উপন্যাস-রাজর্ষি পি. দাস

Spread This
রাজর্ষি পি দাস

রাজর্ষি পি. দাস

আলিয়া
 
খুব ভাবতে ইচ্ছে করছে আমার জন্য এক নারী লেকব্রিজে বা ফ্লুরিস-এ বা অক্সফোর্ডে অপেক্ষা করছে। সে অ্যাকোয়া-মেরিন  টপের উপর একটা  অ্যাশ-ব্লু  স্কার্ফ জড়িয়ে ক্রশ-লেগে বাঁ-পায়ের কাফ্-মাসল বের করে পিচরঙা ঠোঁট দুটো জড়ো করে কফিকাপে একটা আলতো চাপ দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে চুমুক দিল। সামনের দিকে তার কালো বড়ো বড়ো চোখের মণি দুএকবার এদিক ওদিক করে নাকের পাটা ফুলিয়ে আবার একটা বড়ো চুমুক দিয়ে টেবিলের উপরে রাখা মোবাইলটা টেনে নিল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাটিতে প্রথম পা রেখে আকাশের দিকে তাকাতেই দেখি এক টুকরো কালো মেঘ। বাকি আকাশ ঝকঝকে ব্লেডের মতো। আজ অনেকদিন পর বেরোচ্ছি।
ওর নাম কী হতে পারে? এই রে, এই নাম-টামকরণে আমি ব্যাপক ভাবে ব্যর্থ। যতো নাম মনে  করার ততো বেশি মুখ চলে আসে। আর অদ্ভুত,  মুখগুলো চেনা অথচ নাম মনে করতে পারি না! এখন এই পাজাতে ঢুকলে আর পৌঁছতে হবে না! মোবাইল খুলে উবের-এ  লেকব্রিজ টাইপ করলাম। বলল তিন মিনিট।
তিন মিনিটের জায়গায় ৪ মিনিট, বড়ো রাস্তায় পৌঁছে গেছি। আর পাঁচমিনিটের মাথায় নামল বৃষ্টি। ছ’মিনিট হতে না হতে টিপটিপে বৃষ্টি পরিণত হল মহাবৃষ্টিতে। আটমিনিটে এল ড্রাইভারের ক্যান্সেলশন মেসেজ। আমি কোনোমতে গম ভাঙা দোকানের শেড-এর তলায় ভিজতে ভিজতে উল্টোদিকে মুখ করে আবার ডেসটিনেশন টাইপ করলাম। তবে এবার অন্য নাম টাইপ করলাম – অক্সফোর্ড – পার্ক স্ট্রিট! এই বৃষ্টিতে লেকব্রিজে ও দাঁড়াবে না। ওর আবার একটু সর্দির ধাত আছে।
মনে পড়ছে মেয়েটি প্রথম মাথায় এসেছিল, মুম্বাইতে একটি স্ক্রিপ্ট লেখার সময়। এ-মেজর নামে একটি মিউজিক্যাল প্রেমের গল্প ফাঁদতে গিয়ে। ফিল্মের ভাষায় গল্পের ওয়ান লাইন লেখা হয়ে গেছে কিন্তু নায়িকার নাম জুতসই হচ্ছে না। প্রডিউসার পরিচালক দুজনেরই গল্প পছন্দ কিন্তু নায়িকার নাম পছন্দ নয়। কি যেন একটা বাঙালি নাম দিয়েছিলাম। তারপর এক সপ্তাহ ভেবে যে নাম দিয়েছিলাম সেটাও তো মনে পড়ছে না। দেখি তো সমীরকে ফোন করে। মুম্বাইতেও নাকি শুনলাম ফাটিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। এখানেও কম যাচ্ছে না, কিছুতেই মোবাইল বের করার মতো শেড পাচ্ছি না। গমের দোকানের শেডের নিচে তেড়ে বৃষ্টি ঢুকছে। রূপম মিউজিক ডিরেক্টর ছিল। বেহুলা-কে নিয়ে একটা গান আর লালন-এর একটা গান – ইয়েস নায়িকার নাম ছিল আলিয়া। ২০০৮ এ দেওয়া।
আলিয়া একজন পাহাড়ের মেয়ে। শিলং –এর, অসাধারণ গানের গলা, অবশ্যই ওয়েস্টার্ন সাথে বাঁশিটাও ফাটিয়ে বাজায়। লম্বা চুল, রোগা, লম্বা, চোখে একটা অনেকদূরে ঝিলে সন্ধ্যার বিষন্নতা। কম কথা বলে। কিন্তু চাপা ঔদ্ধত্য, হাসে না, নিজের হ্যাঁ বা না মাথা নেড়ে জানায়!
স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ হতে আলিয়া পরিচালকের হয়ে যায়। পরিচালক তারপর আলিয়াকে নিয়ে এতোটাই অবসেসড হয়ে পড়ে যে মুম্বাইতে – প্রায় ৫০০, কলকাতায় ৫০, শিলং-এ ৪০ এর মতো মেয়েকে স্ক্রিন টেস্ট নিয়ে, ৩৫ দিন নায়িকা ছাড়া শ্যুটিং করে, ৬৫ লক্ষ টাকা খরচা করে হাঁফাচ্ছেন। কিন্তু আলিয়াকে পাওয়া যায় না। একদিন পরিচালক ফোলামুখে বলেন – দাদা আলিয়া কো আপকে পাস রাক্ষো!
ফলে আলিয়া আবার লেখকের কাছে ফিরে আসে।
অবশ্য লেখকেরও ততদিনে আলিয়া সম্বন্ধে যাবতীয় বিস্ময়, মুগ্ধতা শেষ! একে তো অন্যহাতে হাতে ঘুরে আসা তার উপর প্রায় আসমুদ্রহিমাচল ছেঁকে এতোগুলো মেয়েকে আলিয়া কল্পনা করে প্রায়  ১৫০০ ঘন্টা কথা বলা – ওহো, সাথে খান ২০ আবার বিদেশিনী!! ঘেঁটে ঘ-ঙ-চ-ছ……চন্দ্রবিন্দু অব্দি!!
 ইনফ্যাক্ট আমি এখনো জানিই না আলিয়া দেখতে কেমন?
উপরের বর্ণনা স্ক্রিপ্ট শুরু করার আগের স্কেচ। সেটাই ভরসা।
যাক নামটা তো মনে পড়েছে। আলিয়া! আহারে মেয়েটা অভয়ের জন্য নিজের গান-বাঁশি মাচায় তুলে আত্মগোপন করে অপুষ্টি আর ইন্সোম্‌নিয়াতে ভুগে ভুগে দীর্ঘ ৭ বছর কাটিয়ে দিল আর কেউ ওকে জানতে দেখতে পেল না! এতো অভিমানী মেয়ে আর আজকাল হয়?
কিন্তু আজ কেন মনে হচ্ছে অক্সফোর্ডে আলিয়া বসে আছে, আমার জন্য?
আলিয়া উঠব উঠব করছে। বৃষ্টি থেমেও থামছে না! কফি শেষ। আলিয়ার টেবিলে একটি নতুন অ্যাসিট্যান্ট  ডিরেক্টরের মতো দেখতে ছোকরা অযাচিত ভাবে এসে বসল। আলিয়া পাত্তা না দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ছেলেটি চোখেমুখে ধূর্ততা। ছেলেটিও তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে জানতে চাইল আলিয়া সিগারেট খেতে বাইরে যাচ্ছে কিনা! ওর নাম সমাপন!
ছেলেটি হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়েই আছে।
আলিয়া আলতো করে বলল – ডু আই নো ইউ?
ছেলেটি হাত নামিয়ে – সার্টেইনলি নট। মাই বস্‌ সেন্ট  মি …
হাত তুলে একটু দূরে বসা একটা ভিড় টেবিল দেখিয়ে বলল – দেয়ার হি  ইস… রাইটার ডিরেক্টর…উনি বলছেন উনি আপনাকে চেনেন, তাই আপনার সাথে আলাপ করতে চাইছেন!
আলিয়া – সো!
বলে দূরে হাত তুলে ধরা এক বছর ৫০ এর লোককে দেখে প্রত্যুত্তরে দুবার  হাত নেড়ে আলিয়া আস্তে আস্তে নিচে নেমে পার্ক স্ট্রিট-এর বিশাল ফুটপাতে দাঁড়িয়ে একটা জয়েন্ট ধরাল। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। সন্ধ্যা নামার আগেই অন্ধকার হয়ে এসেছে। গোটা পার্কস্ট্রিট ভিজে রাস্তার উপর ঝলমল করছে। আলিয়া ঝুকেঁ একবার ট্রিংকাস-এর দিকে তাকাল।
গতকাল থেকে যতবার এই ফুটপাতে এসেছে বা দাঁড়িয়েছে ও আড় চোখে দেখেছে এই রেঁস্তোরার দিকে কিন্তু ভিতরে ঢোকার সাহস হয় নি। শিলং থেকে পালিয়ে এসে অঞ্জন তো এখানেই গিটার বাজাত। এখানেই তো ম্যানেজার মিঃ পাটিলের সাথে দেখা! এ-মেজর-এর রিভাইভেল শুরু!
অঞ্জন, দ্য লিড গিটারিস্ট।
এমন সময় পাশে এসে কেউ যেন দাঁড়াল।
একটা বড়ো শ্বাস টেনে,  আহা, মণিপুরি …
আলিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে সেই লোকটি যে হাত তুলেছিল – রাইটার-ডিরেক্টর। আলিয়া সোজা লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
 লোকটি হেসে বলল – ইউ আর সাপোজড টু বি আলিয়া।
আলিয়া অবাক – নো !
লোকটি হাসি আরো  চওড়া  করে – আই মিন, সাপোজড টু বি!
আলিয়া – হু ইজ শি?
