রাহেবুল-এর গদ্য

Spread This
রাহেবুল

রাহেবুল

মাইনষেকুল এবং দ্যাও-গাঁও গুণ্ডা-খাওয়া জাত

প্রথম পর্ব

অনেকদিনই ভেবেছি বি.এল.আর.ও অফিস যাই, ঠিক বি.এল.আর.ও নয় যেটা ওই গ্রামে থাকে জমি সংক্রান্ত অফিস ওখানে কারণ শহরের বা ব্লকের বি.এল.আর.ও অফিসে গিয়ে পাত্তা পাওয়া বড়ো দায়। এমনিতেও এ বঙ্গদেশে ঘুষখোর অফিস-কাছারির মধ্যে জমি-সংক্রান্ত অফিসগুলির যথেষ্ট সুনাম! তারমধ্যে গাঁইয়া লোকজনেদের কেই-বা পোঁছে, কলিকাতাও পোঁছে না এ কথা উত্তরের গঞ্জগ্রামের সাধারণ জন থেকে শুরু করে কবি-শিল্পীর দলবলও মাঝেসাঝে দীর্ঘশ্বাসে বলে ফেলে। তা সেই গ্রামের ছোট্ট জমির অফিস একবার গিয়েছিলাম কি দু’বার ছোট্টবেলায় তখন বোধহয় আমি মাধ্যমিক পড়ুয়া কচিখোকা, তখন ওবিসি-সার্টিফিকেট তৈরির একটা হিড়িক পড়েছিল। প্রথম প্রজন্মের আমাদের কাছে সেই সার্টিফিকেট আর তা নিয়ে দৌড়োদৌড়ি এ এক রোমাঞ্চকর ব্যাপার ছিল বটে। তা সেই সার্টিফিকেট করতে নাকি লাগে জমির খাজনার রসিদ তার নিমিত্তেই যাওয়া হয়েছিল অফিস। তারপর আরেকটু বয়স বাড়লে, জানার আগ্রহ বাড়লে অনেকবার ইচ্ছে হয়েছিল অফিস থেকে অত্র এলাকার জমিজমার (তাতে ইতিহাস থাকে বৈকি আর ইতিহাসে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি) খোঁজ নেওয়ার, কিন্তু তা আর হল না এখনও। দক্ষিণমুখী মুজনাই আর বুড়ি তোর্সা দুই নদীর মাঝখানের গ্রামটা দ্যাওগাঁও। তা বাদেও দ্যাওগাঁওয়ের পেটে অবশ্য আরও নদী-যাম্পই আছে। বুড়ি তোর্সা আবার গা এলিয়ে আছে খয়েরবাড়ি ফরেস্টের সঙ্গে যে-ফরেস্ট মাদারিহাটের জলদাপাড়ার সঙ্গে জুড়ে গেছে। দ্যাওগাঁও পড়েছে ফালাকাটা ব্লকে। বেশ বড়ো গাঁ, পাঁচ মৌজা—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম এবং একটা মধ্যও আছে। এছাড়া দ্যাওগাঁওয়ের দক্ষিণে বেলতলী গ্রাম সেও প্রশাসনিকভাবে দ্যাওগাঁও ভুক্ত। বেলতলী থেকে আরও দূরে দক্ষিণে গেলে ফালাকাটা। দ্যাওগাঁওয়ের উত্তরে খয়েরবাড়ি গ্রাম, আরেকটু বাঁয়ে গেলে শিশুবাড়ি-দলগাঁও-বীরপাড়া, দেওগাঁওয়ের পশ্চিমে মুজনাই পেরিয়ে ধূলাগাঁও এবং তারপর জটেশ্বর। জটেশ্বর টপকে গেলে ওদিকে সরুগাঁও, মালসাগাঁও, খগেনহাট, দ্যাওমালী, ধূপগুড়ি। একসময় দ্যাওগাঁও কখনও ছিল ভুটানের, কখনও বৈকুণ্ঠপুরের (পুরাতন জলপাইগুড়ি), কখনও কোচবিহার রাজ্যের তারপর ইংরেজের হাতের শাসন বদলে জলপাইগুড়ির হলো, তারপর আলিপুরদুয়ার জেলা হিসাবে জন্মালে হলো আলিপুরদুয়ারের। কংগ্রেসের সময় ছিল জোতদারের ঘাঁটি, বামেদের সময় নাকি বামদুর্গ! জঙ্গল, কাঠ, নদী, মহিষ, বাইসন, বাথান, মাহুত, হাতি, গোরু-মোষের গাড়ি, গাড়িয়াল, জোতদার-দেওয়ানি, আধিয়ার, কর্দমাক্ত রাস্তা-ঘাট-ঘাটা এইসকল এইখানকার দ্রষ্টব্য ছিল একদা, শুনেছি। আর দ্যাও নাকি ছিল প্রচুর। দ্যাও মানে দেবতা কিন্তু ঠিক দেবতাও নয় কারণ দ্যাওয়ের সঙ্গে অশুভতা, ভীতি জড়িয়ে অবশ্য কারোর কাছে দেবতা শব্দটিরও এরকম মানে হতে পারে, বিশেষ করে যখন বলা হয় ‘দ্যাও-দেবতা’। যাইহোক আপাত অর্থে দ্যাও বলতে বদ দেবতা বুঝি। হয়তো গ্রামে বহিরাগত সাগাই-সোদর এসেছিল কখনও তারপর দ্যাওয়ের উৎপাতে তার প্রাণ যায় যায়… পালিয়ে গিয়ে গাঁওয়ের নাম রেখেছিল দ্যাওগাঁও! তারপর প্রশাসনিক বাবুরা, বাঙালি বাবুরা গ্রামের নাম কাগজেকলমে হয়তো করে রেখে দিল ‘দেওগাঁও’, দ্যাও পাল্টে দেও হলো, দ্যাও তার দৈবিক অস্তিত্ব আর তার নাম দুইই এইভাবে হারিয়ে বসলো। এরকম উচ্চারণ পাল্টানো বা লেখ্য বানান পাল্টানোর বাহাদুরি এদিকে অনেক ক্ষেত্রেই ফলেছে কেবল স্থাননাম নয় ব্যক্তিনামেও এই হারাকিরি দেখা যায় সামান্য অতীত ঘাঁটলেই। খাঁটি বানাতে গিয়ে নাকি সংশোধনের ভূত চেপে, অপ্রয়োজনীয় এই হস্তক্ষেপগুলি অনেক দেশি স্বাদ ধুলোয় মিশিয়েছে। গাঁয়ে কতেক জাতি-প্রজাতির বিচিত্র বৈচিত্রের কয়েক হাজার মানুষের বাস! রাজবংশী (হিন্দু এবং মুসলমান), রাভা, মেচ, ভাটিয়া, নেপালি, বাঙালি, সাঁওতাল-ওরাঁও-মুণ্ডা …  সেইসব এবং বাকিসব নিয়ে কথা হবে ক্ষ’ণ। কিন্তু কখন ক্যাম্নে তা আমার আগাম অজানা। এবম্বিধ কেচ্ছা আর কাহিনিও কব, কোনো ফাঁকে।

