স্বপন রায়-এর গদ্য

Spread This
স্বপন রায়

স্বপন রায়

চিঠি, যা নরম ছিলনা, মাংস ছিলনা..
 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) শুধু যুদ্ধ ছিলনা। মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধও সংঘটিত হয়েছিল নাৎসি পার্টির নেতৃত্বে। হিটলারের ‘ন্যাশনাল সোশালিজম’ খাঁটি আর্য রক্তের বাইরের সবাইকে চিহ্নিত করেছিল হীন জাতি হিসেব। প্রথমে আক্রান্ত হয়েছিল ইহুদিরা। তারপর কমিউনিস্টরা। সোশালিস্টরা তারপর। ডেমোক্র্যাট , লিবারেল একে একে সবাই। পোল্যাণ্ড আক্রমণের ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর ইওরোপ জুড়ে ইহুদি নিধন যজ্ঞ। প্রায় ছয়  লক্ষাধিক ইহুদিদের হত্যা করা হয়েছিল। এর মধ্যে লক্ষাধিককে মেরে ফেলা হয়েছিল গ্যাস চেম্বারে। সরাসরি হত্যা করা হয়েছিল তিন লক্ষাধিক সোভিয়েত যুদ্ধবন্দীদের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে  সারা দুনিয়ায় প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় এক কোটি মানুষ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল ইওরোপ এবং এশিয়ার বহু দেশ। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল দুনিয়া জুড়েই। আর এর ফলে মারা গিয়েছিল আরো কয়েক লক্ষ মানুষ। এরপরেও যুদ্ধ থামেনি। হত্যালীলা চলেছেই। আমাদের দেশেও যুদ্ধবিলাসী লোকের অভাব নেই। যাইহোক, যুদ্ধ তো কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। ব্যক্তিমানুষ, যতই অরাজনৈতিক বা নিরপেক্ষ হোক না কেন, যুদ্ধ তাকেও ছাড়ে না। তার ব্যক্তিজীবন, সাংসারিক জীবনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যা চূড়ান্তভাবে হয়েছিল। এই লেখাটা ওই যুদ্ধে নিয়োজিত দু’ জন কাল্পনিক কবিকে নিয়ে , একজন জার্মানির আরেকজন সোভিয়েত । একজন কবি  যখন তার প্রেমিকা বা বন্ধুকে চিঠি লিখতো, কী থাকতো সেই চিঠিগুলোয়? এরকম কিছু চিঠির নমুনা আছে ইন্টারনেটে। তবে সেগুলো চিঠিই, কবিতা নয়।  আমি একটু গভীরে গিয়ে ভেবেছি একজন তরুণ কবির প্রতিক্রিয়াগুলো। আর লেখার চেষ্টা করেছি তাদের কাল্পনিক প্রেমিকা আর বন্ধুর সঙ্গে,  তাদেরই বয়ানে চিঠি আর কবিতার আদানপ্রদান । হ্যাঁ, পুরোটাই আমার বানানো। তবে যুদ্ধটা নয়। যেদিন আমরা বুঝতে পারবো যুদ্ধ কাদের বানানো সেদিন সারা দুনিয়ায় আর যুদ্ধ হবেনা।

কাল্পনিক চরিত্রলিপি :
স্কোল ফিশার – কবি।জার্মান যুবক। প্যানৎজার ডিভিশন-৬ এর সদস্য। এই ডিভিশন পোল্যাণ্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্সে যুদ্ধ করার পর ১৯৪১-১৯৪৫ অবধি ‘ইষ্টার্ণ ফ্রন্টে’ নিযুক্ত হয়। এই গোটা ডিভিশন যখন স্তালিনগ্রাদে ‘রেড আর্মি’র কাছে ঘেরাও হয়ে পড়ে ‘হিটলার’ এই বাহিনীর প্রধান ‘ফ্রেডরিখ উইলহেলম এর্নেস্ট পাউলাস’কে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ না দিয়ে লড়াই জারী রাখতে বলে। ‘পাউলাস’কে ফিল্ড মার্শাল করে দিয়ে অপ্রত্যক্ষভাবে বলা হয় আমৃত্যু লড়াই করে যেতে অথবা আত্মহত্যা করতে। ‘পাউলাস’  হিটলারের নির্দেশ না শুনেই ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘রেড আর্মি’র কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আমার কাল্পনিক চরিত্র স্কোল ফিশার এই হতভাগ্য ডিভিশনের সদস্য ছিল।
সোফিয়া ওয়াগনার- স্কোল ফিশারের প্রেমিকা।
বেন বেকার- কবি। স্কোল ফিশারের বন্ধু। যুদ্ধের সময় গেস্টাপো বাহিনীতে যোগ দেয় বুদ্ধিজীবি প্রচারক হিসেবে। গেস্টাপোর প্রধান কার্যালয় ছিল ‘নিয়েদেরকির্শনারস্ত্রাবে’ তে। স্ত্রাবে মানে রাস্তা। বেন এখানেই কর্মরত ছিল।
আলেক্সেই ফেদোরভ (আলিওশা)- সোভিয়ত  রাশিয়ার সেনাদলের ২৮ নম্বর ডিভিশনের সদস্য। কবি। পলিটিকাল কমিশার, যাদের কাজ ছিল নাৎসি আক্রমণের যাবতীয় ভয়ংকরতার মধ্যে লাল ফৌজের মনোবল অটুট রাখা। হিটলারের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল পলিটিক্যাল কমিশারদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে গণ্য না করে ধরা পড়লেই গুলি করে হত্যা করার।
তানিয়া- আলেক্সেই ফেদোরভ-এর প্রেমিকা
স্কোল ফিশারের কাল্পনিক চিঠি / কবিতা
সোফিয়া,
আমি। আমি। আমি। সবজায়গায়। আকাশেও। ফ্যুরার, সেতো আমিই। কেক কাটা হচ্ছে, নদীর পাশে। আমিই আমার ফ্যুরার। পা রেখেছি, পোল্যান্ডে। নাও পাঠালাম। আকাশ আঁকা, নদীটি। তাতে কেকের গুঁড়ো। আমার দূরযেমন ভালবাসা।
-তোমার স্কোল।
১ সেপ্টেম্বর/১৯৩৯
সোফিয়া,
ট্রেঞ্চ থেকে দেখছি। না দেখাচ্ছি। শূন্য মাঠ। শস্য’র কুহকবিরতি।  পাখিদের স্বভাব, ওড়া। তুমি পাখি, তুমি উড়ো না কিন্তু। ডানা, পাখির কেচ্ছা নিয়ে ‘লুফৎওয়াফে’র উড়ানে শামিল। আমার ফ্যুরার, শামিল। ওইতো ‘মলোটভ’ আর ‘রিবেনট্রপ’। আর আমরা ট্রেঞ্চে। পোল্যান্ড একটা কেকের নাম। জার্মানি একটা দেশের নাম। সোফিয়া একটা মেয়ের নাম। ভালবাসা এই আর্য’র এক আর্যাকে।
-তোমার স্কোল।
২ সেপ্টেম্বর/১৯৩৯
সোফিয়া,
রক্ত। লাল হলেও, আলাদা। আমার রক্তে আঙুর খেতের অভিসার। তোমারও। একজন ইহুদির রক্তে রাইখসমার্কের গন্ধ। আমার, তোমার রাইখসমার্ক। ইহুদিরা দখলে রেখেছে। রক্ত আলাদা। দাম আলাদা বলে। ফ্যুরার বলেছেন, আমরা করছি। ইহুদিদের রক্তে আর রাইখসমার্কের গন্ধ থাকবে না। রক্তে লাগবে আবার ঘোর, ‘প্রজাপতি’র, ফ্যুরারের।
-তোমার স্কোল।
 ৪ সেপ্টেম্বর/১৯৩৯
সোফিয়া,
আমি আবার। ওডের একটা নদী, আকাশ রাখে যে। আজ রেলের কামরায়, কালও। নদী পেরোবার সময় শারীরিক সবকিছু। ঝাঁকুনিও, তোমায় ভেবে। কাঠের কামরায় জ্যান্ত আমাদের গান। কাঠের ভেতরে বেহালা, পিয়ানো, চেলো। পেস্ট করা। লাইন বদল হলে বুঝতে পারি, বেহালা কাঁদলো, পিয়ানো নেচে উঠল আর চেলোর চিৎকার। কাল আমি প্রথম একজনকে মারলাম। হাত একটু কেঁপেছিল। লোকটা ইহুদি, তাও!
