কৃষ্ণেন্দু পালিত-এর ভ্রমণ

Spread This
কৃষ্ণেন্দু পালিত

কৃষ্ণেন্দু পালিত

বাংলার বারাণসী বড়নগর

‘মুর্শিদাবাদ বলতে মানুষ বোঝে হাজারদুয়ারি৷ এর বাইরেও যে দেখার আছে, ঐতিহ্যের দিক থেকে নবাবি ইতিহাসের চেয়ে সেসব কোনও অংশে কম নয়, সে খবর কেউ রাখে না৷ আপনারাও রাখেন না, আপনাদের কাগজগুলোও রাখে না৷ রাখলেও ছাপার কথা ভাবে না৷’ কথাগুলো ক্ষোভের সঙ্গে উগরে দিলেন সুখেন কর্মকার৷ নৌকা তখন মাঝনদীতে জিয়াগঞ্জ থেকে ভাগীরথী পেরিয়ে আমরা যাচ্ছি আজিমগঞ্জ — বাংলার আরেক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সন্ধানে৷ 
কলকাতা থেকে সকালে হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেসে ঘন্টাচারেকের ব্যবধানে মুর্শিদাবাদের পরের স্টেশন জিয়াগঞ্জ৷ ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে এগারোটা৷ সুখেনদা আগে থেকে অপেক্ষা করছিল৷ স্থানীয় মানুষ, আমার পূর্বপরিচিত৷ আমার আসার খবর তাকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম৷ চা-জলখাবারের পর্ব শেষ করে চেপে বসলাম তার বাইকে৷ স্টেশন থেকে সোজা ফেরিঘাট৷ এপারে জিয়াগঞ্জ, ওপারে আজিমগঞ্জ — মাঝে ভাগীরথী৷ নদী পেরিয়ে রড়নগরের দূরত্ব মাত্র তিন কিমি৷
সেকালে বড়নগরকে বলা হত বাংলার বারাণসী৷ আজকের বড়নগরকে দেখে নবাবি আমলের সেই বাণিজ্যনগরকে কল্পনা করা একটু কষ্টকর হবে৷ তখন বহু বিদেশি বণিক পালতোলা জাহাজ নিয়ে এখানে বাণিজ্যের জন্য আসতেন৷ বড়নগরের খ্যাতি ছিল কাঁসা-পিতলের জন্য৷ আজ সে নবাবি আমল নেই, বাণিজ্যকন্দ্রেও নেই৷ নদীর মতো সময়ও একূল ভাঙে ওকুল গড়ে৷ নতুন নতুন শহর-নগরের জন্ম হয়, হারিয়ে যায় অনেক প্রাচীন নগরী৷ বড়নগর এমনই এক শহর৷ সময় তাকে যেমন গ্রাস করেছে, ভাগীরথীও কম করেনি৷ তবু আজও অতীতের স্বাক্ষী হিসাবে টিকে আছে ডজনখানেক মন্দির৷ বাংলার নিজস্ব শৈলী আর টেরাকোটার কাজের জন্য আজও তারা আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল৷ আমরা সেই মন্দিররাজি দর্শন করতে যাচ্ছি৷
সুখেনদা বললেন, ‘বড়নগরের ইতিহাস জানতে হলে রানি ভবানীকে আগে জানতে হবে৷ রানি ভবানীর হাতেই বড়নগরের জন্ম বলতে পারেন৷ ভাগীরথীর পশ্চিমপাড়ে এই বড়নগর ছিল রানির প্রিয় বাসস্থান’৷
‘রানি ভবানীর নামটা শোনা শোনা লাগছে’ আমি বললাম, ‘কোথাকার রানি ছিলেন ইনি?’
ততক্ষণে নৌকা ঘাটে লেগেছে৷ দু’জনে মিলে ধরাধরি করে ফেরি নৌকা থেকে বাইক নামালাম ডাঙায়৷ শুরু হল আমাদের বড়নগর যাত্রা৷ সুখেনদা চালাচ্ছে, আমি সওয়ার৷ ফেরিঘাটের জটলা কাটিয়ে একটু ফাঁকায় আসতেই পুরোনো প্রসঙ্গে ফিরলেন তিনি, ‘ যে কথা হচ্ছিল, রানি ভবানী… নাটোরের রানি ছিলেন’৷
বুকের মধ্যে ছলাৎ করে ওঠে ভাগীরথীর জল৷ প্রিয় পাঠক, জানি কমবেশি আপনার অবস্থাও একই রকম৷ নাটোর শব্দটায় সাথে জড়িয়ে আছে শিক্ষিত বাঙালির এক গোপন ভাবাবেগ৷ শব্দটা শুনলেই মনে পড়তে বাদ্য জীবনানন্দ দাশ, বনলতা সেন… থাকে শুধু অন্ধকার আর মুখোমুখি বসিবার… কে জানে ইনিই সেই…! আমি কৌতুহলী হয়ে উঠি৷ বলি, ‘নাটোর!’
