিকার । গলার স্বরে সমস্ত ভুল নিয়ে আশ্চর্য সততা ! গান শেষ করে উঠে যাও আর শ্বাসরুদ্ধ হাসি ফেটে পড়ে, কাচের মতো তছনছ হয়ে ছড়িয়ে যায় । সেই হাসিকে পেছনে নিয়ে তুমি আচার রোদে দাও, দড়িতে মেলা শুকনো কাপড় ঝেড়ে পাট করো ।
 একটা ভুল গানের জন্য অপেক্ষা ছিল তোমার?
তোমার বাবা প্রথম আমাদের বাড়ি এসেছিলেন একটি আপেল হাতে করে । হাতে করে ঠিক নয়, উড়ানিতে বেঁধে । বহু ক্রোশ দূর হেঁটে আসায় ধুলো মলিন ঠেঙো ধুতি আর উড়ানি, বাতাস দিলে উড়ানি উড়ে মোটা সুতোর পৈতে দেখা যায় । একেবারে ধবধবে । ধুতি অকাচা হলে তবু হয় কিন্তু পৈতেটির শুশ্রূষা হবে নিয়মিত । গরীব যজমানি বামুনের এছাড়া অবলম্বন বিশেষ নেই ।
তোমার বাবা কী রে, দাদু বল !
হ্যাঁ দাদু । মেয়ের বাড়ি এসেছেন কেবল একটি আপেল নিয়ে । নানা ভণিতার শেষে উড়ানির গিঁট খুলে ফলটি বের করে ঠাকুমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, এটুকু রাখুন বেয়ান । ঠাকুমা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এমনভাবে দেখেন যেন সে এক অবাক করা বহুমূল্য জিনিস, অনেক দেশ জয় করে প্রথম আমাদের বাড়ির চৌকাঠ পেরোলো ! তুমি তখন লেবু-চিনির শরবত দুটো গ্লাসে ঢালগাল করছিলে । ঢালগাল শব্দটা এদিককার নয়, ওদিককার,তোমার জন্মভিটের দেশের । চামচ নয়,তখন জলের অণুতে চিনি মিলিয়ে দিতে এ গ্লাস থেকে সে গ্লাসে ঢালাঢালি করা হ’ত, এর কোন বাংলা প্রতিশব্দ নেই, ঢালগাল চমৎকার মানিয়ে যেতো । এমন কতো মাতুলদেশীয় শব্দ তোমার থেকে পাওয়া । তা কোন ব্যাকরণে নেই, শিক্ষিত বাংলাভাষা তাদের স্বীকার করেনি । শরবতের গ্লাস হাতে দাঁড়াতে ঠাকুমা আপেলটা বাড়িয়ে বলেন, বউমা, যাও, আপেলটা কেটে বাড়ির সবাইকে প্লেটে দিয়ে এসো, পারলে কিছুটা পড়শিদেরও দিয়ো !
 দাদুর ধুতির মতো ধুলোমলিন তোমার মুখ ।
 তুই তখন পেটে, এতো জানলি কীসে?
 মামাবাড়ি বললে আমার নদীর কথা মনে হয় । ছোটোবেলায় কাদা ডিঙিয়ে চলেছি, বাবা সাইকেলটা   দু-হাতে তুলে পেরোচ্ছে, তুমি শাড়িটা গোড়ালি থেকে খানিক তুলে, সাবধানে । গাছপালার আড়ালে আড়ালে দেখা যায় নদী, নদীপাড়ের আখবন, নদীপাড়ের কাঁটাবেগুনের ক্ষেত, বলে পালের বেগুন, সব ছাড়িয়ে ঐ দূরে নদী,বিস্তীর্ণ বালুভূমি মিশে আছে একফালি নীলজলের গায়ে ভাসা কুয়াশায় । শুকনো নদীর বালিতে পড়ে নিঃস্ব নৌকো । স্বপ্নের মতো বিস্ময়, চলতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ি ।
 মামাবাড়ি বললে দুয়ারমুখে পাওয়া ঘি দেওয়া মুগডালের গন্ধ,অন্ধকার ঘুপচি ঘরে পাকা কাঁঠালের ঘ্রাণ, কড়িকাঠ থেকে ঝোলা দড়ির শিকেয় বসে থাকা মস্ত পাকা কুমড়ো, শিকেয় রাখা মাটির সরায় দই, মাটির হাঁড়িতে মারা দুধ তুলে নিলে পোষোমাটির উঠোনের মতো সাদাঘন চাঁছি । দিদিমা হাতায় চেঁছে তুলতেন, তা দিয়ে মুড়ি মেখে দেবেন আর আমি বুড়ো আঙুলের নখ কুরে তুলি আর জিভে নিই, মাটিগন্ধমাখা সরের আস্বাদ !
