শতাব্দী দাশ-এর প্রবন্ধ

Spread This
শতাব্দী দাশ

শতাব্দী দাশ

অর্চনা গুহ, প্রতিরোধের স্পর্ধা

অর্চনা গুহ
১.
 
‘সচরাচর যে ঘর অর্ধশূন্য থাকে, সেই কোর্টরুম সেদিন কানায় কানায় ভর্তি উদগ্রীব কিন্তু নির্বাক মানুষে, যারা রায় শোনার জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছে।’
 
এভাবে শুরু হয়েছে ইংরেজি ‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকায় সুভাষ গাঙ্গুলির ১৯৯৬ সালের ২১ শে সেপ্টেম্বরের লেখাটি (বাংলায় অনূদিত)। অর্চনা গুহ মামলার রায় বেরিয়েছিল ১৯৯৬ সালের ৫ ই জুন৷ সে বিষয়েই ছিল তাঁর নিবন্ধ। মানুষের উদগ্রীব হওয়ার কারণ, মামলাটি বহু-আলোচিত। অধৈর্য হওয়া স্বাভাবিক, কারণ তা ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় সবচেয়ে দীর্ঘকাল চলা মামলাগুলির অন্যতম। উনিশ বছর ধরে তা চলেছিল। উল্লিখিত ঘটনা তথা মামলা নিয়ে এতবছর পর কলম ধরার কারণ, নারীর উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কথা বলতে গেলে, অর্চনা গুহর ইতিহাস ভোলার নয়। আরেক কারণ হয়ত এও যে, জুলাই সংখ্যায় লিখতে বললে স্বাভাবিক ভাবেই মনে পড়ে, বাহাত্তরের জুলাই মাসে যেমন চারু মুজমদারের মৃত্যু হয়েছিল কাস্টডিতে, তেমনই  চুয়াত্তরের জুলাইতে অর্চনা, লতিকা ও গৌরিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তফাত হল, চারু মজুমদারের মতো অবিসংবাদিত নেতা হওয়া দূরস্থান, অর্চনা গুহ নিজের বয়ানানুযায়ী সরাসরি রাজনীতিও করতেন না।
বলে নেওয়া ভাল, বর্তমান লেখক অধুনা ডেনমার্ক নিবাসী অর্চনা গুহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেনি কখনও। তাঁর উপর অত্যাচার হওয়ার সময়, তাঁর কেসটি দায়ের হওয়ার সময় সে পৃথিবীতেই ছিল না। কেসটি যখন শেষ হয়, তখনও সে নেহাত স্কুলে। অতএব অর্চনা গুহ বা সৌমেন গুহকে চিনতে, সে সংক্রান্ত তথ্যাবলি পেতে, চাপা দেওয়া ইতিহাস খুঁড়তে হয়েছে। এবং তথ্য খুঁজতে গিয়ে ( এ ব্যাপারে কিছুটা সাহায্য করেছিলেন সুজাত ভদ্র ) বোঝা গেছে, তথ্য বড় একটা সুলভ নয়। তাহলে কি এই অধ্যায়, নারীর উপর রাষ্ট্রীয় দমনের এই জরুরি উদাহরণ ডিসকোর্সের বাইরে চলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে? এই তাড়না থেকেও এ লেখা লিখে ফেলা।
সত্তরের দশকের সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের রাজত্বে জেল-মৃত্যু, কাস্টডিতে অত্যাচার ও এনকাউন্টারের তালিকা তৈরি করা এক দুরূহ কাজ, কারণ সেসব ঘটনা আকছার ঘটত৷ অর্চনা গুহ সেরকমই এক ঘটনার ভুক্তভোগী ছিলেন। আবার এটাও ভাবার বিষয়, সত্তরের দশক, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় বা রুণু গুহনিয়োগী- এই সব ফ্যাক্টরগুলি কি ব্যতিক্রম, না প্যাটার্ন? রাষ্ট্রীয় দমন ও নারী — এ বিষয়ক তালিকা তৈরিও সোজা নয়। আমাদের ভৌগলিক অবস্থানেই ইলা মিত্র থেকে কুনান পোশপরার মেয়েরা, থাংজাম মনোরমা থেকে নোদীপ কৌর — অনেক নাম ভিড় করে আসবে।
 