লোকটি এবার একটা সিগারেট ধরিয়ে জানাল  আলিয়া ওর একটা ফিল্মের নায়িকার নাম। স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ চলছে। দূর থেকে দেখেই মনে হয়েছে ও আলিয়া! তাই আর সামলাতে না পেরে প্রায় অভদ্রতা করে ফেলছেন আর কি!
আলিয়া ভ্রু কুঁচকে – ওকে, আই ডিডন্ট মাইন্ড! বাট ইফ আই এম সাপোজড টু বি আলিয়া দেন আলিয়া ইস সাপোজড টু বি ইন দিস আর্থ সিন্স ২০০৮। এন্ড আই নো আই ডোন্ট বিলং টু  ইউ! দেন হোয়াট দ্য হেল ইউ আর রাইটিং আব্যাউট !
লোকটির মুখে  আকাশের কালো মেঘ বসে গেল যেন। আলিয়া আরো আক্রমণাত্মক হয়ে লোকটার নাম জানতে চাইলে লোকটা পালিয়ে অলিপাব-এর দিকে চলে গেল!
আলিয়া মনে মনে খিস্তি করল — ফাকিং রাইটার্স!
তারপর ঘড়ি দেখে। বৃষ্টি দেখে। রিফারের শেষ টান দিয়ে সিগারেট কোম্পানিকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলতেই ভেজা পিচের রাস্তায় অনলাইন জামাকাপড়ের বিজ্ঞাপন মাড়িয়ে, ভগ্নাংশকে টায়ারে জড়িয়ে একটা নস্যি আর সাদা রঙা মারুতি ব্রিজ প্রায় উড়ে বেরিয়ে গেল। আলিয়া নিজের দুটো তালু ঘষতে ঘষতে প্রায় একদৌড়ে ট্রিংকাস-এ ঢুকে পড়ল।
ভিতরে গিয়ে একটা বড় দম নিয়ে যা দেখল, হতাশ হল! যদিও তখন লাইভ মিউজিক শুরু হয় নি! কিন্তু বৃষ্টির জন্য একটা টেবিলও খালি নেই! হতাশ হল এইজন্য যে আলিয়া ওর মিউজিক ইন্সটিংক্ট দিয়ে সেন্স করতে পারল যে এই পুরো হলভর্তি কনজিউমার আছে শুধু অডিয়েন্স নেই! এখানে অঞ্জন বাজাত? হায় হায়! অঞ্জন-এর জন্য একটা নতুন মন খারাপ তৈরি হল। সেই ২০০৮ –এ অঞ্জন শিলং-এ বলে বলে — কোল্ড-প্লে — বাজাচ্ছে। আর স্ল্যাস তো যখন তখন। আর Lou Majaw এখানে গিটার বাজাত! শিট!
আলিয়া একটা কোণে দেয়াল হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ খুব ক্লান্ত লাগছে।
অঞ্জন ওর জন্য নিজেকে এতোটা ডিপ্রাইভড করেছে! স্ক্রিপ্ট-এর একটা সিন মনে পড়ল।
SCENE NO — 48
EXT-INT SHILLONG, NIGHT, ALIYA’S HOUSE
অঞ্জন আলিয়ার বেডরুমে একটি ধারে বসে আছে। আলিয়া দুহাঁটু তুলে  বালিশ বুকে চেপে বসে আছে।
অঞ্জনঃ প্লিজ অভয় কো মত্ বাতানা হম তুমসে মিলনে আয়ে থে…ও ভি ইস টাইম…
আলিয়াঃ হোয়াই?
অঞ্জনঃ বিকজ হি লাভস্ ইউ!
আলিয়াঃ ওহো মাই মাই …রিয়েলি…মুঝে নেহি পতা থা…দ্যাট সামওয়ান লাভস্ মি…!!!
অঞ্জনঃ মুঝসে জাদা উসকো কোই নেহি জানতা…আই এম হিজ ওল্ডেস্ট বাডি … হি লাভস্ ইউ আ লট্!
আলিয়া অঞ্জনের দিকে তাকিয়ে থাকে আর অঞ্জন আলিয়াকে ছেড়ে প্রায় দৌড়ে পালায়।
একা আলিয়া বসে থাকে। ঘরে টিমটিম করছে একটা টাংস্টেন বাল্ব। আলিয়া বালিশের উপর মুখ চেপে বিছানায় উপুড় হয়!
 
      ঐ সিনে বা তারপরেও অঞ্জন যদি কোনোদিন একবার হাঁটুর উপর বসে ওর হাতের তালুতে চোখ ঘষে বলতো – আলিয়া আই লাভ ইউ! তাহলে আলিয়া কী করতো! আলিয়া জানে না! আজ ৯ বছর হয়ে গেছে আলিয়া জানে না! জানবে কী করে ঐ বাঙালি লেখক তো পুরো – নভেম্বর রেইন — দ্বারা নাকি ইন্স্পায়ারড্! স্ল্যাশ নাকি অঞ্জন আর অভয় হল অ্যাক্সেল রোজ! ফলে যা হবার হয়েছে অঞ্জন একা একা কলকাতায় ওই কমপ্লিটলি নন্-মিউজিক বারে বসে টুং টাং করে গেছে! একবার পেলে হয় মালটাকে। গলা টিপে ধরে বলত – ওয়াজ দেয়ার নট এনিথিং অরিজিন্যাল?
কিন্তু আবার ভয় হয়, রাইটার আবার রিরাইট না শুরু করে দেয়! বিশ্বাস নেই, দুম করে মাল খেয়ে একদিন লিখে ফেলল যে আলিয়া মারা গেছে! ব্যাস, তাহলে এই যে এত সুন্দর পৃথিবী — অবশ্য পৃথিবী বলতে আলিয়ার কাছে এই কলকাতার পার্ক স্ট্রিট আর – আলিয়া হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ে।
ও জানে অলিপাব পেরোলেই ও অদৃশ্য হয়ে যাবে। তারপর হয়তো নিজেকে খুঁজে পাবে মুম্বাইএর ভারসোবা রোডে নাহলে শিলং-এ লাইটুমখ্রাহ আর আশেপাশের পাহাড় নদী গ্রাম-এ! এই তিনটে স্থান ছাড়া একা একা ঘুরে বেড়ানোর জন্য ওর এই পৃথিবীতে আর কোনো জায়গা নেই যাওয়ার ! পৃথিবী শব্দটা আলিয়ার আর্থ থেকে বেশি পছন্দের, আর শুনেছে, বারে-কফিশপে-ফুটপাতে হাঁটতে হাঁটতে অদ্ভুত সুন্দর সুন্দর স্পেসে মানুষ-মানুষীকে টিভিতে হৈ-হুল্লোড় করতে দেখেছে! খুব ইচ্ছে করে ওসব জায়গায় গিয়ে নিজেকে ভুলে যেতে!
নিজেকে ভুলে যেতে?
আলিয়া কতবার চেয়েছে এই — নিজেকে ভুলে যাওয়া — ব্যাপারটা ঘটাতে, নিজেকে ভুলে যেতে যেতে এই যে বারবার জন্ম নেওয়া আর যখন-তখন একটা সীমাবদ্ধ জায়গায় ফিরে আসা আর স্মৃতি বলতে ওই স্ক্রিপ্ট-এ লেখা চরিত্র আর ঘটনা,বারবার সেই একই স্পেসে ফিরে আসা-কে একলাফে অতিক্রম করে অনেকদূর থেকে টানটান চোখে চিনে নেওয়া কোথায় কোথায় ও না থাকলেও চলত বা ক্যানো ও ভালোবাসতে  চায়!
 
শিলং-এর মেয়েরা ভীষণ সাবলীল এবং ডেয়ার ডেভিল কারণ শিলং-এ মেয়েদের সারনেম সন্তান পায়! কিন্তু ও তো শিলং-এ জন্মায় নি, ওর বাবা খাসি নয়!
ও জন্মেছে মিশর-এর একটি শহরতলিতে! আলিয়ার বাবা ইজিপ্ট-এর পুরোনো মুসলিম, ওর শুধু মনে আছে মিশরের সেই ছাড়া-ছাড়া আকাশে উড়ে বেড়ানো ঈগল। তারপর কিশোরী হয়ে যুবতী হয়েছে নানির কাছে! শিলং-এ! গ্রেট!
আলিয়া অনেকবার ভেবেছে রাইটার-এর সাথে দেখা করবে! সাহস হয় নি! কারণ আমি বেঁচে থাকতে চাই! আর এখন তো একেবারে নয়! যদি রাইটার আমাকে পছন্দ না করে! আমিতো ৯ বছর আগে যা ছিলাম এখনো তাই আছি! লেখকের তো মনে হতেই পারে আমার শরীর আর আগের ২২ বছর নয় এখন থার্টি প্লাস একজন মহিলা! আর সবচেয়ে বড়ো ভয় – যদি লেখক ঠিক করে, ওকে, আলিয়া এখন অন্য গল্পের নায়িকা, বয়স ৩১! চেস্ট ৩৬, কোমর ৩২, থাই ৩০ … ও মাই মাই …  আমি জাস্ট নিতে পারব না!
