তদোগেন গিরতে-র গদ্য

Spread This

তদোগেন গিরতে

হামানদিস্তা

কী হয়! মাঝরাতে হামানদিস্তা ঠোকে ওপরের বাড়ি, ঘুম ভেঙ্গে যায়। বিরক্তির ভেতর শুয়ে থাকি কোনোক্রম, কানের ওপর জগদ্দল বালিশ। ওপরের বাড়ি, দক্ষিণ ভারতীয়। সম্ভবত সকালে ইডলির ব্যবস্থা। নাগরাজন আমাকেও ডাকে, কোনো কোনো বরষার দিন। চাটনি প্রবল ঝাল, সাম্ভর। শিস টানি। বাইরে চঞ্চল হয়ে ওঠে ময়ূরময়ূরী। নাগরাজন, তার বৌ মালা আর লনের ময়ূর– এই পৃথিবীর সঙ্গে আমার সমস্ত সম্পর্ক বাস্তব। বাস্তব ওই রাত কাঁপিয়ে ওঠা হামানদিস্তা। আজ সাতবছর হোলো নাগরাজন দিল্লী চ’লে গেছে ট্রান্সফার নিয়ে, সঙ্গে মালা ও তাদের একমাত্র মেয়ে।

ইভিল

সাঁই, আমি তো বলতেই পারি—‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর’—কিন্তু পৃথিবীর কোনো ওজন-যন্ত্র, ব্যারোমিটার কি মাপতে পারে– ক্লান্তি কতটা হলে ক্ষমা করা যায় আর কতটুকে পিঠে-পাছায় চাবুক? অনুমান। অনুমানই একমাত্র। আর অনুমানের বদল সময়ের সাথে। সময় কী? সূর্য ওঠা থেকে ডোবা ও ফের ওঠার পর্ববিভাগ? ঋতু। পৃথিবীর আহ্নিক বার্ষিক গতি, চাঁদ, সূর্য। সময়ের টেক্সচার কী? তবু আমরা মেপে ফেলি, যেমন পালস রেট থেকে সেরিব্র্যাল অ্যাকটিভিটি থেকে মেপে ফেলি মিথ্যা। না মাপি না। অনুমান করি। একদিন আমরা মেপে ফেলব, সমস্ত কিছু। সমস্ত অ্যাবস্ট্রাক্ট। সত্য, মিথ্যা, দয়া, মায়া, আক্রোশ, অ্যাম্বিশন, ভালোবাসা, কামনা, সৌন্দর্য্য। কিন্তু ইভিল? ইভিল-এর বাংলা কী? অশুভ? সে ‘শুভ’র বিপ্রতীপে দাঁড় করানো এক শব্দ মাত্র, তার নিজস্ব অস্তিত্বের ওজন কোথায়? শয়তানি? সে বড় দুর্বল শব্দ। এই উত্তরপ্রদেশে—বাচ্চার দৌরাত্ম্যকেও স্নেহবশে শয়তানি বলেই ডাকা হয়। তা’ছাড়া শব্দের উদ্ভব থেকে বিচার করলে সে আসে শয়তান বা স্যাটান থেকে—আব্রাহামিক ধর্মগুলির থেকে উদ্ভূত এই শয়তানের ধারণা। হয়ত জোরাস্ট্রিয়ান। আহরিমান, লুসিফার, ইবলিশ।
হিন্দু সংস্কৃতিতে ধর্মরাজ, যম। অবজেক্টিভ বিচারক। পাপীকে নরকে শাস্তি, পুণ্য মানুষের জন্য স্বর্গ। আব্রাহামিক ধর্মে শয়তানের আয়ত্তে পাপীদের আত্মা। প্রশ্ন হলো শয়তান পাপীদের শাস্তি দেয় কেন? যত বড় পাপী, নরকে তো তাদের জন্য সিংহাসন বরাদ্দ থাকার কথা। শয়তান, সে তো করাপ্টপর, প্রলোভন– অপর দিকে ঈশ্বরপ্রদত্ত ফ্রী উইল—শয়তান; শুধু নিজের তরফে আত্মা জোগাড়– তবে শাস্তি কেন? পাপীদের যদি শাস্তিই হয় তার বরাদ্দ সন্ত পিটারের হাতে থাকলেই তো ল্যাঠা চোকে। এ কেমন যোগসাজশ? তবে কি শয়তানও আদতে ঈশ্বরের কর্মচারী, অথবা স্যাডিস্ট? তার নিজের বরাদ্দের আত্মা নিয়ে অত্যাচার—এইটুকুই? লজিক্যাল ফ্যালাসিও একদিন পরিমাপযোগ্য হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু আপাতত নেচার অফ ইভিল নিয়ে কথা হোক।
