গল্প-ফাল্গুনী ঘোষ

Spread This
Falguni Ghosh

ফাল্গুনী ঘোষ

বিবর্তন
 
তখন সবে পশ্চিম পানে ঝিকিমিকি সাঁঝালের রেশ এলিয়ে পড়েছে। গাঁ-গঞ্জে শীতের সাঁঝ নামেও তাড়াতাড়ি। এ সময় অপরাহ্নের ক্লান্ত গোধূলি বেহায়ার মত ঢলাঢলি করে গাছ- গাছালি, পাখ -পাখালির ইশারায়। যেন কোন সাত জনমের বাঁধন ছেড়ে যেতে তার মনে বিষাদ, তবু কালের নিয়মে ছেড়ে যেতে হয় তাকে। তাই তো আঁধারের গল্পকথাকে বরণ করে নিতে চরাচরে বেজে ওঠে শাঁখ, ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালায় গেরস্থরা।দ্বিজু সরকারের কোঠাপারা দোতলা ঘরেও প্রদীপ জ্বালে দ্বিজুর বউ।
 
আগে যখন কাঠের জ্বালে ইনিয়ে বিনিয়ে চা ফুটত বউ-এর সোহাগে, দ্বিজু দূর থেকে আড়নজরে দেখত। আহা! আখার আঁচে বৌয়ের আগুন বরণ মুখখানির কী শোভা! তবে আজকাল আর সে শোভা দ্বিজুর চোখে তেমন খোলে না। তার দলের ছোকরার সাথে রঙ তামাশার রস যেন উপচে পড়ে বৌয়ের  চোখেমুখে। এখন কাঠের জ্বালের বদলে কেরাসিন স্টোভের গর্জনে গরম গরম চা মুড়ির আসর বসে তড়িঘড়ি। দ্বিজুও কোনোরকমে চা টুকু গলায় ঢেলেই দলের লোকজনসহ বাড়ির বাইরে অন্ধকারের অভিমানে কোথায় যেন মিশে যায়। মানুষের শ্বাস প্রশ্বাসে বুকের পাঁজরে তামসী রাতের দীর্ঘশ্বাসেরা চেপে বসে ।
 
এসব দীর্ঘশ্বাসের শাপ যাতে না লাগে সেজন্য সারাবছর পর লোকজন মেলাখেলার তাপে তাপিয়ে নেয় নিজেদের। বছরকালের চাষীবাসি দ্বিজু সরকার আমতি ধানের সুবাস পেলে যেন রাজা উজির। মাঠ থেকে বুকে জড়িয়ে এনে ঘরে মড়ি বেঁধে লক্ষ্মীকে জাঁকে বসালেই তার মন ভরে ওঠে। দল পাকিয়ে খেনের পালায় এদিক সেদিক ভিড়ে পড়তে সে তখন দুবার ভাবে না। বছরভর খেন পালার দু চারটে সুযোগ যে আসে না তা নয় কিন্তু আমোদ যত এই শীতের দিনে। তখন দ্বিজুর দলের রাতের ঠিকানা কখনও পথের ধারের ধুঁকতে থাকা ইস্কুল ঘরের বারান্দা, কখনও বা পালা করানোর কর্তাব্যক্তিদের দেওয়া রাত কাটানোর ঠাঁই।
 
এমন রাতেই তো দ্বিজুর কোঠাপারা ঘরে আঁধার ঘন হয়ে ফিসফিসায় । সাঁঝ সকালের  চা টুকুই যা স্টোভে হয়। বাকি পড়ে থাকা দিনলিপিতে দ্বিজুর বউ হু হু করা মন নিয়ে কাঠের জ্বালে চাট্টি ফেনাভাত ফুটায় যখন, হাঁ করা দরজার উন্মত্ত অন্ধকার তাকে ভিতর থেকে গিলে খেতে আসে যেন । বরং বাইরের পাতলা আঁধারে একটা আলোর রেশ থাকে। নরম আলোর চাদর গায়ে দেওয়া সে আঁধার দ্বিজুর বৌয়ের মনের বড় কাছের। এমন  আঁধারে পায়ে পায়ে বাড়ির উত্তর পানের সুপারি গাছটার কাছে এসে দাঁড়ায় সে। আর ক’পা গেলেই ‘ছেরামতী’ নদীর ঘাট। সে ঘাটে যাওয়ার পথে শ্যাওড়া, বাবলা গাছেরা ঝেঁপে আসে । সাথে নিয়ে আসে আদিম রিপুর অন্ধকার।
 