কারণ, আমি নিজেকে বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। আমার শরীর, আমার মুখ, আমার গানের গলা, আমার বাঁশি বাজানোর স্কিল, আমার হাঁটা, আমার ব্যক্তিত্ব, আমার নাভি, ঠোঁট, চিবুক …ইভেন আই লাভ মাই লং পিঙ্ক টাং … আমি অভয়কে পুরোটা পেতে চাই, আমি চাই ও ওর ভোকাল-ব্যক্তিত্ব-ইগো সব নিয়ে ঢুকে পড়ুক আমার শরীরে! তাহলেই হয়তো আবার –এ-মেজর—জেগে উঠবে, ব্যান্ড-এর প্রতিটা মেম্বার জেগে উঠবে উড হাউসে। আমি ভীষণ ভাবে চাই অভয়-এর সাথে লাভমেকিং-এর মতো উত্তেজনায় ওরা সবাই জেগে উঠুক। সবাই আবার হাতে হাত রেখে রিহার্সাল শুরু করি! ফাটাফাটি সব নাম্বার তৈরি হোক! আমি তো দেখি, বারে-কফিশপে আজকাল সারা পৃথিবী জুড়ে ব্যান্ডের কী অবস্থা! ফাকিং হাউলিং অর টকিং স্ল্যাং আর ফিমেল ভোকালিস্ট কাম ফ্লুট প্লেয়ার…নো! নো-হোয়ার এক্সিস্ট! ওরা আবার ৯০ এর রক-ব্যান্ড—এর ম্যাজিক ফিরিয়ে আনবে – বেহুলা তু মুঝসে জিন্দা…
ভাবতে ভাবতে পার্ক স্ট্রিটের শহুরে আলোতে দেখলাম লেখক একটা সাদা গাড়ি থেকে নামছে, এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, ডেস্‌পারেট… আর  আমি দেখলাম, আমি অলিপাবের ফুটপাত থেকে নেমে অল্প-অল্প করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি!
লেখক যতটুকু কল্পনা করে ততটুকুই চরিত্রের অস্তিত্ব?
উবেরে আসতে আসতে লেখক ভাবছিল, এবার আলিয়াকে মুক্তি দেওয়া উচিত। সিনেমায় না হোক একটা বই লিখে পাঠকের কাছে ছেড়ে দিতে হবে। তাছাড়া, নিজেও আলিয়াকে নিয়ে কিছুটা বোর হয়ে গেছে। যখনি ভাবতে ভালো লাগে ওর জন্য পার্ক স্ট্রিট,ভারসোভা আর শিলং-এ কেউ অপেক্ষা  করছে তখন সবার আগে আলিয়া চলে আসে। নবছর হলো, আর কতো? এদিকে, আলিয়াকে স্মৃতি থেকে পুরো মুছে দিতেও পারে না! ঠিক চলে আসে। আজ আলিয়াকে নিয়ে বসতে হবে! আজ আলিয়ার কথা মন দিয়ে শুনবে! অনেকদিন হল, আলিয়া কোনো কথা বলে না!
পার্ক হোটেলের সামনে ট্যাক্সি থেকে নেমে লেখক দেখে আলিয়া অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে! লেখক ভারী গলায় বলে উঠল – আমি এসে গেছি… জয়েন মি!
লেখক সোজা অক্সফোর্ডের সুইং-ডোর ঠেলে উপরে টি-বারে বসে ল্যাপটপ খুলে বসে পড়ল!
আলিয়া অদৃশ্য না হতে পেরে আশ্চর্য হল না, বরং বুঝতে পারল ওর পোশাক বদলে গেছে, ও এখন ফুল লেংথ জিন্স প্যান্ট আর একটা ঢিলেঢালা অফ-সাদা টপ পরে অক্সফোর্ডের দিকে ফিরে যাচ্ছে। লেখক আলিয়ার কথা শুনতে চাইছে! আলিয়ার মনে একটা পুরোনো স্ফুর্তি।
দোতলায় উঠে দূর থেকে আলিয়া লেখককে দেখে অবাক না হয়ে পারল না! মাত্র ন’বছরে লোকটা  এত বুড়িয়ে গেছে। মাথার চুল প্রায় সব পেকে গেছে, বিশেষ করে সামনের দিকে চুল, আর এতদূর থেকেও ভুঁড়ি স্পষ্ট। লেখক বলতে চশমা আর চোখ! সারা শরীর জুড়ে একটা ক্লান্তির ভাষা মুখর, ঝুঁকে বসে আছে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে। অতীতের সেই ছটফটানি, টানটান ঘাড়ের চাঞ্চল্য পুরোটাই অনুপস্থিত। আলিয়া একমন সহানুভূতি নিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেও দুপা হেঁটেই বুঝতে পারল এই মানুষটা ওকে পুরোনো আলিয়া হিসাবে মেনে নিতে পারবে না! দেখা মাত্রই নাকচ করবে ওর বর্তমান চেহারা!
যা ভেবেছিল তাই। আলিয়া টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই লেখক বলল, ইয়েস! আলিয়া খানিকক্ষণ লেখকের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলে লেখক বিষন্ন মুখে অথচ মুখের ভাঁজে হাসি নিয়ে বলল, ও আলিয়া! এসো বসো!
আলিয়া চেইয়ার টেনে বসে — হ্যালো স্যার – বলার জন্য জিহ্বা চালিয়েও শুনতে পেল কোনো আওয়াজ বেরোয় নি। ফলে আলিয়া হালকা বিব্রত!
এদিক ওদিক তাকায়! পাশের টেবিলে একটি লেডিজ হ্যান্ডব্যাগ পড়ে আছে। ফাঁকা! ব্যাগটা সাদা রঙের! ক্যামন যেন ফ্যাকাশে সাদা! এই সাদা রঙের একটা গাউন ওর ছিল, সুস্থ হয়ে যখন হেলিকপ্টার করে ও এ-মেজর—এর রিভাইবেল অনুষ্ঠানের স্টেজে নামার কথা! একটা সাদা গাউন, যার উপরে কুচো কুচো আমেরিকান ডায়মন্ডের সেটলিং! একটু ভারী ছিল, কিন্তু ওকে লাগছিল অসাধারণ, হেলিকপ্টারে ওঠার আগে গৌহাটির হোটেলে তিন চারবার মিরর রিহার্সালে আলিয়াকে – লায়লা ম্যায় লায়লা–র জিনাত আমনের চেয়ে কম কিছু লাগছিল না! সাদা গাউনের উপরে সাদা  ডায়মন্ড-এর আইডিয়া ছিল অভয়ের। এটা স্ক্রিপ্টে ছিল না! যেহেতু অভয় সমীর ছিল আর সমীর সিনেমার ডিরেক্টর ছিল তাই স্ক্রিপ্টে না থাকলেও হয়েছিল!
ও! ফাক্‌! আলিয়া সমীরকে এতক্ষণ ভুলে ছিল কী করে? অভয় লিডে ছিল ওদিকে তো ডিরেক্টরও  ছিল। সমীর ওকে শেষ কবে ডেকেছিল? মনে পড়ে না! আর লেখক বা এতোদিন কোথায় ছিল?
লেখক সামনে থেকে বলে উঠল –
আমি অনেকদিন মুম্বাইতে যাই না আর কলকাতায় বসে আমি ইংরিজিতে কথা বলতে পারি না। চলবে?
আলিয়া এই বাংলা ভাষাকে শুনলেই চিনতে পারে কিন্তু ইন্টারপ্রেট করতে সময় লাগে, মনে হয় উচ্চারণ চেনে কিন্তু কখনো পড়ে নি, কিন্তু এই ভাষা শুনলে মনে হয় অনেক অব্যক্ত কথা আলিয়া এই ভাষাতে বললে আরাম পাবে। আরো বেশি করে মনের কথা বলতে পারবে। কিন্তু পারে না! কখনোই পারে নি। অঞ্জনও বাংলায় কথা বলত, আর অভয় তো অবশ্যই আর ড্রামার আনন্দ। এদের সবার মাতৃভাষা ছিল বাংলা! দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অফ মাদার! আর আলিয়ার মা খাসি – আর আলিয়া সেই ভাষা জানা দূরের কথা শোনেই নি! জন্ম ইজিপ্টে হলেও ন-দশ বছর বয়স থেকে শিলং-এ! আলিয়ার এই প্রথম ভাষা নিয়ে ঠাউমার উপর ভীষণ রাগ হল! এবং রাগটা গিয়ে পড়ল লেখকের উপর!
আপনি কেনো একটা ডায়লগও খাসি ভাষায় রাখেন নি!
লেখক যেন একপাহাড় ক্লান্তি থেকে মুখ তুলে বলল, কিছু বললে আলিয়া!
লেখকের ভঙ্গী থেকেও আলিয়া বেশি আশ্চর্য হল নিজের প্রশ্নের ভাষাতে, আলিয়া তো বাংলাতেই জিজ্ঞেস করল!
আলিয়া এটা চায় নি!
কিন্তু, আলিয়া বুঝে উঠতে পারছে না আজ এই প্রথম লেখকের সাথে আলোচনায় এরপর ও কী ভাষায় কথা বলবে? আলিয়া গত ৯ বছরে জানতো না ও বাংলা ভাষা জানে, ইংলিশ ওর ভাষা ছিল! আজ লেখককে প্রথম সামনা-সামনি দেখে বাংলা ভাষায় কথা বলতেই খাসি ভাষার প্রতি আকাঙ্ক্ষা জেগেছে সাথে একটা তিরতির ব্যথা — ও ক্যানো আরব-ভাষা জানে না!
লেখক আসাম চায়ে চুমুক দিয়ে ক্লান্তগলায় বলল, আমি আজ এসেছি তোমাকে চেনার জন্য! বল তুমি কী চাও! আলিয়া!
আলিয়া এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না! একটা লেখক যে ওকে পৃথিবীতে এনেছে, এক  ইজিপ্সিয়ায়ান পুরুষ ওর বাবা একই সাথে লেখক আলিয়ার খাসি মা-এরও সৃষ্টিকর্তা, সে যদি আজ এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় জানতে চায় আলিয়া কী চায় তাহলে তো আলিয়াকে জিজ্ঞেস করতে হয়, বোকাচোদা যে কারণে এনেছিল ৯ বছর আগে তখন যদি আমাকে  জিজ্ঞেস না করেই নামিয়ে দিয়েছিলি এই পৃথিবীতে তাহলে আজ কেন জানতে চাইছিস আমি কী চাই?  ফাক্‌ ইউ!
লেখক মুখ তুলে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ!