 দাদুর মাটির কুলুঙ্গিতে থাক করা পাঁজি, লাল শালুতে মোড়া কাপড়ের ঢিলে মলাটের রামায়ণ, মহাভারত । তাদের কাণ্ড, পর্বের স্থানে স্থানে বিবর্ণ ছাপা তেলছবি । দাদু সুর করে পড়েন আর সহজ গদ্য করে বলে দেন । সে সব গল্পে শৈশব ভরপুর । মহাকাব্যের নীল অরণ্যে ডুবে থাকি, গাছে গাছে সুমিষ্ট ফল, পাখির কুজন, সোনার হরিণ সেজে মারিচ, অশোকবনে সীতা, দু-হাতে ছাতি ফেঁড়ে দেখানো রামসীতার যুগল মূর্তিসহ হনুমান, কাঠবিড়ালিটা বালি মুখে নিয়ে যায় সেতু গড়ার কাজে ছুটে যায় । আর মেঘনাদের মৃত্যুতে প্রতিবার গোপন ব্যথা তুলে রাখা…মন্দিরে পুজোর পর কাঁসার থালায় ভোগ আসতো মামাবাড়িতে । ঘি দেওয়া সাদা ভাত,আলুর নরম তাল, ভাতের ওপর ছড়ানো তুলসিপাতার গন্ধ, বাতাসে নাক টেনে এইমাত্র পেলাম ।
 জঙ্গলঢাকা বুড়ো শিবের জরাজীর্ণ মন্দিরের ভাঙা চাতাল ছিল আমার নিরিবিলির প্রহর । সেখানে একা বসে খালি ভাবতাম, অজস্র মুন্ডহীন ভাবনা । ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া জমি, তিল ক্ষেত, খালের জল দেখা যায়, কচুরিপানার পাঁকমাখা গন্ধ, বেগুনি ফুল ধরে আছে । চারপাশ জনমানবহীন, ধীর বাতাসের সঙ্গে গোপন দীর্ঘশ্বাস কানে এসে ফিসফিস করে । শিরশিরে ভয় ।
 একদিন সন্ধে ছুঁই ছুঁই, আমাকে নিয়ে এলে ভাঙা মন্দিরের পেছনে । কাঁটাঝোপ আর হরেক ভাবরি ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ, এখানে বলে ভূতভৈরবী ফুল । সেই বুনোঝোপের মাঝে একটুখানি মাটি । তুমি অবাক করে দিয়ে কাপড়ের আড়াল থেকে একটা লোহার খন্তা বের করে মাটি খুঁড়তে শুরু করলে ।
কী আছে মা, গুপ্তধন?
হ্যাঁ, তুইও একটু মাটি তোল, একা পারি না ।
 একসময় কিছুতে লেগে শব্দ হয় । কলসিতে মোহর?মাটিমাখা কাঁচের একটা শিশি।পরম মমতায় হাতে নিয়ে কী দেখতে থাকো, মাটি ঝাড়ো, আঁচলে মুছে দাও বোতলের গা,সন্তানের কপালে জমা ঘামের মতো ।
কী এটা?
বিয়ের আগের দিন সন্ধেবেলা এই শিশি এখানে পুঁতে গিয়েছিলাম, সে কত্তো বছর আগে !
 ছিপি খুলে ভেতর থেকে গোল পাকানো একটা কাগজ আঙুলে টেনে আনো । খুলে দেখলে, আলতায় কাঠি ডুবিয়ে অগোছালো লেখা,কিচ্ছু পড়া যায় না এখন । একবার দেখে মৃদু হাসো তারপর শিশিতে ভরে আবার মাটি চাপা দাও । অন্ধকার নেমেছে, ঝিঁঝিঁর দল ঝোপে ঝাড়ে ডেকে যায় অনিবার । তোমার মাথার চুলে দুটো জোনাকি এসে বসে এবার ।
কী ছিল?
জানি না…
 একটা মিহি দীর্ঘশ্বাস আমার কানে এসে ফিসফিস করে যায় ।
বাজেপোড়া তালগাছের সুদূর মাথায় একটা পাখি এসে বসে এইমাত্র । মেঘ করেছে গাছটার ঠিক মাথায়, উত্তর-পশ্চিম কোণে । মা বলে বৃষ্টি হবে । এ বছর ঝড়-বৃষ্টির বিরাম নেই । মানুষের দুর্দশারও । বলতে বলতে বৃষ্টি এল । গাছটার নেড়া মাথা থেকে পাখিটা উড়ে গেল ডানায় ফোঁটার আঘাত পেয়ে । বৃষ্টিতে গ্রাম ভিজতে দেখা,ভেজা খড়ের গন্ধ, তালের রস নিঙড়ে ফেলে দেওয়া আঁটির স্তূপের গন্ধ, মাঠ থেকে ফিরতে থাকা ভিজে একসা গরুগুলির গায়ের গন্ধ, গোয়ালের পচা খড়ের চাল ধুয়ে নামা জলের গন্ধ, পুকুরের জলে অবিশ্রান্ত ফোঁটা পড়ে উঠে আসা পাঁকাল গন্ধ, সর্বব্যাপ্ত গাঁ !
পাশাপাশি মা আর আমি । বৃষ্টি পড়া দেখি বারান্দায় বসে । আদা আর হলুদ গাছের পাতারা ভেজে,একটুকরো মাটিতে সতেজ খসলা শাকের পাতায় জল ।
বৃষ্টি হলেই মামাবাড়ির ভিতর-বাইর মনে পড়ে,গ্রামদেশের একেক অঞ্চলের ঘরের বিশেষ গঠন, চারপাশে ঘরের মধ্যিখানে আস্ত একটা আকাশ! রোদ পড়ে সেখানে,বৃষ্টি নামে । সেই জল ঘরের ভেতর থেকে পাইপের সুড়ঙ্গ পথে বাইরে যায় । বৃষ্টি হলেই মেঘান্ধকার নদীর কথা মনে পড়ে । নদীর বুকে বৃষ্টি ।
কী ভাবছো?