যত্ন করি গুণ্ডা করি পুরাণ সুকুতা—

কৃষ্ণদাস কবিরাজ (আনুমানিক ১৫৮০ যিশু অব্দ)

‘গুণ্ডা’ শব্দটা বাংলা অভিধানে আর বাঙালি জীবনে মুখ্যত ভিলেন জাতীয় বাজে লোকেদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয় যে শব্দটা নাকি এসেছে ফারসি ‘ঘুণ্ডা’ থেকে। সংসদ অভিধান অবশ্য বলেছে এটি ‘গুন্ডা’ এবং শব্দটি দেশি। মানে ওই এক, দুর্বৃত্ত। এর আরও কতক মানে আছে মনোএল দ্য আসসুম্পসাও (১৭৪৩ খ্রি.) কয়েছেন ‘গৃহহীন’, রাজবংশী ভাষায় ‘পাঁচ গজের মাপ, ধুর’ ইত্যাদি। আমাদের এই ছোট্ট গাঁয়ে অবশ্য ‘গুণ্ডা’র মানে আলাদা। এ হচ্ছে ‘গুঁড়া’ যা এসেছে সংস্কৃত ‘গুণ্ডক’ থেকে। যদিও শব্দটা বাংলা অভিধানে অনুপস্থিত। মুখ্যত চালের গুঁড়ার কথাই বলছি। ভাজা চালের গুঁড়া। যদিও গমের গুঁড়া, মুড়ির গুঁড়া ইত্যাদিরও অল্পস্বল্প চল দেখি। চালভাজার গুঁড়া ভাত ব্যতীত এতদ্‌ এলাকার মুখ্য খাদ্য। এ নিয়ে এলাকার প্রচুর কুখ্যাতি। কতদিন ধরে এমন চলছে কে জানে। “বাপ নাই খায় গুণ্ডা তার ব্যাটা হইচে চান্দিয়া মুণ্ডা” এমন একটা প্রবাদ অবশ্য রাজবংশীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের। জিনিসটা তৈরি করার এবং খাওয়ার নানান তরতরিকা। কালে কালে তার আপডেটেশন হয়েছে। এখনও হয়ে চলেছে। আখার পাড়ে বসে জারের দিনে কড়াইতে চাল ভাজা বেশ আরামদায়ক অভিজ্ঞতা হবে মায়েদের। নিজে যেহেতু ভাজিনি কখনও ফলে প্রকৃত অভিজ্ঞতা কেমন কে জানে! গরমের দিনে কম্মোটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে বলাবাহুল্য। ইদানীং গ্যাস-সিলিণ্ডার কিছু ঘরে ঢুকে গ্যাস-ওভেনে কড়াই চড়িয়েও চাল ভাজা চলে। চালভাজার কাজ সম্পন্ন হলে আসে তা গুঁড়ো করার পালা যে কাজে ছাম-গাইন নামের লোক-যন্ত্রটির প্রসিদ্ধি। এর আরেকটি উপযোগিতা ছিল— চিঁড়া ভুকাবার/পেষবার কাজে।  আন্দাজ, আগেকার দিনে হয়তো ঘরে ঘরেই ছিল ছাম-গাইন, ইদানীং অবশ্য প্রায় লুপ্ত। ছামের পেটে ভাজা চাল ঢেলে দিয়ে তাতে গাইন দিয়ে কয়েক দফায় পাড়/পেষ দিতে হয়। এ কাজেও মহিলারাই বিশেষজ্ঞ। দিনকে দিন নয়া প্রযুক্তি আসে পুরনো প্রযুক্তির লয়-লুপ্তি ঘটে, যেমন এখন বিভিন্ন খাদ্যবস্তু ভাঙবার জন্যে গ্রাইন্ডার অনেকের ঘরে, চালভাজাও তাতে চড়ে নিজের মর্যাদা বাড়িয়েছে। যদিও অর্থবানেদের অনেককেই দেখেছি এ খাদ্যটি নিয়ে নাক সিটকাতে, আবার চুপিচুপি গুণ্ডায় বয়ামও ভরাতে। ‘গুণ্ডা খাওয়ার জাত’ এই কথাটাও হয়তো এদেরই কেউ, এদেরই কোনো জ্ঞাতিগোষ্ঠী সমাজে চালু করে। এলাকায় এমনিতেও আদ্যিকাল থেকে দেখছি চায়ের কদর, মানে ব্রিটিশ চালু করে দিয়ে যাওয়ার পর। কোথাও একটা পড়েছিলাম খয়েরবাড়িতেও হওয়ার কথা ছিল ব্রিটিশ যুগে চা-বাগান তা খয়ের গাছের কাঁটার ভয়ে বোধয় আর পা বাড়ায়নি। এই এলাকার রাজবংশী, রাভা, মেচ ব্যতীত অন্যান্য অনেক আদিবাসী গোষ্ঠীর আগমন মূলত চা-চাষের শ্রমিক