 
আলিয়া এবার বিব্রত! এই লোকটা তো আলিয়ার মনকেও পড়তে পারে! এটা ওর জানা উচিত ছিল! আলিয়া তো এতোটা অভদ্রও নয় যে প্রথম মোলাকাতেই সশব্দে বলে উঠবে, ফাক্‌ ইউ!
আলিয়া লেখকের মাথার উপর দিয়ে পেছনের ওয়ালে একজন অত্যন্ত সুশ্রী মহিলার পোস্টারের দিকে  মুখ সরিয়ে বলল, সরি! লেখকও তেমনি, ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে ব্যস্ত বলে নিজের ল্যাপটপের কি-বোর্ডে কুট্‌কাট করা চালু রাখল!
আলিয়া এবার লেখকের দিকে তাকাল! একটা ব্যর্থ মানুষের যাবতীয় চিহ্ন নিয়ে একটা লোক ল্যাপটপের কি-বোর্ডে ভান করার মালমশলা খুঁজছে!অভয়ের পর আলিয়ার আর কোনো ব্যর্থ মানুষের সঙ্গ ভালো লাগে না! যতো ট্যালেন্ট থাকুক না ক্যানো ব্যর্থ মানুষ কাউকে বিশ্বাস করে না! কথা হল, সন্দেহপ্রবণতা আগে না ট্যালেন্ট আগে আলিয়া জানে না!
আলিয়া সারাজীবন নিজেকে সন্দেহ করে এসেছে। এমনকি নিজের ট্যালেন্টকেও! আলিয়া  মেটাল বাঁশি বাজাতে পারে গত জন্মদিনের  তিনদিন আগে জানতোই না! তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ও নিজেকে দেখল, প্রায় দৌড়ে-দৌড়ে একটা উঁচু রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ দেখে পাশ দিয়ে একটা ছেলে গিটার কাঁধে বাইক নিয়ে যাচ্ছে, যেন কতোদিনের চেনা, ছেলেটা নাম ধরে ডাক দিতেই ওর বাইকে উঠে পড়ে! তারপর বাইক শিলং-এর কুয়াশা চিড়ে একটা ছোট্ট মালভূমির মতো জায়গায় দাঁড়ায়! সেখানে অভয়, অঞ্জন আর আনন্দ বসে ছিল, ওদেরকে ঢুকতে দেখেই একটা সামনে একটা উড হাউসের দিকে দৌড়নো শুরু করে আর বাইকের ছেলেটা  — উত্‌রো উত্‌রো —  বলতেই   বাইকটা  একটু স্লো করে কোনোমতে আলিয়াকে নামতে দিয়েই বাইকটা মাটিতে ফেলে দৌড়োনো শুরু করে। দেখাদেখি আলিয়াও দৌড়োনো শুরু করে। আলিয়া যতক্ষণে গিয়ে উডহাউসের ভিতরে ঢোকে ততক্ষণে অঞ্জন গিটারে লিড বাজানো শুরু করে দিয়েছে, বাইকের ছেলেটা বেস-গিটারে সাউন্ড চেক করছে আর অভয় হামিং শুরু করলেও আনন্দ তখনো লেজে গোবরে! টমটম সেট করতে পারছে না! স্নেয়ার সেট করতে পারছে না! অভয় রাগে চিৎকার করে বলছে, আনন্দ, টুডে ইস দ্য লাস্ট ডে … হিয়ার-আফটার ফর এভরি সেকেন্ড লেট, উই উইল ফাক উ ফর ফিফটিন মিনিটস্‌, অ্যাট লিস্ট… সবাই হো-হো করে হেসে ওঠে আর আলিয়া ঢোকে এ-মেজর ব্যান্ড-এর প্রাক্টিস-প্যাডে! অঞ্জনের লিড বন্ধ হয়ে যায়! অভয় এগিয়ে আসে। আনন্দ বেস গিটার আর ড্রামের একটা ফাঁক দিয়ে আলিয়াকে লক্ষ্য করতে থাকে আর হঠাৎ অ্যালেস বেস গিটারে ফোর-নোট লিড বাজানো শুরু করে।
আলিয়া দূর থেকে  চোখ  বন্ধ করে  মনে পড়ে ওর গত তিনদিন আগের জন্মদিনের পার্টি! আলিয়া চোখ বন্ধ করে বাঁশিতে ফুঁ দেয়! ততক্ষণে আলিয়া বুঝে গেছে এরাই সেই বৃষ্টির দুপুরে অদেখা গাইয়ে-বাজিয়ের দল!
আলিয়ার দাদি আলিয়ার একুশ বছরের জন্মদিনের জন্য কোনোরকম ফাঁক রাখে নি! একুশ বছর বলে কথা! এমনকি সন্ধ্যা বেলায়, পাড়া- প্রতিবেশী-আত্মীয় ছাড়াও, কেক কাটার সময় শিলং-এর উঠতি দুর্ধষ এক ব্যান্ডকে ডেকেছেন। ঠাকুমার কাছে একটা হালকা-খবর আছে যে ওই ব্যান্ডের লিড সিঙ্গার নাকি আলিয়াকে পছন্দ করে। যার নাম অভয়! না, দাদি ব্যান্ডকে আলিয়ার বিয়ের জন্য ডাকেনি! আলিয়া ভীষণ অন্তর্মুখি যুবতী। দাদির ভয় হয়, আলিয়া না একা থেকে থেকে দুম করে একটা ভুল লোককে বিয়ে করে ফেলে! দাদি অভয় এবং ব্যান্ড-কে ডেকেছে যাতে আলিয়ার জন্য একজন বয়ফ্রেন্ডকে আলিয়ার গ্রেট একুশ বছরের জন্মদিনে হাজির করতে পারে। খোঁজ নিয়ে দেখেছে, অভয়, একজন খুব পাওয়ারফুল ফ্যামিলির ট্যালেন্টেড ছেলে। ভালো গান গায়। একটু মাথা গরম কিন্তু ভালো ছেলে।
রাত ঠিক সাতটা কুড়িতে অভয় দলবল নিয়ে উপস্থিত! ওরা একটা বিশাল কেক নিয়ে এসেছে, কেকের গায়ে গানের লিরিক্‌স! তখন আলিয়া আয়নার সামনে দাদির দেওয়া তুঁতে রঙের ফ্রক পরে লাইনার লাগাতে ব্যাস্ত। আলিয়া শুনতে পায়! অ্যাকোস্টিক রিদম গিটারে লিড  আর আরেকটা গিটারে বেস নোট-এর শব্দ! ওয়ান-টু-থ্রি- ফোর রিদমে সাথে দুম করে শুরু হয় বাক্স পেটানোর তাল! আলিয়া আইলাইন শেষ করতেই শুরু হয় একটা হামিং-এর সুর! আলিয়া স্থির দাঁড়িয়ে থাকে আয়নার সামনে। বুঝতে পারে ডি-মাইনর! নিজেকে দেখে! দেখতেই থাকে, কিছু একটা মনে পড়ে আর মুখ লাল হয়ে ওঠে। তারপর একছুটে গিয়ে আলমারি খুলে বাঁশি বের করে একশ্বাসে গিয়ে সবার সামনে দাঁড়ায়! আলিয়াকে দেখে পুরো ব্যান্ড থেমে যায়! আর আলিয়া বাঁশি বাজানো শুরু করলে আনন্দর কমাণ্ডে শুরু হয় ওদের যৌথ জ্যামিং!
নিমন্ত্রিত পরিবার সবাই মুগ্ধ। একে-একে সবাই তালে তালে হাততালি দেওয়া শুরু করে! আর অভয় সবাইকে কোরাসে জড়িয়ে ফেলে! গান জমে ওঠে – বেহুলা তু …
আজ তিনদিন পর আলিয়া এ-মেজরের প্র্যাক্টিস-প্যাডে দাঁড়িয়ে অভয়ের লাইন বাজানো শুরু করে, অভয় গাইতে গিয়েও থেমে যায়! বেস-লিড-ড্রাম চরমে উঠতে থাকে আর অভয় হেসে ফেলে জিপশিটা হাতে তুলে নিয়ে পারকাশন-এ ঢুকে পড়ে!
আলিয়ার সেদিন প্র্যাক্টিস-প্যাড থেকে আসার সময় বারবার মনে করার চেষ্টা করছিল ও কবে থেকে বাঁশি বাজানো শুরু করেছে। ওর গতকালের চেহারা তো আজকের মতোই। এমনকি ৭-৮ দিন আগে আর তিনদিন আগে ওর জন্মদিনেও ও পাকা প্লেয়ার-এর মতো বাঁশি বাজিয়েছে! অথচ ওর কোনো অতীত নামক একটা ক্রমশঃ জীবন নেই, বালিকা বয়স নেই, সারা বাড়িতে ওইসব বয়সের কোনো জামাকাপড় নেই! কোনো ফোটোফ্রেম নেই! আলিয়া কবে থেকে বাঁশি বাজানো শুরু করেছে, কার কাছে শিখেছে? স্মৃতি অথবা গোটা বাড়িতে কোনো চিহ্ন নেই! অতীত বলতে যা আছে, ছেঁড়া ছেঁড়া, তার কোনো কালানুক্রম নেই। এই তো, আলিয়া মনেই করতে পারছে না গতকাল কী করেছে। গতকাল দূরের কথা, তিন ঘন্টা আগে আগে কী করছিল, কোথায় ছিল, তারও কোন হদিশ নেই!
আলিয়া, খুব মন দিয়ে লেখকের আঙুল দেখে, যারা টপাটপ আলফাব্যাট-এর উপর ব্যাস্ত, লেখকের  মতোই বেঁটেখাটো আঙুল। আঙুলে সৃজন-এর কোনো চিহ্ন নেই। উলটে কেমন একটা বিরক্তি জাগে। আলিয়া চট করে নিজের লম্বা লম্বা সুগঠিত আঙুলগুলো দেখে নেয়। একটু নাড়িয়ে চাড়িয়ে নেয়! আজ পার্পেল রঙা নখ।
দুম করে আলিয়া দেখল লেখক আর আলিয়া একটা অচেনা রাস্তায়! দোকানের সাইনবোর্ডে নাম পড়ে দেখল – ফ্রি স্কুল স্ট্রিট! আর আলিয়া এখন পরে আছে একটা ফুল জিন্স্‌ আর একটা পিচ্‌ রঙা টি-শার্ট ! মাথায় একটা ক্রিম রঙের স্প্রিং হ্যাট!
