সুজন ভট্টাচার্য-র প্রবন্ধ

Spread This
সুজন ভট্টাচার্য

সুজন ভট্টাচার্য

ত্রাণ-পরিত্রাণের রাজনীতি ও পিকনিক কালচার

আমরাই সবথেকে ভাল ভাবে ত্রাণ দিয়েছি বা দিতে পারি। তাই ভোট-টা আমাদেরই পাওয়া উচিত। এমন প্রচার নিশ্চয়ই শুনেছেন। কিংবা ভোটের ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায়, আর ত্রাণ নয় জাতীয় হুমকিও নিশ্চয়ই কানে গেছে। কেউ ত্রাণের ছবির সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন বিবিধ সরকারের সদিচ্ছার কাহিনী, কেউ আবার সরকারি অপদার্থতাকে ব্যঙ্গ করছেন চড়া মাত্রায়। আবার ত্রাণ লোপাট বা হজমের অভিযোগও বিস্তর। সেই নিয়ে পারস্পরিক কুস্তি এমনকি আত্মঘাতী ল্যাঙ-এর যাত্রাপালাও জমে উঠেছে। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চ এখন ত্রাণকেন্দ্রিক। কৃতজ্ঞতা পাওয়া উচিত লক ডাউন, আম ফান ও ইয়াশের।
মুশকিল হল, ত্রাণ দেওয়া কিংবা হজম করে দেওয়া, কোনোটাই রাজনৈতিক দলের কাজ নয়, অন্তত হওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য হল সমস্ত স্তরে সরকারি ক্ষমতা কব্জা করা। তাই জনগণকে যাতে বেসরকারি ত্রাণের মুখাপেক্ষি না হতে হয়, সেই ব্যবস্থা করাটাই রাজনৈতিক দলের কাজ হওয়া উচিত ছিল। প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসবেই। সেটা মাথায় রেখেই ধারাবাহিকভাবেই প্রস্তুতি রেখে যাওয়াটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। আর আমাদের কপালে কিন্তু বাস্তবটা হয়ে আছে ঠিক বিপরীত। আমরা যেন মুখিয়ে থাকি, কবে একটা বন্যা-খরা-মহামারী হবে, আর আমরাও বগল বাজিয়ে দৌড়ব ত্রাণ দিতে। আবার কেউ কেউ মুখিয়ে থাকবে এই সুযোগে ইধার কা মাল ওধার করে ফেলা যাবে।
ত্রাণ দিতে পেরে গর্বিত হবার সুযোগ থাকতে পারে মিশন, সেবাশ্রম কিংবা অগুনতি সামাজিক সংগঠনের। কারণ তারা সরাসরি সরকারি ক্ষমতা কব্জা করতে যান না। ক্ষমতার প্রসাদ কমবেশি অনেকের ভাগ্যেই হয়তো জোটে; কিন্তু তারও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে অন্তত তাত্ত্বিকভাবে সেই সীমাবদ্ধতা নেই। কেউ কেউ বিভিন্ন স্তরে কমবেশি সময় জুড়ে ক্ষমতা ভোগ করেছেন। ফলে স্থায়ী ও সক্ষম পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারার দায়িত্ব কমবেশি সকলেরই ছিল বা আছে। তাহলে এমনটা হতে পারছে কেন?
সরাসরি উত্তর খোঁজার জন্য কুড়ি বছর আগের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক। ২০০০ সাল। ভয়ংকর বন্যায় প্লাবিত উত্তর ২৪ পরগনা। আমরা গেছিলাম চরম বিপর্যস্ত স্বরূপনগরে। ইছামতীর বাঁধের উপরে ত্রিপল খাটিয়ে বসে আছে গোটা একটা পাড়া। না, সরকারি ত্রাণ আসেনি। কারণ সেই পাড়ার রংটা আবার সরকারি বাবুদের মনপসন্দ নয়। আমাদেরও চোখ রাঙিয়ে ছিলেন তদানীন্তন কোনো প্রতাপশালী, ত্রাণ এখানে রেখে যান; আমরা দিয়ে দেব। কানে কালা বলে আমরা শুনতে পাইনি। তাই আবার হুমকি, সার্টিফিকেট পাবেন না কিন্তু। ধুর মড়া, আমরা কি নোবেল প্রাইজ পাবার জন্য লাইন লাগিয়েছি নাকি!