হয়ে, তাদের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় তাই চা-টা দুর্লভ নয়। চা-গাছের ফুল খেয়ে লোকের কষ্টের দিনগুজরান তো খুব বেশিদিন আগেরও নয়, আজকেও হয়তো কোথাও ঘটছে। একসঙ্গে এই আদিবাসী জাতিগুলির বসত হওয়ায় জীবন-যাপনে একে অপরের ওপর প্রভাব পড়া খুব স্বাভাবিক। পাশাপাশি প্রচুর চা-বাগান হওয়াতে হাতে মলা চা-র যথেষ্ট প্রচলন, এইভাবে চা-কে কেবল হালকা পানীয় নয় খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের চল ঘটে, হয়তো-বা নিরুপায় হয়ে। এখানে তাই কাউকে কাপে করে চা খেতে দেখতে পাওয়াটা আজও দুর্লক্ষ্য, নেহাত বাঙালি বা বিদেশি আতিথেয়তার ঢং কাপ ব্যবহারে বাধ্য করে, নইলে বাটি ছাড়া এখানে চা খাওয়া চলে না। আরও দেখেছি সকালে উঠে থালা বা সানকিতে করে চা খেতে। লাল চা। তো গুণ্ডায় ফিরি। গুণ্ডা তো শুকনো, কেবলই গুণ্ডা খাওয়া গলায় আটকে মরণ ডাকা! তাই এই চা-এর শরণ অবশ্যম্ভাবি। কয়েক বছর আগে আব্বা সকালে উঠে যেমন হাল-কৃষির দিনে হাল-জোয়াল নিয়ে বেরবার আগে এক বাটি লাল চা-তে কয়েক চামচ গুণ্ডা গুলিয়ে ঢকাঢক খেয়ে নিত, খেতে সময়ও লাগে না, পেটেও বোধয় অনেকক্ষণই থাকে। এখন অবশ্য আর লাঙল, জোয়াল, গোরুর হাল নেই, এমনিতেই বিঘে একের মতন ভুঁই, মরশুমে মরশুমে অন্যের জমি চষাতে এসে ট্রাক্টরে চষে যায় আমাদেরটুকুও। আব্বার যদিও আজও গুণ্ডা-চা প্রিয় পেয়। বেটির (বিধবা ফুফু আমার) গুণ্ডা না হলে হয় না। রুটি তার চলে না। চিঁড়া চলে না। মুড়ি চলে না। চালভাজা চলে, কিছুটা। কিন্তু গুণ্ডা ইজ দ্য বেস্ট! এই নিয়ে তার আম্মার সঙ্গে কাজিয়াতেও আপত্তি নেই। গুণ্ডার মজা যদিও লাল চা-য়ে নয় বরং দুধ চা-য়ে। কত জননীর যে এর ফলে গ্যাস্ট্রিক, বুকজ্বালা ঘটেছে কিন্তু ওই গুণ্ডা-চা-র সুস্বাদ তারা ভুলতে পারেননি। আব্বার আবার যেমন আজও দুধ চা হলে খাওয়াটায় তৃপ্তি হয়, অবশ্য কেবলই দুধ হলে হবে না কো, সর-ওয়ালা আওটা দুধ চাই সঙ্গে চা-য়ে ক’চামচ চালের গুণ্ডা। এ বাদে, লাল চা, দুধ চা ছাড়াও গুণ্ডা-চা খাওয়ার আরেকটা তরিকা আছে, আনাজপত্র দিয়ে খাওয়া। রাতেকার বাসি আনাজ-তরকারি যা যতটুকু থাকে পরদিন সকালে চাল-চা গুণ্ডার সঙ্গে বা দুধ-চা গুণ্ডার সঙ্গে বা নিদেনপক্ষে চালভাজা-চা-এর সঙ্গে আয়েস করে এক চামচ গুণ্ডা-চা মুখে দাও, দিয়েই এক-আধ চামচ বাসি তরকারি মুখে মুখে পুরে লাও আহা পরম আস্বাদ। আমাদের টারিটাতে আমিরদাদের বাড়িতে এমন কত খেতে দেখেছি, আমি-আমরাও বাড়িতে মাঝেসাঝে এইভাবে খাইনি বা আজও খাইনা তাও নয়। আমিরদা অবশ্য আজ বেঁচে নেই সাক্ষ্য দিতে। খুব বেশি বয়স হয়নি, একদিন ওর ক্ষতবিক্ষত লাশ মেলেছিল জলদাপাড়ার জঙ্গলে, গণ্ডারে চেটেছিল ওর গা। ওর বাড়ির লোকেরা শনাক্ত করেছিল আমিরদাকে। শেষের দিকে দেখতাম ও কেবল ছুটতো, ভয়ে আতঙ্কে… পালাতে চাইতো দিকবিদিক। সে মেলা বেদনাদায়ক কথা।

