গল্প-জয়শীলা গুহ বাগচী

Spread This

জয়শীলা গুহ বাগচী

   আমার বাড়ির  পাশে আরশিনগর
 
পাশের বাড়ি। পাশের বাড়ির পাম্প চালানো হল। আওয়াজ আসছে। একটু পর পাশের বাড়ি খবর শুনবে । সকালের খবর। একই পাম্প, একই খবর আমাদের বাড়িতেও চলে। কিন্তু ওদের পাম্পের শব্দ অন্যরকম। ওদের খবর অন্যরকম। কেন এমন হয় জানি না। প্রত্যেকটা শব্দ শুনি। পাম্প যখন চলে মনে হয় মাটির ভেতর কী যেন গুমরে উঠছে। চাপা রাগের মতো। আমাদের বাড়ির সকালের চা মায়ের হাতে কেমন টুং টাং করে হেসে ওঠে। কিন্তু পাশের বাড়ির চাএর রঙ গম্ভীর। অথচ ওরা যখন ওদের দার্জিলিং বেড়াবার সাদা কালো পুরনো ছবিগুলো ফেলে দিয়েছিলো, তখন রাস্তার ধার থেকে  সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে   দেখেছি ওদের বাড়ির ছবিগুলোর সাথে আমাদের এ্যালবামের খুব একটা পার্থক্য নেই। ওই একই ফ্রেম। একই দেখতে মানুষজন , দাঁড়ানোর ভঙ্গি , পোশাক আশাক। প্রথমে ভেবেছি এসব আমাদের বাড়ির , কিন্তু যখনই পাশের বাড়ির দাদু ছড়ি নিয়ে হাঁটতে বের হলেন , দেখলাম ছবিগুলো আমাদের নয়। সর কেটে যাবার মতো কী যেন কেটে গেল। এবার চেনা যাচ্ছে। তাহলে কী সব ফ্রেমই এক? শুধু কিছু একটা যোগ হয়ে যায়। সেটা কী আমি জানি না। মা বলে যে পড়াশুনো বাদ দিয়ে আমি হাঁ করে চেয়ে থাকি… ভাবি… কী এত ভাবার আছে কে জানে। ভাবার কি সত্যি নেই ? এই যে পাশের বাড়ির চায়ের কাপ আর আমাদের চায়ের কাপ প্রায় একই। কিন্তু অবাক হই যখন ওরা  চায়ে চুমুক দেয় তখন আলাদা  হয় কী করে। সারাদিন কান ভরে শুনি, পাশের বাড়ি পাশের বাড়ি একটা মেজাজ এলে ভালোই লাগে। একঘেয়ে রুটিনটা একটু পালটায়।  মা তো সারাদিন পুষ্প পুষ্প করতেই থাকে। মনে হয় বলি আমি পুষ্প তোমাকে কে বলেছে? আমি আজ থেকে বাপিদা। বাপিদা অবশ্য ঠিক পাশের বাড়ি নয়, পাশের পাশের বাড়ি। সে যাই হোক। চুলটা খানিক স্পাইক । খানিকটা সোনালী, একটা হিরো স্প্রিন্ট সাইকেল। ওই নিয়েই হাওয়ায় উড়ে যায় বাপিদা, আমিও উড়ি। সব ঠিক আছে কিন্তু ওই দিয়াদির বাড়ির সামনে বার বার যাওয়া, ও আমার পোষায় না। কেমন যেন গায়ে পড়া ন্যাকা টাইপ। তখনই আমার বাপিদা ভাব ভালো লাগে না, ওর ওই  দিয়াদি ঝুঁকে আসলেই আমার অন্য বাড়ি হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। অথচ বাপিদা যখন, কেউ না কেউ না মুখ করে হাওয়ায় চলে যায় তখন যে কী ভালো লাগে।  