যাই হোক, ত্রাণ দেওয়া শুরু হল। এক সময় তো ভাণ্ডার ফাঁকা হবেই। এবার ফিরে আসতে হবে। গাড়ি চলতে শুরু করল। বাঁধবাসীরা পিছনে পিছনে আসছেন। গাড়ির বেগ আস্তে আস্তে বাড়ছে; তাদেরও। আমরা হাতজোড় করে বলে যাচ্ছি, আর কিছু নেই, আসবেন না। শোনে কে! গাড়িতে একটা পুরনো শাড়ি রাখা ছিল, হাত পরিষ্কার করার জন্য। কে যেন সেই কাদামাখা শাড়িটাই ছুঁড়ে দিল বাঁধের উপরে। মুহূর্তে ভিড় দৌড়তে আরম্ভ করল। মুখে উল্লাস, আছে, আছে। আচমকাই এক পৃথুলা মহিলা আছাড় খেয়ে পড়লেন। তারপরই সম্বিত ফিরে পেল সেই গোগ্রাসী জনতা।
আমার পাশেই ছিল জয়ন্তদা। কাঁদতে কাঁদতে বলল, মানুষগুলোকে আমরা ভিখিরি বানিয়ে ছেড়েছি। হ্যাঁ, এটাই সেই কেমিস্ট্রি যা রাজনৈতিক দলগুলোকে ত্রাণের কম্পিটিশনে নামিয়ে আনে। মানুষকে চরিত্রগতভাবে ভিখিরি বানিয়ে রাখো। দয়ার দান পেয়েই তারা কৃতার্থ হোক। তাহলে হক্কের পাওনা খুঁজতে রাস্তায় নামবে না কেউ। আর তাহলে সেই দাক্ষিণ্য বিতরণকেই ভোটাকর্ষক অস্ত্র বানিয়ে ফেলা যাবে।
ক্ষমতা বলতে কে কী বোঝেন, জানি না। আমাদের দেশে ক্ষমতার সারমর্ম হল যোগ্যতম মানুষটিকে বঞ্চিত করে অযোগ্যতর মানুষটিকে পাইয়ে দেওয়ার শক্তি। যেটা আমার আইনত প্রাপ্য, যদি ঠিক সময়ে সেটা পেয়েই যাই, তাহলে আর ক্ষমতাবানের মহিমা থাকবে কোথায়? একটু লেজে না খেলালে মূঢ় জনগণ ক্ষমতার চক্র জানবে কোত্থেকে? আর যার পাবার কথা নয়, তার হাতে ডালা সাজিয়ে দেওয়াটাই তো আসল ক্ষমতা। যে যত ভালভাবে এই কাজ করতে পারবে, তার ক্ষমতা তত পোক্ত। স্বভাবতই বর্গাদারির সার্টিফিকেট বলুন আর ঘরভাঙার অনুদান, সেই একই চক্র। ২০০০ সালের বন্যা থেকে সাম্প্রতিক আম-ফান, একই অভিজ্ঞতাই তাই ঘুরেফিরে চলে আসে সামনে। হ্যাঁ, পারদর্শিতার তারতম্য তো আছেই। তাই কেউ ঝট করে ধরা পড়ে যায়, আর কেউ ধরা পড়তে কয়েক মাস।
কেউ প্রশ্ন করি না, বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ দিতে হবে কেন! কেন উপযুক্ত সরকারি পরিকাঠামো থাকবে না! কেন কেউ কেউ বঞ্চিত হবেন ত্রাণ থেকে! হ্যাঁ, একটা বিপর্যয় ঘটার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি পরিকাঠামো নিশ্চয়ই সর্বত্রই সমভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে না। মানবিক সক্ষমতার একটা প্রসঙ্গ অবশ্যই আছে। সেই তাৎক্ষণিক খামতিটুকু মিটিয়ে দেবার জন্য বেসরকারি উদ্যোগকে প্রয়োজন পড়তেই পারে। কিন্তু সেটা কতদিনের জন্য? ঘটনার দেড়-দু মাস পরেও? তাহলে সরকারি ব্যবস্থার কাজ কী?
