সাদিক হোসেন-এর গল্প

Spread This
সাদিক হোসেন

সাদিক হোসেন

এলেবেলে, বোঁ-বোঁ

এতদিন যখন হয়নি, আর হবে না।
ইদ্রিস কাকা আক্রান্ত হবার ভয় ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন। মুখে মৃদু হাসি। যেন ইতোমধ্যে জয় করে ফেলেছেন কিছু। এদিকে ডিমের দাম ছয়। গেছিলেন এক ক্রেট ডিম কিনতে। কেনা হল মোটে দশটা। সংসারে ডিম ছাড়াও তেল লাগে, নুন লাগে, শাক-সব্জি-মশলাপাতি লাগে। সেইদিকে নজর দিতে গিয়ে একেবারে দুম-ফটাস। হলুদ কুসুম গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে ক্রেট থেকে। ইস্‌, কী তরল সংসার! তার উপর আঙুলেও লেগেছে খানিক। কতদিক যে সামলাতে হয়! রুমালে সেইসব মুছতে গিয়ে আবারও বললেন, দেখলে তো কেমন ভাগ্য!
ভাগ্য না ছাই! ছাই ওড়ে বাতাসে। এত বাতাস তবু হাঁফ ধরে যায়। কী হল কী।
হবে আবার কী?
হয়েছে ভীমরুলের বাসা। প্যাডেল মারলেই বোঁ-বোঁ শব্দ হয়। আসলে ব্যাটারি। সাইকেলে লাগিয়েছেন তিনি।
এখান থেকে রোজ হাওড়ায় যাতায়াত করবেন?
সেই হাসি আবার ফিরে এলো। এবার সশব্দে। বোঁ-বোঁ। যদিও মুখে অন্য কথা, যেতে তো হবেই গো।
তা বটে, আজকাল সবাইকেই যেতে হচ্ছে।
বাসে চড়ছো না কেন?
ভাড়ার ঠিক আছে নাকি! উঠলেই ১০ নিচ্ছে। তোমাদের লকডাউনে আমরা সকলেই মরলুম।
হ্যাঁ, মরলুম সকলে। যারা মরল না, তাদের শববাহক বানিয়ে দিল। সেইটেও সহজ কথা না।
আসলে কঠিনও কিছু নয়।
কঠিন নয়? বলেন কী?
আজ্ঞে। আগের থেকে সাবধানী তিনি, দুইদিন খুব কষ্ট হল, জানো। তখনো ব্যাটারিটা লাগাইনি। ঘরে ফিরে দেখি পা ফুলে ঢোল। তারপর ব্যাটারিটা লাগালুম। বয়স তো কম হল না। দেখতে দেখতে আধ শত। এখন তো দিব্যি যাচ্ছি।
বোঁ-বোঁ।
এবারেরটা সত্যিকারের। ফলের দোকানে ঘোরে। মিষ্টির দোকানে ঢুকে সন্দেশে হুল ফোটায়। তাকে কেউ বারণ করে না। একটাই শর্ত – মানুষের দিকে ভুলেও মুখ ঘোরাবে না। আর এই সুযোগেই থাকত ফরমান আলি। এইবার আপেল সরাতে গিয়ে ধরা পড়েছে। বাজারের মধ্যিখানে হুলস্থুল। দোকানদার একেবারে কলার চেপে লাল। ওদিকে ধাক্কাধাক্কিতে লেবুগুলো গড়িয়ে পড়ল। আধখানা তরমুজ পিচরাস্তায় চৌচির। যেন থকথকে মাংস। আহা কতদিন মাংসের স্বাদ জোটেনি। সেদিকে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়েছে দোকানি নিজেই। লোভ ও লজ্জা দুই চোখে ক্রমাগত অদলবদল হয়। হায়, দোকানি যে নতুন। যে ভ্যানরিক্সাটায় ফল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেইটাও ভাড়ার। এখনো হাতেখড়ি হয়নি। ওজনে ভুল করে। হিসেবেও। সে ছিল কারিগর। কাম সেলাই(হাটে বেচার জন্য কাপড় সেলাই) করত। এখন বিজনেস লাটে উঠেছে। হাটে বসেছে নব্য ফলঅলা। তাই চোরে-দোকানিতে কেলেঙ্কারি অবস্থা।