-তোমার স্কোল।
৭ সেপ্টেম্বর/১৯৩৯
সোফিয়া,
সময় হল, এবার বেরোবো। আজ ভোরে স্বপ্ন দেখলাম, ফ্যুরার। আমি বলতে গেলাম, হেইল হিটলার…..তার আগে শব্দ হল। এয়ার রেইড? বেরিয়ে দেখলাম, ফ্যুরার! গোঁফের ডগায় দুটো ডানা, প্রজাপতির। সঙ্গে ‘ওয়াগনার’।‘ওয়াগনারে’র ‘লিবেসটোড’, ‘প্রেম এবং মৃত্যু’ আমার ড্রয়িংরুমে। ফ্যুরার পারে। ‘ওয়াগনার’ জ্যান্ত এখন, হাতের ব্যাটন উঠছে, নামছে। ‘অপেরা’র কাছে নতজানু ফ্যুরার আর ‘এস.এস’ বাহিনীর ছোকরারা। ১৯৩৯ নয়, ১৮৫৯। ‘ইসওল্ড’ কাঁদছে ‘ত্রিস্তানে’র মৃতদেহের সামনে। ‘লিবে’ মানে প্রেম, ‘টোড’ মানে মৃত্যু। ‘ওয়াগনারে’র বিখ্যাত অপেরা। ১৮৫৯। ব্যাটনের ওঠা আর নামায় প্রেম আর ইহুদিরা মরে যাচ্ছে। তাদের মুছতে হবে। ফ্যুরার বলল, ডাস্টারটা দাও। মুছে, কফি খাবো….
ডাস্টার কোথায়, ঘেটোতে? আমি কোথায় পাবো! শুওরের বাচ্চা ইহুদিগুলো, মরছে। মুছে যাচ্ছেনা। আমি খুঁজতে থাকি। একসময় উঁকি মারি ড্রয়িংরুমে। একি দেখছি! কেউ কোথাও নেই। মরা নৈস্তব্ধ। ফ্যুরার একা দাঁড়িয়ে। প্যান্ট খ’সে গেছে। জাঙ্গিয়াও। লিঙ্গ নেই। ফ্যুরারের লিঙ্গ নেই….
আমি ক্যাম্পে। ড্রয়িংরুমে তুমি। খবর শুনছ। অনেক অনেক দূরে। আমি স্বপ্নটা ভুলতে চাই। ফ্যুরারকে নয়। ভালবাসা নিও।
-স্কোল।
৯ সেপ্টেম্বর/১৯৩৯
  সোফিয়া,
শাসক আমি। পোল্যান্ড আমার জুতোর ফিতেয় লটকানো। ফ্যুরারকে দেখো ‘we er la chelt’(  কিভাবে তিনি হাসেন), ডানহাত কাঁধের ওপরে উঠে যায়। হাত নয়, শাসনের হাত। আমি হাতের ব্যবহার কত কম জানতাম। পোলিশ মেয়েদের চাইলেই….আমি হাত ভালবাসি। তোমার আর আমার। পপলার গাছগুলো আমাদের হাতে ছায়াময় স্মরণ মেখে দিত। রোজই। আমি লিখতাম হাতের ভিন্ন ছায়া গুলো। বেকার কবি। গ্রেট ডিপ্রেশন চলছে। ইহুদিরা কিন্তু বেশ। রাইখসমার্কের দেমাক। আমি ভালবাসার কাছে ঘৃণাকে বসালাম। হাত, একই হাত। ফর্সা আর উদ্যত, তোমায় ছুঁয়ে। ফর্সা আর উদ্ধত, ফ্যুরারের জন্য। ১লা সেপ্টেম্বর,১৯৩৯। ভোর চারটে। জার্মানি জানিয়ে দিল চুক্তি সাময়িক। ভার্সেই আজ থেকে অতীত। ‘স্কেলসউইগ হোলসস্টেইন’, আমাদের যুদ্ধজাহাজ কামান দাগলো, কেঁপে উঠল দেনজিং-এর পোলিশ গ্যারিসন। জার্মানির বারুদিয়ানায় ঘুম ভাঙবে এবার। চমকে উঠবে দুনিয়া। ভাল থেকো।
-তোমার স্কোল।
১১ সেপ্টেম্বর/১৯৩৯
প্রিয় বেন,
কেমন আছিস? তুই তো গেস্টাপোতে? আমি এখন ‘উইজনা’য়। কবিতা লেখার সময় পাস? আমি কবিতা হারিয়ে ফেলছি। সেপ্টেম্বর সাত থেকে দশ এখানে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হল। আমাদের বেয়াল্লিশ হাজার আর পোলদের হাজারের নিচে। ওরা তিনদিন আমাদের বুট খুলতে দেয়নি। আমাদের সাড়ে তিনশো ট্যাঙ্ক, ছশোসাতান্নটা মর্টার আর হাউইৎজার। সঙ্গে যুদ্ধবিমানের লাগাতার সাহায্য। ওদের ছশোছিয়াত্তরটা এম.এম. গান, বেয়াল্লিশটা মেশিনগান, দুটো অ্যান্টিট্যাঙ্ক রাইফেল। সাড়ে তিনশো ট্যাঙ্ক দিয়ে ওদের সরিয়ে দেওয়ার আগে আমাদের নশো জনের প্রাণ গেছে। ওদের সাতশো ষোলো। জানিনা ফিরে আসবো কিনা। আমার আর বেঁচে থাকার ভেতরে অজস্র বুলেট উড়ে যাচ্ছে। আমার নাম লেখা আছে কোনও একটায়। যাইহোক ফ্যুরারের জন্য প্রাণ গেলে যাবে। এই যুদ্ধে এসে রোজই কিছু না কিছু হচ্ছে যা আগে কখনো হয়নি। দ্যাখ সোফিয়া আসার আগে আমি মেয়েদের ছুঁয়ে দেখিনি এমনতো নয়। দেখেছি, শুয়েওছি। কিন্তু সোফিয়ার পরে সোফিয়াই শুধু। গতকাল সব কেমন গুলিয়ে গেল। ঘোলা হয়ে গেল। ‘উইজনা’ দখলে আসার পরে আমরা বাড়ি বাড়ি সার্চ করছিলাম ইহুদিদের ধরে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠাবার জন্য। এক্ষেত্রে, তুই জানিস আমার উৎসাহ বরাবরের। ইহুদিরাই আমাদের, জার্মানদের দুর্দশার জন্য দায়ি। ওদের দেখলেই আমি জ্বলতে থাকি। অনার্য, অসভ্য। ওদের ধর্মটাই হীন। আর মাথায় ওই বদখত টুপি। ফ্যুরার ওদের সম্পত্তি ক্রোক করে ওদের ঘেটো আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠাচ্ছে। ওদের টাকায় আমাদের অবস্থা ফেরাচ্ছে, আর কী চাই! যাইহোক, একটা দরজা টান মেরে খুলে ফেলতেই দেখলাম…বেন, আমি এমন মেয়ে জীবনে দেখিনি। ও মাই গড। মুখে শস্যশ্যামলা ইওরোপের ছাপ। শরীরে রাইনের ঈশারা। চোখের পাতায় ফারখেলানো পলক। বুকের তীব্র ফলদুটো পাখির ছটফটানি পুষে রেখেছে। মেয়েটি আমার পায়ে পড়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, তুমি