গল্প-শুভদীপ মৈত্র

Spread This

শুভদীপ মৈত্র

নীচানগরে একদিন
সে এক অফুরান বৃষ্টি, কলকাতা শহর বৃষ্টি-বিধৌত হলে এক নয়নাভিরাম। এ শহরের একমাত্র রোমান্স তাই বৃষ্টি গাথা।
মাথায় ছাতা থাকলেও যেহেতু টানা বৃষ্টি ফলে সারা শরীর কেমন আর্দ্র ভিজে-ভিজে যেন মাছের শরীর। রাস্তার নানা অংশে জল দাঁড়িয়ে, কোথাও প্রায় হাঁটুর কাছে উঠেছে, কোথাও পায়ের পাতা পর্যন্ত। দাঁড়িয়েছে কেন বলে জানি না জল যার ধর্ম চলমানতা তা লোকমুখে ‘দাঁড়িয়েছে’ হল কেমনে! সে যা হোক স্থিতিশীল অবস্থা নিয়ে আমার নিজের যা ধারণা তা হল এই কলকাতা শহরে বৃষ্টির মধ্যে কারো সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন – বিশেষ করে একসঙ্গে একটা দলের সঙ্গে চলতে হয়।
বৃষ্টিভেজা রাস্তায় রঙের এক চাপা ঘোলাটে ব্রাউনিশ আচ্ছন্নতা লেগে আছে, যেহেতু অফুরান বৃষ্টি। নদীর উপর সম্পূর্ণ মেঘাচ্ছন্ন হলেও দুপুরের একটা আভা অন্ধকারকে ঘনীভূত করতে দেয়নি। ঘাটের পাশ দিয়ে যে রাস্তা, সেখানেই যাদের সঙ্গে আমার দেখা এবং তাদের পিছু নেওয়া কর্তব্য স্থির হল – বয়সে তারা নেহাত তরুণ। নব্বই বা একুশ শতকের প্রথম দশক হলে স্বচ্ছন্দে তাদের কোনো বাংলা ব্যান্ডের মেম্বার বলে দেওয়া যেত। আজকাল সে উপায় নেই। এই যে মোহাওক কাট চুলের ছেলেটা, এই যে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর ডাবল হাতা জামা – এরা বিশেষ কিছুর প্রতিভূ নয়।
পিছু নিয়েছিলাম এদের বললে আসলে যে কার্য পরম্পরা বোঝায় ঠিক তেমন কিছু ঘটেনি – সঙ্গে চলাটা স্থির ছিল। তবু বৃষ্টির কলকাতায় রাস্তাঘাটে সেটা কঠিন। এবং তারাও এ ব্যাপারে যে লক্ষ্য রেখেছিল তাও নয়। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের আমি হারিয়ে ফেললাম। এই হারানোর ফলে আমার পায়ের গতি বাড়াতে হল, চল্লিশের কোঠায় এসে সে কাজ সহজ নয়, নদীর পাশের রেললাইন পেরোতে হোঁচট খেলাম এবং সামনে রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি ফোয়ারার মতো জল ছিটিয়ে জামা প্যান্ট ভিজিয়ে দিয়ে চলে গেল।
বেকুব বনার শুরু।
সিক্সটি টু আর সিক্সটি নাইনের মধ্যে অবস্থানগত পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ পজিশন। সিক্সটি নাইন এক অতি বিখ্যাত পজিশন যার চর্চা আজো চলে পত্রিকা থেকে আড্ডায় এবং সর্বত্র ফোলানো-ফাঁপানো। ইহা নান্দনিক ও কল্পনায় সুন্দর – যদিও প্র্যাকটিকালি এর ব্যর্থতা যাঁরা দরজা এঁটে গভীর খাদে ও জঙ্গলে নামলেন স্বীকার করেছেন, শ্বাসরোধী সে প্রক্রিয়া যা সূচনায় চরম উত্তেজনা ও থরোথরো কাঁপুনি তা স্বল্পস্থায়ী ও ব্যক্তিগতমাত্র এবং সে আনন্দই উপভোগ্য প্রকৃত সার্থকতার থেকে। যদিও কে প্র্যাক্টিশনার আর কে নয় তা নিয়ে বন্ধু মহলে সন্দেহ এবং যারা ছড়ালেন তাদের সম্পর্কে হিন্দি সিনেমার ভাষায় যাকে বলে ‘ফেকতা হ্যায় সালা’ এ তর্ক যাবে না এবং ধরারও উপায় নেই। অথচ ভেবে দেখুন সিক্সটি টুর পজিশনের মধ্যে একটা নিবেদন ছিল, ওই যে টু হাঁটু মুড়ে বসছে আর শায়িত ছয় – কম্পোজিশন হিসেবে হিসেবে জোরালো এবং একে অপরের উদ্দামতা ও ভয় হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু সিক্সটি নাইনে এসে একে অপরের মৌখিক পরীক্ষা নিতে ব্যস্ত। ফেলাশিও। মুখ-মৈথুন। চোষাচুষি। যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াল নাইনটি সিক্স মানে একেবারে নয় ছয় আরকি।
