পবিত্র সাফুঁই-এর গল্প

Spread This
পবিত্র সাফুঁই

পবিত্র সাফুঁই

ঈশ্বর

অন্ধকারে থাকি, আলো বিপজ্জনক।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে কারা যেন গান ধরে, কারা যেন চাবুকে চাবুকে রাতের বুক ছিঁড়ে ঝরায় শোণিত স্রোত।
সিঁটিয়ে থাকি, মেধাবী বিকল্প তাপ সঞ্চারক। যে কোনো উস্কানিতেই ধ্বংসস্তূপ হয়ে যেতে পারে বাড়ি, বাগান, গেরস্থালী, বন্ধুবান্ধব। শরীর ভর্তি মারাত্মক বিস্ফোরক, মদগর্বী বাসনার মতো উড়ে যাবার সম্ভাবনা ও আশঙ্কায় জর্জরিত।
এ সঞ্চয় অর্জন নয়, পুরোটাই ভবিতব্য। আমার কাজ বিস্ফোরণস্থল নির্বাচন। মৃত্যুপূর্ববর্তী মস্তানী ও মর্দানি তাই অপাংক্তেয়।
সব জায়গাতেই এত প্ররোচনা, চুল্লুর ঠেকে ঈশ্বরকে বলে ফেললাম কথাটা, “এত কষ্ট করে এইসব খচরামির মানেটা কী? মণিদীপাকে চুমু পর্যন্ত খেতে পারিনা, ও তো সন্দেহই করে এটা প্রেম নয়, জালিয়াতি।
মালটা অতিশয় ধূর্ত, মদের আসরেও ঢুলুঢুলু চোখে দৈব বাণী, “এরকম দু-চারটে ছাড়তে হয়। জ্ঞান নয়, যোগ ও যৌনতা নয়, ফেটে পড়াতেই মোক্ষ। কীভাবে ফাটছো, কোথায় ফাটছো, কী ফাটাচ্ছো, কেন ফাটাচ্ছো তার উপর নির্ভর করবে সেন্টহুড।”
কথাগুলো শুনে গা রিরি করছিল, ভাবছিলাম তাক করে ওনার দিকেই ছুঁড়ে দি দু-একটা হ্যান্ডগ্রেনেড। ঈশ্বর চোঁ-ও-ও করে বোতলটা সাবড়ে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, “চ্যাংড়ামি মেরো না। লোকে হাসবে। ইশ্বর অজর, অমর, অক্ষয় এবং ত্রিকালদর্শী, সবাই জানে।”
পুরো নেশাটাই জলে, ভেবেছিলাম কিছু একটা হিল্লে হবে। পুরোনো ক্যালেন্ডারে ওনার আশ্বাস দেবার ভঙ্গিটা তাহলে ঢপ! নিজেকে প্রতারিত লাগছে। এ মনুষ্য জন্ম তাহলে জগতের প্রয়োজনে বলিপ্রদত্ত?
ঈশ্বর খানিকটা অনুকম্পাবশত আমাকে ইশারায় ডাকলেন পাশের আবছা গলিতে। ওখানে কয়েকটা গ্যারেজ ও প্লাস্টিকের ভাঙা বালতি, বোতল ইত্যাদি কেনা-বেচার দোকান আছে। রাতে বন্ধ থাকে।
দু-দশ পা যাবার পরেই উনি আমাকে পিছন ফিরতে বললেন। ঈশ্বরের কথা ক্রমশ প্রত্যাদেশে পরিণত হচ্ছিল, তাকে প্রতিরোধ করার মতো মানসিক সাহস হারিয়ে ফেলছিলাম। আমি হিপনোটাইজড। তারই ফরমায়েশে পিছন ফিরে জাঙিয়া সমেত প্যান্টটা নামালাম।
প্রচন্ড যন্ত্রণা। বেয়াদপির প্রতিশোধ উনি এইভাবে নেবেন আগে বুঝিনি। পায়ু পথ বেয়ে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগলো দু-পা বেয়ে। সব চাইতে ভয় পাচ্ছিলাম বিস্ফোরণে না টুকরো-টুকরো হয়ে যাই। কিন্তু সেসব কিছুই হলনা। ঐশ্বরিক ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।
সব কিছু হয়ে যাওয়ার পর উনি সিগারেট চাইলেন। আমি তখন দাঁড়াতে পারছিলাম না ব্যথায়, ঠ্যাং দুটো কেতরে বসে আছি। ফ্লেকের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বললাম, “এটা কী হলো, স্যার?”
উনি ধীরে-সুস্থে সিগারেট ধরালেন, “খাসা ব্রান্ড। ফ্রম সাফারিং টু সালভেশন। এটা করতেই হল তোমাকে যৌনশান্তি প্রদান করতে, রতি ক্রিয়ার সময় তোমার বিস্ফোরণ শক্তি লোপ পাবে।”
এটা আশীর্বাদ না অভিশাপ ভাবতে ভাবতে ঈশ্বর অদৃশ্য হলেন।