সনতের কথা । এই বৃষ্টিতে খোলা মাঠে ভিজছে ছেলেটা । সিভিক পুলিশ । রথখোলার মাঠে ডিউটি দিয়েছে । কয়েক হাজার সাইকেল সেখানে,গার্ড দিচ্ছে।কোন ছাউনি নেই,খোলা মাঠে পড়ে থাকে সাইকেলগুলো । সাইকেল ভেজে,সেও ভেজে ।
কাদের সাইকেল?
পরিযায়ী । বাস রাস্তা ধরে সাইকেল করে আসে যারা তাদের থামায় পুলিশ, সাইকেল ছাড়িয়ে নেয় । সাইকেলগুলো জমা হয় ।  ভেতরে ভেতরে সাইকেলগুলো বেচতে থাকে পুলিশ । লোক আছে,গন্ডায় গন্ডায় কিনে নেয়,  ব্যবসা করে।
পরিযায়ী শ্রমিকদের সাইকেল নিয়েও দালালচক্র !
আশ্চর্য !
মানুষই পারে এসব, অন্যের কষ্ট বেচে দু-পয়সা কামায় । মানুষের বেঁচে থাকাটাই যেন বিড়ম্বনা এখন, বাঁচতে ইচ্ছে করে না ।
থামো !
 চল্লিশ বছর হল এ সংসারে । আর ভালো লাগে না । আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে রে এবার ।
মায়ের অভিমান জমে জমে পাহাড় । ইদানীং রান্নায় মন থাকে না মায়ের । আগের সেই অবিস্মরণীয় হাত, মায়ের রান্নার সুনাম জগতজোড়া । বাড়িভর্তি আত্মীয় স্বজন মায়ের একেকটা পদ মুখে নেয় আর প্রশংসায় পঞ্চমুখ !কেবল একজনকে খুশি করতে পারেনি মা কোনকালে, বাবা । সারাজীবন বাবার দেওয়া কোন না কোন খুঁত নিয়ে মায়ের রান্নারা দিনের শেষে অবহেলায় পড়ে থেকেছে । খেতে দেবার সময় দেখেছি, আমার ভালোলাগা দেখে মা ভরে উঠছে অর্ধেক,বাকি আধেক উৎকন্ঠা নিয়ে তাকিয়ে বাবার দিকে । বাবা চুপচাপ খেতে খেতে শুধু বলে, নুন, শুধু বলে, পুড়েছে । একটিও বাড়তি কথা নয় । মায়ের মুখ সাদা হয়ে যায় । মেসজীবনে অখাদ্যের ক্লান্তিশেষে মায়ের হাতের একটি পদের জন্যে আমার সে কী ব্যাকুলতা !
 চল্লিশ বছর পর মায়ের রান্নায় মন নেই আর । আমিও টের পাই সেই স্বাদ নেই । মা-ই বলে, রান্না হাতে হয় না, হয় মনে । জিভে নিলেই বোঝা যাবে তখন আনমনা ছিলাম কিনা, কোন কারণে ভেতরে রাগ ছিল কিনা, দুঃখ ছিল কিনা অথবা অস্থির।শান্ত, সংযত মন বোঝে কড়াই আর খুন্তির রসায়ন । এত বছর পর হয়তো হঠাৎ কোন এক মুহূর্তে মা কি আবিষ্কার করেছে কেবল রান্নাটাই মায়ের আইডেন্টিটি হয়ে থেকে গেছে? সন্তানকে খাইয়ে ওঠার মতো সুখে ভরে উঠতে উঠতে জীবন একদিন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে? একদিকে সেই আত্মপরিচয়ের বিপন্নতা,অপরদিকে হালটিকে জলে ফেলে দিয়ে নৌকাকে মা বলেছে, চল, যেদিকে খুশি ভেসে চল !
