ভ্রমণ-সৌগত ভট্টাচার্য

Spread This
Sougata Bhattacharya

সৌগত ভট্টাচার্য

দহগ্রাম থেকে পাটগ্রামের আকাশ দেখা যায়…
 
পাটগ্রাম বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে। দহগ্রাম বাংলাদেশের ভূমি কিন্তু মূল ভূখণ্ড থেকে কয়েকশ মিটার দূরে। আঙ্গরপোতা দহগ্রামের সীমানায় লোহার বেড়ার পারে দাঁড়ালে পাটগ্রামের রাস্তা দেখা যায় বাড়ি দেখা যায় সুপারি গাছ নারকেল গাছ দেখা যায় মানুষজনকে নড়তে চড়তে দেখা যায়। যতদূর চোখ যায় একটা দেশ দেখা যায়। যদিও নিজের দেশ, কিন্তু চাইলেই যাওয়া যায় না, নিজের দেশকে ছোঁয়া যায় না। আচ্ছা দেশ বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? এক ফালি ভূখণ্ড! নাকি সার্বভৌমিকতা! কাঁটাতার! নাকি একটা আকাশকে বুঝি!
দুটো গ্রামের মধ্যে দূরত্ব মাত্র ১৭৮ বাই ৮৫ মিটার ভূমির। এই কয়েকশ বর্গ মিটার এর মধ্যে দিয়ে একটা ইন্ডিয়ার রাস্তা সোজা চলে গেছে মেখলিগঞ্জ থেকে ধাপড়ার দিকে। এই রাস্তা আড়াআড়ি করে ভাগ করে দিয়েছে একটি গ্রাম একটি ও একটি বাংলাদেশের ছিটকে। দহগ্রাম ও পাটগ্রামের মাঝের যে ভূখণ্ড ভারতের অধীন সেই  অঞ্চলটির ভৌগোলিক মাপ তিন বিঘা। চার দিকে ভারতের পতাকা। অর্থাৎ আঙ্গরপোতা দহগ্রাম থেকে পাটগ্রামের দিকে যেতে ভারতের ভূমি ব্যবহার করতেই হবে, ভারতের ওপর দিয়ে যেতেই হবে ছিট বাংলাদেশ থেকে মূল বাংলাদেশে, নিজের দেশে।
লিয়াকত নেহেরু ছিটমহল হস্তান্তর চুক্তির মধ্যে দিয়ে সমস্যার সূচনা। তারপর একের পর এক বেরুবাড়ি ইউনিয়নের ছিটমহল হস্তান্তর, ভারতের সাংবিধানিক সংকট, অনেক আলোচনা অনেক বিতর্ক বিরোধিতা গণ আন্দোলন অনেক রক্তের পর আঙ্গরপোতা দহগ্রাম থেকে ঠিক উল্টোদিকের পাটগ্রামের সঙ্গে একটা করিডোর খুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশের ছিটএর বাসিন্দাদের জন্য। যে করিডোরের মাপ ১৭৮ বাই ৮৫ মিটার, বা তিন বিঘা। করিডোর আড়াআড়ি ভাবে আবহমান ইন্ডিয়ার রাস্তাকে ক্রস করে চলে যায় এক অন্য দেশে চিকিৎসা রেশন শিক্ষার দিকে বা বলা ভালো একটা দেশের দিকে।
