অনির্বাণ বসু-র গল্প

Spread This
অনির্বাণ বসু

অনির্বাণ বসু

নিষাদের মন মায়ামৃগে মজে নেই

মোড়ের মাথায় চা-কচুরির যে-দোকানটা আপাতত বন্ধ, তার সামনের বেঞ্চিতে একটা পাতলা ছেঁড়াখোঁড়া চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে যে-লোকটা, ওকে যারা চেনে, তারা বিলক্ষণ জানে, ও আসলে পাগল। নিজের মনে চুপচাপ থাকে যেহেতু, তাই সচরাচর পাগল বলে ঠাহর হয় না। মুখ খুললে বা খিদে পেলে বোঝা যায়, পুরো মাথাটাই পাগলামিতে ভরা। ওই দোকান থেকে শালপাতায় মোড়া দুটো করে কচুরি আর এক ভাঁড় চা বরাদ্দ থাকে ওর জন্য। ওর সেই কচুরি খাওয়া দেখলে নতুন করে আর-কেউ ওই দোকানের খরিদ্দার হবে না : দাঁত দিয়ে এমনভাবে কচুরি ছেঁড়ে ও, দেখে মনে হবে ও-কচুরি দিন চার-পাঁচেকের পুরোনো—চামড়া হয়ে গেছে একেবারে।
     রাতে পাগলটা দোকানের সামনে-রাখা বেঞ্চটায় শুয়ে পড়ে গুটিসুটি।  দোকান বন্ধ হলে চারপেয়ে দোকানের কোনও-একটা পায়ায় শিকলে তালা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় বেঞ্চের কোনও-এক পা : পাগলটার বয়স যখন কম ছিল, স্বপ্ন ছিল অফুরান, যখন পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল গভীর এক রাতে আর একাদিক্রমে রুল ঢুকিয়ে দিয়েছিল পিছন দিয়ে, অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সে, এবং, ফলত, তাকে দিন কয়েক থাকতে হয়েছিল সরকারি হাসপাতালে, তখন তার পা, জেনারেল ওয়ার্ডে, এভাবেই বাঁধা থাকত বিছানার লোহার ঘেরের সঙ্গে—শিকল দিয়ে। বন্ধ দোকানের অমন ব্যবস্থা তাকে পুরোনো দিন মনে করায়। সে শুয়ে পড়ে বেঞ্চিতে, ভাবে, সময়ে-সময়ে সাদা পোশাকের মহিলারা এসে তার দেখভাল করে যায়—সাদা পোশাক মানে শুধুই কপু নয়, চোখরাঙানি নয়, কথার আগেই চাবকানো নয়। দোকানের ওই বেঞ্চি তাকে নিশ্চিন্ত ঘুম এনে দেয়।
     ঘটনাটা যখন ঘটে, পাগলটা এদিক-ওদিক ঘুরে সবে শুয়েছে তখন। আকাশে চাঁদের দেখা নেই। অমাবস্যা তিথির ঘনঘোর অন্ধকার মাথার উপর। দূরে স্ট্রিটলাইটের আলোও কেমন যেন অনুজ্জ্বল, বাতাসে ধুলোর কারণে ঝাপসা, হলুদ। সেই আলো ঘিরে উড়ন্ত কীটের খেলা। লাগোয়া দেওয়াল জুড়ে পেচ্ছাপের ঝাঁঝালো উগ্র কটু গন্ধ।
     ঘটনাটা তখন ঘটে, যখন রাত্রির গাঢ় অন্ধকার চিরে হন্তদন্ত হয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছিল মেয়েটা। আকাশে চাঁদের দেখা নেই। অমাবস্যা তিথির ঘনঘোর অন্ধকার মাথার উপর। দূরে স্ট্রিটলাইটের আলোও কেমন যেন অনুজ্জ্বল, বাতাসে ধুলোর কারণে ঝাপসা, হলুদ। সেই আলো ঘিরে উড়ন্ত কীটের খেলা। লাগোয়া দেওয়াল জুড়ে পেচ্ছাপের ঝাঁঝালো উগ্র কটু গন্ধ।
     প্রাণ হাতে করে ছুটে এসেছিল মেয়েটি। পাগলটা তখন চাদর মুড়ি দিয়ে, জড়োসড়ো, ঘুমোচ্ছিল। পাগল আর মাতাল—যদি একবার ঘুমিয়ে পড়ে, সহজে সে-ঘুম ভাঙার নয়। পাগলটার অবস্থাও তথৈবচ : বেশ খানিক আগেই ঘুম এসেছে তার, কিন্তু সেসব যেহেতু এই আতঙ্কিত মেয়েটির পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না, ফলে সে প্রথমে বেশ কয়েকবার দূরত্ব রেখে ‘দাদা-দাদা, ও দাদা, শুনছেন’ বললেও সাড়া না-পেয়ে শেষমেশ কাঁধে-পিঠে হাত দিয়ে ঠেলতে থাকে। এক-একটা মুহূর্ত মেয়েটির কাছে মনে হতে থাকে, অনন্ত সময়। গলার উৎকণ্ঠা ক্রমে আর্তনাদের মতো শোনায়। নিজেরই হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানিকে সন্দেহ করতে থাকে সে, তার মনে হয়, ও-শব্দ হয়তো তাকে তাড়া করতে-থাকা লম্পটের পদধ্বনি। ভয় পেয়ে সে আরও জোরে ঠেলতে থাকে ঘুমন্ত লোকটাকে। বেশ কিছুক্ষণ নাগাড়ে ধাক্কানোর পর একটা সময় ঘাড় ঘোরে প্রথমে, তারপর চোখ দুটো—পুরো না-হলেও—খোলে। কোন পরিস্থিতিতে একজন ঘুমিয়ে-থাকা মানুষকে জাগাতে বাধ্য হয় কোনও মেয়ে, তা বোঝানোর একটা চেষ্টা করে সে, ফলে যেমনটা হয় : মেয়েটি যত কথা বলে উঠতে পারে, তারচেয়ে বেশি বাকরোধ হয়ে আসে তার, আর তখন সে হাঁপিয়ে ওঠে; একবার নাক দিয়ে, আর-একবার মুখ দিয়ে নিশ্বাস নিয়ে, বের করে কোনওমতে পুরোটা নিজের মতো করে শেষমেশ বলেও ফেলে।
