স্বপন রায়-এর ভ্রমণ

Spread This
স্বপন রায়

স্বপন রায়

নতুন কবিতার পথে

১.

(বর্ণিত যা কিছু হয়ত কাল্পনিক নয় আবার অতটা সত্যিও। চরিত্র সৃষ্টির জন্য একটা শব্দও লিখিনি। কবিতার জন্য কিন্তু নতুনকে অভ্যস্থ, ব্যবহৃত  ঘরের ছায়ায় পাওয়া যাবেনা। রবীন্দ্রনাথের যেমন মনে হয়েছিল মনে মনে হারিয়ে যাওয়ার মুসাফিরি, বিকল্প জীবন তেমনি এক মুসাফিরি। পাঠক, ‘ইজি’। ‘নতুন কবিতা’য় কোনও ‘রেজিমেন্টেশন’ নেই, ‘অর্ডার’ নেই। হাল্কা পল্কা হাঁটতে থাকুন, পায়ে নতুন বাজবেই, বেই..)

 শিলিগুড়ি। জোড়থাং। ইয়ুকসাম।

হোটেলের বাইরে রোদ পোহাচ্ছিলাম। ইয়ুকসাম একসময় সিকিমের রাজধানী ছিল। এখন পাহাড়ের গায়ে আটকানো একটা গঞ্জ। এখান থেকেই গোয়েচালা ট্রেকিং শুরু হয়। আমার গন্তব্য যদিও কাংলা পাস। এটা নেপাল আর সিকিমের সংযোগকারী গিরিখাত। এইসব সাতপাঁচ ভাবছি যখন লম্বা, একহারা একটি ছেলে এসে হঠাতই বলল, দাদা, আর ইউ ফ্রম কোলকাতা?

মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ বাচক।

-আয়াম শশী। শশী নায়ার ফ্রম মুম্বই।

-হেলো

ছেলেটি এবার ভাঙা বাংলায় বলল, আমি জানতাম আপনি এখানে আসছেন তাই অপেক্ষা করছি।

একটু অবাক হলাম। শশী নায়ার বলে কাউকে চিনিনা। মুখ দেখেও তেমন কিছু মনে পড়ছে না। কে হতে পারে? এই ট্রেক ‘স্পনসর’ করছে ‘ইয়ুথ হস্টেলে’র কলকাতা শাখা। তাদের কেউ? কিন্তু আসছে তো মুম্বই থেকে, তাহলে?

শশী বলল, আপনার নামটাও আমি জানি, শৌভিক, ইজন্ট ইট? (বলল, শাউভিক)।

আমি হাসলাম। শশীর মাথার পিছনে একটুকরো ‘কাব্রু’ শৃঙ্গ উঁকি মারছে। দীর্ঘদেহী শশীর ছায়া আমার পায়ের কাছে। বললাম, ট্রেকিং গ্রুপের আর সবাই কোথায়?

-রিপোর্ট করেনি

আমি একটু অসহায় বোধ করলাম। এতদূর থেকে আসা, কতদিনের প্ল্যান, বললাম, কেন আসেনি, এনি ইনফো?

-শুনেছি একটা ট্রেন ‘ডিরেলড’ হওয়ায় ওরা ভাইজাগেই আটকে গেছে। আমি, আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। তবে, ইফ ইউ ওয়ান্ট, আমরা দুজনে কিন্তু ট্রেক করতে পারি। একজন ‘গাইড’ আর একজন লাগেজ ক্যারিয়ার’ লাগবে, দ্যাট ক্যান বি ম্যানেজড।

আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। অগত্যা। বললাম, চলো আগে কফি খাওয়া যাক।

##

শশীর সঙ্গে একটা হাল্কা বন্ধুত্ব গড়ে উঠল এক দিনেই। হয়ত পাহাড়ের গুণ। বা মানসিকতার। শশীও ঘুরিয়ে ছেলে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটিও হল। এই ইয়ুকসামেই অভিনেতা ড্যানির বাড়ি। গেলাম দুজনে। কাঠোক মনাস্ট্রি আর ডুবডি মনাস্ট্রিও ঘোরা হল। ওঠানামা করে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। জাওয়া ছেংরি আর কর্মা ভুটিয় আমাদের সঙ্গী হবে।জাওয়া গাইড আর কর্মা  মালবাহক। কাল দুজনে বেরোবো। যাবো কাংলা পাস। ফিরে যেতে হচ্ছেনা এতেই খুশি আমি। জীবন পুরনোই হতে থাকে। আর ট্রেকিং হল রিনিউয়াল, জীবনের।

২.

