শুভময় সরকার-এর গল্প

Spread This
শুভময় সরকার

শুভময় সরকার

একটি অতিপ্রাকৃত গল্প

।। ১ ।।

মেঘে ছেয়ে গেছে অনেকটা আকাশ তবে শেষবেলার ঝাঁঝালো রোদ খানিকটা ক্লান্ত হয়ে মেঘের নিচে চলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এখন মেঘের রঙ কালচে লাল। বৃষ্টি হবে আজ। প্রস্তুতি চলছে।

রাত বাড়লে শব্দগুলো স্পষ্ট হয়ে আসে, জোরে মনে হয়। আজকাল আরও বেশি মনে হয়। মনে হয় তার কারণটা সহজ, রাতে চারপাশ বড় শব্দহীন।

ছেলেবেলায় দেখা সেই হরর মুভির কথা মনে পড়ে যায়, অরুণা টকিজে ওরা বন্ধুরা মিলে দেখতে গিয়েছিল। নিস্তব্ধ রাতে সেই অদ্ভুত ক্যাঁচ শব্দে দরজা খোলা এবং সেদিনই রজতাভ প্রথম অনুভব করেছিল সব কিছুর একটা রিভার্স ব্যাকগ্রাউন্ড জরুরি নইলে হারিয়ে যায় সবকিছু। যেমন হারিয়ে যায় প্রতিটি মানুষের নিজস্বতা, নিজস্ব স্বর! যেভাবে হারিয়ে যায় ভাষা, ছোট ছোট নদী, গ্রাম, জনপদ, মানুষ। আসলে সব মাইনর নিজস্বতা ভুলে মিশে যায় মেজরের সঙ্গে, বৃহতের সঙ্গে। মিলে সুর মেরা তুমহারা, আসলে সব মিলে মিশে যায়। আলাদাভাবে মাইনরের কোনো অস্তিত্ব নেই।

মেঘ করলে পাহাড়টা আর দেখা যায়না! আকাশ পরিষ্কার থাকলে পাহাড়ে আলোর মালা দেখা যায় এ শহর থেকে। আগে এত আলো ছিল না, দেখাও যেত না। মিটারগেজ ট্রেনের চলন্ত কামরায় বসে জানলা দিয়ে পাহাড়ের আলো দেখিয়ে বাবা বলতো – ঐ যে আলো দেখছিস, ওটা তিনধারিয়ার আলো। তার বহুবছর পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে তিনধারিয়ার আলো ছাড়িয়ে খানিকটা উঁচুতে  কার্সিয়াং পাহাড়ের আলোও দেখা যেতো আর মাঝে মাঝে সামান্য কিছু আলো দেখে চেনা যেত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট লোকালয়গুলো । রাতে অন্ধকারের মাঝে এই আলোর টুকরোগুলো চিনিয়ে দিত জনপদ, আর এখন পুরো পাহাড়টাই প্রায় জনপদ হয়ে গেছে। অসংখ্য আলোর মালায় তিনধারিয়া, কার্সিয়াং সব একাকার!