বাবা এখন আর খুঁত বাছে না । নীরবে খেয়ে উঠে যায় ।
 প্রতিটি প্রাণী তার মৃত্যুর মুহূর্ত বোঝে, বুঝলি । যেদিন আমি বুঝবো, সেদিন মানুষের মতো মরতে চাই না, মরবো একটা বেড়ালের মতো, নিশ্চিন্ত বাসের জায়গা ছেড়ে ছুটে যাবো অনিশ্চিত বাইরে, আঁতিপাঁতি করে খুঁজে নেবো একটা নিরিবিলি । তারপর অপেক্ষা করবো ।
মরবো একটা হাতির মতো । মরণকালে সে নিশ্চুপে জলের কাছে যায় । স্থির, সমাহিত সন্ন্যাসীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে । মৃত্যু তাকে শীতল বাতাসের মতো আচ্ছন্ন করে ।
মা এসব বলে যায় আর আমি একটা মেঘাচ্ছন্ন নদী দেখি, তার বুকে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে । আর একটা ভিতর-বাইর, ভেতরের সেই বাইরে অবিরাম ঝরে যাচ্ছে জল ।
তখন অন্ধকার বেশি ছিল । দূর গ্রামে যাত্রা দেখতে গেলে সেই আঁধার পেরিয়ে যেতে হত । পিসিরা, পিসিদের বান্ধবীরা মিলে একটা দল খালি পায়ে হেঁটে চলেছে । সেই দলে আমি একমাত্র পুঁচকে বালক । ছোটো পিসি শক্ত করে হাত ধরে আছে । সেই চোরা টানে রাস্তা না দেখেও টানা হয়ে চলেছি । সঙ্গে কারও একটা লন্ঠন পর্যন্ত নেই । মাটি-তেল পুড়িয়ে এতোটা রাস্তা যাবার বিলাসিতাও নেই । চেনা পথ তাদের, পথের একটা রেখা দেখতে পেয়ে চলেছে । আঁধার সইয়ে নিতে নিতে চোখ তাদের জোনাকির মতো তখন । বাঁশঝাড়ের ঘনান্ধকার পেরিয়ে, অন্ধকার কাঁটা বাবলাগাছের সারি, দিনের বেলার রোদে তাতে হলুদ ফুল ধরে থাকে ।
 ঘরে একটা হ্যারিকেন আর লন্ঠন তখন । উনুনের কাছে থাকতো লণ্ঠন, আর পিসিদের বইখাতার কাছে হ্যারিকেন । সেই আলোকে গোল করে ঘিরে বসতো পিসিরা । তাদের অন্ধকার পিঠ, একেকজনের গালের পাশে লেগে থাকা হ্যারিকেনের আলো । সবাই সুর করে পড়ছে । অন্ধকার পুকুরঘাটে বসে আমি সেই সান্ধ্যপাঠের সুর শুনছি । অনেকরকম পড়ার সুরের মধ্য থেকে ছোটো পিসির অঙ্ক মুখস্ত করার সুর আসছে, এ প্লাস বি হোলস্কোয়্যার ইকাল্টু…
খড়ের চালি, মাটির রান্নাঘরে চিরজন্মের আঁধার । ঝুলকালি লণ্ঠন তুলে একেকবার কড়াইয়ে ঝোলফোটা দ্যাখো, হাঁড়ির ঢাকনা খুলে চেয়ে থাকো ফুটন্ত ভাতের দিকে, ঘরময় অন্ধকারের ভেতর ক্ষীণ আলোতে জেগে থাকে ভাতের হাঁড়ি, মুখভরা বাষ্প ওগরায় । উনুনে জ্বলন্ত আধফালি কাঠ পুড়ে খাক হতে   থাকে ।
একটি মাটির প্রদীপ তুলোর সলতের মুখে একবিন্দু আগুন নিয়ে ঠাকুমার শিয়রের কাছে জ্বলে থাকতো সারারাত । শয্যাশায়ী, দড়ির খাটে পাতা হাগা-মুতের বিছানা । খাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে গলা পাকিয়ে তোলা গন্ধ, তখন প্রদীপের দিকে তাকাতে হয়, তেলপোড়ার মৃদু গন্ধ নাকে নিতে হয়, আর তাকিয়ে থাকতে হয় ঠাকুমার মুখে, চাঙড় খসে পড়া প্রাচীন দেয়ালে খোদাই আঁকিবুঁকি । বয়সী চামড়ায় এত অজস্র কুঁচকানো দাগ, সারামুখে জমির আলের মতো বাঁধ দেওয়া আছে, অন্ধকারে বিন্দু আলোয় কেবল একটা প্রাচীন মুখ জেগে থাকে । ঘোলাটে চোখের শুকনো নদী থেকে জল গড়িয়ে নামলে সেই বাঁধে আটকে যায় । অসহায় । মায়ের ওপর নির্ভর । জীবনভর দাপুটে তর্জন চালানো ক্ষমতা নির্জীব পড়ে আছে ন্যাতানো মুতেভেজা কাঁথায় । মা সকাল দুপুর সন্ধে নোংরা পরিষ্কার করে । বিছানা পালটায়, রোদে দেয়, ধোয়, শুকোয় । স্নানের সময় উলঙ্গ ঠাকুমার দেহ, হাড়সার প্রেতের শরীরের মতো আকুলিবিকুলি করে । মা যত্নে ধোয়ায়, মোছায়, একপাশ অসাড় দেহ পাঁজাকোলা করে বালিশে ঠেস দিয়ে বসায়, মুখে তুলে দেয় চটকানো ভাতের মন্ড । আর রাতে আমার পাশে শুয়ে ঠাকুমার মৃত্যু কামনা করে…
 কোনো কোনো রাতে বাড়াবাড়ি হয় । ঘরভর্তি লোক তটস্থ । মা আমার পাশে ধপ করে মাটিতে বসে  ফুঁপিয়ে ওঠে, রাতটাও পেরোবে না রে ! এতো অত্যাচার চালিয়েছে মানুষটা, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেয়েছে এ সংসারে তোমার আসা ইস্তক, তবু সে চলে যাবার হলে প্রাণ ফাটে তোমার, কীসে?
শরীরের কোনো প্রত্যঙ্গ পচে গেলে কেটে বাদ দিতে হয়, কিন্তু হারানো অঙ্গের দুঃখ থেকে যায় । এতো বছর সুখে দুঃখে জ্বালায় যন্ত্রণায় মানুষটা তো একপ্রকার অঙ্গেই জড়িয়ে ছিল !