জোংরি। উচ্চতা তেরো হাজার ফুট। আজকের লক্ষ্য। বেশ ঠান্ডা। গাইড জাওয়া একটা স্টোভ এনেছে। চা, কফি আর ম্যাগি, চাল, ডাল, নুন, চিনি, আলু, পেঁয়াজের স্টকও ঠিকঠাক। কফির কাপ হাতে নিয়ে শশী আমার পাশেই বসে পড়ল। একটা পাথরের চাতাল। নিচে প্রায় হাজার ফুটের খাদ। পাইন, আর বার্চের জঙ্গল উঠে আসতে আসতে ক্রমশ ফাঁকা হওয়ার মুখে।

শশী বলল, দাদা ইউ রাইট পোয়েমস, নো?  অবাক হলাম। আমার কবিতা লেখার কথা মুম্বইয়ের শশী নায়ার জানলকিভাবে? বললাম, তুমিও লেখো?  শশী মাথা নাড়ে, বলে, ইটস নট মাই কাপ অফ টি, তবে ভাল লাগে। কিন্তু শশী, আমি যা লিখি – ওই যাকে তুমি কবিতা বলছ – এতো আমার কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ছাড়া কেউ জানেনা, আই অ্যাম নট আ সেলেব্রিটি, তো মুম্বইতে বসে তুমি আমার এসব গোপন কাজ কারবারের খবর পেলে কিভাবে? আবার সিকিমের ট্রেকিং-এ এসে তুমি আমার বায়োডাটা বলে দিচ্ছ, কী বলবো, ইজ নট দ্যাট সারপ্রাইজিং?  শশীর একটু হাসি রোগ আছে।  হাসতে হাসতে বলল, ‘ইয়ুথ হস্টেল’ সবার পরিচিতি পাঠিয়ে দিয়েছিল, আপনি বোধহয় পাননি। এছাড়াও আরেকটা সোর্স রয়েছে, আই উইল টেল ইউ এভরিথিং, বাট বিফোর দ্যাট এই হিমালয়ান নেসেন্সির জন্য কয়েকটা লাইন, প্লিজ…

 আমি চুপ করে থাকলাম।   শশী নাছোড়। এভাবে ‘ইন্সট্যান্ট’ কবিতা আমি বলতে পারিনা। তবুও ওর জোরাজুরিতে বলতে হলঃ

‘ রাস্তা দিয়ে পথ তৈরি করতে করতে সরু কথাবার্তা

 ব্রীজের বায়না নিতে চাইছে

 ভেজা, চারদিশারী গাছ

 টুপটাপ লিখিত বাটোয়ারা, ভাসা ভাসা

 আঁচলের ছায়ায় বৃষ্টির হাজার ইনিশিয়াল…’

৩.

বিদায় জোংরি। আবার হাঁটছি আমরা। আস্তে ধীরে স্বাদ নিতে নিতে এগোন। পেরিয়ে গেলাম জামলিং গাঁও। শশী অনেকটা নিচের দিকে হাত দেখিয়ে বলল, উঁচু জায়গায় না এলে অবজার্ভেশনে ফাঁক থেকে যায়, কী দাদা ঠিক বললাম তো?

