হাঁসেদের প্রতি-সুভাষ ঘোষ

Spread This
সুভাষ ঘোষ

সুভাষ ঘোষ

হাঁসেদের প্রতি
 
 
যখন ঘর থেকে বেরোই, তখন রাত ঠিক কত, কখন সন্ধ্যা উতরিয়ে গেছে, কিছুই অনুমান করতে পারি না। কিছুদূর এগোনোর পর পা অতর্কিতে থেমে যায়। চারিদিকে থৈ থৈ করা হয় দেখে পা আর কিছুতেই এগোতে পারে না। হাঁসেদের পাখা, পালক, পালকের সাদাবিস্তারে রাস্তা-ঘাট, ফুটপাত, গাড়িবারান্দা, ট্রামলাইন ছেয়ে যায়। হাঁসগুলি তাদের লাল আলতা পা থ্যাপ্‌ থ্যাপ্‌ করে ফেলতে থাকে। ঠাসাঠাসি ও গাদাগাদি হয়ে হাঁসগুলি লাল পদ্ম খায়, ছেঁড়ে, ছেঁড়ে ও খায়, তারা পরস্পরের গায়ে ছুঁড়েও মারে সেইসব ফুল। তারা লাল পদ্মের গায়ে গা ঘষে ও বিশ্রাম নেয়। মার্কারীর মত সাদা আগুন পিছলে যায় রাস্তা ফুটপাত বাড়ি গাড়ী, গাড়িবারান্দা, স্কোয়ারে। লাল পদ্মের উপরে এইসব বেওয়ারিশ ফুলন্ত পালকসহ হাঁস আমার চিন্তার প্রতিটি পথের মুখে বেরিকেড ফেলে। আমার দুই চোখের পাতা কিঙ্কবিহীন শেকল যােগে নাদির ও জেনিথ পয়েন্টে ঘাঁটিয়ে রাখে কে। লাইটপােষ্ট অন্যমনস্কতা ও শঙ্কার সঙ্গে পাহারা জাগে। হাঁসেরা পদ্মফুল খায় ও ছেঁড়ে, ছেঁড়ে ও খায়। এই যূথবদ্ধ বেওয়ারিশ হাঁসেদের যথেচ্ছতার কার্যকারণ কিছুতেই ধরতে পারি না। হঠাৎ এক ধরণের আওয়াজ দিয়ে উঠি, যা সেই সাদা হাঁসেরাই শুনতে পায় শুধু, সঙ্গে সঙ্গে তাদের গা দুলে ওঠে, ঘাড় ও কান খাড়া হয়ে যায়, তাদের লাল ঠোঁটও ঈষৎ ফাঁক করে তারা, ঠিক তক্ষুণি আমার মাথার ভেতর গোঁ গো শব্দে ডেকে ওঠে বিরাট টারবাইন।
গায়ের প্রতিটি লোম সট্ সট্ হয়ে যায়, দাউ দাউ করে মাথার চুল। পকেট থেকে রুমাল বের করে এনে বুকের উপর ঝুলিয়ে দিই। হাত পায়ে থর থর কাঁপন ওঠে। এই বিশেষ রঙ ও ডিজাইনের রুমাল দেখে হাঁসেরা ঘাড় খাড়া করে, পাখা ও পালক ঝাড়ে তারা, তাদের গলা থেকে অস্ফুট ভাক বেরিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দ, এই ডাক—১২, ১৩ বৎসর পূর্বে কোন একসময়ে প্রথম শােনা আমার উরুর ফাঁকে ফলিত ঘাসের আবির্ভাব কালের কোন একসময়ে রক্তে অসুখ দেয়া, এই ডাক বিগত ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩ বৎসরকাল—হাত পা লিঙ্গ, লিঙ্গতল, সমস্ত শরীর প্রণালী, রূপােলী আগুন, ঘর, বাড়ি, রাস্তা, রো, স্কয়ার, সমগ্ৰ পরিমণ্ডল চাঁড়িয়ে তোলে। আমার হাত পা মাথা রক্ত তোলপাড় করে, অসংখ্য, অসংখ্য পাখা, পালক, হাঁস। বুকের রুমাল হাতে উঠে এসে মাথার চারপাশে ঘুরতে থাকে— পাগলের মত ঘুরতে থাকে রুমাল। পয়েন্টম্যানের অস্থির সাঙ্কেতিক ফ্ল্যাগ যেন পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণে ঘোরাফেরা করে। শঙ্কিত ও অন্যমনস্ক লাইটপােষ্ট এখান সেখান থেকে ছুটতে থাকে, ছুটতে ছুটতে কোন ডুবাে জলপাহাড়ের গায়ে ভেঙ্গে খান্ খান্ হয়ে যায়। সমস্ত দিক তীব্র সার্চলাইট ফেলে দেখে নিই, হাত থেকে ক্রমাগত সঙ্কেত চলে যেতে থাকে। হাঁসেরা সাদা ঘাড় সােজা করে, লাল পদ্ম থেকে মুখ তুলে আনে প্রতিটি হাঁস। এই অভাবিত আবিষ্কারে অস্থির হয়ে পড়ি। রুমালের দিকে তাকিয়ে তার। ঠোঁট ও ঘাড় নাড়ে, পাখা ও পালক ফুলোয় তারা। মাথার ভেতরে আবারো ভয়ঙ্কর ডাক ছাড়ে কিছু আগে থেমে যাওয়া সেই টারবাইন।