ধরুন লক ডাউনের কথা। বাড়ির বাইরে বেরোনো বন্ধ হলে দিনগত উপার্জন যাদের, তাদের যে পেটে কিল মেরে পড়ে থাকতে হবে, সেটা আপনি-আমি জানলেও কেন্দ্রীয় সরকারের মাথারা বোধহয় জানতেন না। পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে বিস্তর হল্লাগল্লা হল। আচ্ছা বলুন তো, ৪ ঘণ্টার নোটিশে যারা লক ডাউন নামিয়ে আনলেন, তারা জানতেন না! এইসব মানুষদের যদি আগেই যার-যার বাড়িতে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হত এবং সেখানেই নিয়মিত খাবার বা রেশন দেবার ব্যবস্থা করা হত, তাহলে কি এমন বিশৃঙ্খলা হবার সুযোগ থাকত? সেটাই করা হল, লক ডাউন এক মাস গড়িয়ে যাবার পর। ততদিনে যা হবার হয়ে গেছে। ভারতই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে হুট করে লক ডাউন করেও সংক্রমণের হার ক্রমাগত মাত্রা ছাড়িয়েছে।
আসলে সমস্যাটা দৃষ্টিভঙ্গির। কীভাবে সুষ্ঠু পদ্ধতিতে রেশন দেওয়া যায়, কাদের রেশন কার্ড নেই বা থাকলেও অন্য কোনো জায়গার, সেটা কীভাবে চটজলদি বের করা যায়, আমি জানি, আর নেতারা জানেন না, সেটা কি আর হয়! আসলে করবেন না। কারণ ঐ যে আগেই বলেছি। সব যদি সুষ্ঠুভাবে হয়ে যায়, তাহলে আর ক্ষমতার মধু থাকবে কোথায়? লোকে তাহলে পুঁছবে কেন? দেশে যে আট কোটি মানুষ আছেন যারা ভিন রাজ্যে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করেন, সেই তথ্য তো অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেই বলা আছে। তাদের কথা মাথায় আসল না কেন?
লক ডাউনের সময় নানান জায়গায় ব্যক্তিগত কিংবা ছোট ছোট স্থায়ী বা তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক উদ্যোগ এইসব মানুষের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলেই ফুড রায়টের হাত থেকে গোটা দেশ বেঁচে গেছে। কেউ রান্না করা খাবার দিয়েছেন, কেউ দিয়েছেন চাল-ডাল-সবজি। ক্ষমতায় থাকুক আর নাই থাকুক, একটিও রাজনৈতিক দল এইসব উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়েছেন? আমার চোখে পড়েনি। কেন দেননি? কারণ এইসব উদ্যোগের অধিকাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাদের মনপসন্দ এলাকায় বা কেবলমাত্র তাদের কাছের মানুষদের পেট ভরানোর জন্যই সক্রিয় হয়নি। অতএব তাদের যাবতীয় উদ্যোগ রাজনৈতিক দলগুলোর ভাল লাগেনি।