২.
সেদিন সপ্তম মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রটের কোর্ট-এ (যার অন্য নাম ব্যাঙ্কশাল কোর্ট) বেলা সাড়ে বারোটায় বিচারক সূর্যেন্দু বিশ্বাস ‘অর্চনা গুহ বনাম রুণু গুহ নিয়োগী ও সন্তোষ দে’ মামলার যে রায় পড়েছিলেন, তাকে আপাতভাবে অর্চনা ও তাঁর ভাই সৌমেন গুহর ‘জয়’-এর সূচক বলা চলে। অন্তত তেমনটাই ভেবেছিল আনন্দে ফেটে পড়া জনতা। উনিশ বছর পর ‘দোষী’ সাব্যস্ত হয়েছিল রুণু গুহনিয়োগী, যা নৈতিক জয় নিঃসন্দেহে। তবে সুদীর্ঘ উনিশটি বছর লড়াই-এর পর, অর্চনা গুহকে ক্রমাগত নির্যাতন করে পঙ্গু করে দেওয়ার কারণে, রুণু গুহনিয়োগী এক বছর মাত্র বিনা পরিশ্রমে কারাদণ্ড পেয়েছিল। তার চেয়েও বড় বাস্তবতা হল, এক দিনের জন্যও রুণু গুহনিয়োগীকে জেল খাটানো যায়নি। সে এর পর এক মাসের জামিন পায়। জামিন দেওয়া হয়, যাতে সে রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল করতে পারে অন্যত্র। শেষ পর্যন্ত সে আপিল করেছিল। আবারও শুরু হয়েছিল দীর্ঘসূত্রিতার দিনলিপি। এভাবেই রুণু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত হাজতবাস এড়িয়েছিল। পাঁচ বছরের মাথায়, ২০০১ সালে, সে মারা যায়।
আরও কিছু টুকরো বাস্তবতা ছিল। যথা, সেদিন ‘দোষী’ প্রমাণিত হওয়ার পর রুণু গুহনিয়োগী ও সন্তোষ দে পুলিসি প্রহরায় কোর্ট থেকে বেরোয় ও পুলিসের গাড়ি করেই বাড়ি ফেরে। আসামীরও পুলিসি প্রহরার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু পুলিসের গাড়িতে বাড়ি ! তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার কখনও স্পষ্ট করেননি, ঠিক কেন একজন আইন-মতে অপরাধী, জামিনপ্রাপ্ত, সাধারণ ব্যক্তি পুলিসি গাড়ি পাবে বাড়ি ফেরার জন্য। ঘটনা ঘটার সময় রুণু ছিল রাজ্য পুলিস অফিসার ও সন্তোষ দে ছিল কনস্ট্যাবল। মাঝের উনিশ বছরে, বাম আমলে নানা পদোন্নতির পর রুণু হয়ে উঠেছিল রাজ্য পুলিসের অন্যতম কর্তাব্যক্তি। কিন্তু ছিয়ানব্বই সালে, রায় বেরোনোর দিন, রুণু ছিল অবসরপ্রাপ্ত; অতএব সাধারণ নাগরিক মাত্র।
ঘটনাক্রমের শুরুতে ফেরা যাক। ১৯৭৪ সালের ১৭ই জুলাই তারিখে মাঝরাতে দমদম অঞ্চলের জোপুর রোডে মধ্যবিত্ত ভাড়াবাড়িতে টোকা পড়ে। দরজা খুলতেই হামলে পড়ে পুলিশ। তারা এসেছিল নকশাল আন্দোলনে জড়িত সৌমেন গুহর খোঁজে। কিন্তু তিনি অজ্ঞাতবাসে। বাড়ি তল্লাশি হল জিনিসপত্র তছনছ করে। কোনো সিজার লিস্ট (তল্লাশির পর বাজেয়াপ্ত জিনিসের তালিকা) দেওয়া হয়নি, কিন্তু সাদা কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হয়। তারপর অভিযুক্তর দিদি অর্চনা গুহ, অভিযুক্তর স্ত্রী লতিকা গুহ ও আরেক আত্মীয়া গৌরি চ্যাটার্জিকে পুলিস-ভ্যানে তোলা হয়। অর্চনা জুনিয়র স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। লতিকা কলেজে পড়াতেন। গৌরি দোকানে কাজ করতেন। প্রথমে কাশীপুর থানায় ও পরে ভোর-রাতে লালবাজার থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাখা হয় স্পেশাল সেলে, যার লাগোয়া রুনু গুহনিয়োগীর অফিস ও টর্চার চেম্বার। সেখানে অর্চনাকে নিজের পরিচয়, লেখাপড়া ও চাকরির বিশদ জানাতে হয়। তারপর নানা জনের ছবি দেখিয়ে হদিশ জানতে চাওয়া হয়, যা তাঁর জানা ছিল না। বেলা বাড়লে রুণু গুহনিয়োগী আসে। তার নির্দেশে শুরু হয় অত্যাচার৷ প্রথমে গৌরি, তারপর অর্চনাকে টর্চার চেম্বারে ডাকা হয়। ‘কছুয়া ধোলাই’ সেসময় খুব প্রচলিত ছিল। বিষয়টা এরকম: ভাঁজ করা দুই হাঁটু বাঁধা, দুই হাতও বাঁধা। ভাঁজ করা হাঁটুর মধ্যে দিয়ে লাঠি ঢোকানো রয়েছে। সে লাঠির দুই প্রান্ত রাখা হয়েছে দুটি চেয়ারে। এই অবস্থায় ব্যক্তি ওই দুটি চেয়ারের মধ্যে লটকে থাকবেন। মাথা নিচের দিকে, পা উপরে। তার উপর ধুপধাপ লাঠিও চলবে পায়ে, পাছায়। অর্চনাকে যখন টর্চার চেম্বারে ডাকা হল, তখন তিনি গৌরিকে ঠিক এই অবস্থায় দেখেন। অর্চনাকে হুমকি দেওয়া হয়, পুলিশের পছন্দমাফিক স্বীকারোক্তি না দিলে তাঁর অবস্থাও গৌরির মতোই হবে। গৌরি খানিক পরে অজ্ঞান হয়ে যান।
এরপর রুণুর অফিসে রুণুর নির্দেশে লতিকার উপর অত্যাচার শুরু হয় বিরাশি সিক্কার থাপড় দিয়ে। ওদিকে অর্চনাকেও আবার টর্চার চেম্বারে নিয়ে যায় কনস্ট্যাবেল সন্তোষ দে। শাড়ি হাঁটুর উপর তুলে পিছনে কাছা করে দেওয়া হয় আর আঁচল বুক থেকে নামিয়ে বাঁধা হয় কোমরে। তারপর পূর্ব বর্ণিত উপায়ে ‘কছুয়া ধোলাই’ শুরু হয় অর্চনার উপরেও৷ মাথা নিচে পা উপরে, এই অবস্থায় পায়ের পাতায় যখন লাঠির বাড়ি পড়ছিল, তখন অর্চনার মনে হচ্ছিল মাথার শিরা ছিঁড়ে ফেটে যাবে। রুণুর নির্দেশেই ধোলাই চলছিল। রুণু নিজে মাঝে মাঝে সিগারেটের ছ্যাঁকা শরীরের এখানে ওখানে গুঁজে দিয়ে সঙ্গত করছিল; ক্রমশ জানা যাবে এটি রুণুর প্রিয় খেলা। অশ্রাব্য গালিগালাজ তো ছিলই। অর্চনাও অজ্ঞান হয়ে যান।
