অনুবাদ-শ্যামলী সেনগুপ্ত

Spread This
শ্যামলী সেনগুপ্ত

শ্যামলী সেনগুপ্ত

মুখোশ

মূল ওডিআ গল্প : অনিল পাঢী

এক
আজ্ঞে!  শুনুন,আজ যা বলতে যাচ্ছি, তা একশো ভাগ সত্যি। মানে কোনও এক সময়ে এরকম ঘটেছিল। কোনও এক সময় বললে সময়ের পরিমাপে একটু দ্বন্দ্ব থেকে যায়। তবে আনুমানিক একটা সময় ধরা যেতে পারে।
বরং এখান থেকেই শুরু হোক। আসলে যেটা ঘটনা,আমি এই সৃষ্টির রচয়িতা কে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বয়ংক্রিয় ও স্বয়ংসিদ্ধ শক্তি মনে করি । অন্তত কিছু সময়ের জন্য বিগব্যাং এবং স্ট্রিং থিয়োরি কে সৃষ্টি তৈরির মূল উৎস বলে না মনে করে, ভাবুন, কোনো এক কল্পনাবিলাসী কবি, যিনি আমাদের জন্য ভগবান, আল্লাহ্ বা ঈশ্বর, তিনি নিজের স্বর্গের বাসভবনে বসে ঠোঁটে পালকের কলম কামড়ে কবিতা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ এই পৃথিবীর মতো একটি কবিতা বানিয়ে ফেললেন। কবিতার পাত্রপাত্রী হলো দেব-দানব ও মানুষ। কবিতার ছন্দ হলো সাগর,নদী আর পাখিদের কলকাকলী। কবিতার ব্যাকরণ হলো মেঘের ডাক , হিংস্র পশুর গর্জন আর মানুষের চিৎকার। কবিতার যতিচিহ্নগুলি নীল আকাশ, সূর্যাস্ত-সূর্যোদয় ,পূর্ণিমা-অমাবস্যা আর তালপাতার পুঁথি হলো ঋতু পরিবর্তন। সমালোচক এবং পাঠকরা গ্রহণ করলো সময়ের চরিত্র।তাই এই পৃথিবীতে কিছুই অসুন্দর ছিলো না, এখনও নেই। এবার গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটি হলো ,তাহলে এত কদর্য জিনিস কী করে ঘটে চলেছে ! আর এই মানুষ এত কুৎসিত কেন! এর উত্তর খোঁজা যেতেই পারে। ধরে নেওয়া যেতে পারে,পৃথিবীতে শয়তানের পা না পড়া পর্যন্ত এখানে সবকিছু বিশুদ্ধ ছিলো। বাঘ মানুষের পিঠে চেপে ঘুরতো।তিমিমাছ জাহাজের ভূমিকা পালন করতো।বিশালকায় চিল,শকুন আর গরুড়পাখি মানুষদের পিঠে চাপিয়ে আকাশে ঘুরিয়ে আনতো কিন্তু হঠাৎ একদিন সব কেমন বদলে গেল। এমন বদলে গেল যে,সম্পর্ক হয়ে গেল খাদ্য-খাদকের। এই সময়ের অপেক্ষায় ছিলো শয়তান। সে ধীরে ধীরে নেমে আসলো মানুষের কাছাকাছি। ভগবান রূপী কবি যখন দরকার মতো নানারকম জিনিস দিয়ে দুনিয়া তৈরি করছিলেন,ঠিক সেই সময়ে তাঁর অজান্তে সৃষ্টি হলো শয়তান। ধরা যাক,মানুষের নাক তৈরি করার সময়ে খুব বেশি বড়ো হয়ে গেলে কিছুটা কাটছাঁট করে ফেলে দিতেন। এসব বাতিল জিনিস দিয়ে শয়তান গড়ে উঠলো।