গদ্য-অনির্বাণ দাস

Spread This
অনির্বাণ দাস

অনির্বাণ দাস

তলায়, তলায় … 
 
দেশ ও জাতির প্রতি একটা মিনিমাম দায়বদ্ধতা থাকবে না তোদের? কথা নেই বার্তা নেই দুম করে সব কটা কাউন্টার বন্ধ করে দিলি? দিক দিগন্ত হতে এসে বন্ধ শাটারের গায়ে কপাল ঠুকছে তৃষিত আত্মারা। আজ কি বেস্পতিবার? আজ কি গান্ধি বার্থডে? আজ কি স্বাধীনতা দিবস? ভােট যে ভােট – সেও এখনাে এক মাস দেরি! তাহলে? তাহলে কী? একজনই বাঁচাতে পারে। দেরি করে লাভ নেই আর। হাওয়া আজ প্রতিকূল। হাওয়া আজ দু’মুখে দু’রকম কথা কইছে। বিকাল আর সন্ধ্যার মাঝে শরীরে প্যারাস্যুট বেঁধে যারা শূন্যের ভিতর ঝাঁপিয়ে পড়ে রােজ — স্মৃতি নিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য তারা পছন্দ করবে কেন? জ্যোৎস্নায় পুড়ে যাওয়া জংলা মাঠ আসলে একটা ইস্তেহার। তাতে প্রতিশােধ বানানটা লিখতে গিয়ে কাটাকুটি করেছে। কে যেন। ইঁদুরের গর্ত আর উড়ােঝুরাে মাটি, উথালপাথাল ঘাস আর তার মনের আশপাশ দিয়ে কথা কইতে কইতে চলে যায় চৈত্রের বাতাস। পেরিয়ে যায় কত প্রাচীন পুকুরের নিথর দেহ। সন্দেহ মানে ভাঙা ঘাট। মিথ্যেবাদীর একা হয় খুব, সত্যি সত্যি! এই সব অলিগলি ধরে এখন ছুটতে হবে, জার্মানবাড়ির পাশে পার্কের অন্ধকার রাস্তায় সে দাঁড়িয়ে আছে হয়তাে। সে মানে মহাকাল, মহাকাল মানে বাবুদা, দুই ব্যাগে নীপ পাঁইট নানাবিধ মৌলিক ও যৌগিক বঙ্গানুবাদ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাকে হেঁকে ধরেছে কত বয়সী তৃষ্ণা। ছায়ামানবেরা পকেট থেকে টাকা বের করে ওঠার আগেই মহাকাল তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে বােতল। নাও নাও তাড়াতাড়ি ফুটে যাও, পুলিশের ঝামেলা খুব। কখন তুলে নিয়ে যাবে ঠিক নেই। দু’বার চক্কর মেরে গেছে। ও.সি-র নীপ নেই, নাম্বার ওয়ান দেবাে? আত্মারা যা নিতে এসেছিল, নিয়ে চলে যায়। দলা দলা টাকা – এখন এসব গুনতে বসলে চলবে না। মহাকাল সাইকেলে ওঠে অন্ধকারের ভিতর; সঙ্গে বিশাল দুটো ব্যাগ, হ্যান্ডেলে ঝােলানাে। কে বলে ব্যাগ? আসলে বিপর্যয় মােকাবিলা কমিটি। এবার ঝুপ্পস অন্ধকারের অন্তরে মিলিয়ে যাবে সাইকেল নিয়ে। হা হুতাশের হালখাতা নিজের পাতা নিজে উল্টায় আর বিড়বিড় করে — বাকি রাখবাে না এখন থেকে আর। বাকির কারবার ভাল না। বাতাস হাসে। কিছু বলে না। মনে দাগা দিয়ে কী লাভ?