সন্ধে থেকেই আজকাল রাতের অপেক্ষায় থাকে রজতাভ। অদ্ভুত এক বিষণ্ণতায় কেটে যায় সারাদিন। দিনের পর দিন এভাবে ঘরবন্দী। সন্ধের পর থেকে রাত অবধি কেটে যাওয়া বলতে কিছু জরুরি কাজকর্ম, ফোন, ওয়ার্ক ফর্ম হোমের প্ল্যানিং ইত্যাদি। আর তারপর রাত বাড়লে নিস্তব্ধ সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়া। আর ঠিক তখনই  ফিরে আসে অসংখ্য শব্দ। আজ যেমন আসছে। এই সব শব্দগুলো ফিরিয়ে দেয় একেকটা সময়। গত ক’দিনের ঘরবন্দী জীবন বহু মানুষের কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠলেও এই বাধ্যতামূলক নির্বাসনকে মেনে নিতে অসুবিধে হয়নি রজতাভর। যদিও আতঙ্কের জায়গাটা মাঝে মাঝেই জুতোর ভেতর জেগে ওঠা কাঁটার মতো খচ খচ করে! ভাইরাসটা যত ছড়িয়ে পড়ছে, মানুষ ততো নিজস্ব আস্তানায় ঢুকে যাচ্ছে। পরিচিত জনবহুল রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে অচেনা লাগা শুরু হয়। ক্রমশ অচেনা লাগে চারপাশটা, এমনকি মানুষগুলোও। আজ খুব ভোরে সেই অচেনা পাখির ডাকটা শুনেছিল রজতাভ। অদ্ভুতভাবে একটানা ডেকে চলা। কী পাখি বুঝতে পারেনি, ঘুমের ঘোরে রজতাভ শুধু অনুভব করেছিল রাত ফিকে হচ্ছে! নিস্তব্ধতা ভাঙবে এবার, কিন্তু পাখিটার একটানা ডাকে, দরজা খুলে যখন ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল, নিস্তব্ধতা তখনো  ভাঙেনি, চারপাশ শুনশান!

রাত বাড়লে শব্দের মতো স্মৃতিরাও ফিরে আসে। ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, নেটফ্লিক্স, ইউটিউবে সিনেমা, এই সব কিছু নিয়ে ঘরবন্দী মানুষের ভালো থাকা, নিরাপদ থাকার চেষ্টা। ভাইরাসের শেকল শিল্প ভেঙে যাবার আশায় সবাই দূর থেকে যোগাযোগে। ভাসছে ভাইরাস, ছড়িয়ে  পড়ছে বৃত্ত থেকে বৃত্তান্তরে। ভাইরাস ঢুকে যাচ্ছে মনের গভীরে, বাসা বাঁধছে, গ্রাস করে নিচ্ছে সব! তবে এত কিছুর মাঝেও রজতাভ অনুভব করে কিছুদিন থেকেই এই নিভৃতযাপনটা বোধহয় চাইছিল ও! মাঝে মাঝে মাঝে এভাবে একা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার এক অদ্ভুত মজাও আছে। একা, ভীষণ একা! স্মৃতিময় এই একাকিত্বে মামাবাড়ির ছোটবয়েসে দেখা সেই বইয়ের আলমারিটার কথা মনে পড়ে যায় আজ। একষট্টি সনের মার্চ মাসের কোনো এক বর্ষণমুখর দিনের উল্লেখ করা বইটা রজতাভ প্রথম দেখে মামাবাড়ির সেই বইয়ের আলমারিতে। শতবর্ষের প্রেমের কবিতা-কে কাকে দিয়েছিল লেখা নেই, শুধু লেখা ছিল – ‘যে আমারে দেখিবারে পায়, অসীম ক্ষমায় ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি…।’ শহর ছাড়িয়ে প্রায় তিরিশ- পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরের এই মামাবাড়ি ছিল রজতাভর এক প্রবল আকর্ষণের জায়গা। আর তার অন্যতম কারণ ওই বার্মাটিকের বইয়ের আলমারি। বার্মাটিকের ওপর লালচে বার্নিস সময়ের স্রোতে অনেকটাই ম্রিয়মান, অনুজ্জ্বল। সমস্ত বাড়িটার মধ্যেই একটা গা ছমছমে ব্যাপার। আধো আলো অন্ধকারে সে যেন এক রূপকথার বাড়ি। সামনে, পেছনে বিরাট বাগান। সামনের অংশে শুধুই ফুল, পেছনের দিকটায় আনারস, নারকেল, সুপুরি, দারুচিনি, আম, কাঁঠাল, লিচু, সবেদা, করমচা …! কী নেই! সে বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা মহেন্দ্রলাল বসু, যিনি সম্পর্কে রজতাভর মাতামহ, নেহাতই শৌখিন বললে সঠিক বলা হবে না বোধহয়, রীতিমত মেজাজি মানুষ।