বিকেল চারটে নাগাদ আবার ডাক পড়ে স্পেশাল সেলে। সন্ধে নাগাদ আবার শুরু ‘কছুয়া ধোলাই’, কিন্তু এবার আরও নির্মম ভাবে। পাঁচ-ছ জন পুলিশকর্মী অর্চনাকে মাথা নিচু পা উঁচু অবস্থায় পায়ের তলায় লাঠি মারতে থাকে। রুণুর প্ররোচনায় রুণু ছাড়া অন্যরাও জ্বলন্ত সিগেরেট চেপে ধরে। তারপর দেওয়া হয় ঠান্ডা জলের ফোঁটা। অর্চনা আবার জ্ঞান হারান।
রাত ৮ টা নাগাদ স্পেশাল সেলের সেন্ট্রাল লক আপে তিনজনের ঠাঁই হয়।
পরদিন তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হল শিয়ালদা কোর্টে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করা হল না। দেড় ঘন্টা বসিয়ে রেখে আবার স্পেশাল সেলে ফিরিয়ে আনা হয়। স্পেশাল সেলে সেদিনও তিনজনকে দিয়ে সাদা কাগজে দস্তখত করানো হয়।
বিকেলে আবার তলব অর্চনাকে। অরুণ ব্যানার্জি নামক অফিসার হঠাৎ জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন ঘুষি মারতে শুরু করেন তাঁকে, অবশ্যই রুণুর সম্মতিক্রমে। সে ঘুষি পর্ব পনের মিনিট চলে।
সন্ধেবেলা তিনজনেরই ডাক পড়ে। প্রথমে গৌরি, তারপর লতিকা টর্চার চেম্বারে যান। সবশেষে অর্চনার পালা। শারীরিক অত্যাচারের সঙ্গে খুন করে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া থেকে লোক ঢুকিয়ে ধর্ষণ করানো— নানারকম ভয় দেখানোও চলছিল। অর্চনার ক্ষেত্রে সেদিনের বিশেষত্ব ছিল চুল টেনে অত্যাচার। মানে, চুলের মুঠি ধরে চেয়ার থেকে টেনে তুলে দেওয়ালের দিকে ছুড়ে দেওয়া, আবার চুলের মুঠি ধরেই দেওয়ালে ধাক্কা খাওয়ার আগে টেনে নিজের দিকে নিয়ে আসার অভিনব নির্যাতন খেলা। দুজন পুলিশ দুপাশ থেকে চুলের মুঠি ধরেই তাকে ঝুলিয়ে রেখে দেয় মিনিট কুড়ি৷ সেই সঙ্গে সিগারেট-চুরুটের ছ্যাঁকা। সে রাতে অর্চনাকে বাকি দুজনের থেকে আলাদা রাখা হয়।
২০ জুলাই। স্পেশাল সেলে ডাক পড়ল সকাল দশটায়। পুলিশ অফিসাররা তিনজনের উপরে, বিশেষত অর্চনার উপর অত্যাচার চালাতে শুরু করল।
রাত ৮ টা নাগাদ অর্চনা ও লতিকাকে আবার স্পেশাল সেলের অফিসে নিয়ে আসা হল। আজ মুখ না খুললেই মাতাল লেলিয়ে ধর্ষণ, এরকম হুমকি আসতে থাকে৷ তাতেও কাজ না হওয়ায় মুগুরের মতো কিছু দিয়ে সজোরে অর্চনার মাথায় মারতে থাকে রুণু। পনের মিনিট ধরে চলে মাথায় মারা। তারপর সেলে ফেলে আসা হয়। পরদিন অর্চনার জ্ঞান ফেরে লতিকা ও গৌরির কান্নায়। তাঁরা অর্চনাকে ডেকে ডেকে সাড়া পাচ্ছিলেন না।
এইভাবে ১৮ জুলাই, ১৯৭৪ থেকে ১৩ অগাস্ট, ১৯৭৪ পর্যন্ত সাতাশ দিন এই তিনজনকে লক আপে এক পোষাকে, বিনা স্নানে রাখা হয়েছিল। ১৮ই জুলাই-এর পর চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তাদের ম্যাজিস্টেটের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়নি, যা বে-আইনি। এর পরেও যখনই কোর্টে নিয়ে যাওয়া হত, তখন তাদের কখনই ম্যাজেস্ট্রেটের সামনে নিয়ে যাওয়া হত না৷ কোর্ট সেলে বন্দী রাখা হত বা অন্যত্র বসিয়ে রাখা হত, যাতে ম্যাজিস্ট্রেট তাদের শারীরিক অবস্থা না দেখতে পান। লালবাজারে ফেরার পর আবার শুরু হত অত্যাচার। অত্যাচারের জেরে অর্চনা গুরুতর অসুস্থ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ১৯৭৪ সালের ১৩ অগাস্ট মিসা আইনে অভিযুক্ত করে অর্চনা, লতিকা ও গৌরিকে প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। উল্লেখ্য, এর আগেও বেশ কিছু ফলস কেস দেওয়া হয়েছে। সেই যে সাদা কাগজে সই করানো হয়েছিল, সেই সাদা কাগজেই পছন্দমতো সিজার লিস্ট বানিয়ে নানা বে-আইনি জিনিস রাখার অপরাধে নানা কেস দেওয়া হয় ও নানা কোর্টে তাদের ঘোরানো হয়। শেষ পর্যন্ত সেই ভুয়ো সিজার লিস্টের বলেই মিসা-ও দেওয়া হয়। মিসা হল Maintenance of Internal Security Act, যা ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধির তৎপরতায় পাশ হয়েছিল ও যাকে ইউএপিএ-এর পূর্বসূরী বলা যায়। সেখানে তিন বছর আটক থাকেন লতিকারা। সাতাশ দিনের অত্যাচারের ফলশ্রুতি হিসেবে অর্চনার শরীর এত খারাপ হয়ে যায় যে প্রথমে কয়েকদিনের জন্য, তারপর দীর্ঘ সময়ের জন্য হাসপাতলে ভর্তি হতে হয় তাঁকে পুলিসি প্রহরায়। ডাক্তার, নার্স সকলেই সহানুভূতিশীল ছিলেন অর্চনার বয়ান অনুযায়ী। ১৯৭৬ সালে অর্চনাকে প্যারোলে ছাড়া হয়। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ছাড়া পান লতিকারা। সৌমেন গুহ, যিনি এই তিন জনকে ধরার কিছুদিন পরে ১৯৭৪ সালের ৫ই অগাস্ট ধরা পড়েছিলেন, তিনিও ১৯৭৭ সালেই ছাড়া পেলেন।
৩.
 