মানুষের আকৃতির,পশুর আকৃতির এমনকি শয়তান পাথরের মধ্যেও ফুটে উঠলো। ঈশ্বর যারই বাড়তি অংশ কেটে ফেলে দিচ্ছিলেন, সেই আকৃতির রূপ নেওয়ার  সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভেতরে সৃষ্টি হলো তিতিক্ষার ভাব। তখন শুরু হলো ঈশ্বরের বিরুদ্ধে শয়তানের অভিযান আর শিকার হলো ঈভ্। এই সময়কে শয়তানের রাজ্য বিস্তারের সময় বলা যেতে পারে। প্রচণ্ড প্রভাবশালী শয়তানের ভয়ে ঈশ্বর চিরকালের জন্য উবে গেলেন,চলে গেলেন নিজের কল্পিত দ্বারকাপুরে। শয়তান খুব বীভৎস দেখতে ছিল,যেহেতু  ঈশ্বর তাকে সৃষ্টি করেননি। বিরাট আকৃতির হলো,যেহেতু সে ঈশ্বরের ছাঁচে তৈরি নয়। মহাসমুদ্রের ভেতরে দাঁড়ালে ওর পায়ের তলা ভিজে যেত। পাহাড়গুলো ওর জন্য তখন  স্নানের ঘাট হয়ে যেতো এবং চাঁদ সূর্য  যদি ওর মাথায় ধাক্কা  খায়, এই ভেবে খুব সতর্কতার সঙ্গে অস্ত যেতো অথবা উদয় হতো। শয়তানের তুলনায় মানুষ ছিল পিঁপড়ে র মতো। শয়তান চেয়েছিলো মানুষের হৃদয়ে  অথবা হিংস্র পশুর দাঁত ও নখে থাকতে। তাই তাকে তার ওজন ও আকৃতি হালকা করতে হয়েছিলো। সে ঈভের কানের পাশে একটি সরীসৃপের মতো হয়ে গেল । নরকের আগুনের ভেতরে সে বৈদ্যুতিক বাল্বের মতো সাঁতার কাটতো। পরিক্ষীতের কারণে সে তক্ষক হলো।কখনো জরাসন্ধ, কখনো রাবণ অথবা কংস কিন্তু এইসব রূপ ধারণ করে শয়তান সন্তুষ্ট হতে পারছিলো না । জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাওয়ার পর হয়তো লাস্যময়ী,হাস্যময়ী,লাবণ্যময়ী,অসামান্য সুন্দরী ঈভের নগ্ন রূপ দেখে ও নারীর মায়ায় পড়ে গেল। আর এসব থেকেই সে শিখে ফেললো সীতাহরণ,দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ।তবুও তার আফশোস থেকে গেল! মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করতে না পারার হতাশা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো।
কীভাবে!
কীভাবে!
ঈশ্বর ক্ষীরসাগরে বাম জানুর ওপরে দক্ষিণ জানু রেখে মিথ্যে যোগনিদ্রায় ছিলেন। মাথার ওপর বাসুকী ফোঁস  ফোঁস করছিলো।ক্ষীরসাগরের ভেতর থেকে একটি ডলফিন লাফিয়ে উঠে নিজের আশ্চর্য দক্ষতা দেখিয়ে আবার জলের ভেতরে লুকিয়ে পড়ছিল।এই জলক্রীড়ার ফলে কিছু জল ছিটকে এসে লক্ষ্মীদেবীর আরক্ত মুখে পড়ে তাঁকে আনমনা করে তুলছিলো।
ঈশ্বর স্বর্গ থেকে শয়তানকে বিতাড়িত করলেন,স্বেচ্ছাচারের নমুনা। তিনি কারও মতামত নিলেন না,মিটিং এ কোরামের আবশ্যকতা ছিলো না। তবে তিনি শয়তানকে পৃথিবীতে না পাঠিয়ে স্বর্গ থেকে সোজা নরকে পাঠিয়ে দিলেন। নরকের উপরে স্থাপিত হলো পৃথিবী আর পৃথিবীর অনেক ওপরে স্বর্গ।সুতরাং, ঈশ্বর আর শয়তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলেও শেষপর্যন্ত তা মানুষ বনাম শয়তানের যুদ্ধে পরিণত হলো। ঈশ্বর বলে ফেলেছিলেন ,”আমি মানুষকে আমার প্রতিরূপ করে গড়েছি।” এই যুদ্ধ বেশিদিন চলেনি এবং মানুষ যে দেবতাদের মতোই পরাক্রমশালী এই কথাটি প্রমাণ করে দিলো রোমান এবং অযোধ্যার অধিবাসীরা। শয়তানের তখন আক্কেলগুড়ুম! ও থাকবে এই সমাজের মধ্যে কিন্তু শয়তান হিসেবে কেউ তাকে চিনতে পারবে না!
কী করবে ও!
ও কী করবে!

