পিউ মহাপাত্র-র গল্প

Spread This
পিউ মহাপাত্র

পিউ মহাপাত্র

কথা ও কাহিনী

উঁচু উঁচু ঢিবি গুলোর কোন কোনটার এক প্রান্তে সাদা সিমেন্টের ফলক গাঁথা। বড় রাস্তার ধারে খানিক পরে পরেই যেমন শিলনোড়ার মত সাদা পাথরের উপর লেখা থাকে , ‘বাজপুর: ২০ কিমি’,  ঠিক তেমনটাই এই ফলকেও মালিকের নাম সাল সব ক্ষুদে ক্ষুদে হরফে লেখা।  তবে বেশির ভাগ ঢিবি বেনামি। খোলা আকাশের নিচে রাতভর বৃষ্টিতে শুকায় আর রোদে ভেজে।
কাদেখ মিয়া (কদা)
জন্ম: ১৯৭৮
মৃত্যু: ১৯৮৫
হিসেব করে নিয়ে বোঝে বড়ি যে ছোটখাটো মানুষ কিনা কদা তাই ওর ঢিবিও কোলবালিশের চেয়ে খানিকটাই বড়। খুব জানতে ইচ্ছে করে ওর, যে মাটির নিচে কাদেখ ঠিক কোনদিকে সিঁথি কেটে শুয়ে।গুলতির টিপ ঠিক কেমন ছিল ব্যাটার। এখন খালি পায়ে নাকি চটি পরে শুয়ে। আর এমন হতোকুৎসিত ডাক নামটা কেইবা রাখলে ওর?
 দুপুরে খেতে বসে মাকে এসব জিজ্ঞাসা করতেই, বেমালুম আশান্তি। মেয়েমানুষদের সব কথা কইতে নেই, সাধে কি আর নরেন জ্যাঠা বলেন! বড়ির প্রশ্ন শুনেই, সরু চুড়ি পরা মায়ের হাত ভাতের গরাস নিয়ে থমকে থেমে যায়। অবাক বিস্ময়ের ছায়াটা মুখ থেকে সরে যেতেই, ঘোর অন্ধকার গলায় শুনানি, ‘দুপুরে দোরে ছিটকিনি দিয়ে ছাদের ঘরে রেখে আসব। ভর দুপুরে গেরস্থানে গ্যালে পিঠে চেলাকাঠ!!’ এই বলে ভাতের পিণ্ডটা বড়ির মুখে গুঁজে দিয়ে থালা তুলে রান্নাঘরের দিকে মা চলে যান হনহন করে।
 দেশে আসলে মাথায় ঘোমটা দেন মা। সন্ধ্যেতে কাঠির আগায় তুলো লেপ্টে লাল টুকটুকে আলতার সরু টান দেন পায়ের গোছে। আঙ্গুল ছুঁয়ে গোল হয়ে ঘুরে লাল টিপ পায়ের পাতার বুকে এসে থামে। বড় ইচ্ছে জাগে বড়ির মনে। ছোট ছোট দুটো পা ফড়ফড় করে এগিয়ে দেয় ওমনি। মা ওর পায়ের বুকে দুটো কুসুম কুসুম গোল টিপ এঁকে দিয়ে মুচকি হেসে বলেন, ‘খুব শখ না?  শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় এ মেয়ে ড্যাংড্যাং করে ছুটবেন।‘  কুপির আলোয় মায়ের মুখটা কী মিঠা লাগে। সেই মুখ আর কিনা এই মুখ। কী বিষ! কী বিষ!
ভাতের শুখা ডেলাটা কোনমতে গিলে দাওয়ার কোনায় রাখা বালতির জলে মগ ডুবিয়ে আনমনে মুখে ঠোঁটে জল বোলাতে বোলাতে বড়ি দেখে কাঁসার বালতির গায়ে খোদাই করা, ‘পারুল বালা, ১৯৬৯’
মুখ ধোয়া বালতির গায়ে নাম খোদাই করার এমন বিটকেল শখ কেনই বা জাগলো তা বাপু পারুলের বাপ মা জানেন। তবে সারা বাড়ি হন্যে হয়ে খুঁজেও পারুলের একখানা ছবি পর্যন্ত পায় না বড়ি। নির্ঘাত কেলে, দাঁত উঁচু, দজ্জাল মেয়ে। বড়ির মতই তিলের নাড়ুটা, নারকেলি বিস্কুট সরাত বেটি ভরদুপুরে। জেঠির কাছ ঘেঁষে ওর কথা জানতে চাইলে বড়ি দেখেছে, জেঠি কিনা জেঠি, যিনি বড়ির সাত দুগুণে চোদ্দ খুন মাপ করেন, তিনি পর্যন্ত ভারি গলায় বলতেন, ‘আজ সন্ধ্যেতে দুলুদার কাছে অঙ্ক কষতে বসা হবে না বুঝি?’