পাশে, লেখক কিন্তু সেই অক্সফোর্ডে পরে আসা সেই একটা বিশ্রী নীল রঙা জিন্সপ্যান্ট আর একটা ঢলঢলে অফ-হোয়াইট সস্তা টি-শার্ট গায়ে, আলিয়ার দিকে আড়-চোখে তাকিয়ে ভারী শরীর নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খুব নিস্পৃহ গলায় বললেন, উনি আলিয়া নিয়ে ক্লান্ত! আর উনি টানতে পারছেন না!
আলিয়া লেখকের  কাছে একটা ব্যর্থতার নাম হয়েই শুধু  থেমে নেই, আজকাল লেখক লেখকের প্রতিটা ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করে আলিয়ার নাম দিয়ে! যেমন গত পরশুদিনে পুরোনো, শোনানো একটা স্ক্রিপ্ট-কে নতুন করে সাজিয়ে শুনিয়ে যখন বুঝতে পারে প্রযোজক-পার্টি একই সাথে পুরোনো আর নতুন করে সাজানো গল্প দুটোই নাকচ করে সম্পূর্ণ একটা নতুন গল্প ভাবতে বলল, লেখক সাথে সাথে বাতিল গল্পের নাম দিয়েছে – আলিয়া বাল, ১৯! এবং এই আলিয়া নামকরণ করাটার ভিতরে এমন একটা জৈবিক সুখ কাজ করে যেন আলিয়াকে কিছুটা হলেও শায়েস্তা করা হল, শরীর না ছুঁয়েই !
শরীর! এই শব্দটা কখনো তো মাথায় আসে নি!
এমনকি এই আলিয়ার সাথে রেপ শব্দের কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে গোটা স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে একমুহূর্তের জন্যও মনে হয় নি। আবার রেপ শব্দটা এলো কী করে? আলিয়া মেয়ে বলেই শরীর শব্দটা উচ্চারণ করার সাথে সাথে রেপ শব্দটা চলে এল, যদি চরিত্রটিকে হ্যারাস করে একটা জৈবিক তৃপ্তি পেতে হয়! কিন্তু রেপ শব্দটা এতো তাড়াতাড়ি চলে এলো কেনো? তাহলে কী আমার একটা প্রচ্ছন্ন চাহিদা ছিল যে ও তো আমার সৃষ্টি ওকে নিয়ে যা খুশি করতে পারি! অথচ দেখো, বাকী চরিত্ররা একমুহূর্তের জন্য রেপ করা দূরের কথা আলিয়া ল্যাংটো দেখতে কেমন সেটাও জানতে চায় নি!
বলা যেতে পারে, আলিয়ার প্রতি ব্যান্ড-এর প্রতিটা পুরুষের একটা চাপা ভালোবাসা ছিল। যদি ভালোবাসা থাকে, আমি নিজেকে এখন ৯ বছর বাদে জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হচ্ছি, তাহলে অন্তত আলিয়াকে নিয়ে সবার একটা চাহিদা ছিল! উঁহু, আবার ভুল শব্দের প্রয়োগ! চাহিদা নয়, কল্পনা!
শুধুই কল্পনা – নিজের চরিত্রদের এতোটা মহান ভাবার কোনো সলিড কারণ – তাহলে সবাই আসলে ঠিক কী চাইত আলিয়ার কাছ থেকে?
 ঠিক শব্দটা কাকে চিহ্নিত করতে চাইছে?  ভালোবাসা – চাহিদা – কল্পনা ?
 কোনটা?
ভালোবাসা
অভয়, অঞ্জন আর অ্যালেক্স এক বৃষ্টি-দুপুরে দৌড়তে দৌড়তে একটা গলি দিয়ে নামতে নামতে একটা বাড়ির বাগান পেরিয়ে কাঠের দেওয়ালে হেলান দিয়ে হাঁফায় আর শ্বাস ভরে বুক নর্মাল হবার আগেই শুনতে পেল এক নির্মম বাঁশির সুর! যেন বাঁশির প্রতিটা নোট ওই কাঠের বাংলো থেকে বেরিয়ে এসে বৃষ্টির সাথে মিশে একাকার হয়ে একটা সারা শিলং-কে একজন শিল্পীর গভীর বীতরাগে ভিজিয়ে দিতে নিমগ্ন! অ্যালেক্স ভিতরে গিয়ে দেখতে চাইছিল কে সেই শিল্পী! অভয় অ্যালেক্স-এর হাত টেনে ধরে অঞ্জনকে কর্ড ধরতে বলে। অঞ্জনও হারিয়ে গেছিল সুরে, তাই অভয়ের ইশারা বুঝতে পারে না! কিন্তু অভয় অঞ্জনের অল্প ভেজা গিটারকে নিজের টি-শার্ট খুলে মোছা শুরু করে বাঁশির সাথে গুনগুন করে সুর ধরতেই অঞ্জন কপট রাগ দেখিয়ে গিটার কেড়ে নিয়ে ডি-মাইনর কর্ডে প্লাকিং করা শুরু করে! আর অ্যালেক্স অফে হাততালি দিতে শুরু করে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঁশির সুরের সাথে তিনজন গলা-গিটার-হাততালি সহ একটা আরব মিউজিকের ভঙ্গীতে জ্যামিং শুরু হয়!
জ্যামিং এর তোড়ে মনে হল বৃষ্টিও ওই তালে নিজের নেমে আসার রিদমকে বদলে নিল!
হঠাৎ বাঁশি বন্ধ হয়ে যায়! কারণ, বৃষ্টি হচ্ছে না! অঞ্জন একটা বার বেশি বাজিয়ে থেমে গেলে অভয় আরো কিছুটা গিয়ে সুর গিলে অঞ্জন-এর দিকে তাকায় আর অ্যালেক্স ভাঁজ করা হাঁটুতে অর্ধেক তালির ভঙ্গিতে দুজনের দিকে তাকায়! অভয় ইশারায় সবাইকে স্ট্যাচু হতে বলে নিজেও স্ট্যাচু হয়ে যায়! তিনজন মিলে নিজেদের বুকে হাত দিয়ে কাউন্ট করতে থাকে – ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ … এভাবে কুড়ি-একুশ–এর মাথায় ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। আর দুম করে বাঁশি শুরু হয়! অভয় লাফ দিয়ে খালি গায়ে বৃষ্টিতে নেমে শার্ট আকাশে ঘুরিয়ে হামিং করা শুরু করলে অঞ্জন এক-পা কাঠের দেওয়ালে রেখে উজ্জ্বল মুখে কাঠে মাথা ঠেকিয়ে ডি-মাইনর কর্ডে লং ড্রাইভে হারিয়ে যায় আর অ্যালেক্স বৃষ্টির হাঁটু-ভেঙ্গে হাততালি দিতে দিতে  হালকা ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করে।
বৃষ্টি পড়ছে, পড়েই যাচ্ছে, বাঁশি থামছে না, গিটার থামছে না, ভোকাল থামছে না, আর ক্রমশ যেন বাঁশির আওয়াজ ওদের আরো কাছে চলে আসছে। অঞ্জন ফিল করে ওর পেছনেই কাঠের দেওয়ালের ওপারে বাঁশিবাদক এসে সেঁটে গেছে। ওদের পাশ দিয়ে লোকজন পায়ে হেঁটে, সাইকেলে, ছাতা তুলে আড়চোখে মুচকি হাসিসহ চলে যাচ্ছে। একজন তো সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে তালে তালে ছাতা নাচিয়ে উৎসাহ দিয়ে গেল।
বাঁশি যখন চরমে ঘোরাফেরা করেই যাচ্ছে, বাড়ির দরজা খুলে একজন প্রাণোচ্ছল বয়স্কা মহিলা বেরিয়ে এসে ওদের উন্মত্ততার দিকে তাকিয়ে একজন কিশোরীসুলভ লজ্জায় নিজের মুখ চাপা দিলেন! তারপরেই প্রায় ঘোষণা করার স্কেলে বলে উঠলেন – বয়েজ হোয়াই ডোন্ট উ অল কাম ইন্‌সাইড!
 বৃদ্ধার ঘোষণা শেষ হতে না হতেই বাঁশি থেমে গেল। মূহূর্তের মধ্যেই অঞ্জন, অভয়, অ্যালেক্স কিছু একটা আন্দাজ করে যে যেদিকে পারে ধাঁ!