 (২)

তখন শুরু হলো মুখোশের বংশ সারণি।
মুখোশ ! মুখৌটা!মাস্ক!
মুখোশের ঈশ্বর শয়তান।
শয়তান মুখোশ সৃষ্টি করলো।
শয়তান ছিলো ঈশ্বরের মতো বলশালী,কুশলী,তাই নিজের কল্পনা কে মুখোশের রূপ দিলো।
আহা! কী সুন্দর সব মুখোশ!
দয়াশীল,পরোপকারী, সৎ ও সত্যনিষ্ঠ। যে দেখে  সেইই আশ্চর্য হয়। সকলের মনে হলো ,বস্ত্র বাইরের আবরণ,বিনা বস্ত্রে মানুষ যেমন উলঙ্গ, বিনা মুখোশে মানুষের অন্তর ঠিক তেমন উলঙ্গ। তাই অন্তরের সাজসজ্জার জন্য মুখোশের নিতান্ত প্রয়োজন।
মুখোশের আউটলেটগুলোও তেমন তেমন! সেসব কী অদ্ভুত রকমের! ওই তো যেখানে রাস্তাটি একটু নির্জন,একটা পাতাহীন বিকৃত তেঁতুল গাছের পাশে নামগোত্রহীন অন্ধকার, সেখানে একটি সাইনবোর্ডে লেখা ছিলো,’ এখানে নানারকম মুখোশ পাওয়া যায়।’
যেখানে সমুদ্রের বুকের ওপর মৃত তিমিরা ভেসে উঠেছে,সেখানে জলের অতল গভীরে একটা ডুবো জাহাজের অস্থি-কঙ্কালের মধ্যে ছোট ছোট গুহা ,সেখানে পাওয়া যেত মুখোশ। আবার যেখানে উল্কাপিণ্ডের বলয়ের মধ্যে মাছি পড়লেও ন’টুকরো হয়ে যায়, সেই ভয়ংকর জায়গায় ছিল মুখোশের দোকান। চোরাবাজারের মতো এখানে ওখানে ছিলো মুখোশের আউটলেট! মুখোশের প্রয়োজন ছিলো এবং মুখোশ বিনা কাউকে মানুষ বলে গণ্য  করা হতো না।
মুখোশ কেনার আদবকায়দাও আজব রকমের। সোনা-রুপোর আশরফি নিয়ে গেলে বা টাকাপয়সা নিয়ে গেলে মুখোশ কেনা যেতো না। মুখোশ কেনার জন্য যা অতি প্রয়োজনীয়, তা ছিলো আজব রকমের এবং  দুর্মূল্য। যেমন,প্রথমে কোর্টে যেতে হতো এবং নিজের নাম রেজিস্ট্রি করতে হতো।নিজের হাতে একটি লিখিত  স্বীকারোক্তি দিতে হতো এইভাবে–“এতদ্বারা, আমি অমুক সম্পূর্ণ সুস্থ মনে এই ঘোষণা করছি যে,মুখোশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিস যা ধনসম্পত্তি বা আসরফি বা অর্থ নয়, দিতে আমার কোনও আপত্তি নেই।” স্বীকারোক্তিটি নিয়ে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাণী মানুষদের একটি ঘরে ঢুকিয়ে দিতো। কী বিচিত্র ওই কামরা! মনে হতো যেন আই. সি. ইউ। কম্পিউটার এবং নিক্তির মতো যন্ত্রপাতি ছিলো ওখানে, কয়েকজন বিচিত্র প্রাণী যাদের চোখে বিরাট বড়ো চশমা ,তারা অদ্ভুত কিছু পরীক্ষার পরে রিপোর্ট দিতো। মানুষের ভেতরে অনুকম্পা, দয়া,প্রেম,পবিত্রতা, সহৃদয়তা,ধৈর্য কত পরিমাণে নিহিত তার এক রিপোর্ট তৈরি করা হতো। যেমন,দয়া কত মিলিলিটার, প্রেম কত গ্রাম ইত্যাদি ইত্যাদি। ঐ রিপোর্ট নিয়ে অন্য একটি কামরায় যেতে হতো। একদম কোর্ট রুমের মতো দেখতে সেই ঘরে অদ্ভুত, কালো কোট পরিহিত প্রাণীরা স্ট্যাম্প হাতে নিয়ে উইল তৈরি করতে তৎপর। পাঁচ বছর,দশ বছর,একশো, দুইজন্ম,সাতজন্ম এমনকি জন্মজন্মান্তরের চুক্তিপত্র  তৈরি হতো। চুক্তিপত্রে লেখা থাকতো, ‘তুমি তোমার নিজের ইচ্ছেয় একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমার আত্মাকে বন্ধক রেখে একটি মুখোশ গ্রহণ করছো। ভবিষ্যতে তোমার আত্মার প্রতি আইনগত বা ঈশ্বরগত অধিকার থাকবে না। বন্ধক রাখা জীবন তোমার আত্মাকে নিজের ইচ্ছেমত ব্যবহার করবে।’ এর উপরে একটি বামন জাতীয় জীব সিগনেচার করতো,স্ট্যাম্প দেওয়া হতো। আর ঠিক সেই সময়ে কানের পাশে একটি জাদুকরী স্বর শোনা যেত,”দিয়ে দে,বিবেক দিয়ে দে।দয়া,ক্ষমা,প্রেম…সব দিয়ে দে।” শরীর থেকে তখন নীল রঙের রশ্মি বেরিয়ে ওই বামন জাতীয় জীবের হাতের ফাঁসে আটকে যেত আর ধোঁয়ার মতো কী যেন মানুষের শরীরে প্রবেশ করতো।

