গল্প-অর্ণব সাহা

Spread This

অর্ণব সাহা

স্টেশন ময়দান, প্ল্যাটফর্ম ডানদিকে 

 
আরও একবার তার দৃষ্টি ঘুরে যায় একশো আশি ডিগ্রি। বাঁদিকে ধর্মতলা মেট্রো স্টেশন থেকে ডানদিকে কার্জন পার্কের মোড় পর্যন্ত। এখন দৃশ্যগুলো আর কোনও অর্থ বয়ে আনছে না তার, তনুময়ের কাছে। সে দেখতে পায় মনুমেন্টের মাথায় উজ্জ্বল আলো। হাতে চায়ের ভাঁড় নিয়ে একলা খানিকক্ষণ পায়চারি করে সে। বিরাট বড়ো চেহারার ভলভো বাসগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক কোনায় এক বুড়ো উসকোখুসকো ভিখিরিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে চলে সে। একটা তাড়া-খাওয়া জন্তুর মতো লোকটা রাস্তার এক কোণে বসে এই মুহূর্তে পরম নিশ্চিন্তে এক টুকরো পাঁউরুটিতে কামড় বসাচ্ছে। সামনে একটা প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ, যাতে রাখা খানিকটা কালচে ঘুগনি। সূর্যের আলো নিভেছে অনেকক্ষণ। জমজমাট হয়ে উঠেছে উইক-এন্ডের সান্ধ্য এসপ্ল্যানেড। যারা দূরের বাস ধরবে তাদের ব্যাগ-সুটকেস ঢুকে যাচ্ছে বাসের গর্ভে। প্রাণপণে সুখী দম্পতিরা বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে বাসে ওঠার আগে সেলফি তুলছে। নিষ্পাপ, নিরাভরণ, নিষ্কণ্টক সব ছবি, যেন ফোটোফ্রেমে বাঁধানো। অথচ এটা খুব ভালোই জানে তনুময় যেকোনও ফোটোফ্রেমের ভিতরেই হিংসা লুকিয়ে আছে। রয়েছে অনিবার্য ভায়োলেন্স। সেই চাপা সন্ত্রাসের সামনে আমাদের যাবতীয় সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুমের বিলাসিতা তছনছ হয়ে যায়। যেন একটা মিড শটে কেউ এ-ঘর থেকে ও-ঘর যাচ্ছে। হাতে একটা ফুলদানি । কোনও এক অচেনা আতঙ্কে তার হাত থেকে সেই পোর্সেলিনের মাটির ভাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এই ভাঙচুরের দৃশ্যটা টপ অ্যাঙ্গল থেকে নেওয়া হবে। খুব ধীর গতিতে একটা ফুলদানি মাটিতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অশুভ আত্মা যেন বাসা বেঁধে আছে তনুময়ের প্রত্যেকটা দৃষ্টিকোণের ভিতরে। অজানা নিয়তির টানে তার জীবনও আজ এক কিনারের দিকে ছুটছে। যে সন্ত্রাসের ভিতরে সে নিজে বসবাস করেছে বিগত কয়েকটা বছর যাবত আজ তার এক চরম ক্লাইম্যাক্স ঘটবে হয়তো। যদিও তনুময় জানে না কী সেই শেষ বিন্দু! কী সেই অন্তিম পরিণাম যার টানে সেই সকাল থেকে এই সন্ধে পর্যন্ত সে ঘুরছে এই ময়দান, মেয়ো রোড, এসপ্ল্যানেড ভলভো গুমটি, নিউজপেপার অফিসের সিঁড়ি হয়ে পার্ক স্ট্রিটের পিছনদিকের রাস্তাগুলো ঘিরে? আর এখন, এই মুহূর্তে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত ও সর্বতোভাবে বিপর্যস্ত তনুময় হাতের ধোঁয়া-ওঠা চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করে একটা মাছি ওই কাপের গরম চায়ের ভিতর পড়ে ছটফট করছে। এক লহমায় তীব্র আতঙ্কিত আর ভয়ানক কোণঠাসা বলে মনে হয় তার নিজেকে। ঘেন্নায় চায়ের কাপটা ছিটকে ফেলে দেয় সে। তারপর ঠায় তাকিয়ে থাকে ভাঙা কাপটার দিকে।
 