তখন, একটি কুড়ি-একুশ বছরের মেয়ে কাঠের দেয়ালের ওপারে কান পেতে সবার পালিয়ে যাবার শব্দ শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেওয়াল থেকে কান সরিয়ে বাঁশিটাকে কিছুটা হেঁটে নিজের বিছানার বালিশের উপর রেখে একটা পিঙ্ক রঙা চাদর জড়িয়ে বাড়ির পেছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়! বৃষ্টি পড়ছে। সামনে একটা টিলার পেটে একগাদা ঝুলে পড়া ফুলের গাছ। সব গাছে গুঁড়িগুঁড়ি লাল ছোটোছোটো ফুল উপচে পড়ছে! বারান্দার দুপাশে পরপর বিশাল লম্বা আর মোটা পাইন গাছের গুঁড়ির ভিড়! গাছের গায়ে নানারকম শ্যাওলা উদ্ভিদ! কেউ ফুল-ছাড়া নয়! বৃষ্টি চলছে। একটা পুরোনো প্লাস্টিকের বালতিতে গাটার দিয়ে জল এসে পড়ে উপচে বেরিয়ে নিচের দিকে চলে যাচ্ছে। এই বারান্দায় বৃষ্টিজাত প্রতিটা শব্দ ওর চেনা! গত ৪ বছর ও শিলং-এ এসেছে। মাথার উপরে ট্র্যান্সপারেন্ট ফাইবার, বারান্দায় বৃষ্টির শব্দ ড্রাম-সেটের টমটমের মতো। ইজিপ্টে এরকম বৃষ্টি হয় না! কিন্তু শিলং-এ এসে ও বুঝতে পেরেছে ও আসলে বৃষ্টির দেশের মেয়ে। ওর মা, খাসি, শিলং-এর মেয়ে। আলিয়া মায়ের গর্ভে এসেছিল ইজিপ্ট-এ কিন্তু জীবনের প্রথম সতেরো বছর ওখানে থাকলেও শিলং-এ এসে প্রথম বৃষ্টির শব্দ শুনে মনে হয়েছিল এ শব্দ ওর বহুদিনের চেনা! এতো চেনা যে দেখতে পায়। ইজিপ্টে কোনো মন-খারাপের বিকেলে চোখ বন্ধ করলেই আলিয়া দেখতে পেত বড়ো-বড়ো হাইফেনের মতো বৃষ্টি ওর সামনে ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে! তাই শিলং-এ প্রথম দেখা বৃষ্টি দেখেই সব হাইফেনগুলোকে খোলা চোখের সামনে জ্যান্ত হতে দেখে আলিয়া বাঁশি বাজাতে বাজাতে কেঁদে ফেলেছিল! যেন নির্বাসন থেকে জন্মভূমিতে ফিরে আসার আনন্দ!
আজ, সেই আনন্দের মাত্রা বদলে গেছে! আজ আলিয়ার মনের সাথে শরীরও উদ্বেল হয়ে উঠেছে। আলিয়া নরম হতে হতে ফিল করছে ওর শরীর একটা স্পর্শ চায়! এবং, সেই স্পর্শ গোপনীয়তা চায়! আলিয়া চায়, ও চোখে বুঁজে থাকবে আর কেউ এসে অর সারা শরীর ধরে ধরে আদর করে কোনো নাম-ঠিকানা না রেখে চলে যাক!
কারা ওরা, কে গিটার বাজাচ্ছিল প্রতিটা প্লাকিং-এ  আলিয়ার ভীষন ব্যক্তিগত অথচ অচেনা আনন্দকে লাই দিয়ে দিয়ে আর ওই হৃদয় কেড়ে নিয়ে মাটিতে শুইয়ে পাগলের মতো আদর করে আলিয়াকে যাবতীয় বিষাদ থেকে মুক্ত করে দেবার মতো গলা কার, কেই বা হাততালি বাজাচ্ছিল যেন ও না থাকলে ওই গিটার আর গলা আলাদাই থেকে যেত! বাঁশি থামিয়ে আলিয়া বেবাক হয়ে ছিল কিছুক্ষণ, বুঝতেই পারছিল না কীসের অপেক্ষা করছিল! যদি আজ বৃষ্টি না নামত?  তাহলে আলিয়া আর কতদিন পর বুঝতে পারত যে ও বাঁশিটা নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকেও শোনাতে চায়!
চাহিদা
আপ্রাণ চাইছি আমার সামনের ফাঁকা চেয়ারে এমন একজন এসে বসুক যাকে আমি কোনোদিন দেখি নি, এবং অবশ্যই পুরুষ! দৃশ্যত আমার সামনের একটা চেয়ার ছাড়া গোটা বারে আর কোনো চেয়ার খালি নেই! এখন রাত সাড়ে নটা, অলিপাব, শনিবার! আর আলিয়া-মালিয়া ভালো লাগছে না!
দরজার সিকিউরিটি চার-পাঁচটা ফ্যামিলি আর বেশ কিছু দম্পতিকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। আজ ভগবান বা শয়তান যেই আসুক না কেন জায়গা হবে না! আমি চারটে সস্তা হুইস্কি একসাথে নিয়ে টেবিল জুড়ে বসে কাকে প্রার্থনা করব ভাবছি! উন্নি শিবারামকৃষ্ণান‌ বলেছিল, ইফ দেয়ার ইস ডেভিল দেয়ার মাস্ট বি গড। বারের ডানদিকের ওয়ালে একটা ফাঁকা রাস্তার লম্বা ছবি! কেনো?
যখনই ভাবি এভাবে আর চলতে পারে না তখনই না হোক কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারি অভ্যস্ত হয়ে গেছি! যেভাবে আমি গত দুটো বছর ইলিশ না খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছি! না, পুরোটা না খেয়ে নয়, খেয়েছি, দুশো-তিনশোর মাল! এবার যদি তুমি বল দুশো ওজনের ইলিশ মাছ খাওয়াটাও ইলিশ খাওয়া তাহলে আমি উঠি! তাহলে তুমি বাঙালি নও! আর এইমুহূর্তে আমার বাংলা ছাড়া আর কোনো ভাষায় ভাবতে বা কথা বলতে ইচ্ছে করছে না!
তাছাড়া তুমি এইভাবে দুম করে অবাঙালি হয়ে উঠতে পারো না! ভাষার ক্ষেত্রে আমি ভীষণ প্যারিস! কলকাতায় বসে আমি অন্যভাষায় মনের কথা বলতে পারব না! সে তুমি বোঝো আর না বোঝো! আর ভুল উচ্চারণে ফরাসি বলা মেয়ের প্রেম গদার-এর প্রেফারেন্স হতে পারে আমার নয়! কারণ আমি সুইডিশ নই, আমার জন্ম কলকাতায়! ভুল ফরাসি উচ্চারণের দুটো মানে হতে পারে – এক, সে ফরাসি হতে চাইছে কিন্তু ফরাসি নয়। অথবা সে ফরাসি তাই জোর করে ভুল উচ্চারণ করছে। আমি গদার নই তাই তুমি ভুল উচ্চারণে বাংলা বলবে না!
আমি কি একটু বসতে পারি?
নারীকন্ঠে চোখ এনে দেখি, একজন যুবতী, খুব সম্ভবতঃ সদ্য বিবাহিতা! দুহাতে বিভিন্ন ব্র্যান্ড-এর প্লাস্টিক ব্যাগ উথলে উঠছে, হাত দুটো এতোটাই ছড়ানো যে মনে হল নিচ থেকে কেউ একটু তুলে ধরলেই উড়তে শুরু করে দেবে!
নিজেকে এতোটা হালকা শেষ কবে ফিল করেছি এখন অবশ্যই মনে করতে চাইছি না! আমি না হেসে নির্বিকার মুখে ওই এনার্জিতে থৈথৈ চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, নিশ্চিন্তে! মেয়েটিও না হেসে ধপ করে বসে পড়ে বলল, বাঁচালেন!
বা! এই শব্দটা আজ অব্দি কোনো নারী আমাকে বলে নি!
অথচ শব্দটা আমার বলার কথা ছিল! এখানে যদি অন্য কেউ এসে বসতো!
অথচ আমি চেয়েছিলাম একজন পুরুষ মাতাল! কথা বলার বাবা-মা থাকবে না, পাঁচমিনিটে খেলা-রাজনীতি-রেপ-সিনেমা-গান নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক আলোচনা সেরে কে কতদিন ধরে মদ খাই আর কেন খাই আর কী কীভাবে মদ খেলে আরো ভালো নেশা হয় বা কে কতটা মদ নিয়ে জানি তারপর আমরা দুজন যতই মদ খাই না কেন আসলে আমরা কেন মাতাল নই-এর সুত্র ধরে তিন চারজন মহিলার নাম নিয়ে প্রথমে তাদের প্রশংসা ও সবার শেষে নারী ও মুসলিম জাতিকে খিস্তি করতে কর‍তে বিল মেটানো – কে কার বিল দেবে এ নিয়ে একটা ছোট্ট নাটক থাকবে!
কিন্তু এখানে তো দেখছি সেসব হওয়ার কোনো চান্স নেই অথচ ভালো লাগছে!
আজ রাত্তিরে এই সিন দিয়েই একটা নতুন স্ক্রিপ্ট শুরু করতে হবে! একটি ইউরোপিয়ান ফিল্মে দেখেছিলাম একজন মেয়ে একটি পুরুষের কলার ধরে ফুটপাতের দেওয়ালে ঠেসে ধরছে – পরে জেনেছিলাম ওই দৃশ্যটা পরিচালক বাস্তবে দেখেছিলেন। নামটা মনে পড়েছে না!
থাক!
মেয়েটি কিন্তু বসার পরেই ফোন বের করেছিল, কিছুক্ষণ তর্জনি ওঠানামা করে, ভ্রূ কুঁচকে টানটান ইত্যাদি করে যেভবে দুম করে বসেছিল ঠিক সেভাবেই হঠাৎ শান্ত হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে!
এই মেয়েটি বাঙালি! এবং উচ্চারণে আমি সিওর ঢাকুরিয়া-গড়িয়াহাট-হাজরা-কালিঘাট! বাইরের বাঙালিও নয়! তাই আমি ভাষা ভুলে মেয়েটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আর তাকিয়ে থাকা ঠিক নয় ঠিক করে এবার জোর করে আবার সেই ফাঁকা লম্বা রাস্তায় আর কী কী আছে জানার জন্য কুটকুটে হৃদয় নিয়ে পেইন্টিং এ ফেরত গেলাম! মিড-ফ্রেমেই রাস্তা শেষ! তারপর আকাশের নানারকম ধাপ্পাবাজি! লালচে রঙের মধ্যে একটা ক্রোম হলুদ রাস্তা! রাস্তায় কেউ নেই কিন্তু তাকিয়ে থাকলে মনে হচ্ছে কেউ হাঁটছে!
আপনি আছেন তো?