বলছিলাম যেমন দেওগাঁর উত্তর-পশ্চিমে শিশুবাড়ি। উত্তর দেওগাঁ হয়ে মুজনাইর পাড়ের নকুতুল্লার হাটটি পেরলে কিছুদূর গিয়ে শিশুবাড়ি। নামেই হাট কথাটা আছে এখন অবশ্য আর হাট হয় না বললেই চলে, মরেই গেছে। এসেছিল বাজারের চল। সেও যাচ্ছে। মল এসেছে, শপিং মল। তারপর অনলাইন কেনাকাটার রমরমা। আগামীতে কী হবে কেউ জানে? হয়তো-বা। শিশুবাড়িকে পুবে-পশ্চিমে দো-ফালা করে গেছে জাতীয় সড়ক, এখন এশিয়ান হাইওয়ে। রাস্তার উত্তরে, রাস্তার পাশেই শিশুবাড়ি হাট, স্কুল, মাদ্রাসা, ব্যাংক, লাগোয়া রেলস্টেশন—মুজনাই। মূলত রাজবংশী মুসলমান বসতিপূর্ণ এলাকা। কিন্তু কিছুটা জামাতি প্রভাব থাকায় জীবন যাপনে কেতাবি মুসলমানি ছাপ প্রবল। প্রথাগত শিক্ষাতেও অনেকেই এগিয়ে এখানে। সঙ্গে যা হয় সভ্যতার অন্ধকার দিকটাও কোথাও কোথাও উঁকি মারে। হাট পেরিয়ে আরেকটু ছড়িয়ে গেলে উত্তরে বিভিন্ন আদিবাসী মানুষের বাস। রাস্তার দক্ষিণের দিকে যত দূরে সরে আসা যায় দেওগাঁওয়ের কাছাকাছি মুসলমানদের মধ্যে ধর্মভাব কম। এইসব নিয়েও দেওগাঁওয়ের মুসলমান লোকেদের খানিক কুখ্যাতি আছে। তো সেই গুণ্ডার কথা। আমি অবশ্য স্বয়ং কোনোদিন দেওগাঁওয়ের উত্তর দিক ধরে ১৫-২০ কিমি দূরত্বের কাছের শহর বীরপাড়ায় শ্রমিকের কাজে যাইনি। ঘরবাড়ি নির্মাণ শ্রমিক বা মিস্ত্রির একটা চাহিদা শহরে সব সময়ই ছিল, থাকে। কেউ আবার সবজি বেচতেও যায়। শিশুবাড়ির লোকেও যায়। এগুলো শোনা কথা। ছোটোবেলায় শুনেছি হয়তো টারির কোনো দাদা-ভাইজান-চাচা-বড়ো আব্বার মুখে যারা একত্রে কাজ করত বীরপাড়ায়। বা এমনও হতে পারে আত্মীয়তা সূত্রে এইসব কথা আসে। কিছুটা গসিপ মনেহয়। আবার কে জানে সত্যও হতে পারে। শিশুবাড়ির লোকে সকালে উঠে মুড়ি খেতে পছন্দ, সেই খেয়েই তারা কাজে ছোটে কিন্তু দেওগাঁর লোকে গুণ্ডা খেয়ে। দু’দলে বিবাদ। শিশুবাড়িয়া ঠাট্টা করে গুণ্ডা-খাওয়া বলে আর দেওগাঁইয়া মুড়ি খাওয়াকে ছোটো করে দেখে। আমার মনেহয় বাজারের পাশের বা জাতীয় সড়কের পাশের মানুষের জীবনে বাজার বা জাতীয় সড়কের গতি প্রভাব ফেলতে বাধ্য, তারাও ছুটতে চায়, এটা শহর-নগর-মহানগর কিংবা আমাদের উত্তর ছেড়ে দক্ষিণে মানে কলিকাতার সন্নিকটে গেলে আরও প্রবলভাবে অনুভূত হয়। যেমন ১৯৬৯-এ আমারই মতন এক গাঁইয়া, কবি অরুণেশ (১৯৪১-২০১১) এর প্রথম কলিকাতা দর্শন: “সকাল দশটা-এগারোটায় লোকগুলো ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে যাচ্ছে, বাস থেকে নেমে ছুটে ঢুকছে অফিসে কিংবা কাজে। মাথায় ঘা হলে কুকুর যেমন পাগল হয়, কলকাতাও তেমনি, নিজের মধ্যে ছুটে ছুটে ঘুরে মরছে, তার মৃত্যুও নেই, মুক্তিও নেই।” আমার মনেহয় সেই গতিকে ধরতেই শিশুবাড়িয়ার মুড়ির শর্টকাট ধরা। অপরদিকে দেওগাঁইয়া তখনও পর্যন্ত গতির দৌড়ে নামেনি সেভাবে বলেই হয়তো গুণ্ডার ঝুট ঝামেলা তার সয়ে যায়, মানে ওই খড়ি খুঁজে এনে আখা ধরানো, আখায় কড়াই বসিয়ে তাতে চালকে চড়ানো, চালকে ভাজা তারপর গুঁড়ো করা এ কম তো হ্যাপা নয়। প্রশ্ন হলো কাঁহাতক আর এই গতি থেকে আমাদের দূরে থাকা?