      ( তিন)

আসলে ঐ বামন ছিলো শয়তান।
দুঃশাসন!
জেনারেল ডায়ার!
ওসামা বিন লাদেন!
এবং পরম্পরায় যা চলে আসছে সেই কাল থেকে  তা হলো,শ্রাবণ মাসের অমাবস্যায় যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি  পড়ে,দুর্গম জঙ্গলের ভেতর থেকে অশরীরীদের বিলাপ মেঘের গর্জনের চেয়ে বেশি তীব্র, যখন স্থাবরজঙ্গমকীটপতঙ্গ ‘ত্রাহি মাম্’ ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে,তখন যার যার জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে পৃথিবীর সমস্ত মুখোশ। কাঁটার সিংহাসনের উপরে বিরাজমান  আঁধারের মালিক শয়তান মহারাজ।
মুখোশেরা জয়ধ্বনি দেয়, ‘ হে শয়তান মহারাজ, তোমার আদি বা অন্ত নেই।তোমার জন্ম-মৃত্যু নেই।মহারাজের জয় হোক!

তখন বাদলধারা তেরছে পড়তে থাকে। মেঘ গর্জনের শব্দ ম্লান হয়ে যায়। বিদ্যুতের ঝলকানি টিমটিম করে। অথচ ওই ঘন কালো রাতে আঁধারের অনবদ্য ঔজ্জ্বল্যে মুখোশগুলি দেখা যায়।  মহারাজের মুখের লোমগুলি পেরেকের মতো সোজা হয়ে যায়।তার পায়ের তলায় গালিচার নিচ থেকে কারও আতুর কণ্ঠস্বর শোনা যায়। কে ওরা! কিছুটা দূরে উদূখলে বাঁধা থাকে বিবেক,প্রেম,ধর্ম,কর্ম। একজন কসাই ওখানে বসে একটি বিরাট পাথরের উপরে ঘষে ঘষে দায়ে শান দিতে থাকে ।