‘আদতে এঁরা ছিলেন বরিশালের জমিদার৷ যেহেতু বরিশালের নাটোর গ্রামের মানুষ ছিলেন, তাই নাটোরের রাজা হিসাবেই পরিচিতি ছিল রাজা রমাকান্তের৷ ১৭৫৩ সালে রমাকান্তের অকাল প্রয়াণের পর মাত্র ২৭ বছর বয়সে, মতান্তরে ৩২ বছর বয়সে বিশাল জমিদারির শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন রমাকান্তের বিধবা স্ত্রী রানি ভবানী এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন৷ বিশেষ করে সংস্কৃত ভাষায় তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য৷ জমিদারির কাজেও তিনি ছিলেন পারদর্শী৷ স্বামী বেঁচে থাকতে জমিদারি পরিচালনার অনেক ক্ষেত্রেই তিনি স্বামীকে সাহায্য করতেন৷ 
দানধ্যানের ব্যাপারেও তাঁর জুড়ি ছিল না৷ প্রজারা মাতৃরূপে দেখত৷ বলত দীনজননী, সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা৷ আর ছিল ধর্মে মতি৷ রানি ভবানী ছিলেন শিবের উপাসক৷ সধবা থাকাকালীন ১৭৫২ খিস্টাব্দে তিনি কাশীর শিবমন্দির তৈরি করে তাতে ভবানীশ্বর শিব প্রতিষ্ঠা করেন৷ বড়নগর ছিল নাটোররাজের দ্বিতীয় আবাসস্থল এবং রানি ভবানীর প্রিয় জায়গা৷ পরবর্তীকালে এই বড়নগরকেই তিনি তাঁর সাধনস্থল হিসাবে বেছে নেন এবং তৈরি করেন একটার পর একটা শিবমন্দির৷ মোট ১০৭টি শিবমন্দির তৈরি করে তিনি বারাণসীতুল্য করে তুলতে চেয়েছিলেন বড়নগরকে৷ যার অধিকাংশই আজ কালগর্ভে নয়তো নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে৷ টিকে আছে কয়েকটি মাত্র৷’৷ 
কথা বলতে বলতে আমরা মন্দির কমপ্লেক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েছি৷ সামনেই একবাংলা পঞ্চানন শিবমন্দির৷ মন্দিরের খিলানে পোড়ামাটির কাজ৷ ভেতরে প্রাচীন শিবমূর্তি৷ এই শিব বৈশিষ্ট্যে অনন্য৷ মহাদেবের এখানে পাঁচটি আসন৷ 
পাঁচমুখী শিবমন্দির দর্শন করে সামান্য উত্তরে এগোতেই বড়নগর তথা রানি ভবানীর অনন্য কীর্তি চারবাংলা মন্দিরাবলি৷ একটি স্বল্প-পরিসর স্থানে মুখোমুখি চারটি মন্দির৷ প্রত্যেক মন্দিরে তিনটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এবং প্রত্যেকটি মন্দিরে তিনটি করে শিবলিঙ্গ৷ প্রতিটি মন্দির টেরাকোটায় আবৃত এবং বহুলভাবে কারুকার্যমণ্ডিত৷ রামায়ণ, মহাভারত ছাড়াও নানা পৌরাণিক আখ্যান মূর্ত হয়েছে চারবাংলা ভাস্কর্যে৷ ১৭৫৫ সালে এটি তৈরি৷
চারবাংলার উত্তর-পশ্চিমে অষ্টকোণি ভবানীশ্বর শিবমন্দির৷ মুর্শিদাবাদের নিজস্ব শৈলীতে ১৭৫৫ সালে রানি ভবানী এটি তৈরি করান৷ ১৮ মিটার উচু মন্দিরের ছাদের গম্বুজটি যেন উলটানো পদ্ম৷ পদ্মের পাপড়ি আটটি দিকে বিকশিত৷ মন্দিরের প্রবেশদ্বারও আটটি৷
অদূরে পথের বাঁকে রানি ভবানীর কন্যা তারাসুন্দরীর তেরি গোপাল মন্দিরটি আজ দীর্ণ৷ দু’পাশে আছে আরও দুটি ভগ্নপ্রায় শিবমন্দির৷ এদের বামপাশে রানি ভবানীর রাজরাজেশ্বরী মন্দির৷ মন্দিরে অধিষ্ঠান করছে দারুনির্মিত মদনগোপাল মূর্তি, জয়দুর্গা ও মহালক্ষ্মী৷ কেবলমাত্র অষ্টধাতুর মহিষমর্দিনী দুর্গামূর্তিটি আজ অন্তর্হিত৷ রাজরাজেশ্বরী মন্দিরের সামান্য উত্তরে রাজবাড়িটি আজ বিধ্বস্ত ও পরিত্যক্ত৷ এই বাড়িতেই রানি ভবানীর শেষ জীবন কাটে৷ ১৭৯৫ খিস্টাব্দে ৭৯ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন তিনি৷ 