এর মধ্যে রোহিণীকে আমি কীভাবে খুঁজে পাই, যেভাবে ও যেখানে খুঁজে পাই – তেমন কথা ছিল না। সরু গলির ভিতর যেখানে জানলা খোলে না খুললে অন্য বাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগে যেখানে একটা বাড়ির রকের থেকেই আরেকটা বাড়ির উঠোন – এমন জটিল জ্যামিতির কৌণিকতার মধ্যে শ্যাওলা ধরা রোয়াকে রোহিণী তেরছা করে আধা-বসা বা আধশোয়া। অপেক্ষা না আবাহন আমি বুঝতে না পেরে ডেকে উঠলাম, বোজা গলা অস্পষ্ট শোনাল।
তার ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। এমন অবস্থায় প্রকাশ্যে সে এত অসচেতন কী করে? শুধু বৃষ্টির পর্দা তাকে ঘিরে লোকচক্ষুর থেকে আড়াল করেছে। অথচ এমন বৃষ্টিতে তার দেহ ভিজছে না হয়তো মাথার উপর কার্নিশ আছে কোনো। তার মুখে এই ভরা বর্ষায় দোলের লাল আবির মাখা। লম্বা মুখখানা আরো লম্বা লাগছে, সটান চুলগুলো সামনে ঘাড়ের দু-পাশ দিয়ে যেন গঙ্গা পদ্মায় দু-ভাগ, তাতে বামে পদ্মার স্রোতই বিপুল। টানা টানা নাক ও চোখ যেন মদিগ্লিয়ানির ছবি হয়ে উঠেছে। আবিরের ছোপ গলায় বুকের উপরের অংশে, খাঁজে। লাল আর গোলাপি আবির। তার মধ্যেও দেখতে পেলাম বাম বুকের ভিতর দিকে একটা ছোট্ট তিল যা আবিরের রঙের মধ্যে দিয়ে আরো প্রস্ফুটিত।
অথচ সে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল না মোটেও। সে কার জন্য অপেক্ষা করে আসছে সারা জীবন তা আমি জানিও না, আমি শুধু তার অপেক্ষার গল্পে মশগুল ছিলাম। কিন্তু ঢপের ব্যাপার। আমি যা বুঝে উঠতে পারিনি তা হল এ অপেক্ষা নয় এ সঙ্গম শেষের রসাবসাদ।
তার গালে একটা টোল পড়ল, প্রায় চোখের চাহনিতে বুঝিয়ে দিল নির্দিষ্ট কারো জন্যই তার অপেক্ষা ছিল না কখনো। স্বাভাবিক। যাকে আদর্শ প্রেয়সী ভেবেছি, বা ভাবা যাবে সে চিরদিনই বহুবল্লভা। অথবা অস্পর্শা। ভার্জিন। আর তাই ওই মুহূর্তটায় রোহিণী আমাকে ডাকছিল বেছে নিতে।
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভেসে এল কানে – কান্টের মত অনুযায়ী আবেগ দু-ধরনের সাবলাইম আর বিউটিফুল। গলাটা চেনা হতে পারে, নাও পারে, কিন্তু গমগমিয়ে উঠছে, ঝমঝমিয়ে উঠছে, সাবলাইম ও বিউটিফুল। কানে হাত দিয়ে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। বাংলায় একে উত্তুঙ্গ আর সৌন্দর্যানুভুতি বলা যায়? এই অনুভূতিগুলো কান্ট বলেছেন জাতীয় চরিত্রেও থাকে। বাঙালীর কোনটা আছে, কোনোটাই আছে কি? উত্তেজনা আর সাবলাইম এক হতে পারে না, আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাবলাইমের সঙ্গে উত্তেজনাকে গুলিয়ে ফেলি। তাই আমি রোহিণীর ক্ষেত্রে বেছে নিতে না পেরে সরে যাচ্ছি ক্রমশ।