এভাবেই কোনো এক গ্রীষ্মের বন্ধে নির্জন দুপুরে, বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে, আলমারির ঝুলন্ত খোলা টিপতালার গন্ডি পেরিয়ে সোঁদা কাগজের গন্ধ মাখা আলমারিটা খুলে ফেলেছিল সুমন! সবার ওপরের সারিতে মেরুণ রেক্সিনে বাঁধাই গ্রন্থাবলীর সারি- বঙ্কিম, শরৎ, শরদিন্দু আর বাদামি-খয়েরি রঙের রবীন্দ্রনাথ। পুরোনো পুজোসংখ্যাগুলো সব একজায়গায়। সাইড পাল্লাগুলো সরিয়ে একে একে বইগুলো নামিয়েছিল সুমন, আবার রেখেও দিয়েছিল যথাক্রমে। তবে বইয়ের ভেতর লেখা সেই লাইনগুলো  দাদুর হাতের লেখা নয়। রহস্যময় সেই মামাবাড়ির চূড়ান্ত রহস্যময়তার সবটুকু যেন এসে জমা হয়েছিল ওই আলমারির ঘরে। সেই নির্জন দুপুরে পুরোনো কাঠের আলমারিটা থেকে কিছুটা সময় খসিয়ে নিয়ে সার সার বইগুলোর মাঝে ছোট্ট একটা ফাঁক তৈরি করেছিল, কেউ বুঝতে পারেনি!

।। ২ ।।

প্রত্যাশিত বৃষ্টিটা নেমেছিল কিন্তু তারপর আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। রাতে একা একা ছাদে এসে দাঁড়ায়। আকাশভরা তারা। রাত বাড়লে উদ্ভট সব কল্পনা মাথার ভেতর খেলা করে আবার দিনের আলো ফুটলে সে’সব উধাও! তবে রবিঠাকুরের সেই লাইনটা  মাঝে মাঝে বড় সত্যি মনে হয়, রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে। তারপর ফের জেগে ওঠে সূর্যোদয়ের পর। মেঘহীন আকাশে আজ ঝলমল করছে তারাগুলো। সেই বহুকাল আগে টিভি-তে দেখা মুঙ্গেরিলালের হাসিন স্বপ্নের মতো নানান রকম ফ্যান্টাসির স্রোত নিরন্তর চলতে থাকে রাত বাড়লে। রাত যতো বাড়ে, পরিষ্কার আকাশে তারারা ততো উজ্জ্বল হয়। আকাশের দিকে আজ হাত বাড়ায় রজতাভ, তারারা সব নেমে আসে, ওদের সঙ্গে গল্প হয়। বন্ধুর মতো সেইসব তারারা গল্প করে, নতুন নতুন পরিকল্পনা জানায়, প্রাণিত করে ওকে! অনেকদিন পর মামাবাড়ির বার্মাটিকের আলমারি থেকে আনা সেই শতবর্ষের প্রেমের কবিতা বইটার কথা মনে পড়ে। হাতের লেখাটা কার, কে কাকে  দিয়েছিল সবই রহস্যময় রয়ে গেছে আজও।

নিজের অবিবাহিত জীবন নিয়ে কোনো আক্ষেপ বা অপূর্ণতা নেই রজতাভর। বিয়ের বয়েস পেরিয়ে গেছে এমনটাও নয়। এই মধ্যতিরিশে বিয়ে তো করতেই পারে কিন্তু অদ্ভুতভাবে ইচ্ছেটা হয়নি। এ শহরে চাকরির জন্য থাকা। পাশের শহরে বাড়ি হলেও  এখানে ছোট্ট এই টু বিএইচকে ফ্ল্যাটটা কিনে নিয়েছে। বাড়িতে সবার আপত্তি ছিল, বিশেষত কাকিমার কিন্তু সে’সবে কর্ণপাত করেনি রজতাভ। হাজারো যুক্তি সাজিয়েছিল নিজের ফেবারে। কাতর স্বরে শেষ পর্যন্ত কাকিমা বলেছিল – তাহলে বিয়েটা করেই নতুন ফ্ল্যাটে ঢোকো। রজতাভ হেসেছিল, যেভাবে হেসে ‘না’-টা বুঝিয়ে দিয়েছে ও চিরকাল। রজতাভর বিয়ে না করার পেছনে কোনো দেবদাসীয় ঘটনা কিংবা ঘটনাক্রম নেই, মূল কারণ কিছুটা অনীহা। আসলে যেভাবে থাকতে চেয়েছে, সেভাবেই আছে- বন্ধনহীন, পিছুটানহীন। রাতে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে তারাদের সাথে কথা বলতে বলতে মনে হয়, এই তো বেশ আছি। কেমন বন্ধনহীন, মুক্ত!

