ভ্রমণ-অমিতাভ দাস

Spread This

অমিতাভ দাস

ভ্রমণ-কথা ,আপন কথা কাটোয়ার পথে পথে 
 
গত ১৬ মার্চ আমরা তিন পত্রিকা সম্পাদক গিয়েছিলাম কাটোয়া লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় অংশ নিতে  ।নৈহাটিতে সকলে মিট করে ব্যান্ডেল । সেখান থেকে কাটোয়া লোকালে কাটোয়া পৌঁছুতে দুপুর আড়াইটে । টোটোতে করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেলাম । উদ্যোক্তারা বললেন আগে খেয়ে আসুন । কাটোয়া শহরে এই প্রথম । কিছুই চিনি না । মুগ্ধতা চোখে অপার । পেটে তখন ছোঁচো ডন দিচ্ছে । হাতে – পিঠে লাগেজ । কোথায় যেতে হবে ? জননী হোম ডেলিভারি । সেটা আবার কোথায় ? ওই তো সামনেই , হেঁটে পাঁচ মিনিট । বলবেন খুড়োর মিষ্টির দোকান । তার পাশে একটা গলি সোজা ওপরে উঠে গেছে । তিন তলায় জননী হোম ডেলিভারি । আমরা আবিষ্কারের আনন্দে গ্রীষ্মদুপুরে পাহাড়ে ওঠার মতো আমাদের ভোজন স্থানে পৌঁছে গেলাম ।
আহা, চমৎকার রান্না । খেয়ে তৃপ্তি পেলাম । জননী হোম ডেলিভারির লোকজনদের ব্যবহার খুব ভালো । আন্তরিকতাও বেশ  ।আবার ফিরে এলাম লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় । তখনো লজে যাইনি । জানি লজ বুকিং করা । পরে শুনি কোনো ঘর ফাঁকা নেই । ফলত নিজেদের লজ খুঁজে নিতে হল । উদ্যোক্তাদের একজন একটু সাহায্য করল । অথচ আমরা বলেছিলাম লজ বুকিং করে রাখতে । কী আর করা যাবে — কুছ পরোয়া নেহি । লজ না পেলে ট্রেন ধরে পুনঃ ব্যান্ডেল । তারপর দেখা যাবে । যাইহোক , অবশেষে একটি লজ পাওয়া গেল  ।
রাতে খাওয়ার পর বসল আড্ডা । নানা পরিকল্পনা — কাল রবিবার কোথায় কোথায় যাওয়া যায় ? চন্দ্রাণী শোনাল একটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প । শুনে চমকে গেলাম । অদ্ভুত সুন্দর এক গল্প । বললাম , তোমার কোনো বইতে রেখো গল্পটা । আমি শোনালাম নতুন লেখা রহস্য গল্পটি । অনেক রাত হল । যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম ।
খুব সকালেই ঘুম ভেঙে গেল । নতুন জায়গায় ভালো ঘুম না হলেও । শেষ রাতে ভালোই ঘুম হল । গত রাতে কিনে এনেছিলাম খুড়োর দোকানের বিখ্যাত মিষ্টি । অপূর্ব স্বাদ । এখানে মিষ্টির দাম অন্য জায়গার থেকে তুলনায় বেশ কম ।
ম্যানেজারকে বলেছিলাম আটটায় চা দিতে । ও মা , সাতটা দশে ডাকাডাকি করে বেড টি দিয়ে গেল । ঘুম ঘুম চোখে খেতে বেশ লাগল । তারপর ফ্রেশ হয়ে খুড়োর মিষ্টি নিজের ভাগেরটা খেয়ে চন্দ্রাণী আর সঞ্জয়ের জন্য রেখে দিলাম ।
গত রাতেই ফোন করেছিল বিদ্যুৎ বিদুর ।বিদুর পত্রিকার সম্পাদক । সে এবং শমিতদা মানে কবি শমিত মন্ডল যাবেন আমাদের সঙ্গে কাটোয়া ভ্রমণে । নটায় আসার কথা । আসছে না দেখে ফোন করলাম । বললে , তৈরি হচ্ছে । বেরুবে । ভাবলাম একসঙ্গে টিফিন করব । ওরা আসছে না দেখে  আমরা টিফিন করতে গেলাম কাটোয়ার এক কচুরির দোকানে । সেখানে অদ্ভুত কান্ড– দেখি পদ্মপাতায় কচুরি দিচ্ছে । দেখেই তো অবাক হচ্ছি , খাবো কী । তবে চমৎকার স্বাদ কচুরির । সঙ্গে ডাল । আহা , মুখে লেগে আছে এখনো ।
এরপর ওঁরা দুজন এলো । আমরা পাঁচজন একটি টোটো ঠিক করলাম । চললাম কাটোয়ার পথে পথে তীর্থ দর্শনে ।
টোটো স্ট্যান্ডে দাঁড়াতেই একটি টোটো রিজার্ভ করা হল । চালক ছেলেটি বেশ ভালো । অল্প সময়ে আমার সঙ্গে ভাব জমে উঠল । ওর সঙ্গে অনেক মজাও করেছি আমি । খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করেছি । আর ও ভালো গাইডের মতো অনেক তথ্য দিয়েছে আমাদের । সে স্থানীয় একটি কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র । নাম গৌরব । আমাকে সে বললে , কাটোয়ার কার্তিকের লড়াই দেখতে আসতে । ওই সময় খুব ভিড় হয় । ও নাকি সব ঘুরিয়ে দেখাবে । বললাম , কার্তিকের লড়াইটা ঠিক কী ?
