সোমনাথ ঘোষাল-এর গদ্য

Spread This

সোমনাথ ঘোষাল

দূরপাল্লার বিছানা ২
 
আলস্য পথ কোনোভাবেই থেমে যায় না। পায়ে হেঁটে চলে  আমার সঙ্গে। আমি জানি না কোন কোন পথ আমাকে খুব শান্ত  নির্জন দেবতার কাছে নিয়ে যাবে। যেখানে নিভে যায় প্রতিটা অন্ধকার। শীতশেষের পাখির মতন ঝরে পড়ে গাছের পোশাক। আমরা আসলে একটা মানুষও খুঁজে যাই। নিজের সঙ্গে মৃত্যুদিন অব্দি। অথবা তার পর যেন একটা জানলায় বসে ডেকে ওঠে রেডিওর মতন।
 
আমাদের আসলে কোনো ঘর নেই। আছে একটা দুটো সুতোর মেশিন। যেটা দিয়ে চারকোনা একটা থাকার অজুহাত রাখি। সেই সুতো আলোবাতাস খেয়ে ছিঁড়ে যায়। আবারও সেই সুতোর মেশিন। গান লিখে রাখি রান্নার মশলায়।
 
বেশ কয়েকটা দিন একটা খুব বয়স্ক সুতোর চারকোণে কাটিয়ে গেলাম। নেতিয়ে পড়েছে যেন। আশপাশের গাছগুলো ওষুধ দেয়। ঘুম থেকে তোলে। জল দেয়। আবার ঘুম। বহুবছর ধরে সুতোর চারকোণ দাঁড়িয়ে আছে। অপেক্ষা করতে করতে এখন তাকিয়ে পড়ন্ত রোদে। এখানে আবহাওয়ার কোনো ঠিকানা নেই। যখন যেমন খুশি সেজে আসে। বৃষ্টির সময়ে কান্না চাপা ব্যাঙের ছাতার তলায় গুটি মেরে সূর্য লিখতে থাকে। ধুয়ে যায়। আবার লেখে। ধুয়ে যায়। একদিন আলতো রোদ। হাসি। ব্যাঙ চলে যায় ছাতা নিয়ে। আমাদের জীবনের প্রথম দশ বছর আঁকার খাতা। ওটাই এঁকে রাখে বাদবাকি সুতোর মেশিনে।
 
শীত এলে চা বাগানের রাস্তায় নিচু হয়ে থাকে মানুষগুলো। এখানে সুতোর চারকোণগুলো তখন গাছের পাতায় পাখির মতো ডাকে। পাখিরা তখন ঘর হয়। জানলায় বসে শীতকালীন কবিতা খায়। পাশেই পাহাড় নদী জঙ্গল। আর কী চাই শরীরে! তবুও যেন সেই নির্জন দেবতার পুজো। বনদেবী যদি আদর করে রাখে। জিভ বুলিয়ে দেয় ঝরা পাতার রসালো শব্দে…
 
রোদে বসবাস করে জামা কাপড়ের গায়ে হলুদ লেগে থাকে। তারে ঝুলে থাকা ছায়াগুলো গেরস্থ হতে চায়। এখানে সবটাই ছবির মতন। বহুবছর আগে আঁকা হয়েছিল। এখন ধুয়ে যাচ্ছে রোজ। সুতোর মেশিনে এখন আর কেউ গান লিখে রান্না করে না। গাছের পালকে পাখিদের বিজ্ঞাপন হয় না। নদীপথে কেবলই শৈশব শুকিয়ে থাকে। বর্ষার সময় মাছেরা সুতোর মেশিন আনে। কেউ কি সুতোর চারকোণে সুর মেশাবে!
 
এখানে কুলগাছের তলায় মানুষ আসে। ব্যাগে করে আদিবাসী কাপড়। সেখানেই শীতের শেষে বসন্ত আঁকা। কেমন যেন আঙুলে গুলে দেওয়া সময়। ঝরে যাচ্ছে প্রতিটা কথাতেই মরশুমের কোয়া লেবু। রান্নাগান। ওই দূরে চা বাগানের ছায়াছবি।
 