জি-প্লাস ফোরের  প্রাইম এপার্টমেন্টের টপ ফ্লোরে আটশো স্কয়ার ফুটের এই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা হয়ে একটা দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিয়েছে রজতাভ। এ আবাসনের  ছাদ বাগানটা ওরই করা। প্রথম প্রথম বাকি আবাসিকরা প্রবল উৎসাহ দেখালেও, সময় যত এগিয়েছে সে উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। এখন পুরোটাই রজতাভর দায়িত্ব। এতে অবশ্য মনে মনে কিছুটা খুশিই হয়েছে । আসলে বাগান করাটা  একটা আর্ট, আর সবাই সেটা জানেনা। টবের গাছগুলোতে জল দিতে দিতে পাতাগুলো পরম মমতায় ভেজা হাতে পরিষ্কার করতে করতে তারাদের মতই এদের সঙ্গেও কথা বলে রজতাভ। অনুভব করে স্পন্দন। আজ থেকে নয়, সেই স্কুলবেলা থেকেই কাকামণির সঙ্গে থেকে গাছকে ভালোবাসতে শিখেছে। শুধু জল দেওয়া বা আপাত যত্ন নয়, আরও এক দৃঢ়তর সম্পর্কে জড়িয়ে যায় রজতাভ। আজ নাইট কুইন ফুটেছে টবে। ওদের জলপাইগুড়ির বাড়িতেও ছিল নাইটকুইন। বারান্দার টবে ফুটতো। কুঁড়ি দেখেই কাকামণি বুঝতে পারতো আজ নাইটকুইন ফোটার রাত। সে রাতে কাকামণি যেনো একেবারে অন্য মানুষ। সন্ধে থেকেই উত্তেজনা। বহুদিন পর আজ প্রাইম এপার্টমেন্টের ছাদবাগানে আবার সেই নাইটকুইন। আজ আবার খুব বাড়ির কথা মনে হয় – বাবা, কাকামণি, কাকিমা। মা চলে যাবার আগে থেকেই সন্তানহীন কাকিমা আঁকড়ে ধরেছিল ওকে। মা আর কাকিমার পারস্পরিক সম্পর্ক, বোঝাপড়াটাও ছিল অসম্ভব ভালো। ফলে ওদের পারিবারিক যৌথযাপনের ছন্দে কখনও ছেদ পড়েনি। অনেক কম বয়েসেই চলে গিয়েছিল মা। সেবার ছিল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষার দিন কয়েক পরেই মা-র চলে যাওয়া। তারপর কাকিমা  আরও আঁকড়ে ধরলো ওকে।