ব্যবস্থা কিছুতেই টেঁকে না। টিঁকবে কিভাবে? নেড়িদের সংসার অগোছালো বড়। ছিল উড়েদের(এলাকায় এই নামে পরিচিত) বাদামভাজা-ছোলাভাজার দোকান। এখন আর নেই। উড়েরা নেই। তালাবন্দিতে উড়ে গেছে কোথায়। সেই যে ছাইগাদা জমেছিল আঁচে, সেইখানে ঘর বেঁধেছে ভুলু। তার সঙ্গিনী কালুয়া। গুটি মেরে শুয়ে থাকে। ছাই মাখে। আহা সন্ন্যাসী! একালে ভিক্ষাও জোটে না। মাংসের ছাঁট, নিদেনপক্ষে লেড়ো বিস্কুট – বিস্কুটের নাম ভাইফোটা, সন্দেশ, ঘুঁটে, সস্তায় পাওয়া যেত টোস্ট – সেইসব বয়ামেই বন্দী থাকে। কদিন আগে খুলেছে আদর্শ হোটেলখানি। সেইখানে পাওয়া যেতে পারে উচ্ছিষ্ট। পাওয়া যাবে ইঁদুর। জ্যান্ত বা মরা। জ্যান্ত হলে বিপদ বড়।
কত যে বড় বিপদ তা জানে রাহান মোল্লা। উজির আলি মার্কেটে সবে নতুন শাড়ির দোকান খুলেছিল। লকডাউনের ঠিক আগে। শান্তিপুর গিয়েছে, ফুলিয়া গিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে দুইবার বড়বাজার। কত কী শাড়ি। জামদানি, হাজারবুটি, হ্যান্ডলুম, বেগমপুরী, তাঁত, লিলেনের উপর ডিজিটাল প্রিন্ট, শাড়ির পাড়ে শকুন্তলা – সঙ্গে আছে হরিণ, মাথার উপর গাছ – গাছের পাতা সুতো দিয়ে বোনা – সব কুটিকুটি ঐ ধারাল দাঁতে। দাঁত, না করাত? দোকানের শাটার খুলে সেই যে মাথা ঘুরেছিল আর থামলই না। খালি বোঁ-বোঁ আওয়াজ হয়। যেন কেউ চাকে ঢিল মেরে চলে গিয়েছে। বোঁ-বোঁ। ভুম-ভুম। রাহান মোল্লা চরকি হল। ভালো বাঙলায় ঘূর্ণিপাক। ঘুরঘুর করে সে ঘুরতে থাকল বাজারময়। কী যে বলে, কী যে করে কেউ বুঝল না। কিন্তু মাড়ির পাশে সে খৈনি রাখতে ভুলল না। নেশার জিনিস মানুষে সহজে ভোলে না। তেমনি নেশা লটারির। খৈনির দোকান লটারির টিকিট রাখে এখন। দোকানে লিখে রেখেছে প্রথম পুরস্কার এক কোটি!
প্রথমে এমনি হয়। তারপর সব সহজ হয়ে যাবে।
ইদ্রিস কাকা জানিয়েছিলেন। যেতে যেতে তিনি মাঝখানে কয়েকবার দাঁড়িয়ে পড়েন। হাঁফ ধরে যায় তো! তখন দম নিতে পারি না।
দম নিতে পারছিল না সুদেষ্ণাও। সে আমাদের এলাকার শিক্ষক। মাদ্রাসায় ইংরাজি পড়ায়। একদিন ফোনে বলল, হেল্প দরকার।
কী ব্যাপার?
ব্যাপারটা গুরুতর। রোগ নয়, আসলে বিয়োগ। মানে বাদামঅলার খোঁজ চাইছে।
ট্রেনে আসতে-যেতে বাদামঅলাটার সঙ্গে পরিচয়। সেই সূত্রে বাদাম খাওয়া। খাওয়ার সূত্রে, কোনো একদিন, খুচরো না থাকায় করে ফেলেছে ধার। এখন ট্রেন বন্ধ। জানে না বাদামবন্ধু কোথায়। সেই সূত্রে এলাকাতেও আসতে চায়। ছাত্রীদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত হয়ে যাবে তাতে। তবে তার আগে ধার মেটানো চাই।
ধার মেটে না সহজে।
বললুম, দু-পাঁচটাকার জন্য কেউ না খেয়ে মরবে না এখানে।
তাও শুনল না। বলল, দম ভারী হয়ে আসছে।
অতএব জোগাড় করতে ছুটলুম। তিনি আসবেন আর আমি বসে থাকব তা তো হয় না। এদিকে বাদামঅলা ভাড়া বাড়িতে থাকত। ভাঙিপাড়ায়। নাম জানে না। এত সহজে বেনামীর পাত্তা পাওয়া যাবে?