ফিরতে হবে সুতোর চারকোণে। মা আঁচলে কিছু সুতো আনছে। আমি এখনও গান জানি না। সুতোর মেশিনে  কীভাবে চারকোণে সুর লাগাবো! রান্নায় মশলা পড়ে গেলে যেমন স্বাদ বাড়ে তেমনি বেশি পড়ে গেলে রান্না কেটে যায়। নদীর পাড় থেকে কিছু চারামাছ বুক পকেটে রেখেছি। এখন ওরা সুতো খাচ্ছে। বড় হলে চারকোণে সুর বসিয়ে নাহয় কবিতা মতন ডেকে উঠবে…
রাতের মায়াস্বর কাটিয়ে চলে যাচ্ছে তারাদের মাঠ। এই দুলে দুলে যাওয়া গতির সফরে। এখন ঘাসেরা জোনাকির মতন দেখতে। বেনামী স্টেশন ফেলে চাদর জড়ানো চাঁদ দুদিন পর থেকেই বড় হবে। ফেলে আসা সুতোর মেশিনে বোনা চারকোণের সুর দিয়ে যেন আশপাশের প্রিয়জনের আমরুল ফুল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আনমনে আদর করে যাচ্ছে। শালের ঝরা পার্বণে। কী দারুণ এক নির্জন দেবতার চারকোণ। রেলগেটের গায়ে হলুদ ঘর। গাছের ছায়া অবলম্বনে আমাদের গতিপথ। সেটাও কিন্তু ঘর নয়। ওখানে কেউ থাকে না। যারা থাকে তারা থাকতেই আসে। কিছু ছাপ রেখে যায়। পেয়ারার বাগান পেরিয়ে চলে যাচ্ছে আমাদের দুপুরবেলা। পাখিদের সমবেত সরলরেখায় দাগ থাকে দূরের ইস্কুল ফেরত কামরাঙা দিনে। কীভাবে ওখানে যাবো। কতটুকুই বা ফেলে এসেছি ছোটবেলা! অবাক হতে পারি না। রাতের ঘুম ভাঙিয়ে দূরপাল্লার গতি আমিও বিপরীতে থাকা একটা বলের লাফানো স্বপ্ন দেখি।
 
কোনো এক নির্জনতার ডাকে
টিকিট কেটে চলে যাওয়া যায়
দূরের কোনো একটা তৃতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত রাতের গল্পে
যেখানে উবু হয়ে আছে আলোটে কিছু এঁটো ঘর
 
শুনেছি ওখানে থাকে না কেউ
আসে যায় আকার ওকার যাত্রীবাহী রাতের অপেক্ষা
আমি ওপারের দৃশ্য তুলি
 
যেন স্টেশন জুড়ে শুধুই
শেষের তারিখে ডাকাডাকি
করছে আমাদের ফেব্রুয়ারি
 
ফিরে যাচ্ছি জং লাগা সুতোর চারকোণে। সুর কেটে গেছে। মা তাই আগামীকাল দিদির সুতোর মেশিনে বোনা শীতের মায়া হরিণ লুকিয়ে আনবে। আমার বালিশের তলায় রেখে জঙ্গল লিখে দেবে। তাহলেই নাকি স্বপ্নটা হরিণের গতিতে সুন্দর সুতোর চারকোণে সুরকার ঘুম হবে… এতই সুন্দর! হরিণ না হরিপুর কোন স্টেশন এটা? মা তো বলেছিল সুতো আনবে আঁচলে করে! না কি ওটা সুতোর হরিণ… যে রাতের মায়াগতিতে হরিণঘর থেকে স্বপ্নেরা আবার আমাকেই ভাবছে!
 
গতির সঙ্গে যে আলোগুলো আলোচনায় ব্যস্ত, তাদের ভেদ করে চাঁদ জানান দিচ্ছে এই রাতের অধিকার আমার। ঠিক দুদিন পর থেকে আলোগুলো গল্প হয়ে যাবে। চাঁদের অনন্ত পথে পড়ে থাকবে আমাদের উল্লাস। হ্যাঁ, এখন ওই পুরোনো সুতোর চারকোণে থাকা ঘরের মতন কিছু একটায় পেঁচা আসবে। ইঁদুর খেতে। বয়স্ক গাছগুলোর মাথায় অদ্ভুত মায়াতুর ডাকে সাড়া দিয়ে ফেলে বোকা ইঁদুর! কখন যেন রাতের খাবার হয়ে যায়। আমি হাঁ করে গিলতে থাকি শব্দ শুনে শুনে। খাবারের গতি ও প্রকৃতি। একটা একলা থেমে যাওয়া স্টেশন ট্রেনটা সবুজের অপেক্ষা করছে। কোনো এককালে এখানে না কি একটা মানুষ চাঁদ নামিয়ে ছিল। সুতো দিয়ে। তারপর থেকেই এই স্টেশনের নাম চাঁদটানা। যদিও এখন অন্ধকার। ঘুমন্ত ট্রেন অপেক্ষা করছে। কেউ হয় তো থাকার জায়গায় ফিরবে। কিন্তু সবুজ রঙের ওই গাছটা জ্বলছে না! যেখানে পাখিটা সদ্যোজাত স্বপ্নের পোকাগুলোকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছে…
 
অপেক্ষা… এই স্টেশনটাও কিন্তু থাকার কথা বলছে।
 
ভাঙাচোরা কিছু উচ্চারণ পড়ে আছে। ঘরের মেঝেতে ধুলোবালির সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে আগামীকাল। এখন ঝরাপাতার দিন। নতুন সম্পর্কের প্রান্তর থেকে খোসা ছাড়ানো বিকেল। যেন আমি একটা টিলায় বসে ভাবছি। চা ঠান্ডা হওয়ার আগে চুমুক দিচ্ছি নতুন লালমাটির মানুষের গল্পে। ব্যাগের ভেতরটা গোছানোই আছে। কেবল পা দিয়ে ঢেলে দিলেই সেই নির্জন….