শশীর মুখের ওপর মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। ম ম করছে জুনিপার। অবজার্ভেশন নিয়ে তো কত কথাই বলা যায়। দেখা সমগ্র দিয়ে শুরু হয়না। একটা কেন্দ্রে, দৃশ্যের একটা কেন্দ্রে চোখ আটকে যায় প্রথমে। ভাল লাগে। ভাললাগার স্বভাবই হল ছড়িয়ে পড়া। তখন ছড়িয়ে পড়ে চোখের ব্যাস। দৃশ্য হয় দৃশ্যাবলী। আবার যে কোনও দেখাই কিছু সময়ের পরে মিথ্যে হতে থাকে। মিথ্যে, কারণ তা মুগ্ধতা বা অপছন্দ দিয়ে প্রভাবিত করছে দেখাগুলোকে। সেখানে মিশে যাচ্ছে দ্রষ্টার চিন্তা ভাবনার তরঙ্গ, তার পছন্দ বা অপছন্দ মাফিক আলো, ছায়া, মেঘ ও উদার বনপথ।

মুখে বললাম, সামনে রথংচু, সাঁকোটাও দেখা যাচ্ছে।  জাওয়া অবাক হল, বলল, সাব আপ পহেলে আয়া থা ক্যা? শশীও অবাক। বললাম, বছর তিনেক আগে একবার। এই সাঁকো পেরিয়ে গেলেই ডানদিকে তিম্পিচু নদী, যেন ঝর্না! তো সেবার ফিরে আসতে হয়েছিল। জ্বরে পড়ে গেলাম। পারলাম না।

চুপচাপ হাঁটছি আমরা। নিরিবিলি এই পরিশ্রম। নির্জন এই চলার প্রতিভাকে বলা যেতে পারে চল্মি। চল্মি শব্দটা নতুন, আমার বানানো, মানা না মানা নিয়ে আমার কিছু যায় আসেনা। ঘরে বসে শব্দার্থ খুঁজলে এই শব্দের কোনও ব্যাখ্যাই আসবে না। মুসাফির জানে একমাত্র এই চল্মি’র রহস্য। কবিতাও তাই। ঘরেলু উচ্চারণ, অমুক ঋতু, তমুক স্মরণ, চুলছেঁড়া প্রেম, সমাজনীতি আর আবৃত্তি। দম বন্ধ হয়ে আসে। কবিতার ধারামুক্তি জট পাকিয়ে যাচ্ছে এভাবেই।

 -দাদা,সামনেদেখুন! একটা বেরিয়ে আসা পাথর, পাখির ঠোঁট। শশীর সঙ্গে উপরে উঠে এলাম। নিচে স্রোতল তিম্পিচু, ঝলমল করছে মেঘ সরানো রোদে।। জাওয়া আর কর্মা আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। ক্যাম্পিং-এর জন্য জায়গাটা সত্যিই চমৎকার। তুরামতারা মন এখন এই দৃশ্যের সামনে। জাওয়া আর কর্মা খাওয়ার ব্যবস্থা করছে। খিচুড়ি, ঘি, চিপস। শশীর মুখে রাজস্থানী সুর। শিস দিচ্ছে ও। সুর একধরণের সেন্সেশন দেয়, কবিতায় এই সেন্সেশন কিভাবে? দেখা গেছে প্রতিষ্ঠিত শব্দ বা ব্যবহৃত শব্দগুলোই সেন্সেশনকে বাধা দেয়। শব্দের প্রতিষ্ঠা মানেই রেফারেন্সের প্রতিষ্ঠা। ভোর-এই দৃশ্য বা দৃশ্যবিন্দুকে অনুভাবনায় রাখলে দেখা যাবে ভোর আর বিষয় হিসেবে থাকছে না। ফলে বর্ণনা বাদ। বিষয়কে হীন করার মত রেফারেবল শব্দ কবি তখন খুঁজতে থাকেন। ‘দারুজ্যোৎস্না’ লিখলেন উৎপল কুমার বসু এভাবেই হয়ত। বারীন ঘোষাল লিখেছেন, ‘সাঁতাকেন’ বা ‘হৃম’ এরকমই কোনও খোঁজ থেকে। তবে শব্দ, এমনকি নতুন শব্দও কবির কাছে জোড়াইয়ের মশলা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই কবিকে মজে থাকতে হয় চেতনার নতুনায়নে।

শশী খুব ছবি তুলছে। তুলতে তুলতে বলল, দাদা আমার প্রফেশন হল এডিটিং, তো এখন এই লেন্সের ভেতর দিয়ে এডিট করে যাচ্ছি। দেখুন ওই শাদা পাথরটার বাঁদিকে গাছের ডাল পড়ে আছে। আমি ডালটাকে বাদ দেবো।পেছনের পাহাড়টা দেখুন গ্রীন। পাথর হোয়াইট। এই ডালটা ডেড, ফলে ফ্রেম থেকে বাদ। গ্রীন অ্যাণ্ড হোয়াইট, এনভায়রনমেন্ট অ্যাণ্ড পিস, সিম্পল!

