অমিতাভ প্রহরাজ-এর গদ্য

Spread This
অমিতাভ প্রহরাজ

অমিতাভ প্রহরাজ

ল্যাং, কবিতা ও রূপকথা

কবিতার অর্থ থাকে একমাত্র যে খাতায় লেখা হচ্ছে আর যে কলমে লেখা হচ্ছে তার দামে (ওইজন্য ল্যাপটপে লেখা কবিতা বা স্মার্টফোনে লেখা কবিতার অনেক বেশি অর্থ)… কবিতা হচ্ছে কবির মারা একটি ল্যাং, যা খেয়ে কেউ পড়ে যাবে, কেউ পড়তে পড়তে সামলে নেবে, কেউ কিছুই টের পাবেনা, কেউ ‘শালা শুয়োরের বাচ্চা’ বলে খিস্তি মারবে, কেউ ‘ভারি দুষ্টু’ বলে একটা চুমু খাবে, কেউ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবে ওকে ল্যাং লারবে বলে,
কেউ ধরে বোঝাবে ‘জানিস রবীন্দ্রনাথ কোনদিন ল্যাং মারেননি, জানিস জীবনানন্দকে ল্যাং মেরেছিল বলে ট্রামের সামনে পড়ে মারা গেছিলেন’,
কেউ নিজের মনে ভেবে উঠবে, ‘এইতো ল্যাংচার মতো মিষ্টি এই ল্যাং, অপূর্ব’, কেউ বলবে ‘জানিস বেদে কয় প্রকার ল্যাং এর কথা বলা আছে? কোন বিশেষ ধরণের ল্যাং থেকে ল্যাংবোট শব্দ জন্ম নিয়েছে? ফ্রেঞ্চ ল্যাং, জার্মান ল্যাং, রিয়েল ল্যাং, সুররিয়েল ল্যাং, ম্যাজিক-রিয়েল ল্যাং, এগুলো নিয়ে জান, পড়, বোঝ তারপর মারবি’, কেউ তার পাশের লোককে বোঝাবে ‘বুঝলেন এটা ল্যাং নয়, এর মধ্যে এক গভীর অর্থ নতজানু হয়ে বসে আছে, অভিনিবেশ সহকারে ল্যাংটি খেলেই তা বোঝা যায়… ও ঘুঁষি বা থাপ্পড় না মেরে ল্যাং মারলো কেন?? মানে ওর হাতের ওপর বিতৃষ্ণা এসে গেছে, তাই পায়ের ব্যবহার… হাতের মানে এই কংগ্রেস সরকারের দুর্নীতি ওকে আলোড়িত করেছে… পা দিয়ে ল্যাং মেরে ও এটাও বুঝিয়ে দিচ্ছে যে কীভাবে ন্যায়, নীতিকে পদদলিত করে এগিয়ে যাচ্ছে এই সময় ও সরকার… তাই ও চাইছে এর পতন… ও ল্যাং মেরে আমাকে ফেলে দিয়ে এটাও বোঝাচ্ছে আমরা যে পথে হেঁটে যাচ্ছিলাম সেই পথ ঠিক নয়, তাই আমাদের চলা ও বিঘ্নিত করলো, বুঝিয়ে দিল এই রাস্তার শেষে কীরকম আক্রমণ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে… আরো গভীরে গেলে দেখবেন, যে এই আমাদের চলা একধরণের গঠনমূলক প্রক্রিয়া, তাকে ও ল্যাং মেরে ভাঙলো, মানে এটা একধরণের ডিকনস্ট্রাকশানকে চিহ্নিত করে… আবার অন্য দিক দিয়ে দেখলে দেখবেন, আমরা দাঁড়িয়ে আছি বা হাঁটছি, ল্যাংটি খেলে আমরা পড়ে যাচ্ছি মাটির ওপর, মানে আমাদের সর্বস্ব ও মন যেন মাটির কাছাকাছি থাকে, হাঁটার সময় মাটি থেকে মনের যা দূরত্ব, ল্যাং খেয়ে পড়ে গেলে সেই দূরত্ব কমে যায়… এ এক লৌকিক দর্শনের দিকে নিয়ে যায়”
কবিতার অর্থ, ব্যাখ্যা, বোঝা ইত্যাদি গত শতাব্দীর অভ্যেস, যেমন কোন মহিলা দেখলেই রাস্তায় মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতো, কার মেয়ে? বা কার বোন? বা কার স্ত্রী? বা কার বাঁধা? বা কার বিধবা? বা কোন বাড়ির? ইত্যাদি… যে প্রশ্নটা এখন জাগে, “কী করে?” বা “কী নিয়ে পড়ছে?” এর কনসেপ্ট ছিলই না… কবিতা একটা ক্রিয়া বা ল্যাং, তার প্রতিক্রিয়া হয় শুধু, তুমি সেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারো… অর্থ, বিশ্লেষণ আর কিছু নয়, তোমার মনের অভ্যেসসঞ্জাত মাত্র, ওই কার মেয়ে, কার বোন, কার বউ ইত্যাদির মতো…
এ এক নেশাগ্রস্তে
কাটারি কুঁচকে যায়… বারান্দা গর্দানে
ওহে মমমমা… কী দেখি কাতানে?
আলোর শিরা এসে লেগেছে ঝাউকুঁচে
তাই কাটো?
নলি কাটো পর্দার থেমে থাকা?