চার অনুজ পান্ডব নরকভোগ করেছিল, অধিকাংশই ভ্যানিটিদোষে— জ্ঞান, সৌন্দর্য্য, ধনুর্বিদ্যা, বল। এছাড়াও ভীমের ক্ষুধা, অপরের চিন্তা না ক’রে সিংহভাগ ভোজন। দ্রৌপদীর অর্জুনমুখী প্রেম। আর ওই একবার মিথ্যাকথনের দোষে যুধিষ্ঠির—অশ্বত্থামা হতঃ…। দূর্যোধন অকলুষ, রাজধর্ম পালন, এই মাত্র। তবে এ দোষ, চারিত্রিক স্থলন কিছু। অপরকে আঘাত না করে ভ্যানিটি যদি থাকেই—সে নিয়ে আপত্তির কারণ তো দেখি না। ক্ষুধা শারীরিক। প্রেমের একমুখগমণও ব্যক্তিস্বাধীনতা। বরং এর চেয়ে অনেক ইন্টারেস্টিং ঋষি শৌনক ও তাঁর মরাল ডিলেমা। সে নিয়ে কথা আর কখনো।
আপাতত, নেচার অফ ইভিল। আত্মসংরক্ষণে হত্যা কি ইভিল? যে মানুষ মারে বস্তুতান্ত্রিক কোনো লাভের তাগিদায়—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক—সে কি ইভিল? অথচ আত্মসংরক্ষণ প্রত্যেকটি প্রাণীর বুনিয়াদি অধিকার। সাপ কামড়ায় সে শয়তান বলে নয়, তার স্বভাব খল নয়—সে কামড়ায়; হয় শিকারে, নয় ভীতিতে, কিছু ক্ষেত্রে নিজের এলাকার অধিকারের দাবীতে, বিরক্তিতে। প্রত্যেকটি হত্যা, ভায়োলেশন শাস্তিযোগ্য, কিন্তু প্রশ্ন সে নিয়ে নয়—ইভিল নিয়ে। আর যে ক্লিনিক্যালি অসুস্থ, সাইকোপ্যাথ, সোশিওপ্যাথ?
তখন সুইডেনে—ক্যানসার কোষে, ইঁদুরে যে কাজ আমাদের, তার হিউম্যান ভেরিফিকেশান চাই, আমরা অপেক্ষা করি লাশের—যার লিভার থেকে হেপাটোসাইট বের করে কাজ করা যাবে। নিরাশ হই বৃদ্ধের মৃত্যুতে যার লিভার ফ্যাটি, সাদা ক্যারামেল মাত্র, কোনো কাজের নয়। অপেক্ষা করি, অ্যাকসিডেন্টে মৃত যুবক, তরুণের—পেলে উল্লাস। মুহূর্তের জন্য ভুলে যাই, প্রাণ, ইমোশন, আত্মীয়স্বজন—শুধু নিজের কার্যসিদ্ধির উত্তেজনা। লিভারের টুকরো কোলাজিনেস ও অন্য উৎসেচকে ফেলি, নাইলন জালের মধ্যে দিয়ে সূক্ষ্ম টুকরো করি। যখন মানুষের মৃত শরীরের, অঙ্গের গন্ধে খেতে পারি না, রাতের ঘুম উড়ে যায়, তখন মৃত্যুর ধারণা রোমকূপে এসে বেঁধে, জীবকে বস্তু ভেবে নেওয়ার মত ভুল।
কেউ আত্মসংরক্ষণে প্রাণ নেয়, কেউ কৌতূহলের বশে—এ সমস্তই যার কোন ব্যবহারযোগ্য দৃষ্টিকোণ আছে, পাওয়া আছে—বস্তু বা ভাবসংক্রান্ত; যেমন যৌনউত্তেজনা। কিন্তু কেউ অন্যকে ভায়োলেট ক’রে শুধুমাত্র সে এ কাজ করার ক্ষমতা রাখে বলেই, সেখানে ম্যাগনিচ্যুড নয় ইন্টেন্ট ধার্য—হত্যা, ধর্ষণ তো দূর থাক, টিফিন কেড়ে নেওয়া্টুকুও সে ক্ষেত্রে পিওর ইভিল। আর যে তার জন্য অনুকূল আবহাওয়া গড়ে দেয়, সেও।
ভিটে