আমায় নাও, নিয়ে আমার বাবা, মাকে বাঁচিয়ে দাও। এরকমই কিছু বলছিল। অধস্তন একজন চোখ টিপে বলল, স্যর নিয়ে নিন। আমি, বিশ্বাস কর বেন, সোফিয়াকে ভুলে গেলাম। ভুলে গেলাম মেয়েটা ইহুদি। ওর শরীরে হীন রক্ত বইছে। আমি বললাম, ভেতরে চলো। আমি নিলাম ওকে। ও দিল আমায়। ইতস্তত করেনি কোথাও। দারুণ। আমি বহুদিন পরে শরীরের সাফল্য দেখলাম। সব হয়ে যাওয়ার পরে মেয়েটি বলল, নিচে একটা বাঙ্কার আছে। বাবা, মা ওখানেই। আমি ভাবলাম, দেখা যাক যদি বাঁচাতে পারি। নিচে এলাম। বাঙ্কারের দরজা খোলা। মেয়েটি ছুটে ভেতরে গিয়েই চিৎকার করে উঠল। আমি উঁকি মেরে দেখলাম দুটো নিথর শরীর। বয়স্ক পুরুষ আর মহিলা। মেয়েটি ওর মায়ের শরীরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। অদ্ভুত নৈস্তব্ধ্য। ভেঙে দিল আমার অধস্তন সেই তরুণ অফিসার। বলল, স্যার, এবার আমি নিই। খাসা জিনিস….আমি ফিরে এলাম বেন। ঘৃণা, ইহুদিদের প্রতি চরম ঘৃণাও কি হেরে গেল আমার অসহায়তার কাছে? আমি জানি ওখানে আর একটি লাশ পড়ে থাকবে। মেয়েটিকে ভোগ করার পরে সেই তরুণ অফিসার ধন্যবাদ লেখা একটা বুলেট ঠুসে দেবে মেয়েটির মাথায়। একদম পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে।
বেন, আজ যখন তোকে চিঠি লিখছি, মনে হচ্ছে কবিতা লিখি বলেই এত ভাবালো মেয়েটা। যুদ্ধ চলছে। সেখানে এসব তো জলভাত। না, আমি সোফিয়াকে জানাইনি এসব। যুদ্ধ আমায় বিশ্বস্ত থাকতে দিচ্ছে না, সোফিয়া জানলে কষ্ট পাবে। বিকেলের মরা আলোর দিকে তাকিয়ে হয়ত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবে। এই আমার খবর। তোর খবরাখবর জানিয়ে উত্তর দিস। আজ রইলাম।
-স্কোল।
১১ মার্চ, ১৯৩৯।
সোফিয়া,
আমরা জিতেছি। ‘উইজনার’-এ স্বস্তিক উড়ছে, পাশের হাওয়ায় ফ্যুরারের হাসিয়ানা। আকাশ এক বিগলিত ব্যাটালিয়ন। বিউগল আর শ্যাম্পেনের হাই হেলো চারদিকে। আমরা গাইছিঃ
রাস্তা এখন মুক্ত , বাদামি সেনারা, এগিয়ে চলো
রাস্তা এখন ফাঁকাই ঝটিকা বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে
লক্ষকোটি ক্ষুধিত মানুষ স্বস্তিকাকে চাইছে
সেই শুভ দিন শুরু হল সাথী, রুটিরুজি আর মুক্তির
গান হয়ে গেল ওড়ার ভঙ্গী, একাকী স্কাইলার্কের। নাকি অন্য কিছু, পুড়ে যাওয়া গমের খেতের উপরে ধোঁয়ার অলস উড়ে যাওয়া। আরো ওপরে একটা ফাইটার প্লেন। ফাইন আর্টস মিশে যাচ্ছে এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং-এ।জাগছে জার্মানি, সোফিয়া যখন তুমি হাসছ, তখন। যখন ভাবছ আমায় তখন। যখন একটা এলোমেলো রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছ তখনও। জার্মানি একটা মৃত চুক্তির জেগে ওঠা। ভার্সেই। আমরা ছাই করে দেবো ওই চুক্তি। ছাই, পুড়লে হয়। আমরা সবে আগুন লাগাচ্ছি। পুড়বে সব। ছাই হবে। শুধু তোমার শাদা লেস বসানো ছাই রঙের গাউনটা বাদে।তুমি আর তোমার গাউন, এই আমার পৃথিবী সোফিয়া। আমি পুড়তে পুড়তে একদিন ঠিক শুদ্ধ হয়ে ফিরে আসবো, তোমার কাছে।
-ভালবাসা হানি, তোমার স্কোল।
১৩ মার্চ, ১৯৩৯
প্রিয় বেন,
রোদ সামলে ওঠার আগেই, কফি। জেতার আনন্দে হাওয়াও আজ ঘুরঘুরে। ‘কিয়েলবাসা’ একধরণের ‘পোলিশ’ সসেজ, আর স্যান্ডউইচ। জীবনঘন সেবা, চলছে। টেবিলের ওপরে রাখা ‘মাউজার’ পিস্তলটা চোখ মারল, শেষ ওকে টিপেছি তিনদিন আগে। তাই অভিমান, তাই ওর রঙ আরো কালো হয়ে উঠছে। আর আমার ‘কারবাইনার’ রাইফেলে ঠিকরে উঠছে তৃতীয় রাইখ।তিনদিন ধরে খুব চলল ওর সঙ্গে। কার্তুজ এক উদাসীন আত্মঘাতী ছোকরা, খুব মুক্তমনা। বেরিয়েই মৃত্যুপাত্র খোঁজে। শরীর, শরীর। ঘিলু, হৃদপিণ্ড, পাকস্থলি, কিডনি, খুব প্রিয় জায়গা কার্তুজের। জানি, আমারও আছে। একদিন ওর হবে….বেন, দ্যাখ যেন কবিতা লিখলাম। তোর খবর কী? তুই এক পেন্টারের কথা লিখেছিলিস। ‘কমি’। ক্যানভাসে শুধু কয়েকটা কালো বিন্দু ছিল। নাম দিয়েছিল জার্মানি। দেশদ্রোহী! তোরা ওকে মেরে ঝুলিয়ে দিয়েছিস। গ্রেট! হারামির বাচ্চাকে এবার বাতাস আঁকবে। শকুন রঙ দেবে, ঠুকরে ঠুকরে। আইনস্টাইনকে ধরতে পারলি না? বেজন্মা ইহুদি। তোর কাজটা বেশ। রিমলেস চশমা যেন। অভিজাত। ‘প্রিন্স অ্যালবার্ট স্ত্রাবে’র -এর ঠাণ্ডা ঘরে বসে নির্দেশ দিস। ধরার, মারার। তোর চশমায় ঘাম জমেনা। ঠিক আছে দোস্ত, আমাদের রাস্তা আলাদা, লক্ষ্য এক। হাইল হিটলার!
-তোর প্রিয়বন্ধু, স্কোল।
১৩ মার্চ, ১৯৩৯।
………………………………………………………….