আজ গলা পর্যন্ত চোলাই টানা হয়েছিল।
দোটানায় শার্পনেস নষ্ট।
সেন্টহুড অথবা লাম্পট্য, যে কোনো একটা বেছে নিতে হবে। প্রথম সম্ভাবনাটি দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে পৃথিবীতে এবং তা অর্জিত হবে বহু প্রাণের বিনিময়ে। সম্ভবত ঘটনাক্রমের দিকে নজর রেখে সময়মতো সেঁধিয়ে যেতে হবে প্রাসাদের বেসমেন্টে, আমার শক্তি ও গৌরবের কথা লেখা রবে ইতিহাসে। এটা ঈশ্বরের স্বয়ংক্রিয় পুনর্নির্মাণ পদ্ধতি, ধ্বংসের বীজ ছড়িয়ে দিতে হয় পুনরুজ্জীবনের জন্যে। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরমার্থের কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু আমার লোভ তো মণিদীপার শরীরে। ওর জামার বোতাম টিপলেই জ্বলে উঠবে ভিসুভিয়াস। এ কবচ আমি পেয়েছি পিছন মারা যাওয়ায় প্রতিদানে।
নির্বিবাদে মত্ত হলাম পাপ আস্বাদনে। বোতামের ঘাট গুলো বড়ো হয়ে গেলে বনানী, শিউলি, তারপরে উজ্জয়নী। মেয়েদের শরীর জ্যান্ত, ইউটোপিয়ার থেকে মহৎ ও অর্থবহ। বস্তুত সেন্টহুডের অসাড়তা আমাকে নির্মোহ করেছিল আর আমি বিস্ফোরণ শক্তির অহংকার ও ঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে চাইছিলাম, উপহাস করতে চাইছিলাম মহান ঐশ্বরিক চালাকিকে।
কিন্তু সব প্রচেষ্টা বিফলে গেল। যেমন সব ফলই টুপ করে খসে পড়ে মাটিতে। পিছন ফাটার যন্ত্রণাটা দিনকে দিন বেড়েই চললো, ঈশ্বরের সাথে লিপ্ত হবার পরিণতি। ঘুমবন্ধ, না পারি নারীর রূপ বর্ণনা করতে, না পারি চেয়ার কিম্বা কমোডে বসতে, রাতে ইসবগুল খেয়ে উবুড় হয়ে শুই প্রাতঃকালীন কষ্ট কমাতে।
ভাগ্যিস, নিজের পেছনটা দেখা যায়না।
খোকনের চায়ের দোকান। হেমন্তের রাত। ঠান্ডা পড়া শুরু হয়েছে। লোকজন প্রায় নেই, খোকন হেডফোন কানে গুঁজে কাপ-ডিশ ধুতে ব্যাস্ত। ওনার মাথায় উলের টুপি, গলায় মাফলার, যেন ওনারও ঠান্ডার ধাত! ভেকধারী লোকেদের সহ্য করা কঠিন।
–কিছু করার নেই। তোমার সিস্টেমটা ইনবিল্ট, বাইরে থেকে পরিবর্তন করতে গেলে গড়বড় হতেই পারে।
–আমার অবস্থার কোনরকম উন্নতি হলোনা। আগে ভয় পেতাম উড়ে যাবার, এখন পিছনের জ্বালায় দৌড়োচ্ছি।
–তুমি পৃথিবীর রূপ, রস, বর্ণে, গন্ধে পরিতৃপ্ত হয়েছো, তোমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। জীবন থেকে এর বেশি পাওয়ার অধিকার কারুর নেই।
–আমি স্বাভাবিকতা চাই। সমস্ত যন্ত্রণা ও ভয়ের থেকে রেহাই চাই। অতিরিক্ত কিছু না।
–সব যন্ত্রণা ক্রিয়াশীলতায়। মস্তিষ্ক এবং শরীর উভয়েরই। সহিষ্ণুতা আথবা নিষ্ক্রিয়তা পারে শান্তি দিতে, সেটা তোমার নিজস্ব অনুশীলন। আমি কেবলমাত্র তোমাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিতে পারি। সন্ত হবার সুযোগ ও সম্ভাবনা জারি থাকবে, তাই এই প্রত্যাবর্তন হিতকর। তবে আগের আত্মতে ফিরে যেতে তোমাকে পুনর্বার আমার সাথে পায়ুসংগমে মিলিত হতে হবে।
চিৎকার করে উঠলাম, অতীতের দুঃসহ স্মৃতি আমাকে গিলতে উদ্যত, দ্রুত চায়ের দোকান থেকে পালিয়ে দিগবিদিক ছুটলাম অন্ধকারে, বুকের কাছটায় হাপরের শব্দ। একটা অযাচিত বিস্ফোরণ রাতের নীরবতাকে ঝলসে দিল।