বাপিদা যখন থাকে না, তখন ওর বাড়ি হয়ে যাই। বাড়িটা  একটু চুপচাপ ধরনের। ওর কাকা একটা একলা ঘরে থাকে। একটু অন্ধকারমতো, ওই ঘর । একটা কমপিউটার দপদপ করে। ওই ঘরটার মতো আমার হাত পা মাথা গা… আমি বাপিদা বাপিদা হয়েও ধীরে ধীরে নির্জন হয়ে যাই। আমি নির্জন হলে নাকি মায়ের ভয় করে। ভয়ের তো একটা উৎস থাকে। যেদিন যেদিন বাবাকে একটুও চেনা যায় না সেদিন বরং মা ভয় পাক। কিন্তু সেদিন মা খুব শক্ত হয়ে ওঠে। আমি মনে মনে বলি এই তো চাই। অন্তুদের কাঠ চাঁপা গাছটা মায়েরই মতো। দেখতে বেশ শক্তপোক্ত সুন্দর। অন্তুদের বাড়িতে কখনো যাইনি, কিন্তু ওদের বাড়িটা আমি চিনি। ওইরকম বাহারি বাড়িটারিতে তেমন কিছু নেই। বরং পাশের দাদুদের গমগমে পাম্পটা যখন চলে তখন কিন্তু একটা আলাদাই রহস্য। ওদের অনেকগুলো বন্ধ ঘর আছে। ঘরের ভেতর পুরোনো পুরোনো গল্প আছে, সেসব গল্প আমি চিন্তা করি। কী হতে পারে? যেমন ধরা যাক একটাই  আলমারি ওই ঘরে। আলমারিটা আজো বেঁচে আছে। শ্বাস নিচ্ছে। অনেককিছু জমা আছে কাছে। ও জানে না কাকে দিয়ে যাবে সেসব। কেউ নেবে না বোধহয়। একটা সময় সবাই কেমন ছলকে ছলকে ওঠে। আবার সব চুপচাপ। সেই ছলকে ওঠার সময় মেয়েটির গালে লেখা হচ্ছে চড়াই পাখির বাসা। আলমারি ভরে ওঠে রঙে ।তারপর কবে যেন ন্যাপথলিনের গন্ধ ভিড় করে। মাকে কখনও ন্যাপথলিনের গল্পের কথা বলি না। মা তো সারাদিন ঘরেই থাকে। যদি সেসব গল্পে কিছু ভাবে। আমি এইভাবে থাকবো না মায়ের মতো আধা বন্দী।
     দুটো বাড়ি পরে আরো একটি পাশের বাড়ি আছে। ওদের দোতলার বারান্দায় একটা জানালা আছে। ওই ঘরটায় আলোছায়ায় আমি একদিন দেখেছিলাম। কী আশ্চর্য  সুন্দর দুই ছায়ার নড়াচড়া। তবে যে সবাই এইসব লুকিয়ে রাখে! তারপর থেকে আমার  বারবার মনে পড়ে ওই  ছায়া মূর্তিদের। এত সুন্দর লেগেছিলো বলেই মাকেও বলে ফেলেছিলাম। মা’তো গান টান গাইতো, ভেবেছিলাম আমার মতোই এক্সপ্রেশন দেবে। ধুর , কেমন ক্ষেপে গেল। বলেছি আর তাকাবো না। এটা বলিনি যে আমার তাকাতে হয় না। আমি টের পাই। টের পাই লক্ষ্মীদি যে কিনা উল্টো দিকের বাড়ির ঠিক পাশেই থাকে, সে কতরকম মিথ্যে কথা বলে। আর মা সেগুলো মুগ্ধ হয়ে শোনে। আমি মায়ের ভুল ভাঙাই না। ওই দুপুরের দিকটা বোধহয় গল্পের বই পড়ার মতো মা সাতজনের সাত কাহন শোনে। লক্ষ্মীদির বাড়ির বারান্দায় খুব সুন্দর রোদ আসে , ওইটুকু সত্যি। আর একদিন পড়া থেকে ফেরার সময় দেখেছিলাম ওদের উঠোনে চাঁদের আলো থইথই করছে। এটাও সত্যি। ওইটুকু বাদ দিয়ে ওদের বাড়ির বাকি সবটাই খারাপ। কলেজে টিচাররা কবিতা বোঝান আরও সুন্দর করে, সাধারণ জীবনও কত মায়াময় ওইসব কবিতায়। আমি জানি সাধারণ জীবন সাধারণই হয়। ওসব কবিতার ভাষা টাষা। সাধারণ জীবন অসাধারণ হয় না। লক্ষ্মীদি যতই গল্প বানাক,ওসব আমার জানা আছে। আরও একটা জিনিস খারাপ লাগে সেটা হল ওর অস্বাভাবিক উঁচু বুক। শাড়ি বা নাইটি সবই এত বিচ্ছিরি লাগে দেখতে। আমার চোখ যখন পড়ে, তাহলে সবারই পড়ে। অবশ্য পড়লেই বা কী। আমারও তো পোশাক কত সময় ঠিক থাকে না। আমিও একদিন হয়তো ক্লিভেজ শো করবো। তবে ঠিকঠাক ড্রেসের সাথে। ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম একদিন। একটা ঘরে হাঁস মুরগী থাকে। বেশ পরিষ্কার সেই ঘরটা। ওদেরও ঘর আছে, আমার নেই। আমি মায়ের সাথে থাকি। খুব খারাপ লাগে না। তবে মাঝে মাঝে মনে হয় একার ঘর থাকলে  প্রেমে পড়া সহজ হতো। মোবাইলটাও মায়ের সাথে শেয়ার করতে হয়। কীভাবে শাসন করবে এরা তাইই ভেবে পায় না। আমি তো সবই টের পাই, সবই বুঝি, কী আটকাবার আছে জানি না। পাশের বাড়ি দেখতে দেখতেই শিখে গেলাম সবকিছু। এই যে দীপঙ্কর বাবু, সরকারি কেরাণি, পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে চোখে পড়ে না এমন চেহারা, কিন্তু সার্টের নিচে যেসব চামড়া মাংস রক্ত সেখানে কয়েক’শ চোখ বাস করে, আমার মনে হয় দীপঙ্কর বাবু একটা নন, অনেকগুলো। কালো কালো চিটচিটে একটা হাসি উফফফফ। পেল্লাই  বাড়িটা দেখে আমার চোখ কটকট করে। একটা এডভারটাইজে দেখেছিলাম, আপনার বাড়িই আপনার পরিচয়। তাইই বোধহয়। কত রকম যে রঙ আর কতরকমের যে টাইলস। ওদের টাইটেল জানি না, মনে মনে মালহোত্রা বানিয়ে দিই। কী জানি কেন।
         সব বাড়ি পাশের বাড়ি নয়। পাড়ার মোড়ে সাহানাদের বাড়িটা একটু অন্যরকম। সকালবেলা ওরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে। যদিও ওরা কারুর সাথে খুব একটা মেশে না, তবু ওদের কথা আমি প্রায়ই ভাবি, তাই বলি পাশের বাড়ি। ওদের জামায় অনেক সুতোর কাজ আর লেস থাকে। শাড়িগুলো মোটেও উজ্জ্বল নয়। রাস্তায় থুতু ফেলতে দেখিনি। যদিও মা বলছিল ওরা থুতু ফেলে। আমি সেকথা বিশ্বাস করিনি। যদিও থুতু ফেলাটা অসভ্যতা কেন ঠিক জানি না। কোনো কোনো খাবার দেখলে জিভ ভিজে ওঠে। সেটা কি খারাপ? মাকে জিজ্ঞেস করলে রেগে যায়। বলে এসব নাকি অবান্তর কথা। সঠিক জায়গায় ফেলতে হয় থুতু তাহলেই হল। তবে ওরা খ্যাক করে থুতু ফেললে বোধহয় ভালো দেখাবে না। সেই তো রবীন্দ্রসঙ্গীত থুতু ফেলে না। এইসব হাবিজাবি ভাবি বলেই মা বলে আমি বড় হইনি। আমি জানি আমি বড় হয়েছি। আমারও প্রেম করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু বুঝি না, ছেলে না মেয়ে কার সাথে প্রেম করবো। আমি বায়োলজিকালি মেয়ে। কিন্তু মানসিকভাবে ওসব বিভেদে বিশ্বাস করি না। আমি ছেলেদের মতো স্বাধীন থাকতে চাই। কলেজ শেষ হলেই আমি চাকরি টাকরি খুঁজবো । তারপর সাহানাদের মতো একটা বাড়ি বানাবো। সকালে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজবে এমন বাড়ি। ভেবেই হাসি পেয়ে গেল। নাকি অরিজিত সিং? অরিজিত সিং এর রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজাবো। ব্যস সমাধান। লেস বসানো জামা এমন করে পরবো যাতে হালকা ক্লিভেজ দেখা যায়। আমার ব্রেস্ট ততটা বড় নয়। ক্লিভেজ ঠিকঠাক হয় কিনা আয়নায় দেখতে হবে। এখন না হলেও পরে একটু মোটা হলেই হয়ে যাবে। আমারও একটা মোহময় জানালা থাকবে। আমার মনে হয় না এসব খুব লজ্জার। দেখতে যা সুন্দর তা লজ্জার হতে যাবে কেন? মানুষ জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখে সুন্দর বলে, জানালা দিয়ে দেখা ভেতরটাও যদি সুন্দর হয় তবে কেউ দেখবে না কেন? দেখার এপাড় আর ওপাড়। এই জানালা নিয়ে বেশ ভাবার বিষয় আছে। একদিন লিখবো , ক্যাপশন দেব…। তাহার বাড়ির জানালায়। জাস্ট টিন এজ ক্রশ করে আমার মনে হয় জীবনটা খুব বেশি কঠিন নয়। সবাই এত কঠিন করে ভাবে তাই। এই যে এত্তগুলো পাশের বাড়ির গল্প আমি জানি  মানে বুঝে ফেলি, সেসব খুব কঠিন কিছু নয়। মা বলে এত সোজাও নয় সবকিছু। হবে হয়তো।
        পাশের বাড়ি ধীরে ধীরে চেপে বসছে আমার মাথায়। মা যে বলেছিল সবকিছু সোজা নয়। তাই হয়তো। কাল সারারাত ঘুমোইনি। অবশ্যই নিজের কারণে নয়। আমার বাবা লোকটি আর মা হোল নাইট এক অদ্ভুত চাপা স্বরে চাপান উতোর চালিয়ে গেল। আমার খুব টেনশন হচ্ছিলো। যা হোক একটা সমাধান করে নিলেই হয়। পরীক্ষার হলে টলে আমার এত টেনশন হয় না। আজ কিছু একটা হবে মনে হচ্ছিল। এদের ব্যাপারে আমি কোনদিন থাকি না। শুনিও না। এদের বাইরে আমার নিজের একটা জগত আছে। মা বিষয়টা একটু আলাদা এই আর কী। সকালে মা রান্নাঘরে ঢোকেনি। চা হয়নি। আমার তলপেট থেকে একটা ভয় পাক খেতে খেতে ওপরে উঠছিলো। নিজেকে ধমকালাম, কী হয়েছে এত… এত ভাবার কিছুই নেই। বাবা ডাকছে… উঠতে গিয়ে দেখলাম আমার পা কাঁপছে । ওদের ঘরে গেলাম। দুজনে মুখোমুখি বসে রয়েছে। মায়ের মুখ নামানো, কিন্তু শক্ত নারকেল গাছের মতো। বাবা কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেল। মা বলল, তারা নাকি আজ থেকে আলাদা থাকবে। আমি যার সাথে খুশি থাকতে পারি। আমি দেখছিলাম আমার সামনে আমার বাড়িটা ভাগ হয়ে দুটো পাশের বাড়ি হয়ে গেল। বাবা নামের একটি পাশের বাড়ি। আর মা নামে একটি পাশের বাড়ি। আমি কি পাশের বাড়িতে গিয়ে থাকবো? কখনোই না… আমি কেনই বা পাশের বাড়িতে থাকবো… কিন্তু সব কটা বাড়ি পাশের বাড়ি হয়ে গেলে… আমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? আমার কি কোনো কষ্ট হচ্ছে না? আমি কি ফেটে পড়ছি? আমি কি ফেটে পড়ছি না? আমার সারা গায়ে আগুন, আমার কোনো আগুন নেই। আমার ভেতর আমি, আমার ভেতর পাশের বাড়ি… হাত ধরলাম… ওমনি এ ওর ডানায় বাঁশি বাজিয়ে উড়তে লাগলাম।