এই পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দমন চলছিল নিয়ম মাফিক। তাতে অভিনবত্ব নেই৷ কিন্তু এরপর এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। তা এক আশ্চর্য প্রতিরোধের গল্প। অর্চনা গুহ কলকাতার চিফ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রুণু গুহনিয়োগী ও চারজন পুলিসকর্মীর বিরুদ্ধে ২০ অগাস্ট, ১৯৭৭ সালে অভিযোগ দায়ের করলেন। স্ট্রেচারে শায়িত বা হুইলচেয়ারে আসীন অর্চনা কোর্টে আসছেন, পাশে সৌমেন গুহ, এমন ছবিতে সংবাদপত্র ভরে গেল প্রাথমিক ভাবে। অবশ্য আস্তে আস্তে আগ্রহে ভাঁটা পড়েছিল। উনিশ বছর বড় কম সময় নয়।
ইতোমধ্যে অর্চনাকে ঘিরে কিছু মানবাধিকার সংগঠন, এপিডিআর বা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সঙ্ঘ সরব হয়ে উঠেছে৷ সবচেয়ে কল্যাণকর ভূমিকাটি নেয় অ্যামনেস্টি ইনটারন্যাশনাল। তাদের তত্ত্বাবধানে অর্চনাকে চিকিৎসার জন্য ডেনমার্কের কোপেনহাগেনে নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখানে তখন সদ্য খুলেছে ‘রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ফর টর্চার ভিক্টিমস।’ দীর্ঘদিন চিকিৎসা হয় অর্চনার। অথচ কেসের প্রায় কোনো ডেট তিনি বাদ দেননি৷ তাঁকে আসতে হত ডেনমার্ক থেকে প্লেন ভাড়া করে। ক্রমে চিকিৎসাকালে ফিজিওথেরাপিস্ট পিয়া জেনসেনের সঙ্গে তাঁর প্রণয় ও বিবাহ।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ধারা ১৬৬ (সরকারি কর্মচারীর আইন অমান্য করে তার অধীনে থাকা ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে আঘাত করা), ৩৪৮ (স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য অন্যায়ভাবে বন্দী করা), ৩২৪ (বিপজ্জনক অস্ত্রের মাধ্যমে আঘাত করা), ৩৩০ (স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য মারধোর করা),
৫০৯ (শব্দ, অঙ্গভঙ্গি দ্বারা নারীর শ্লীলতাহানি করা) দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৩০ ধারার জন্য সর্বাধিক সাত বছরের সাজা হতে পারত।
রুণু ও তার সহযোগীরা প্রথম দিন থেকে নানা কোর্টে আপিল করে অভিযোগকারীদের এমন ব্যস্ত রেখেছিল, নানা জাল বিস্তার করে মূল কেসকে এমন ভাবে স্থগিত রেখেছিল, যাতে আঠারো বছরেও অর্চনা গুহ সব সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করে উঠতে পারেননি। প্রতিটা বিষয়েই তারা প্রথমে নিম্ন আদালতে যেত। একসঙ্গে নয়, রুণু ও অন্যান্য অভিযুক্তরা আলাদা আলাদা ভাবে আপিল করত। একজনের আপিল কিছুদিন পর  খারিজ হলেও আরেকজনেরটা চলত। তারপর সেখান থেকে ধীরে ধীরে তারা উচ্চ আদালতে যেত। এবং প্রতিটা কেসই শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে গড়াত৷ এতে রায় যাই হোক না কেন, মূল কেস ঝুলে থাকতে বাধ্য হত।
এইভাবে মূল শুনানি শুরু হওয়ার আগেই সেশন কোর্টে দুবার, কলকাতা হাইকোর্টে আটবার, আর সুপ্রিম কোর্টে পাঁচবার এ মামলা ঘুরে এসেছিল। অভিযুক্তরা কিসের ভিত্তিতে এত আপিল করত? নানা অজুহাত তারা খাড়া করে নিত। এক, যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, ওরকম অত্যাচার করা নাকি মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়৷ তাই তা অবাস্তব। দুই, অরুণপ্রকাশ চ্যাটার্জি সরকারি কৌঁসুলি হওয়ায় তাঁর অর্চনার হয়ে লড়ার অধিকার আছে কিনা। ( এই বিষয়ে বহু সময় ব্যয় হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত অরুণপ্রকাশ কেস জেতেন, কিন্তু পরে আবার সৌমেন গুহ তাঁর উপরেও ভরসা করতে পারেন না)। তৃতীয়ত, এপিডিআর বা নারীনির্যাতন প্রতিরোধ মঞ্চ কেন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই রুণু গুহনিয়োগীকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে জনমত গড়ে তুলছে? তাতে রায় প্রভাবিত হতে পারে। একই অভিযোগ ছিল আজকাল সংবাদপত্র, প্রতিক্ষণ পত্রিকা ইত্যাদির বিরুদ্ধেও এবং একটি সুয়ো মোটু কেসও হয়েছিল এদের বিরুদ্ধে। চতুর্থত, যে মামলা এত দীর্ঘ সময় চলে (দশ বছরের বেশি সময়), তা এমনিতেই খারিজ করে দেওয়া উচিত৷ বস্তুত ১৯৮৮ সালে রুণুর হাতে নতুন অস্ত্র হিসেবে আসে ক্রিমিনাল আইনের সংশোধিত ২৪৫/৩ ধারা, যেখানে বলা হয়েছে যে, কেস দায়ের করার চার বছরের মধ্যে সব সাক্ষ্যপ্রমাণ দাখিল করতে না পারলে কেস খারিজ হতে পারে।