দেওগাঁর সোজা উত্তরে, উত্তর দেওগাঁর কার্জিপাড়া পেরিয়ে খয়েরবাড়ি। কার্জিপাড়ায় কার্জিদের বাস। ভুটানিরা নাকি রাভাদের এমন উপাধি দিয়েছিল। খয়েরবাড়িতেও রাজবংশী মুসলমানাধিক্য, তবে তারও অনেক ফেরফার যেমন মক্কায় হজ করে আসা হাজিদের হাজিপাড়া, লোকের বাড়ি বাড়ি বা মাদ্রাসা-খানকায় ফাতেয়া-মিলাদ ইত্যাদি অনুষ্ঠান করে বেড়ানোদের মুন্সিপাড়া। সূত্রধরপাড়া, এইসবও আছে কিছু। ফালাকাটা থেকে সিধা উত্তরে মাদারিহাট যাওয়ার সড়কটা, এক মাইল দু’মাইল করে পাঁচ মাইল পর্যন্ত এসে পশ্চিমে ঢুকেই ছোট্ট খয়েরবাড়ি ফরেস্ট পেরিয়ে দেওগাঁও, ছোটো ছোটো ক’টা মোড় বা কিঞ্চিৎ ভিড়ভাট্টা যেমন বামনিয়ার পাড়, দোকানের পাড়, স্কুলের ডাঙ্গা, কাশিয়াবাড়ি, জুম্মার পাড়, গবিনহাট, বটতলা, তারপর কার্জিপাড়া পেরিয়ে খয়েরবাড়ি হয়ে রাঙ্গালিবাজনায় পৌঁছে জাতীয় সড়কে উঠেছে এই পকেট রোড। এখন এটা পিচ রাস্তা, জেলা পরিষদের অধীন, যখন ভাঙে কমের পক্ষে পাঁচ বছর দাঁত হি করা শিল, গর্ত-গাড্ডা, ধূলা এইসবের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে তখন ফালাকাটা-বীরপাড়া-মাদারিহাট যাওয়া-আসা। এককালে অবশ্য রাস্তাই নাকি ছিল না, ছিল শুধু জঙ্গল-ঝাড়, আর গর্ত, গোরুর গাড়ি চলত, সঙ্গে গাড়ির চাকা ফেঁসে গেলে ঠেলাঠেলি করার লোক সঙ্গে থাকাটা ছিল আবশ্যিক। ইতি-উতি দরকার-বেদরকারে সরকারি আধিকারিকের নাকি দেওগাঁও এসে জন্মের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। যেমন ষাটোর্ধ্ব বাপের বয়ানে একটা শোনা যাক: “ওইল্লা বহুদিনকার কতা। সেলা হামা দেওয়ানির বাড়িত্‌ থাকি। কাজ করি খাই। চ্যাংড়া মানষি। একবার কী একটা দরকারোত্‌ ফালাকাটার পুলিশ আইসচেলো। কোন-বা অফিছার ছিল। আসি পুলিশের গাড়ি খারাপ হয়। হামাক কয় দেওয়ানি পুলিশের গাড়িক্‌ নিগি থুইয়া আসির। দুইকান ভইসের গাড়ি নেই হামা। মটোরকান বান্দি আফতার আর মোর গাড়িত্‌। কচরদা আর কেশার গাড়িকানোত্‌ ছিল পুলিশলা। এইম্‌তোন করি কচরদা, আফতার, কেশা আর মুই মিলিয়া দুইকান ভইসের গাড়িত করি ওমাক পওছে দেই। ফালাকাটা গেইতে ঘাটাত্‌ ওত্তি বলাইক্‌ মাইরেচেলো ওইসমায়। হামার মেলা রাইত্‌ হয় ঘুরি আইসতে আইসতে। হামা তো ভয়োতে ডাইল। ভইসের গাড়ির হাউদা হাতোত নিয়া দুইকান গাড়িরে ভইসোক্‌ পিট্টান দিয়া অ্যায়সা হাকান্‌ দেই… বাড়ি আইসতে আইসতে রাইত একটা দুইটা বাজি যায়, এমা এত্তি বাড়িত্‌ চিন্তা করির ধইরচেল হামাক ধরি।”