ঠাঁই নেই। বিচার ছাড়াই অপরাধীর তকমা, নিগ্রহ। যাযাবর তারা নিজের ইচ্ছায় নয় অবস্থার পাকে হয়েছিল। হয়তো ভারতীয় উপমহাদেশ—আজকের রাজস্থান, হরিয়ানা পাঞ্জাব বা কাশ্মীর থেকেই ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়েছিল– নয় নয় করে সেও প্রায় হাজার বছর। নানা ঘাট ধরে ইয়োরোপে পৌঁছায়, আমেরিকাতেও। তাদের গায়ের চাপা রঙ, বিজাতীয় সংস্কৃতি নিতে পারেনি স্থানীয় মানুষ। হাঙ্গারি তাড়ায়, পোল, চেক, স্লাভ, সার্ব, ক্রোট, বস্ক, ইস্পাহানি, গল, রোমানিয়া, বুলগার, জার্মানি, স্ক্যান্ডিনেভিয়া…–কখনো চোর, খুনী ব’লে, কখনো কালা জাদুর দায়ে। এক জনপদ থেকে অন্যে তাদের হন্যে ঘুরে বেড়ানো। ধীরে ধীরে স্থান তাদের মুক্ত করে দেয়। পড়ে থাকে কাল। আর স্থান ছাড়া যে কাল থাকে সে বড় ডিস্টর্টেড। বিকৃত, তোবড়ানো। তল্পি খোলা আর বাঁধা, তাঁবু গাড়া আর গুটিয়ে নেওয়ার মধ্যে যে’টুকু সময়খন্ড মাংস চিবিয়ে খায়, স্মৃতি। জায়গা সম্পর্কে, জলবায়ু– স্মৃতি যা ঘোড়ার জাবনার মত বেলায় বেলায় ফুরায়, গলায় কোথাও তার কাঁটা খচখচ করে। এদের নিত্যব্যবহার্যে যেটুকু রঙিন সুতোর কাজ, নানা দেশের মুদ্রা, চাকতি সাজিয়ে তৈরি ঘুঙ্ঘট, বন-ফায়ার ঘিরে যেটুকু গান-বাজনা, নাচ যার একটুকরো রোমানিয়া থেকে তোলা তো অপর টুকরো হাঙ্গারি—সেই এদের শিল্প। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানো বিভিন্ন দলের গানে নাচে সেই সেই দেশের ছাপ—যৌগ। একসময় পারস্যেও ছিল তারা—কবি ফিরদউসি জানান; সম্রাট এদের বহিষ্কার করেছিলেন। দেখলেই ফাটকে পোরার কথা। অথচ এই আইন লাগু থাকা কালীনই সম্রাট হাজার ‘রোমা’-কে ডেকে পাঠান এক গান নাচের আসরে তাদের ‘ল্যুট’ বাজানোর পারদর্শীতার কথা জেনে। প্যারাডক্স। প্যারাডক্সই। যে বসতি তাদের তাড়ায় তাদেরই সুর চোরকাঁটা হয়ে কখন ঢুকে পড়ে এদের গানের বুনোটে। আজ তাদের হাতে গীটার। কিন্তু কোনো টিভি চ্যানেল তাদের অনুষ্ঠান রাখতে চায় না, রেডিও সময় দেয় না। টাট্টু, খচ্চরের জায়গায় আজ তারা তোবড়ানো ট্রাকে, এস ইউ ভিতে ঘুরে বেড়ায় এক ভূম থেকে অন্য ভূমে। আজ তারা যাযাবর বাই চয়েস। বংশের যারা থিতু হয়, মূলস্রোতে বিয়ে-শাদি করে, বাড়ি বানায়, কলেজে যায়—তারা পর হয়ে যায়। ত্যজ্য। অনেকে থিতু ত্যজ্য জিপসি বিখ্যাত হয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে, তার রোমা পরিচয়ের ‘এক্সটিক’ খোলস বজায় রেখেই। কেউ কেউ জিপসি আর্টিস্ট হিসেবেও নাম করে। কিন্তু যদি স্বকীয় স্বতন্ত্র জিপসি শিল্পের কথা বলা হয়—সে রকম কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আর যার নিজস্ব শিল্প নেই বা থাকলেও তার প্রচার নেই, মূলধারায় গ্রহণযোগ্যতা নেই তাকে অন্য মানুষ, মূলধারার জনগোষ্ঠী অতি আয়াসেই, তার নিজের