নানা আদালতে নানা বিচারক নানা মত দেন। বেশ কয়েকজন অর্চনার প্রতি সমব্যথী ছিলেন, প্রতিপক্ষের প্রায় সব কটি কেস খারিজ হয়, যদিও তাতে অনেক বছর কেটে যায়। ২৮ শে মার্চ, ১৯৮৮- তে নিম্ন আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট ডি এস রায় নিজে ছক এঁকে দেখিয়েছিলেন যে, রুণু এবং তার সহযোগীরা ৯ বছর ৯ মাস দেরির জন্য দায়ী। অর্চনার নিজের জন্য বড় জোর এক বছর এক মাস দেরি হয়েছে, তাও  একাশি সালের পর থেকে তাঁকে চিকিৎসা ও বিবাহের কারণে ডেনমার্কে থাকতে হয়েছে বলে। অতএ, তিনি বলেন,  দেরির অজুহাতে কেস খারিজ করা হবে না।
রুণু তৎক্ষণাৎ হাইকোর্টে যায় এবং এই মামলার ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার পর্ব ঘনিয়ে আসে। ওই বছর ১৫ই জুলাই প্রকাশিত রায়ে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অজিত সেনগুপ্ত কেসটি সত্যিই খারিজ করেন। এগার বছরের পরিশ্রম কি তবে জলে গেল?
বলা বাহুল্য, গুহ পরিবারও এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করল। ১৯৯০ সালের ৫ মার্চ বিচারক এম.এন. রায় ও এস.কে গুঁই আগের রায়কে বাতিল করেন। তাঁরা দ্রুত বিচার শেষ করার আদেশ দেন। তাতেও দমে না রুণুরা। আবার আপিল-আপিল খেলা শুরু হয়। শেষপর্যন্ত, শেষ বারের জন্য মামলা সুপ্রিম কোর্টে যায়। ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪। সুপ্রিম কোর্ট এক চূড়ান্ত রায় দেয়। তা এরকম: অভিযুক্তদের আর কোনো আপিল শোনা হবে না; আর কোনো কোর্ট এই মামলায় হস্তক্ষেপ করবে না; প্রতিদিন বিচার করে তাড়াতাড়ি কলকাতা হাইকোর্টে এই মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। এইভাবে, আঠারো বছরের টানাটানির পর শেষ পর্যন্ত রুণুকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো গিয়েছিল।
এদিকে সৌমেন গুহর সঙ্গে বাদী পক্ষের উকিলদেরও গোলোযোগ বেধেছে। যে কোনো কারণেই হোক, অরুণপ্রকাশ চ্যাটার্জি বা অমিয় চক্রবর্তীদের উপর তিনি আর ভরসা রাখতে পারছিলেন না। কারও বিরুদ্ধে ছিল প্রতিপক্ষের দ্বারা ক্রীত হওয়ার অভিযোগ, কেউ হয়ত কেসে তত সময় দিতে পারছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে, রুণু যে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অর্জন করেছিল, তার কারণে সে প্রায় সমস্ত বড় উকিলকেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখত। ফল দাঁড়ালো এই যে, সৌমেন গুহ নিজেই বোনের হয়ে সওয়াল করার আর্জি জানান। ১৯৯৫ সালের ৬ ই জুলাই থেকে সৌমেন নিজেই দিদির হয়ে ওকালতি করার অনুমতি অর্জন করলেন। তিনি দেড় ঘণ্টা ধরে ৭ নং মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট শ্রী নন্দদুলাল গুঁইকে যুক্তি-প্রতিযুক্তির মাধ্যমে বুঝিয়েছিলেন, কেন তিনি যোগ্যতম ব্যক্তি। অনুমতি মিলেছিল। তবে বলা হয়েছিল, যে কোনো সময়ে অযোগ্যতা প্রমাণ হলে অনুমতি খারিজ হবে। সে সুযোগ সৌমেন গুহ দেননি।
বিচারপ্রার্থী নাগরিক যে নিজের পক্ষে সওয়াল করার জন্য উকিলের শরণাপন্ন হতে বাধ্য নন, এমন সদর্থক বার্তা দিয়েছিল ঘটনাটি। আগেই বলা হয়েছে, সৌমেন গুহ নিজেও এই তিন মহিলাকে ধরার কিছুদিন পর ধরা পড়েছিলেন। বাঁকুড়ায় কাস্টডিতে তাঁর উপরেও চলেছিল অত্যাচার। যেন দাবার চাল হঠাৎ উলটে গিয়েছিল। রাষ্ট্রের হাতে অত্যাচারিত নিজে রাষ্ট্রীয় অত্যাচারীকে সওয়াল করার সুযোগ পেয়েছিল প্রথমবার। অথচ সংযত ও ধীর ভাবে, যুক্তি সহকারে, ব্যক্তিগত ঘৃণা বা কষ্ট প্রকাশ না করে বাকযুদ্ধ চালাতে হচ্ছিল, তাও আবার অ-প্রশিক্ষিত একজনকে প্রশিক্ষিতদের বিরুদ্ধে। এমন ঘটনা ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় বিরল।
 
