প্রদীপ চক্রবর্তী-র গদ্য

Spread This
প্রদীপ চক্রবর্তী

প্রদীপ চক্রবর্তী

নীল পাহাড়ে কাঠের বাড়ি 

এক
বয়সকালের গান
•••••••••••••••••••••••
ভালোবাসাই কি জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি? ভালোবাসা ছাড়াই বা বাঁচে কী করে মন?
মানুষের সম্পর্কের এই মধুর ছন্দময় মানসিক আহার্যসঙ্গীত হলো এই ক্রমদীপিকার আলো। মানুষের লেখায় গানে ছবিতে তাঁর নিজস্ব সৃজনশীল স্বপ্নে এই অন্বেষা| কিন্তু প্রতিপ্রশ্ন একটা থাকে| ভালোবাসা পেলেই কি সৃজনশীল মনের গহন বেদনা দূর হয়? হয় কী?
জীবনানন্দ তাঁর চেতনায় যে জায়গায় পৌঁছেছিলেন তা যাবতীয় প্রাপ্তির উর্ধে| এক আধুনিক চরম বিষণ্ণতা তাঁকে গ্রাস করেছিল|
জীবনের জন্মান্তর মানুষের এক অলীক চাহিদা|
জীবনানন্দ জানতেন না, তাঁর মৃত্যুর পরে তিনি আরও জীবিত হবেন তাঁর রেখে যাওয়া লেখাগুলোর মধ্যে| জানতেন না, রামকিঙ্কর, মানিক, ঋত্বিক ঘটক,  মধুসূদন, বিনয়, সুব্রত চক্রবর্তী, যোগব্রত, কমলকুমার, ফাল্গুনী, শামসের আনোয়ার ۔۔۔ এভাবেই কেউ কেউ!
তবু কোনও মগ্ন রাতে বা বৃষ্টিভেজা নির্জন দুপুরে তাঁদের সৃষ্টি নিয়ে জনৈক পাঠিকা বা পাঠক মগ্ন উন্মাদনায় রক্তে যে সৃষ্টির বিষ তাঁদের, তুলে নেয় নিজের নিজের অস্তিত্বের গাঢ় সংবেদনায় ۔۔۔۔, যদি সেই সৃজনশীল মহাপ্রতিভারা জানতেন আজও এভাবেই কেউ কেউ বেঁচে থেকে মরে যায় তাঁদের সৃষ্টিকর্মে, তাহলে এইসব মহাপৃথিবীর মগ্ন চিন্তকরা আরও একটু বেশি বাঁচতেন কি এই তাঁদের প্রতি মানুষ – মানুষীর দ্বগ্ধ সমর্পিত ভালোবাসার পরিচয় পেয়ে?
না  এবং না| ভালোবাসা জীবনকে পূর্ণ করে হয়তো, সার্থক করে কিন্তু তাতেও এই সৃজনমনের অতৃপ্তি যায় না|
ব্যথা যা আপাত ভাবে নেই, কষ্ট বিষাদ বিষণ্ণতা বিরহ তিমিরঘন যন্ত্রণা এতটাই মনের দখলে থাকে যে পুড়ে পুড়ে নিজেকে নিঃশেষিত করার নামই হয়তো আরেক ভালোবাসার রূপকল্প। ভালোবাসার শক্তি যথেষ্ট কিন্তু চির অতৃপ্তির ব্যথা হয়তো মনের পূর্ণ দহন ও ভালোবাসার স্বরূপ| মনের এই খনন এই দহন এই তুচ্ছ অথচ তীব্র একাকিত্বের নির্বিকল্প সমাধির হয়তো কোনও উত্তর নেই ۔۔۔
” শোনো / তবু এ মৃতের গল্প , কোনো / নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই , / বিবাহিত জীবনের সাধ /কোথাও রাখে নি কোনো খাদ , / সময়ের উদ্বর্তনে উঠে এসে বধূ / মধু – আর মননের মধু / দিয়েছে জানিতে , / হাড় হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে / এ – জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই , /
তাই / লাশকাটা ঘরে / চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে “
এই চেতনা এই বিষাদ এই রক্তে মেশা আদিম অন্ধকার এই বিভ্রান্ত যুগের বিমূঢ় জীবনবৃক্ষের বিষাদদীর্ণ শিকড়, অনুভূতির সাহচর্য খোঁজার জন্যই আজও ভালোবাসার উষ্ণ অসম্পূর্ণতার ভেতর নিজেকে অন্বেষণ করে জীবনশিল্পী বা জীবন জুয়ায় হেরে যাওয়া প্রেমিক| আধুনিক মনন যদিও জানে ভালোবাসা শেষ আশ্রয় নয় শুধু| এরপরেও থাকে আত্মদংশনের নিভৃত ভাঙাচোরা মুখের বিকৃতি | যা হয়তো শিল্পের  সুষমায় সুন্দর নয়| তবু তবু ভালোবাসা এক অসম্পূর্ণ প্রতিবন্ধী শিশুর মতো পারঙ্গম হতে চাওয়ার আশা নিয়ে যে অসম যুদ্ধ চালিয়ে যায়, মেরে পাটপাট করে দেয় প্রতিদিন। সেই দিনানুপাতের খেরোর খাতায় জীর্ণ পৃষ্ঠার কোনো অসম্পূর্ণ শব্দের শেষে, আকাশপ্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একমাত্র ইচ্ছে গুলো| শুধু এই চলে গিয়ে একমনে ঝরে যাওয়ার ইচ্ছে। আকাশের কোণে কোণে পাখি নিয়ে খোলা আকাশে সমস্তটা ওড়ার ইচ্ছে ۔۔۔
দুই
সেই সারমেয়
••••••••••••••••••
সেই নিঃসঙ্গ একাকী বৃষ্টির অথৈ বিন্দুতে ধুয়ে যাওয়া সারমেয় | দেখছি , কীভাবে এই প্রথম কালবৈশাখীর ঝড় ও  বৃষ্টিতে একের পর এক ভরদুপুরে গেরস্ত বাড়ির বন্ধ দরজার সামনে আশ্রয়ের ব্যর্থ প্রয়াসে দিকদিশাহীন হয়ে ছোটাছুটি করছে | তারপর ? এবং তারপরই এ জন্মের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাটুকু দিয়ে গেলো সে ۔۔۔|
কোনো আশ্রয় পেয়ে , এমনকি কোনো বড়োগাছের  নিচে এই হঠাৎ নেমে আসা অশান্ত রঘুডাকাতের হৈ রৈ রৈ বাদল কালো ঘনঘটায় , একটুকরোও আশ্রয়ের উপায় না দেখে তার শেষ বেঁচে থাকার অস্ত্র সে প্রয়োগ করলো |
কী এমন করলো সে ? কী করলো ?