 ভোররাতে সুস্থির হয় ঠাকুমা । সারাবেলা ঘুমোয় তারপর খিদেয় জেগে উঠে ডাকে, বউমা ! আমি তখন তোমার মুখের দিকে তাকাই । কোনো ভাবান্তর চোখে পড়ে না, একটা শ্বাস ফেলে আবার উনুনের কাছে যাও । এমন কতোবার, আর কী অবাক, প্রতিবার তুমি সেই একইভাবে কাঁদো আর ঠাকুমার এবারেও বেঁচে ওঠায় মৃদু শ্বাস ফ্যালো !
কী অক্ষয় আয়ু নিয়ে এসছে রে বাবা এ মানুষটা !
ঠাকুমা সে সময় এক পচাগলা ব্যবস্থার মতন, চলে যাওয়ার সময় পেরিয়েও প্রাণপণ আঁকড়ে আছে জীবন । কিছুতেই যাবো না বলে কলুষিত করে যায় চারপাশ, বিবমিষা ওঠে, সবাই গোপন কামনা করে মর মর ! তবু তাকে জীবনের খাতিরে মেনে নিতে হয়, মৃত্যু মুহূর্তে গলায় পাকিয়ে ওঠে ব্যথা ।
 কোনো এক ভোরে ঠাকুমা চলে গেল আকস্মিক । মনে আছে সেদিন গাড়িতে করে প্রথম আমাদের গ্রামে এল বিদ্যুতের খুঁটি, রাস্তার পাশে ডাঁই হলো ।
প্রত্যেকের একটা ভূতের গল্প থাকে, নিজস্ব, আবছা মতন একটা গল্প । মানা না মানার মাঝে খানিকটা জায়গা থাকে, সেখানে একটা হানাবাড়ি, সে বাড়িতে ভূতটা বন্ধ দরজার পেছনে কেবল ছায়া হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে । ছমছমে সোঁদা গন্ধ ওঠা বাড়ির মাথায় একটা জীবনানন্দীয় চাঁদ, যার গা ছুঁয়ে দুটো ভৌতিক পাখি উড়ে যায় । বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে একটা দরজা দাঁড়িয়ে থাকে, যার গায়ে বন-কুদরির লতাগুল্ম । সেই বিভ্রমে পথ হারালে ভয় নিয়েও একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে আশ্বাসের মতন । দরজার পেছনে কোনো অবিনাশী ছায়া জেনেও দরজায় আশ্রয়ের করাঘাত, বারবার । দরজা খোলে না, কেউ উত্তর দেয় না । টেল দেম আই কেম, অ্যান্ড নো ওয়ান আন্সার্ড ! এই যে নিশ্চুপ, এই যে নির্জন, সে আসলে আমাদের বলডাঙা মাঠের শ্মশানের মতো । কতো রাত বসে থেকেছি একা । ভয় নিয়ে, ভয়ের ভেতরে অভাবনীয় কিছুর আনন্দ নিয়ে । আকাশে ঠাণ্ডা মেরে যাওয়া চাঁদের গা দিয়ে আষাঢ়ের ফিনফিনে মেঘ ছুটে যায়, সে আলোয় শ্মশান আবছা হয়ে থাকে । এই আলোটাও বড়ো বিস্ময়ের ।  আলো অথচ আলো নয়। কেবল কেউ অন্ধকারকে মূর্ত দেখবে বলে এমন আলোর নেমে আসা ।
 দক্ষিণের হুহু বাতাস । রাতপাখির খরখরে একটা ডাক । অন্ধকারের একটা ভাষা থাকে, নিবিড়, একাগ্র হয়ে কান পেতে রাখলে শোনা যায় । ভয়ের একটা ঘোর থাকে, জ্বরের মতন । অনেক বছর আগে শ্মশানের ঠিক যতটুকু মাটির ওপর সাজানো চিতায় ভাই পুড়েছিল, এখন সেখানে ঘাস । পুড়িয়ে ফেলার একমাস পর সেখানে এসে বসেছিলাম । পোড়া কাঠের টুকরো, ছড়ানো ভাঙা মাটির হাঁড়িকুড়ি, আর দক্ষিণ থেকে আসা রাতের বাতাসে রোজ চিতার ছাইয়ের উড়ে যাওয়া । উড়ে যেতে যেতে আর একবিন্দু ছাই পড়ে থাকে না, তখন ঘাস গজায় । এখানে বসেই কতো রাত দুই ভাই, যে যার প্রেমের গল্প শুনেছি । তখন অল্প দূরে পড়ে থেকেছে অন্য কারও পুড়ে যাওয়া কাঠ, ছাই । প্রেমের গল্প বলতে বলতে আমরা টের পাই, সম্পর্কও একপ্রকার ভূতের গল্প । মানা না মানা, বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মধ্যবর্তী খানিকটা জায়গায় সে এক বিজন বাড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । তার দরজায় করাঘাত করতে করতে ব্যর্থ হয়ে বলে যেতে হয়, টেল দেম আই কেম, অ্যান্ড নো ওয়ান আন্সার্ড…
মা, ভাইয়ের কথা ভুলে গেছো?
হ্যাঁ ।
পুরোটাই?
আবছা মনে আছে । আগে পুকুরঘাটে রাতে বাসন নিয়ে গেলে ধাপে খানিক্ষণ বসতাম । জলে ভেঙেচুরে যাওয়া জ্যোৎস্নার নড়াচড়া দেখতাম, বাসনধোয়া ভাতের লোভে একটি দুটি মাছ আসতো জলে ডুবে থাকা ধাপের কাছে । ঝুঁকে থাকা কলাগাছের ছায়ায় তোর ভাই এসে দাঁড়াতো তখন ।
ভয় করেছে?