মুখোশের বার্ষিক উৎসব।
বক্তা যে মুখ্য অতিথিও সে,ওই এক শয়তান। শয়তান  হাততালি দিয়ে উৎসব উদঘাটন করবে।কার্যক্রম চলতে থাকবে। কোনো এক মুখোশ বার্ষিক বিবরণী পড়তে তৎপর হয়ে উঠবে। হয়তো সে ছলনা! ধরে নেওয়া গেল, এখন থেকে পৃথিবীর সব বিবরণী, বিবৃতি ছলনাময় হয়ে যাবে।
মুখোশদের দেখতে খুব সুন্দর লাগবে,যেন গ্রীনরুম থেকে বেরিয়েছে সব। তীক্ষ্ম নাক,ঢুলু ঢুলু চাহনি, তিরতিরে ঠোঁট,তীব্র বক্ষ, বিস্তৃত জঘন, ইনি নারী।
স্পর্ধিত মুখাবয়ব, বিস্তৃত কাঁধ,উত্থিত বুক,দৃঢ় বাহু,ইনি পুরুষ। এদের মতো মানুষ এই পৃথিবীতে সম্ভব নয়।অসুন্দরের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই ।
শয়তান ঢেকুর তুলবে,আড়মোড়া ভাঙবে আর এই সময় দেখা যায়  ওর ত্যাড়াবাঁকা দশটি পা, যা কিনা বটের ঝুরির মতো  দুলতে থাকে। ঝুলতে থাকা ওই পায়ের সামনে ছুঁচালো নখ। চোখগুলো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে যেন! যদিও বেশ ভয়ংকর দেখতে তবু অনেকটা জোকারের মতো লাগে। সমবেত মুখোশের দিকে তাকিয়ে সে একটাই কথা বলে,”শয়তান খুস হুয়া” । এরপরে শুরু হবে নাচগান। অপ্সরানিন্দিত নর্তকী নাচ শুরু করবে। ধরা যাক, তার নাম মায়া। অদ্ভুত এক ভাষা ও সুরের গান শোনা যাবে।অনেকটা বিদেশী উচ্চাঙ্গ সুরের মতো। হয়তো সে মোহ! শ্রাবণের ধারা অবিশ্রান্ত ঝরবে। হয়তো মুখোশদের এই আসরের অন্য  দিকে জলস্তর বেশ বেশি হয়েছে তখন। আর হয়তো তখন জনপদে আসল মানুষের রূপ দেখা যাবে। আহা! কেউ যদি এই অনন্য মুহূর্তের ছবি একখানা তুলতো। অন্তত বোঝা যেত,মুখোশবিহীন মানুষদের কেমন দেখতে। তবে,ব্যাপার হলো,তখন মানুষেরা অচেতন অবস্থায়। ঈশ্বর তাদের নিজেই ডেকে তুলবেন,” হে মানব ওঠো। নিজেকে চেনো। তাঁর স্বর পাতাদের মর্মর ,বৃষ্টির ছমছম,ডাহুক অথবা পেঁচার ডাক হয়ে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মধ্যে খোলা জানলা দিয়ে ঈশ্বর এক ঝলক বাতাস হয়ে ঢুকে পড়েন, বৃষ্টির ছাঁট সহ। চারদিকে অন্ধকার!

যদি ধরে নিই, বিভীষণের থেকেই শুরু হয়েছে ছলনার মুখোশ। শয়তান অবশ্য বলে থাকে , ঈশ্বরই আসল ছলনাময়, নয়তো দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্ম নিয়ে  ছয়টি শিশুর প্রাণ হরণ করতেন না! শয়তান  সিসিফাস ও প্রমিথিউসের উদাহরণ দিয়ে বলে,”ঈশ্বর ছলনাময়, ছলনা ই ঈশ্বর। “
মুখোশরা অন্তর্হিত হয়ে গেলে মানুষের কাছে সম্পর্ক বা স্থিতির রূপায়ণ থাকবে না আর। এখন তো মানুষের ঘরের ভেতরেই নকল মা,  নকল বাবা,নকল ভাইবোন, মিথ্যুক নেতা,সেবক,পূজারী,নকল দেশপ্রেমিক ….
আচ্ছা, এসব কিছুই থাকতো না যদি মুখোশরা হারিয়ে যেত!আহা! কী অদ্ভুত পৃথিবী হতো … একটি শিশুও ধর্ষিত হতো না আর, কন্যাভ্রূণটি টিকে যেতো, গরিবের থালায় পরিবেশিত হতো পঞ্চ ব্যঞ্জন । যুদ্ধ নেই,পরকীয়া, প্রিয়তোষণ,  হত্যা,লুণ্ঠন কিচ্ছু নেই! কেমন হতো ওই পৃথিবী!
ঈশ্বর ছলনামুক্ত হোন।
শয়তান ছলনামুক্ত হোক

  (চার)