খয়েরবাড়ির আরেক নাম ইসলামাবাদ। কে জানে কীভাবে হলো। রাঙ্গালিবাজনা আর খয়েরবাড়ি দু’টো এলাকাই পড়াশোনা ও অর্থসর্থে অনেকটা এগিয়ে। অবশ্য যথারীতি কিছু দু’নম্বরি কারোবারও শিরোনামে আসে সংবাদপত্রে শিশুবাড়িরই মতো। রাঙ্গালিবাজনা ডুয়ার্সের গান্ধি যজ্ঞেশ্বর রায় (১৯০০-১৯৭১) এর বাসস্থান, এই এলাকার একটি পুরনো স্কুল রাঙ্গালিবাজনা হাইস্কুল তাঁরই বাবা মোহনসিং-এর নামে। তা এই খয়েরবাড়ি এলাকার মানুষেরও মাঝেমাঝে সাধ হয় দেওগাঁইয়াদের গুণ্ডা-খাওয়া বলে শংসা দেবার। নানানভাবে এ নিয়ে মজা-ইয়ার্কি করার। অবশ্য গুণ্ডার দুর্লভ স্বোয়াদ তারা পায়নি হয়তো নইলে কি আর এই দুর্বুদ্ধি মস্তকে ভিড়ে!

