সুতপা সাহা-র অনুবাদ

Spread This
সুতপা সাহা

সুতপা সাহা

নেটিভ আমেরিকান কবি জোয় হারজো র ( Joy Harjo ) এই কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল কয়েকবছর আগে
The Woman Who Fell From The Sky নামের সংকলনটিতে। আজকের নয়া স্বাভাবিকত্বের যে পৃথিবীতে আমরা বাঁচার চেষ্টায় আছি , প্রতিমুহূর্তে সে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে জীবনের ন্যূনতম চাহিদা, জীবনের গূঢ় অর্থ। ইতিহাসের এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে এই কবিতাটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হল।
 
 
” হয়তো এখানেই পৃথিবীর শেষ “
 — জোয় হারজো
পৃথিবীর চলা শুরু এই রান্নাঘরের টেবিলে
বাস্তবে যাই ঘটুক না কেন, খাদ্য জীবনের জন্য।
ভূমিজাত যাবতীয় মহার্ঘ জড়ো হয়, তৈরি হয় এই টেবিলে
সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকে, এবং এটাই বলবৎ  থাকবে।
 
 
টেবিলের আশপাশ থেকে আমরা কুকুর মুরগি তাড়াই
শিশুদের কচি দাঁতে টেবিলের কোনা ক্ষয় হয়
টেবিলের নিচে তারা হাঁটু ঘষে।
 
 
এখানেই ছোটোদের মানবিকতার পাঠ
এখানেই আমরা পুরুষ খোদাই করি, নির্মাণ করি নারী
 
এই টেবিলে আমাদের যাবতীয় গল্পগাছা
শত্রুকে চিনে রাখি আর ভালোবাসার প্রেতাত্মাদের
 
আমাদের স্বপ্নরা বেঁচে থাকে কফির ধোঁয়ায়
দুহাতে তারা আমাদের শিশুদের গলা জড়িয়ে ধরে
আমাদের ভেঙ্গে পড়া সত্তা আর সেই সত্তাকে
টেবিলে টেনে তোলার অপচেষ্টা দেখে ওরা হাসে
 
এই টেবিল আমাদের বর্ষার আশ্রয়,
রৌদ্রের আচ্ছাদন।
 
যুদ্ধ শুরু হয় এবং শেষ হয় এই টেবিলে
সন্ত্রাসের ছায়া থেকে বাঁচতে এখানেই লুকোতে হয়
এখানেই উদযাপিত হয় শোচনীয় বিজয়।
 
এই টেবিলেই আমাদের প্রসববেদনা
এবং পূর্বপুরুষের সমাধিস্থল
 
এখানেই আমরা গাই আনন্দের গান, দুঃখের গাথা
দুর্ভোগ আর অনুতাপ থেকে মুক্তি প্রার্থনা,
জ্ঞাপন করি কৃতজ্ঞতা।
 
হয়তো আমাদের হাসি আর কান্নার ভেতর দিয়ে
এই রান্নাঘরের টেবিলেই পৃথিবীর যাত্রা শেষ হবে
শুধু পড়ে থাকবে অবশিষ্ট খাবারের শেষ সুললিত কামড়।
 
জোয় হারজো
Still I Rise — Maya Angelou
‘তবুও ঋজু হয়ে উঠি’         
 
ইতিহাসের পাতায় তুমি যতই আমায় ছোটো করো
তোমার ওই তেতো বাঁকা মিথ্যে দিয়ে
যতই আমাকে দলে দাও নোংরার ভেতর
তবুও , ধুলোর মতো, আমি জেগে উঠবো।
 
 
আমার সাহস ও শক্তি কি তোমাকে অখুশী করে ?
তোমার মনে কেন হতাশার বাস ?
কারণ আমি এমনভাবে হেঁটে যাই , যেন আমার
বসার ঘরে কুঁয়োভর্তি তেলের সরবরাহ অবাধ।
 
চাঁদ যেমন সত্যি , অথবা সূর্য
অথবা যেমন নিশ্চিত জোয়ারভাঁটা , সমস্ত
আশা যেমন করে লাফিয়ে মাথা উঁচু করে ওঠে ,
আমিও উঠে দাঁড়াই ।
 
তুমি কি আমাকে ভগ্নহৃদয় দেখতে চেয়েছিলে ?
মাথানত অবস্থায় কিংবা আনতচোখে ?
দুপাশে ঝুলে পড়া কাঁধ ঠিক যেন অশ্রুফোঁটার মত , 
আমার গভীর ব্যথার কান্নার মতো দুর্বল ?
 