চ্যাংড়াবান্ধা মেখলিগঞ্জ এর রাস্তার দুই দিকে শুধু তামাক আর ধান। কোথায় যে খেতগুলো বাংলাদেশের আর কোথায় যে ভারতের  বোঝা মুশকিল। স্থানীয় কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলবে, “ওই বাড়িটা বাংলা দ্যাশ, ওই বাঁশঝাড় অগো দ্যাশে”!
সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সাইনবোর্ড বলে দেয় তিন বিঘা পৌঁছে গেছি। কোচবিহার জেলার  মেখলিগঞ্জ থেকে মাত্র পাঁচ কিমি। রাস্তার পাশে বাইকটা দাঁড় করানোর পর একজন সীমান্ত রক্ষী সামনে এসে হিন্দিতে বলেন, রাস্তার এখানে বাইক রাখা যাবে না। তিনি বাইক রাখার জায়গা দেখিয়ে দেন। বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল। বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখি রাস্তার ডাইনে ও বাঁয়ে কয়েকশ মিটার দূরে দুটো লোহার গেট। গেটের পাশে তার কাঁটা দিয়ে ঘেরা। তারকাঁটার পাশে যত্নে লাগানো ফুল গাছে মরশুমি ফুল ফুটে আছে পুরো গলি পথ জুড়ে! এই গলি পথের রাস্তা বাংলাদেশের আঙ্গরপোতা দহগ্রাম গেট থেকে পাটগ্রামের গেটে পর্যন্ত চলে গেছে, মাঝে ভারত ভূমিকে ক্রস করে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি ঠিক মোড়ের মাথায় এক আন্তর্জাতিক বিন্দুতে। যে বিন্দুর ডাইনে বাঁয়ে বাংলাদেশ, সামনে পেছনে ভারতবর্ষ। সীমান্ত রক্ষীরা স্পষ্ট হিন্দিতে বলে দিলেন কোন পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে দাঁড়ানোর অনুমতি আছে আমার। বড় রাস্তা থেকে তারকাঁটার আর লোহার গেটের দিকে একটু এগিয়ে যেতেই দেখা গেল একটা মসৃণ রাস্তা চলে গেছে পাটগ্রামের দিকে। রাস্তায় ঢোকার মুখেই একটা  বি জি বি এর চৌকি আর একটা বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে শিমুল গাছের ফাঁক দিয়ে। মানুষ এই পতাকার দিকে ছুটে আসছে দলে দলে উল্টো দিকের দহগ্রাম থেকে। একটা মুক্ত আকাশ ছাড়া পতাকাও কি স্বাধীন ভাবে উড়তে পারে!
 
