শৌভিক কুন্ডা-র ভ্রমণ

Spread This
শৌভিক কুন্ডা

শৌভিক কুন্ডা

  রেশমপথিক

নামটি রেশম পথ, কিন্তু একটা  সময়ে অন্তত এ পথে চলা আদৌ রেশমমসৃণ ছিলো না। বাঁকে বাঁকে, যাঁরা জানতে চান, তাঁদের জন্য লুকিয়ে আছে জানা-অজানা ইতিহাসগান। দু হাজার বছরেরও প্রাচীন ধুলো মিশে আছে এ পথের বহমানতায়। খ্রীস্টের জন্মেরও শতাধিক বছর আগে(আনুমানিক ১১৪ খ্রীস্টপূর্ব) চীন দেশের হান রাজবংশের আমলে এ পথের পত্তন, পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ার বানিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে যার গুরুত্ব অপরিসীম।
তখন এনজেপি বা শিলিগুড়ি থেকে দুভাবে যাওয়া যেত রেশম পথের দিকে। কালিম্পং হয়ে পেডং বা ঋষি। সরাসরি ঋষিতেও আসা যায়। আমি এ পথেরই পথিক। তাই আগে বলে নিই কালিম্পং থেকে যাওয়ার পথটির কথা। কালিম্পং শহর ছাড়িয়ে ১৫ কিমি দূর আলগাড়া, আরো দু কিমি চললে বিশমাইল সেনা ঘাঁটি, পেডং এখান থেকে চার কিমি। পেডং থেকে ঋষিভ্যালি ১৫ কিমি। ভিন্নতার স্বাদ পেতে চাইলে ঋষি ও পেডং দু জায়গাতেই এক রাত করে থাকা যায়।  হাতে যাদের সময় কম, তারা যে কোনো একটি জায়গায় থেকে অন্যটি ডে আউটিং সেরে আসতেই পারেন।
আমার পরামর্শ,  অবশ্যই যদি হাতে সময় থাকে, ক্ষিধে খুব বেশি পেয়ে না থাকলে, স্রেফ হাতমুখ টুকু ধুয়ে এনজেপি  প্ল্যাটফর্মে শুধু এক কাপ চা খেয়ে নিন। স্টেশন থেকে বের হয়ে গাড়ি ছুটুক ইস্টার্ন বাই পাস ধরে। তারপর সেভক রোড। সালুগাড়া ছাড়াতে, মহানন্দা অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে মখমলি রাস্তায় আলোছায়ার জাফরি কাটা। কপালে থাকলে ময়ুর, হরিণ, চাই কি হাতিও চোখে পড়তে পারে, বাঁদরের বাঁদরামি অলমোস্ট গ্যারান্টেড!  ডানহাতের জঙ্গল  হাল্কা হয়ে এলে তার জায়গাটা নেবে তিস্তা, আর কখন যে হঠাৎ দৃষ্টিতে বাধা দেবে আকাশের পটে আঁকা নীলচে পাহাড়। সেবক পেট্রোল পাম্প ছাড়িয়ে গাড়ি দাঁড়াক। ডানহাতের গৌতম ধাবায় ঢুকে পড়ি চলুন। জানালা  ঘেঁষে জায়গা পেলে আপনার চোখকে তৃপ্ত রাখবে তিস্তা, তিস্তা ছাড়িয়ে ওপারের সবুজ পাহাড়।  রসনা তৃপ্তির জন্য চৌকো পরোটা,  আচার আর ধোঁয়া ওঠা মশলা চা। যাঁরা সাত সকালেই চোখ আর মন রাঙিয়ে নিতে চান, তাঁদের জন্যও সোনালি-লাল-ধূসর সব রকম ব্যবস্থাই আছে। চলতি গাড়ি আবার দাঁড়াক সেবকেশ্বরী মন্দিরের সামনে। পুজো দিন,  অথবা,  ধরমে মতি না থাকলেও দেখে নিন সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে,  জাগ্রত নাম্নী বিখ্যাত মন্দিরটিকে। এর পরের দাঁড়ানোর জায়গা করোনেশন ব্রীজ, স্থানীয় মানুষের ভাষায় ‘বাঘপুল’। ফটোসেশান সেরে আমরা ধরি সোজা রাস্তাটি। বাঘপুলকে ডান হাতে ছেড়ে দিয়ে। চলার পথে অনেক গুলো ঝোরা, নাম মনে রাখুন একে একে,  কালিঝোরা, শ্বেতিঝোরা, হনুমান ঝোরা, আন্ধেরি ঝোরা ইত্যাদি। একে একে গেলখোলা,রামবি, রিয়াং, লোহাপুল, সাতাশ মাইল, লিখেভির(ধ্বসপ্রবণ) ছাড়িয়ে আসুন ‘তিস্তা’য়। স্থানীয় মানুষের উচ্চারণে ‘টিস্টা’। ব্রিজ পেরিয়ে একটু এগোতে চিত্রে। হোয়াইট ওয়াটার র‍্যাফটিংএ আগ্রহী?  