আমার মতো আপনাদের মনেও একই প্রশ্ন, যে শয়তান মুখোশের স্রষ্টা, যে মুখোশদের ঈশ্বর,সেইই কি সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব! আর কেউ তার চেয়ে খারাপ নয়?
এই প্রশ্ন ততটা যুক্তিসঙ্গত  বা ঠিক মনে না হলেও বিচার্য অবশ্যই। যেমন,একজন বিজ্ঞজন বললেন,মুখোশ খারাপ কিন্তু শয়তান ভালো, কারণ সে ঈশ্বরের সৃষ্টি।
একজন বললেন,মুখোশ তো মানুষেরা পরে,সুতরাং ওরাই আসলে খারাপ। । যুক্তিতর্ক ক্রমশ দীর্ঘায়িত হলো। আমরা কি ঈশ্বরকে খুঁজতে গিয়ে অজান্তে শয়তানের খোঁজ করি? পজিটিভ আর নেগেটিভ না হলে শক্তির সৃষ্টি হয় না। সকল গুণের মধ্যে দুর্গুণও থাকে। যেমন,বাইশ ক্যারেট সোনার সঙ্গে কিছুটা খাদ না মিশলে অলংকার তৈরি হয় না। এসব খুব ক্লিশে আলোচনা। ক্লিশে কারণ,শয়তান এসব বলে গেছে। বলে গেছে,স্বর্গ বা নরক বলে কিছু নেই। মন চাইলে এখানেই স্বর্গ নয়তো স্বর্গও নরকসমান।
হে প্রাজ্ঞজন,মন একটা জিনিস বটে! মন আর আত্মা কি এক!আত্মা কি কলুষিত নয়! কেউ  কেউ বললেন,মন কলুষিত হয় না,প্রবৃত্তি কলুষিত হয়। ওরে বাবা! মন ই বা কে আর প্রবৃত্তি বা কী?
এর সমাধানও দুষ্কর।  না কেউ আত্মাকে দেখেছে,না মনকে।সাধকরা বললেন,শয়তান হলো এক বিশাল কৃষ্ণগহ্বর। ওর ভেতরে আছে চোদ্দ ভূবন,আমাদের পৃথিবীও। সুতরাং, আমরা জন্মের আগে থেকেই শয়তান। আমাদের প্রথম সম্পর্ক শয়তানের সঙ্গে। হয়তো সারা জীবন আমরা শয়তানকেই ভগবান ভাবি।
এটা একটা ভ্রম আর এই ভ্রমও একরকম মুখোশ।
শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণগর্তের মৃত্যু হয় এবং অবশিষ্ট যা বিন্দুর মতো থাকে ,সেইই ঈশ্বর। এই ঈশ্বরকালের জীব থাকে না,ব্রহ্মাণ্ড থাকে না,তাই ঈশ্বরের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় না। সম্ভবত,এই কারণে শয়তান আমাদের বেশি কাছের। পাপ লোভনীয় কারণ কারও মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জীবনের সঞ্চার হয়।