৪.
 
আবার ফিরি  ৫ ই জুন, ১৯৯৬ তারিখে, ব্যাঙ্কশাল কোর্টে, চূড়ান্ত রায়ের দিন। রায় অনুযায়ী ১৬৬, ৩৪৮, ৩২৪, ৩৩০, ৫০৯ — সব ধারার অপরাধই প্রমাণিত হয়েছিল। তবে একটি অপরাধের ক্ষেত্রে, অবৈধ ভাবে ২৪ ঘন্টার বেশি আদালতে হাজির না করে কাস্টডিতে রাখার ক্ষেত্রে, দেখা গিয়েছিল, ইনভেস্টিগেটিং অফিসার আসলে দোষী, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কেস করাই হয়নি আগের উকিলদের বদান্যতায়। করা হলে সেই ব্যক্তি ৩৪৮ ও ১৬৬ ধারায় অভিযুক্ত হতেন। বাকি সব অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্তিরাই দোষী সাব্যস্ত হয়। বিচারক বলেন, ‘এমন রায় হওয়া উচিত যাতে এরকম কাস্টডিয়াল নির্যাতন ভবিষ্যতে না ঘটতে পারে।’ বিচারক প্রতিপক্ষের সব কটি যুক্তি একে একে খণ্ডন করেন।
নির্যাতনের অভিযোগ প্রতিষ্ঠায় অর্চনা গুহর সঙ্গে লতিকা গুহের বিবৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, যার বিরোধিতা করে প্রতিপক্ষ সওয়াল করেছিল, ‘আত্মীয়া তো অভিযোগকারিণীর হয়েই বলবেন’। তখন সুপ্রিম কোর্টের রায় দেখিয়ে আলোচ্য রায়ে বলা হল:
‘… সাধারণত নিকটাত্মীয়ই প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করার যোগ্যতম ব্যক্তি, তিনি সচরাচর মিথ্যা কাউকে দোষী সাব্যস্ত করবেন না।’ যখন বলা হয়, অত্যাচারিতারা এসব আগে বলেননি কেন, তখন বিচারক সূর্যেন্দু বিশ্বাস বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তাদের কখনও নিয়েই যাওয়া হয়নি এবং কারাগার কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করে লাভ হয়নি৷’ গৌরি চ্যাটার্জি মামলায় সাক্ষী দিতে হাজির হলেন না কেন, এর জবাবে বিচারক বলেন, ‘উকিল যাকে ইচ্ছে সাক্ষী হিসেবে ডাকতে পারে, যাকে ইচ্ছা বাদ দিতে পারে। গৌরি চ্যাটার্জি এখন বিবাহিতা ও তাঁর সাক্ষ্যদানে ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতে পারে।’ প্রতিপক্ষের দুজন  পুলিস সাক্ষী, যারা বলেছিল অত্যাচার হয়নি, তাদের ‘ক্রস-এক্সামিন’ করেননি সৌমেন গুহ। সেটাকেও ‘মেনে নেওয়া’ বলে চালাতে, চাওয়া হয়। বিচারক বলেন, ‘সব সময়েই ক্রস-এক্সামিন না করা মানেই মেনে নেওয়া নয়।’ অর্চনা ও লতিকা গুহ জবানির পাশাপাশি অর্চনার বন্দীত্বকালীন চিকিৎসায় অংশ নেওয়া পাঁচজন চিকিৎসকের সাক্ষ্যর ভিত্তিতে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছয় যে, অত্যাচারের কারণেই অর্চনা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছিলেন, যদিও কোনো ডাক্তারই স্পষ্ট করে সেই কার্য-কারণ সম্পর্কের কথা বলেননি। এ বিষয়ে প্রতিপক্ষের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে রায়টি বলে: ‘চিকিৎসকদের বয়ান ও মেডিকাল প্রমাণ সর্বদাই সাহায্যকারী ভূমিকায় থাকে। চিকিৎসকরা রোগীর অবস্থা বর্ণনা করেছেন, সেটাই তাঁদের কাজ। সেটুকুই যথেষ্ট। তার থেকে এই ধারণাই হয় যে প্রবল অত্যাচার ছাড়া এ শারীরিক ক্ষতি অসম্ভব।’ শ্লীলতাহানির ক্ষেত্রে আদালত ব্যবহার করে বিখ্যাত ‘রূপম বাজাজ বনাম কে.পি.এস গিল’ কেসের রেফারেন্স, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘নারী যদি কারো কোনো আচরণে তাঁর শ্লীলতাহানি হয়েছে মনে করেন, তবে তা নিশ্চয় হয়েছে। সেই ব্যক্তির উদ্দেশ্য কী ছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’ এখানেও নারী মনে করছেন বুক থেকে জোর করে কাপড় সরিয়ে কোমরে আঁচলটি বেঁধে দেওয়ায় বা হাঁটুর উপর কাপড় তুলে কাছা বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়ায় পাঁছ ছ জন পুরুষের সামনে তাঁর শ্লীলতাহানি হয়েছে, অতএব তা মেনে নিতে হবে৷
 