নেমে পড়ুন তবে। লাইফ জ্যাকেট এঁটে র‍্যাফটে ভেসে যান তিস্তার বুকে। আপনার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করবে পেছনে ফেলে আসা লোহাপুলে। র‍্যাফটিং শেষে সে গাড়িই ফিরিয়ে আনবে চিত্রেতে। চিত্রে থেকে ডানহাতি রাস্তা উঠে গেছে কালিম্পংএর দিকে, আমরা চলবো সোজা। শিবখোলা, তারখোলা, মেল্লি বাজার পেরিয়ে রঙপো। এই রঙপো ঢোকার মুখেই কারুকার্যময় যে তোরণটি পেরোলেন, সেটাই কিন্তু জানিয়ে দিলো,  পশ্চিমবঙ্গের মাটি ছাড়িয়ে আপনি এই ঢুকলেন সিকিমে। যানবাহন,  দোকানপাট মিলিয়ে রঙপো বাজার বেশ জমজমাট। এতক্ষণের নৈসর্গিক নীরবতার  পর যেন কাঙ্খিত টী-ব্রেক! এর পর রঙপো তে-মাথা থেকে বেশিরভাগ গাড়িই ঘুরছে বাঁ হাতে, গ্যাংটকের রাস্তায়, আমরা যাবো ঠিক উল্টো, ডানহাতে। আমাদের ডান হাতে সঙ্গ দিতে শুরু করেছে রংপো নদী। নদীর  ওপারে পশ্চিমবঙ্গ, আর আমরা রয়েছি সিকিমে! রাস্তার ওপর দেখতে পাবো সিপলা কোম্পানির বিশাল কারখানা।  আর একটু এগোলেই রোরাথাং। ব্রীজ পেরিয়ে  নদীকে এবার বাঁ হাতে রেখে শুধু সবুজ রঙেরই অজস্র শেড দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবো রেনক। আর একটু পরেই নেমে যাওয়া মূল রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে মাটি পাথর বিছানো পথ বেয়ে উপত্যকায় ঋষি নদীর ধারে। গাড়ি থেকে নেমে একবার চোখ বুলিয়ে নিন। পায়ের কাছে বয়ে চলেছে ঋষিখোলা, ওপারে ছোট্ট ছোট্ট কটেজ, সবুজ পাহাড়ের কোলে ফ্রেমে বাঁধানো ছবি যেন এক!
গাড়ি এ পারেই থাকবে। স্থানীয় মানুষরা পাথর সরিয়ে, মাটি কেটে দিব্যি পার্কিং লট তৈরি করে রেখেছে, চিন্তার কারণ নেই কিচ্ছুটি।  এবার মালপত্র নিয়ে ঋষিখোলার ওপর হাতে তৈরি অস্থায়ী সাঁকোটি পেরিয়ে যাওয়ার পালা। অত্যুৎসাহীরা জলের বুকে উঁচিয়ে থাকা পাথরও টপকাতে পারেন। তবে বর্ষা কালে সাবধান। জলের তোড় সাঁকোটিকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায় কখনো কখনো।
ওপারে পৌঁছাতে আপনাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসবেন ছোটখাটো, পোক্ত চেহারার যে মানুষটি, তিনিই সেবাস্টিয়ান প্রধান, অনাঘ্রাত ঋষি উপত্যকাকে পর্যটন অনুকূল করে গড়ে তোলার প্রাণপুরুষ। আপনার জন্য নির্দিষ্ট কটেজের বারান্দায় বসে চাএর চুমুক শেষ করে যদি দেখতে পান, ছোট জাল কাঁধে সেবাস্টিয়ান চলেছেন নদীর দিকে, সুযোগ হারাবেন না, সঙ্গ ধরুন।  রঙিন পাথরে ঘিরে প্রধান তৈরি করেছেন চমৎকার এক ফিশিং পুল। ওঁর হাত থেকে নেটটি নিয়ে আপনি নিজেই ছেঁকে তুলুন না টাইগার ট্রাউট,  চেপটি বা ট্যাংরা! রিসর্টের ক্ষেতেই জন্ম নেওয়া রাইশাক, ডুকরু, কালিদাল, ইস্কুশ আর ডল্লো খুরসানির আচার সহযোগে নিজে হাতে ধরা টাটকা মাছের হাল্কা ঝোল, আহ অমৃত। সেবাস্টিয়ানকে বলে রাখুন কিছু মাছ  তুলে রাখতে। সন্ধ্যের তরল আমেজে মুচমুচে মাছভাজা একদম প্রাণের সঙ্গী হবে।