এল সে রোব্বার। একেবারে গাড়িতে। মুখে মাস্ক। হাতে স্যানিটাইজারের গন্ধ। কিছু ছাত্রী পাওয়া গেছিল। তাদের সঙ্গে আলাপ জমালো আবার। পড়াশোনার খোঁজখবর। সংসারের আঁতিপাতি। কজনকে সাহায্য করল। কজন চুপ। কোনো কথাই বলল না। ওদের জন্য খাবার এনেছিল। খাতা-কলম, আরও কত কী।
সেইসব চুকিয়ে এইবার আমাদের বেরতে হবে। কেন যে আমাকে সঙ্গে নিয়েছে জানি না। ভাঙিপাড়ায় গেছি গোটা দুইবার। কিংবা বড়জোর চারবার। চিনিনা সেরম কারোকেই।
গাড়ি নয়, পায়ে হেঁটেই রওনা দিলাম।
পাড়ার মুখ থেকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল। বেনামী সত্যিই বেপাত্তা। কেউ বলল চলে গিয়েছে। কেউ বলল এখন মাস্ক বিক্রি করছে। আসলে কেউ কিছুই বলল না।
ফিরব না কিছুতেই – আমরাও স্থির।
তখনি একজন হকারকে চেনা গেল। সেও ট্রেনের হকার। তবে মানিব্যাগ-চিরুনি-সেপ্টিপিন এইসব বিক্রি করে।
বলল, এখন অন্য বিজনেসে।
কী বিজনেস?
তিনি দাঁত বার করে হাসলেন। উত্তর দিলেন না। তবে জানালেন বাদামঅলা কোনখানে।
ঠিক জায়গাতেই এসেছি। তবে আরও খানিক ভেতরে। মাঝখানে খোলা নর্দমা। মাঝখানে চায়ের দোকানে লোক। দেখে দিদিমণিকে। ওদিকে লাইন দেওয়া ভাড়াবাড়ি। ওদিকে মহিষের খাটাল। দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র – দরজায় তালা মারা।
বসির হাজির লাইন ঘর। সারি সারি খুপরি। এইখানে নাকি থাকে। যাকেই জিজ্ঞেস করি যেন কেমন সন্দেহের চোখে তাকায়।
কী সন্দেহ! কতটা বোঝাপড়া!
কিছুই বুঝল না সুদেষ্ণা। আমাকে ছেড়ে এবার নিজেই খোঁজ নিল। দুদ্দার দরজা খুলছে। দুদ্দার বন্ধ হচ্ছে। শেষে একখানা ছাত্রীকে চিনতে পারল। সে-ই নিয়ে গেল খুপরিতে।
দরজা খুলতেই চায় না।
ছাত্রীটিও চেঁচাল, হালিমার আন্টি এইচে।
হালিমা?
সুদেষ্ণা আমার দিকে তাকাল। মনে পড়েছে কি তার ছাত্রীটির মুখ? নাকি ভাবছে, বাদামবন্ধু কেন মেয়ের পরিচয় দেয়নি এতদিন? মেয়ের শিক্ষকের কাছে বাদাম বেচতে লজ্জা লাগত তার?
দরজা খুলল একজন ঘোমটা। কিছুতেই উত্তর দেয় না। খালি মাথা নাড়ছে। তাতে কিছু বোঝা দায়!
উঁকি দিল হালিমা।
সে লজ্জিতা। চোখ পায়ের পাতার দিকে।
সুদেষ্ণা বলল, তোমার বাবা কোথায়?
সে মুখ তুলল না।
আগের ছাত্রীটি জানাল, পুলিশে তুলে নিয়ে গেছে।
পরে জেনেছিলাম পকেটমারিতে ধরা পড়েছে বাদামবন্ধুটি।
সম্মুখের দরজাটি খোলাই রইল। হালিমাকে দেওয়া হল খাতা-কলম আরও কত কী!
ওগুলো ব্যবহারের উপযোগিতা হারিয়েছে – আমরা জেনে গিয়েছিলাম। তবু সুদেষ্ণা বলল, চিন্তা করিস না, স্কুল খুললে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি এসে আবার খবর নেব তোর।
হালিমা তখনো লাজুক। মুখ তুলল না।
ফেরার পথে সুদেষ্ণা কাহিল। গাড়ি করে ফিরে গেল।
ওদিকে খবর রটেছে কার লাশ যেন জোর করে পুড়িয়ে দিয়েছে শ্মশানে।
ছাই ভাগ্য। বাতাসে ছাই ওড়ে।
কাকার সাইকেলের চাকা চলে রাস্তায়। ফলের দোকানে ভীমরুল ওড়ে। রাহান মোল্লার মাথায় চাক বেঁধেছে পোকা।
বোঁ-বোঁ শব্দ হয় চারদিকে…