এলাকার মেয়ে বৌ’রা রাত বিরেতে এ পথের পানেও চায় না। নাকি নদীর নামে কীসব বদনাম আছে! কোন অতীতের গর্ভে এক সে মেয়ে ছিল। যেন রূপ পরী। রূপের বাহারে বাবা মা নাম রেখেছিল ‘শ্রীমতী’। কিন্তু ঐ রূপই তার কাল হল। অচিন গাঁয়ের পুরুষের নজর পড়ল তার দিকে। ভরা যৌবনে পিরিতের গাঙে ভেসে গেল দুটি মন। হায়রে! কী লজ্জা! দেশে, ঘরে, গাঁয়ে ছিছিক্কার পড়ে গেল। তাই তো, ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে শ্রীমতী বেরিয়ে পড়ল অজানার প্রান্তরে। পথে বিপদে আপদে ক্ষতবিক্ষত শ্রীমতী কোথায় যে হারিয়ে গেল তার প্রিয় মানুষের সাথে!
 
তখন সব হায় হায় করে উঠতেই যে পথে পথে শ্রীমতী হেঁটে গিয়েছিল সেই পথের বুকে ভালোবাসার জোয়ার এল । দুকূল ছাপানো টলটলে ভালোবাসা বিলিয়ে এলাকার মানুষের আদরের হয়ে উঠল শ্রীমতী। বড় আদরে তারা তাকে ডাকল ‘ছেরামতী’ নামে।
 
ভিন গাঁয়ের মেয়ে দ্বিজুর বউ যেদিন খেনের পালায় ছেরামতীর জীবন গাথাটি প্রথম শুনেছিল তার গলার নলি আটকে গিয়েছিল নোনতা ডেলায়। ছলছল চোখে স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে সান্ত্বনা খুঁজেছিল–
 
“ঐ মেয়াটার কত কইষ্ট লাগত বোলো!”
 
দ্বিজু দুবাহুতে আঁকড়ে ধরেছিল বৌয়ের নরম শরীরটাকে ,
 
“বোকা মাইয়া! উ তো সে কবেকার গল্পকথা! ঐ মাইয়ার লাগত কান্দস ক্যান?”
 
খেন দলের ছোকরার দিকে তাকিয়ে জলভরা গলায় দ্বিজুর বউ  বলেছিল,
 “ঐ তো ছেরামতী………”
 
হো হো করে গলা ফাটিয়ে হেসেছিল দ্বিজু। শার্টের কলার তুলে নতুন বউকে বলেছিল, কেমন পালা লিখেছি বল আর আমার দলের লালু কেমন ছেরামতীর আক্টো করেছে!
 ২
 
এ অঞ্চলে কোন আনজনম থেকে  দীর্ঘরোগেভোগা পান্ডুর কিশোরী কন্যার তনু নিয়ে ‘শ্রীমতী’ নদী বয়ে চলে। শীর্ণা শরীর হলেও পাড়ে বসে  ছেরামতী’র হৃদয়ের ধুকধুকি কান পাতলে আজও শোনা যায়। হবে হয়ত কোনো একদিন সে তার ভরা যৌবনের ঠমক ঠামকে দিত সবাইকে থম ধরিয়ে। মেয়েরা ঈর্ষান্বিত চোখে চেয়ে মুখ বাঁকিয়ে চলে যেত।  কিন্তু আজকাল তাকে দেখলে সত্যিই করুণা হয় দ্বিজুর বৌয়ের। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভাবে সে,
 