****
৫.
 
রায়টি অবশ্যই যুক্তিনিষ্ঠায় ও নির্যাতিতের প্র‍তি সহমর্মিতায় ব্যতিক্রমী। কিন্তু অর্চনা গুহদের প্রতি যে অত্যাচার হয়েছিল, তাকে ব্যতিক্রমী বলা যায় না। সত্তরের দশকের বন্দীদের কারও কারও হাল অর্চনার থেকেও খারাপ হয়েছিল৷ সারা জীবনের মতো বিকলাঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন কেউ কেউ, কেউ পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অতি সামান্য হলেও ন্যায় পাওয়া গিয়েছিল একমাত্র এই কেসে৷ এ দিক থেকেও এ কেস উল্লেখযোগ্য।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো মামলাই হয়নি। অন্যদিকে, সামান্য যে দু-একজন সাহস করে মামলা করেছিলেন, তাঁরাও সুবিচার পাননি। ১৯৭৩ সালে ১২ই ফেব্রুয়ারি রাজবন্দিদের মা, বোন, স্ত্রীরা মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে গণ ডেপুটেশন করে যে স্মারকলিপি জমা দিয়েছিলেন, সেখানে লেখা হয়েছিল:
 ‘রাজবন্দী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া তো দূরের কথা, নিরস্ত্র ও অসহায় এইসব বন্দীদের উপর পুলিশ হেফাজত থেকে জেল পর্যন্ত যে অত্যাচার অব্যাহত ভাবে চলছে তা কোনো নিকৃষ্ট সাধারণ অপরাধীর সঙ্গে করাও সম্পূর্ণ অমানবিক।…প্রতিদিন এক শ্বাসরোধকারী আশঙ্কা নিয়ে আমরা অপেক্ষা করি, কখন মেদিনীপুর, বহরমপুর, আলিপুর ইত্যাদি জেলের বন্দীহত্যার মতো আরেকটি গণহত্যার শিকার হবেন আমাদের প্রাণের থেকেও প্রিয় এইসব মানুষেরা।’
সেই ১৯৭৩ সালেরই মে মাসে আরএসপির প্রভাবাধীন নিখিল বঙ্গ মহিলা সমিতির মেয়েদের মিছিল থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় লালবাজার ও প্রেসিডেন্সি জেলে। তাঁরা ছাড়া পেয়ে যান পরদিন রাতেই। কিন্তু তাঁরা ফেরেন জেলে বন্দী নকশাল মেয়েদের ও নকশালদের আত্মীয়াদের নিদারুণ অত্যাচারিত হওয়ার গল্প নিয়ে৷ তরুণীদের সম্পূর্ণ অনাবৃত করে টেবিলে শুইয়ে দিয়ে বুক, পেট, গলা ও শরীরের নানা জায়গায় জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরার ঘটনা তখন থেকে চাউর হয়ে যায়।
বন্দীমুক্তি আন্দোলন চলতে থাকে। সাতাত্তর সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর জীবিত বন্দীরা একে একে ছাড়া পেতে থাকেন। কিন্তু তাঁরা ফেরেন প্রবল শারীরিক-মানসিক ক্ষত নিয়ে, যা থেকে উত্তরণ বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি। যদিও এর পর বাম রাজত্বকাল, তবুও সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের আমলের পুলিসকর্তাদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ বজায় থাকে। তাই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার হিম্মত ছিল কম জনেরই। অর্চনা ও সৌমেন তা করতে পেরেছিলেন। নাগরিক আন্দোলনের অভিমুখ ছিল এরকম: একদিকে এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চাওয়া, অন্যদিকে রুণুর বরখাস্তের দাবি। এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে একাধিক চিঠি লেখা হয়েছিল।  বলা বাহুল্য, রুণু সাসপেন্ড হয়নি। বরং ১৯৮৮ সালে তার পদোন্নতি হয়েছিল। সে অবসর নিয়েছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিস হিসেবে। সেসময় অনেক বামপন্থী নেতাদের বলতে শোনা যেত, রুণু আছে বলে কলকাতার মানুষ রাতে শান্তিতে ঘুমোতে পারে। নন্দীগ্রামে নির্যাতক পুলিস যেমন তৃণমূল আমলে প্রোমোশন পায়, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সময়ের নির্যাতক পুলিসের ক্ষেত্রেও জ্যোতিবাবুর আমলে তার অন্যথা হয়নি।
 
৬.
 