বানানো মরালিটির তোয়াক্কা না ক’রেই অবজেক্টিফাই করে। কাউকে চিড়িয়াখানায় এক্সিবিট ক’রে রাখে—যেমন আফ্রিকার কালোদের এককালে লন্ডন, পারী, হামবুর্গ, অ্যান্টওয়ের্প, নিউ ইয়র্ক– অ্যাবরিজিনিসদের শিকার করে– দাস করে রাখে; কালো, জিপসি, আদিবাসিদের—আজ, ২০শে ডিসেম্বর ২০১৮ –এও কর্ণাটকে এক খামার বাড়িতে ৫২ জন আদিবাসি দাসকে পুলিশ উদ্ধার করে– যাদের কাউকে বলপূর্বক কাউকে ৬০০ টাকার লোভ দেখিয়ে এনে বন্দী করে দিনের পর দিন বিনা মজুরিতে খাটানো হয় ইঁটভাটায়, খাদানে।
বিসমিল্লা খান বলেন—‘একঠো ব্যায়ঠনে কা স্থান চাহিয়ে’—সত্যি তো বেনারসের ঘাট ছাড়া আমরা কি বিসমিল্লাকে পেতাম? আমরা যারা বসতি গড়ি–আমাদের বসবাস তো আর শুধু এক ভূমি বা কালখন্ডে নয়, মানুষ তার অবস্থানের একটা সচল আইডিয়া গড়ে তোলে—কালক্রমে, জেনারেশানের পর জেনারেশান ধরে সেই আইডিয়া যুক্তিসম্মত হয়, তার চারপাশের কোণগুলো মসৃণ হয়, মানুষের কগনিটিভ আওতার বাইরে সে প্রায় অজান্তেই ঢুকে পড়ে অভ্যাসে, একধরনের মাসল মেমরি– রোজকার রিচ্যুয়াল, লোকাচার, তার থেকেই শিল্প গড়ে ওঠে। মানুষ রোজগারের ধান্দায় অন্যত্র যায়, সেই নতুন অবস্থানকেও সে পুরোনো অভ্যাস অনুসারে মানানসই করে তুলতে চায়। সঙ্ঘাত হয়। আপস। আবার এক নতুন গড়ে ওঠা, সেই নতুন জায়গার মৌল থেকেও নিয়ে।
এ তো গেল একক মানুষের কথা। কিন্তু একটা গোটা জনগোষ্ঠীর যখন মাইগ্রেশান হয়? কালেক্টিভ ধারণা, যা স্মৃতি ও ইতিহাস, কালেক্টিভ অভ্যাস– প্রবল অস্তিত্বসংকট না হলে, কোনো জনগোষ্ঠী তাকে ছেড়েছুড়ে সম্পূর্ণ ত্যাগ করে কোত্থাও যেতে চায় না। তবু সে যখন পরিকল্পিত ভাবে একসঙ্গে বেরোয় ভাগ্যান্বেষণে বা ক্রমে গড়ে ওঠা বিপন্নতার খাতিরে– সে কিছুটা তৈরি হয়ে বেরোয়। সে সঙ্গে নিয়ে বেরোয় তার বাপ মায়ের নিশানি, হাড়ের চিরুনি, শখের পোর্সিলিন, লক্ষ্মীর ঝাঁপি, অপদেবতা, অধিদেবতা, তার ক্ষুদ্র লোকালয়ের খুঁটিনাটি ছোট্ট সংস্কার সব। আইরিশ, স্কট, কেলটিক, ইটালিয়ান কত জনগোষ্ঠী আমেরিকায়—একসময় সব মূলধারায় মিলেমিশে কিন্তু ছোট ছোট পরিচয়গুলোর কিছু না কিছু থেকেই যায়—রান্নায়, মদে, সঙ্গীত, সাহিত্যে। এমন কি—রূপকথায়, ঘুমপাড়ানি গানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বা তার পরে যে ইয়োরোপিয়রা প্রচুর অর্থ সঙ্গে নিয়ে আসতে পারে তারা আর্জেন্টিনা, ব্রেজিল, সিরিয়া, মিশরে আলেক্সান্দ্রিয়ায় গড়ে তোলে নিজেদের কলোনি—ছোট ছোট দেশ, জেলি, মার্মালেড সমগ্র সংস্কৃতিসমেত।