     গায়ের চাদরখানা নিয়েই—বুঝে কিংবা না-বুঝে—একটা ব্যস্ততার ভাব এনে বেঞ্চি থেকে নেমে দাঁড়ায় পাগলটা। চোখ দুটো সরু করে যেন বুঝে নিতে চায় পরিস্থিতির গুরুত্ব। উলটোদিকে মেয়েটির আতঙ্কিত লম্ফঝম্প দেখে বেশি সময় নষ্ট করতে পারে না কিংবা চায় না সে। চটজলদি গা থেকে খুলে ফেলে চাদর। তখন তার শরীরে বলতে প্রায়-কালো হয়ে-যাওয়া স্যান্ডো গেঞ্জি একটা, যার ডান বগলের তলা ছিঁড়ে পেট অবধি এসে ঠেকেছে আর নোংরা থ্রি-কোয়ার্টার—হাঁটু পর্যন্ত—জিন্স। সে চাদরটা দু’হাতে তুলে ধরে মাথার পিছনে, তারপর চকিতে, এক ঝটকায় সেটাকে ঘুরিয়ে আনে সামনে; ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক দেখানোর সময় যেমন করে, সামনে এনে চাদরটাকে সেভাবেই দোলাতে থাকে পাগলটা। ফুটিফাটা চাদর দুলতে থাকে মেয়েটির সামনে। এদিকে মেয়েটি বুঝে উঠতে পারছে না, কী তার করণীয়—লোকটা যে পাগল, এতক্ষণে মালুম হয় তার।
     পাগলটার কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই, আপন খেয়ালে সে খেলে চলেছে চারপাশ নিয়ে : এই মুহূর্তে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের পক্ষে, মানুষের আরামের জন্য, সুস্থিতির জন্য, জগতের সকল ব্যস্ততার বিরুদ্ধে তার লড়াই।
     চাদরটা একই ছন্দে দোলাতে-দোলাতে ঘুরতে থাকে পাগলটা। ঘুরে চলে মেয়েটির চারপাশে। সে ঘুরে যায় আর মেয়েটির মাথাও, যতটা সম্ভব, পাল্লা দিয়ে ঘোরে। এইরকমভাবে সাত পাক। সাত পাক শেষ করে চাদরখানা সে তুলে ধরে মেয়েটির সামনে। বিড়বিড় করে নিজের মনে বলে চলে কী-সব। তারপর একটা সময় ম্যাজিশিয়ানের মতো ঝাপট মেরে চাদরখানা সরাতেই দেখা যায়, মেয়েটি উধাও।
     আমরা আবারও মেয়েটিকে দেখতে পাব নিশ্চিত, কিন্তু যতটা পথ এইটুকু সময়ে পেরিয়ে এল মেয়েটি, তাতে আর তাকে মেয়ে বলা যাবে না; এই মুহূর্ত থেকে আমরা তাকে নারী বলে অভিহিত করব।
     সুদৃশ্য গোলাপি আর বেগুনি রঙে ভরে আছে চারপাশ। যেদিকেই চোখ যায়, বড়ো-বড়ো গাছের সারি। প্রতিটি গাছই পাকা পীচ ফলে ভর্তি। সেই পীচগন্ধের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যায় নারীটি। যাত্রাপথ বুঝে নিতে চায় সে, কিন্তু যেহেতু খানিক পরে-পরেই বায়ুমণ্ডল কুয়াশার মতো বাষ্পভারাতুর, খুব-একটা কিছু ধরা পড়ে না তার চোখে। সে শুধু নির্ভার হেঁটে চলে। এখানে তাকে ভয় দেখানোর কেউ নেই, মন ফলত নিশ্চিন্ত। এখানে এসে থেকে এমন কাউকে সে দেখেনি, যার কারণে কিনা তার আব্রু নিয়ে টানাটানির উপক্রম হবে, চেতনা ফলত নিরাপদ। নারীটি অতএব বাগানে ঘোরে, প্রাণ ভরে গন্ধ নেয় নাম না-জানা কত ফুলের; তেষ্টা পেলে চলে আসে একপাশ ধরে বয়ে-চলা স্বচ্ছতোয়ার কাছে, আঁজলা ভরে তুলে নেয় জল।
     পীচ ফলে পেট ভরে গেলে, স্বচ্ছ-স্বাদু জল খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে খানিক জিরিয়ে নিতে মন চায় নারীটির। ফলত সে শুয়ে পড়ে নরম ঘাসের গালিচায়। কুলকুল শব্দে পাশ দিয়ে বয়ে যায় নদী। গাছে-গাছে নাম না-জানা পাখিদের কলতান—ঘুম এসে যায় তার।
     কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল, সে নিজে বুঝতে পারে না। ঘুম ভেঙে উঠতেই সে দেখে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষ। সেই পুরুষটির মাথার পিছনে জ্যোতির্বলয়ের আভাস। নারীটির মনে হয়, এই পুরুষ আর রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে তাকে ধাওয়া করা পুরুষেরা, উভয়ত, এক নয়। এই পুরুষটি তার ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগ নিতে পারত, কিন্তু সে বরং অপেক্ষা করেছে—এই ভেবেই উপস্থিত জ্যোতির্ময়কে ভালো লেগে গেল তার। সেই ভালোলাগা তাকে মুহূর্তে ভুলিয়ে দিল যে, তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তার সম্পূর্ণ অপরিচিত; কৌতূহলে সে জিজ্ঞাসা করে বসল তার পরিচয় : ‘তুমি কে?’
     স্মিত হাসি খেলে গেল পুরুষের মুখে-চোখে : ‘আমি ভগবান। এটা আমার রাজ্য—স্বর্গরাজ্য।’
     ‘স্বর্গরাজ্য! এটাই স্বর্গরাজ্য! আর আপনি, আপনি ভগবান! আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। আমায় আপনি ক্ষমা করুন।’ অর্ধশায়িত অবস্থাতেই প্রণাম করে বসে নারীটি।
     ভগবানের দুই হাত প্রণামের ভঙ্গিতে বুকের কাছে ওঠে : ‘হে নারী, তুমি জেনে তো কোনও ভুল করোনি। কেউ যদি জেনে-বুঝেও ভুল করে, তবে তাকে আর ভুল বলা যায় না—সেটি দোষ, সেটি অন্যায়। তুমি তো তা করোনি, তবে আবার ক্ষমা চাওয়া কেন?’ বহু সময়ের পর নারীস্পর্শের কারণে কিনা কে জানে, চোখের পাতা জুড়ে আসে তার।
     ঘাসের নরম থেকে মাথা তোলে নারী। করজোড়ে তাকায় ভগবানের দিকে। আকুতি-ভরা দৃষ্টি তার দু’ চোখে। ভগবান তার বাজু ধরে দাঁড় করায়। ভগবানের সামনে দাঁড়িয়ে, লজ্জাবনত, অধোমুখী—ভগবানের চোখের দিকে তাকাতে না-পেরে—খেলা করে নিজস্ব লীলাকমলের পাতাদলের সঙ্গে। তার মনে ভয় এবং ভালোলাগা, যুগপৎ, কাজ করে। একবার মনে হয়, বিনা অনুমতিতে এই স্বর্গরাজ্যে আসার কারণে এবার হয়তো ভগবান তাকে শাস্তি দেবে; পরক্ষণেই মনে হয়, যে-ভগবান এত মোলায়েম স্বরে কথা বলে, অপাপবিদ্ধ হাতে তুলে ধরে তার মতো নগণ্য একজনকে, তার পক্ষে ভালো ব্যতীত মন্দ করা সম্ভব নয় কখনও। কোনওমতে সে, ব্রীড়াবনত, সসম্ভ্রমে ভগবানের দিকে চায়। ভগবানের মুখে স্মিতহাস্য—দেখতে পায়। নারীটি এই প্রথম কোনও পুরুষের মুখের অভিব্যক্তিতে মায়া দেখে, স্নেহ দেখে, করুণা দেখে। এই মুখে কামনার লেশমাত্র ধরা পড়ে না তার দৃষ্টিতে। সে ভগবানকে তার ভালোলাগার কথাটুকু বলতে যায়, কিন্তু সংবরণ করে নিজেকে : প্রথম পরিচয়েই এমন প্রগলভতা সাধারণত কারও কাছেই ভালো ঠেকে না। ভগবান তার দিকে পিছন ঘোরে, চলে যেতে থাকে এবং আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর তাকে পিছনে রেখেই বলে : ‘আমার এই সুরম্য রাজ্যে গাছে-গাছে ফলই বলো আর ফুলই বলো, কখনও ফুরোয় না। তোমার খুশিমতো যে-কোনও ফল, যত ইচ্ছা, খেতে পারো। ভয়ের কিছু নেই। যদি মনে করো মধু খাবে, এখানকার প্রতিটি ফুলেই তোমার অধিকার, তুমি নিশ্চিন্তে মধু খেতে পারো। তেষ্টা পেলে নদীর বিশুদ্ধ জল তো আছেই। শুধু একটা কথা, ওই ওইদিকে যে ধূসর মেঘের দল ভিড় করে আছে, ওইদিকে কখনও যেয়ো না।’ নারী মাথা ঝুঁকিয়ে, হাত জোড় করে শোনে সবটা। ভগবানের শেষ কথাগুলো অনেকটা সাবধানবাণীর মতোই শোনায়।
     এই পর্যন্ত বলে ভগবান অদৃশ্য হয়ে যায়।
     স্বর্গরাজ্যে অন্ধকার হয় না কখনও। এখানকার আকাশ আলোয় ভরা। অঢেল সম্পদ ছড়িয়ে চারপাশে। শুধু প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে জানলেই হল। দুশ্চিন্তার কোনও অবকাশ নেই৷ এই স্বর্গরাজ্যে রাগ নেই, ঈর্ষা নেই, হানাহানি নেই, কথায়-কথায় রক্তপাত নেই—কারণ, ওই নারীটি বাদে এখানে আর-কোনও মানুষ নেই—বিত্ত না-থাকায় কাড়াকাড়িও, ফলত, নেই। নারীটিও মনোমতো ফল, ফুলের মধু এবং প্রয়োজনের সময় টলটলে জল খেয়ে কাটিয়ে দিল আরও কিছুকাল।