আমি ছবি থেকে মুখ নামালাম বিরক্তি নিয়ে কারণ এইমাত্র আবিষ্কার করছিলাম যে ছবিতে আর কেউ নয় আমি হেঁটে যাচ্ছি!
চোখে চোখ রাখতেই যুবতী বলে উঠল, আই নিড স্মোক! একটু দেখবেন প্লিজ!
যুবতী আমার সম্মতির অপেক্ষা না করে চলে গেল দরজার দিকে! আমি ক্যালানের মতো হাঁ করে মেয়েটির চুল পিঠ কোমর দেখে গেলাম! চলে গেল! গলা শুকিয়ে আসছে!
একটা বড়ো চুমুক দিতেই মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ দৌড়ে গেল! মেয়েটি কে? যদি ফিরে না আসে! ব্যাগের মধ্যে কী আছে। কে বিশ্বাস করবে মেয়েটিকে আমি চিনি না! মেয়েটি যেভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইছিল সেটা তো পাশের টেবিলের লোকটিও শোনে নি! এই চাপা গমগম পরিবেশে অতো দূর থেকে ওয়েটার কী শুনেছে আর কী ভেবেছে? আর আমাদের দুজনের মুখোমুখি বসে থাকা তারপর দুম করে মেয়েটির চলে যাওয়া দেখে মনে হতেই পারে লেট ম্যারেজ-এর দাম্পত্য কোলাহল। স্ত্রী যদি কন্যার বয়সী হয় তাহলে মেয়েটির সিদ্ধান্তে নিশ্চয় আমি একটা প্রবল শ্রদ্ধার জায়গা দখল করে রেখেছি নাহলে বিয়ে করবে কেনো! ফলে পাবলিক প্লেসে মেয়েটির তরফ থেকে প্রতিবাদ বা বিরোধিতা নীরব হওয়াই স্বাভাবিক!
আমি দেরি না করে  খুলির ভিতর একঝাঁক মাছির কামড় সহ্য করতে করতে ধীরে পায়ে বার থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে এলাম! সিকিউরিটি ইশারায় বাঁদিক দেখালো!
দেখেছো, সিকিউরিটি ধরে নিয়েছে ওই অচেনা মেয়েটি আমার কিন্তু মেয়ে নয়, স্ত্রী না হলেও ওইসব কিছু এটা তার বুড়ো আঙুল বেঁকানোর আর নাড়াচড়ার মধ্যে স্পষ্ট ছিল! ঠিক হ্যায়, দেখতে হ্যায়!
বাইরে বেরিয়ে দেখি, আলিয়া একা রেলিং হেলান দিয়ে সিগারেট – না রিফার টানছে। মাথা আকাশের দিকে। আকাশে মেঘ নেই চাঁদ নেই!
বিরক্তিতে মাড়ি ঘষে নিলাম।
কী হল, তুমি এখনো এখানে!
আলিয়া ওইভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বলল, স্টপ থিংকিং মি আই শ্যাল ইভাপোরেট!
আমি দুহাত দিয়ে গোটা মুখে ঘষে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টায় মনে করার চেষ্টা করলাম আমি এর মধ্যে আবার কখন ওকে নিয়ে ভাবলাম!
আলিয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে জানতে চাইল আমরা দুজন আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকব?
মানেটা কী? আমি তো ভিতরে বসে মাল খাচ্ছিলাম, বেরিয়ে এসেছি এক অবাঞ্ছিত মহিলাকে খুঁজতে! কড়া চোখে আলিয়ার দিকে তাকিয়ে আমি স্যাট করে বারের ভিতরে ঢুকে দেখি ভিতরের জনগণ সব অচেনা! একজন ওয়েটার এসে বলল, সাব টেবিল খালি নেহি হ্যায়!
কিন্তু আমি তো আর দুমিনিট আগেও বসেছিলাম, ওই তো – আরে বাল, আমার জায়গায় একজন যুবক বসে আর সামনে সেই যুবতী যাকে খুঁজতে আমি বাইরে এসেছিলাম! এগিয়ে গেলাম! সামনে দাঁড়ালাম। না যুবতী আমাকে চিনতে পারছে না! দুপাশে একরাশ ব্র্যান্ডেড শপিং ব্যাগ ঠিক এ ওর ঘাড়ে পড়ে আছে। আমি যুবতীর দিকে তাকিয়ে রইলাম! একটা অদ্ভুত রাগ হচ্ছে! গলা টিপে ধরতে ইচ্ছে করছে। যুবতী আড়চোখে দু-একবার আমার দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে ছেলেটাকে কিছু বলল! ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে একবার মেপে নিল।
বারের ডানদিকে তাকিয়ে দেখি দেওয়ালে ছবিটা নেই!
হনহন করে বাইরে এসে দেখি আলিয়াও নেই!
কল্পনা
একজন মানুষ বাড়ি ফেরে! ফেরার সময় বাঁহাতে শ্মশান আর তার ঠিক উল্টোদিকে মুসলিম কবরখানা! বেরোবার সময় হাত বদলে যায়! কবরখানা বাঁহাতে চলে যায় আর শশ্মান ডানদিকে! মুম্বাই এর অন্ধেরি ওয়েস্টে চার-বাংলো সাত-বাংলো পেরিয়ে সমুদ্রের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা সোজা ভারসোভা গাঁও চলে যায়! যেতে যেতে রাস্তার দুধারে যেখানে কফি—বার্গার – দারু – স্যালোন — প্রাইভেট ব্যাংক — জিম-এর ব্র্যান্ড শেষ,  ঠিক সেখান থেকেই শুরু  শশ্মান, উল্টোদিকে কবর তারপর লটে মাছের মৃতদেহ ফাঁসি দেওয়া আসামির মতো পরপর হাজার হাজার  ঘাড়-ভাঙ্গা মীন কেলিয়ে আছে দুধারে ঘাড় কাত করে – ভারসোভা, জেলেপাড়া শুরু!
একজন মানুষ সেই গ্রামে ঢুকেই অটো থেকে নেমে পড়ে! একটি চারতলা বিল্ডিং-এ  ক্লান্ত পায়ে ওঠে, থাকে টপ ফ্লোরে, বিল্ডিং-এর নাম রাম আশীর্বাদ, একজন মানুষ ছাড়া বাকি সব ঘর মুসলিম! লোকটির বাড়িওলাও মুসলিম!
বাড়ির পেছনটা, মানে বেডরুমটাও প্রায় সমুদ্রের উপর ঝুলে আছে। এক চারপাল্লার বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, খুললেই আরব সাগরের উদ্দাম হাওয়া এসে অতীত ভুলিয়ে দেবে, মনে হবে, এইমাত্র জীবন শুরু হল! আর রাত্রিবেলা তো আরব সাগরের উপর দিব্যি হাঁটাহাঁটি করা যায়! ওই হেঁটেহেঁটে শাহরুখ-সালমানের বাড়ি দেখে আসা যায়! ডানদিকে হেঁটে গেলে, মানে ওই আরবপানির উপর দিয়ে মিঠুন চক্রবর্তীর বাড়ি!
পূর্ণিমা হলে তো কথাই নেই আরবসাগরের গায়ে তখন ঘন চাঁদের সর, মনে মনে দৌড়ে দুবাই চলে যাওয়া যাবে। কিন্তু জোয়ার এলেই পাগলা বেদুইন-সাগর এসে নিচে কালো পাথরে ধাক্কা মেরে মেরে সব ইঁদুরকে বের করে দেবে আর মুম্বাই এর ইঁদুর তারপর সারারাত ডাঙায় এসে বেড়াল-কুকুর তাড়া করে সব উচ্ছিষ্ট খেয়ে নেবে! গণেশের বাহন সারা মুম্বাই-এর সমুদ্র পার গর্ত করে খোক‌লা করে দিয়েছে। বিএমসি এবং জনগণ মনে করে অর্ধেক মুম্বাই একদিন আরবপানিতে বসে যাবে এইসব ভীম ইঁদুরের দাঁতের সুরসুরানির জন্য। তাই এতো ধুমধাম করে গণেশের পুজো, গণপতি বাপ্পা মোরিয়া। ইঁদুর তো এই সাতটা দ্বীপের আদি বাসিন্দা। তারপর কোলি, তারপর গুজরাটি সুলতান পর্তুগিজ ইংরেজ হয়ে মারাঠি তারপর গোটা ভারতবর্ষ!
আবার প্রায় প্রতিবছর এই গণপতির পুজোতে রোজা পড়বেই! সলমন খান সবচেয়ে বড়ো গণপতির প্যান্ডেলে নিজহস্তে পুজো করে সন্ধ্যায় ইফতার সারলে মৌলবিরা পরেরদিন প্রতিবাদ জানালে সালমান খানের বাবা সেলিম খানের প্রেস কনফারেন্স এ লোকটি  জানতে পারে যে একজন মানুষের প্রথম ধর্ম তার মায়ের ধর্ম, কারণ নাড়ি জুড়ে থাকে। জন্ম নেবার পর বাবার ধর্ম জুড়ে যায়! আর সলমন খান নাকি মুম্বাই-এর সিদ্ধি গণেশের কাছে মানত করে পাওয়া ছেলে! তাহলে সে গণেশের পূজো করবে না তো কে করবে? আর মৌলবী সাহেবরা যদি ওনার জন্য এবং ওনার পরিবার পরিজনের জন্য গোর দেবার জায়গা না দেন কোনো ব্যাপার নয়। আল্লাহ্‌ ওনার প্রতি যথেষ্ট করুণাময়, ওনার নিজের সে জমি আছে, মৃত্যুর পর গোটা পরিবারের টানটান হয়ে শুয়ে পড়ার জন্য।
লোকটি দেখে, এক হিন্দু ফিল্ম পরিচালকের মুসলিম স্ত্রী, যে তাঁর ছেলের জন্য জ্যোতিষীর কাছ থেকে নিজে নৃসিংহ মন্ত্র মুখস্থ করে পাথর পরানোর সমস্ত রিচুয়্যাল লিখে নেয়! কারণ ছেলে এসব মানে না! একজন লোক দেখে এক আইআইএম  জোকা-র পাস-আউট-এর বাড়িতে এক মুসলিম যুবতীর আলপনা দেওয়া আর ফল-কাটা, লক্ষ্মী পুজোর জন্য! জারিন নাকি আবার শিয়া। একজন লোক শোনে এক স্ট্রাগলার মুসলিম অ্যাক্টর ওর বাড়ির জানলার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, দ্য বেস্ট রিলিজিওন বিং ফলোওড বাই দ্য ওর্স্ট পিপল্‌! একজন লোক দেখে গণেশ পুজোর আরতিতে সন্ধ্যেবেলা মুসলিম ফ্যামিলিকে দাঁড়িয়ে থাকতে! একজন লোক দেখে হিন্দুরা রোজা পালন করে থুতু পর্যন্ত গিলছে না!