সরাসরি বন্যাত্রাণে প্রথম নেমেছিলাম ১৯৯৪ সালে। তারপর ২০০০, ২০০৯-এর আয়লা, ২০১৮-র বন্যার সময়েও সক্রিয় ছিলাম। কিন্তু আম-ফানের সময়ে ত্রাণ দিতে যাবার যে ব্যাপক উৎসাহ চোখে পড়েছে, সেটা আগে কখনো দেখিনি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা লক ডাউনের কারণে দীর্ঘদিন ঘরে বসে থাকার ফলেই এই ব্যাপক জাগরণ সম্ভব হয়েছে। লক ডাউনের মধ্যে সকলেই স্বচক্ষে দেখেছেন গরীব মানুষের দুর্দশা। সেই দৃশ্যই সবাইকে জাগিয়ে তুলেছে। অফিস-দোকান বন্ধ থাকার পারিপার্শ্বিক সুযোগটাও অবশ্যই কাজ করেছে। যদি বলেন, লক ডাউনের এই একমাত্র সুফলটাই আমার চোখে ধরা পড়েছে। বাকিটা নিতান্ত ফালতু।
মানুষটার নাম তপন দেব। ন্যাজাটের বাসিন্দা, সুন্দরবন নাট্যোৎসব কমিটির সেক্রেটারি। বিপদেআপদে মানুষের পাশে থাকেন। নিজের লজ খুলে দেন ত্রাণের কাজে, কমিউনিটি কিচেনের জন্য। হ্যাঁ, বিনা ভাড়াতেই। রবিবার বড় সেহারা থেকে ফিরে সন্ধে সাড়ে ছটায় সোজা হানা তপনবাবুর লজে। ওখানেই ন্যাজাটের কমিউনিটি কিচেন চলছে। আগেই বলে রেখেছিলেন, এখানেই খেয়ে নেবেন। খেতে বসেছি। তপনবাবু আক্ষেপ করলেন, আজ খুব বিভ্রাটে পড়ে গেলাম। কী ব্যাপার?
না, তেমন কিছু নয়। একটা টিম যোগাযোগ করেছিল ওর সঙ্গে, ত্রাণ দিতে ইচ্ছুক। ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার দেবে। তপনবাবু বেছে নিলেন জেলেপাড়াকে। রবিবারই দেবার কথা। তপনবাবু স্বভাবতই তাদেরও বলেছিলেন, এই কিচেনেই খেয়ে যাবেন। প্রথমে তারা রাজিও হলেন। তারপরই জানালেন, ২০-২৫ জন হয়ে যাচ্ছে। সবাই সুন্দরবন যেতে চায়। তাই নিজেরাই রান্না করে খাব; আপনাকে আয়োজন করতে হবে না। হ্যাঁ, খালি একটা লঞ্চের ব্যবস্থা করে দিন। জেলেপাড়ায় তো লঞ্চ লাগবে না, তপনবাবুর উত্তর। উল্টোদিক থেকে জবাব এল, আপনার সঙ্গে পরে কথা বলছি। না, কোনো ফোন আর আসেনি, তপনবাবুর ফোনও আর তারা ধরছেন না। পিকনিক করবে, বুঝলেন তো, তিক্ত হেসে তপনবাবু বললেন।
বেইজ্জত হয়ে গেলাম দাদা, তপনবাবুর আক্ষেপ। স্লিপ তো বিলি হয়ে গেছে। অগত্যা বললাম, ওদের টিমে একজনের করোনা হয়েছে; তাই আসতে পারছে না। না, স্বার্থহীনভাবে যারা মানুষের জন্য ঝাঁপান, তাদের বেইজ্জত হতে হয় না। আমাদের বাড়তি ৬০ প্যাকেট ওদের হাতে তুলে দিলাম। বাকিটা উনি ঠিক ম্যানেজ করে নেবেন। কিন্তু বাস্তবতার এই দিকটাকেও আর অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না। সেদিনই আমাদের যে টিমটা গিয়েছিল সন্দেশখালি ১ ব্লকের নিত্যবেড়িয়ায় (আমি অবশ্য ছিলাম না সেই টিমে) তাদেরও একই অভিজ্ঞতা। নীল টি শার্ট শোভিত ২৫-৩০ জন এসেছেন ত্রাণ দিতে, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে। তারাও দাঁড়িয়ে গেলেন কমিউনিটি কিচেনের খিচুড়ির লাইনে। বেশ উৎসবের মেজাজ আর কি।