     স্বর্গরাজ্যে এইভাবেই দিনাতিপাত হয় নারীটির। মাঝে-মধ্যে ভগবান আসে। গল্পগুজব হয় দু’জনের। যদিও সেইসব সাক্ষাৎ ভগবানের মর্জিমাফিকই হয়ে থাকে। নারীটির যদি-বা ভগবানকে দেখার সাধ হয়, ইচ্ছা হয় দুটো কথা বলার─যদি-না তখন ভগবানের ইচ্ছা হয়─সংযোগ ঘটে না। তবু এই স্বর্গরাজ্যে সে, বলতে গেলে, সুখেই দিন কাটাচ্ছিল। নিঃসঙ্গতায় মানুষের লজ্জাবোধ আসে না, আর খাবারেরও কোনও কমতি নেই তার চারপাশে। এসব সত্ত্বেও শুধুমাত্র মানুষ হওয়ার কারণেই তার মনে কৌতূহল দুর্দম। সেই কৌতূহলের বশে সে ভগবানকে সম্পূর্ণ জানতে চায়, দেখতে চায় এবং যেহেতু চাইলেই ভগবানের দেখা মেলে না, অধিকাংশ সময় সে আড়ালে রাখে নিজেকে, তাই নারীটির কৌতূহলের মাত্রাও বাড়তে থাকে। কৌতূহল বেড়ে চলে, নিরসন হয় না।
     ভগবানকে নিয়ে যত কৌতূহল নারীটির, ততটা না-হলেও ধূসর মেঘের দল ঢেকে রাখে যেই দিক─সেই অগম্য স্থান ঘিরেও সে যথেষ্ট কৌতূহলী। ভগবানের বারণ থাকার কারণেই কিনা কে জানে, ভগবানকে ওই নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসাও অথচ করতে পারেনি; ভগবানকে ভালোবাসে সে : ভালোবাসার মানুষ যে-বিষয়ে নীরব থাকে, তা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা অনেক সময় তাকে আহত করে। নারীটি তার সামান্য বোঝাপড়ায় এটুকু অন্তত জানে যে, প্রিয়জনকে, জ্ঞানত, আঘাত করতে নেই; যদি-বা অপর পক্ষ থেকে কিঞ্চিৎ আঘাতও আসে কখনও, তবু তা ফিরিয়ে দিতে নেই। প্রত্যাঘাতে প্রতিশোধ থাকে, প্রেম থাকে না।
     ধূসর মেঘের দল─প্রাথমিকভাবে রঙের কারণে─বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে যে-জায়গাখানা, সেই দিক থেকে কখনও-সখনও ভেসে আসে মাংস পোড়ার গন্ধ। নারীটি যখন মেয়ে ছিল, মাংস কেন, কোনও পোড়াগন্ধই সহ্য হত না তার। তার নাক জ্বলত, সমস্যা হত নিশ্বাসে, গা গুলিয়ে উঠে আসতে চাইত পাকস্থলীর টকজল। একদিন যে-দুর্গন্ধ থেকে দূরে পালাতে চাইত সে, আজ সেই গন্ধই তাকে মনমরা করে দেয় : মায়ের হাতের রান্না করা মাংসের কথা মনে পড়ে, মাংসের ঝোলে হিমশৈলের মতো ডুবে-থাকা আলুর স্বাদ, তুলতুলে চর্বির কচকচ মনে পড়ে। পোড়াগন্ধ ছাপিয়ে পেঁয়াজ-আদা-রসুনবাটার গন্ধ, গরমমশলার গন্ধ বড়ো হয়ে ওঠে। পরমুহূর্তেই তার মা-বাবার জন্য, বাড়ির জন্য মনকেমন করে ওঠে। যদিও যেইমাত্র তার মনে পড়ে যায় মায়ের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি, ঝগড়া, চড়চাপড়─বীতরাগ ঘিরে ধরে তাকে আর তখন সে মনে করবার চেষ্টা করে ভগবানের মুখ। অত্যধিক ভালোবাসার ফলে খুব-একটা চেষ্টা করতে হয় না তাকে, ভগবানের শান্ত মুখশ্রী তার দৃষ্টিতে ভেসে উঠলে মনখারাপের সঙ্গে মাংসের গন্ধ আর তজ্জনিত কৌতূহল পলকে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
     ভগবানও এমনই─আসে, আবার চলেও যায়। নারীটিও, নির্বান্ধব, একলা থাকে। তার এই আপাত একাকী অথচ দিব্য বেঁচে-থাকাটির ফাঁকে-ফোকরে ঘাপটি মেরে তবু থেকে যায় দুর্নিবার কৌতূহল।
     সে যথাপূর্বক ফল খায়, ফুলের মধু খায়, ঝরে-যাওয়া ফুলের গন্ধ মেখে নেয় গায়ে, কাচের মতো স্বচ্ছ-স্বাদু জল খায় নদী থেকে, নরম ঘাসের গালিচায় বিশ্রাম নেয়, সময় হলে ঘুমিয়েও পড়ে; আর অবসরে─যখন ভগবান আসে না─রঙিন প্রজাপতিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নেচে যায়; দু’ হাত দু’ পাশে ছড়িয়ে দিয়ে পতঙ্গের কায়দায় উড়তে চেষ্টা করে। স্নান কিংবা গা ধোওয়ার জন্য নদী নয়, সে বেছে নিয়েছে জলপ্রপাত। পাহাড় থেকে নেমে-আসা সেই জলপ্রপাতের অন্য দিকে যে একটি গুহা আছে─জলগুহা পর্বত─তা যদিও তার অজানা। একদিন এমনই এক স্নানের সময়, একান্ত নগ্নতার সময় আচমকাই সে ভেসে যায় প্রপাতের জলে। তারপর জলের অন্তর্গত ঘূর্ণিতে পাক খেয়ে যখন তলিয়েই যাচ্ছিল প্রায়, কোথা থেকে যেন ভগবান এসে উদ্ধার করে তাকে : এইরূপে ভগবানের প্রতি তার প্রেম আরও গাঢ় হল।
     ধূসর মেঘে ঘেরা জায়গাটা নিয়ে আগে থেকেই একটা কৌতূহল ছিল নারীটির, তাকে উদ্ধার করে ভগবান অন্তর্হিত হলে এবার তার কৌতূহলের তালিকায় যুক্ত হল এই জলগুহা পর্বত। যদিও এই দুর্ঘটনার পর থেকে রোজ স্নানের সময়টা সে বেশ সাবধানেই এসে দাঁড়ায় জলপ্রপাতের নিচে। যেখান থেকে একবার আঘাত পায় মানুষ, সাধারণত তার সম্পর্কে একটা সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে। এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটে না। যতদিন-না পা পিছলেছে তার, স্বর্গরাজ্য সম্বন্ধে কোনও ভয়ের ব্যাপারই ছিল না; এখন স্নানের ওইটুকু সময় বাদ দিলে সে ভয়ডরহীন, নিরাপত্তা নিশ্চিত বলে মোটের উপর আশ্বস্ত।
     ক্রমে একসময় ফল আর মধুতে অরুচি জন্মায় নারীটির। সেই এক খাবার খেতে ভালো লাগে না আর। অনিচ্ছার সঙ্গে পাকা ফলে কামড় দেয় আর এদিকে মন পড়ে থাকে ওইদিকে─ধূসর মেঘের দল সর্বদা ঘিরে রাখে যেইদিক। তার যেতে ইচ্ছা করে সেদিকে, কিন্তু ভগবানের নিষেধ মনে পড়ে যায় আর কোনওমতে সে আটকায় নিজেকে : ভয়ে নয়, ভগবানকে ভালোবাসে সে; ভালোবেসেই সে ভগবানের অনুজ্ঞা মেনে চলে অক্ষরে-অক্ষরে। ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিতে চায় না নারী; যাকে কষ্ট দিতে চায় না, তার এই সামান্য উপরোধটুকু রাখতে পারবে না সে? মনে জোর আনে, মন স্থির করে : নিশ্চয় পারবে, অবশ্যই পারবে। তার নমুনাস্বরূপই হয়তো-বা, সে দ্রুত শেষ করে হাতের ফলটি, তারপর জল খেয়ে শরীর ছেড়ে দেয় নরম ঘাসে।
     সেই প্রগাঢ় ঘুমের মধ্যে, সেই নিরবচ্ছিন্ন আরামের মধ্যে কখন যে তার কান গলে ঢুকে পড়ে অতিক্ষুদ্র এক পোকা, ঘুমঘোরে বুঝে উঠতে পারে না সে। যদিও তার সুষুপ্তি─চেতনাচেতনে─ধীর লয়ে হলেও, কেটে যেতে শুরু করে এরপর। অতঃপর তার মস্তিষ্কে জন্ম নেয় সুখাসুখ। সুপ্তির সেই দশায় স্বপ্ন আসে তার মধ্যে : মাংস রন্ধনকালীন ঘ্রাণের দিকে ছুটে চলে সে। বহুদিনের অনভ্যস্ত স্বাদকোরক যে-কোনওরকম মাংস চেখে দেখতে চায় শুধু। সে পায়ে-পায়ে পৌঁছে যায় ধূসর মেঘেদের কাছে। মেঘমালা পার করে সে ঢুকে পড়ে এক নতুন জগতে। তার চারপাশ জুড়ে তখন রামধনুর রংবাহার। মাংসের সুবাস আরও প্রখর তখন। তার চোখে পড়ে বিভিন্ন আকারের নানান পাত্র, যেগুলির সামনে গেলে সে দেখে, প্রতিটি পাত্রই ভরা আছে মাংসের রকমারি পদে। নারীটি তখন এক-একটি পাত্রের কাছে যায় এবং চেখে দেখতে থাকে সব ক’টি আয়োজন। প্রতিবার এঁটো আঙুল জিভ দিয়ে চেটে নিতে-নিতে উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে থাকে তার মন, মুখ। মাংস-ভর্তি রৌপ্যপাত্রগুলোর উপর বিভিন্ন প্রাণীর ছবি─কোথাও আটকানো নয়, শূন্যে ভাসমান : হাঁস মুরগি ঘুঘু কোকিল পায়রা হরিণ ছাগল গোরু শুয়োর ভেড়া কুকুর উট কচ্ছপ সোনাব্যাঙ। একে-একে সব ক’টি মাংসই─অল্প-অল্প করে─সে গলাধঃকরণ করে আর চাপা ঢেকুর তুলে খানিক হাঁটাহাঁটির পর শুয়ে পড়ে। ভরপেটে প্রশান্ত ঘুম।