যদিও আসল উদ্দেশ্যটা মাথার ভিতর ঝাপসা হচ্ছে।
আমাকে ওদের সঙ্গে পা মেলাতে হবে।
এই বেছে নেওয়াটা কার তাও মনে নেই আমার।
মহাত্মা বা ফরেস্ট গাম্প কোনোটাই নই, তবু এই বৃষ্টিদিনে আমি হেঁটে চলেছি কোন নিয়তিতে স্পষ্ট নয়। চোট লাগা গোড়ালিতে ব্যথা। জমা জলে জুতোটাও ভারি হয়ে গেছে, থস থস করছে। আশপাশের মুখগুলোর দিকে তাকাচ্ছি, তারা কোথায় গেল? কিছুটা হাঁটার পর হাঁফাতে হাঁফাতে এক জনের অন্তত দেখা মিলল। তাকে কাষ্ঠ হাসি হেসে মিনমিন করে জানাতে গেলাম যে একেবারে দলছুট হয়ে পড়িনি। তাতে সে অবজ্ঞার সঙ্গে তাকাল। ‘কবিতা ফবিতা লিখলে অমন হয়’ সেই ঠাট্টা আমার পোশাক ছাড়িয়ে নিয়ে পরিয়ে দিচ্ছিল পাজামা, পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলা এবং এক অলীক কবি হয়ে ওঠার মধ্যে লক্ষ্য করলাম তার চোখ কুঁচকে বিদ্বেষ, ঠোঁটের কোণ মুচড়ে – যা আমার এক সচ্ছল সফল পিসে না মেসো যার মুখের ক্লাসিক সিগারেট আর স্যুটের ভাঁজে দেখতাম এক দেড় ডজন বছর আগে – এই ছেলেটাও তার আত্মীয়, হয়তো তার নাতি।
ছেলেগুলোর কী নিষ্ঠুর চোখ। তাদের থেকে উপচে আসা কথাগুলো ছুরির মতো। আর সবচেয়ে খতরনাক তাদের নিঃশব্দ হাসি। পৃথিবীর সমস্ত আগুন নিবে গেলে পর, ঠান্ডা ছাইয়ের রঙ তাতে লেগে। দখলদারির কথা এদের মুখেই মানায়, এরা কোনোরকম রক্ত বা ঘামে হাত না ভিজিয়েই সমস্ত কিছুকে মুঠোবন্দি করে নিচ্ছে। দেখলাম রুমালের মতো সামনের ব্যাঙ্কটাকে ভাঁজ করে পকেটে ঢোকাল। আরেকজন একটা আস্ত শপিং মলের উপর দিয়ে আঙুল বোলাল, শাদা কংক্রিটের কংকালটুকু পড়ে রইল। ওষুধের দোকানে লাইন দেওয়া ছাড়া আর বাকি শহরের লোকজনের কোনো আবশ্যিক কাজ যেহেতু ছিল না তাদের চোখেও পড়ল না এই সব। তাই এরা যখন বাকি নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলছে কই একটুও কোনো সংঘাত নেই তো, বরং প্রশ্রয়ই কি রয়েছে? বুঝতে পারলাম না। বৃষ্টি জল কামান নয়, তবুও তাতে অভ্যস্ত হতে পারে না এ শহরের লোকে। তারই ক্যামোফ্লাজে বিশ্বাস করে আমি চলেছিলাম। কিন্তু এই অনুসরণ আমার সেই লুকোচুরি ধরে ফেলেছে। রোহিণীর থেকে দূরে এবং কবির স্পষ্ট পোশাকে আমাকে চিহ্নিত করে ফেলেছে এই যুবকেরা। চিহ্নিতকরণ বিরোধী সেই মানুষগুলোর হাইড আউটের খোঁজ ওরা আমার থেকে বের করে নেবে। কিন্তু আমি কি সত্যি সেটাও পারব? তাহলে প্রত্যেক নাগরিকের দিকে আঙুল তুলতে হয়। ওই নীল মোজার লোক, ও খয়েরি জড়ুলের রূপান্তরকামী – এভাবে নীচানগর উজাড় হয়ে যেতে পারে। নিজের অপারগতা চোখে ভেসে উঠতেই ওরা আমার কাঁধে হাত রাখল। ঠোঁট বেঁকিয়ে মাথা নাড়াল। না এমন বিশাল দায়িত্ব তারা আমায় দেয়নি। বরং….
আমি বুঝতে পারলাম এই যে পিছন পিছন চলেছি তা নিতান্ত পারিবারিক তা আর লুকিয়ে লাভ নেই বরং স্বীকার করাই ভাল। আমাকে ওরা আগেই চিনেছিল। তবু পাশ দিয়ে যাওয়া একটা বাচ্চা মেয়ে গেয়ে গেল ‘এস নীপবনবীথিতলে, করো স্নান…’