 আলেক্সেই ফেদোরভ, আলিওশার  কাল্পনিক চিঠি / কবিতা
প্রিয় তানিয়া,
আজ ঠিক সন্ধ্যার আগে আমি ভোল্গা পেরিয়ে ২৮ নম্বর রেজিমেন্টের সঙ্গে যোগ দেবো। তুমি মস্কোতে। দেশ আক্রান্ত। তুমি নার্স, তোমার হাতের সেবায় লালফৌজের আঘাতগুলো সেরে উঠুক। আমি জানিনা আর দেখা হবে কিনা। আমার কাজ, তুমি জানো পলিটিকাল কমিশারের। নাৎসিরা স্তালিনগ্রাদে হামলা করার আগে বার্লিন থেকে যে বারোশো কিলোমিটার ‘ব্লিৎসক্রেইগ’ আক্রমণের ঝড় তুলে ঢুকে এসেছে তার প্রতিটি ইঞ্চিতে রয়েছে অমানবিক অত্যাচারের হাড় হিম করা চিহ্নগুলো। নির্বিচারে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে আমার মত ‘পলিটিকাল কমিশার’দের। এটা নাকি হিটলারের নির্দেশ। বলশেভিকদের একজন নেতাও যেন বেঁচে না থাকে! বেলোরুশে তারা সাতশোর কাছাকাছি গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। কীভাবে জানো? মহিলা, বাচ্চা সহ বিবাহিত সব পুরুষদের কোন একটি গুদাম ঘর বা স্কুল ঘরে আটকে বাইরে থেকে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।জ্যান্ত অবস্থায় পুড়তে পুড়তে তারা চিৎকার করেছে, আর্তনাদ করেছে, কেউ শোনেনি। উচ্চতর জাতি নাৎসিরা বরং উল্লসিত হয়েছে নিম্নজাতির এতজন মানুষকে নিশ্চিহ্ন করতে পেরে। এসব করার আগে তারা রেপ করেছে, লুঠ করেছে। আমাদের কাছে খবর আসছিল, তোমার সঙ্গে এ নিয়ে কথাও হত। যদিও খুব কম সময় পেতাম আমরা। তবে আমরা জানতাম সামনের দিনগুলো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠবে। আমি সঙ্গে ডায়েরিটা নিয়েছি। লিখবো, কবিতা যদি পারি , নইলে দিনলিপি। যদি বেঁচে থাকি দেখা হবে।
ভালবাসায়, আলিওশা
 ১,অগাস্ট ১৯৪২
তানিয়া,
স্তালিনগ্রাদ ধ্বংসস্তূপ এখন। এক সপ্তাহ ধরে নাৎসিদের ৬ নম্বর ইনফ্যানট্রি আর ৪ নম্বর প্যানৎজার বাহিনী আমাদের কোণঠাসা করে চলেছে। ওদের ‘লুফৎওয়াফা’ থেকে ফেলা হাজার হাজার বোমায় স্তালিনগ্রাদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। আমরা প্রত্যাঘাতের জন্য তৈরি হচ্ছি। কমরেড স্তালিনের নামের এই শহরেই নাৎসিদের হার মানতে হবে। একথাই মাটির নিচে, ট্রেঞ্চে আমি বলে চলেছি। আর ভাবছি তোমার কথা। আমরা ‘বারমালে ফাউন্টেন’ থেকে হেঁটে চলে যেতাম ‘ভোল্গা-ডন ক্যানালে’র দিকে। নদীর হাওয়ায় তোমার চুল উড়তো। আমি বলতাম, চুল নয়, প্রজাপতি। আর আমরা সাইকেল মাটিতে ফেলে দু জনে, দুজনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতাম চুমু খাওয়ার আগে! এখানে এসে, এই যুদ্ধের ভেতরেও আমি লিখছি। আমি তো কবিতা লিখি না নাতাশা, আমি তোমাকে লিখি।
তোমার, আলিওশা।
১৮ অগাস্ট, ১৯৪২
পুনঃ লেখাগুলো দিলাম-
ক’জন মরেছে জানিনা
ক’জনকে মেরেছি জানিনা
বেঁচে আছি!
আমি তোমায় প্রথম দেখি কমসোমলের সভায়
আমি তোমায় শেষেও দেখতে চাই
আমি শেষ দেখতে চাই
যদি না থাকি, আমি তোমায় দেখবো না
তুমি দেখবে, কিন্তু কীভাবে?
কীভাবে তুমি দেখবে যে আমি তোমার পছন্দ মত রোজ শেভ করতাম
আমার গালটা চকচক করছিল মরার সময়
আমার শহর ধুলোয়
কিন্তু ধুলোগুলোও তো আমার
আমার ধুলো জমে উঠছে এখন
ঝড় হবে বলে..
তানিয়া,
মস্কোর অবস্থা, স্তালিনগ্রাদের অবস্থা, সারা দুনিয়ার অবস্থা পাল্টাবে যদি আমরা নাৎসিদের শেষ করতে পারি। আর আমরা তা করবোও। আমরা এমন এক নেতার অধীনে লড়ছি যিনি জার্মানদের হাতে বন্দী নিজের ছেলে ‘ইয়াকভ’কে বাঁচাবার জন্য কোনও সমঝোতা করেন নি। জার্মানরা একজন ‘রাইখমার্শাল’-এর মুক্তি চেয়েছিল তাঁর ছেলের মুক্তিপণ হিসেবে। স্তালিন উত্তর দিয়েছিলেন, আমরা একজন জুনিয়র অফিসারের সঙ্গে (এক্ষেত্রে তাঁর সন্তান) একজন ‘রাইখমার্শাল’-এর বিনিময় করি না। আর আমার সৈনিকেরা সবাই আমার সন্তান। গোয়েবলস ‘ইয়াকভ’কে নিয়ে নানা মিথ্যা কথা ছড়িয়েছে, তুমি জানো। তবে, আমরা সত্যিটা জানি। আর এটাও জানি, যোশেফ স্তালিন, মার্শাল জুকভ আর জেনারেল চুইকভের নেতৃত্বে আমরা স্তালিনগ্রাদে নাৎসিদের হারাবোই। তুমি লিখেছ মস্কো অবরুদ্ধ হয়ে আছে। চরম খাদ্য সঙ্কট। পানীয় জলের হাহাকার। স্তালিনগ্রাদে আমরা ভোলগার ওপার থেকে এখনো অবধি সরাবরাহ চালু রাখতে পেরেছি। শহরের প্রায় পুরোটাই নাৎসিদের কবলে, কিন্তু ওরা আর এগোতে পারছে না। ওরা চাইছে ভোলগা পার হয়ে আমাদের সরবরাহ বা সাপ্লাই লাইন বন্ধ করে দিতে। ওরা পারবে না নাতাশা। এটা আমাদের দেশ। স্তালিনগ্রাদ ফ্রন্টে ২৮,৫১,৫৭,৬২ আর ৬৪ নম্বর বাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে যাচ্ছে। জার্মানদের অস্ত্র শস্ত্র আমাদের চেয়ে উন্নত কিন্তু আমাদের মনোবল ওদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। একটা আক্রমণাত্মক , হিংস্র, পাশবিক সেনাবাহিনীকে আমরা হারাবোই। মৃত্যুভয় স্তালিনগ্রাদের কোথাও আর নেই। আমরা বিভিন্ন ভেঙে পড়া অট্টালিকা, স্কুলঘর, কারখানায় ঘাঁটি গেড়ে জার্মানদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলছি। ওরা এধরণের যুদ্ধে অভ্যস্থ নয়। আমার ‘নোট বুকে’ যুদ্ধের আগুনে সেঁকা কলম যা লিখল, তোমায় না পাঠিয়ে পারি?
বুলেট লাগা আর না-লাগার দুনিয়ায় পাখি আর তার নরম মাংস ফুটে উঠল
আমরা খেলাম
যুদ্ধে এই হয়, খেতে হয়, নরম মাংসের স্বাদ নিতে নিতে মনে হয় কাল আবার ভোর হবে, হয়ত গান গাইবে আরেকটা পাখি
আমার সেদ্ধ মাংসের দিকে তাকিয়ে..