সেই মদ্দা ভাদ্রমাসের একাকী বিক্ষত কুকুরটি শেষে আপন পৌরুষে সমস্ত প্রতারিত আশ্রয় ছেড়ে দাঁড়ালো এসে অফুরো ঝরে যাওয়া বৃষ্টির কিনারায় | ফাঁকা আকাশের নিচে | এক অদ্ভুত পাঞ্চজন্য তার কণ্ঠে | না কান্না , না বিষাদ , না ব্যথা , না যন্ত্রণা , না বুভুক্ষের ভিক্ষা চাওয়া | না আকুল আশ্রয়ের প্রার্থনা ۔۔۔ ! এ যে অকুতোভয় পৌরুষ ! যে পৌরুষ নিয়ে হেলায় কবচকুণ্ডল কুন্তীকে দান করে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে কর্ণ | সেই না হেরে মরে যাবার আগে না মরে , সেই বীরের বীরগতিপ্রাপ্তি | সেই একাকী কালপুরুষের মতো অন্ধকার রাতের পাড়াপ্রহরী সারমেয় আমাকে যেন জাগিয়ে দিলো | এতবছর ধরে এতো করুণা এতো দয়া ভিক্ষা এতো উঞ্ছবৃত্তি দেখে দেখে , মানুষের কলঙ্কচিহ্নিত লোভের কাছে মাথানত মানুষ দেখে দেখে , একটু একটু  করে নিজের ভিতর ক্রমশ ধ্বজহীন আলোহীন এক বেঁটেখাটো অসুস্থ আমি’ কে দেখছিলাম | আজ সেই ইতিহাসহীন কুকুরটি দেখিয়ে গেলো | একাকী পৌরুষের সম্মুখ সমর | যার কোনো এগোবার আর পথ নেই , পিছবার রাস্তা কবেই বন্ধ ۔۔۔ !
এবং তাই অন্তিম যুদ্ধের আগে যে বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র পাঞ্চজন্য বাজাতে পারে | যে আশ্রয়ের জন্য সে হন্যে হয়েছিল সেই শেষ আশ্রয়কেও সে উপেক্ষা করতে পারে অবহেলায় | যখন মন বোঝে কোনো চাওয়া পাওয়া নয় কেবল , বিন্দু থেকে শিখর পর্যন্ত সমস্ত সমস্ত পৌরুষকে জড়ো করে জ্বালিয়ে দিতে হয় মায়ার শিকল | পুড়িয়ে দিতে হয় অহং ও সামাজিক যাবতীয় স্বীকৃতির কাঙ্খা |
সেদিনই দুপুরে প্রথম শিখলাম একজন পুরুষের দ্ব্যর্থহীন লড়াইয়ের প্রথম ও বিকল্প শব্দ ” পথের কুকুর | ” সবচে যার বড়ো আশ্রয় আকাশ | সবচে বড়ো প্রেম একাকিত্ব | আর লড়াই ? জীবনের অর্জন ۔۔۔
এসব ভাবতে ভাবতে ভেসে এলো পাশের বাড়ির বড়ুয়া কাকুর রেডিও থেকে একটা গান —
‘ আমরা মলয় বাতাসে ভেসে যাবো শুধু
কুসুমের মধু করিবো পান ,
ঘুমাবো কেতকী সুবাস শয়নে
চাঁদের কিরণে করিবো স্নান || “
বিষণ্ণ একলা দুপুরে ডি এল রায় একটা ভালোবাসা …
তিন
বসন্ত এসে গেছে ۔۔۔ !
••••••••••••••••••••••••
” ইয়া রব , জমানা মুঝকো মিটাতা হ্যায় কিস লিয়ে ,
লওহ – এ – জঁঁহা পে হরফ – এ মুকররার নহি হুঁ ম্যায় | “
সেই কবে মির্জা গালিব এক গজলে বলে গিয়েছিলেন , হে ঈশ্বর কাল আমাকে মুছে ফেলছে কেন ? পৃথিবীর পৃষ্ঠার উপর বাড়তি হরফ তো আমি নই | আমি সে অর্থে কবি বা পাঠক নিজেকে ভাবতেই অসংখ্যবার হোঁচট খাই | নিজেকে মনে মনে বলি , I am nobody …তবু গান ভেসে আছে দুর্নিবার জনপ্রিয়তার অভিঘাতে , ইউটিউব চ্যানেল থেকে লোকের মুখে মুখে … ‘ বাতাসে বহিছে প্রেম , নয়নে লাগিল নেশা / বসন্ত এসে গেছে …’
”  হস্তি হ্যায় নহ কুছ অদম হ্যায় , গালিব !
আখির তো কেয়া হ্যায় , অয় নহি হ্যায় ?”
সব আছে | না কিছুই নেই গালিব ? শেষপর্যন্ত কোনও ব্যাপার আছে কি ? নাকি কিছুই নেই ?