আমার ঔদ্ধত্য কি তোমায় বিরক্ত করে ?
তোমার কি মেনে নিতে খুব কঠিন মনে হয় ?
কারণ আমি যখন হাসি , মনে হয় আমার
বাড়ীর উঠোনে সোনার খনি খোঁড়া আছে ।
 
তোমার মুখের ভাষা আমায় বিদ্ধ করুক
তোমার দৃষ্টি আমাকে করুক ছিন্নভিন্ন
তোমার ঘৃণা দিয়ে আমাকে তুমি মেরে ফেলতে পারো
তবু , বাতাসের মতো আমি উঠে দাঁড়াবোই।
 
আমার শরীরি উন্মাদনা কি তোমায় বিচলিত করে ?
খুব কি আশ্চর্য করে তোলে ?
কারণ আমি যখন নাচি , মনে হয়
আমার দুই জঙ্ঘার সন্ধিস্থলে
অনেক হীরে লুকোনো আছে ।
 
লজ্জিত ইতিহাসের ভাঙ্গাচোরা কুঁড়েঘর থেকে 
আমি উঠে দাঁড়াই
ব্যথার শিকড়ে জারিত অতীত থেকে
আমি উঠে দাঁড়াই
এক অন্ধকার সমুদ্রে ঢেউয়ের মতো আমি উত্তাল হয়ে উঠি
জোয়ারের মতো আমি ফুলে উঠি , উপচে পড়ি
পেছনে ফেলে রাখি ভয় আর দুঃস্বপ্নের রাত
আমি উঠে দাঁড়াই
পূর্বপুরুষের দান করা মহার্ঘ উপহারগুলো দুহাতে ধরে থাকি
আমিই স্বপ্ন , আমিই আশা , সব ক্রীতদাসের
আমি উঠে দাঁড়াই
আমি জেগে উঠি
আমি ঋজু হয়ে উঠি ।
 
Maya Angelou 
A woman Speaks —— Audre Lorde
 
         এক নারীর কথন
 
চাঁদ চিহ্নিত এবং সূর্যস্পর্শী
আমার অলিখিত মায়া
কিন্তু যখন সমুদ্র ফিরে তাকায়
সে পিছনে আমার বালুচিহ্ন-ছাপ রেখে যায়
আমি এমন কোনো কৃপাপ্রার্থী নই, যাতে রক্তস্পর্শ নেই
অথবা যা প্রেমের অভিশাপের মত অকরুণ
আমার সমস্ত ভুলের মত স্থায়ী
অথবা আমার অহংকারের মত
আমি মিলিয়ে ফেলি না 
ভালবাসা আর করুণাকে
কিংবা ঘৃণার সঙ্গে অবজ্ঞা
আর যদি আমাকে জানতে চাও
তাকিয়ে দেখ স্বর্গের দেবতার অন্তরে
যেখানে অস্থির সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ে।
 
আমি জন্ম ও দেবত্বের মাঝামাঝি
বসবাস করি না
আমি শাশ্বত এবং অপরিণত
এবং আজও খুঁজে বেড়াই আমার অনুজা-দের
আফ্রিকার দাহোমে-র বীর জাদুকরীদের
তাদের কুন্ডলিত পোশাকের ভেতরে
নিজেকে ধারণ করি
যেমন করেছিলেন আমাদের জন্মদাত্রীরা
শোকে-পরিতাপে।
 
বহুদিন ধরে
আমি নারী
বিপজ্জনক আমার হাসি
অতীতের জাদু আর দ্বিপ্রহরের নতুন উন্মাদনা নিয়ে
আমি এক প্রতারক
তোমাদের সমস্ত প্রতিশ্রুত 
প্রশস্ত ভবিষ্যত জুড়ে
আমি নারী
আমি বর্ণহীন ।
           ———————-
 
Audre Lorde