সারাদিন বিকেল সন্ধ্যা সারারাত
সারারাত সন্ধ্যা বিকেল সারাদিন
সাররা স বিকে সারাদি
সারাদি বিকে স সাররা
সারা বি স সার
সার স বি সারা
সা সা
সা
একা বেরিয়ে এলাম হাইডআউট থেকে, জার্মানরা পালাচ্ছে…
স্কুলের ঘন্টা বাজলেই আমার একটা পাটকিলে পাখির উড়ে যাওয়া মনে হত
এখন বুলেট ওড়ে
ঘন্টা বাজে
ওই বুলেটে যার নাম লেখা, তার জন্য
কাল আর আজ, আজ আর কাল
জীবন
আজ আর কাল, কাল আর আজ
মৃত্যু
এর ভেতরে কোথাও ‘জন্য’ শব্দটা
তোমার জন্য
শুয়ে আছে
স্কোল ফিশারের কাল্পনিক চিঠি / কবিতা
সোফিয়া,
রাশিয়া খুব বড়। হারিয়ে যাবো মনে হয়। মাইল মাইল বাসি মড়ার গন্ধ। আমি বেঁচে আছি, বুলেটটা লাগেনি বলে। আমি স্তালিনগ্রাদের খুব কাছে, তোমার থেকে অনেকদূরে। খুব বড় রাশিয়া, যদি হারিয়ে যাই? বাইরে চাঁদ আলো ফেললে ইচ্ছে হয় বলি আহা, বারুদের গন্ধ ভক্‌ করে বেরিয়ে আসে…ভাল থেকো, – তোমার স্কোল।
৩ নভেম্বর, ১৯৪২
বেন,
কবিতা আছে না নেই? মানুষের মাথা থেঁৎলে যাওয়ার পরেও চাঁদ ওঠে। ইহুদিদের শেষ নিশ্বাস ঢুকে গেছে কলমের ভেতরে, এখন ঢুকছে রেড আর্মির। কী একটা ঝাঁঝ নিয়ে বিকেল ঘা ঘা করে। ঘিলুর রেশম বোনে পাৎলা নভেম্বর। রাশিয়া কি কিছু বুনছে, ভোলগার জল কি আরো গভীরের সেই ল্যাবরেটারি, যেখানে ফ্যুরারের পায়ে চাপা দেয়া চিৎকার সুর হয়ে যাচ্ছে, রেড আর্মি গাইছে পাতালছাড়া আকাশফাড়া গান। জানিনা, জিতলে কী হয়, হারলে কী হয়, জানিনা। মানুষের কাছে মানুষের পাশে একটা গাছ, একটা রান্নাঘর আর একটা পিয়ানো যদি রাখতে পারতাম! – স্কোল,
৫ নভেম্বর, ১৯৪২
সোফিয়া,
গালের পাশে বুলেট আর প্রজাপতি। আমি গর্তের ভেতরে, জার্মানির জন্য পেতে দিতে চাইছি একটা জাল, যদি বুলেট আমার একগাল থেকে অন্য গালে যাওয়ার সময় একটু জড়িয়ে যায়। সামান্য আদুরে হয়। পাখায় রাখে খেয়ালহারা রঙ, উদাসীনা হয়। আমি বাড়িয়ে বলছি, কাল মরে গেলে, এই বাড়িয়ে বলাটা কেউ না কেউ শুনবে। প্রজাপতিকে আলাদা করে রাখলে, ফুল ফোটে। গোঁফের দু দিকে রাখলে, কান্না। কান্না উঁচু জাতির। নীচু জাতির। রক্ত লাশ পোহাতে পোহাতে পোকা। পোকারা গান গায়। বারুদ শোঁকে। জার্মান আর রাশিয়ান, সব লাশকেই মনে হয় এই দুনিয়ার নাগরিক। শুধু মরার আগে ওরা বোঝেনি। আমি ফিরবো কিনা জানিনা, সোফিয়া দীর্ঘশ্বাস রেখো, ছোট্ট জীবনে যা দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাবে।
-স্কোল,
১২ নভেম্বর, ১৯৪২
প্রিয় বেন,
আজ, ‘ক্রিস্টলনাখ্‌ট’ মনে আছে। ভাঙা কাচের রাত্রি। দুশোটা ‘সিনাগগ’, আমরা পবিত্র করে দিচ্ছিলাম। ভেঙে। ইহুদিদের উপাসনালয়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলাম খাঁটি জার্মান রক্তের মাঞ্জা। লুঠ করা হল আট হাজার বাড়ি। হাজার হাজার ইহুদি যখন ভোরে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে রওয়ানা দিচ্ছে, আমরা গাইছিলাম :
রাস্তা এখন মুক্ত , বাদামি সেনারা, এগিয়ে চলো
রাস্তা এখন ফাঁকাই ঝটিকা বাহিনি এগিয়ে যাচ্ছে
লক্ষকোটি ক্ষুধিত মানুষ স্বস্তিকাকে চাইছে
সেই শুভ দিন শুরু সাথী, রুটি রুজি আর মুক্তির
ইহুদিরা তাদের দরজা জানলার ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। এদিকে ওদিকে কয়েকটা মৃতদেহ। বেজন্মা ইহুদিদের। আমরা গান গাইছিলাম, চলে যাওয়া শয়তানগুলোর দিকে তাকিয়ে।বেন, আমি আর তুই একটা হারমোনিকা বাজাচ্ছিলাম। একটা ইহুদি বাচ্চা, কপালে জমাট রক্তের দাগ।যেতে যেতে দেখল আমাদের। হাসল। হাত নাড়লো। বেন, আমি আর তুই একসঙ্গে বলে ছিলাম, হেইল হিটলার। বাচ্চাটা তখনো হাসছে, সূর্য টপকে এল তখন। আমরা চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। মনে আছে বেন?
-স্কোল,
১৪ নভেম্বর,১৯৪২
সোফিয়া,
আর কিছু করার নেই। নেই, নেই। বারবার লিখলাম কারণ মাথার ওপরে সারাক্ষণ বুলেট। স্প্লিন্টার। ধোঁয়ায় উড়তে থাকা সৈনিকের শরীর, কাল একটা আঙুল এসে পড়ল। তাতে এনগেজমেন্ট রিং। আমি ভাবতে পারছি না আর। স্তালিনগ্রাদে যারা আমাদের শত্রু, তারা এই দেশের নাগরিক। তারা নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষা করছে, যে যেখানে আছে রুখে দাঁড়াচ্ছে। মেয়েরা স্নাইপার হাতে লড়াই করছে ঘরের ভেতরে, ট্রেঞ্চে, ফক্সহোলে। এদের পেছনে গোটা দেশ আর আমরা এক মূর্খ একনায়কের হাস্যকর রাজনীতিকে সমর্থন করে সর্বনাশের মুখে এসে দাঁড়িয়েছি। আমাদের বোমারু বিমানের হানায় বিধ্বস্ত স্তালিনগ্রাদের প্রতিটি ক্ষত বিক্ষত বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, কারখানা আর মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। এই লড়াই আমি আগে দেখিনি। আমরা জার্মানরা জানিই না কীভাবে ঘরে ঘরে ঢুকে যুদ্ধ করা যায়। আমরা হেরে যাচ্ছি। সোফিয়া, আমরা এখানে এসেছি কেন? ‘বার্গফ’-এ বসে একটা শয়তান এই সুন্দর পৃথিবীটাকে শেষ করতে চাইছে। লোকটা আমার দেবতা ছিল। আজ আমি ঘৃণা করি শয়তানটাকে। ঘৃণা করি নিজেকে। আমি জানি ‘রেড আর্মি’র সৈন্যরা আমায় ঘৃণ্য নাৎসি ছাড়া আর কিছুই ভাববে না মারার আগে। আমার মৃত্যু হবে, আমি শুয়ে থাকবো , তুষার ঢেকে দেবে আমায় ধীরে ধীরে। যেমন দিচ্ছে আমার সহযোদ্ধাদের। তুমি আমার কবিতা পছন্দ করো। আমি আর লিখতে পারিনা। গতকাল হিটলার রেডিওতে ভাষণ দিয়ে জানিয়েছে যে আমাদের ৬ নম্বর ডিভিশনের আত্মত্যাগ জার্মানির মানুষ চিরকাল মনে রাখবে। সোফিয়া, এর মানে কী জানো? আমাদের বলি দিয়ে দেওয়া হল। স্তালিনগ্রাদের এই রুক্ষ তুষারপ্রান্তরে আমাদের জন্য কোন সাহায্য আসবে না। আমাদের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে দেওয়া হল। আমদের রেড আর্মি ঘিরে ফেলেছে। আজ পয়লা জানুয়ারি, ১৯৪৩। নতুন বছর। আমাদের কোন উদযাপন নেই। খাওয়া, ওষুধ, অস্ত্র শেষ হওয়ার পথে। আমরাও…শুভ নববর্ষ প্রিয়তমা।
পুনঃ আমার এই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন লাইনগুলো তোমায় পাঠালাম।বন্ধু ‘বেন বেকার’ বেঁচে আছে কিনা জানিনা। পারলে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার কথা জানিও, বোলো, আর দেখা হবেনা। আমার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন কিছু লাইন, তোমার জন্যঃ
১. যদি ফিরে যেতে পারি, একটা পরিষ্কার বেডশিট যেন থাকে আর তুমি। আমার যুদ্ধবিরতি।
২. দাড়ি কামানো সময় নেই, রেজর নেই, নেল কাটার নেই, টুথ পেস্ট নেই। ইউনিফর্ম শেষ। স্নান নেই। আমরা মানুষ ছিলাম। এখন জন্তু।
৩. ‘ওয়াইন’-এর গন্ধ ছিল। ‘রাইন’ ছিল। তুমি ছিলে। নতুন বছরগুলো, ছিল। আমি ভাঙা জানলা দিয়ে রাতের আকাশ দেখছি, থাকবে তো?