সংবাদমাধ্যমে অর্চনার উল্লেখ বর্তমান লেখক মনে হয় শেষ বার পেয়েছিল বাংলা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে। সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র ২০১৯ সালের ৮ই ডিসেম্বর অন্য প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে, বস্তুত এনকাউন্টার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে, অর্চনার উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, ৮৭-৮৮ সালে সাংবাদিক হিসেবে অর্চনার ইন্টারভউ নেওয়া মানুষদের মধ্যে তিনি অন্যতম প্রথম। প্রশ্ন করেছিলেন, বিরাট শক্তিধর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জয়ের কি কোনো আশা তিনি দেখছেন? অর্চনা গুহর উত্তর ছিল :
‘চেষ্টা করছি আমরা, না হলে কী করব? তবে এটাও মনে রাখতে হবে, যত মহৎ উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, আইনের চোখে আমাদের অনেক বন্ধুও তো অপরাধ করেছে, এতগুলো খুন কারা করল, কিন্তু তার জন্যও তো কারও কোনও শাস্তি হয়নি, তাদের বাড়ির লোক-জনেরও বিচার পাওয়ার অধিকার আছে, সেই কথা ভেবে আমার বিচার না পাওয়াটা মেনে নেব।’
অর্চনা গুহ। নিজের বয়ানানুযায়ী কোনও দিন যিনি রাজনীতি করেননি, ভাই সহিংস নকশালপন্থী রাজনীতি করতেন বলে যাঁর উপর হয়েছে অকথ্য নির্যাতন, যিনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধের কোল্যাটারাল ড্যামেজ। অথচ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব স্পষ্ট অভিমত তিনি রাখতে পেরেছিলেন। অর্চনা গুহর এই বক্তব্য সবাই সমান ভাবে গ্রহণ করবেন না, তা স্বাভাবিক। কেউ তাঁকে বলবেন রাষ্ট্রদ্রোহী, আবার  বিপরীত পক্ষ তাঁকে বলবেন লিবারাল ও প্রতিবিপ্লবী। বর্তমান লেখকের কাছে সেসবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল আরেকটি দিক। অর্চনা নামক ব্যক্তিমানুষ সেই মূল্যবোধ বজায় রাখতে পেরেছিলেন, যা সংবিধান নির্ধারিত হলেও রাষ্ট্র নিজে বজায় রাখতে অক্ষম।
অর্চনাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যখন, তখন জরুরি অবস্থা শুরু না হলেও তার মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল। এরপর, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর, ধরপাকড়, পুলিশি অত্যাচার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ বেড়েছিল ক্রমে। সম্ভবত বিজেপির এই দফার শাসনকালের আগে পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় এই দশক। আর রাজ্যের ক্ষেত্রে সত্তরের দশকই রাষ্ট্রীয় অত্যাচারে এখনও পর্যন্ত সেরা। বর্তমানে অবশ্য ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রশক্তি ইমার্জেন্সি জারি না করেও যথেচ্ছ গ্রেপ্তার করতে পারে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণেরও আছে সূক্ষ্মতর কৌশল। দেশে এনআরসি লাগু হয়েছে এক রাজ্যে। কৃষি-আইন লাগু করার চেষ্টার বিরুদ্ধে আজকের কৃষক আন্দোলন মনে করিয়ে দেয়, সত্তরের আন্দোলনও কৃষি-আন্দোলন দিয়েই শুরু হয়েছিল। শ্রম কোড আইন হচ্ছে, যা মনে করায়, ইন্দিরা গান্ধির সময়েও শ্রমিকের বোনাস আর আন্দোলনের অধিকার কাড়া হয়েছিল। আজ যথেচ্ছ গ্রেফতার করা হচ্ছে ভীমা কোরেগাঁও অভিযুক্তদের, দিল্লির ছাত্রীদের, দেশ জুড়ে আরও অসংখ্য আন্দোলনকারী বা বুদ্ধিজীবীকে। এ এক অঘোষিত জরুরি অবস্থা ছাড়া আর কী? দেখেশুনে মনে হয়, ভারতের মতো ‘স্বাধীন’ দেশে বাঁচার দুটিই উপায়। হয় মেনে নেওয়া ও অধিকার ছেড়ে দেওয়া৷ নয় অধিকারের জন্য লড়া, এমনকি দমনের ভয় থাকলেও লড়া। নাহলে যে কঠোরতর দমন আসবে!
যদি দমন নেমে আসে, তবে যেন অর্চনা গুহর মতো প্রতিরোধের মনোবল থাকে। তিনি ছাড়া এ অদ্ভুত শক্তি মনে হয় দেখিয়েছেন একমাত্র গুজরাতের দাঙ্গায় ধর্ষিতা বিলকিস বানো। যদিও তাঁর ক্ষেত্রে অত্যাচার এক রাতের ছিল, সাতাশ দিনের নয়, যদিও সে ক্ষেত্রে জড়িত ছিল রাষ্ট্রশক্তির মদতপুষ্ট হিন্দুত্ববাদীরা, সরাসরি রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা নয় — তবু দুজনের অপরিসীম ধৈর্য আর প্রতিরোধ তুলনীয়। যদি ঘোষিত বা অঘোষিত জরুরি অবস্থার ভয় হয় আমাদের কালেকটিভ আনকনশাসের সেই চালিকাশক্তি, যা আমাদের লড়াই-এর মাঠে রাখে, তবে অর্চনা বা বিলকিস বানো হলেন লড়াই-এর অনুপ্রেরণা।
 
 
ঋণ- ১) সুজাত ভদ্র
 ২) মুখ্যমন্ত্রীদের প্রতি এপিডিআর-এর পুরানো চিঠি
 ৩)  ১৯৮৮, ৯০, ৯৪ ও ৯৬ সালের অর্চনা গুহ মামলা রায়ের বয়ান।
৪) Frontier, 1996
 ৫) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯।