ইশরাত তানিয়া-র গল্প

Spread This
ইশরাত তানিয়া

ইশরাত তানিয়া

মড়ক কিংবা কালবাষ্প

সেই যে সময় মড়ক লেগেছিল, সে বছর হাওরের ধান পেকে মাটিতে ঝরে যায়। উথালপাথাল গন্ধ ছড়ায় পাকা ধানের মাঠ। জোর হাওয়ায় সেই গন্ধ ভেসে আসে। একটা সস্তা বিড়ির ধোঁয়ার সাথে মিশে যায়।
উত্তরের ক্ষেতমজুরদের কবেই দক্ষিণে পৌঁছে যাবার কথা ছিল। চোতমাসে কালবাষ্প ধেয়ে আসে সাত আসমান জুড়ে। আচানক দেশের সব পুরুষের মাথা ন্যাড়া হয়ে গেলে ওরা বুঝতে পারে না ঘর থেকে এখন কিভাবে বের হবে। পুবে-পশ্চিমে ধান কাটার কথা থাকলেও সেদিকে যাওয়ার কথা সবাই ভুলে যায়। সোনালি ধান বুকে নিয়ে গাছগুলো ভুঁই স্পর্শ করে। মাঠের হলুদ আভা আরও বাড়িয়ে দেয় গোলায় না ওঠা ঝরাধান। সকাল দুপুর বিকাল আর সন্ধ্যা সবই যেন একবেলা। সূর্য আছে কি না ঠাহর করা যায় না।
প্যাচপ্যাচে কাদা পায়ে জড়িয়ে হাঁটে দুই ভাই। ন্যাড়ামুণ্ডু সদরুল-বদরুল। তাদের সবল পেশিবহুল হাত-পা ক্রমশ দুর্বল। ক্ষুধার এমন অন্ধকারের সাথে ওদের পরিচয় ছিল না। চোখে মুখে অন্ধকার। সেই ঘুটঘুটে কালোতে দৃষ্টি ডুবে থাকে। সারাদিনই যেন চাঁদসূর্যহীন ঘোলা ঘোলা সন্ধ্যালাগা। চারপাশের ধূসরতার মধ্যে বোরো ধানের মাঠ সামান্য যা উজ্জ্বলতা ছড়ায়। নিমগাছের তলে বসে রহমতুল্লা লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বিড়ি বের করে। নজর বাঁশঝাড়ের বস্তার দিকে। আকিজ বিড়ির ধোঁয়ায় বিকালটা আরও ধূসর হয়ে সন্ধ্যার মতো ঘনিয়ে ওঠে। বাঁশঝাড় বাঁয়ে ফেলে ডানে গেলেই গোরস্থান। শিয়াল কুকুর পাছে বস্তায় মুখ দেয় তাই রাত থেকে নিমগাছের নিচে ঠায় বসা রহমতুল্লা। ডান পাশে কোদালের ধারালো ফলা মাটিতে দাঁত গেঁথে দাঁড়িয়ে। রাতে সে কয়েক মুঠ মুড়ি-বাতাসা খেয়েছিল। পেটে যাওয়ার আগেই মুড়ি মুখে মিশে গেছে।
সকাল হতে না হতে রহমতুল্লার পেট থেকে কষাটে স্বাদ উঠে এসে মুখের ভিতর জ্বলতে থাকে। দুই ভাইকে দেখে সে ডাক দেয়- কোনাই যাও সদরুল মিয়া?
হাঁটার গতি কমিয়ে দেয় সদরুল। রিলিফের কথা যাচাই করে নেয়ার জন্য পালটা জিজ্ঞেস করে- রিলিফের মাল আইছে নি?
– মাইনষে কয় আইসে, চেয়ারম্যান সাবে কয় আইয়ে ন। কিত্তাম কও?
রমতুল্লা ধারণা করে নেয় দুই ভাইয়ের গন্তব্য চেয়ারম্যানের বাড়ি। রিলিফের চাল এসেছে। হাওয়ায় এমন কথা প্রায়ই শোনা যায় কিন্তু কেউ কখনো চাল চোখে দেখে না। রহমতুল্লাকে পার হয়ে এগিয়ে যায় দুইভাই। উঁচু গলায় রহমতুল্লা জিজ্ঞেস করে- চাচীআম্মার শইল ভালা নি?
দুই ভাইয়ের চোখে ভয় আর অনিশ্চয়তার ছায়া দেখা যায়। কী বলে শোনা যায় না। কিছুটা শোনা গেলেও বোঝা যায় না। এই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের উত্তরে দূর থেকে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ানোটা দেখা যায়। দুই ভাইয়ের তাড়া আছে কিংবা মাকে নিয়ে কথা বলতে তাদের অনীহা। রহমতুল্লা বিচলিত বোধ করে। একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে আজরাইল ফেরেশতার শুলুক খোঁজে। আরেকবার তাকায় বাঁশঝাড়ের দিকে। পুব আর পশ্চিমের পর দক্ষিণের লোকদের মাথাও ন্যাড়া হয়ে যায়। দক্ষিণের লোক আর উত্তরমুখো হয় না। সেই কালবাষ্পই নাকি চুল উড়িয়ে নিয়ে গেছে রহমতুল্লার। হতেও পারে মড়কের প্রকোপে চুল ঝরে গেছে। এই দুই সম্ভাবনার মীমাংসা করতে করতে রহমতুল্লা বাঁ হাতে লুঙ্গির উপর দিয়ে বাঁ অণ্ডকোষ চুলকায় আর ডান হাতে ধরা শেষ বিড়িতে টান দেয়।
গতকাল গভীর রাতে নিদ ছুটে গেলে রহমতুল্লা পেটের তরল হালকা করে ঘরে ফিরছিল। নিশুতি কালে গাছের পাতা সামান্য কেঁপে উঠলেও শরশর আওয়াজ শোনা যায়। নিথর পুকুরে শোল মাছ ঘাই দিলে ছলাৎ ওঠে জলের ঘরে। তখন দূরের একটা বাতির ক্ষীণ জ্বলে ওঠা বা নিভে যাওয়াটাও চোখে পড়ে। দুজন মানুষ একটা বস্তা ধরে নিয়ে গিয়েছিল বাঁশবনের দিকে। কালবাষ্পের প্রকোপ বাড়লে হাওয়ার ফোঁসফোঁসানি বাড়ে। বাঁশঝাড় একবার নুয়ে পড়ে আবার খাড়া হয়। বোবা বাঁশপাতার মুখে শনশনিয়ে বোল ফোটে। ডানে গোরস্থান। আয়াতুল কুরসী পড়ে বুকে থুথু দিয়েছিল রহমতুল্লা। নিশ্চল অন্ধকার ঠেলে এগিয়ে গিয়েছিলো। আলোর জ্বলে ওঠা আর নিভে যাওয়ার দিকে। অ্যাঁই! ন্যাড়াড়ামুণ্ডু সদরুল-বদরুলকে দেখে তব্দা খায় রহমতুল্লা। বাঁশবনের গহীনে দুই ভাই লুকিয়ে রাখে চালের বস্তা। রিলিফের চুরির মাল। সেখান থেকে কয়েক মুঠো চাল চুরি করলে খোদা রহমতুল্লাকে গুনাহগার করবে না।
সদরুল-বদরুল সরে গেলে বস্তার দিকে এগিয়ে যায় রহমতুল্লা। বস্তার মুখ খুলে হাতের সামান্য অংশ ঢুকিয়ে উত্তাপ অনুভব করে। সে বছর চোতমাসেই কয়েকবার কালবৈশাখী দেখে ধারণা করে নেয় এই কালবাষ্প জমে জমেই গজবের আখড়া হয়েছে। পর পর তিনবার বাজ পড়ে এক জায়গায়। গ্রামের সব নারীপুরুষ এসব তেলেসমাতি দেখেশুনে তাজ্জব হয় কিন্তু কোনো কারণ খুঁজে পায় না। রহমতুল্লা বাঁশগাছের উঁচুনিচু শিকড়ের উপর থেকে বস্তা নামায়। কিছুটা সমতল জায়গা পায় ঘাসের উপর।
বিনা কারণে কত কিছুই হয়। এমনটাই ধরে নেয় সদরুল-বদরুল। প্রতিদিন বেইন্নাবেলায় বাজারে গিয়ে দোকান খোলে দুই ভাই। মুদী দোকানের সাথে লাগোয়া সামনের ফাঁকা জায়গায় চা বানিয়ে বিক্রি করে বদরুল। সদরুল দোকানের ভিতর বসে। বেচাবিক্রির কাজ করে। স্টোভ না জ্বালিয়ে ধূমল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে সদরুল-বদরুল। সদরুলের মনে হয় এক জায়গায় তিন বার বাজ পড়লে হয়তো দোকানের কলা পচে যায়। বনরুটি নষ্ট হয়ে যায়। বদরুলের মনে হয় কাস্টোমার আসে না তাই রুটির গায়ে স্যাঁতা পড়ে। কলার হলুদ বরন গায়ে কালো ছোপ লাগে।
ফাঁকা মহাসড়কের উপর দিয়ে শাঁই শাঁই করে দুই একটা বাস চলে যায়। রিকশায় মাইকিং চলে- সম্মানিত এলাকাবাসী, শান্তিপ্রিয় দেশবাসী, করুনা ভাইরাসের কোনো ওষুদ এই হইজ্জন্ত কেউ আবিষ্কার করতে পারে ন… সাবান দিই বেশি বেশি হাত ধুইতে হইব। নামাজ পড়ি আল্লার কাছে দোয়া করতি হইব। বিশেষ করি, বিদেশ থেকে যেইসব লোক আমাদের দেশে আইসবে অন্তত চোইদ্দ দিন হইজ্জন্ত হোম কোরেন্টিনে থাইকতে হইব। নিজের বিবি-বাইচ্চা কাউরে হাত দি ধরতি হাইত্ত ন। অবশ্যই চেয়ারম্যান সাবরে ফোনের মইদ্দে  জানাইবেন যে লোক আইসছে। কোনো চা’র দোকানো বেশি বেশি গফ মাইত্তে হাইত্তেন ন… সম্মানিত এলাকাবাসী, শান্তিপ্রিয় দেশবাসী…
করুনা রোগে ধরলে আর রক্ষা নাই। এ সত্য জেনে দুই ভাই শঙ্কিত হয়। নিজস্ব বিবেচনায় কোরিন্টিন ব্যাপারটার মানে দাঁড় করায়। তাদের কাছে সেটা একঘরে হওয়ারই নামান্তর। তাই মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক হয়ে ওঠে কোরেন্টিন শব্দটি। উদ্বেগ অনিশ্চয়তায় গলা শুকিয়ে আসে সদরুল-বদরুলের। লা-ইলাহা পড়ে মনে মনে। ধর্ম ও সমাজচ্যুত হয়ে বেঁচে থাকার অপমান মৃত্যুর সামিল। মসজিদে জুম্মার নামাজ না পড়া আর খোদার সাথে নাফরমানি করা একই কথা। পচাবাসি কলা-রুটি ফেলে দিয়ে দুই ভাই দোকান বন্ধ করে দেয়। বাড়ি ফিরে মাটির রাস্তায় গাদা গাদা ভেজা খড় পাতলা করে বিছিয়ে দেয়। মঙ্গলবারে তিনদিনের বৃষ্টি ধরেছে। সদরুল-বদরুল ভেজা ধান উঠানে পেতে দেয়। বৃষ্টিতে ভিজে ধান সব চুপচুপা। কড়া রোদ ওঠে না। ধানও শুকায় না। সদরুল আর শাহীনার ছেলে টুটুল টলমলে পায়ে হেঁটে এসে দুই হাতে খড় ঘাটে। অ্যাঁই! কড়া গলায় ডাক দেয় বদরুল- খ্যারে হাত দিস না, চুলকাইবো। সদরুল ছোঁ মেরে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়।
একগাদা ডালপালা মাথায় নিয়ে ওই পথেই হেঁটে আসে শাহীনা। মুখের প্রায় সবটুকু পাতার আড়ালে। কড়িয়ার ডাল শুকিয়ে লাকড়ি হবে। শাহীনার চোখে বিষাদের ছায়া গাঢ় ছাপ ফেলে বহুদূরে আসমানের অন্ধকারে রঙ লাগায়। সেই বিষাদের রঙ অবশ্য  ধূসর না। ভাতের পাতে লাল শাকের আভা হয়ে আসমানে মিশে যায়। সেই লালশাকে সরিষার তেলের মৃদু ঝাঁঝালো গন্ধ। শাহীনার শুকিয়ে আসা মুখের ভিতরটা আচানক পানিতে ভরে যায়। এক থালা সাদা ভাতের  স্বপ্ন সে দেখেছে গতকাল রাতে। সেই থেকে দানবীয় ক্ষুধা পেটের চামড়াসহ ভিতরে ঢুকে গেছে। আজদাহা সাপের মতো ক্ষুধা তাকে আগাগোড়া গিলে নিলে হয়তো বেঁচে যেতো শাহীনা। কেবলই মন চায় এদ্দিন ডুইল্লার হাগ দি ভাত খাইতো! শাশুড়ির জ্বরজারির মধ্যেও শাহীনার বেশরম ক্ষুধার থামাথামি নাই।
চৈত্রের ঘূর্ণি বাতাসে পাক খায় গ্রামের ঘরবাড়ি, গাছপালা, পুকুর ডোবা। আর মানুষের শুধু জ্বর বাড়ে। সকালে জ্বর গায়ে দুই সহোদর সদরুল-বদরুল হাঁচি দেয়। কাশতে কাশতে মাটির উনুনে আঁচ দেয় শাহীনা। সারাদিনে এই একবার। দিনের বাকিটা উপোস। আগুন চুলার উপর দাপিয়ে উঠলে শাহীনার ঘাম ঝরে। আবার কোনো কোনো দিন চুলা জ্বলে না। শাশুড়ি হোসনারা আগে মাজা টেনে টেনে হেঁটে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতে পারতো। চোখে কম দেখলেও আন্দাজ করে আলুর খোসা ছিলে ফেলতো অভ্যস্ত হাতে। শলার ঝাড়ুর বাড়িতে পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠত ঘর উঠান। দুই ছেলে আর নাতির জন্য হাঁসের ডিম তুলে রাখতো। আধপাকা আতাফল রেখে দিতো চালের ডুলিতে।
বাতের ব্যথা জানান দিলে ধরা কোমর নিয়ে এখন আর ঘরউঠান করতে পারে না হোসনারা। সারাদিন জমি-চর-বিল, ধান-সুপারীর বাগান, গরু-বাছুর, জ্বীন-পরী, দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, ছেলেদের জন্মানো এসব অফুরন্ত কথার মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে নেয়। জংধরা বাদামীরঙা টিনের কৌটা খুলতে খুলতে মওলানা আব্দুল্লার জ্বীনের মসজিদের কথা বলে। সেই কোন আমলে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় জেগে উঠেছিল এক চর। হোসনারা মুড়ির মোয়া কি বাতাসা দেয় টুটুলের হাতে আর বিড়বিড় করে- আধারিয়া রাইতে মওলানা আব্দুল্লাহর পালা জ্বীনেরা চরে মজ্জিদ বানানোর কাম কইরতো। মজ্জিদের তলে আছিলো ইবাদতখানা, আরো নীচে আছিলো হুস্কুনী। হুস্কুনীত জ্বীনেরা গোসল কইরতো, মসজিদে ন’জ হইরতো, আধারিয়া রাইতে জিকিরের বোল দূরেত্তন হুনা যাইতো। বলতে বলতে আপন মনে জিকির করে হোসনারা। আল্লাহু আল্লাহু…  প্রায় সব গল্পই জানা হয়ে গিয়েছিল শাহীনার। তিন দিনের ধুম জ্বরে হোসনারা এখন প্রায় বেহুঁশ। পেট ছেড়ে দেয়ার পর বিছানা গুয়ে মুতে একাকার। শাহীনা ক্লান্ত ক্ষুধার্ত শরীরে শাশুড়ির সেবা করে। শ্বাসটান উঠলে বুকে পিঠে কালিজিরার তেল মালিশ করে। জ্বর বাড়লে মাথায় জলপট্টি দেয়। ফজর আর মাগরিবের নামাজের পর দরুদে শিফা পড়ে। এই দরুদ শরীফ সকল রোগের মহৌষধ।
খড় বিছানো মাটির সরু রাস্তার উপর দিয়ে মাইকওয়ালা রিকশা চলে যায়… শব্দের উৎস দূরে সরে যায়  কিন্তু কানের গ্রাহ্যসীমায় ভাসতে থাকে… হোলামাইয়াগুনরে বাড়িত রাইকবেন। করুনা ভাইরাস একজনের তুন আরেকজন, আরেকজনের তুন আরেকজনরে ধরি ব্যাকেরে আক্রান্ত কইরব। মনে রাখিবেন বিশ্বব্যাপি হাজার হাজার লোক মারা যাইতেছে। এই হইজ্জন্ত হনেরজন ডাক্তারও মরি গেছে। আমরা সবাই সচেতন থাইকব। বেশি বেশি সাবান দিই হাত ধুবো আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পইড়ব ইনশাল্লাহ… দুই ভাই বোঝার চেষ্টা করে- কি জিনিস এই করুণা। চোখে দেখা দেখা যায় না। এর কোনো স্বাদ গন্ধ নাই। জ্বর আসলেই শ্বাসকষ্ট। মনের দুশ্চিন্তা অবশ্য উচ্চারিত হয় না। দোকান বন্ধ করে ফেরার পথে সদরুল-বদরুল এমনও শুনেছিল কোরিন্টিন মানে ক্রসফায়ার। হোসেন ব্যাপারির বাড়ি নাকি পুলিশ এসেছিল। সৌদি থেকে আসা তার ছেলে হারুনকে কোয়ারিন্টিন দিতে। পুলিশ অবশ্য হারুনের নাগাল পায় নাই। পুলিশ আর কোরিন্টিনের নাম শুনেই সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
দুই ভাইয়ের গলা খুশখুশ করে। হয়তো ঘনমেঘের লাগাতার শীতলতা ছড়িয়ে দেয়ার কারণেই। ম্যাগের কি শ্যাষ নাই? আম্মার জ্বর নিয়ে দুশ্চিন্তা হয় সদরুলের। লক্ষণ ভালো না। বদরুলের মনে হয় এই জ্বরের কথা পাঁচ কান করা ঠিক না। কোনো ভাবনাই দুই ভাইকে স্বস্তি দেয় না। বাপের কোল থেকে নেমে যায় টুটুল। কোমরে লটকে থাকা কালো কাইতনে তিনটে ঘুঙুর বাজিয়ে মায়ের কাছে চলে যায়। আঁচল ধরে টানে। অভ্যাসবশত মায়ের মাই চোষে। বুকের ওই মাংসপিণ্ডই সার। এক ফোঁটা দুধে টুটুলের ঠোঁট ভেজে না।
সন্ধ্যার মুখে চিকন দাঁতের চিরুনি দিয়ে মাথার উকুন কব্জা করার চেষ্টা করে শাহীনা। মাগরিবের আজান শুনে সামান্য তেল দিয়ে কূপির সলতায় আগুন ধরায়। ভুরভুর করে নীরবে ধোঁয়া উড়ে যায় আর তিনটা পোকা আগুনের শিখার চারপাশে পাক খায়। দূরে যায় আবার কাছে আসে। স্পঞ্জের স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে টিপ কলের দিকে যায় শাহীনা। উত্তর ঘরের নাসিমা আসে কলসি ভরতে। নিচু খ্যারখ্যারে গলায় বলে- মামানীর শইল ভালা নি? জ্বর কইমছে?
নাসিমার স্বরে আন্তরিকতাটুকু চাপা পড়ে কৌতূহল উপচে ওঠে। ওর মুখের দিকে তাকায় শাহীনা। বাদলা বাতাসে নাসিমার মুখটা আরো ফ্যাকাসে লাগে। একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। নাসিমার ঔৎসক্যে ভয় পায়। অস্বস্তির ঠোঁটে নিঃশব্দ হাসি ফুটিয়ে বলে- আম্মার জ্বর কইমছে। আইজ্জা দুফুইররা নিজের হাতে জাউভাত খাইছে।
হোসনারার জ্বর নিয়ে শাহীনা যা বলল এতে সে নিজেই অনিশ্চিত। আজ দুপুরে ভাত রান্না হয়েছিল কি হয় নাই এমন ভাবনায় সে বিভ্রান্ত হয়। জিভের ওপর ডুইল্লার শাকের সোয়াদ কতটা পুরনো বোঝার চেষ্টা করে। নীল টিপ কলের মুখ দিয়ে তখন ঝরঝর পানি ঝরে। শাহীনার পায়ের কাদা নরম হয়ে ধুয়ে যায়। ছিটকে আসা স্বচ্ছবিন্দুগুলো শুষে নেয় শাড়ির সুতা। সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে সে ওযুর পানির পবিত্রতা অনুভব করে।
কেরোসিন তেল নাই তাই রাতে হারিকেন জ্বলে না। এক ফুঁয়ে কূপির আগুন নিভে গেলে কিছুক্ষণ পর চোখে অন্ধকার সয়ে যায়। ঘোর অন্ধকারের সবটাই তখন ছায়া হয়ে ঘরে লেপ্টে থাকে। কয়েকটা জোনাকি পেটে আলো নিয়ে উড়ে যায় বাদারের দিকে। চোত মাসের রাতেও শীত লাগে শাহীনার। ঘরের ভিতর চৌকির উপর শুয়ে থাকে সে। মাটিতে শাশুড়ি শুয়ে আছে মোটা চটের উপর। জ্বরের তাপ গন্ধে, বিছানার সোঁদা গন্ধে, সদরুলের ঘেমো গন্ধে শাহীনা আরাম পায় না। মুখের ভিতর থুথু ভরে যায়। নোনা স্বাদের থুথু গিলে ফেলে সে। ঘুমন্ত টুটুলের মাথা বালিশে তুলে দেয়। সদরুলের দিকে পাশ ফিরে বলে- আম্মার লাই একটা ব্যবস্থা করন দরকার। ইমাম সাবের তন হানিহড়া আনিয়েন।
পুকুর থেকে ঠাণ্ডা বাতাস উঠে আসে। বেড়ার ফোঁকর দিয়ে, জানলার পাল্লার ফুটা দিয়ে, দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে বাতাস ঘরে ঢুকে গেলে জীর্ণ কটুগন্ধী কাঁথা গায়ের উপর টেনে নেয় শাহীনা। তার শুষ্ক ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে আলগা কয়েকটা শব্দ গড়িয়ে পড়ে- মনে করি ওগ্গা জ্বরের তাবিজ আনিয়েন।
সদরুল নিরুত্তাপ গলায় বলে- হ, আইন্নুম আরি।
করুনাজ্বরের চিকিৎসা নাই। ওষুধ নাই। কাউকে ধরাছোঁয়া যায় না। শ্বাসকষ্টে ফ্যাকাশে হয়ে যায় গ্রামের মানুষ। স্তব্ধ রাত ধীরে ধীরে গভীর হলে শাহীনার চোখে ঘুম নামে। অভুক্ত সদরুলের দৃষ্টি আটকে থাকে অন্ধকারে। জীবনের কষ্ট কুটিলতায় ঘুনধরা কড়িকাঠের দিকে। পেটের মধ্যে তখন ঘন অম্লরস জমে বায়ু পাকিয়ে ওঠে। সদরুলের গলা পর্যন্ত জ্বলে যায়। বাঁচার চেষ্টায় শোয়া থেকে উঠে বসে সে। অন্ধকারের মধ্যেই পেট ভরে পানি খায়। কুলি করে। বদরুলের জন্য অপেক্ষায় জাগে। ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শাহীনা। টের পায় সদরুল ঘরে নাই।
কোদাল চালিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শেষে ক্ষুধা পিপাসায় কাতর রহমতুল্লা। মাটি সহজে আলগা হয়ে গেলেও সে হাঁফায়। নিমগাছের তলে বসে হাঁ করে দম নেয়। ডান হাতে কোদালের লম্বা বাঁট ধরে শরীরের ভর ছেড়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর শ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলে আসমানের দিকে তাকায় রহমতুল্লা। তাকিয়ে তাকিয়ে বুড়াটে মেরে যায়। তবু ধৈর্য ধরে মৃত্যুর অপেক্ষা করে আর এই বিনিদ্র পাহারার দৈর্ঘ্যের পরিমাণ জেনে যায়। ঢলে পড়া বিকেলের বৃষ্টিগন্ধী হাওয়ায় উপলব্ধি করে জীবনে অপেক্ষার স্থায়িত্ব। কারো শেষ নিঃশ্বাস পতনের সময়কাল পর্যন্ত এই অপেক্ষা। তার ঢিলাঢালা চামড়ায় শিরশিরানি ওঠে। গায়েবী বিদ্যুতের প্রভাবে পশম খাড়া হয়ে যায়। আসমান চৌচির হয়ে বাজ পড়ার পূর্ব লক্ষণ সে টের পায়।
রহমতুল্লা ফের আসমানের দিকে চোখ তোলে। আল্লাহর ফেরেশতা আজরাইলের শুলুক খোঁজে। কখন রুহ কবজ করতে আসবে সেই আন্দাজ লাগায়। আরেকবার তাকায় বাঁশঝাড়ের বস্তার দিকে। তারপর শেষ বিড়িতে শেষ টান দেয়। তাজা ঘাসের উপর বিড়ি ফেলে হাঁটা দেয় বাঁশঝাড়ের দিকে। বৃষ্টির বড় বড় বিক্ষিপ্ত ফোঁটা নামে। বস্তার ভিতর চিৎ হয়ে পড়ে থাকা ক্ষীণকায় হোসনারার শুকনা মুখে জলের ছোপছাপ পড়ে।
বাঁশগাছের উপর দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে কালবাষ্প উড়ে যায়। বৃদ্ধার নিস্প্রাণ চোখের তারায় ছাইবরণ আসমান ছায়া ফেলে। ছায়ায় স্থিরতা নাই। সেখানে শকুনের ওড়াওড়ি।
(শব্দার্থ: কোনাই- কোথায়, শইল-শরীর, বেইন্নাবেলা- বিহান/সকাল বেলা, হইজ্জন্ত-পর্যন্ত, হনের- পনের, গফ- গল্প, হুস্কুনী- পুষ্করিণী/পুকুর, ন’জ- নামাজ, হোলামাইয়াগুন- ছেলেমেয়েগুলো, ডুইল্লার হাগ- লাল শাক, আইজ্জা- আজ,  দুফুইররা- দুপুরবেলা, মজ্জিদ- মসজিদ, হানিহড়া- দোয়া পড়ে দেয়া পানি, ওগ্গা- একটা, আইন্নুম- আনবো)