কাল একলা বৈশাখ। কী হতে কী হয়। তার চেয়ে ভাল দূরে দূরে থাকা। সুখের থেকে দুখের থেকে। গলা শুকিয়ে কাঠ, কী যেন একটা ছটফট – চোখ মেলতেই জানলার ফাঁক দিয়ে কমলা রঙের ভাের এলাে। ধড়ে ফিরে এলাে অপহৃত প্রাণ। বুঝলাম – স্বপ্নে এ্যারেস্ট হয়েছিলাম। ধরপাকড় শুরু হয়ে গেছে খুব। কী করে ছাড়া পেলাম? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই তাে আবার সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আর কে না জানে সন্ধ্যা হলে কী হয়। কী হয়? বলা যাবে না। সব বলা যায় না কি? আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে সব বলতে হবে না। সব তুমি কী করে বলবে, শব বলবে শ্মশান, সব জানে সে। তুমি আর কতুটুকু জানাে। এই তাে, হয়ে গেল তাে, আবার শ্মশান? আবার তার মানে কথা ঘুরানাে শুরু? আরে না না কথা কারাে নাম হতে যাবে কেন? কী মুশকিল, আমি কী করে বলবাে খেলাপ তার কে হয়। আনমনা হলেই বেজে ওঠে ঝনঝনি – বাঘছাল পরে হাতে ত্রিশূল নিয়ে সেই আশ্চর্য অবিনশ্বর হ্যাজাক বাতিবৃত্তে লাফিয়ে নামে পরচুলা পরা প্রণয়। তালে তালে নাচে আর লােকজন জড়াে হয়। মোটেই একা নয় সে। তাকে ঘিরে আরাে কত জরি ঝলকানাে মুখোশাশ্ৰিত চরিত্র আসরে নাচতে নেমে পড়ে। ক্রমে বেড়ে চলে বাজনার লয়। এরপর সর্বনাশ এসে হাত পেতে দাঁড়াবে, পিঠে দুটো চারটে এক্সট্রা হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা। কোন খুচরাে তার কোন হাতে তুলে দেবে সংসার – আগে থেকে কি বলে দেওয়া যায়?
দেশ আর দুর্নীতির মাঝে যে সরু সরু গলিপথ থাকে — সেগুলাে ধরতে পারলে তাড়াতাড়ি পৌঁছনাে যায়। যারা জানার তারা জানে। সে সব রাস্তায় ট্রফিক সিগনাল একদম আলাদা। মেনে চলার ব্যাপারটাও একদম ভিন্ন রকমের। ফলে অমান্য করারও আলাদা একটা ব্যাকরণ। মানেই নেই? কে বলেছে নেই? আছে সব আছে। সামনে ভােট, তাই সব খুলে বলা যাচ্ছে না। সব না হয় না-ই বা খুললেন, অল্প কিছুও কি খোলা যাবেনা? মানুষ কী অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে – এক ফালি কুমড়াে কিনতে গেলেও মনে হচ্ছে পরিতােষ জুয়েলার্সে শাঁখা-পলা বাঁধাতে ঢুকেছি। এই আপনার এইটুকু টুকু লাউ – তাতেও হাত দেওয়া যাচ্ছে না। আপনার মাংসটাংস তাে ছেড়েই দিয়েছি কবে। এবার কি আলুর কথায় আসবেন? দোষের কথা কেউ ঝিরিঝিরি করে ভেজে ছেড়ে দিচ্ছে কেউ কষা করে গােটাগােটা। বাজার সব খায়। খাওয়াতে পারাটাই আসল। সুদীপ্ত সেন বলেও আসলে কিছু হয় না – ওটাও একটা ছদ্মবেশ। বিমূর্ত তার কায়া ও মায়া। লােভের কখনাে দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতা থাকে? সীমাবদ্ধ থাকে কি সে একটা কোনাে নাম একটা কোনাে পরিচয় একটা কোনাে আয়ুষ্কালের মধ্যে? স্মৃতির সঙ্গে মানুষের ক্যাচাল কখনাে মেটে না। পাড়ার বেড়ালের মতাে সে – এক বাড়ির এঁটোকাটার অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে? গাড়ি করে ঘুরে বেড়ায় প্রার্থী – গলায় গেঁদা ফুলের মালা, মুখে হাসি। হাত নাড়ে। নাড়তে নাড়তে চলে যায়। পাবলিক যে কোথায় টিপতে কোথায় টিপবে – শরীরটাকে কেমন ই.