সেই কথাটা আবার কে যেন কানের কাছে গরম নিশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল | কী অদ্ভুত ভরাট একটা পুরুষালি গলা | সেই গলার রেশ আর অনুরণন নিয়ে চোখটা খুলে দেখি , বসন্ত কোথায় ? আবোলতাবোল ভাবি | সে অর্থে ভাবুকও নই | তবু কত কী ভেবে এসেছি এ জীবনে | পরিচিত ও অপরিচিত মানুষ পশুপাখি প্রাণী যাদের সঙ্গে নিজের ভাবনার মিল অমিল খুঁজতে খুঁজতেই বুঝেছি যে নিজের একান্ত বোধ ও চেতনার স্পর্শাতীত অনুভবগুলো আজো ভাষা না পেয়ে আমার সঙ্গে একান্তে বিন্দাস আছে | কারণ ভাষাহীন অকল্পনীয় সৌন্দর্য্য বা ভাবনার স্পর্শ পেয়েছি এজীবনে অনেকবার কিন্তু তাকে প্রকাশিত করার দুঃসাধ্য না দেখিয়ে উপভোগ করেছি অতলস্পর্শী ডাকে | এই ডাক এই আলেয়া এই বিষাদময়তা এই অলীক স্বপ্নের রূপকল্প এই  অরূপ মোহ ও মায়া এই প্রেম এই পাপ এই উত্তুঙ্গ নিজের প্রতি খামখেয়াল এই চলাচল এই জীবনের পাকে পাকে আধো আলোছায়ার রোম্যান্স আমাকে বিধুর করেছে , করেছে একাকীর প্রেমময়তায় পূর্ণ … |
যাইহোক এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ” শেষ বসন্ত ” কবিতাটির কিছু অংশ —
”  বেণু বনচ্ছায়াঘন সন্ধ্যায় তোমার ছবি দূরে
মিলাইবে গোধূলির বাঁশরীর সর্বশেষ সুরে !
রাত্রি যবে হবে অন্ধকার
বাতায়নে বসিয়ো তোমার |
সব ছেড়ে যাবো , প্রিয়ে সমুখের পথ দিয়ে —
ফিরে দেখা হবে না তো আর “
আহা … এ জীবনে কত কী না পড়ার চেষ্টা করেছি | কিন্তু এই কবিতার প্রাণে এমন একটা চলে যাওয়া বিষাদের আনন্দ আছে এমন একটা গভীর আরক্ত রেখায় পাখির আসা যাওয়ার মধ্যে বাঁশবনের দূর নিরালা সন্ধ্যায় এই
” তুমি ” – র স্থির ছবিটি দূরে মিলিয়ে যাওয়া আছে যে এর মধ্যে যখন একে একে হারিয়েছি যত প্রিয়জনদের যাদের সঙ্গে যুগযুগান্তে কল্পকল্পান্তে আর কখনও দেখা হবে না অথচ যারা চলে গিয়ে বেশি করে থেকে গেছে আমার মন প্রাণ নিশ্বাস জুড়ে | তাদের প্রতি এক অভূতপূর্ব প্রেম ও মায়া অনুভব করি , তাতে বুঝি বন্ধনের চেয়েও তার মুক্তি , আরো প্রগাঢ় প্রেমের বন্ধন | বুঝি মনে মনে কোনও রাজনীতির রাজাধিরাজ এই অনুভব থেকে আমাকে সরাতে পারবে না যে আদিমকাল থেকে পশুপাখির মতো মানুষও আদিম | তার কৃত্রিমতা তার সভ্যতার কাঁটাতার কখনোই আসল সত্যকে চাপা দিতে পারবে না | মানুষের কোনও দেশ নেই ভূগোল নেই মানচিত্র নেই এন আর সি নেই |
সে যতই জোর করে , আধিপত্য বিস্তার করে , নির্মম নিষ্ঠুরতায় ডিটেনশন ক্যাম্প গেস্টাপো গ্যাসচেম্বার গিলোটিন সাঁজোয়া গাড়ি সাজিয়ে রাখুক , ফুয়েরারের নিষ্ঠুর ঔদ্ধত্যের জবাব হিসেবে সময় ঠিক মুছে দেয় দিকদিশাহীন সংসারপৃথিবীর ক্ষত চিহ্নগুলো |
আমার মনে পড়ে সংসারপৃথিবীর পাড়ে সেই আসন্নসন্ধ্যায় দেখা শেষবারের মতো আমার নাম না জানা প্রেমিকাটির কথা | যে চিনিয়েছে ব্যথার মুক্তোগুলো পালিশ না পেলেও কত জ্বলজ্বল করে ওঠে ভোররাতের শুকতারার মতো | কত বন্ধনহীন এই প্রণয় ও পাশা | কত পাপ আর মুখোশ তাকে চিনিয়েছে প্রকৃত মুখশ্রী | এই দুহাত ভরা অন্ধকার , এতো অধিক আজ আলোকিত কেন ? কেন বিষাদময়ী , তুমি এতো সুন্দর ?