একটা হিরো বাইকে দুজন লোক পাট গ্রাম থেকে দহগ্রামের গেটের দিকে চলে গেল। বাইকের পেছনে নম্বর প্লেটে বাংলায় লেখা বগুড়া- হ- ৪৩২৭! ইন্ডিয়ার বড় রাস্তাকে ক্রস করার সময় দুই দিক ভালো করে দেখে নিল। তারা কি সত্যি ভারতবর্ষকে  দেখতে পেল! উল্টো দিক থেকে একটা অত্যাধুনিক টোয়েটা চলে গেল একই ভাবে এই গেট থেকে ওই গেটের দিকে। কিন্তু দুই গেটের মাঝের ভারতের এই অংশে কোনো বাংলাদেশের গাড়ি বা যানবাহন বা মানুষের দাঁড়ানোর নিয়ম নেই। শুধু করিডোর হিসেবেই এই রাস্তাকে ব্যবহার করবে বাংলাদেশের মানুষজন নয়শ নিরানব্বই বছরের জন্য, ইজারা হিসেবে।
রিকশা পণ্যবাহী ট্রাক ওষুধের গাড়ি একের পর এক চলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক করিডোর পেরিয়ে এক দেশের এক ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে  অন্য দেশের ভূখণ্ডে। তাকিয়ে দেখছি, একটা পানীয় জলের গাড়ি একটা মুরগির গাড়ি আর টোটো ভর্তি লোকজন এক সীমান্ত পেরিয়ে উদাসীন মুখে অন্য একটি দেশের ওপর দিয়ে সেই দেশের মানুষ আবার নিজের দেশে যাচ্ছে। আমার আর তাঁর নাগরিকত্ব আলাদা হলেও ভাষাটা এক, টোটোর পেছনে লেখা বাংলার বিজ্ঞাপন বা সড়ক পরিবহণের বিজ্ঞাপন পড়ে নিতে অসুবিধা হয় না। বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বি জি বি যখন দাঁড় করায় পাটগ্রামগামী টোটোকে, জিজ্ঞাসাবাদ করে নিয়ম অনুযায়ী কিছু কথা। না শুনতে পেলেও বুঝি সেটা আমার ভাষা, বাংলা ভাষায়। কিছুক্ষণ আগে বি এস এফ এর আমাকে জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলো ছিল হিন্দিতে! আসলে সেই দেশের মানুষ টোটো বা গাড়ি ভাড়ার সঙ্গে কিছুটা সময় বা ইতিহাসকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক করিডোরের ওপর দিয়ে।
স্বাধীনতার পরের কথা, কোচবিহার তখন ভারতের মূল ভূমির মধ্যে চলে এসেছে। পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে কোচবিহারের রাজার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কোচবিহারের রাজা ভারত অন্তর্ভূক্ত হওয়ার আগে কতগুলো সিট (যেগুলোকে পরবর্তী কালে লোকের মুখে মুখে ছিট নামে পরিচিত) বাংলাদেশকে দেয়। বাংলাদেশও কয়েকটা ছিট ভারতকে দেয়। ভারতের স্বাধীনতার সময় মানচিত্রে সেই ছিট গুলো ভারত নামক স্বাধীন নতুন দেশের বুকে এক টুকরো দ্বীপের মত বাংলাদেশ জেগে ওঠে। এমনি ভারত ভূমিতে জেগে ওঠা একটা দ্বীপের মত ছিটের নাম দহগ্রাম। যা কিনা মূল বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। আঙ্গরপোতা দহগ্রাম ছিটের মানুষ রেশন চিকিৎসা শিক্ষা সবের জন্য তাকিয়ে থাকে পাটগ্রামের আকাশের দিকে। মাঝখান দিয়ে চলে যায় আবহমান এক ভারতবর্ষ।
স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সানিয়াজান নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে যায়। নেহেরু থেকে মোদি পর্যন্ত একের পর এক প্রধানমন্ত্রী সাংবিধানিক প্রশ্ন নিয়ে ঘুরপাক খেতে থাকেন এই তিনবিঘা স্বতন্ত্র ভূমির প্রশ্নে। দহগ্রাম ছিটের বাসিন্দারা তাকিয়ে থাকে পাটগ্রামের দিকে। আর তাকিয়ে থাকে দুই দেশের ভাগ্য বিধাতাদের দিকে।
আমরা ভারত ভূমির থেকে তাকিয়ে দেখি একটা দেশকে। একসময় আমরা এক ছিলাম, একই পতাকা ছিল, যে দেশ একদিন আমাদের ছিল, আমরদের  সুখ দুঃখ গুলোও একই ছিল। এ যেন একান্নবর্তী পরিবারের হাঁড়ি ভাগ হয়ে যাওয়ার গল্প। হাঁড়ি ভাগ হলেও যাতায়াতের উঠোনটা যেন এক থেকে গেছে আজও। যাওয়া আসার সময় একে অপরের দিকে চাহনিটাও এক রয়ে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। দেশ ভাগের সময় র‍্যাডক্লিফ লাইন তো হাঁড়ির খবর রাখেনি কোনোদিন।
যাত্রী বোঝাই টোটো থেকে শৌখিন গাড়ি থেকে রিকশা পণ্যবাহী গাড়ি হেঁটে যাওয়া মানুষের ঢল চলেই যাচ্ছে সারাদিন ধরে এই তারকাঁটার পাশে ফুল দিয়ে সাজানো রাস্তা দিয়ে। রাস্তাটা ঠিক যেন তিনবিঘা আর করিডরের মাঝে একটা হাইফেন! সেই হাইফেনটাই একটা চলমান ইতিহাস, হ্যাঁ, আমরা কোনো একদিন সবাই এক ভূমিখণ্ডে বাস করতাম।