ভ্রমণ-কৃষ্ণেন্দু পালিত

Spread This
Krishnendu palit

কৃষ্ণেন্দু পালিত

খেলনা ট্রেনের  বিদায় বেলায় 
 
   এত ভোরেও কাউন্টারে বেশ লম্বা লাইন। অধিকাংশ যাত্রী কলকাতামুখি। কাজের তাগিদে। একমাত্র আমরা এসেছি মনের তাগিদে, অথবা অকাজের গোঁসাই বলেই…। মিনিট পাঁচেকের ব্যবধানে কাউন্টারের সামনে পৌঁছে বললাম, পাঁচটা বলগনা। রিটার্ন।
     কাউন্টারে বসা ভদ্রলোকের হাতদুটো কি-বোর্ডের ওপর থেমে গেল। এই প্রথম স্ক্রিনের উপর থেকে চোখ তুলে বিপরীতে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে বিস্ময়়ে তাকালেন। দুচোখের সার্চলাইটে এমনভাবে জরিপ করতে লাগলেন যেন এমন আজব জীব তিনি জীবনে দেখেনি, অথবা নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে থাকার পর নিঃসংশয় হতে জিজ্ঞাসা করলেন, ক়ী বললেন?
     -পাঁচটা বলগনা। রিটার্ন।
     -রিটার্ন! বিস্ময়়ে উচ্চারণ করেন তিনি, তাও বলগোনা!
     -কেন, পাওয়া যাবে না?
     -দেখতে হবে। এত বছর চাকরি করছি, কাউকে রিটার্ন কাটতে দেখিনি। টিকিটই কাটে না কেউ এ লাইনে। দাঁড়ান পাওয়া যায় কিনা দেখছি। স্ক্রীনে চোখ রেখে ক়ী সব যেন দেখলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, দিন। হবে মনে হচ্ছে।
     চোখের সামনে সাজিয়ে রাখা ন্যারোগেজ লাইনের একটি স্টিম ইঞ্জিন। ইঞ্জিন়ের ছবি তুলে ওভারব্রিজ ধরে স্টেশনের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলাম। সম্ভবত এটি ৫ নম্বর প্লাটফর্ম। যদিও প্ল্যাটফর্ম বলে কিছু নেই, তবে একটি নির্দিষ্ট টিকিট কাউন্টার আছে। সবুজ রঙের একটি চার বগির ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে আড়াই ফুট প্রশস্ত রেলপথের ওপর। ভেতরে অন্ধকার। হয়তো ছাড়ার আগে আলো জ্বলবে। কেউ কেউ দেখলাম অন্ধকার বগিতেই উঠছে। ট্রেনের চারপাশটা ঘুরে দেখতে লাগলাম আমরা।
     হঠাৎ ট্রেনের ভোঁ বাজল।গার্ড সাহেব সবুজ পতাকা ওড়ালেন। ট্রেন চলতে শুরু করল। ঘড়ি দেখলাম, তিনটে বেজে পঞ্চাশ । দৌড়ে গিয়ে একেবারে পেছনের কোচে উঠলাম। না, আলো জলেনি, ভেতরে অন্ধকার। আলোর ব্যবস্থা থাকলেও বাল্ব নেই একটিতেও। রক্ষণাবেক্ষণ হয়না বললেই চলে। জানালা দিয়ে স্টেশনের নিওন লাইটের আলো এসে পড়েছে ভেতরে। অস্পষ্ট কম্পার্টমেন্টের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে জনা পাঁচ- ছয় যাত্রী। অধিকাংশ চাদর মুড়ি দিয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে। এবছর নভেম্বরের প্রথম থেকেই একটু একটু ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। ভাঙা জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে ফুরফুর করে। এই ভোরে তার তীব্রতা নেহাত কম নয়। আমার মনে হল আমরা বোধহয় কোন ভৌতিক ট্রেনের সওয়ার। স্টেশনের সীমানা ছাড়াতেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল ভেতরটা, সেইসঙ্গে ট্রেনের প্রচন্ড দুলুনি আর বিরক্তিকর ঘরঘর শব্দ। সঙ্গে যোগ হয়েছে বিকট নাক ডাকার শব্দ। ট্রেন ছেড়েছে কয়েক মিনিট মাত্র, এরইমধ্যে ঘুম, নাকি অনেক আগে থেকেই উঠে ঘুমিয়ে আছে। মোবাইলের আলোয় শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করলাম। কম্পার্টমেন্টের শেষপ্রান্তে, একেবারে কোনায় চাদর মুড়ি দিয়ে কেউ একজন ঘুমোচ্ছে। নাক ডাকার উৎস তিনি। অন্যরাও দেখলাম চাদর মুড়ি দিয়ে কমবেশি একই মুদ্রায় বসে আছে। ফাঁকা সিট দেখে আমরাও এক কোনায় বসে পড়লাম। ট্রেন চলতে থাকল দুলতে দুলতে খেলনা ট্রেন এর মতই।
২.