” আগোশ – এ – গুল কুশুদা বরা – এ – বিদা হ্যায়,
 আয় অন্দলীব চল কি চলে দিন বাহার কে | “
( মির্জা গালিব )
” গোলাপের কলিগুলো পাপড়ি মেলেছে বিদায় জানাবার জন্য , হে  বুলবুল চলো এবার , চলে যাচ্ছে বসন্তের দিন | “
চার
পৃথিবীর কঙ্কাবতী
•••••••••••••••••••••••
ব্যক্তি কখনও ব্যাপ্তি দেয় কখনো দেয় না | যখন অনেক পথ অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে পেরোনো যায় ঠিক তখন ব্যক্তি বন্ধুর কাছে যায় | অবশ্য বন্ধু কে ? প্রিয় সঙ্গ বলে কি কিছু অনেকদিন টেঁকসই হয় ? হয়তো হয় , হয়তো হয় না | আমি’ ই কি আমার প্রিয় সঙ্গ , সর্বদা ? নিজের ব্যক্তিসত্তার দ্বন্দ্ব ও অনেক আমি’ র প্রশ্ন মেটাতে গিয়ে নিজের জলমুকুর তরঙ্গ তুলে মিলিয়ে মিলিয়ে যায় | যায় কিন্তু একেবারে যায় না | ফিরে ফিরে আসে | বারংবার আসতেই থাকে |
নিজের বৃত্ত ভেঙে গুটি পোকার মতো ছড়িয়ে যাই | যাই কিন্তু সমগ্রের মধ্যে বেবাক হারাই নিজেকে …
এই আমি’ কে ভেঙে ভেঙে আমার প্রেম আমার বিষাদ | মনে পড়ে এই অবিস্মরণীয় কবিতার এই পংক্তিগুলো …
” অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে
তোমার মুখ অশ্রু ঝলমল
লিখিও , উহা ফিরত চাহো কিনা ? “
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই অবিস্মরণীয় কবিতাটির চলিত ভাষার মধ্যে পুরোনো চিঠির এসেন্স মাখানো | ‘ ফিরত চাহো কিনা ‘ সবাই উপভোগ করেন | কিন্তু এই সহজিয়া প্রশ্নের ভেতর ‘ অবান্তর ‘ শব্দপ্রয়োগের অতল – বেদনা – উদাসীন দুস্টুমি মনে করায় আরেক বিশিষ্ট গীতিকার গুলজারের কথা | যাঁর প্রিয় কবি ও বন্ধুর তালিকায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রথমেই আছে | ওপরের এই কবিতার অনুষঙ্গে যে অসামান্য গানটি তিনি রচনা করেছিলেন , সেটি আর . ডি . বর্মনের সুরে আশা ভোঁসলের কণ্ঠে , ‘ ইজাজৎ ‘ ( ১৯৮৮ ) সিনেমায় , অনুরাধা প্যাটেলের লিপে —
” মেরা কুছ সামান / তুমারে পাস পড়া হ্যায় / ও শাওন কে কুছ ভিগে ভিগে দিন রাখে হ্যায় / ও অউর মেরে এক খত মে লিপটি রাত পড়ি হ্যায় / ও রাত পড়ি হ্যায় / ও রাত বুঝা দো / মেরা ও সামান লওটা দো … “
এভাবেই আমিই আমার নিজের বৈরিতায় চিৎকার করে উঠি | আমার শূন্য এলোমেলো ঘরে যে ফেলে গেছে স্মৃতির টুকরো টাকরা , তাকে খুঁজে যাই | বলি , এভাবে চললে তোর আর মুখ দেখবো না | আজ’ ই তোর সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ | আরেক আমি তখন হিংস্র মন লুকিয়ে আরেক মনের পায়ে পড়ে যাই | কাকুতি মিনতি করি | এদিকে চোট আঘাত লুকোই | আবার অন্যদিকে মুখোশের মুখকে ঢেকে বিনয়ী হই | খিস্তি করে গর্জে উঠি | মনে মনে বলি , শালা তোকে বাগে পেলে পিষে মারবো | আবার অনুনয়ে ভিজে যায় | এভাবেই শান্ত মন অশান্ত মন প্রেমিক মন কামুক মন অহংসর্বস্ব মন ভোগী মন ত্যাগী মন উড়ুউড়ু মন ভ্রামক মন অন্যের ক্ষতি চেয়ে আনন্দিত মন , মেধাবী মন নাগরিক ও গ্রাম্য মন , সহজ জটিল ব্যথিত ক্ষতবিক্ষত নিঃসঙ্গ ও সঙ্গপিপাসু মন , কাউকে সহ্য করতে না পারা উপকারী উদাস দায়িত্ব প্রাপ্ত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন – সব্বাই একে অন্যের সঙ্গে মিশে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে এক বেবাক অন্তর্দাহ সৃষ্টি করে | এই অনেক আমি , কখনও বড়ো আমি ও ছোট আমি’ র বিরক্তিতে নাজেহাল , কখনো বড়ো আমি ও ছোট আমি’ র বিরক্তিতে নাজেহাল , কখনও অশ্রুসজল | এই আমিদের রাতের কল্লোল আমাকেও স্বেচ্ছাচারী করে | কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বেজে ওঠেন বুকের শিরায় —
”  সারঙ্গ , যদি ঝর্ণা ফোটাই তুমি আসবে কি তুমি আসবে কি / সন্তর্পণ পল্লব দোলে এতো অজস্র বন্ধু হাওয়া / গাছের শিরায় ফেটেছে নূপুর অমন নূপুর জলে ভাসবে কি | / পাহাড়খণ্ড পাহাড়খণ্ড ওর নৃত্যের দোষ  নিয়ো না হে | “
অদৃশ্য , মহাজাগতিক কোনো কোনো আলোর রশ্মি যেমন আমাদের দেহ ভেদ করে চলে যায় অলক্ষ্যে , তেমনি এই সমস্ত কবিতার খণ্ডিত অংশও বাজিয়ে যায় অলক্ষ্যে …
পাঁচ
চাঁদের বোন উদয়তারা
••••••••••••••••••••••••••••
নির্জনতার ভাষা আমার এখনো পর্যন্ত না ছেড়ে যাওয়া মুসাফির মনের বন্ধু | সেই কবে থেকেই তো ছুটছি | আর চলমান জানলার কাঁচে বৃষ্টিবিন্দুগুলো তার টপক তার  ক্ষণমনের বিভ্রম আমাকে  ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে |
গ্রামবাংলার লাজুক  গৃহকোণের নির্জনে পড়ে থাকা মেয়ের পুরোনো এসেন্স আর লাল মলমলের লুকোনো তোরঙ্গের কোণে গানের খাতাটির মতো আমার মায়েরও ছিল এরম এক গানের খাতা | বালক বেলায় মা’র সেই পুরোনো বেঙ্গল কেমিক্যালের ন্যাপথলিন গন্ধে ম ম করা তোরঙ্গ ঘেঁটে পেয়েছিলাম বলা চলে আবিষ্কার করেছিলাম এই খাতাটি | ভুলিনি খাতার সেই পুরোনো হলুদ পাতার শুকিয়ে যাওয়া এক বিষণ্ণ গোধূলির মতো গোলাপটিকে | তখন বুঝতাম না , কিন্তু দুহাজার সতেরো সালের পর মায়ের গানের খাতার প্রথম গানটির মর্মোদ্ধার করি আমি | তার আগে তো পান খেতে খেতে মুখ নামিয়ে এক বিষাদী এবং পৃথিবীর নির্জনতম বাঁশরী পাখিটির মতো সেই গায়িকার স্বকণ্ঠে সেই গান শুনেছিলাম এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় আমাদের শিল্পশহরের ছোট্ট এক অডিটোরিয়ামের ভেতর | সেই থেকে এ গান যতবার শুনেছি ততবার বুঝেছি , বিষাদ হলো মনের পরকীয়া | মনের এমন এক সুধা আছে যার ছোঁয়ায় আমি অমল না হয়েও পৃথিবীর পথে পথে বিষাদের চিঠি বিলি করেছি কবে থেকে |
গ্রামোফোন রেডিওর অনুরোধের ফেলে আসা আসরের মতো , মা আমাকে ঘুম পাড়াতো এই গানটি গেয়ে …  মৃদুহাতের কাঁকনগুলোর দিকে এক  দৃষ্টে চেয়ে আমি শুনতাম , চেয়ে চেয়ে –
” একটা গান লিখো আমার জন্য
না হয় আমি তোমার কাছে
 ছিলেম অতি নগণ্য
একটা গান লিখো আমার জন্য … “
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় কেয়া খয়ের দেয়া পান খেতেন | একবার অনেক বড়ো বেলায় আমাদের শিল্পশহরের এক অনুষ্ঠানে আমার দুই বন্ধুর সঙ্গে ছুটে গিয়েছিলাম তাঁর অটোগ্রাফ নিতে সাজঘরে | তিনি কেমন স্নেহ মেশানো কণ্ঠে নাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন | মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় দিয়েছিলেন অটোগ্রাফ … দেখতে দেখতে তিরিশ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলো |
” সে গান যেন আমায় উজাড় করে নেয়
সে সুর যেন আমায় ব্যাকুল করে দেয়
আমি যেন হই তোমার মাঝে ধন্য … “
তারপর কত কত বছর ধরে এই গান আমাকে একা হতে সাহায্য করেছে যাবতীয় ভিড় ও নির্জনতায় | তার ছায়া আলো আর সংসার পৃথিবীর মেঘ রৌদ্র এই গানটির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে কতবার …
দুহাজার সতেরোয় হঠাৎ আমার বাবা যখন পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহের সন্ধানে চলে গেলেন আমাদের সঙ্গে পথ চলতে চলতে হঠাৎ ,
সেই সফর সঙ্গীকে হারিয়ে আমি অবিকল আমার মায়ের মুখে দেখেছিলাম প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়া …
মা নীরবে তার শোক সামলে আস্তে আস্তে কেমন চুপ করে গেলেন | একদিন হঠাৎ সেই আবিষ্কৃত গানের খাতাটি মা’ কে দিতে মা বর্তমানে তার মৃদু কণ্ঠে আবার গুন্ গুন্ করলেন …
”  সেদিন আজো আমার মনে পরে যায়
তেমনি করে আমায় যেন খুঁজে পায় ” …
এই গান তাহলে দীর্ঘ কয়েকদশক ধরে একটি পরিবারে রয়ে গেলো এক অনাবিল শান্তি আর  নৈঃশব্দকে পরিব্যাপ্ত করে |
মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ভাঙা চাঁদ জ্যোৎস্নার ঝালরে খুব আত্মগতভাবে নিচু স্বরে টোকা দেয় আমার মনে আরেকটা গান নিয়ে আজকাল |
 ” নমকিন ” সিনেমার কিশোর কুমারের গাওয়া , গুলজারের লেখা ও পঞ্চম দা ‘ র ( আর ডি বর্মন ) সুরে | মুসাফির সঞ্জীব কুমার একজন ট্রাক ড্রাইভার | অন্তহীন পথের অব্যক্তে পৃথিবীপাড়ের দেশ পেরিয়ে সে কেবল শীত গ্রীষ্মে বর্ষা বসন্তে ছুটে চলেছে এক অন্তহীন উদাসী পারুষ্যে | এ পথের যেন শেষ নেই | পাতা ঝরে | জনহীন কত জনবহুল পথ পেরোতে পেরোতে , পিছুটানহীন এক গতিতে সে এগিয়ে যায় | পেছনে অরোরা বোরিআলিসের ছিন্ন মায়া | সে গেয়ে যাচ্ছে …
” রাহপে রাহেতে হ্যায়
ইয়াদো পে বসর করতে হ্যায়
খুশ রহ এহেলে বতন
ও , হাম তো সফর করতে হ্যায় …”
আমার সফর সেই অনির্দিষ্ট নির্জন নামক প্রেমিকার সন্ধানে | আর তো মাত্র কয়েকদিন |
তার আলো অন্ধকার কান্না আর শেষ রাতের আকাশে পুজোর গন্ধ মাখা হঠাৎ থালার মতো শব্দহীন চাঁদ উঠতে দেখে মন যখন হারিয়ে যাবে সুতমিতপরিবারকে পিছে ফেলে তখন , ঠিক সেই তখনই , পৃথিবীর নির্জন সফরসঙ্গী হিসেবে মনের কোণে পড়ে থাকবে এই গানটুকুই | অসমাপ্ত ভালোবাসার দু একটা অদ্ভুত রাস্তা থাকে | দু একটা ফাঁকা বহির্ভূত রাস্তা | মরিয়া ম্লান মায়াতুর …
ছয়
চালচিত্র
•••••••••••••