মা-র চলে যাবার রাতটা বেশ মনে আছে। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাওয়া। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সব শেষ। সে রাতেও আকাশ ছিল তারা ভরা , বারান্দায় ফুটেছিল নাইটকুইন। স্তব্ধ হয়ে বসেছিল কাকামণি, একবারও ফিরে তাকায়নি গাছটার দিকে। ভেতর থেকে কান্না বেরিয়ে আসছিল রজতাভর, ভারী হয়ে আসছিল বুক তবু যেনো একটা একটা করে পিছুটান কেটে বেরোনোর জন্য একধরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। চিরকালের পিছুটানহীন থাকার এক নিরন্তর ইচ্ছে রজতাভর। সে রাতে মায়ের চলে যাওয়া আসলে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে  পৌঁছে দিয়েছিল ওকে। শ্মশানে শরীরে হাত রেখেছিল মায়ের। ঠান্ডা, শীতল এক অনুভূতি, অপরিচিত লেগেছিল সে স্পর্শ…! যে উষ্ণতায় আজন্ম ছুঁয়ে থাকতো মাকে, এ শরীর যেনো অন্য কোনো গ্রহের। অপরিচিত। সেই মুহূর্ত থেকে হালকা লাগা শুরু হয়েছিল। কেমন এক নির্ভার, পিছুটানহীন! অনুভব করেছিল অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বে যেতে, সচেতনতা থেকে অসচেতন হতে, আকার থেকে নিরাকারে পৌঁছতে বড্ড কম সময় লাগে। ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢুকে গিয়েছিল মায়ের আজন্ম চেনা শরীর, বেরিয়ে এসেছিল এক কড়াই ছাই। দূরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ লাগোয়া হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল মানুষভর্তি দু’একটা বাস। শেষরাত তখন। বাড়ি ফিরে দেখেছিল নাইটকুইনটা ফুটে আবার চুপসে গেছে।

।। ৩ ।।

অনেকদিন পর আজ আবার বোষ্টমিদিদির দোকানে। সাহুর পাড়ে এই দোকান বড় প্রিয় হয়ে উঠেছে রজতাভর। সুমনই চিনিয়েছিল প্রথম। সুমন ওর অফিসের কলিগ। দু’জন মিলে প্রথম যেদিন বাইকে করে এসেছিল সে’দিনই জায়গা এবং দোকানের প্রেমে পড়েছিল। শহর ছাড়িয়ে, ইস্টার্ন বাইপাস পেরিয়ে বেশ খানিকটা গেলেই শুরু বৈকুন্ঠপুর ফরেস্ট রেঞ্জ। আর সেই ফরেস্টের মাঝেই বয়ে চলা সাহু ! অদ্ভুত পরিবেশ। নদী পেরিয়ে জঙ্গলকে দু’পাশে রেখে ফিতের মতো কালো রাস্তা এগিয়ে গেছে সাহুডাঙ্গির দিকে,সেখান থেকে জলপাইগুড়ি।  আর সে রাস্তার পাশেই নদীপাড়ে বোষ্টমিদিদির চা, ঘুঘনির দোকান। ঘুঘনির সাথে ডিমসেদ্ধ। এসব অঞ্চলে করোনা সন্ত্রাস নেই সে’ভাবে। মানুষজন বেশ নিশ্চিন্তে ঘোরা, ফেরা, আড্ডায় রয়েছে। দোকান বলতে একটা গাছের নিচে চারখুঁটির দো-চালা, সামনে কাঠের বেঞ্চ আর বাঁশের বাতা দিয়ে বানানো বসার জায়গা। গতকাল অনেক রাতে ছাদ থেকে নেমেছিল রজতাভ। রাতে সে’ভাবে ঘুম হয়নি। অনেকদিন না বেরোনোয় একটা বিরক্তি তো ছিলই, আর বার বার ভেঙে যাওয়া ঘুম। মোটরসাইকেল নিয়ে সকালেই চলে এসেছে এখানে। সাতটা থেকে দুপুর অবধি খোলা থাকে এ দোকান। গলায় কন্ঠিধারী স্নেহময়ী দোকানের মালকিনকে ওরা বোষ্টমিদিদি বলেই ডাকে। অনেকদিন পর রজতাভকে দেখে আজ খুব খুশি  বোষ্টমিদিদি।