নাহ । জিজ্ঞেস করেছি, বারবার জিজ্ঞেস করেছি, কেন এমন করলি রে? চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকেছে । একবার শরীরে সমস্ত শক্তি নিয়ে উঠে গিয়ে তাকে ছুঁতে গেছি, হাতটা তার থেকে কিছুটা আগে শক্তমতো কিছুতে আটকে গেছে ।
কীসে?
যেন একটা দরজার মতন, বন্ধ । সেটাকে দু-হাতে ঠেলছি, খুলছে না, সে খুলে দিচ্ছে না বা পারছে না । তারপর একদিন সে আবছা হয়ে এলো । আর দেখতাম না । দেখতাম না বলে কান্না পেতো । তাকে ভুলে যাচ্ছি বলে হাহাকার করে উঠতাম, তারপর সেটুকুও থাকলো না । এখন কোনো এক হঠাৎ সময়ে একেকবার মনে আসে, সেখানে শোক নেই, যন্ত্রণা নেই, কেমন এক মাঝামাঝি একটু জায়গার মতো, শূন্য, ফাঁকা ।
 মনের যে জায়গাতে কোন সুদূরে চিতা জ্বলেছিল, শেষ ছাই বাতাসে উড়ে গেলে সেখানে নতুন ঘাস হয় ।
 আমাদের ব্যক্তিগত ভূতের গল্পগুলো এরকম, হয়তো এরকমই ।
গল্প কেমন করে লেখে?
কেন?
তুই যে লিখিস, কেমন করে লিখিস?সব বানিয়ে বানিয়ে?
সত্যিও কিছুটা থাকে ।
বানাস কেন তবে?বানিয়ে বানিয়ে পাতার পর পাতা লোকে লেখে কী করে বাবা কে জানে !
এই মনে করো তোমার কথা লিখছি । সেখানে খানিকটা তুমি আছো, অনেকটা তুমি নেই ।
আমি না থাকলে আমার গল্প হবে কী করে?
ঠিক তোমার গল্প তো নয়, তোমার মতন গল্প ।
বুঝিনি ।
রাসুকাকাকে মনে আছে?মাসে একবার আসতো, বাবার স্কুলের বন্ধু । মাটির গাংদায় তালপাতার চাটাইয়ে বসে গল্প শোনাতো । একটা কেবল বাতি কমানো হ্যারিকেন । সদর পুকুরের অন্ধকার জলে কালবোসের ঘাই মারার শব্দ । রাসুকাকা ভূতের গল্প বলতো, রূপকথা, সাদা ঘোড়ার দুটো ডানা নিয়ে উড়ে যাবার গল্প, বনে পথ হারানো পথিকের ঝোপের ভেতর কালোপাথরের শিবলিঙ্গ খুঁজে পাওয়ার গল্প ।
 তারপর অনেকদিন রাসুকাকা এলো না । গ্রীষ্ম গেল, ঝমঝমিয়ে নিম্নচাপের দীর্ঘ বর্ষায় কলাবাদাড়ের ভেজা দেখি জানালা দিয়ে । একদিন রাসুকাকা এলো । গাংদায় বসে তোমার করে দেওয়া চায়ে চুমুক দিল শব্দ করে । মনে আছে সেদিন একেবারে আলাদা একটা গল্প বলেছিল । একটি মেয়ের দূর গ্রামে বিয়ে হয়ে চলে যাবার গল্প । বাবার ঘর শূন্য করে, বাপের অন্তর কাঁদিয়ে । কাজে মন থাকে না বাপের । জমির আলে বসে মেয়ের কথা মনে পড়ে, মেয়ের অনর্গল কথা, তার হাসি, তার রাগ, ছোটো ছোটো বায়নার কথা । বাপ পারে না, বেয়াই বাড়ি ছুটে ছুটে যায় নানা বাহানায় । মেয়েকে একবার চোখের দেখা দেখবে বলে । রোগা হয়েছে মেয়ে, বাপ চারটি ফল হাতে ছোটে । একদিন গিয়ে মেয়ের দেখা পায় না । মহাপুরুষের মেলা দেখতে মেয়ে গেছে দূরের গাঁয়ে । মেয়ের শ্বশুরবাড়ির তক্তপোশে বসে বাপ চা খায় উদাস মুখে । এঁটো কাপ খাটের তলায় নামিয়ে রাখতে গিয়ে দেখে সার সার আলু বস্তা । জামাই ঘর বড় চাষী । একটা বস্তা থেকে বেরিয়ে আছে দুটো পা । পূবমুখী জানালার অল্প আলো এসে পড়েছে দুটি পায়ে, কোথাও যাবে বলে যত্নে আলতা পরা, একজোড়া রুপোর নূপুর। বাপ আরও খানিক্ষণ বসে থাকে, বেয়াইয়ের সঙ্গে চাষাবাদের গল্প করে । জামাই প্রণাম করলে মাথায় হাত রেখে শুভাশিস দেয় । তারপর ওঠে । ক্লান্ত পায়ে হাঁটা দেয়, অনেক ক্রোশের সে পথ ।