বাঙালি জীবনে ” উনুনের ভূমিকা ” কতটা গভীর শিকড়ে নাড়া দেয় এ অভিজ্ঞতা আমার মজ্জায় মজ্জায় | যেহেতু সত্তর দশকে জন্মেছি , লার্জার দ্যান লাইফ নয় , সামান্য মধ্যবিত্ত জীবনের মধ্যে থেকে আমার এ নিয়ে একটা পিছুটান আছে | সেসময় , আমার শৈশবের দুর্গাপুর শিল্পশহরে , ডি পি এল টাউনশিপে থাকতাম আমরা | দেখতাম কী যত্নে , বাবা কাঠের দোকান থেকে খন্ডিত কাঠের ফালাফালা পাটা ব্যাগে নিয়ে ঘরে আসছে | জগরু যাদব ছিল প্রসিদ্ধ ঘুঁটে বিক্রেতা | তার প্লাস্টিকের এক বস্তা ঘুঁটে পাবার জন্য বহু মামু কাকা লাইন দিতো তার পঞ্চাশ গরুর সম্মিলিত বিশেষ বাথানে | তো দেখতাম , ভোজন বিলাসী বাঙালি জীবনে কী সীমাহীন যত্নে উনুন সাজানো হয় | প্রথমে দেখতাম , সমানভাবে টুকরো করে কাঠ কেটে , উনুনে বিন্যাসক্রমে বসিয়ে , তার ওপর হালকা পাঁচ আঙুলের খোদাই বা ছাপের দাগ মাখা থিন এরারুট ব্রিটানিয়া বিস্কুটের মতো নমনীয় ঘুঁটে ভেঙে ভেঙে দিয়ে , তার ওপর কয়লা টুকরো করে রেখে , হালকা চুড়ো তুলে , তারপর জুট কেরোসিন তেলে ভিজিয়ে উনুনের নিচে অগ্নিসংযোগ করে তারপর নানারকম ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে , চোখের জল বের করে , ধোঁয়া উড়িয়ে সেই জ্বলন্ত অগ্নি – মান্দব একসময় প্রস্তুত হতো | কাঠ , ঘুঁটে , কয়লার আগুনের রঙ কেমন যেন বহুবর্ণের জাগলার মনে হতো | কত কোমল রঙের আগুন যেন ভোজনবিলাসী রাজা | তার থরে থরে কেঁপে ওঠায় যেন উষ্ণহিম নরনারীর সম্পর্কের মতো নীরব আসক্তিতে সম্মত | ধীরে ধীরে কমে আসে আগুনের মুখের রক্ত | আর তার ফুরোনো রক্ত ওষধি মেখে , উনুনের রান্নার সূক্ষ্ম স্বাদ আরো সূক্ষ্মতর হতো |
তার অপরূপ ব্যঞ্জনকলায়  যে রান্নার স্বাদ – উৎসব হয়ে লেগে থাকতো ছেলেবেলার অল্পলাল নতুন ভাষার মতো জিভের কোণে কোণে , তা আজ আর পাই না …
সব শুরুরই শেষ আছে | ঠিক সে ভাবেই একসময় আমাদের শিল্পশহরে দেখলাম , ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত জীবন থেকে উনুনের প্রভাব কমছে | তার পরিবর্তে এলো ইলেকট্রিক হিটার | এবং তার অনেক পরে এলো রান্নার গ্যাস |
শ্রদ্ধেয় চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন , তাঁর ” চালচিত্র ” নামক কাল্ট সিনেমায় , নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনে উনুনের বাস্তব ও খন্ডহর ভূমিকা দেখিয়েছেন | এর অনেক আগে বিশিষ্ট পরিচালক তপন সিনহা ” গল্প হলেও সত্যি ” সিনেমায় দেখিয়েছেন , বাড়ির বৌদের অষ্টপ্রহর এই রান্না নিয়ে চুলোচুলির ভেতর , মুস্কিলআসান রবি ঘোষ কিভাবে মধ্যবিত্ত জীবনের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া গুলোকে একটি স্বপ্নের বিনিসুতোর মালার মতো গেঁথেছিলেন |
যা বলছিলাম , মৃণাল বাবুর ” চালচিত্র ” সিনেমায় খুব সুন্দর ভাবে দেখানো হয়েছে , কিভাবে ভাড়ার বাড়িতে শ্যাওলাধরা উঠোন ঝাঁ চকচকে করা যায় , তার মহিলামহলে বারোয়ারি প্রতিযোগিতায় | উনুনকে প্রতীকী হিসেবে দেখিয়ে তার সুসময় ও দুঃসময় নিয়ে , কিভাবে আস্তে আস্তে মুক্ত অর্থনীতির পরোক্ষ প্রভাবে সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে উনুন বাঙালি জীবন থেকে ব্রাত্য হয়ে যাচ্ছে একান্নবর্তী সংসারের সূক্ষ্ম বাঁধনকে আলগা করতে করতে | সে সময় থেকেই রান্নার কয়লার দাম হু হু করে বাড়তে থাকলো এবং জ্বালানি বিভ্রাট শুরু হলো | তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছিলো না মধ্যবিত্তের পকেটের রেস্ত | রান্নার গ্যাসের ডিলারের আগে বিভিন্ন মফস্বল শহরে ঘুঁটে ও কয়লার ডিলারের ছিল মারকাটারি বাজার | সেসময় বাড়ির গিন্নিরা তুলসী তলার মতো উনুনে নিয়ম করে যত্ন সহকারে গোবর জল লেপতেন | উনুনের মান ও আয়ু যাতে টেকসই হয় , তার কথা ভেবে | মৃণাল বাবু , এ সিনেমায় দেখিয়েছেন , কিভাবে ক্রমশ উনুনের সময় ফুরোলো | এবং গ্যাস আসতে শুরু করলো বাজারে |
একে একে অনেক কিছুই তো বিদায় নিলো এভাবে | বিদায় নিলো রেডিও | নানারকম গানের অনুরোধের আসরের সীমাহীন জনপ্রিয়তা | রেডিও নিজেই বিদায় নিতে নিতে এখন কেবল এফ এমে দাঁড়িয়েছে | হারালো কুকুরমুখো গ্রামোফোনের লংপ্লেয়িং রেকর্ড | একে একে হারালো ক্যাসেট , সাদা কালো ঢাউস সাটার দেওয়া টিভি | হারালো মানুষের গভীর জীবন থেকে , গল্প দাদুর আসর , উনো জমির দুনো ফসল , মহিলা মহল , রেডিওর নাটক ,  প্রাত্যহিকী , কথিকা , ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার বাংলা ধারাবিবরণী | অজয় বসু , পুষ্পেন সরকার , সুকুমার সমাজপতি থেকে শুরু করে , দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় , তরুণ চক্রবর্তী , নীলিমা সান্যাল , বরুণ চক্রবর্তীদের কণ্ঠের ঐশ্বর্য্য | এখনো হয়তো কিছু কিছু অনুষ্ঠান টিকে আছে | এসব আর কেউ শোনে না | কলকাতা দূরদর্শনের অনুষ্ঠান সেভাবে কেউ কি দেখে এখন ? দূরদর্শনে পঙ্কজ সাহার পরিচালনায় বহু গুণী শিল্পীদের নিয়ে  , নববর্ষের অনুষ্ঠান কেউ কি দেখে সেভাবে এখন , এই প্রাইভেট ঝাঁ চকচকে আজব কল্পিত মূর্খ মেগাসিরিয়ালের যুগে  ?