দুপুরে একটু জিরিয়ে নিয়ে বিকেলের চা সেরে, পকোড়া মুলতুবি রেখে হাঁটতে চলুন। আমি গেছিলাম একা।  হাঁটারও সাথী জোটে নি কেউ। সাঁকো পেরিয়ে,  উপত্যকা ছাড়িয়ে ওপর পাহাড়ে পা। গাড়ি যে পথ থেকে নীচে নেমেছিল, তার উল্টো,  অর্থাৎ আমার ডানহাতি রাস্তায় হাঁটা শুরু করলাম। দুপাশে বাঁশ আর ধুপি জাতীয় গাছই বেশি। ক্রমঅস্তায়মান সূর্যের আলো পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে, চোখের ওপর আকাশ আর চলার পাশের পাহাড় রঙ বদলাচ্ছে, সোনা রঙ থেকে কমলা, ফের গোলাপি,  তারপর ধূপগন্ধী ছায়া! অন্ধকার হচ্ছে। অনেকটা হেঁটেছি, এবার ফিরতে হয়। কিযে মনে হল, চেনা মোটরপথ ছেড়ে বাঁ হাতে জঙ্গল পথেই রওনা হলাম। আর, আধ ঘন্টা মতো হাঁটার পর বুঝতে পারলাম,  নিজের ওপর যতই ভরসা রাখি, বস্তুত নবকুমার পথ হারাইয়াছে!! তবে, স্কুল জীবন থেকেই হুটহাট বের হয়ে পড়া আমি এটা জানি, দুঃসাহসীদের সাহায্য জুটেই যায়। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। পাহাড়ি এক মেঘবালকের (মেষপালক)  কৃপায় উপত্যকায় ফেরার পথ খুঁজে পেলাম। সেবাস্টিয়ান, তাঁর স্ত্রী,  কনভেন্ট পড়ুয়া মেয়েরা অপেক্ষাতেই ছিলেন। ডাইনিং লাউঞ্জেই গিয়ে বসলাম। ডাবল ব্ল্যাক সাথে ছোট মাছ ভাজা। তরলপথের যাত্রী হোন বা না হোন, ঘোর সন্ধ্যের অবকাশে প্রধান সাহেবের ফোটোগ্রাফি কালেকশন মিস করলে আফসোস থেকে যাবে কিন্তু! যাঁরা নভিস, তাঁরা নির্দ্বিধায় সেবাস্টিয়ানের কাছ থেকে ক্যামেরা ও তার একসেসরিজের ঠিকঠাক ব্যবহার জেনে নিতে পারেন। তথ্য সংগ্রহে আগ্রহী যাঁরা, এই অবকাশে গল্পে গল্পে জেনে নিতে পারেন,  কিভাবে এই পান্ডববর্জিত জায়গায় ট্যুরিজম প্রোমোশনের ভাবনা মাথায় এলো সেবাস্টিয়ানের, কি ভাবে স্রেফ নিজের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চললেন তিনি। অনবরত পরিবর্তন বা সংযোজনের পথ ধরে আগামী পরিকল্পনাই বা কি তাঁর। অন্ধকারে ছোট্ট ট্রেকিং এরও স্বাদ নিতে পারেন সেবাস্টিয়ান প্রধানের হাতে হাত রেখে।  রাত একটু বয়সী হলে নেমে আসুন কটেজ থেকে ঋষির ধারটিতে। নদীর উচ্ছ্বল কলধ্বনি,  বাতাসের শনশন ষড়যন্ত্র,  অন্ধকারে কালো হতে থাকা পাহাড়, আর তার শরীরে এখানে-ওখানে জ্বলে উঠতে থাকা হীরের কুচি আলো, এক অপার্থিব স্পেসে নিয়ে যাবে আপনাকে। সময় কিভাবে মুঠো গলে ঝরে পড়ছে, টেরই পাবেন না! আপনি ভাবতে থাকছেন হাজার বছরেরও পুরনো অভিযাত্রীদলের কথা। ঘোড়ার পিঠে, এমনকি পায়ে হেঁটেও যাঁরা এ পথেই বয়ে নিয়ে চলতেন বানিজ্যিক পসরা, ভারত থেকে চীন, মধ্য এশিয়া,  অথবা উল্টো পথে। সে প্রাচীন ইতিহাস আপনার একা মনকে গ্রাস করে নেবেই, অচিরেই আপনি হয়ে উঠবেন সেই পূর্বপুরুষদেরই একজন।

ছবি : লেখক এবং অন্তর্জালের সৌজন্যে পাওয়া।