ইতিমধ্যেই অবশ্য এমন অভিযোগ উঠে গেছে। ত্রাণের নামে সুন্দরবন ট্যুর আর পিকনিকের। লাক্সারি বাস আর বাহারি লঞ্চের ভিড়। ত্রাণ-ট্যুরিস্টদের সেই ভিড় সামলাতে গদখালিতে নাকি র‍্যাফও নামাতে হয়েছিল। হ্যাঁ, রবিবার ফেরার পথে এমন একটি লাক্সারি বাস আমাদের ওভারটেক করেছিল বসিরহাট কলেজের সামনেই। রবিবারই দেখেছি দুটি পার্টিকে। সুদৃশ্য লঞ্চের কেবিনে ২০-২৫ জন, আর ছাদে ২০ লিটার জলের কয়েকটি জার। ফেরার সময় বিদ্যাধরীর বুকে এমন একটি লঞ্চের দুয়েকজনকে দেখলাম ডেকের উপর হামাগুড়ি দিতে।
তবে এটা নতুন অভিজ্ঞতা নয়। আম ফানের পরে দেখেছিলাম ২৫-৩০টি ছোট গাড়ির কনভয়। প্রত্যেকটিতে ড্রাইভার ছাড়া ২জন আরোহী। আর সঙ্গে একটা আধাভর্তি ১০৭ ভ্যান। কোনো একটি মিডিয়া চ্যানেলের এমব্লেম প্রত্যেকের বুকে। বোঝাই যাচ্ছে, মিডিয়া কভারেজটা ভালই হবে। রিলিফের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা প্রথম হয়েছিল ২০০০ সালের বন্যায়। তখন থেকেই দেখেছি, রবিবারেই রিলিফ টিমের দঙ্গল বাড়ে। সেটা অস্বাভাবিক নয়। সারা সপ্তাহ খাটাখাটনির ঝামেলা তো থাকেই। তাই ছুটির দিনই সুবিধে। আম ফানের সময়ও রবিবার ভিড় লেগে যেত। কিন্তু এখন তো লক ডাউন চলছে। কাজেই অফিসের ঝামেলা নেই। তাহলে কেবল রবিবারই কেন?
এটা আসলে মানসিকতার প্রশ্ন। মানুষ ধারেকাছে বেড়াতে যায় রবিবার বা অন্য কোনো ছুটির দিন। সেক্ষেত্রে লক ডাউনের হিসাব আর কে কষে? এখন একটা জরুরী প্রসঙ্গ। ত্রাণ দিতে কতজন লাগে? কতজনকে সাহায্য করা হবে, তার উপর সংখ্যাটা অবশ্যই নির্ভর করবে। তবে, রাস্তার যা হাল করে ছেড়েছে ভরা কোটালের জল, তাতে ১০৭ ভ্যানই সবথেকে ভাল। এমন একটা ভ্যানে খুব বেশি হলে ৭৫০ পরিবারের ৩ দিনের শুকনো খাবার নেওয়া যায়। আবার যদি কমিউনিটি কিচেনেই সরবরাহ করা হয়, তাহলে ৪-৫ জন থাকলেই চলে যাবে। কারণ সর্বত্রই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা আছেন। তারাও পাশে দাঁড়ান।
লোক বেশি লাগে নদীর পাড় বেয়ে উপরে উঠে শুকনো খাবারের প্যাকেট বিলি করতে। জোয়ারের সময় খুব অসুবিধে হয় না। কিন্তু ভাটার সময় অন্তত ১৫-২০ ফুট ঐ পিচ্ছিল কাদা বেয়ে উঠতে হয়। লাইন বেঁধে পরপর দাঁড়িয়ে হাতে হাতে প্যাকেট তুলে আনতে হয়। সেক্ষেত্রেও ১০-১২ জনই যথেষ্ট। হ্যাঁ, সেই টিমটাও নাকানিচোবানি খাবে যদি জল দিতে হয়। জল মানে কিন্তু হাফ, এক বা পাঁচ লিটারের বোতল নয়, ২০ লিটারের জার। যারা সত্যিই