“এত রূপ যৌবনের গরব কিছুই থাকল না! “
 
কোনো কিছুই চিরটাকাল বোধহয় এক থাকে না। এই যেমন দ্বিজু আর তার বৌ। দ্বিজুর খেন দল এলাকায় বেশ নামকরা। প্রেমের গল্প, কেচ্ছা, দলে দলে, পাড়ায়-বেপাড়ায় লড়াই ঝগড়া , গোপন পিরিতি, মামলা মোকদ্দমা, কুলত্যাগ, অসবর্ণ বিয়ে হাজারো একটা ঘটনার ঘনঘটায় খেন দলের পালা সেজে ওঠে। এককথায় সমাজের কোনো অসঙ্গতিই চোখ এড়ায় না পালাকারের। দ্বিজুর দৃষ্টিও প্রখর। সহযোগী বাজনদার আর ছোকরা সাজা লালু থাকে যোগ্য সঙ্গতে। যে সঙ্গতে দুপাশে জড়ো হওয়া লোকজনের মন দুলে ওঠে।
 
তাছাড়া দোলা দেবে নাই বা কেন! লালু ছোঁড়ার ছলাকলা তো কম নয়। সহসা কার সাধ্যি ওকে পুরুষ বলে চিনে নেয়। লাল টুকটুকে শাড়িতে শরীরি হিল্লোল তুলে ,পানের রসে ঠোঁট রাঙিয়ে যখন কাজল চোখের ইশারা করে লালু, সমবেত ছেলে ছোকরার সিটিতে কান পাতা দায় হয়। দ্বিজু নিজেও চোখ টেরিয়ে এক আধবার দেখে নেয় সেসব ছলাকলা। অবসর সময়ে বিড়ি টানতে টানতে লালুর থুতনিতে চুমকুড়ি দিয়ে দ্বিজু হেসে ওঠে,
“ওরে মোর রসিকা……”
 
নরম সরম নতুন বৌটার সামনে এসব ছলা করতে দ্বিজুর ভারী মজা লাগত একসময়। কেমন লজ্জা পেয়ে ভিজে শাড়ির মত জড়োসড়ো হয়ে যেত বৌটা। যত লাজ লাগে বৌয়ের তত আসরে নেশা ধরে দ্বিজুর। স্যাঙ্গাত লালুকে নিয়ে দ্বিজু টেনে টেনে রসের কথা কইত। বউ এর লজ্জা বাড়লে ওস্তাদের কোঠাপারা ঘরে বৌএর সাথে আদরের রাত চাদর ঘন হত।
 
নতুনের আড় একটু ভাঙলে নরমসরম বৌ নথ নেড়ে ঘোমটা টেনে ফিসফিসিয়েছিল,
 
“কেনে যে তুমি মজা করত লাগো! ও তো বেটাছেলা!”
 
“তাথে কি । লালু রসিকা আছে! তুমি ছেলা হলে বুইঝতা!”
 
“কী যে কও তার ঠিকনা নাই!”
 
অমনি দ্বিজু হো হো হাসিতে কিশোরী সাঁঝের বুকে কাঁপন ধরিয়ে লালুকে ঘিরে ঘিরে রঙের গান ধরত–
 
“তুই যেমুন সুন্দরী সতী
যেন ঐ সূরয কিরণ
তোর উপে মুই হইছুরে পাগল।
ও সতী তুই যেন ঐ আশমানেরই চান্দর।
তোর নাগি মুই হইছুরে পাগল।”
 
কপট প্রণয়োচিত রাগে লালু চোখের ঠমক মারত দ্বিজুর দিকে । মুখ ঝামটা লাগিয়ে দ্বিজুর বৌ বলে উঠত , ‘আ মরণ!’
 
সেসব এক দিন ছিল , ভাবে দ্বিজু। কী করে যেন বদলে গেল সব ! এইরকম হাসতে খেলতে লালু হয়ে উঠল দ্বিজুর বৌয়ের লালি ঠাকুরপো। হৈমন্তিক দিনগুলোর শেষভাগে জুবুথুবু বৃদ্ধা রাত্রির পরান যৌবন রসে মাতাল হয়ে উঠত এদের হাসি ঠাট্টার যৌথ গিটকিরিতে। কখনও বা বাজনা, সাজ পোশাক ছাড়াই শুরু হত সঙালি গান। আবার কখনও সখনও একসাথে শীতরাতের নরম কুয়াশায় ওম খুঁজে নিত খেন গানের জাঁকালো পালায়।
 
হাড় কাঁপানো শীতে মেলা খেলার কেন্দ্রে জমে উঠত লালুর সঙালি, সঙ্গতে দ্বিজুর হেঁড়ে গলার বেসুরো গান আর ঢোলকের ঢুলকি। বৌ এর ইচ্ছে হত দুকলি তালে মেলায় । কিন্তু স্বামীর বিরক্তি আসর ভারী করে দিক সে কখনই চায়নি। সে ছিল দ্বিজু আর সঙ্গালির আনন্দের ভাগীদার।
 
 
এবছরে সেদিন আমতি ধান কাটনের শুরুর দিন। ছেরামতীর ঐ পাড় থেকে নদীর গা বেয়ে দক্ষিণে খানিক এলে নদীর বুক চিরে মানুষের গড়ে তোলা আনকোরা পথে পায়ের ছাপ রেখে এ পাড়ে আসতে হয়। সে পথে ঘরে ফিরতে ফিরতে দ্বিজুর চোখ আটকে গেল পাড়ের কচি লাজুক কাঁচা রাস্তায় । সেই ক’মাস আগে পালা করতে গিয়ে ভিন গাঁয়ের খেন দলে দেখেছিল মেয়েটাকে।
 
একেবারে ডবকা মেয়া। শরীরে কী রস! পাছার তালে সাপের ফণার মত দুলতে থাকা চুলের গোছার কাছে কোথায় লাগে লালুর চামরের মত পরচুলা। পালার সময় ঐ সাপের ছোবল খাবার জন্য আশপাশের লোক যেন উপচে পড়ে।
‘যুবতী কালের ছেরামতীর মত মেয়ার যৈবন তখন ফুঁসছে’– হাঁ করে পাড়ের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখ বুজে একবার মনে মনে সেদিন রাত্রের স্মৃতিকে চেটে নেয় দ্বিজু । নদীর পাড় ধরে ছলছলে পায়ে তড়িঘড়ি কোথায় জানি চলেছে সে।  সর্বাঙ্গে গোধূলি যেন গলে গলে পড়ছে তার।
 
এই নিয়েই কদিন আগের এক নির্জীব সাঁঝে লালুর সঙ্গে খানিক কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। বলার মধ্যে শুধু দ্বিজু বলেছিল–
 
“যাই বল লালু, ঠমক ঠামক না বাড়ালে তোর পালা আর কেউ দেখবে না।”
 
“কেনে উস্তাদ! মোর ঠমক ঠামক তো আগুকার লগেই রাখছু!”
 
লালুর বিতর্কে বিরক্তিভরে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে সে। তারপর ঝাঁজের সাথে বলে,
 
“উয়াদের পালার লগে কর কেনে ! মেয়াছেলা সাজছস যদি তো মেয়াই হও কেনে!”
 
ঠোঁট কাটা লালু মুখ টিপে উত্তর দিয়েছিল , “তাই বোলো! তোমার নজর যাছে বাইরের মেয়াদের লগে!”
 