তাই সাধকরা বললেন,শয়তান থাকবেই। কত পরিমাণে তোমার ভেতরে থাকবে সেটি সম্পূর্ণ তোমার উপরে নির্ভর করছে।সেভাবেই  আমরা কঠিন,কোমল,সুন্দর এইসব মুখোশ পরে থাকি।তাই,মুখোশ একটি জরুরী প্রসঙ্গ। এখন আমরা বরং ফিরে যাই মুখোশদের বার্ষিক উৎসবের আসরে। ওখানে মোহিনী নারীগণ পরিচারিকা হয়ে মুখোশদের দেখাশোনায় ব্যস্ত । তাদের নাভিমণ্ডল থেকে উঠে আসা আতরের সুগন্ধ মুখোশদের ক্লান্তি দূর করছে।মুখোশদের খুশির আজ একটি বিশেষ কারণ আছে। মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে,মানুষের অন্তরের সঙ্গে সবসময় যুদ্ধ করতে করতে ওরা ক্লান্ত। শ্রাবণ অমাবস্যা রাতের মাত্র কয়েক ঘন্টা ওরা মানুষের থেকে নিষ্কৃতি পায়। আজ তারা স্বশরীরকে প্রত্যক্ষ করে।তাদের কারও শরীরে ক্ষত,কারও সারা শরীরে ছিদ্র,তোবড়ানো।এদের দ্রুত শুশ্রূষা চলে এবং এক বছরের জন্য পুষ্টি ভরে দিতে হয়। মুখোশেরা দুর্বল হয়ে পড়লে শয়তান দুর্বল হয়ে যাবে। শয়তান এসব জানে,এও জানে যে ,কখনো কখনো মুখোশবিহীন মানবশিশুর জন্ম হয় এবং তারা শয়তানের বিনাশের জন্য সচেষ্ট থাকে। এই যেমন,যীশু,মহম্মদ, গান্ধী, বিবেকানন্দ, সফোক্লেস, ব্রুনো! এরা মুখোশদের প্রচণ্ড ক্ষতি করে। এদের প্রাদুর্ভাবের কারণে কিছু কিছু মুখোশের বিলয় ঘটে। শয়তান তখন আতঙ্কিত হয়,মনে করে, এটাই বোধহয় কৃষ্ণগহ্বরের বিনাশকাল!
না কি সে জারাশবরকে পাঠায়,কালভরী পাহাড়ে ক্রুশকাঠ নিয়ে যায়,নাথুরাম গডসের বন্দুক গর্জে ওঠে।তাই মুখোশদের সদাসতর্ক, জীবিত ও সজাগ রাখতে এই বার্ষিক উৎসবের আয়োজন। নয়তো গান্ধী, যীশুরা প্রোটোটাইপ গড়তে সিদ্ধহস্ত। যদি একজন গান্ধী তিরিশ কোটি  লোককে বশ করতে পারে,তবে পাঁচ বা সাত জন গান্ধী তো সারা দুনিয়া বশ করে নেবে।
শয়তান  জানে,মানুষরা ভালো কোনো কিছু বেশি দিন মনে রাখতে পারে না।তাই তো গান্ধীগিরির নামে রাজনীতি হয়,আব্রাহাম লিঙ্কনের নামে গণতন্ত্রের ধর্ষণ হয়,ম্যান্ডেলার নামে বর্ণবৈষম্যবাদের  উত্থান হয়। মানুষ ভালোবাসে তাজ হোটেলে সংঘটিত বর্বরতা ,  আই এসের হত্যাকাণ্ডের জীবন্ত ভিডিও।তাই তো গান্ধী মূর্তির ঘাড় ভেঙে যায়,পানের পিকে লাল হয়ে যায়। মানুষ ভালো নিয়ে বেশি সময় কাটালে তাদের অবস্থা হয় ডাঙায় তোলা মাছের মতো। তারা খাবি খেতে থাকে। শয়তান জানে যে,মানুষ হওয়ার ভিত হলো শয়তানি। এইসব সূত্র  শয়তানের আরও নতুন নতুন আবিষ্কারের জন্য শয়তানলোকে যে পরীক্ষাগার আছে,যেখান থেকে প্রতি বছর  বেরোয়। এইসব বার্ষিক সম্মেলনে মুখোশদের প্রশিক্ষণ  দিতে হয়।