মুজনাই পার হয়ে ধূলাগাঁও হয়ে কলি, বারোবাঘ এই পেরিয়ে খগেনহাট টপকে কালুয়া নদীর পাড়ে দ্যাওমাল্লি (মাল্লি<আলি<আল), ফকিরপাড়া, আমার নানাবাড়ি। এক্কেবারে কালুয়ার গা ঘেষেই। এই নদীতেই হাত-পা-গা ছুঁড়ে ছুঁড়ে একসময় আমার সাঁতার শেখা। নানা কখনও তেলি ছিল নাকি কে জানে। বড়ো খালার ছেলে মহাবুব ভাইজানকে তেলি তেলি বলে দু’একবার ইয়ার্কি করতে শুনেছিলাম অতীতে। তবে গালামালের দোকান ছিল নানার। নানা, একমাত্র মামু মিলে হাতেটানা ঠেলায় একদা হাটবার করে দোকান নিয়ে যেত। পুজো-গ্রীষ্মের স্কুলের ছুটিতে যখন নানাবাড়ি যেতাম সেসময় আমিও সেই ঠেলার পেছনে লেজুড় হতাম। নানাবাড়ির অল্প উত্তরে তখন ছোটো ছোটো অনেক হাট— বুধবারিয়া হাট, শালবাড়ি হাট—এখন আর সব অক্ষত নেই বোধয়, বরং এখন মোড়ে মোড়ে দিনবাজার। আমার বাড়ির পাশের কাশিয়াবাড়ির হাটটা যেমন দেখতে দেখতে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে…

