অংশুমান-এর গদ্য

Spread This
অংশুমান

অংশুমান

বীজ ও পাথর ৩

স্বপ্ন
সত্য
নেশা

কিছু একটা ছিল। আগের মুহূর্ত অবধি তার বিন্যাস। স্মৃতিভ্রম আছে বলেই আজো পারছি সাজিয়ে নিতে আবার। কিছু একটা ছিলই, জঙ্গম, চরম ডাইনামিক।  অথচ কোনটায় আমি পা রেখেছি কখন, তা নিয়ে চালাকির শেষ নেই। স্থান-কাল সমুদ্রে হরেক কম্বিনেশনে ঠকিয়ে চলেছি আজন্ম। আমার আগামী পুরোটাই চিটশিট। অর্থাৎ, সূত্রপাতই বিলীন হয়ে আছে, শেষটাও তাই।

প্রত্যেকবারই একই উচ্চস্বরে বলে উঠেছি, ‘চলো হোক আরেক বার!’  বর্ষার রাত্রি, ভোরের বন্যা হয়ে বিছানায় গড়িয়ে গেছে। পেষা-ভাঙ্গা ছাইমাটি চোখের ভেতর ঢুকে আছে আপনাদেরও। ধোঁয়ারা চলে গেছে ভ্রমণে। নেশার আঙুল ছুঁয়ে গেছে যেসব স্ট্রিং, আজ মহাকাশে তার চিহ্ন। রেশ থেকে যায়। প্রতিটা নিঃশ্বাসের ভ্রমর গুনগুন করে। থেকে যায় বলেই আন্দাজ করতে পারি। কিছু তো ছিল, যার পিশাচ আমার পিছু ছাড়ে না। তাই আবার নতুন রুমাল, গীটার, তাস। অনেক সময়, কিছুই না। সবথেকে প্রিয় সেইসব জিনিস, যা মানুষ পার্থিব কোন কিছুর সাহায্য ছাড়াই করতে পারে। একেবারে শূন্য থেকে; উলঙ্গ। হাতে কিছু না থাকলে হাতসাফাই হবে কী করে! জানি, দাঁড়াতে হলে মাটি দরকার। অতএব, উপায়? শূন্যে ভাসা। শূন্যের ভাষা জানা দরকার।আপনারা রুমালের দিকে চোখ রেখে সময় নষ্ট করতে করতে ভাবছেন আমি লেভিটেশনের কথা বলছি। তাসগুলো চলে যাবে রুমাল জগতে। রুমাল নড়ে গেলে বেজে উঠবে গীটার। আমি জানি, আপনারা ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টায় নিজেরাই বিভ্রান্ত। বহুমাত্রিক অনস্তিত্ব কল্পনায় মশগুল, ভুলে গেছেন কোথাকার জল কোথায় এসে থামল। আমার ভেসে থাকার ক্ষমতা নেই।

একের পর এক চক্রান্তে আমি ম্যানেজ করছি এইসব আশা নিরাশা। নিয়ন্ত্রণ করছি আপনাকে। এরপর আপনার অস্বস্তি হবে। আপনার মনে পড়বে দেশ, কাল, দৌড়, যৌনতঞ্ছট, দাসত্ব। উঠে গিয়ে সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করবে, তলপেটে জমে থাকা ইউরিয়া থেকে এক তীব্র জ্বলন ত্বকের তলা দিয়ে বয়ে যাবে সারা শরীরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, সবকিছু আঁচ করতে পারা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। লোভ। যে আপনাকে আমার সামনে বসিয়ে রেখেছে। টেনে নিয়ে গেছে সমুদ্রে, জঙ্গলে, নদীর উপর কম্পমান সেতুতে, এমন কী এই অডিটোরিয়ামে বাথরুম থেকে আপনি ঝটপট সিগারেট টেনে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। প্রিয় শরীর আড়চোখে উপেক্ষা করে বা প্রিয় মানুষের পাওনা লুকিয়ে রেখে আপনি এগিয়ে আসছেন সামান্য রুমালের দিকে। সেই রুমাল আমার হাতে হাতে খেলছে।

