সুদেষ্ণা মৈত্র-র গদ্য

Spread This
সুদেষ্ণা মৈত্র

সুদেষ্ণা মৈত্র

কিছু খামখেয়ালি গদ্যগাছ
কাগজের গালে রঙ ঢালতে গিয়ে দেখি আজ কতোদিন তুমি দাড়ি কাটো নি। ওপরের তালুতে মাংসের ঝাল গরম রেখেছে তোমায় সারা দুপুর।আবার কাগজে ফিরে আসি।দোয়েল, টিয়ে এরা এমনিই জেগে ওঠে। ডাকতে থাকে। তুলি ধরে বিকেল নামতে থাকে। পশ্চিম দিকের আলো বরাবর একটা স্ট্রাইক মেরে এইযে বাঁদিকে ঘুরে যাচ্ছি, ওখানে জবা গাছ।জল দেওয়া হয় নি এখনো। না, ওদিকে যাব না।আমি ডানদিক ধরে তোমার আঙুল-টানে হাঁটতে থাকি। মৌমাছি ঝমঝম করছে ডগায়।মধুর বখাটে ভিড়ে তুমি পাশ ফিরতে গিয়েও সামলে উঠছো। কলারে লেডিব্রাবোর্ণ’এর ডিপ্লোমা। বোতামে সুন্দরী ফিজিশিয়ান -তবু খেয়াল পড়েই গেলো নিচের থেকে চার নম্বর ঘরটি খোলা। দুটো আঙুল দিয়ে ক্রমশঃ তুলির মুখ সূচালো করে নিলে বলিরেখা ভালো আঁকা যায়। আমি সেলাই করে দিই ঘর। তোমার ফিরতে ফিরতে সন্ধে আর চায়ের গল্পে যথারীতি তুমি স্বাদ পাবে না আজ…তাহলে যা দাঁড়ালো সেখানে স্পষ্ট একটা কিচিরমিচির পেরিয়ে কাগজটি গোধূলি-লগ্নের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সারা শরীরে এখন তন্ন তন্ন পাখির পালক আর রঙিন কাচের স্তব্ধতা। তোমায় ঠিক কবে থেকে নিজের বলে দেখি না স্নেহময়! তুমি কাগজ পড়ো না?
 
সন্ধে কামড়াতে কামড়াতে কখন যেন আগন্তুক হয়ে উঠেছি নিজের কাছেই। বুক ধরে কড়া ভাঙচুর। কে আছো ভেতরে? কলসি উপুড় হয় না। হা হুতাশ হা হুতাশ। এক ফোঁটা জলও গড়ায় না যাবতীয় প্রশ্নের পাশ ঘেঁষে। তোমাদের সাবেকী বিচ্ছিন্নতা উবু হয়ে বিড়ি ধরাতে শেখে আর আমি শিখি ওর আলোটুকু নিশানা করতে। নিশানার চোখ জ্বলজ্বল।তাকে বালি ছুঁড়ে দিই। নিশানার হাতে গুঁজে আসি ভুল বানানের অভিমান। তারপরেও কি দরজা খুলে কেউ এক গ্লাস জল হাতে দাঁড়ায়? হাজার হলেও আগুনই তো! পোড়াবেই…পুড়তে পুড়তে সুড়ঙ্গ খোঁজার ঘোরে মৃত দেহ মাড়াই। হাড় গুঁড়িয়ে হাওয়া অস্ফুটে ডাকে কোনো নাম।স্বভাবতই তাচ্ছিল্যে মন সরাই। এগিয়ে যাই।সুড়ঙ্গের গায়ে গ্রন্থিলিপি। গিঁট বেঁধে বেঁধে স্মৃতি ধরে রাখার সংগ্রাম। হাত বুলোই আগন্তুকের হাতে। তালি বেজে ওঠে। অযথাই-অনীহায়…
 
আমি  একটুকরো কাপড় হাতড়ে বেড়াই প্রতিরাতে-ঘুমের ভেতরে-একটা গিঁট-একটা স্মৃতি-একটা মুখ-অন্তত এই আগন্তুকের হাত থেকে পালানোর ছোটোখাটো সুড়ঙ্গ বা কিছু…?
 