একটি লোক বাড়ি ফেরে।
আর ভাবে, এ  আমি কোথায় এলাম! টপাটপ বোরখা-চোখের প্রেমে পড়ে! পেছন পেছন হাঁটে, সাথে বুক ভর্তি অপরাধবোধ!
একটা লোক কৈশোর থেকেই অপরাধবোধ ছাড়া মেয়েদের দিকে তাকাতে পারত না! এ তো মুসলিম! মুসলিম শব্দটা শুনলেই একটা শরীরের ভিতর থেকে শিরশিরানি ভাব জাগে! ভয়! তাই একজন লোক একটা সূত্র খুঁজে পেতে পেতে পায় না কিন্তু একটা তিরতিরে বিশ্বাস কাজ করে যে ভয় আর অপরাধ বোধের উৎস হয়তো একই, কিন্তু ডিফাইন করে একটা সিগারেট বা সন্ধ্যার প্রথম পেগের প্রথম চুমুকের মতো তৃপ্তি আসে না! ভয় অপরাধবোধকে পুরোটা গ্রাস করে!
হ্যাঁ ভয়!
একটা লোকের বাবা মা বরিশাল ফরিদপুর ছেড়েছিল মুসলিম নয় বলে। সে চরম দুর্দশার কথা বিগত ৪২ বছর ধরে শুনে আসছে। অথচ, দেখেছে বাবার ট্যাক্সির ড্রাইভার সবাই মুসলিম! তবে বাঙালি মুসলিম। বাবা বলত,বাঙালি নয় হিন্দিভাষী মুসলিম এসে বাংলা ভেঙেছে। আর বরিশাল ভেঙেছে কারা বাবা বলত না!বরিশালে দাঙ্গা হয়েছিল ১৯৪৯-এ ১৯৪৭-এ নয়! আসলে বাবা নিশ্চয় অন্তিম শ্বাস নেবার আগেও বিশ্বাস করতেন না যে ফজিজুল হক শুধুমাত্র মুসলিম ছিলেন!
মুম্বাইতে সব মুসলিম হিন্দি বলে! আর হিন্দুরাও হিন্দি বলে!
তবুও একজন মানুষ রাম-আশীর্বাদ বিল্ডিং-এ থাকে!
এবং দেখে, এই পুরো বিল্ডিং-এর কোনো বাসিন্দা বা বারিস্তায় বসা মুসলিম অ্যাক্টর বা দাদর, বোরেভেলি, ব্যান্ড্রা বা নিউ মুম্বাই এর কোনো মুসলিম-এর সাথে কথা বলতে অসুবিধা হওয়া দূরের কথা, বন্ধু হয়ে উঠছে!
একদিন আদর্শ স্ট্রাগ্লার বারে টেবিলের ওপারে দুজন নতুন হিন্দু-ইয়ার-এর সাথে কথায় সেই সবকিছু হয়ে মুসলিম-এ  এলে  একজন বলে উঠল – ডোন্ট মাইন্ড ব্রো, বাট মুসলিম অ্যাজ আ মাইনরিটি এন্ড মুসলিম অ্যাজ আ মেজরিটি ইজ আ কমপ্লিটলি ডিফারেন্ট ফেনোমেনা!
অভয় — আপকো না ময়ূর না ম্যাঁয় কভি ভি আরজ্ কিয়া থা কয়ি মুসলিম ক্যারাক্টার কে লিয়ে?
শিলং-এ নদীর পার ধরে হাঁটছি! জুলাই মাস! বৃষ্টি নানাভাবে হয়ে চলেছে। পুরো ইউনিট চলে গেছে! আমি আর অভয় আজ হাঁটব!
অভয় বলে চলেছে, মেরা বাপ তো রিলিজিয়াস থা, মৌলবি থে না! সবসে বড়ি বাত আপ ভি রিলিজিয়াস হো, নেহি তো আপনে আলিয়া কা আব্বা কো কিসলিয়ে মুসলিম বানায়া, আউর ফির মাইনাস-মুসলিম করকে এক খৃষ্টান দাদি কা পাস ছোড় দিয়া? আপ অন্দর সে মুসলিম সে ডর তে হো লাইক ইওর ফাদার, ইসলিয়ে আলিয়াকো মুসলিম বানাকে এক হিন্দু হিরো কে প্যার মে ডাল দিয়া!
একটি লোক  প্রতিবাদ জানাতেই অভয় বলে উঠল, দাদা আই নো ইউ অলওয়েজ ট্রাই টু বি আ সেকুলার, ও হোতা নেহি! ডাজ নট এক্সিস্ট!
আই নো!
বলে, একটি লোক এবার আক্রমণে যাবে ঠিক করে —
ইউ,মুসলিম ডোন্ট ইভেন গিভ আ ট্রাই অলসো! বাট আই ট্রাইড! মাই ফাদার ট্রাইড ! ডু ইউ রিমেম্বার, উ ইনসিস্টেড মি টু মেক অভয় আ মুসলিম! এন্ড আই টোল্ড ইউ, ডোন্ট টেক রিস্ক! বিকজ, মুসলিমস আর মাইনর! ইট মে  হ্যাম্পার বিজনেস, অ্যাজ ইট ইজ ইয়োর ডেব্যু ফিল্ম!
অভয় থামে না —
লেকিন আপ হিরোইন কো মুসলিম ব্লাডমে কিসলিয়ে ডালা? ক্যান ইউ সেন্স মাই প্রব্লেম! টুডে আই ওয়েন্ট ফর ৩৬ টেক টু অ্যাবান্ডন অ্যা গার্ল হু ইস এ প্রডিউসার্স পুশ! এন্ড ই নো আই মেড আ গ্রেট সিন! বাট হোয়াট এলস আই কুড ডু! ইউ মেড মি আ হিন্দু ক্যারেক্টার এন্ড অন স্ক্রিন মাই উড বি হিরোইন ইস অফ আ মুসলিম অরিজিন দ্যাট টু ফ্রম ভেরি মুসলিম স্পেস,  কায়রো… অ্যাম  আই নট লায়েবল টু ফাইন্ড আ উওম্যান অফ দ্যাট লুক অফ মুসলিম অরিজিন হোয়ার মাই মাদার বিলংস!
আলিয়া! আলিয়া ইস নো মোর ইওর্স অ্যালোন দাদা,সি বিলংস টু মি অ্যাজ ওয়েল! বিকজ আই মে বি অভয় বাট অ্যাম দ্য ডিরেক্টর অফ দ্য ফিল্ম অলসো!
কোনটা
লোকটি এবার ঠিক করে একা হোটেলে ফিরবে!অভয়কে ফেলে জোরকদমে একা হয়!
লোকটি সত্যি সত্যি মুসলিমকে ভয় পায় তাই প্রশংসা করে! কিন্তু মাথার গভীরে কোথাও একটা হিন্দিভাষী হিন্দুপ্রচার কাজ করে যে আবার,বাবার মতো একটা লোককে জন্মভূমি ছাড়তে হবে! কিন্তু, একটা লোকের ভাষা তো বাংলা এবং সে বোম্বের স্ক্রিপ্ট  ইংরেজিতে লিখলেও ভাবে বাংলাতেই!
একটা লোক বলতে চেয়েছিল আলিয়া কায়রোতে জন্মালেও সে আসলে বেহুলার মতো! সেজন্যই রূপমকে দিয়ে মিউজিক করাতে চেয়েছিল, একজন প্রগ্রেসিভ মুসলিম যার স্ত্রী হিন্দু, বাঙালি মুসলিম বলেই বেহুলা বোঝাতে কষ্ট হয় নি! আর মুম্বাই তো কম্পোজিশন কেঁপে গেছিল! অবশ্যই প্রি-প্রোডাকশন লেভেলে যার কোনো দাম নেই বলিউডে! ওরকম শুরুতেই অনেকের মাল পড়ে গেলে বোম্বাই মুম্বাই হলেও প্রি-প্রোডাকশনের দাম সেই একই।
এসবের মধ্যে আলিয়া, রকস্টার সিনেমায় নায়িকার নাম হয়ে গেল! আবার সন্দেহ একজন মুসলিমকে, ইউনিটের সেকেন্ড অ্যাসিট্যান্ট ডিরেক্টর আখতার আর রকস্টার তো এর ফিল্ম!
তবু লোকটি বাড়ি ফেরে। কারণ, খিদে পায়, ঘুম পায়! আর চারদিকে মুসলিম নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে এতটুকু অসুবিধা হয় না! কারণ, লোকটি এখনো মুসলিমকে ভয় পায় বলে ভাবার সময় ভাবে যে কেনো ফেরার সময় বাঁহাতে শ্মশান আর তার ঠিক উল্টোদিকে মুসলিম কবরখানা — বেরোবার সময় হাত বদলে যায়! ডানহাতে শশ্মান আর কবরখানা বাঁহাতে চলে যায় আর-
আর, সোজা রাস্তাটা বোধহয় আলিয়া!