     স্বপ্নের মধ্যে সে ঘুমিয়ে পড়লে নরম ঘাসের বিছানায় ধীরে-ধীরে ঘুম ভাঙে নারীটির।  ঘুম থেকে উঠে তার খিদে পায়। ফলত সে চলে আসে ফলের গাছগুলির কাছে। গাছের ডালে-ডালে ঝুলে আছে ফল সব; পাকা এবং পোকাহীন। সে ফলের দিকে হাত বাড়ায়, মনে হয়, ডালখানা যেন সরে-সরে চলে যাচ্ছে তার নাগালের বাইরে। বাতাসের বেগ বেড়ে যায় হঠাৎ। হাওয়ায়-হাওয়ায় ভেসে আসে আবারও সেই মাংসগন্ধ। যেহেতু নারীর মনে খানিক আগে-দেখা স্বপ্নের প্রক্ষেপ কিঞ্চিৎ হলেও ক্রিয়াশীল ছিল তখনও এবং যেহেতু গাছ তার গর্ভিণী ডাল নিয়ে দূরে সরে যাচ্ছিল, নয়তো কিছুতেই তার মনে পড়ত না ধূসর মেঘমালার অমোঘ কৌতূহল আর সেই মুহূর্তের জন্য অন্তত বিস্মৃত হত না ভগবানের সাবধানবাণী।
     ধূসর মেঘের ভিড় পেরোনোর সময় ভগবানের─তার একান্ত প্রিয়জনের─এই স্বর্গরাজ্যে তার একমাত্র সঙ্গীর─মুখ নারীর মনে পড়েছিল কিনা কে জানে, সে প্রবেশের ঠিক মুখটায় অবশ্য এদিক-ওদিক চেয়ে দেখেছিল, তাতে যদিও মুখরেখায় কোনও বদল ঘটেনি। তার এতদিনকার কৌতূহল আর সদ্য-দেখা-স্বপ্ন তাকে নিয়ে চলে; সে হেঁটে চলে সামনের দিকে, হাঁটতে হয় বলে নয়, কোথাও পৌঁছবে বলে। যতই এগোয়, স্বপ্নের সঙ্গে মিল পায় না কোনও। এখানে সবুজ নেই, যতদূর চোখ যায়, যতদূর গাছের সারি, শুধু হলুদ আর তামাটে─বিবর্ণ। তবু সে ফিরতে পারে না। কৌতূহলে এগিয়ে চলে আরও গহনে। দু’পাশে ছড়ানো বনবীথি─সাদা রঙের ফলে ভরপুর─রং হারিয়ে দাঁড়িয়ে। নারীটি আসলে মাংসের সন্ধান করছিল, ফলের প্রতি খুব-একটা আকর্ষণ তার আর নেই : স্বর্গরাজ্যে এসে থেকে বিস্তর ফল সে দেখেছে, খেয়েছেও। তবু তার মনে হয়, গাছটা নয়, গাছের ডালে ঝুলতে-থাকা সাদা ফলগুলো তাকে টানছে তাদের দিকে। সে এগিয়ে যায় গাছগুলোর দিকে আর তখনই বিকট চিৎকার করে উড়ে যায় কতকগুলি হাড়গিলে শকুন। ভয়ের সময়, একা মুহূর্তে মানুষের প্রিয়জনকে মনে পড়ে : শকুনেরা উড়ে গেলে তাই নারী মনে-মনে ভগবানের কথা মনে করে। মনে জোর পায়। সেই জোরটুকু সম্বল করে গাছের সামনে আসতেই সে দেখে, ফল কোথায়─ডাল জুড়ে ঝুলে আছে অসংখ্য নরকরোটি। নিখুঁত করোটি নয় সব, কোনওটার মাথার কাছ ফেটে আছে, কোনওটার-বা থুতনির কাছে ফাটল। ভগবান তার সহায় জানলেও এবার ভিতরে-ভিতরে ভয় চেপে ধরতে থাকে তাকে। রোমকূপে শিহরণ খেলে যায়।
     খুলিগাছের থেকে সরে এসে অন্যদিকে তাকায় নারী। ওদিকে ন্যাড়া গাছের জঙ্গল। পাতা নেই, ফুল নেই, ফলত ফল নেই; শুধু ডাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পত্রপুষ্পহীন হওয়ায় অভয় পায় সে। মানুষের মাথার খুলির মতো ভয়াবহ কিছু যে আর তাকে দেখতে হবে না─এটুকু বুঝে ফেলে সে এগিয়ে যায় ন্যাড়া গাছগুলোর দিকে।