একটা অসতর্ক ঝাঁপতাল জলের মধ্যে উড়নচণ্ডী বাজাচ্ছে। দুটো বেনোজল সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়লো ওপাড়ার বুড়ো মাস্তানের বাড়ি। নিয়ম করে কিনে ফেরা হাফ কিলো দুধে স্পষ্ট বসে তিনটি পেয়ারা পাতা। গায়ে রোদ্দুর সামলাতে যেটুকু এলোচুল বাতাস ভর করতে গেছিলো তাকে দেখে হেসে কুটিপাটি নিরীহ কাকটাও। তবে নিরীহ তো। কা কা করে ডেকে উঠছে না। বাজার এখন আস্ত একটা ভিজে বেড়াল হয়ে ঝিঙে পটল আর বেগুনের রসায়ন দেখছে। পথে নামার জো নেই। জো নেই সবকটার কান ধরে হিড়হিড় করে বাপি কাকুর ব্যাগে ঢুকিয়ে দেওয়ারও। এমতাবস্থায় যার বাড়ির সিঁড়ি প্রায় এক মাথা জল নিয়ে পরিত্রাহি ডেকেই চলেছে ‘ওগো শুনছো!’ তার ঘরে চালভাজার কড়মড় শোনাতে না যাওয়াই ভালো!
 
 আস্ত একেকটা বিভ্রমের মেঘ দেখেছো নিশ্চয়ই? বৃষ্টির সময় এলেই যে জন প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে গুম হয়ে বসে থাকে। যেন কোনো হ্যারিকেনবাক্স। তাপ জমছে। জমছে। ভয় দেখাচ্ছে,কিন্তু ফাটল দেখায় না! আমিও তেমন উড়োভঙ্গিমা শিখছি। গাছের সিঁধ কেটে এমন ভাবে বসি যেন কতো জন্মের সংসারী পাখি।ঠিক প্রসবের আগে ছুঁড়ে ফেলি খড়কুটো। তোমরা যারা বিশেষ হবে বলে কখনো পোশাক বদলাও না, তাদের চোখের সামনে টকটকে লাল হয়ে ফুটে থাকি,যেন বা টোকায় দোল উৎসব এখনই রচনা করবে আস্ফালন। অথচ দ্যাখো,এই তো ছুঁলে,চুমুও খেলে-পেলে কোনো দিকভ্রান্তের স্বাদ? কেমন শুকনো কাপড় না?রোদ্দুরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক শতাব্দীর শুকনো কাপড়?
সারল্য আমায় মাছি হতে শেখায়। বারবার তাড়িয়ে দেওয়ার পরও ফিরে আসা পুঁজের বাসায়। আবেগ প্রস্রবণের ভঙ্গিমায় মাথা নিচু দু পা ইতস্তত ঘষে চলা। তারপর রক্ত-ঘাম-আঘাত শুষে ঠিক সময়মতো উড়ে যেতে হবে বুঝি।অথচ তুমি হঠাৎ একদিন ধূর্ত ডেকে ফেললে আমায়। পোশাক বদলাতে হয়। প্রজাপতি আমি তোমার মাথায়-বুকে-আসরে ঘুরে ঘুরে সামাজিক হই। তুমি জানালা দরজা খুলে রঙের আবাহন দ্যাখো। আমি দেখি একটা পাক্কা খচ্চর শুঁয়োপোকা কেমন সারা গায়ে ঘা তৈরি করতে করতে নিজেকে পরিপূর্ণ পটিয়সী করে তুলছে। আচ্ছা তুমি কি কখনো আমায় একটিবার সুযোগ-সন্ধানী বলে ডাকবে? আমি কথা দিচ্ছি,নিজেকে স্নানঘর ছাড়া আর কোথাও লুকিয়ে রাখব না।