বিশেষ দ্রষ্টব্য — শেষ সংযোজন যেটি সেটি হলো , শ্রদ্ধেয় মৃণাল সেন মারা যাবার পর , তাঁর প্রবাসী পুত্র  কুণাল সেন  , মৃণাল সেনের  চিঠিপত্র , পুরস্কারের স্মারক সহ  অনেক  কিছু দান করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষণশালাকে  | যেখানে স্বামীবিবেকানন্দের অনেক কিছুই সংরক্ষিত আছে | এভাবেই বাঙালির সংস্কৃতির শিকড় আলগা হচ্ছে অনেকদিন ধরেই | আমোদগেঁড়ে বাঙালির যেকোনো বিষয় নিয়ে অশ্লীল খিল্লি করার লঘু প্রয়াস কেবল টিকে আছে এখন !
সাত
ভ্যান গঘ , পল গ্যগ্যাঁঁ ও সিলভিয়া প্লাথ
 ••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
 
আর্ট হিস্টিরিয়ান জন রিবাল্ড ১৯৩০ সালের একটি লেখায় দুটো নতুন তথ্য দিয়েছিলেন | এতদিন পর পড়তে গিয়ে ভুল কিছুটা ভাঙলো |
এক . ভ্যান গঘ জীবনের শেষ এক খ্রিষ্টমাসের দুদিন আগে , ২৩শে ডিসেম্বরে কান কেটেছিলেন হতাশায় , বা তার খ্যাপামো থেকে – এটা একটা মিথ | বিতর্ক আছে তার পরিচিত ও অল্প কদিনের বন্ধু শিল্পী পল গ্যগ্যাঁঁ ভ্যান গঘের সঙ্গে একটি বিশেষ বিতর্কে জড়িয়ে যান | বিতর্ক ক্রমে রাগ , ক্রোধ এবং শেষে হাতাহাতির পর্যায়ে নেমে আসে | এই হাতাহাতি এমন  তীব্র আকার ধারণ করে যে শিল্পী পল আত্মরক্ষা করতে গিয়ে তাঁর তরবারি দিয়ে ভ্যান গঘের কান অসতর্ক মুহূর্তে কেটে ফেলেন | পল রীতিমতো মুষ্টিযুদ্ধ ও তরবারি খেলায় পটু ছিলেন |
দুই . ভ্যান গঘ সুইসাইড করেছিলেন , তাঁর ব্যর্থতায় হতাশায় নিজেকে গুলি করে | এটাও একটা জনপ্রিয় মিথ | একজন শিল্পী , আর্থিক কষ্টে , হতাশায় হয়তো কখনো আত্মহত্যা করেন | কিন্তু বিতর্ক আছে , ইয়ার্কি করতে গিয়ে গুন্ডা বদমায়েশ যুবক Rene Secretan পুরোনো বন্দুক নিয়ে খেলা করতে গিয়ে আচমকা তার হাত দিয়ে গুলি ছিটকে যায় |
অন্যদিকে পড়ছি সিলভিয়া প্লাথ | ( অক্টোবর ২৭ , ১৯৩২ – ফেব্রুয়ারি ১৭ , ১৯৬৩ ) | এতো অল্পদিন ? এতো হেলাফেলার জীবন ? এভাবে নষ্ট করে ফেলা ? সিলভিয়া প্রতিভাময়ী , কবি , ঔপন্যাসিক এবং মানসিক ভারসাম্যহীন | পড়ছি সিলভিয়ার লেখা ছোট ছোট চিঠি ও ডাইরির অংশগুলো | আত্মবিহ্বল না অনির্বচনীয় এক কিঞ্চিৎ জীবনের নিজের শর্তে নিজের মতো করে বাঁচা এবং মৃত্যুকে নিপুনিকার মতো একই পংক্তিতে বসিয়ে খেলাচ্ছলে খেলে যাওয়ার নেশা ! বাঁচার নেশা না আকণ্ঠ বেদনায় ডুবে বীতস্পৃহ জীবনের প্রতি মৃত্যুর আসক্ত , ব্যুহ রচনা ? এই প্রশ্ন ও প্রতিপ্রশ্নের চিরায়ত বিষাদ নিয়ে পড়তে থাকি সিলভিয়ার ডাইরি – ” কখনো পারবো কি , এই যে এতো বই , সব পড়ে শেষ করতে ? ইচ্ছে তো খুব , একার মধ্যে বহু হয়ে থাকার , জীবন কাটাবো যখন যেভাবে খুশি | সাধ হয় সবকিছুতে পটু হতে , সাধ্য নেই | বাঁচতে খুব খুউব ইচ্ছে করে | সব রং , আলো , ছায়া , রস রূপ , সুরভি নিয়ে | যতরকম মানসিক ও শারীরিক অস্তিত্ব সম্ভব , সবটুকু শুষে নিয়ে যেন সোচ্চারে বাঁচি , কিন্তু যে কী  নিদারুণ সীমাবদ্ধতা | “
তাই কি সব আলো ছাপিয়ে হতাশার
 কৃষ্ণছায়া ?
মাত্র তিরিশবছর পেরোতে না পেরোতেই আত্মহনন ?