৪. জার্মানি। জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্র। জাতীয়তাবাদ। জাতীয়। জাতি। জা। যাঃ!, কিছুই নেই আর…
৫. যারা যুদ্ধের কথা বলবে এরপরেও, আরো মৃত্যু এরপরেও তাদের জন্য।
৬. ভোর চামড়া, সকাল পোড়া চামড়া। দুপুর থ্যাঁতলানো চোখ, বিকেল ওপড়ানো চোখ। সন্ধ্যা, অসমাপ্ত গ্রেনেড। রাত্রি, অশুভ। গভীর রাত্রি, মৃত্যুর…
৭. শিশু, আয়ু। শিশুর বাবা, পরমায়ু। মা, সেতু। কনভয় নিয়ে চলে যাচ্ছে..
৮. ট্যাঙ্কের ভেতরে পুড়ে যাচ্ছিল। পুড়ে যাচ্ছিল, আমার বন্ধু
৯. একটা বিন্দু আকাশ নয়, একটা আকাশ অনেক অনেক বিন্দুর
১০. মরার আগে সবাই কিছু না কিছু বলতে চায়। বাতাসে গোলা এইসব না বলা কথা। বারুদের গন্ধই সবটা নয়।
১১. রক্ত ছিলই, আমাদের, ওদের। রক্ত আছে। আমাদের, ওদেরও। বয়ে যাওয়ার জন্য..
১২. হাসি পাচ্ছিল। হিটলার ভাষণ দিচ্ছে ভেবে? না ঠিক তা নয়। ভাবছিলাম ওর হামাগুড়ি দেওয়ার কথা। এখন আবার দিচ্ছে ভেবে.
আলেক্সেই ফেদোরভ, আলিওশার  কাল্পনিক চিঠি/ কবিতা
তানিয়া,
আজ ১৮ নভেম্বর, নির্দেশ আছে কাল থেকে আমরা জার্মান বাহিনীকে দুটো দলে ভাগ হয়ে ঘিরে ফেলার লড়াই শুরু করবো। রাশিয়ার বিখ্যাত শীতের অপেক্ষায় ছিলাম আমরা। কমরেড স্তালিনের ২২৭ নম্বর নির্দেশ এখন আমাদের জ্বালানি। আমরা তেতে আছি। স্তালিন যে নির্দেশ দিয়েছেন তার শেষ লাইনে রয়েছে, ‘এক পাও পিছনে যাওয়া যাবে না, কোন জমি নেই আর, স্তালিন।’ ডন নদী। ব্রীজের মুখে সিগারেট ধরালাম। আজ ১৯ নভেম্বর, ১৯৪৩। শুরু হবে একসাথে, অপারেশন ‘ইউরেনাস’ আর ‘মার্স’। দু দিক দিয়ে আক্রমণ করা হবে, এতটা জানি। জেনারেল রোকোসসোভস্কি, মার্শাল জুকভ আর কমরেড স্তালিন বাকিটা জানেন। আজ বাঁচলে কাল আবার লিখবো। কিন্তু এ কদিনের লেখাগুলো আবার তোমায় পাঠালাম। যত্ন করে রেখো, না ফিরলে উড়িয়ে দিও, চিঠিগুলো যেন পাখনা পায় তখন। জার্মানরা আমাদের দেশে এসেছে, আমরা যাইনি। লক্ষ লক্ষ রুশীদের মৃত দেহ পেরিয়ে এই নাৎসি বর্বরের দল স্তালিনগ্রাদে এসেছে, এবার শোধ নেওয়ার পালা। কাল থেকে ওদের প্রতিটি ধর্ষণ, লুঠ, আর হত্যার হিসেব চোকাতে হবে। যদি বেঁচে থাকি, লেখায় লেখায় আমরা কথা বলে যাবো। যাবোই।
ইতি, তোমার আলিওশা, আলেক্সেই ফেদোরভ
কবিতা
শাদা, ফিনফিনে শাদা
যুদ্ধ আর লাল নয়, শাদা
আমি খ্যাপাটে তুষারের মধ্যে
আমি বেঁচে আছি
তোমার শাদা রঙের গাউন, সেই বিয়ের জন্য বানানো গাউনটা জড়িয়ে
সাইরেনের শব্দে ভোলগাও কাঁপলো, ভোলগা আমার মা বলতেন, আমি
আর আমি বলতাম, মা
স্নাইপারদের জানলা, গর্ত, দরজার ফাঁক আছে
এটাই ঠিকানা
জানলা, গর্ত, দরজার ফাঁক এই ঠিকানায়
ফুল যা, তানিয়াও তাই
একটা বুলেট
একবারই নক্‌ করে
চিঠি হয়ে
জানলা, গর্ত, দরজার ফাঁকে, ওই একবারই
ফেরেনা কিন্তু!
তানিয়া,
আজ ২৪ নভেম্বর, ১৯৪৩। ‘ডন’ নদীতে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়েছে। তানিয়া, বেঁচে আছি আমি আর দেখতে পাচ্ছি আমাদের হাতে আটকে পড়া জার্মান বাহিনীর দুর্দশা। রাশিয়ার এই শীত আমাদের সহায়ক হয়ে উঠল। রণকৌশল ঠিক থাকলে আর ঠাণ্ডা মাথায় তাকে প্রয়োগ করলে এমন সাফল্য আসতে থাকবে। তানিয়া আমরা দুটো দিক দিয়ে আক্রমণ করে জার্মানীর প্রায় তিন লক্ষ সৈনিককে ঘিরে ফেলেছি। কোনও বাধা মানিনি। আমি বেঁচে আছি ঠিক কথা, তবে মরেও যেতে পারতাম। হাজার হাজার লাল ফৌজের সেনা এই চারদিনে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু থামানো যায়নি আমাদের। আজ এই সকালে ডন ছুঁয়ে থাকা ‘কালাচ’-এ আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছি। এখানেই দু দিক থেকে আসা লালফৌজের দুটো অংশ কাল মিলিত হয়েছে। জার্মানদের হার শুরু হল তানিয়া। চারদিকে শাদা তুষার আর মৃতদেহ। পাশাপাশি শুয়ে আছে সোভিয়েত আর জার্মান সেনারা। তুষারে জমাট রক্ত। কারো পা নেই, হাত উড়ে গেছে। পাকস্থলী বেরিয়ে আছে কারো। কারো বা মাথার খুলি বিদীর্ণ। যুদ্ধ, এত অমানবিক আর এসবই একজন উদ্ধত উন্মাদ জাত্যাভিমানীর অবদান। তুমি জানো, তার নাম। আমরা সবাই জানি। যতদিন মানব সভ্যতা থাকবে ততদিন ঘৃণার সঙ্গে উচ্চারিত হবে হিটলারের নাম। আর এসবেরই ভেতরে আমি বিধ্বস্ত অবস্থায় লেখা চালিয়ে গিয়েছি, তোমার জন্য। তুমি আমার চিঠি পাবে, খুশি হবে, ভাববে আমায়, তানিয়া এর চেয়ে সুখের আর কী আছে?