 শশী এবার আমার ছবি তুলছে। ওকে বললাম, কবিদেরও এডিট করতে হয়। -বাট এডিটরস জব ইজ প্রেডিক্টেবল, কিন্তু কবিতা কী প্রেডিক্ট করা  যায়?

-কবিতাকে যায়না। তবে কবি তার লেখাকে যদি ফেলে রাখে, অনুভূতিগুলো স্বতস্ফূর্ততা থেকে বের করে আনতে পারে তাহলে। মেদ কমে আরকি! শশী বলল, এ ব্যাপারে আমি কিছু বলছি না, এটা আপনার এলাকা। বলেই একটা ঢাল দিয়ে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। ওর বাছাবাছি চলছে। ট্রেকিং-এ বেরোলেই আমি ভাবনার সুতো বুনতে আরম্ভ করি। যখন ক্লান্ত, গা এলানো, খিচুড়ির গন্ধ ভাসছে, তখন। কবিতা দু’রকমের প্রাথমিকভাবে। অধিকাংশই শব্দ সচেতন। শব্দের মায়া, শব্দের ভুবন, শব্দব্রহ্ম, এভাবে। অল্প আছেন যাঁরা চেতনাপিয়াসী। এঁদের কাছে শব্দ শুধুই রেফারেন্স। শব্দ সচেতন কবিরাই মনোহারী কবিতা লিখে থাকেন। চেতনানুসারী কবিদের যেতে হয় নানারকম অভিজ্ঞতা আর কল্পনার ভেতর দিয়ে। এই অভিজ্ঞতাগুলো বিমূর্ত এবং কাল্পনিক।এঁরা শুধু শব্দ নয়, কবিতার প্যাটার্ণ, ডিকশন থেকে আরম্ভ করে প্রতিষ্ঠিত ভাষাকেও আক্রমণ করেন প্রথমাবস্থায়। কবিতা থেকে প্রতিকবিতায় এভাবে। -দাদা উঠঠিয়ে খিচড়ি রেডি হ্যায়, চোখ মেলে দেখলাম জাওয়া ডাকছে। আমি ঘুমোই নি। স্বপ্ন দেখছিলাম, কবিতার। আজ এখানেই বিশ্রাম। খাওয়া দাওয়ার পরে শশী হঠাৎ বলল, দাদা আপনি শ্রীকে চেনেন, জয়শ্রী আয়েঙ্গার? চমক সামলে খুব আস্তে বললাম, কোন জয়শ্রী?  -খড়গপুরের, আপনি তো খড়গপুরে থাকতেন? আমি কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলাম।, শশী তুমি বাংলা শিখলে কোথায়?  -শান্তিনিকেতনে দাদা, আমার একটা ডক্টরেট ডিগ্রি আছে, তো তখন শিখেছিলাম, কিন্তু দাদা আপনি কথা ঘোরাচ্ছেন কেন, ডোন্ট ইউ রিমেমবার জয়শ্রী? জয়শ্রী আমার প্রথম প্রতিরোধ। প্রথম ‘ব্লাইন্ডনেস’। এমনকি গতানুগতিক জীবন থেকে আমায় প্রথম ‘ডিসম্যান্টল’ করে জয়শ্রীই। আমি লিখেছিলাম, ‘ আয়েঙ্গার সভ্যতার দিকে উড়ে যাচ্ছে কারুনির্জন পাখিরা…’ আবেগ কথাকারির নিম্নস্তরে উৎসারের মুখ খুলে দেয়। খড়গপুরের রেলজীবন, সাউথসাইডের অসংখ্য ‘বুলভার’-এর রিমঝিম ছায়াপুরান, এসবই আমায় সাধারণ থেকে পাগল করেছিল। তখনকার প্রিয় গান, পাগল হইয়ে বন্ধু, পাগল বানাইলে পাগল…মুখে বললাম, জয়শ্রী কেমন আছে শশী?  শশী বলল, জয়শ্রী এখনো আপনাকে ‘মিস’  -শশী, লাইফ ক্যান নট বি অলওয়েজ শ্রী, তাছাড়া ‘বাইগনস আর বাইগনস’, তুমি জয়শ্রীকে চিনলে কী করে?