খেলনা ট্রেন বলতে যারা একমাত্র  দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনকেই বোঝেন, তাদের অবগতির জন্য বলছি,  এক সময় গোটা বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল এই ছোট রেলের অন্তর্জাল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রথম সূচনা হয়েছিল 1894 সালে তারকেশ্বর- মগরা পথে দু ফুট চওড়া ন্যারো গেজ লাইন দিয়ে, পরবর্তীকালে বেলগাছিয়া-হাড়োয়া- দেগঙ্গা, বারাসাত- বসিরহাট হয়ে হাসনাবাদ, হাওড়া- আমতা, হাওড়া- শিয়ালদা, মাঝেরহাট- ফলতা, কাটোয়া -বর্ধমান এবং কাটোয়া- আহমেদপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সময়ের প্রয়োজনে এবং গতির তাগিদে একে একে বন্ধ হয়ে যায় এগুলো। টিকে ছিল একমাত্র কাটোয়া-বলগোনা ন্যারোগেজ রেলপথ দৈত্যকুলের প্রহ্লাদের মত। আগামী 30 শে নভেম্বর, 2014, শতবর্ষপূর্তির ঠিক এক বছর আগে, জন্মদিনের আগেরদিন সেটিও বন্ধ হয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। এর ফলে পূর্ব রেলের আর কোন ন্যারো গেজ লাইন থাকবে না।
     যাত্রা শুরু হয়েছিল  1915 সালের পয়লা ডিসেম্বর বিকেল চারটেয় ‘ম্যাকলিওড এন্ড রাসেল কোম্পানির’ উদ্যোগে কাটোয়া থেকে বর্ধমান পর্যন্ত। যাত্রাপথ ৫৩ কিলোমিটার। স্বাধীনতার পর 1966 সালে ভারতীয় রেল এটি অধিগ্রহণ করে। তারপর অতিবাহিত হয়েছে প্রায় অর্ধ শতাব্দী। বদলে গেছে সমাজ, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গতি এসেছে মানুষের জীবনে। গতির সঙ্গে তাল মেলাতে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ব্রডগেজ লাইনের। তাতে যাত্রাপথের সময় অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসবে। সময়ের সেই চাহিদা মেনেই কাটোয়া-বর্ধমান লাইন -এর অর্ধেক পথ অর্থাৎ বর্ধমান থেকে বলগনা ব্রডগেজ লাইন পাতা হয় বাংলা ১৪১৭ সনে। রয়ে যায় বাকি অর্ধেক, অর্থাৎ কাটোয়া-বলগনা, সাড়ে চবিশ কিলোমিটারের ন্যারোগেজ। 30 শে নভেম্বর সেটুকু স্তব্ধ যাবে।
অবশেষে এলো শেষের সেদিন। শেষ যাত্রার শরিক হতে সেদিন উপস্থিত ছিল অসংখ্য মানুষ। সাজানো হয়েছিল ট্রেনটিকে। চার কামরা কাঠের ট্রেনে ঠাসাঠাসি ভিড়। ভিড় ট্রেনের ছাদে, যাত্রা পথের দু’ধারে। দূরদূরান্ত থেকে এদিন মানুষ এসেছিলেন ঐতিহাসিক যাত্রার সাক্ষী থাকতে। যাওয়ার কথা ছিল আমারও। শেষ পর্যন্ত ওই দিনটিতে বিশেষ কাজ পড়ে যাওয়ায় দু’দিন আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম কালনা। দার্জিলিংয়ের টয়ট্রেনে চাপলেও সমতলের কোন ছোট রেলে চাপার সুযোগ কখনো হয়নি। সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনা বলেই কয়েকদিন আগে গিয়েছিলাম খেলনা রেলের সওয়ার হতে।