–লড়াই মানে ঠিক মারামারি নয় । আগে অনেক কিছু হত । এখন লড়াই বলতে কে কত খরচ করল , কোন ক্লাব কত বড় প্যান্ডেল করল , কে কত বড় ঠাকুর গড়ল বা কে কত মাইক বাজাতে পারে এইসব নিয়েই কাটোয়ার কার্তিকের লড়াই । বললে গৌরব । কথায় কথায় আমরা একটি প্রাচীন শিবমন্দিরে চলে এলাম । গৌরব বললে , কাটোয়ার সবচেয়ে প্রাচীন শিব মন্দির । সামনেই বিরাট বটবৃক্ষ । পাশেই হাড়িকাঠ । একটু এগিয়ে মন্দির । মন্দির লাগোয়া পুকুর । দেখে ভালো লাগল । চন্দ্রাণী বললে , গতরাতে পড়া তোমার রহস্য গল্পটির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে এই মন্দিরের পরিবেশটি । সত্যিই অবাক হলাম ।আমার গল্পে বর্ণিত সব উপাদান এখানে আছে । যেন মনে হচ্ছে এই শিবমন্দির দেখে আমি গল্পটি লিখেছি । জীবনে কত যে রহস্য থাকে তাই ভাবি । আমি আর মন্দিরে গেলাম না । বাইরে থেকেই ভক্তিপূর্ণচিত্তে প্রণাম জানালাম ।
বাইরে যূপকাষ্ঠের সামনে বিবাহিত বন্ধুদের দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হল । সে নিয়ে হাসি-মস্করা ।
আবার টোটো চলতে শুরু করেছে । বললাম , এবার কোথায় যাচ্ছি ভাই ? গৌরব বললে , মাধাইতলা ।
যেতে যেতে কথা হচ্ছিল কে বউকে ভয় পায় , কেন ভয় পায় ? দেখলাম বিয়ের পর সবাই পরাধীন । সকলেই বউকে ভয় পায় । সমীহ করে । মান্য করে । এইটে বেশ ভালো ব্যাপার বটে ।
–এই হচ্ছে মাধাইতলা । যান দেখে আসুন , বললে গৌরব ।
কানে এলো অপূর্ব কীর্তনের ধ্বনি । মনটা অজানা পুলকে নেচে উঠল । একটা প্রশান্তি আর ভালো লাগা বোধে আচ্ছন্ন হলাম ।
গৌরব বললে , সারাদিনে প্রায় কুড়ি ঘন্টা কীর্তন চলে । পর্যটক ও ভক্ত আগমনের বিরাম নেই । বিদেশী ভক্তরাও আসে  ।দুপুরে ভোগ খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে ।
এখানে একটি মাধবীকুঞ্জ আছে । যেখানে মহাপ্রভু বিশ্রাম নিতেন । বড় শান্ত সমাহিত সে স্থান । মহাপ্রভুর প্রিয় শিষ্য মাধাই এখানেই শেষ জীবন অতিবাহিত করেন সাধনভজন করে । এই সেই মাধাই । অত্যাচারী , লম্পট , মদ্যপ মাণিকজোড় ভাই জগাই- মাধাই । নিতাইকে কলসির কানা ছুড়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন ।পরে মহাপ্রভুর পরম ভক্ত ।  পরম বৈষ্ণব । দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত থাকার পর ১০৩৭ বঙ্গাব্দে বৃন্দাবনের গোপীনাথ দাস বাবাজি এখানে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন । মন্দিরে আছেন গৌরনিতাই , রাধাগোবিন্দ , গোপীনাথ ।আছে মাধাইয়ের সমাধি-মন্দির । মঠের পাশেই রয়েছে জগাই-মাধাইয়ের বসত বাড়িটিও ।