তোমার, আলিওশা
তানিয়া,
যুদ্ধের আগে দুটো নদীর জল থেকে নিয়ে হিমের পরশ আমরা রেললাইনে ছড়িয়ে দিতাম। ভোলগা আর ডন। তোমার স্কার্টে নিঝুম বাদামের রঙ আর দেদার ডানা মেলা আস্কারা। সবই যুদ্ধের আগে। হিটলার চাইছে ককেশিয়ার দখল নিতে। বাকু’র তেলের খনি তার চাই। জার্মান সেনাদের একটা অংশ ককেশিয়ার দিকে যাচ্ছে। ওদের স্তালিনগ্রাদও চাই। তাহলে ককেশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ হাতের মুঠোয় এসে যাবে। স্তালিনগ্রাদের শিল্প তালুক ককেশিয়ার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে। ওরা চাইছে আমাদের অর্থনীতির দখল নিতে।স্তালিনগ্রাদ আমাদের শিল্প শহর। ‘রেড অক্টোবর’ ইস্পাত কারখানা, ‘ব্যারিকেডি আর্মস ফ্যাক্টরি, ‘স্তালিনগ্রাদ ট্র্যাক্টর ফ্যাক্টরি’ সবইতো এখানে। জার্মান বোমায় সবকিছুই এখন ধ্বংসস্তূপ।  তানিয়া, একজন উন্মাদ নেতা সারা দুনিয়ার দখল নিতে গিয়ে শুধু আমাদের নয় জার্মানীরও সর্বনাশ করে ছাড়বে দেখে নিও। হিটলার জানেই না যে ককেশিয়ার সংগে আমাদের যোগাযোগ শুধু রাস্তাবাহিত নয়। সাহিত্য, সঙ্গীত আর খাওয়া দাওয়াতেও ককেশিয়া আর স্তালিনগ্রাদ জড়িয়ে আছে। তানিয়া, মুভি বা অপেরা দেখে ফেরার পথে আমরা ককেশিয়ান ‘সালগুনি’ আর গরম ‘খাচাপুরী’ রুটি খেতাম, তারপর কফি। দিনগুলো, হায়! এই যুদ্ধটা যদি শেষ করতে পারি, আমি আর তুমি হানিমুনে ককেশিয়ান পাহাড়ে যাবো। আর গেয়ে উঠবো ককেশিয়ান লোকগীতি :
‘এই হল ককেশিয়া
পাহাড়িয়া
রোদ আদুরে
শিক কাবাব আর হালওয়া
ককেশিয়া ককেশিয়া..’
এই গান অবধি বেঁচে থাকা যাক, কী বলো?
তোমার, আলিওশা।
২৫ নভেম্বর,১৯৪৩
পুনঃ লিখছি কিন্তু। এই লিখে যাওয়াটাই আমার যুদ্ধ, জিততে হবেই আমাদের। গতকাল আমি আমার প্রিয়বন্ধুকে হারিয়েছি। সাশা। তুমি দেখেছ ওকে। লম্বা। একহারা। সব সময় হাসতো। একর্ডিয়ন বাজাতো। সাশা নেই তানিয়া।  তোমার জন্য  ওকেও কিছুটা দিলাম এখানেঃ
১.
আমি নদীর পার ধরে আছি, শুনছি চ্ছলাৎ চ্ছলাৎ
মনে হয়নি জল আমাদের চোখেও
মনে হল যখন
সাশা খসে পড়ল, আমাদের গর্তে
একটা বুলেট
ওর বুক পকেট ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা রক্ত
সেই রক্তে আমার চোখের জল
বন্ধুত্ব!
২.
রাত বাড়ছে
সাশা ভারী হচ্ছে
সহ্য করছে পৃথিবী
৩.
আমি একটা স্কুলের বারান্দায়
সাশাও
দু সপ্তাহ আগে স্কুলটা উড়ে গেছে
আজ সাশা..
৪.
আমি সাশার আঙুল থেকে ট্রিগার খুলে নিলাম
মৃত সাশা
মৃত আঙুল
জ্যান্ত ট্রিগার, যুদ্ধ এরকমই
৫.
সাশা আমার বন্ধু
……
….
..
.
ছিল…
স্কোল ফিশারের শেষ চিঠি:
সোফিয়া,
আর তোমার সঙ্গে দেখা হবেনা। লাল ফৌজ আমাদের ঘিরে ফেলেছে, আমরা এখন বিচ্ছিন্ন। জার্মানী থেকে বারোশো মাইল দূরে বিধ্বস্ত স্তালিনগ্রাদে পুরো ছ’নম্বর বাহিনী অনিবার্য মৃত্যুর অপেক্ষা করছে। সোফিয়া, এর জন্য আমরাই দায়ী। একজন জাতিবিদ্বেষী একনায়ককে আমরা জার্মানরা বেছে নিয়েছিলাম। আর সে, লক্ষ লক্ষ জার্মান ইহুদীদের পুড়িয়ে মেরেছে, খতম করেছে নাৎসি বিরোধীদের নির্মম ভাবে, আক্রান্ত দেশগুলোয় নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ করা হয়েছে। যুদ্ধবন্দীদের ‘জেনেভা কনভেনশনে’র তোয়াক্কা না করে চরম অত্যাচার আর খুন করা হয়েছে। সোফিয়া, এতো আমাদেরই নির্বাচন, আমাদের! আমার বাবা আমায় জোর করে নাৎসি পার্টির সভ্য করেছিল। তাঁর বিশ্বাস ছিল জার্মানির যে সম্মানহানি হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিরাই সেই সম্মান আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে।যেদিন আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিলাম, বাবার আনন্দ দেখে কে? মা কিন্তু কাঁদছিল। আমার দুই মামা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা গিয়েছিল। বাবা মা’কে বলল, তোমার ছেলে দেশের জন্য লড়তে যাচ্ছে। তোমার গর্বিত হওয়া উচিত! মা গর্বিত না হয়ে কেঁদেই চলল। জার্মানির ঘরে ঘরে তখন হিটলার পূজিত হচ্ছে। ‘হেইল হিটলার!’ উচ্চারিত হচ্ছে গর্বের সঙ্গে। জার্মানির মানুষ, নাৎসিদের ইহুদি-নিপীড়ন, কমিউনিষ্ট দমন নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজী ছিলনা। তাদের একমাত্র পছন্দ তখন হিটলার। আর  তার ফল আমরা এখন পাচ্ছি। যতক্ষণ জিতছিলাম ততক্ষণ সব কিছুই ঠিক ছিল। ‘গোয়েবেলস’-এর অবিরাম মিথ্যা প্রচারের অভিনবত্বে পুরো জার্মানি প্রভাবিত ছিল, আমরাও ছিলাম। এখন স্তালিনগ্রাদে হারের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের বাহিনীর একজনও আর ‘গোয়েবেলস’-এর মিথ্যে প্রচারে কান দিতে রাজী নয়। এখনো সে আর তার দলবল আমাদের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কথা প্রচার করে যাচ্ছে আর ছেড়ে দিয়েছে  সোভিয়েত বাহিনীর হাতে। হিটলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমাদের জন্য কোন সাহায্যকারী বাহিনী পাঠানো হবেনা। সাহায্য নাকি আসবে ‘লুফৎওয়াফা’র বিমানে, আকাশ পথে! মাথামোটা, হামবাগ এয়ার চিফ মার্শাল ‘গোয়েরিং’ বলেছে সে আকাশপথে খাদ্য, ওষুধপত্র, পাঠাতে সক্ষম। প্রতিদিন সাতশো টন সামগ্রী লাগবে। প্রথম দিন এল একশো সাতাশ টন। দ্বিতীয় দিন আরো কম। তৃতীয়তে আরো। লালফৌজ যে দুটো বিমান অবতরণ ক্ষেত্র ছিল, সে দুটোরও দখল নিয়ে নিয়েছে। খাদ্য নেই, জল, নেই, চিকিৎসা নেই। টাইফাস, ডায়েরিয়া, অপুষ্টিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে বিখ্যাত ৬ নম্বর বাহিনী। আর এর মধ্যেই লড়াই চলছে। আজ শুনলাম, আমাদের বাহিনীর প্রধান পাউলাসকে হিটলার ‘ফিল্ড মার্শাল’ পদে উন্নীত করে আমৃত্যু লড়াই চালিয়ে যেতে বলবে। পাউলাস কী করবে জানিনা। আমি আর পারছি না, সোফিয়া। যদি সত্যিই হিটলারকে সামনে পেতাম, আমার রাইফেলের সব কটা বুলেট ওর বুকে নামিয়ে দিতাম। সোফিয়া, ভাল থেকো। আমি আর লিখতে পারছি না। এই মাইল মাইল ধরে পড়ে থাকা মৃত্যু আমার লেখা কেড়ে নিয়েছে। বিদায়!