     কাটোয়া স্টেশন থেকে হাঁটা পথে 5 মিনিটের দূরত্বে আমাদের হোটেল। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে বারোটার মধ্যে শুয়ে পড়লাম। ঠিক আড়াইটার সময় ঘুম ভাঙিয়ে দিল মুঠোফোনের কর্কশ কুকুরের ডাক। তিনটে পঞ্চাশ মিনিটে দিনের প্রথম ট্রেন। ঘুমের জড়তা কাটিয়ে তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগলো। সাড়ে তিনটের মধ্যে স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।
কাটোয়া থেকে পরবর্তী ট্রেন আটটা কুড়ি মিনিটে, তারপর বারোটা পঞ্চাশ এবং পাঁচটা কুড়ি, সারাদিনে চারবার মাত্র যাতায়াত করে। সর্বসাকুল্যে দুটি মাত্র ট্রেন। একটি ডিজেল ইঞ্জিনে টানা লাল রঙের, স্থানীয়রা বলে কাঠের গাড়ি। অপরটি কার ট্রেন, দেখতে অনেকটা বাসের মতো, সবুজ রঙের। আমরা দ্বিতীয়টির সওয়ার। বলগনা পর্যন্ত মোট ছ টি স্টেশন পড়বে এ পথে— শ্রীপাঠ- শ্রীখন্ড, শ্রীখন্ড, বনকাপাসি, কৈচর,নিগম এবং বলগনা। সব মিলে সাড়ে 26 কিলোমিটার রাস্তা। সময় লাগবে ঘন্টা দুয়েক। তার কারণও আছে। একসময় ঘন্টায় 28 কিমি গতিতে চলত। পরবর্তীকালে কমিয়ে করা হয়েছিল 22 কিমি। 2000 সালের ভয়াবহ বন্যায় এক দীর্ঘতম অংশের ভূমি আলগা হয়ে যায়, সেই থেকে গতিবেগ আরো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাটোয়া থেকে বলগনা পর্যন্ত এক পিঠের ভাড়া মাত্র 10 টাকা।
     ট্রেনের বিচিত্র ঝনঝন শব্দের মধ্যেই কানে এলো কেউ একজন গান গাইছে। কীর্তনাঙ্গের সুর। কান খাড়া করে গানের কথাগুলো শোনার চেষ্টা করি—
         স্বয়নে স্বপনে গোরা গৌরাঙ্গরে
          নরহরি প্রাণ গোরা গৌরাঙ্গরে
          গদাধর প্রাণ গোরা গৌরাঙ্গরে
          গৌরাঙ্গ হে গোরা গৌরাঙ্গহে…
     কাটোয়া এবং সন্নিহিত অঞ্চলে বৈষ্ণব ও শাক্ত তীর্থ আছে বেশ কিছু। আছে বৈষ্ণবদের আখড়া। হয়তো কোনও বৈষ্ণব ভক্ত গাইছে। মোবাইলের আলো জ্বেলে গায়ক মানুষটিকে খুঁজে বের করি, মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক। পোশাক-আশাকে শহরের ছাপ, চেহারাতেও। গান থামলে উঠে গিয়ে তার পাশে বসে আলাপ জমাই, নাম প্রাণগোপাল বিশ্বাস। বাড়ি বনকাপাসি।  কলকাতার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সপ্তাহান্তে বাড়ি ফেরেন। অফিস করে শনিবার কাটোয়া পৌছতে রাত দশটা বেজে যায়, সারারাত প্লাটফর্মে কাটিয়ে তিনটে পঞ্চাশের ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরতে রবিবার সকাল। এভাবেই চলছে গত 18 বছর। —পূর্ব রেলের শেষ ছোট ট্রেন, এ মাসের শেষ দিনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে চিরতরে, খবরটা শুনে কেমন লাগছে আপনার? ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম। উত্তরে তিনি দুই হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বললেন, খবরটা সত্যি তাহলে? কানাঘুষো অনেকদিন ধরেই শুনছিলাম। এতদিনে ঈশ্বর মুখ তুলে তাকালেন। আপনাদের কাছে যা খেলনা গাড়ি, আমাদের কাছে সেটাই কাজের। অনেক দিনের দাবী ছিল আমাদের। এবার এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবো। কতটা সময় বাঁচবে ভাবতে পারছেন? ভেবেছিলাম ভদ্রলোক দুঃখ পাবেন, স্মৃতি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়বেন, ঐতিহ্যের জন্য গর্ব করবেন, ফল হলো সম্পূর্ণ উল্টো। আসলে প্রয়োজন। যা আমাদের বিনোদন তা-ই স্থান়ীয় মানুষের কাছে কঠিন বাস্তব। যাতায়াতের পথে এ ধরনের প্রশ্ন অনেক যাত্রীকেই করেছিলাম নিতান্ত কৌতুহলের বশে, কমবেশি সকলের প্রতিক্রিয়া একইরকম। সকলেই খুশি খবরটা শুনে। কেবল আমরা খুশি হতে পারছিলাম না তাদের এই আচরণে। বরং রাগই হচ্ছিল।
     প্রাণগোপাল বাবুর সঙ্গে কথাবার্তার ফাঁকেই প্রথম স্টেশন শ্রীপাট-শ্রীখন্ডে ট্রেন থামল। খুব ছোট স্টেশন। লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। দু- চার জন যাত্রী উঠলেন, কেউ নামল না। ট্রেন ছেড়ে দিল। পরের স্টেশন শ্রীখন্ড। শ্রীচৈতন্য ঘনিষ্ঠ নরহরি সরকার ঠাকুর, ভক্ত রঘুনন্দন ও মুকুন্দের স্মৃতি বিজড়িত এই গ্রাম শ্রীখন্ড। অগ্রহায়ণ মাসে কৃষ্ণপক্ষের উত্থান একাদশীতে চারদিন ধরে মেলা হয় এখানে। স্থানীয় মানুষের মুখে যা বড়ঙ্গা মেলা নামে খ্যাত।
শ্রীখন্ডে গাড়ি থামতেই নেমে পড়লাম।এখানে বেশ কয়েকজন যাত্রী নামলেন, উঠলেন আরও বেশি। বেশ কিছুক্ষণ ট্রেন থামল এখানে। গাড়ি ছাড়লে আমরা পরের কম্পার্টমেন্টে উঠলাম। এই বগিতে অবশ্য আলো জ্বলছে।  সমগ্র কম্পার্টমেন্টে একটাই মাত্র কম পাওয়ারের হলুদ বাল্ব, বাকিগুলো উধাও। হতে পারে চুরি হয়ে গেছে, অথবা খারাপ হয়ে যাওয়ার পর আর পাল্টানো হয়নি। বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠেছে বলেই হয়তো এই অবহেলা।  রহস্যময় হলুদ আলোয় চাদর মুড়ি  দেওয়া অস্পষ্ট মূর্তিগুলোকে মনে হয় যেন কোন প্রাগৈতিহাসিক জীব।  হানাদারের মত হঠাৎ আমাদের উপস্থিতিতে মানুষগুলোর ঝিমুনি কাটে। কেউ কেউ মুখের আড়াল সরিয়ে দেখতে থাকে আমাদের। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বন্ধুদের কেউ কেউ আলাপ জমানোর চেষ্টা করে তাদের সঙ্গে। আলোর স্বল্পতা এবং প্রচন্ড ঝাঁকুনি উপেক্ষা করেও ছবি তোলার চেষ্টা করি। খেলনা ট্রেন তার নিজের ছন্দে ছুটে চলে পরের স্টেশনের দিকে।
IMG-20210307-WA0047
পরবর্তী স্টেশন বনকাপাসি। বেশ কাব্যিক নাম। আর কেমন যেন চেনা চেনা। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি উত্তমকুমার পরিচালিত বিখ্যাত বাংলা ছবি ‘বনপলাশীর পদাবলী’র শুটিং হয়েছিল এখানে। সিনেমার বনপলাশী আসলে বনকাপাসি। শুটিংয়ের কাজে সিনেমার নায়ক এবং পরিচালক মহানায়ক উত্তমকুমার বেশ কিছুদিন এখানে কাটিয়ে ছিলেন। স্থানীয় বয়স্ক মানুষের মনে সেসব স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল।
     বনকাপাসির পরের স্টেশন কৈচর। কৈচর থেকে কিছুটা দূরে একান্ন পীঠের একপ়ীঠ ক্ষীরগ্রাম। কথিত আছে সতীর ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল পড়েছিল এখানে। দেবীর নাম যোগদ্যা। দেবী প্রতিমা সারাবছর ডোবানো থাকে দিঘির জলে। বৈশাখী পূর্ণিমার দিন দেবীকে তুলে এনে পুজো দেওয়া হয়। পুজো উপলক্ষে বড় মেলা বসে। নাম যোগদ্যা মেলা। বৈশাখ সংক্রান্তি থেকে শুরু হয়ে চলে এক সপ্তাহ। এই মহিষাসুরমর্দিনীর মেলায় মহিষ বলিরও প্রথা রয়েছে।
     কৈচর়ের পরের স্টেশন নিগম। নিগমের পরে সাওতা। ছোট ছোট স্টেশন।  সাওতার পর বলগনা। শেষ হয় আমাদের প্রথম পর্বের ছোট রেল যাত্রা। ঘড়িতে তখন ঠিক ছটা। আকাশে বড় টিপের মত লাল টকটকে সূর্য। অসংখ্য চেনা অচেনা পাখির কিচিরমিচির। যাত্রীদের ছোটাছুটি। কেউ ছোট রেল থেকে নেমে বড় রেলের দিকে ছুটছে, কেউ বড় ট্রেন থেকে নেমে ছোট ট্রেনের দিকে। কুড়ি মিনিটের ব্যবধানে আবার কাটোয়ার দিকে ছুটতে শুরু করে। এবার বেশ ভিড়। ট্রেনের মধ্যে পা রাখার জায়গাটুকুরও অভাব। যাত্রীদের সঙ্গে উঠেছে অনেক মালপত্র, বিশেষ করে বড় বড় দুধের হাড়ি। কন্ঠিধারী বৈষ্ণব -বৈষ্ণবীর একটা দল গুনগুন করে গান গায়, আদিবাসী রমণী কোলের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ায় পরম মমতায়, পারিপার্শ্বিক সংকোচের ঊর্ধ্বে উঠে গ্রাম্য কিশোরী ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে, আর আমরা ফেরার পথে মনোযোগী হই ছবি তুলতে। একটার পর একটা স্টেশন পেরিয়ে ট্রেন ছোটে কাটোয়ার দিকে।
একদিন থেমে যাবে এই চলা। চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে খেলনা ট্রেন।  মনের খেলনা ট্রেন শুধু স্মৃতি হয়ে চলবে কু-ঝিকঝিক…