মাধাইতলা থেকে গৌরব আমাদের একটা মন্দিরের সামনে নিয়ে এসে টোটো থামাল । বললে , এই হচ্ছে হাড়ি মা । কাটোয়ার সবচেয়ে প্রাচীন দুর্গা পুজো এখানেই । তবে প্রতিমা ঠিক নয় , খড়ের কাঠামোর গায়ে শাড়ি পরানো । প্রথমে অন্ত্যজ শ্রেণীর দ্বারা পূজিতা , পরে অবিশ্যি সকলেই এই হাড়ি মাকে পুজো করে । বিশ্বাস করে । শুনলাম খুব জাগ্রত দেবী এই হাড়ি মা । গৌরব আরো বললে , প্রতিমা ভাসানোর পর সেই কাঠামো অন্য ঘাটে ফিরে আসে । কোন ঘাটে আসবে তা তিনি পুরোহিতকে নাকি জানিয়েও দেন ।
হাড়িমাকে প্রণাম করে আমরা চললাম গৌরাঙ্গ বাড়ি । এখানে এসে দেখা হয়ে গেল আরো তিন কবির সঙ্গে , তাঁরাও ভ্রমণে এসেছেন । তাঁরা হলেন কবি সুব্রত চক্রবর্তী , অভিমান্য পাল আর প্রতাপ হালদার । আমরা সবাই মিলে জমিয়ে ছবি তুললাম । সুব্রতদা বললেন , বিকেলে মেলা ।সকালে ভাবলাম কাটোয়া একটু বেরিয়ে নিই । বললাম , ভালোই করেছেন । কাটোয়ার চারপাশে প্রচুর ইতিহাস ।
মহাপ্রভুপাড়ার বাজার পেরিয়ে সংকীর্ণ পথে গৌরাঙ্গ বাড়ি । ফটক দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে নিমাইয়ের মস্তক মুন্ডন স্থান । সেখান থেকে বেরিয়ে বাঁ পাশেই সন্ন্যাস গ্রহণ ও নাম প্রকাশের স্থান । এর পরেই আছে গুরু কেশবভারতীর সমাধি ও গুরু-শিষ্যের পায়ের ছাপ ।ফটকের ডানদিকে মহাপ্রভুর প্রিয় পার্ষদ গদাধর ও মধু প্রামাণিকের সমাধি । মন্দিরে মহাপ্রভুর বিগ্রহ । দুপুরে ১২ টা থেকে চারটে অবধি নাকি মন্দির বন্ধ থাকে । আগে জানালে দুপুরে ভোগ পাওয়া যায় ।
এরপর ওই গলিতেই কাছাকাছি আছেন কাটোয়ার জাগ্রত ক্ষেপীমা । সেই মন্দিরটিও চমৎকার ।
তারপর কাছেই বাগানপাড়ায় আছে কাটোয়ার শাহী মসজিদ । প্রায় তিনশ বছরের পুরনো । ১৭৭১ সালে সৈয়দ শাহ আলম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর সহায়তায় মসজিদটি নির্মাণ করান । সেকালে জনশ্রুতি যে , মোগল সম্রাটের উচ্চ পদস্থ কর্মচারী সৈয়দ শাহ আলম সম্রাট ফারুকশিয়রের ভয়ে পালিয়ে কাটোয়া এসে থাকছিলেন । আমি সেই গল্পটি শোনালাম পথে যেতে যেতে । বললাম , এই গল্পটি জানতে গৌরব ? সে বললে , না , এতকিছু জানতাম না তো । আমরা মসজিদ দর্শন করে চললাম কাটোয়ার গঙ্গার ঘাটের দিকে ।