ইজরায়েল গঠনের আগে ইহুদিরা অধিকাংশই ছোট ছোট গেটোয় থাকে ইয়োরোপের নানা দেশে, অনেকক্ষেত্রে যথেষ্ট সমৃদ্ধতায়। তার সমৃদ্ধতা, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বিপক্ষে ধীরে ধীরে রিসেন্টমেন্ট জন্মায়। তারপর পরিকল্পিত মিথ তৈরি হয়। মিথ্যা। পাবলিক পারসেপশানে সেই মিথ্যাকে টেনে এনে, সামগ্রিকভাবে গোটা এক জনগোষ্ঠী ভিলেন সাব্যস্ত হয়। কাতারে কাতারে খুন হয় তারা—জার্মানি, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, পোল্যান্ড…। এমন কি রাশায়। কিছু আঁচ পেয়ে পালায় ভিনদেশে, ভিনমহাদেশে। অবশেষে একদিন সে স্থাপন ক’রে তার দুধ-মধুর দেশ। কানাডা আমেরিকা থেকে ডেকে পাঠায় তার আত্মপরিজনকে– কিন্তু জায়গা কোথায়? জায়গা বানাতে শ’দুশো বছরের পুরোনো বাসিন্দাদের উপড়ে ফেলা হয়– ইজরায়েলি আর্মি এসে ঘুমন্ত মানুষকে গ্রামচ্যুত করে ছেড়ে দিয়ে আসে পঞ্চাশ মাইল দূরের জঙ্গলে, দেশ ছাড়ার শাসানিসমেত–সে মুসলমান হোক বা অর্থোডক্স খ্রীস্টান—তার ঘরদোর সাজানো মিথ্যা তথ্যসহকারে যাদুঘরে রূপান্তরিত হয়, বা অন্য মহাদেশ থেকে সদ্য আসা ইহুদিদের বাসস্থান। তার গীর্জা, মসজিদ, শুঁড়িখানা, মজলিশের বেদি, হামাম তো পড়ে থাকে, কিছু নতুন ফর্ম পায়, কারো ভিত ফেটে জন্মায় বুনোগাছের চারা– কিন্তু তার আইডিয়াটুকু কোথায় যায়? ওই যে বাসস্থানের আইডিয়া। মানুষ যদি ওই আইডিয়াটুকু হারায়—সে তার আত্মপরিচিতিও হারিয়ে ফেলে, ডিগনিটি। ওই আইডিয়াটুকু মানুষের কাপড়জামা, তার মনুষ্যত্বের প্রমাণবিশেষ। আর ওই বসে থাকার ‘স্থান’, রিফ্লেকশান, নিজের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ ও তার থেকেই শিল্প, সংস্কৃতি।
সংস্কৃতিহীন মানুষের পরিচয় কী? চাকমা, রোহিঙ্গা, সবে আশা-ভরসা নিয়ে যারা একটু একটু থিতিয়ে বসার চেষ্টা করেছিল সেই মরিচঝাঁপির মানুষজন?
তাজা আঘাতে ব্যথার অনুভব কম। ঘা শুকোতে শুকোতে বা ইনফেকশান হলে তবেই টাটিয়ে ওঠে। শিল্প যদি ব্যথা থেকে উদ্ভূতই হয় তবে এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোরও ব্যথাটুকু অনুভব করার সময় লাগে, রিফ্লেকশনেরও। তাড়া খেতে খেতে কোনোক্রমে বেঁচে থাকা শরীরগুলোকে চালিয়ে ফেরে অ্যাড্রিনালিন, কিন্তু অ্যাড্রিনালিন শুধুমাত্র সারভাইভালের ক্ষমতা জোগায়। জান্তব, পাশবিক ক্ষমতা। সে’খানে সৃষ্টিশীলতার কোনো জায়গা নেই।
ডাচ গাঁয়ে যে টিউলিপের ক্ষেত, লালে হলুদে ছেয়ে যাওয়া যে দিগন্ত, সে শিল্প—তাকে নমন করি। তার জেগে ওঠার জন্য যে কনডিউসিভ প্রেক্ষাপট, এনভায়রনমেন্ট—তাকেও। কিন্তু নোনা ধরা দেয়ালের পাশে যে একলা টিউলিপ চারা অকাল বরফ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে জেগে ওঠে– সে জীবন। স্পৃহা। অদম্য। বিপুল। তাকে বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়।