এখানে এলেই এক অদ্ভুত অনুভূতি। চায়ের সঙ্গে ঘুগনি, ডিমসেদ্ধ। অদ্ভুত স্নেহ মাখানো মুখ, কোনো বিরক্তি, অভিযোগ, নালিশ কিচ্ছু নেই। কোনো আতঙ্ক বা শঙ্কার চিহ্ন নেই বোষ্টমিদিদির  মুখে। দ্বিতীয় কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে পেছনের জঙ্গলের দিকে হাঁটে রজতাভ, নদীর পাড় বরাবর। যত এগোনো যায় গাছপালা ততোই বাড়তে থাকে। অদ্ভুত এক পরিবেশ। পাখি, কীট, পতঙ্গ, নদী, হাওয়া সব মিলিয়ে জঙ্গলের এক নিজস্ব ভাষা! কান পাতে, মন দিয়ে জঙ্গলের সেই ভাষাকে, শব্দকে অনুভব করার চেষ্টা করে। বর্ষার গাঢ় সবুজের সঙ্গে মিলেমিশে যায় রজতাভ। মেঘলা আকাশ আরও কালো লাগে এখানে । অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে জঙ্গলের। কেমন একটা গা ছমছমে অনুভূতি। নিজেকে পর্যটক বা ভ্রমণকারী মনে হয় না, মনে হয় না জঙ্গল দেখতে এসেছে। জীবনের সব পিছুটানকে বিপ্রতীপে রেখে এই জঙ্গল, নদী, শব্দ, মেঘলা আকাশ, বোষ্টমিদিদি সব কিছু বড় বেশি আপন মনে হয় আজ! বার্মাটিকের আলমারি থেকে নিয়ে আসা সেই শতবর্ষের প্রেমের কবিতা  বইটার অপরিচিত হস্তাক্ষরে লেখা লাইনগুলো আওড়াতে থাকে রজতাভ – ‘যে আমারে দেখিবারে পায়, অসীম ক্ষমায়,  ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি …”! আজ অনুভব করে একমাত্র এই সবুজই পারে সেই অসীম ক্ষমায় দেখতে। সবরকম নাগরিক অসভ্যতামো সহ্য করেও কী অদ্ভুত স্নিগ্ধ এই সবুজ…!

— কাকু, চা…!

ডাক শুনে ঘোর ভাঙে রজতাভর। বোষ্টমিদিদি দোকানের ছেলেটাকে দিয়ে চা পাঠিয়ে দিয়েছে।

— তোমার জন্য চা পাঠায় দিল পিসি…!

— তুই খুঁজে বার করলি কীভাবে আমাকে…!

–কাকু, তুমি তো বেশি দূর যাইতে পারবা না, আমি জানি…! রাস্তাই তো চিনতে পারবা না, ফিরতেও পারবা না। বলে একগাল হাসে ছেলেটা।

— তুই চিনিস এই জঙ্গলের রাস্তা…!

— সব রাস্তা চিনি কাকু…! সব!

— আমায় নিয়ে যাবি একদিন, অনেক দূর, অনেক অনেক দূর…!

— যাব কাকু, এই জঙ্গলের রাস্তা দিয়াই তো আমার দিদার বাড়ি যাইতে হয়! আমি তো যাই।

চা খেয়ে দু’জনে একসঙ্গেই ফেরে দোকানে। বোষ্টমিদিদি যেনো অপেক্ষাতেই ছিল। কী স্নেহময়ী চোখ! সে চোখে শুধুই অসীম ক্ষমা। ভালো মন্দ সব কিছু বড় সহজ করে গ্রহণ করার চোখ। অনেক দিন পর রজতাভ আজ নতুন করে অনুভব করে আবার, সব কিছুর একটা রিভার্স ব্যাকগ্রাউন্ড চাই! বড় সুন্দর, আপন মনে হয় এই প্রকৃতি আর মানুষগুলোকে। সব যেনো মিলেমিশে একাকার – জঙ্গল, নদী, শব্দ, মেঘলা আকাশ, বোষ্টমিদিদি, বাচ্চা ছেলেটা, সব! ওর প্রাত্যহিক যাপনের মাঝে এও তো এক রিভার্স ব্যাকগ্রাউন্ড! নাকি এই প্রকৃতিজীবনের বিপ্রতীপে ওই প্রাত্যহিকতা?  হয়তো দুটোই…!