কাটোয়ার গঙ্গার ঘাটে গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন বেশ গরম লাগছে । প্রায় সাড়ে এগারোটা মতন বাজে । গঙ্গাঘাটের অনেকগুলি প্রাচীন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম । কত মানুষ স্নান করছেন । দেখলাম বিদ্যুৎ এখানে এসে খুব আত্মমগ্ন হয়ে উঠল । কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে চুপচাপ ঘাটের একটা সিঁড়িতে বসে রইলো , সেখানে ছায়া আছে । শমিতদা তাকিয়ে থাকলেন গঙ্গার দিকে । হয়ত ভেতরে ভেতরে নিজেকে রচনা করছেন । তিনি দার্শনিক মানুষ — চুপ করে তাকিয়ে আছেন ।আমি আর চন্দ্রাণী নীচে নেমে গঙ্গার জল মাথায় নিলাম । সঞ্জয় ছবি তুলছে নানা মুডে । গঙ্গার ওই পারে বালি তোলা হচ্ছে বা অন্য কোনো কাজ হচ্ছিল । গৌরব বললে , ওই যে দূরে নদীটা বাঁক নিয়েছে ওইটে অজয় । দেখলাম দুই রকম জল ।বোঝা যায় দেখার মতো করে দেখলে । আমার তো স্নানের বাতিক আছে ।ওপরে উঠে টোটোতে বসতে বসতে বললাম , স্নান করতে পারলে ভালো হত । একদিন স্নান করতে আসতে হবে ।
এরপর শেষ গন্তব্য ঝুপোমা । তিনিও খুব জাগ্রত দেবী । এখানে কোনো বিগ্রহ নেই । একটি বিরাট নিমগাছ মা হিসেবে পূজিতা । গাছটাকেই শাড়ি পরানো হয়েছে , অলংকার ও গহনায় সাজানো হয়েছে । গৌরব বললে , কত পুরোনো এই গাছ কেউ জানে না । পূর্বে ডাকাতরা পুজো করত । তান্ত্রিকদের ডেরা ছিল । বছর কুড়ি আগেও এদিকে লোকজন কম আসত । নতুন মন্দির হয়েছে । বহু ভক্ত আসে মায়ের কাছে এখন ।
গৌরব আরো বললে , জনশ্রুতি কাটোয়ার তিন মা– ক্ষেপীমা , ঝুপোমা আর তারামা তিনজনে এখানে এসে গল্প করেন ।এইসব গল্প শুনতে বেশ লাগছিল । বেলা হয়ে গেল , ফিরতে হবে । শমিতদা তাগাদা দিচ্ছেন– চলো চলো , ওদিকে দেরি হয়ে যাবে ।আর এদিকে বিদুর খুব ভাবুক হয়ে পড়েছে । এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলোচনা শুরু করেছে । তাঁর বক্তব্যে বিদ্যুৎ খুশি নয় । আমার তো বেশ ভালোই লাগল । আমি আর চন্দ্রাণী শুনলাম । তিনি মার্কেন্ডেয় ঋষির কথা বললেন । জানলাম , সংকট ও মৃত্যুকালে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র-ই আমাদের বাঁচাতে পারে । ঋষি মার্কেন্ডেয় তাঁর স্বল্পায়ু পুত্রের জন্য মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র-ই জপ করেছিলেন । বললেন , মার্কেন্ডেয় মানে কি জানেন ? সূর্য । আলোচনা দারুণ জমে উঠেছে কিন্তু ইচ্ছে হলেই আর শোনা হল না , মাঝপথে মন খারাপ নিয়ে চলে আসতে হল । সন্ন্যাসী বললেন , বেটা , এসব শুনতে গেলে তো সময় লাগে । মন শান্ত করতে হয় । ব্যস্ত হলে চলে না । তাঁকে নমস্কার জানিয়ে চলে এলাম । পরম নাস্তিক চন্দ্রাণীও বললে , ভদ্রলোক ভালো বলছিলেন কিন্তু । তোমার ভ্রমণকাহিনিতে এসব রেখো কিন্তু ।
শেষ হল আমাদের কাটোয়া ভ্রমণ । অনেক আনন্দ আর স্মৃতি নিয়ে আমরা ফিরে এলাম আমাদের নিজস্ব লজে । এবার একটু বিশ্রাম ।