     খানিক দূরে, উর্ধ্বাকাশে, গোল হয়ে চক্কর কাটছে শকুনের দল। তাদের ঠিক নিচে ধূমবর্ণ হালকা মেঘ তৈরি হয়ে আবারও হারিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে গাছের দিকে চায় নারী, দেখে, ছাই-সাদা রঙের ডাল─অপর্ণ─মেলে রেখেছে নিজেকে। সে ডালে হাত রাখলে নাকে পচা গন্ধ এসে লাগে। গন্ধটা কি এই গাছের থেকেই আসছে─এই ভেবে হাত-রাখা-ডালটির কাছে নাক নিয়ে আসতেই দেখে, সারিবদ্ধ পিঁপড়ের নৈমিত্তিক চলাচল সেই গাছের ডাল জুড়ে। পিঁপড়েদের যাতায়াতের পথ নজর করে সে : মরা ডালের ভিতরের ছোটো গর্তে সেঁধিয়ে যাচ্ছে একদল, বেরিয়ে আসছে অন্যদল। নারী তখন খুঁটিয়ে দেখতে চায় গর্তটি, দেখে বোঝে, গাছের ডালগুলি আসলে মৃত মানুষের হাড়। হাড়ের ভিতরের মজ্জার খোঁজ পেয়েছে পিঁপড়ের দল, তাদের খাবার সংগ্রহ চলছে অবিরাম।
     এবার তার ভয় করতে শুরু করে। এবার আর মনে পড়ে না ভগবানের কথা। সে, অতএব, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকে। পাখিদের কলকাকলি লক্ষ্য করে সে ছোটে এবার সম্পূর্ণ অন্যদিকে। যত এগোয়, পোড়া গন্ধ তত তীব্র হতে থাকে। এভাবে কিছুক্ষণ ছোটার পর সে দেখে, মাথার উপর ঘুরে চলেছে শকুনের দল : যাকে তার মনে হয়েছিল পাখিদের আনন্দ-আয়োজন, তা আসলে ছিল শকুনদের সম্মিলিত উল্লাস। অথচ সে এমন-কি পালাতেও পারে না, কারণ এখানকার পথ স্বর্গের মতো কুসুমাদপি কোমল নয়। যত্রতত্র চোরকাঁটার অবিন্যস্ত ফরমান। এতখানি যে সে ছুটে এসেছে অসাবধানে, ভয়ে, ফলত বোঝেনি, কাঁটার আঘাতে তার পায়ের পাতা রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। স্বভাবতই ফিরতে চাইলেও ফিরতে পারে না তখন। ভয়ে আর যন্ত্রণায় চোখ ছলছল করে ওঠে আর সেই ঝাপসা দৃষ্টি দেখে, সামনে মাংস ঝলসাচ্ছে আগুনে আর আগুনের ওই পারে সিংহাসনে বসে আছে ভগবান স্বয়ং।
     যেন হাতে চাঁদ পেল নারী। প্রলয়ের জলে ভেসে যেতে-যেতে একটা ছোটো কুটো পেলে যেভাবে আঁকড়ে ধরে বিপন্ন মানুষ, ঠিক সেভাবেই একছুটে ভগবানের পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়ল সে। ভগবানের মুখ নিচু হয়ে বুকের কাছে ঠেকেছে প্রায়, হাত দুটো তুলে ধরা সেইখানে। হাঁফাতে-হাঁফাতে সে কোনওমতে বলে : ‘ভগবান!’
     ভগবান মুখ তুললে দেখা যায়, তার হাতে কাঁচা মাংস, যার কিছুটা খাওয়া হয়ে গেছে এরই মধ্যে, হাড়ের আদল থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওটি আসলে কোনও মানুষের পাঁজরের অংশ। ভগবানের দাঁতে রক্তের ছিটে, ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে নামছে রক্ত─টাটকা রক্ত। নারী অনন্যোপায়, ভগবানকে দীর্ঘ সময় ধরে সে জেনে এসেছে আর্তের শরণাগতি; হঠাৎ করে তার পক্ষে এমন কাউকে খারাপ ভাবাটা সম্ভব নয়, ফলত সে আকুল হয়ে শুধু চেয়ে থাকে ভগবানের দিকে। ভগবান একমনে তৃপ্তির সঙ্গে মাংস খেয়ে চলে।
     মাংস খাওয়া শেষ করে হাত চেটে লেগে-থাকা রক্তের অবশেষটুকুও মুছে নেয় ভগবান, তারপর উদাসীনতার সঙ্গে বলে : ‘আমি শয়তান। এর আগে তুমি আমায় যেখানে দেখেছ, সেই অংশে আমি ভগবান, এই অংশে আমিই শয়তান।’ চোখ-মুখ ক্রূর হয়ে আসে তার।
     ‘ভগবান─!’ গলা ঠেলে আর্তি উঠে আসে নারীর।
     ‘ভগবান নই, ভগবান নই─আমি শয়তান। ফের যদি ভগবানের নাম করেছ, তোমাকে আমি জ্যান্ত গিলে নেব।’ হাতের মুঠি হাওয়ায় আছড়ায় শয়তান।
     ‘ভগ…না-না, শয়তান, শয়তান─এখানে গাছে-গাছে মানুষের খুলি আর হাড়। এসবের কী মানে? এখানে গাছে ফুল হয় না? ফল হয় না?’