  পরে এক বুড়ো মাছশিকারির গল্প পড়ি । সান্তিয়াগো। যে রোজ একলা নৌকায় মহাসমুদ্রে পাড়ি দেয় মাছ ধরতে আর শূন্য হাতে ফিরে আসে । চুরাশি দিন পর সে দেখা পায় কাঙ্ক্ষিত মাছের । তিন দিন তিন রাত মস্ত সেই মার্লিনের সঙ্গে অবিশ্রান্ত লড়াই চলে তার । অবশেষে মাছটিকে কবজা করে নিয়ে চলে ঘরের পথে । তখন হানা দেয় হিংস্র হাঙরেরা । তারা মার্লিনের মাংস ছিঁড়ে খেতে চায় । আরেক প্রস্থ লড়াই শুরু হয় বুড়োর । কিন্তু এখন বড়ো পরিশ্রান্ত সে । হার মানে । ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে দেখে একটু একটু করে নিঃশেষ হয় মাছের শরীর, কেবল অস্থিসার পড়ে থাকে ।
 এই গল্পটা পড়ে আমার রাসুকাকার গল্পের সেই বাবার কথা মনে পড়েছে । আর দুটো আলতামাখা পা ধুলোভরা চটের বস্তা থেকে বেরিয়ে আছে । কৈশোর থেকে বড় হওয়ার বাঁকে বাঁকে সেই দুটো পা আমাকে অস্থির করেছে, ঘুমোতে দেয়নি । চোখ বুজলেই খন্ড দুটি নূপুর পরা লাল আলতার পা। সেই পায়ে পড়ে আছে সুদূর ফ্যাকাসে এক আলো । কেবল এটুকুই গল্প মা ।
 না, এটা গল্প নয় ।
কেন?
বড় মিষ্টি মেয়ে ছিল প্রণতি, সে তোর রাসুকাকার মেয়ে…
সব টের পাচ্ছি, সব ! এই মহাবিশ্ব, হাওয়া, মানুষ । টের পাচ্ছি মাধ্যাকর্ষণ, পৃথিবীর আবর্তন । যে তাপ এইমাত্র আমার শরীর থেকে নির্গত হল, টের পাচ্ছি, শিরা-উপশিরায় রক্ত বয়ে চলবার কোলাহল, টের পাচ্ছি জ্বরের ঘোরে কপালে রাখা তোমার হাত । টের পাচ্ছি তোমার বুকের দুধের প্রথম ফোঁটার স্বাদ, মুখ ভরিয়ে অজস্র চুমুর আদর । টের পাচ্ছি তরলে পূর্ণ অন্ধকার গর্ভের ঘর…
কে বলছে?
একটি মেয়ে, সে কতকাল পর তার মা-কে ফোন করে বলছে এসব ।
বুকের দুধের স্বাদ মনে আছে তার? যত্তোসব !
  তখন কি চারপাশ খানিক বেশি সবুজ ছিল?শৈশবে? এখন বহুদূর থেকে সে সবুজ নীল হয়ে আসে। জংলি লতাপাতায় ভরা পুকুরের পাড় ধরে পায়ে পায়ে তৈরি এক চিলতে রাস্তা। উদোম কচি দুটো পায়ে হেঁটে যাচ্ছে আমার শৈশব। কতোবার পায়ে বাবলা কাঁটা ফুটেছে। তুমি সস্তা ব্লাউজের গা থেকে সেফটিপিন খুলে নরম চামড়া অল্প অল্প খুঁড়ে কাঁটা বের করে দিয়েছো। পায়ের তলি থেকে বেরিয়ে আসা কাঁটা দুই আঙুলে নিয়ে ভেবেছি, যে গাছের এমন সুন্দর হলুদ ফুল ধরে তার কাঁটা এমন তীক্ষ্ণ হয় কী করে! পিঠে একটা নাইলনের থলে ঝলং ঝপং চলেছে, তাতে ভরা থালা, একটা স্লেট, খড়ি আর এক টুকরো স্লেট মোছার ভিজে কাপড়। হাঁটার তালে স্লেটে খড়িতে লেগে খটমট শব্দ ওঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখি, উঁচু আলের ওপর তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে, চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত। মাটির পাঠশালায় পাঠাচ্ছো আমাকে। স্কুলে ভর্তির বয়স হয়নি। বাড়ির কারও পড়াশোনা নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না তখন। এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আরেক বুনো গাঁয়ে সংসার করতে এসে সন্তানকে পড়তে পাঠাবার কেমন মরিয়া বাসনা তোমার। দরিদ্র সংসারের সীমাহীন জোয়াল ঠেলে সেই গোপন ইচ্ছে ভাবে ছিল?
মায়েদের হয়। আমার তো বেশিদূর লেখাপড়া হয়নি। হাভাতের সংসারে একটু বড় হতে না হতে তোকে না কোনো কাজে লাগিয়ে দেয়, ভয় ছিল।
 তালপাতার কয়েকটা চ্যাটাই। মাটির মেঝেতে জড়াজড়ি করে বসা আমরা ক’টা বামুন বাগদি মাঝি ঘরের ছেলে। স্লেটে অ আ ক খ, সুর করে সমবেত এক দুটো নামতা। তারপর হলুদ খিচুড়ি। তারপর ছুটি। ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ি থালায় ধরে সাবধানে চলেছি ঘরের দিকে। অনন্ত পথ পেরিয়ে এতটুকু খিচুড়ি মাটিতে না ফেলে তোমার কাছে পৌঁছবো উজ্জ্বল মুখে!