(পাঁচ)

প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হোক অথবা মুখোশদের নবজীবন প্রদান, সেসবের জন্য একটি দুর্মূল্য পানীয়ের ব্যবস্থা করা হয়।এই পানীয় তৈরির প্রক্রিয়া ও ফর্মুলা শুধু কয়েকজন বাছা বাছা ল্যাবোরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট জানে এবং মূখোশ ব্যতীত অন্য কেউ এটি পান করতে পারে না। সমুদ্র মন্থনের সময় মন্দার পর্বতের ওপরে বসে শয়তান ভূবনমোহিনীর ঐ ছল লক্ষ্য করেছিল। সেদিনই সে প্রতিজ্ঞা করে  অমৃতের বিকল্প বের করার। অমৃত দেবতাদের অমর করেছে এ কথা সত্যি কিন্তু না পারলো ওদের শক্তিশালী করে গড়তে,না পারলো শয়তানের প্রভাবমুক্ত রাখতে। শয়তান যে পানীয় তৈরি করেছে তা মুখোশদের শুধু অমর করবে তা নয়,শক্তিশালী এবং দুষ্ট প্রকৃতির হয়ে থাকতে চিরকাল সহায়  হবে। ঐ পানীয় তৈরি করার কৌশল জেনে গেলে দেবতা হোক কি মানুষ,পানীয়ের গুণগুলি নষ্ট করে দেবে। অদ্ভুত এর নির্মাণ কৌশল–
গিরগিটির রঙ বদলানো চামড়া,বাঘের চোখ,শেয়ালের চালাকি,বিড়ালের গোঁফ,সজারুর কাঁটা,টিকটিকির লোভী জিভ,ভাল্লুকের নির্দয় মুখ,হাতির দাঁতে তৈরী এই পানীয়। একটি গোপন পাকশালে এক বিরাট হাঁড়িতে সাত সাতটি অমাবস্যা ধরে ফুটতে থাকে । শেষে খুব ছোট একটি পাত্রে এই পানীয় বাঁ হাতে ধরে দাঁড়ায় প্রতারণা নামের মুখোশটি। এরপর শয়তানের নির্দেশে,মায়া,মোহ নামের মোহিনী নারীরা এই পানীয় মুখোশদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। সম্ভবত,এবারও এমন পরিকল্পনা ছিল।শয়তান গত বছরের পারফরম্যান্স রিপোর্টে সন্তুষ্ট ছিলো না।
প্রতি রাতে এক লক্ষ অবলার গণধর্ষণের সময়ের আর্তনাদ না শুনলে শয়তান বিছানায়  যেতো না। রাজনৈতিক দাঙ্গা,হত্যা,লুঠপাট না দেখলে ওর হাই উঠতো না। ধর্মস্থানে মানুষদের  ঠকানো হচ্ছে না দেখে ও আড়মোড়া ভাঙতো না।উগ্রপন্থীরা সক্রিয় না হলে ও বিছানায় শরীর ফেলতো না। পরিবার না ভাঙলে ওর তন্দ্রা আসতো না। সীমানায় যুদ্ধ না হলে তার ঘুম আসে না। অর্থনীতি,সমাজব্যবস্থা ছারখার না হলে ওর ঘুমে স্বপ্ন আসতে পারে না। তবে,কয়েক বছর ধরে সে এসবের গ্রোথ রেট ডবল ডিজিট্যাল করে নিতে পারেনি। মুখোশদের কিছু বলা যাবে না। মানুষরা শৈব,শাক্ত,বৈষ্ণব,হিন্দু,মুসলমান, খ্রিস্টান এভাবে ভাগ হয়ে গেছে। যদি আগামী দিনে মুখোশরাও এভাবে ভাগ হয়ে যায়!
সিংহাসনে বসে শয়তান ঐক্যের শপথ দেওয়ালো আর এর পরেই নির্দেশ দিলো ঐ অমূল্য পানীয় পরিবেশন করতে। পরিবেশন চলছিলো,হর্ষোল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল সকলে। শ্রাবণ অমাবস্যার অন্ধকার আর বৃষ্টি মিলেমিশে একাকার। ‘শয়তান,জিন্দাবাদ’  ধ্বনিতে  আকাশপূথিবীপাতাল  মুখরিত হয়ে উঠেছিল । এমন সময় এক মুখোশ  শয়তানের সিংহাসনের পাশে গিয়ে একটা নির্দিষ্ট দিকে দেখিয়ে দিলো। এক বিস্ময়কর দৃশ্য  !সৃষ্টির শুরু থেকে এখনো অব্দি এমন ঘটনা কখনো ঘটে নি।।
এতো দুঃসাহস!
এত অহংকার!
শয়তানের চোখ থেকে আগুন ঠিকরে পড়ছিলো।ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এলো তীক্ষ্ম কাঁটা।জিভ বাসুকীর মতো লকলক করতে লাগলো।হাজারটি হাতে শোভিত হলো কৃপাণ,ভাল্লা,ত্রিশূল এমন অনেক কিছু
“থামো।” গর্জন করে উঠলো শয়তান ।
পরিবেশন বন্ধ করে পরিচারিকারা স্থাণু পালটে গেল। মুখোশরা ভয়ভীত হয়ে পড়লো। শয়তান আঙুল নির্দেশ করলো এক দিকে। সকলে সেদিকে তাকিয়ে দেখলো,আরে! একটি মানুষ, মুখোশদের মাঝে লুকিয়ে থেকে পানীয়ের স্বাদ অনুভব করেছে। মুখোশরা মানুষটিকে ধরে ফেললো। কিন্তু ওকে তো মেরে ফেলতে পারবে না।শয়তানের খড়্গ হঠাত্  মানুষটাকে দু’টুকরো করে দিল।খণ্ডগুলি মরলো না। ওরা উবে গেল যেন!

       (ছয়)

ওই টুকরো দুটি আজও একান্তে আসে, যখন আমাদের শরীরে কিছু বেজে ওঠে। যখন সুশীতল মৃদু বাতাস বয়। বাঁশির সুর শোনা যায়,ঠিক সেসময় ওই দুই খণ্ড আসে। কখনো আমরা তাকে চিনতে পারি, আবার কখনো সে আমাদের  কাছ ঘেঁষতে  দেয় ন।।

তবুও মুখোশের এই মিছিলে  এ পর্যন্ত  আমাদের  পাশে আছে বিবেক  ও আশা।
  

                                                              *******

 
 
অনিল কুমার পাঢী- রিডার,ইংরেজি বিভাগ,কুঞ্জবিহারী কলেজ,পুরী।
  ১৯৮৬ সাল থেকে লিখছেন।এখনো অব্দি মোট ২৪টি গ্রন্থ,যার মধ্যে ১৫টি গল্প গ্রন্থ।উপন্যাস ৯টি।বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখছেন।বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত।
 
___________________________