-আমরা খুব ভাল বন্ধু

-শুধু বন্ধু? শশী, এখান থেকে ওখানে এটাই লাইফ। আমি ‘নতুন কবিতা’য় এসেছি এভাবেই, অ্যাণ্ড আই অ্যাম এনজয়য়িং ইট, টু বি ফ্র্যাংক পুরনো কবিতার মত পুরনো দিনও আমায় চালায় না, জয়শ্রীও এরকম, নাইস বাট ইরেলিভেন্ট। শশী কিছু বলল না। বিকেল শেষ। হিমশীতল ঠাণ্ডা নেমে আসছে একটা নতুন সন্ধ্যার ওপর।

নতুন চারিদিকে। বাইরেই নতুন  আমরা হাঁটছি। ডানদিকে ‘কাব্রু হাম্প’ দেখা যাচ্ছে। পিছনে ‘মাউন্ট কাব্রু’। ছড়িয়ে পড়ছে গতিশোয়ানো আলো। পড়ছে মুখের ওপর। নির্জনতার খুশি এখন পশমিক শুধু নয়, নয় শুধু ‘উলেন’ লয়কারি। যদি ‘অ্যাডভেঞ্চার’ হয় কোনও বিরল নিষ্ক্রান্তি তবে তার কেন্দ্র খোঁজা, অণুকে খোঁজার মত দুরূহ হলেও ভবিষ্যময়। ‘নতুন কবিতা’ সেই লিখবে যার এই কেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস আছে। আর এই হাঁটার প্রতিটি পদক্ষেপ এক ‘নতুন’ নিয়ে আসছে। ঘুরে ঘুরে উঠে যাওয়া রাস্তায়, তুষারাছন্ন পর্বতের চূড়োয় চলেছে অবিরল নতুনের উৎসব। আমিও এই ‘সেলিব্রেশন’ মাথায় রেখে দেখলাম একটা জলবিভাজিকার কাছে তাঁবু টাঙাবার তোড়জোড় করছে শশী, জাওয়া আর কর্মা। আমিও হাত লাগালাম। এই জায়গাটার নামেও একটা ‘অনুস্বার’ আছে।‘মুয়ারিপাংচু’।

৪.

চা খাওয়ার ফাঁকে আমি শশীকে আলতোভাবে জিগগেস করলাম, তুমি মনে হয় আমায় যাচাই করেতে এসেছ, তাইনা শশী? শশী একটু হবাক। হতচকিত নয়, অবাক। বলল, শ্রী’র কোনও কথা আমি ফেলতে পারিনা। ওর মধ্যে একটা অপরাধ বোধ এখনও। আপনিতো তখন হায়দ্রাবাদে।, শ্রী’র বাবার ট্রান্সফার হওয়াতে ওরা মুম্বই চলে এল। আপনাকে জানাতে পারেনি, যোগাযোগ করতে পারেনি, এটা এখনও ওকে ভাবায়। ওর বাবা কিভাবে যেন জানতে পেরে সবকিছু, ওকে খুব ব্যাডলি ট্রিট করে, শাসায়। ওরা তামিল ব্রাহ্মণ, আপনি জানেন ওরা কতটা ‘কনজারভেটিভ’ হয়, শ্রী কিন্তু এখনো ভুলতে পারেনি আপনাকে।   -আমি এসব জানতাম না শশী, জানলেও কী করতে পারতাম? আমার কথায় শশী হাসল। নির্ভার। এই যেমন মেঘ সরিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি রোদ নেমে এল মুয়ারিপাংচুতে। শশীকে আমি বললাম না, শ্রী কিভাবে আমায় বিশৃঙ্খল করেছিল। ক্ষীর বসছে এমন রোদজমা শীতের দুপুরে আমি এখনো শ্রী’র একেকটা কোণ দেখতে পাই। যৌনসুতোর রিবন থেকে খুলে যাচ্ছে বুনতে থাকা সিঁথিপথ, পেয়ারা ফলের আভা, চেরাই মেশিনের তুলবুল আওয়াজ। এসব কথা বলা যাবেনা শশীকে। শশী বলল, দাদা শ্রী শিলিগুড়িতে আসছে, ওর বন্ধুর বিয়েতে। ওন্ট ইউ মিট হার? আমি একটু হাসলাম। হেসে চাপা দিলাম আমার স্তব্ধতা। আমার নিয়তিকে।