 স্কুল কলেজ সব তো আগে মন্দির ছিল। সবাই ঢুকতে পেতো না। বিদ্যেসাগরমশাই যখন কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ, কেবল বামুন আর বৈদ্য ছাত্র সেখানে। তাও বৈদ্যদের শাস্ত্রপাঠের অনুমতি নেই। যেমন করে একজন ভাস্কর পাথরের কণা কণা ভেঙে অবয়বের দিকে নিয়ে যায় তিনি সেই অচলায়তন ভাঙছেন নিঃসাড়ে। তাড়াহুড়ো করছেন না। কলেজের রক্ষণশীল অধ্যাপকের দল, প্রতিষ্ঠানের সম্মানে জড়িয়ে জাতের গৌরব! তাই শুরুতেই নানা শ্রেণীর শুদ্রদের আনছেন না, প্রথমে কায়স্থ তারও দু-তিন বছর পর নবশাখদের। আবার বাদ থেকে যাচ্ছে সুবর্ণবণিকেরা। ধীরে ধীরে বদল ঘটে যাচ্ছে, বদলে ফেলছেন তিনি।
 আর ঠিক সেই সময়ে পাশের হিন্দু কলেজে এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে যায়। ইংরেজদের বদান্যতায় এক পতিতার ছেলে ভর্তি হয়ে যায় হিন্দু কলেজে! উনিশ শতকের মধ্যভাগের বাঙালি হিন্দু সমাজে সে কি প্রবল আলোড়ন! বেশ্যার ছেলের ছোঁয়া থেকে বাঁচতে দলে দলে কলেজ ছাড়ার প্রতিযোগিতা। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন সেই পতিতার কথা, হীরা বুলবুল। শহরের বাবুরা, কলেজ কমিটির সভ্যরা যে পতিতার চরণ বক্ষে ধরে আমোদ করে প্রতি রাতে, মদের ফোয়ারা ওড়ায়, তারই ছেলেকে কলেজে স্থান দিতে কী প্রবল বিবমিষা! হিন্দু কলেজ ছাত্র শূন্য, বিকল্প মেট্রোপলিটন কলেজ গড়ে উঠছে, ভদ্র সমাজের সন্তানেরা ভর্তি হচ্ছে সেখানে। উপায় না দেখে হিন্দু কলেজ কর্তৃপক্ষ তাড়িয়ে দেয় বেশ্যা মায়ের ছেলেকে। সে ছেলের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সন্তান বিহনে হীরা বুলবুল একদিন উন্মাদ হয়ে যায়।
 আহা রে মায়ের মন, সমাজে ঘৃণার হলেও তার বুকেও যে সন্তানকে লেখাপড়া করাবার সাধ হয়। আচ্ছা কাছে যে বিদ্যেসাগরমশাইয়ের কলেজ ছিল, যদি তাঁর কাছে নিয়ে যেতো? তিনি ফিরিয়ে দিতেন?
হয়তো দিতেন। অন্য অনেকের সুযোগ যা তিনি বিন্দু বিন্দু গড়ে তুলেছেন, একজন ছাত্রের জন্য স্তদ্ধ করে দিতে পারতেন না।
 একেবারেই কি ফেরাতেন? গোপনে  সে ছেলের লেখাপড়ার ভার নিতেন না?কতোজনেরই তো নিয়েছেন, তাই না?
 মনে মনে চলে যাই সেই প্রায়ন্ধকার সময়ে। সুরম্য বাড়িগুলি থেকে ভেসে আসে মজলিসি সুর, বাঈজির গানে তবলার সঙ্গত। সমগ্র সমাজ হামলে পড়েছে কলকাতার অলিতে গলিতে এই বাড়িগুলির অভ্যন্তরে। আর অন্যদিকে দু’মুঠো অন্নের জন্য রাজপথে দেহ বেচে ফেরা রমণী, কিশোরীরা। লাইব্রেরিতে মধ্যরাত পর্যন্ত পড়াশোনার পর যখন বাসার দিকে ফিরতেন, তাদের কারও সঙ্গে কি একবারও সাক্ষাত হয়নি তাঁর? গোটা এক সভ্যতা যাঁর বৃষস্কন্ধে পা রেখে উতরে যেতে চেয়েছে। বাল্যবিধবার দুঃখে যিনি  আকুল, শিক্ষাহীন মেয়েদের জন্য যাঁর প্রাণ কাতর, রাস্তার মোড়ে মোড়ে সেই নারীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাতৃসমা মনে হয়েছে? চিরদুখিনী মা? তিনি কি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়েছেন? নাকি মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে যেতে চোখ ভিজে এসেছে তাঁর? বজ্রকঠিন মানুষটিরও যে অতি অল্পে যখন তখন চোখে জল এসে পড়তো। সে জল লোকে দেখতে পেতো না, কিছু জল দেখা যায় না।
 আমি ইতিহাসের গর্ভে হারানো জলটুকু দেখে নিয়ে আবার পাঠশালা থেকে ঘরের পথে ফিরছি। সমুদ্র তীর থেকে ডিমের প্রসব শেষে জলে নেমে যাচ্ছে অলিভ কচ্ছপেরা।
 দূরে আলের মাথায় দাঁড়িয়ে আছো তুমি।