     অতঃপর শয়তান চোখ বুজে বলতে শুরু করে :
     মমৈবেতে নিহতাঃ পূর্বমেব |
     নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্ ||
এই সৌরজগতে যা-কিছু খারাপ তা আমার এই অংশ। যে যৎসামান্য ভালো, আনন্দের উদ্ভাস, সৃষ্টি─সেসবই ওই অংশে, যেখান থেকে তুমি তোমার অপার কৌতূহলের কারণে এখানে এসেছ। তোমার মতো মানুষেরা আসলে সকলে প্রত্যেকে একা, তাই মানুষের মিলিত শিল্প তোমাদের নজরে আসে না। স্বর্গোদ্যানে থাকাকালীন সেখানকার পাহাড়, পাহাড়ের ভিতরের গুহাগুলো─লক্ষ করোনি তুমি। নিজেকে নিয়ে বিভোর যে-মানুষ, তার পক্ষে খেয়াল করা সম্ভবও নয়। যদি চোখ মেলে চাইতে পাহাড়ের গায়ে, গুহার ভিতর, দেখতে পেতে কত-কত চিত্রপট। মানুষের যে-জগৎ─নীল রঙের গ্রহ─সেখান থেকে নিয়ে আসা হয়েছে সেসব। এবং এসবও।
     বীমবেটকা অজন্তা ইলোরা ছবিমুরা স্টোনহেঞ্জ বৈশালী নাললেদি বোঙ্গা-উপত্যকা পারি-কমিউন─এমন আরও কত জায়গা ঢুঁড়ে নিয়ে আসা হয়েছে তাদের, অথচ তোমরা সেসব কিছুই দেখো না, কিছুই জানো না, কিন্তু ওইসবই তো তোমাদের গর্ব হতে পারত। বরং তোমরা যাকে নিজেদের অহমিকা ভাবো, সেইসব কিছুকে আমি সাজিয়ে রেখেছি এখানে, এই জায়গায়─যাকে আমি নরক বলি।
     এই নরকের মরাগাছগুলোয় যে-খুলি, যে-হাড় ছড়িয়ে রয়েছে─এইসবের কারণ তুমি, তোমরা। ওই মৃতশরীরদের কিছু আমি নিয়ে এসেছি অটোমান সাম্রাজ্য থেকে, কিউয়িং সাম্রাজ্য থেকে। কত এসেছে ইউক্রেন, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ সুদান, বাংলার দুর্ভিক্ষের শেষে। বাকিদের অধিকাংশই এসেছে পোল্যান্ড, কম্বোডিয়া, কাজাখাস্তান, ইন্দোনেশিয়া, রুয়ান্ডা, সার্বিয়া, পূর্ব পাকিস্তান, উত্তর চিন, বুরুন্ডি, লিবিয়া, বাম্বুতি, কঙ্গো, সোমালিয়া, গুয়াতেমালা, লাটভিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া, আলজিরিয়া, বসনিয়া, তাসমানিয়ার মতো জায়গা থেকে। এই হাড়গোড়ের স্তূপে মিলে-মিশে গেছে রেড ইন্ডিয়ান, ইহুদি, চেচেন, রোমানি, কুর্দ, রোহিঙ্গা, ইয়াজিদি, মোরিওরি─আরও কত কে।
     তোমরা মানুষেরা, শুধু লড়তে জানো, ভালোবাসতে জানো না। এই যে তুমি, তুমি কি ভুলে গেছ সেই অমারাত, তোমায় তাড়া করছিল তিন কামুক, তুমি সাহায্য চেয়েছিলে এক পাগলের কাছে? কীভাবে এসে পৌঁছালে স্বর্গরাজ্যে? কিংবা এই নরকে?
     তুমি মৃত। এখানে আসার আগেই তোমার মৃত্যু ঘটেছে। পাগলটি তার চাদর দিয়ে তোমার শ্বাস বন্ধ করে প্রথমে, তারপর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে আবার। সেই তিনজন এসে তোমায়, অচেতন, পড়ে থাকতে দেখে এবং প্রতিরোধহীন তোমার সেই শরীরকে একাদিক্রমে ভোগ করে।
     এই পর্যন্ত বলে শয়তান নারীটিকে তুলে শুইয়ে দেয় তার ঊরুদেশে। এবার শুরু হবে তার ভোজনপর্ব।