সিলভিয়ার কবিতা confessional poetry – র ধারক | তার দুটি বিখ্যাত কবিতা সংকলন
 – ” The colossus and other poems ” আর
 ” Ariel ” …
১৯৮২ তে মরণোত্তর পুলিৎজার পুরস্কার | একটা আধা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ” The Belljar ” | মাত্র ৮বছর বয়সে পিতৃহীন সিলভিয়া | এবং ততদিন ঈশ্বররের প্রতি বিশ্বাস তার সারাজীবনের জন্য উবে গেছে | বাবার সমাধি দেখে ফিরে এসে সিলভিয়া লিখেছিলেন ,
” Electra on A zalla Plath |” পরে প্লাথ লিখেছিলেন , ” তার জন্মের পর প্রথম ন ‘ বছর যেন ওই স্বচ্ছ কাচের বোতলে বন্দি জাহাজের মতো | সুন্দর , ধরা ছোঁয়ার বাইরে | বস্তা পচা , নজরকাড়া সাদা এক দুরন্ত পুরাণকথা | “
প্রচন্ডভাবেই স্ববিরোধী এবং সংশয়াচ্ছন্ন ছিলেন সিলভিয়া | ১৯৫৬ সালে সিলভিয়া বিয়ে করেন কবি  টেড হিউজেসকে | দুটি ফুটফুটে ছেলে মেয়ে | ফ্রিডা আর নিকোলাস | কিন্তু সুখে থেকেও আপন মুদ্রাদোষে কেন এতো তীব্র বিষাদ আর হতাশায় দিন দিন ডুবে যাচ্ছেন সিলভিয়া ? অক্টোবর ১৯৬২ , কবিতা লিখছেন একের পর এক | ইতিমধ্যে স্বামী চলে গেছেন অন্য নারীর সঙ্গে | ভাঙা মনে আরো বিষণ্ণ সিলভিয়া |
মাকে কখনো লিখছেন চিঠিতে , ” সারা পৃথিবী আমার পায়ের নীচে ফেটে চৌচির | যেন পাকা রসালো তরমুজের লালিমা | ” ডিপ্রেশন চূড়ান্ত আকার নিলো | হতাশা থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা |  ১৯৫৩ | এক গাদা ঘুমের ঔষধ খেলেন | তিনদিন যমে মানুষে টানাটানি | ফিরে এলেন | এবং মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসে লিখলেন , ” আমি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলাম আমার চারপাশের এই অন্ধকারের ঘূর্ণির কাছে , যাকে ভেবেছিলাম এক চিরন্তন বিস্মৃতিমাত্র |”
পড়ছি এক নিঃশ্বাসে | আর ভাবছি | …
পরের ছমাস মানসিক হাসপাতালে | আবার পড়াশোনার জগতে ফেরা | লিখছেন উপন্যাস — ” The Belljar |” কিন্তু এই Anti – depressant নিয়ে আর কতকাল বাঁচবেন তিনি | রোজ  মানসিক চিকিৎসক আসেন | এবং একদিন সেই শেষের মুহূর্ত | প্লাথের মাথা গ্যাসচুল্লিতে ঢোকানো | গ্যাসের নব খোলা | কার্বন মনোক্সাইডের তীব্র বিষক্রিয়ায় মৃত্যু | দুই বাচ্চা অসহায় ভাবে চেয়ে আছে হিমশীতল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মায়ের দিকে | তখন ফ্রিডার বয়স দুই | নিকোলাস ন ‘ মাসের |
সিলভিয়ার কবিতায় এসেছে বারংবার চাঁদ , রক্ত , হাসপাতালের গন্ধ , ভ্রুণ , করোটি |
কবিতায় ডিলান টমাস , ইয়েটস , আর মারিয়ান মুরের প্রত্যক্ষ প্রভাব | ১৯৬০ ‘ এর পর কবিতায় surrealistic নিসর্গ চিত্র | সঙ্গে বন্দিদশার অব্যক্ত যন্ত্রণা আর মৃত্যুর নিঃশব্দ পদসঞ্চার |
আত্মহননের আগে প্রিয় বন্ধু আলভারেজকে একটি চিঠিতে লিখছেন , ” ঠিকঠাক ভাবতে পারি নি , বলতে পারি নি , লিখতে পারি নি …
যন্ত্রণার আগুনে পোড়াতেও পারি নি নিজেকে |
শেষ করে ফেলা নিজেকে একবার | দায়িত্ব সর্বনাশা | দায়িত্ব ভয়াল রাক্ষস | আমি ফিরে যাবো মাতৃগর্ভের ওই নিশ্চিন্ত নিরাপদ অন্ধকার তরলে | থেকে যাবো ভাসমান আনন্দিত অস্তিত্ব হয়ে | “
তার কবিতা পড়ছি | কত অস্থির হচ্ছি | তার জীবনের অস্থিরতা শব্দান্তরসাধ্য অস্থিরতায় আমার ইন্দ্রিয়ানুভূতি বিপর্যয় ঘটিয়ে চলেছে এক নাগাড়ে | ক্ষরিত আলোর মতো রক্তের  তাপে যেন যুগপৎ আনন্দ ও তিক্তের ওতপ্রোত নিঃশ্বাস ও নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেয়েছি | অস্থিরমনা অকালপ্রয়াত বিষণ্ণ সিলভিয়াকে যেন আবিষ্কার করছি শেষ বিকেলের নরম আলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে —
” ঠিক যেমন নদী নিজের মনে ছেনালি করে
জলে ডোবা মরচে – লাল ইঞ্জিনটার সঙ্গে
আমার চোখ টানতে চায় ওদের দিকে ,
… ওরা খুশিয়াল চোখে
খেলা … বিশ্রাম … খেলা …
কোনোরকম শর্ত ছাড়াই …
 দেওয়ালগুলো পর্যন্ত কেমন শত্রু হয়ে উঠেছে !
উষ্ণতা ছড়ানোর ফিকির !
এই টিউলিপগুলোকে খাঁচায় বন্দী করো তো !
হিংস্র জন্তু সব !
দাঁত নখ থাবা …
আফ্রিকান বনবিড়াল !
আর আমি … আমি বুঝতে পারছি ,
আমার হৃদপিন্ড খুলছে …বন্ধ হচ্ছে …
ভলকে ভলকে রক্তিমা উঠে আসছে ,
পাপড়ি মেলছে …
আমাকে বড্ডো ভালোবাসে তো !
আমার ভিজে ঠোঁটে জলের স্বাদ উষ্ণ ,লোনা ,
সমুদ্র জলের মতো …
ওরা এসেছে সাগরপারের দেশ থেকে …
অনেক দূরের নাগালের বাইরে যে দেশ …
জীবন ! “
( অংশত কবিতা / মূল কবিতা : Tulips )
 
পয়লা বৈশাখ / ১৪২৮ / দুর্গাপুর
 
সমস্ত ড্রইং – শিল্পী সঞ্জয় রক্ষিত 
বন্ধু ও প্রিয় শিল্পী সঞ্জয় রক্ষিতের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই ۔۔۔