রাজবাড়ি রেখে আরও উত্তরে এগোলে বড়নগরের নিজস্ব দেবতা অষ্টভুজ গণেশ মন্দির৷ মন্দিরের টেরাকোটার কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়৷ আরও উত্তরে মঠবাড়ির বিপরীতে জোড়বাংলা মন্দির বা গঙ্গেশ্বর শিবমন্দির বাংলা টেরাকোটা শিল্পের আরেক অনন্য নিদর্শন৷ মোটামুটি বড়নগর দর্শন এখানেই শেষ৷
এবার আমাদের গন্তব্য দশ কিলোমিটার দূরে কিরীটেশ্বরী মন্দির৷ তার আগে দুপুরের ডানহাতের কাজটা আজিমগঞ্জ থেকেই সসেরে নিই৷ কিরীটেশ্বর যাওয়ার পথে ৬ কিলোমিটার দূরে ডাহাপাড়ায় শ্রীজগবন্ধু ধামটাও দেখে নিই৷ পরম বৈষ্ণব জগবন্ধু সুন্দরের জন্ম এই ডাহাপাড়ায়৷ প্রতি বছর বৈশাখ মানে খুব ঘটা করে প্রভুর জন্মোৎসব পালিত হয়৷ 
ডাহাপাড়া থেকে কিরীটেশ্বর — দূরত্ব চার কিলোমিটার৷ কথিত আছে, সতীর কিরীট অর্থাৎ মুকুট এখানে পড়েছির৷ কিরটেশ্বরী তাই সতীপীঠ৷ অতীতে নাম ছিল কিরীটকণা৷ ১৭২টি শিবমন্দির তেরি হয়েছিল সেকালে৷ ১৪০৫ সালে মূল মন্দিরটি ধ্বংস হলেও কারুকার্যমণ্ডিত প্রস্তরবেদিটি আজও আছে৷ বর্তমান মন্দিরটি ১৮ শতকে লালগোলার রাজা দপৃনারায়ণ রায় তৈরি করান৷ মন্দিরে কোনও দেবীমূর্তি নেই, ছিল দেবীর কিরীট, বর্তমানে যেটি রানি ভবানীর তৈরি গুপ্তমঠে স্থা্নান্তরিত হয়েছে৷ ইতিহাস বলছে, জীবনের শেষলগ্নে কুষ্ঠরোগগ্রস্ত মিরজাফর শরীর-মনের জ্বালা মেটাতে দেবী কিরীটেশ্বরীর চরণামৃত পান করেছিলেন৷ কিরীটেশ্বরী মন্দির ছাড়াও এই চত্বরে রয়েছে আরও অনেক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ৷ পৌষ মাসের প্রতি মঙ্গলবার এখানে মেলা বসে এবং ভক্ত সমাগম হয়৷
কিরীটেশ্বরী দর্শন শেষ করে আমরা পরবর্তী দ্রষ্টব্য সিরাজের সমাধি খোশবাগের উদ্দেশে রওনা দিই৷ শীতের বেলা, দ্রুত আলো নিভে আসছে, ইচ্ছা ছিল এ যাত্রায় শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণটাও দেখে নেব৷ রাস্তায় বাইকের টায়ার পাংচার হওয়ায় সে পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে৷ কর্ণসুবর্ণ তোলা থাকল অন্য কোনও সফরের জন্য৷ 
খোশবাগ পৌঁচাতে পাঁচটা পেরিয়ে গেল৷ পাঁচটায় খোশবাগের মূল ফটক বন্ধ হয়ে যায়৷ অগত্যা গেটের বাইরে থেকেই খোশবাগ দর্শন করে ফিরে আসি ডাহাপাড়া ফেরিঘাটে৷ ভাগীরথীর ওপাড়ে রালবাগ বা মুর্শিদাবাদ৷ ফেরিঘাট থেকে হাজারদুয়ারির দূরত্ব মাত্র আধ মাইল৷ রাতটা হোটেলে কাটিয়ে কাল সকালে ধীরেসুস্থে বেরোব নবাবি ইতিহাসের মুর্শিদাবাদে৷ দেকে নেব হাজারদুয়ারি, কাটরা মসজিদ, নশিপুর রাজবাড়ি, কাঠগোদাম, রোজপরিবারের সমাধিস্থল সহ আরও যা যা দ্রষ্টব্য৷ সব মিলে ঘন্টা দুই-তিনের সফর৷ তারপর বিকালের হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস ধরে আবার কলকাতায়৷ বাঙালিমাত্রেই মুর্শিদাবাদ সম্পর্কে কমবেশি ওয়াকিবহাল এবং বহুচর্চিত বিষয়, তাই সে বর্ণনায় আর গেলাম না৷ ভবিষ্যতে যাঁরা মুর্শিদাবাদ ভ্রমণে আসবেন, তাঁদের কাছে একটাই অনুরোধ, অতিরিক্ত একটা দিন বরাদ্দ রাখুন বড়নগরের জন্য৷ সম্ভব হলে শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণের জন্যও একটা দিন৷ কথা দিচ্ছি ভাগীরথীর ওপার আপনাকে বঞ্চিত করবে না৷