আমি যাই আকাশের কাগজের কাছে
আমি যাই আকলম অবোধের কাছে
ঘুরেফিরে করাতের পায়চারি যেন
বাহির
ঘুরেফিরে শুকনো শূন্যতার ওপরে র‍্যাঁদা চালাচ্ছে আমার ছায়াটি
আর কি চোকলা উঠছে…
…… তো লালকমল লিখতো ফুটকি ফুটকি দেওয়া ঝুমকোলতার মতো দোলদুলুনির লেখা। সেটা রাজকন্যা ছুটকির ছিলো খুউউব পছন্দ। আর নীলকমল লিখতো ঝনঝনানি শনশনানি তরোয়ালের লেখা। তারপর একদিন সেখানে এলো এক মস্ত রাক্ষস সম্পাদক। সে এসেই এ কিছু লিখছে তো একে কাটছে। ও কিছু লিখছে ওকে কাটছে। নিয়ম করে দিলো সবাইকে রাক্ষুসে লেখা লিখতে হবে। রাক্ষুসে লেখা না হলে, যখনই মানুষের মতো হতো, রাক্ষস কোনটাকে নখ দিয়ে ফ্যাঁএ্যাএ্যাএ্যাএ্যাস, কোনোটা দাঁত দিয়ে কচমচকচমচকচমচ। আর রাক্ষসের লেখা নিয়ে কেউ কিছু নিজের কথা উচ্চারণ করলেই তাকে রাজ্য থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতো।
আর সেই সময়ে না, লিখলে লোকে হাততালি দিতো, জানো। দুটো হাত একসাথে মেরে মেরে চটর পটর চটর পটর আওয়াজ।
রাক্ষস রোজ সকালে খেত একশো মানুষ হাততালি, রাত্রে দুশো মানুষ হাততালি। আস্তে আস্তে বাড়তে বাড়তে সেটা দুশো মানুষ, তিনশো মানুষ, হতে হতে হাজার মানুষ। সে রাক্ষসের ছিলো মাথার মধ্যে মস্ত একটা পেট, আর চোখের মধ্যে কানের মধ্যে একটা প্রকান্ড হাঁ করা মুখ। এমনি করে যখন রাক্ষস রোজ সকালে হাজার হাততালি রাত্রে হাজার হাততালি, না দিলে রাজ্যে প্রবেশ নিষেধ। তখন, মানুষে কি এত এত হাততালি দিতে পারে বলো? কেউ হাততালি দিতে দিতে হাতের তালুর নরম মাংসে গজিয়ে ফেলেছে কি যন্ত্রণাদায়ক কড়া। কেউ বা হাতের ব্যথায় পালিয়ে গেছে অন্য রাজ্যে। এমনি করতে করতে লোকেরা রাক্ষস যাই করে তাতে হাততালি দিতে থাকে, অভ্যেস যে হয়ে গেছে। অনেক হাত অকেজো হয়ে ভেঙে ঘরের কোনায় রাখা থাকতো। অনেক লোক তো হাতটাকে রাক্ষস এর কাছেই রেখে চলে যেত। শেষে লালকমল আর নীলকমল ছাড়া আর একটা কেউ ছিলো না রাজ্যে যে লেখে। আর রাজকন্যা ছুটকি ছাড়া আর কেউ ছিলো না যে লেখা পড়ে হাততালি না দিয়ে চোখ ভিজিয়ে ফেলে।”
– “তাপ্পর?” গোল্লা গোল্লা দুই চোখ
– “তাপ্পর? তাপ্পর তাপ্পর তাপ্পর রাজ্যে সবার অজান্তে ঢুকলো কয়েকটা বাঘ বাঘিনী। রাক্ষস হাততালি শুনতে এত মৌতাতে আছে, তার সামনে নাচছে বীণার মতো দেখতে নর্তকী, হাঁসের মতো দেখতে একটা লোক রাক্ষসের কানের পাশে প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক করে শোনাচ্ছে হংসধ্বনি। আর চারদিকে গমগম করছে কাটা হাতগুলো। এত আওয়াজে রাক্ষস শুনতেই পেলো না বাঘ বাঘিনীর ডাক। আর আস্তে আস্তে হাত হারানো সমস্ত মানুষ বাঘ হতে শুরু করলো, শুরু করলো বাঘিনী হতে। থাবায় দিলো শান, চোখে দিলো ডোরাকাটা রোদ্দুরের তেজ। গলায় আনলো পাহাড়ভাঙার আওয়াজ……”
আমি স্বপ্ন দেখি এক আশ্চর্য উন্মাদ যে সব মানুষের বুকের মধ্যে যে সোনার কৌটোয় থাকে সে যেন নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে বাইরে আসে।
বই পড়া নেট ঘাঁটা উত্তর হয় এমন প্রশ্নদের আমার বর্জ্য মনে হয়, উত্তর জন্ম নেবে মানুষের গর্ভ থেকে অপৌরুষেয় রূপে। আমি আপনার থেকে শিখতে চাই, জ্ঞান নিতে চাই।
 সেইই আপনি যিনি, ওই আর কি কিছুই না, মানে এমনি টুকটাক লেখেন আর পড়েন, মানে বিরাট কিছু নয়। আমি আপনার সাথে কথা বলবো।