তোমার, স্কোল ফিশার।
সকাল-১০টা, ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩
আলেক্সেই ফেদোরভ, আলিওশা’র  কাল্পনিক চিঠি/ কবিতা
তানিয়া,
আজ ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩। আজ জার্মানরা আত্মসমর্পণ করবে। আমরা স্তালিনগ্রাদে জিতেছি তানিয়া। সকাল থেকে কোন গোলাগুলির আওয়াজ নেই। স্তালিনগ্রাদ ধ্বংসস্তুপ এখন।খোলা আকাশের নিচে বহুদিন পরে মাথার হেলমেট নামালাম। আমি আর আমার কয়েকজন কমরেড এবার যাবো মৃতদেহগুলোকে কবর দিতে। তানিয়া, আমি নিজে একজন জার্মান সেনাকেও কবর দেবো আজ। অদ্ভুত ঘটনা, জানো! গতকাল বিকেলে প্রবল গোলাগুলি চলছিল। আমরাই আক্রমণ করছিলাম। যাইহোক বেশ কিছুক্ষণ পর জার্মান শিবির থেকে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। আমরা সাবধানে আমাদের হাইড-আউট থেকে বেরিয়ে এলাম খোলা চত্বরটায়। বেশ কিছু জার্মান সেনার মৃতদেহ পড়ে আছে। কিছুটা এগোবার পরে আমি দেখলাম একজন যন্ত্রনাকাতর জার্মান সেনা আমায় ডাকছে। আমি এগিয়ে গেলাম। ও আমায় ওর পাশে বসতে বলল ঈশারায়। জিগগেস করল, সিগারেট আছে কিনা। আমি এগিয়ে দিলাম, ওর বাঁ পা উড়ে গেছে। মুখ রক্তাক্ত। আমি ওর পাশে বসে সিগারেট এগিয়ে দিলাম। বুঝতে পারছিলাম ও বাঁচবে না।। ও আমায় ওর পার্স আর একটা ব্যাগ , যা ওর পিঠে ছিল , নিতে বলল। আমি সিগারেট ধরলাম ওর মুখে। ও টান দেয়ার চেষ্টা করল। ইশারায় বলল পার্সটা খুলতে। খুলে দেখলাম একটি একুশ বা বাইশ বছরের মেয়ের ছবি, পেছনে নাম, ঠিকানা। ও আপ্রাণ চেষ্টায় বোঝাতে চাইছিল আমি যেন এই পার্স আর ওই ব্যাগটা এই ঠিকানায় পৌঁছে দিই। আমি আর কী বলতাম! তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সেই আলোয় আমি ওকে বললাম, দেবো, যদি বেঁচে থাকি। ও আরেকটা টান দেয়ার চেষ্টা করল, একটু হাসল, তারপর মরে গেল। তানিয়া,  আজ সকালে আমি আমাদের ইউনিটের জার্মান ভাষা জানা একজন কমরেডকে দিলাম ওই ঠিকানা আর ব্যাগের একতাড়া কাগজের পাঠোদ্ধার করার জন্য। সেই কমরেড জানালো, মৃত সৈনিকের নাম, স্কোল ফিশার। বয়স ছাব্বিশ। ঠিকানাটা বার্লিনের। আর ওই একতাড়া কাগজে রয়েছে স্কোলের লেখা কবিতা, যা সে তার প্রেমিকা সোফিয়াকে পাঠাতো। আমি ওই কাগজগুলো হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম, একজন কবি! অথচ এসব জানার আগেই আমি কাল মাঝরাতে এই  লাইনগুলো লিখেছিলাম ঃ
‘কাল একটা জার্মান, কপালে গুলি, মরবে এক্ষুনি। আমি সিগারেট খাচ্ছিলাম। ও সিগারেট চাইল। দিলাম। মুখে। টানলো। মরে গেল।
সিগারেট মৃত্যুর কারণ কেন বুঝতে পারলাম।’
আজ আমি এই জার্মান তরুণ কবিকে কবর দেবো। চারদিকে তুষার। তাপমান মাইনাস দশ। মৃতদেহ অবিকৃত অবস্থায় পড়ে আছে। আমি ওর পাঠাতে না পারা  চিঠি আর কবিতাগুলো সেই কমরেডকে দিয়ে পড়িয়েছি তানিয়া। স্কোল ফিশার তার প্রেমিকা সোফিয়া আর কবিবন্ধু বেন’কে যেগুলো লিখেছে কিন্তু স্তালিনগ্রাদে আটকে পড়ায় আর পাঠাতে পারেনি। জার্মান তরুনদের হিটলার কীভাবে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে বলি দিয়েছিল স্কোলের চিঠি পড়লে বোঝা যায়। শেষের চিঠিগুলোয় বিশ্বাস আর স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার, আমিও পড়তে পড়তে এই জার্মান তরুণের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছিলাম। স্কোল একজায়গায় লিখেছে, ‘ঘৃণা আমার নিশ্বাসে ছিল, শেষ নিশ্বাস ঘনিয়ে আসার আগে বুঝতে পারছি, ভালবাসাই সব, সে আমায় ডাকছে সোফিয়া, আমার দম নেই আর।’ তানিয়া, আমিও জানিনা আর তোমার সঙ্গে দেখা হবে কিনা! আমি সৈনিক। মাতৃভূমির জন্য আরো অনেক লড়াই আমার সামনে, তোমার সামনেও। যদি দেখা হয় আমাদের, যদি বেঁচে থাকি, আমরাও এই পুরনো ভালবাসার গল্পগুলোই আমাদের পরের প্রজন্মকে নতুন করে শোনাবো। তাদের বলবো, ভালবাসো। মনে রেখো বাচ্চারা, যে কোনও সময়েই এক হাজার বছরের ঘৃণা মুছে দিতে পারে এক মুহূর্তের অমল ভালবাসা।
স্কোল’কে কবর দিয়ে ফিরে এসে তোমার জন্য এই লাইনগুলো লিখলাম তানিয়া :
‘তানিয়া, ফুল কোনও বিকল্প নয়, বিকল্প একটা বাজে শব্দ
যা ফুলের হয়না, তোমারও তো হয়না
যুদ্ধে এটাই আমার শান্তিপ্রস্তাব
ফুল
আর তুমি ফুটে উঠবে, আমরা পতাকা হেলিয়ে মার্চ করে যাবো…’
যুদ্ধ মর্মান্তিক হয়। আমি কিছু চরিত্র বানিয়ে তাদের চিঠি, কবিতা ইত্যাদিও আমার বকলমে লিখে দিলাম। তবে আলেক্সেই ফেদোরভের( আলিওশা) সঙ্গে তানিয়ার দেখা হবে কিনা, আমি জানিনা। এই অংশটাও আমি বানিয়ে লিখতে পারতাম। পারিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে মারা গিয়েছিল প্রায় পঁচিশ লক্ষ মানুষ। আলিওশা আর তানিয়ার একটা মিলনান্তক দৃশ্য বানিয়ে কিছু কবিতা দিয়ে ‘মেলোড্রামা’ তৈরি করতে পারতাম।কিন্তু যুদ্ধ কখনোই মিলনান্তক হয় না। দু’জন ব্যক্তি মানুষ শেষ দৃশ্যে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেও হয় না। অজস্র মৃতদেহ আর ধ্বংসের গন্ধ থেকে যায়। হাহাকার আর অশ্রু শকুনের ডানা হয়ে স্থির অচঞ্চলতায় ভেসে বেড়াতে থাকে। পাঠক, শেষটা আপনারাই ঠিক করুন। এই পৃথিবী থাকবে কি থাকবে না, ঠিক করুন আপনারা।