##

এবার দুধপোখরির দিকে হাঁটা।

##

রাস্তা কিছুটা বিপজ্জনক। ঝুলন্ত পাথর, বোল্ডার পেরিয়ে ক্রমশ। ‘নতুন কবিতা’র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এভাবেই পরিণত হচ্ছে। মিশে যাচ্ছে সার্বিক অনুভবের বিদ্যুৎছটায়। বিষয়হীনতা, নতুন শব্দ, অচিত্রকল্পনা, কাল্পনিক অভিজ্ঞতার গতিময় লিপিকলা, অর্থ এবং ব্যাখ্যা পেরিয়ে ঢুকে পড়া সম্প্রসারিত চেতনার সত্যে, যা অতীত নয়, বর্তমান নয়, শুধুমাত্র ভবিষ্যতের, নতুন ক্যারি করছে সবকিছু। গিমিক মুছে যাচ্ছে। নাটকও। ‘নতুন কবিতা’ মিশে যাচ্ছে কবিতার অপরিমেয় তরঙ্গে। অনুভব করি হাঁটতে, হাঁটতে হিমালয় আছে বলেই আমরা আসি এখানে আর কবিতা আছে বলেই কবি যায় কবিতার কাছে, কবি টের পায়। যায় আনবাড়িতে, যায় অভিসারে, যায় রোমাঞ্চ সিরিজে, সুখে, অসুখে কবি কবিতা টের পায়। সবইতো কবিতা, যেমন আমিও পাচ্ছি সবকিছুতে এখন।

প্রায় সাড়ে তিনঘন্টার চলা শেষ করে দাঁড়িয়ে রয়েছি ধারামুক্ত কবিতার সামনে।পায়ের নিচে কাংলা। সামনে মেঘ আঁচড়ানো ‘জানু’ পর্বত শিখর। পা ডুবে যাচ্ছে তুষারে। আর কী চাই!

##

ইয়ুকসাম থেকে ফেরার সময় আমি মনস্থির করে নেমে পড়লাম ‘গেজিং’-এ। শশীও নামল। অবাক হয়ে বলল, দাদা ব্যাগ অ্যাণ্ড ব্যাগেজ নিয়ে নেমে পড়লেন যে! – ‘গেজিং’-এ আমার কিছু পুরনো বন্ধু বান্ধব আছে, দেখা যাক ওদের সঙ্গে অন্য কোথাও যাওয়া যায় কিনা। -কিন্তু শ্রী’কে কী বলবো আমি?                                                                                                                                  -ওকে বলবে পরে কোনও এক সময়ে হয়ত দেখা হবে। হয়ত না। তবে শশী ডোন্ট ওয়েট ফর মি, ইফ পসিবল স্টার্ট আ নিউ লাইফ উইথ শ্রী, শী নিডস ইউ! শশী হাসল। ট্রেকিং মুছে দিয়েছে অবিশ্বাস, সন্দেহ।বাস ছাড়বে, হর্ণ দিচ্ছে ড্রাইভার। শশী বাসে উঠে জানলা দিয়ে হাত নাড়ছে। হঠাৎ কুয়াশা। শশীর আঙুল আর তার ডগায় লেখা ধন্যবাদ মিশে গেল ওই আবছা হয়ে আসা কুয়াশার ভেতরে। আমি আবার পা বাড়ালাম। জীবন একটাই আর দেখা অফুরন্ত…..