ত্রাণ দিতে চান, তাদের সবারই পকেট-সঙ্কট। তাই তারা চেষ্টা করবেন আনুপাতিক খরচ কমাতে, যাতে অনেক বেশি পরিমাণে সাহায্য করা যায়। ২০ লিটার জারের খরচ ২০ থেকে ২৫ টাকা। আর এক লিটার বোতল জলই ২০ টাকা। সেই জার বয়ে তুলতে হবে পাড়ে, ঢেলে দিতে হবে গ্রামবাসীর আনা পাত্রে। মুখের কথা নয়। ললিতলবঙ্গলতাদের দিয়ে সেই কাজ হবে না। আবার ওই কাদায় দুজন মিলেও টানা সম্ভব নয়। কাজেই ১০০ জন ফুলবাবু মিলেও সামলাতে পারবেন না, দুচারজন খাটুয়া চাই।
দলের বহর এর থেকে বেশি মানেই কিছু লোক যাচ্ছে স্রেফ ঘুরতে। মালের পরিমাণ বেশি থাকলে লঞ্চ তবু ঠিক আছে। বিশেষ করে আমাদের মত ছাউনিহীন ভটভটি চেপে রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে ডুবে মরার ভয় পাওয়ার শখ নাই থাকতে পারে। কিন্তু লাক্সারি বাস কোন কাজে লাগে? কী প্রয়োজন থাকে ৫টি এস ইউ ভি নেবার? স্রেফ বেড়াতে যাওয়া ছাড়া? ১০০ টাকা ত্রাণপিছু আনুষঙ্গিক খরচ তো ২০০ টাকা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আবার গোটা মরসুমে একদিন ত্রাণ দিয়েই ফুরিয়ে গেল শখ? সপ্তাহে নিদেনপক্ষে দুদিন করে দিন, আলাদা আলাদা জায়গায়। অন্তত তিন সপ্তাহ ধরে। তাহলেই আর কোনো অভিযোগ উঠবে না। কারণ একই স্পটে কেউ পরপর তিন সপ্তাহ পিকনিক করতে যায় না।
হ্যাঁ, এবারে অভিযোগটা উঠছে মূলত দক্ষিণ ২৪ পরগনা নিয়েই। একটা কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলি। আম ফানের সময় তো বটেই, এবারেও উত্তর ২৪ পরগনা আন্ডার-কভার্ড। কোনো কোনো জায়গায় চরম শোচনীয় পরিস্থিতি। কিন্তু মিডিয়া কভারেজ কম, ফলে রিলিফও কম। আর সেই সূত্রেই অবশ্যই কম রিলিফ-ট্যুরিজমও। হ্যাঁ, আম ফানের সময় অনেক টিম দেখেছি। আমার সঙ্গেও অনেকে যোগাযোগ করেছিলেন, কোথায় যাবেন সিদ্ধান্ত নিতে। এবারে কিন্তু সেই প্রবাহ নেই বললেই চলে। ফলে আমরা উত্তর ২৪ পরগনার বাইরে আর যেতে পারছি না। হ্যাঁ, বার্নপুরের একটি টিমকে বলেছিলাম খেজুরির দিকে যেতে। তারা একবার ঘুরে এসেছেন। আবার বলছেন গোসাবায় যাবেন। মরা কোটাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছি।
 
যারা প্রকৃতার্থেই হাতেকলমে ত্রাণ দেন, তাদের কাছে আঞ্চলিক ভূগোল আর আবহাওয়ার সংবাদ খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল নির্ভরযোগ্য লোকাল কন্ট্যাক্ট। একমাত্র তারাই আপনাকে সবথেকে দুর্গম এবং সেই কারণেই ত্রাণ না পাওয়া অঞ্চলে নিয়ে যেতে পারবেন। ২০০০ সালের বন্যায় আর আম ফানের সময় দেখেছি, জল নেমে