ভি.এম ই.ভি.এম লাগে। বেলা বাড়লেই রাস্তাঘাটে লু। বেচারা গ্লুকোজ আর ক’দ্দিক সামলাবে! কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। এই তাে কটা দিন। তারপর … আচ্ছা, এখানে কেষ্টদার নামে কেউ কিছু বলল মনে হচ্ছে? থমথমে গরমের ভিতর ঘুরপাক খায় তাপ – সবই আসলে মানুষের স্বার্থে। মানুষ বড় অবুঝ, মানুষ বােঝে না, বুঝতে চায় না। গানটা একটু হবে না কি? গান বললেই কোমরে হাত চলে যায় অজান্তে — দুলে ওঠে মাধবীর প্রাণ / কী অনুরাগে … এখানে বসে বসে মাধবী মারাচ্ছেন আর ওদিকে কিন্তু সাত নম্বর বুথে বাইরের ছেলেপেলে ঢােকা শুরু করেছে। গন্ধ ভাল না। শান্তি নেই শান্তি নেই। শান্তির মেজো পিসিও নেই। দেব না কি ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে – প্রতিটা দিন এভাবেই নানারকম শশা বেচে বেড়াচ্ছে। কত যে কম্পার্টমেন্ট, কত যে রুমাল দিয়ে সিট রাখা। অথচ জান হাতে নিয়ে রানিং করে উঠে জানলার পাশে যার জন্যে জায়গাটুকু রাখা – সে কি এসেছিল কোনােদিন শেষ পর্যন্ত? চোখ বুজে পড়ে থাকে প্ল্যাটফর্ম। কথা কইতে ভাল লাগে না আর।
এই ভাবেই এলােমেলাে হয়ে যাচ্ছি রােজ! কী হবে বারণ করে? ঝড়ের ভিতর কম সামলে রেখেছি টিনের চাল? ঘর বাহির যে যার মতাে ফেলে রেখে চলে গেছে আমায়, ফিরেও তাকায়নি। যদিও বা তাকিয়েছে — আমি তখন কোথায়? রান্না খাওয়া হাগা মােতার বাইরে, উঠতে বসতে ব্লেড চালানাের বাইরে, টাকাপয়সা আর টাকাপয়সার বাইরে কে ছিলাম আমি? ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোম – যে যেমন পেরেছে ঢপ দিয়েছে আমায়। চোখ বুজে সরল মনে বিশ্বাস করেছি সব। ঠকেছি, তারপর আবারও গিয়ে হাত পেতে দাঁড়িয়েছি। কাঙাল কখনাে জোচ্চুরি করে না কান্না নিয়ে। সেই সব পোড়াগন্ধ রাস্তা হারানাে রসাতলের ভিতর হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে একা একা কখন। কেউ জানতেও চায়নি দেখতেও পায়নি। কুকুর কি ধাওয়া করেনি তাই বলে? মাঝরাস্তায় দাঁড় করিয়ে ফালা ফালা করে দেয়নি জামাকাপড়? আজ আর কী লাভ সে সব বলে। ক্ষতি কুড়ােতেই তাে এসেছি অবেলায়। সন্ধে হলেই শুরু হয় খোঁজা। সবার ভিতরেই একটা চোর থাকে আর একটা পুলিশ। নইলে আর খেলা কীসের! কারাে কারাে ভিতরে আবার থানা থাকে, থাকে লকআপ। স্যাটা-ভাঙা মারে ধরে নিয়ে গিয়ে। কোন বাপ তােকে বাঁচায় দেখবাে। হিসি করে দেয় ঠাপ খেয়ে। নাম বল, সবকটা শুয়ােরের বাচ্চাকে আজ রাতেই তুলবাে। এই সব চলে। ফোন আসে – ছেড়ে দিন। আমার লােক। ধুলাের ভিতর ধুলাে জড়িয়ে শুয়ে থাকা নেড়ি মিটমিট করে চায়। কত রাত এখন? রাত কি শেষ হয়ে এলাে? একটু জল খেতে পারলে ভাল হত। কল আছে কি কাছে ধারে? থাক, জিগ্যেস করার দরকার নেই। কী কল দেখিয়ে ছাড়বে শেষে। তার চেয়ে হাঁটতে থাকা ভাল। ঘুমের ভিতর। হাঁটতে হাঁটতে ভাের হয়ে যাবে।