হরি! হরি! কিসের কী উত্তর। এর পর সুড়সুড় করে সরে আসাই মঙ্গল।
বড়ি ঠাহর করে দেখেছে, নানা বিটকেল জায়গাতে চেনা , অচেনা মানুষের নাম লেখা। সঙ্গে আবার ঠিকুজি কুষ্ঠি।  এইতো, বুড়ো শিবমন্দিরের থানে, শিউলি মঞ্চের নিচের বেদিতে ঘটা করে লেখা,
নিত্যানন্দ চাটুজ্যে
১৯৪৩-১৯৭১
ওতে আবার ঘেয়ো প্রায় দুপুরই কুণ্ডলী পাকিয়ে রোদ পোহাতে পোহাতে ঝিমোয় । নিত্যানন্দর ছায়া ওপরে শিউলি গাছের ডালে বসে তা দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হতেই পারেন, তবে এমন মিঠা রোদ মাখা বেদিতে শীতের দুপুরে ঘেয়ো ইয়ে করে ফেললেও বাপু তাকে দোষ দেওয়া যায় না।
নানা আজব জিনিসে লোকে নাম লিখে রাখে ঘটা করে। এই যেমন ছোট ভাইয়ের ঝিনুকে খুদে খুদে ছেঁদা করে খোদাই করা, ‘প্রেম’। আবার দাদুর বিয়েতে পাওয়া কাঁসার মুড়ি খাওয়ার জামবাটিতে  খচিত, ‘অমর নাথ”। এই এতে ওতে এমন ‘অমর’ ‘প্রেম’ খোদাই বড়ই ধন্ধ জাগায় মনে। বাবার রুমালের কোনায় ছোট পিসি কী যত্ন করে সুতোর টানে লেখেন, ‘দাদাকে’। নীল সুতোর লেখার ওপর আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে বড়ি ভাবে, ঘাম মোছার সময় বাবার খেয়াল থাকে তো যে  ‘দাদাকে’ যেন ভিজে না যায়।
‘আমার জন্যে বেদি টেদি কোরো না বাপু। বলা যায় না, খেয়াল রইল না, দেবযানী না লিখে বড়ি লিখে রাখলে!’
এসব মনের দুর্ভাবনা কেবল বাবাকেই বলা যায়। বাবা প্রথমে না বুঝে, পরে বুঝে হাসেন।
‘তা দেবযানীর বেদিতে কী হবে শুনি?’
বাবার এহেন উৎসাহে ছোট মানুষটির মনে আশা জাগে কিঞ্চিত। ভরসা পেয়ে গুছিয়ে কোল ঘেঁষে একে একে পেশ করে বড়ি,
‘ দোপাটিই ভাল? তাই না বাবা? তুলসী লাগিয়ে কী হবে? কেমন নরম লাল গোলাপি ফুল বেদি জুড়ে!’
‘হ্যাঁ মা। সে বড়ই মনোরম।‘
‘ফলকটা একটু বড় হোক কেমন? ওতে তুমি বরং দুকলম লিখে দিও বাবা, ভালো ভালো কিছু। পড়লেই যেন চোখ ফেটে জল আসে’
‘বেশ! বেশ!’
‘আর যাদের যাদের আমার খুব ভাল লাগে তাদের সবার নাম।‘
‘তাতে কি আমার নামও থাকবে মা?’
মায়া লাগে বড়ির এ কথায়। এক হাতে গলা জড়িয়ে, অন্য হাতে বাবার চুল ঠিক করে দিতে দিতে আশ্বাস দেয়,
‘হ্যাঁ তো বাবা! তোমার নাম তো সব্বার আগে !”
‘তা বেদি হতে তো বেশ দেরি, ততদিনে বরং…’
কথা শেষ না করে, সামনে ‘কথা ও কাহিনী’ বইটার প্রথম পাতায় পেনের আঁচড় কেটে যত্ন করে লেখেন বাবা,
স্নেহের দেবযানীকে,
দীপ হয়ে জ্বলো।
শতায়ু কামনা করে,
বাবা
১৯৭৯