গেলেও ঘরে না ফিরে বাঁধ বা রাস্তার উপরে ত্রিপল খাটিয়ে পড়ে থাকতে। হ্যাঁ, ত্রাণের লোভে। কারণ, যারা কোন খোঁজখবর না করেই বেরিয়ে পড়েন, এদের দেখেই তাদের হৃদয় বিগলিত হয়ে পড়ে। আর সেখানেই সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে তারা হৃষ্টচিত্তে ফিরে যান। রিলিফের প্যাকেটের ব্যবসার কথা শুনেছেন কোনদিন? রাস্তার মুখে যারা বসে আছেন, রবিবারে তারা হয়তো পেলেন পরিবারপিছু ৬ প্যাকেট। তার একটা অংশ আবার ভিতরের জলভাসিদের কাছে তারাই বিক্রি করে দিচ্ছেন ১০-২০ টাকায়। সবসময় নগদ মেলে না ঠিকই। তবে ধারবাকির কারবার তো চিরন্তন।
 
না, রিলিফের নামে পিকনিক শুনে আঁতকে ওঠার কিছু নেই। এটা চরিত্রদোষ। যাদের সেই গুণ আছে, তারা সবকিছুতেই পারে। রক্তদান শিবিরের নামে চাঁদা তুলে রাতে ফিস্টি দেখেননি কোনোদিন? তাই বলে কি রক্তদান শিবির মানেই খ্যাঁটনের আসর? নাকি রক্ত দিতে হবে শুনলেই মুখ ফিরিয়ে নেন? কিংবা আমরা তো তোওত্ত লিতিল ম্যাগাজিন; তাই কবিতা ছাপলে আপনাকে ৫ কপি কিনে নিতে হবে কায়দায় সিগারেটের খরচ তোলা দেখেননি? তাই বলে কি আপনি কবিতা লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন? নাকি লিটল ম্যাগ কবিতা পাঠের সভায় ডাকলে তেড়ে খিস্তি লাগান? কোনোটাই যখন করেন না, তখন এক্ষেত্রেও আপনাকে সোনাপানা মুখ করেই মেনে নিতে হবে। সম্প্রতি এক মহিলা-কবির ত্রাণ স্ক্যাম নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তাই বলে কি অন্যরা হাত গুটিয়ে বসে গেছে? নিশ্চয়ই নয়।
 
আসল সমস্যা এটা নয়। আম ফান ত্রাণের সরকারি টাকা মেরে দেবার কিস্যা জানেন না? তারপরেও সেই মুরুব্বিরা ক্ষমতায় আসেন কীভাবে? তার মানে যতই ক্ষোভ থাক, মানুষ বিচার করেন আরো অনেক কিছু দেখেই। ত্রাণের কাজে আদত সমস্যা হল রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। ক্ষমতার কারবারীদের চোখে মানুষ বলে কিছু নেই; হয় আমার ভোটার, নয়তো ওদের। আমরাই পাব, আমরাই দেব, এই চাহিদা ক্ষমতার কারবারীদের মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। না, মেরে দেবার কথা বলছি না। ত্রাণ অবশ্যই দেওয়া হবে; তবে আমার লোকরাই পাবে। কীভাবে সামলাবেন? এক যদি অকুস্থলে আপনার নির্ভরযোগ্য কন্ট্যাক্ট থাকে, তাহলেই সামলাতে পারবেন। এবং কাউন্টার-ভেরিফিকেশন। তাতে সময় লাগে। আমি করে থাকি। তার জন্য সুন্দরবনের গ্রামে আপনার যোগাযোগটাও থাকতে হবে তো। নইলে বনবিবি ব্রিজে কিংবা গদখালির লঞ্চঘাটে থলে উবুড় করে দিয়ে আসতে হবে।