পকেট থেকে নীল শিশি বের করে এইবার প্রতিটি হাঁসের গায়ে ফ্লুইড ছিটিয়ে দিই। সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীর অবশ হয়ে যায়। সম্মােহিতের মত আমার ছায়ার দিকে এগিয়ে আসে তারা। তারা আমার ছায়া ঘিরে সমবেত হয়। আমার হাত এই সময় একবার অসম্ভব দীর্ঘ হয়ে প্রতিটি হাঁসকে মুঠির ভেতরে ধরে ফেলতে চায়। সঙ্গে সঙ্গে সংযত হয়ে সামনের দিকে বেণুবাদকের মত এগিয়ে যেতে থাকি। হাঁসগুলি সম্মোহিতের মত অনুসরণ করে। রুমাল উড়তে থাকে। সঙ্কেত ছড়িয়ে পড়ে! আমি মাঝে মাঝেই নিপুণ সার্চলাইট দিয়ে দেখে নিই ফেলে আসা পেছনভূমি। প্রতিটি হাঁস আমার ফেলে আসা পায়ের চিহ্নে পা ফেলে; পেছন পেছন এগিয়ে আসে তারা। আমার হাতে ঘোরে পয়েন্টম্যানের দুরন্ত অস্থির ফ্ল্যাগ।
আমরা যেতে যেতে কখন বিশাল আকাশের নীচে এসে যাই। এইখানে মাঠের সর্বত্র সাদা আগুনের শিখা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনা। এই আগুনে মাঠের সবুজ ঘাস জ্বলতে থাকে। হাঁসের রুদ্ধগলায় ডাক ছাড়ে। সাদা আগুনে তারা মুহুর্মুহু তাদের অতীত পুড়ে ফেলে, পাখা ঝাড়ে, ও পোষাক খেলে। আমার মাথার ভেতর টারবাইন পূর্বের দ্বিগুণ শব্দে ডাক দেয়। আমি বার বার পেছনে তাকিয়ে হাঁসেদের দেখে নিই। বেণুবাদকের মত আরো কিছুদূর এগিয়ে যাই মাঠের ভেতরে। মাথার উপর রুমাল উড়তে থাকে। এক সময় আমার চোখ টেনে ধরে বিশাল পদ্মদিঘী। চুম্বক পাহাড়ের মত সে আমায় আকর্ষণ করে। আমি ক্রমশঃ সেই দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। হাঁসগুলি বোবা ও অন্ধ হয়ে অনুসরণ করে।
দেখতে দেখতে আকাশ প্রমাণ শিবলিঙ্গ গজে ওঠে পদ্মদিঘীর চারটি উঁচু পাড়ে। কয়েক মুহূর্তে তারা দিঘীর চারিদিকে ঘন হয়ে ওঠে। পেছন ফিরে যূথবদ্ধ হাঁসেদের আরো একবার দেখে নিই। পদ্মদিঘী দেখতে পেয়ে তারা অত্যন্ত চঞ্চল হয়। আমি দ্রুত পায়ে দিঘীর অপর পাড়ে গিয়ে রুমাল ঘুরোতে থাকি। রুমালের সঙ্কেতে তালে তাল দিয়ে হাঁসেরা একে একে পদ্মদিঘীর জলে গা ভাসায়। তারা যথেচ্ছভাবে পদ্ম খায় ও ছেঁড়ে, ছেঁড়ে ও ফেলে, সমস্ত দিঘী তোলপাড় করে, তাদের মাতাল পাখা খুলে যায় দিঘীর প্রতিটি দূরতম প্রান্তে- তার অন্ধদের পায়ে ফুল চন্দন ও দুর্বা দেয়—দ্বিধাহীন ভাবে যাবতীয় অলঙ্কার ছুঁড়ে দেয় তারা পদ্মের লাল আগুনে।
আমার মাথার ভেতরে পূর্বের দশগুণ শব্দে ডেকে ওঠে টারবাইন। যথেচ্ছাচারে নিমগ্ন হাঁসগুলির দিকে তাকিয়ে কেবলি মনে হতে থাকে, আমি কত উপায়ে কত বেশী সংখ্যক উপায়ে তাদের থেকে কত ডিম, কত বেশীসংখ্যক ডিম আদায় করে, তাদের পালকহীন রুগ্ন মলিন করে, কখন কত সময়বাদে তাদের পদ্মদিঘী থেকে টেনে বের করে দেবো এবং আমি নিশ্চিত তা করবো, আমার এই প্রতিজ্ঞা—এই একমাত্র প্রতিজ্ঞা—ক্রমাগত, ক্রমাগত জেগে ওঠে প্রপাত শব্দে, টারবাইন ব্লেডে।
 
আমার চাবি- সুভাষ ঘোষ
প্রথম প্রকাশ : ১৯/২/৬৫
দ্বিতীয় প্রকাশ : ১৩/২/৮৪
গ্রাফিত্তি-তে ডিসেম্বর ২০০০-এ প্রকাশিত