খর রাগ দেখিয়ে সেদিন অনেক রাত অবধি ছেরামতীর পাড়ে গিয়ে বসেছিল দ্বিজু। অমাবস্যার তুলোট আঁধার কেটে সবে অলস চাঁদ গা এলিয়েছে তখন । মনে মনে বলেছিল, ‘মুই বাইরের মেয়ার লগে নজর দিই , ইদিকে তুই যে মোর বৌ এর লগে ঢলামি করিস! যতই মেয়া সাজস না কেনে , তুই সেই ব্যাটা ছেলাই…’
 
 
এসব খেনের পালা রাত বিরেতে হয়। খাওয়া , শোওয়ার সময় পাত্তা থাকে না। একটি মেয়েকে নিয়ে পালা করে বেড়ানো বড় সব্বনাশা কান্ড। গাঁয়ে গাঁয়ে মোড়লদের জটলা বসে– ‘পালাগানে নাকি মেয়েরা নাইচতেয়াছে, গাইতেয়াছে !’ আশপাশের ছি ছি কলরবে পথ ঘাট সিঁটিয়ে থাকে। দ্বিজুও মাথা নেড়ে সায় দেয়। মেয়েদের এভাবে পালা করতে চলে আসা উচিত হয় না । সমাজে পাঁচজনের তালে তাল রেখে হুঁ হাঁ করলেও মনের ভিতর থেকে যেন জোর পায় না। ‘ডবকা মেয়ার যৈবন ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে!’
 
#
 
দ্বিজুর বউ আজকাল বোঝে , তার স্বামীর ঘরে মন বসে না। নাই সে আমোদ, লুকোচুরি, হাসি ঠাট্টা, ভালোবাসার গোপন ইশারা। আলোনা সম্পর্ক দিয়ে পেট ভরাতে হয় , মন ভরে না। ঠারেঠোরে দ্বিজুর বউ শুনেছে, আজকাল পালাগানের আসরে না কি মেয়েরাও নামছে। তার ঘরের মানুষটার কি কোনো মেয়েছেলের নেশা হয়েছে! আগে তাও মাঝে মধ্যে বউকে সঙ্গে নিয়ে পালাগানে যেত। আজকাল ঠিক উলটো! যেন বাড়ি থেকে দূরে থাকলেই আনন্দ!
 
বাড়ির উত্তর পানের সুপারি গাছের আঁধারে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্বিজুর একসময়কার নরম সরম বউ। বাতাস ফুঁপিয়ে উঠে দ্বিজুর বউকে ছুঁয়ে যায়। চরাচর গুম ধরে থাকে। সহসা রাতের ঘোরালো মৌতাত চিরে আছড়ে পড়ে তীক্ষ্ণ, তীব্র দ্বিজুর হাঁকডাক, ঘনঘোর বর্ষার বজ্রপাতের মত–
 
“ঐ আঁধারপানে বইসে কোন নাগরের কথা ভাইবা মনে এত দুখ তোমার! …… ভাতটো খেতে দেবার লাগে নাকি!”
 
সে তীক্ষ্ণতার শিহরণে বিবাগী সন্ন্যাসীর পথ অনুসরণ করে গাছের পাতারা ঘর ছাড়ে। বাক্যবাণের তীব্রতর উত্তাপ বউ-এর মাথায় আগুন জ্বেলে দেয়! নিত্যদিন এই অপমান!
 
“কেনে, মুই খেতে টো না দিই যাই কনে?”
 
পালটা আক্রমণ দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে , “ মনটো খারাপ হবার লাগে, তোমার লালি ঠাকুরপো আসেক নাই!”
 
আর পা নড়ে না বউ-এর। ‘রোজদিন এত রপমান সইবার লয়কো! সে এবার বাপোক ঘরতই চলে যাবেক!’ মনে মনে কঠোর প্রতিজ্ঞা করে সে।
 
 
বউ চলে যাওয়া আজ বেশ কয়েকমাস হয়ে গেল। দ্বিজু সরকারের একলা ঘরদুয়োর আজকাল মুখ নামিয়ে বসে থাকে। অঘ্রাণের শুরুতে মাঠে ধান কাটতে ব্যস্ত বাড়ির কর্তা। সারাদিনমান চাট্টি মুড়ি, কাঁচা পেঁয়াজ আর লঙ্কা বেঁধেই কেটে যায়। সন্ধেয় ফিরে কাঠের জ্বালে চাট্টি ভাতেভাত বসিয়ে আখার সামনে উবু হয়ে বসে। গুবগুব শব্দে ভাতের গন্ধ সাঁঝাল হাওয়ায় মিশে নেশা ধরায়। তখনই বউটার জন্য বড় মন কেমন করে তার। এই সময় কাঠের জ্বালের আঁচে কেমন আঙার পারা হয়ে উঠত বৌয়ের মুখটা। তবে আজকাল জেদও বেড়েছিল খুব।  মুখে মুখে কেবল চোপা। আর লালুর সাথে অত কী যে হাসি ঠাট্টা কে জানে!
 
মনে মনে ভাবে সে, ‘কতদিন বাপোর ঘরত থাকছ বউ! ‘ মোক কাছত আসবার হবেই।’ তাছাড়া এই আমতি ধান কাটন শেষ হলেই খেনের পালা জমে উঠবে গাঁ- ঘরে। এবার আবার বউদের গাঁয়েই পালার লড়াই ডেকেছে সব দল। ‘তহন পারবা মোক ছাইরা দূরত থাকত! ‘ এসব ভেবে মনে মনে পুলক জাগে দ্বিজুর। ঘরের কাঁথাচোতার ওমে মুখ ডুবিয়ে গরম করে নিজেকে। খেনের পালা পড়বে, আবার ডবকা ছুঁড়িগুলোর সাথে দেখা হবে। বউরে পটাতে পারলে লালুকে এবার দল থেকে তাড়িয়ে দেবে। বদলে এক ডবকা ছুঁড়িকে যদি সঙালি রাখা যায়! আপন সুখে চোখ বুজে আসে দ্বিজুর।
 
দেখতে দেখতে খেনের পালা শুরুর দিন এসে গেল। লড়াইয়ের ময়দানে ওস্তাদরা জড়ো হয়েছে। লালুটাকেই সঙ্গে আনতে হয়েছে, নাহলে যে পালা হবে না। তবে লালুর খুব ট্যারা ট্যারা কথা হয়েছে আজকাল।তার ভাউসান চলে যাওয়া ইস্তক দ্বিজুর সাথে লালুর সম্পর্কের ঢেউ জল ছলছলিয়ে বয়ে যায়নি আগের মত, বলাই বাহুল্য। দ্বিজুর নিজের অক্ষমতার উপর রাগ হয় মাঝে মধ্যে, এই যে সেই পুরনো লালুকে দিয়েই পালা চালাতে হচ্ছে তার জন্য রাগ, বউকে নিজের বাড়িতে ধরে রাখতে পারেনি তার জন্য রাগ!
 
মেলার মাঠে পাতলা ত্রিপলের তাঁবুর খড় বিছানো বিছানায় শুয়ে শুয়ে  এসবই ভাবছিল দ্বিজু ওস্তাদ। তাঁবুর গায়ের বড় বড় ছিদ্রপথে উত্তুরে হাওয়ার অনায়াস বিচরণ দ্বিজুকে আরো কাঁপিয়ে দিচ্ছে! অথচ এভাবে ত্রিপলের ছেঁড়া তাঁবুতে তার পড়ে থাকার কথাই নয়। এই গাঁয়েই তার শ্বশুর ঘর।বউ নিশ্চয় জানে খেনের পালার লড়াই হলে দ্বিজু তার দল নিয়ে আসবেই। জেনে বুঝেও কি একবার তার বৌ তার কাছে আসবে না! নিজে থেকে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ওঠা যায়!
 
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই সন্ধের মেলা জমজমাট হয়ে উঠছে। মেলা কমিটি অনবরত বলে যাচ্ছে, ‘আর কিছুক্ষণের মধ্যেই খেনের পালার লড়াই শুরু হবে।’
 
সাজ পোশাক সেরে লালুকে নিয়ে আসরে উপস্থিত হয় দ্বিজু ওস্তাদের দল। আসর সাজানো হয়ে গেছে।দ্বিজুর নামকরা দলের সাথে আজ এ গাঁয়ের খেন দলের পালার লড়াই।  কিন্তু বিপক্ষ দলের গিদালির সাজ সম্পূর্ণ হয়নি এখনও, তাই পালা শুরু হচ্ছে না। লটারিতে আবার বিপক্ষ দলই আগে সঙালি করবে তাই নিদান।তাদের জন্য নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করেই সামনের অগুনতি কালো কালো মাথার ভিড়ের মধ্যেই  দ্বিজু উঁকিঝুঁকি দিয়ে কি যেন খুঁজতে থাকে। লালু ফিসফিসিয়ে বলে,
“ভাউসানকে খুঁজছ তো! “
 
খেন দলের ওস্তাদ কথা গায়ে মাখে না। এ পালায় তাকে জিততেই হবে। মান সম্মানের ব্যাপার আছে। লালুর ঠমক দেওয়া সঙালিই আসল আকর্ষণ। নাহলে তার দলে কোনো মিঠে গলাও নাই। এইজন্যই আজকাল অনেকেই দলে মেয়ে ঢোকাচ্ছে। আর সে মেয়ে যদি সঙালি সাজে তো সোনায় সোহাগা।
 
“এই দলের গিদালির কিন্তুক গলায় খুব মিঠাস। লোকেরা সব কয়ে বেড়াছে……”
 
লালুর ফিসফিসানি শুনে দ্বিজু তাকে উসকে দেয়–
 
“তোর ঠমক তো কম লয় রসিকা……”
 
পালা করতে এসে এতদিনকার জমাট বরফ যেন একটু গলে।
 
 
 
এমন সময় রব ওঠে বিপক্ষের গিদালি আসরে আসছে।
 
“মুই দুখিনী নারী
খাবার নিয়া আসছু
সোনাবন্ধু তুমাক দেখবার পারি নাই
কোথায় রইলা তুমি……”
 
কী মধুর গলা! অথচ কী করুণ! দ্বিজুর প্রতিপক্ষ দলের গিদালি ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে উঠে আসছে। পালাকারের ঘোষণা জনতার ভিড়ে ঘুরে ঘুরে দ্বিজুর চোখে এক অপরূপ মোহজাল সৃষ্টি করে চলেছে ক্রমাগত। দ্বিজু নিজেও জানে না কী দেখছে আর কী শুনছে!  –
 
“মোদের নতুন গিদালী ‘শ্রীমতি দাসী’র মিঠাস গান শুনেন বন্ধুরা, আইসেন আইসেন……”
 
আসরের নকল আলোকে লজ্জা দিয়ে অনেক দূর আকাশের অগুনতি নক্ষত্রের আলো গলে পড়ছে শ্রীমতী দাসীর শরীরে । তার মিঠে গলার ধুন আসর ছাড়িয়ে গাঁ, গঞ্জ ছাড়িয়ে দ্বিজুর কোঠাপারা ঘরের আনাচে কোনাচে আছড়ে পড়ছে। আছড়ে পড়ছে ছেরামতীর বুকে, একূল ওকূল দুকূলে। বান ডেকে উঠছে রুক্ষ্ম পাথরের বুকে। ভরে উঠছে ছেরামতীর যৈবন। আসরে লাগছে তার উপচানো জোয়ার। দ্বিজু ভেসে চলেছে ছেরামতীর ভালোবাসার বানে। বিপক্ষে শ্রীমতী দাসীর চোখে উপচানো হাসির জোয়ার, লালুর  মাতাল ঘাগরা, আর দ্বিজুর  কান্না জড়ানো হেঁড়ে গলার সুরে ভেসে ভেসে জড়িয়ে ধরছে চরাচরকে–
 
“তুই যেমন সুন্দরী সতী
যেন ঐ সূরয কিরণ
তোর উপে মুই হইছুরে পাগল।
ও সতী তুই যেন ঐ আশমানেরই চান্দর।
তোর লাগি মুই হইছুরে পাগল………”