আমি সত্যি আর মিথ্যে দুটোই একই ভঙ্গিমায় বলতে পারি। ফলে, তারা নিজেদের মধ্যে অস্তি বদল করতে পারে। স্বপ্ন থেকে যা পাই, নেশার ঘোরে বলতে থাকি। আপনার এত কিছু না জানলেও চলে। তবু, যেহেতু আপনি ধরে ফেলতে চাইছেন আমার ভেতরের এক চিলতে ক্ষীণজোনাকি আত্মা, ভাবছেন, কী করে তাকে নাকচ করে চলে যাওয়া যায়। কত অনায়াস হয়ে ওঠে। বিশ্বাস করুন, সহজে নয়। রেশ থেকে যায়। রিপিটিং প্যাটার্ন আমার এক অস্ত্র। তাজ্জব। ভয়ানক কিছু ঘটবে এমনি তাড়নায় বুকের ভিতর এক শ্বাপদ অনবরত গড়গড় করে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে চিবুকের কিনারায়। খুব সজাগ সবকিছুই।

এমন যে আগে হয়নি তা নয়। সম্যক। অভিজ্ঞতা সাজিয়ে আমরা গণনা করে ফেলতে চাইছি। চোখে চোখ রাখুন। আসুন বুঝে নিই একে অন্যের অঙ্ক, সূত্র, স্বতঃসিদ্ধ, মারকাটারি সব স্ট্র্যাটেজি, ঘাপলা, প্ল্যান, মিউচুয়াল শত্রু, উপাদেয় বন্ধু এমনকী ভালবাসার চিনচিনে অসুখের ঘাত ও দাওয়াই। পারফরমেন্সের মধ্যে দর্শককে ধীরে ধীরে আপন করে নিতে হয়। আগুনকে জিইয়ে রাখতে গেলে অনেক সময় নিজেই জ্বলে যেতে হয়। সে এক ধ্বক। বোকামি। যার জন্য এখনও চোখে চোখ রেখে আপনি আমাকে ফলো করছেন, ভাবছেন, রুমালই তো একমাত্র যার ক্ষমতা আছে ডিরেকশন দেওয়ার। অর্থাৎ, সব শেষে থেকে যাবে সেই। তারপর অনন্ত রুমালের মিছিল বুকের ভেতর থেকে এসে জড়ো হবে, অনিয়ত কালার প্যালেটের উত্তেজনায় জুতোসহ পা ঠুকবেন মাটিতে। কেউ কেউ ততক্ষণে খেয়াল করে ফেলবেন, গীটারটা গায়েব এমনকী কয়েকটা তাস আপনারই মতো কারোর পকেটে অবস্থান করছে। উশখুশ করবেন। হৃদয়ের গতি বেড়ে যাবে। বিকেলের আলো দেখতে ইচ্ছে করবে। মনে হবে, বাথরুম থেকে সোজা বেরিয়ে গঙ্গার ধারে চলে গেলে খোলামেলা নিঃশ্বাস পাওয়া যেত। এমনকি ভালোবাসার চিনচিনে অসুখ নিয়ে কিছুকাল, কিছুক্ষন নিজেকেই আগলে রাখা যেত, উচ্ছন্নে রাখা যেত নশ্বর। এই নগ্নতার সামনে পড়তে হত না। এই শঠ বেলেল্লা, এই রংলড়িয়ার শিকার হয়ে আপনার খুব অপমানিত লাগছে। ভয়ে পকেটের ভেতর হাত চালিয়ে দিতে আপনি সাহস পাচ্ছেন না।

আপনিই কেন?
কেন এই অপ্রস্তুত টারগেটেড মুহূর্ত?
অগণিত চোখের মাঝে কেন আপনাকেই উঠে দাঁড়াতে হবে?

পকেট থেকে সেই বেজ্জতির চিহ্ন তুলে ধরতে হবে আকাশে আর হাততালির স্রোত ভেসে আসবে আমার দিকে। আমি এই সম্মান ফিরিয়ে দেবার দাবি করতে পারব না। এইসব হুজ্জুতিই আমার টেক্কা। যারা এইমাত্র আকাশে উড়ছে, খসে পড়া তারার মতো ধীরে ধীরে নেমে আসছে অডিটোরিয়ামে। পারফরমেন্সের মাঝে টুইস্ট অবশ্যম্ভাবী, আপনি প্রস্তুত থাকলেও, হাতে রুমাল আমারই… এক ঝটকায় বদলে দিতে পারি। যা হওয়ার ছিল, যা হয়ে গেছে তার মাঝখানে স্লাইসার চালিয়ে দিতে পারি, যেকোনো মুহূর্তে আপনাকে বাঁচিয়ে দিতে পারি যাবতীয় মারজিন্যাল ভবিতব্য থেকে। মনে পড়বে, আঘাত খেতে খেতে গাছেদের বড় হওয়ার কথা। রেশ থেকে যায়।  প্রত্যেকটা প্রতিঘাতী পিশাচ ঠিক মাথার পেছনেই ফিসফিস করে। কুর্নিশ।