ছোটো বেলায় নানাবাড়িতে সরাসরি নাহলেও আব্বা-আম্মার খটোমটো লাগলে আম্মার মুখে অনেকবারই হয়তো শুনেছি নানাজি নাকি আম্মার বিয়ের ব্যাপারে আক্ষেপ করত। নানাজির আর চার মেয়ের তিন মেয়েই চোখের আগায় খগেনহাট এলাকাতেই বিয়ে, সবচেয়ে ছোটো মেয়ে কেবল একটু দূরে ধূপগুড়িতে কিন্তু তার বিয়েও হয়েছে তুলনামূলক অনেক পরে। বাড়ির পাশের তিন মেয়ে নিজেদের জমিজমায় চাষবাস করে মোটামুটি ভালোই চলত। নিজেদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ে হলেও একমাত্র মরণ হয়েছিল আম্মারই। কারণ আমাদের নিজস্ব জমিজমা বিঘে খানেক মাত্তর, যদিও দাদুর নাকি ছিল বিঘে তিরিশেক ভুঁই! নিজেদের জমি না থাকায় আম্মাকেই দিনের পর দিন অন্যের জমিতে কামলা খাটতে হত আর আব্বা দেওয়ানির বাড়ি ছাড়ার পর টুকিটাকি নিজেরটুকু নিয়েই থাকত সঙ্গে নানান কিসিমের অসুখ-বিসুখ। আম্মা হাজিরা করে করে যখন সামান্য টাকা পয়সা হয় তখন আধ-এক বিঘে জমি অন্যের বন্ধক নিয়েছিলাম আমরা। সেই জমির চাষাবাদের জমি চষানোটা ছাড়া বাদবাকি সব কাজেই সেই আম্মাকে লাগত। আম্মা অন্যের জমিতে কাজ করতে যাওয়ার আগে খুব সকালে বা কোনোদিন বিকেলে চারটা-পাঁচটার সময় হাজিরা ছুটির পর নিজের জমিতে খাটত। নিড়ানি দেওয়া, ফসলকাটা, ফসল বাঁধা, মাথায় করে বাড়ি বয়ে আনা এইসব হত এই যৎসামান্য ফাঁকটুকুতে। এমনকি দুপুরের টিফিন টাইমেও মা একইভাবে ছুটত আমাদের জন্যে খবাবারদাবারটুকু বাড়িতে এসে দিয়ে গিয়েই বা নিজের পেটে একটু গুণ্ডা-চা ঢেলেই। কিন্তু খগেনহাটের খালাদের এমন বিপত্তি ছিল না জীবনে তারা যা কাজ করত মূলত বাড়িতেই, বাইরের কাজ খালুরাই করত। এতেই হয়তো নানার আপত্তি ছিল, সঙ্গে তো তীব্র অভাব ছিলই আমাদের, মাছ-মাংস ক’দিনই-বা কিনে খেতে পারতাম? আমাদের সেইসব দেখে জ্বলতেন। নানা তাই বলত “আর কোন্দিন্‌ দ্যাওগাঁত্‌ বেটি দিম না। দোলাবাড়িত্‌ খাটে মারে বেটিছাওয়ালাক দ্যাওগাঁর মানষি।” নানাও কি কখনও এমতন সময় গতর খাটিয়ে খাওয়া দেওগাঁইয়াদের গুণ্ডা খাওয়ার খোঁটা দিত? মনে নেই। বা পরবর্তীতে অন্য কোনো সময়, অন্য কোনো মুহূর্তে মামানি কি কিছু মজা-ইয়ার্কি করত আমাদের সঙ্গে এই নিয়ে? ঠিকঠাক মনে পড়ে না আজকে। এখন অবশ্য দিন বদলেছে। নানার মুখে প্রচুর তৃপ্তির হাসি ছড়াতে দেখেছিলাম যখন একসময় আম্মা-আব্বার বহু প্রচেষ্টায় আমরা তিন ভাই-বোন খানিক বইপত্র পড়ে উঠতে পেরেছিলাম এবং জুটেছিল সেইসূত্রে প্রতিদিনের পেট চালানোর মতন সংস্থানও। নামাজি নানার তখন একটাই কথা: “আ বারে আল্লা আছে। মুখ তুলি দেইখছে আল্লা। আল্লা রহম কইরচে।”

(ক্রমশ)

ছাম-গাইন হাতে বেটি