আজ, খুব ভোরবেলায় উঠে তনুময় দেখতে পায় এক অস্বাভাবিক ধ্বংসস্তূপের ভিতর শুয়ে আছে সে। তার একচিলতে ঘরের মেঝেতে বাথরুমের নোংরা জল। ছোট্ট ল্যাপটপটা ভাঙা আর ল্যাপটপের টুকরোগুলো তার, প্লাস্টিকের ভগ্নাংশ সমেত জড়িয়ে পড়ে আছে মেঝেয়। তখনও ভোর হয়নি। মাথার উপরের কাচের জানলা দিয়ে সূর্যের আবছা আলোর রেশ আসছে। ঘুম একবার ভেঙে গেলে আর ঘুম আসে না। আর যে অনুভূতির মধ্যে সে বেঁচে আছে বিয়ের পর এই চারটে বছর তাকে শুধু ভয় বললে কম বলা হয়। তা আসলে একধরনের বিপন্নতা। এই বিপন্নতার শুরু তার কৈশোরে। যেদিন সে প্রথম বুঝতে পারে এই বাবা-মায়ের পরিবারে সে এক চূড়ান্ত মিসফিট। চূড়ান্ত অর্থোডক্স বাবা আর প্যাসিভ ও নিষ্ঠুর মায়ের দ্বিতীয় সন্তান সে। দাদা তার চেয়ে বছর চারেকের বড়ো। লেখাপড়ায় বেশ ভালো। অথচ স্বভাবে চূড়ান্ত উদাসীন আর চরম স্বার্থপর ছিল দাদা। পরিবার, আমরা জানি মানুষের প্রথম আশ্রয়। কিন্তু খুব শৈশব থেকেই তনুময় জানত এই পরিবার তার কোনও আশ্রয় নয়। আট বছর বয়সে সে বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়। তাদের বরানগরের বিশাল তিনতলা বাড়ির উপরতলার ঘরের দরজার তালা সাঁড়াশির ছাপে ভেঙে ফেলেছিল সে। ওই ঘরে ছিল তাদের তিনশ’ বছরের পুরোনো কালীমূর্তির সিংহাসন। তারা বর্ধমান থেকে আসা এক প্রাচীন তান্ত্রিক পরিবার। বাবা ছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। তাদের শৈশবের দিনগুলো সকাল থেকে রাত পর্যন্তই ছিল অনড় রীতিনিয়মে বাঁধা। দাদা খুব সহজেই সেই নিয়মকানুনের ভিতর খাপ খাইয়ে নিতে পারত নিজেকে। তনুময় সেই দুপুরে কালীর বিগ্রহ স্পর্শ করে এবং তার সামনে রাখা প্রসাদী ফুলের বাটিতে হাত দেয়। আজও জানে না কেন এই কাজ সে করেছিল। শুধু কি কৌতূহল মেটানোর শৈশব-আগ্রহ নাকি তার পরবর্তী-জীবনে প্রত্যেকটা সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে আঘাত করা, প্রতিটি আধিপত্যের নরম্যাটিভ ফ্রেম ধরে ধরে ভাঙার চেষ্টার শুরু ছিল সেটা ? বাবা সেদিন ঠাকুরদার খড়ম দিয়ে পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলে দিয়েছিল তার। কিন্তু সে দমেনি। সেইদিন থেকেই যা কিছু নিষিদ্ধ তা ভেঙে ফেলার এক অমোঘ আকর্ষণ গড়ে ওঠে তার ভিতরে। সেটা বারো বছর বয়স থেকে বস্তির ছেলেদের সঙ্গে মিশে শুকনো নেশায় হাতেখড়ি থেকে আরম্ভ করে পনেরো-ষোলো বছরে প্রায়-দ্বিগুণ বয়সী বৌদির সঙ্গে নিষিদ্ধ যৌনতার পাঠ নেওয়ার সময় থেকেই তার পরিবারে এক ডেঞ্জারাস আউটকাস্ট হিসেবে গড়ে তোলে তাকে। সেইসঙ্গে শুরু হয় নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পিতামাতার সঙ্গে এক চিরস্থায়ী অসেতুসম্ভব দূরত্ব। ইউনিভার্সিটিতে পড়তে ঢুকে শুরু হয় প্রথমে মাঝরাত করে বাড়ি ফেরা, অতঃপর রাতে আর বাড়ি না ফেরা। ওর রাত তখন কাটছে নেতাজিনগর, শহিদ স্মৃতি কলোনি, বেঙ্গল ল্যাম্পের বিভিন্ন বন্ধুর বাড়িতে। নেশা, গিটার আর আড্ডায় কেটে যাচ্ছে রাতের পর রাত। বাড়ি ফিরলে মা-বাবা কথা বলত না। দাদা তখন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ফাইনাল ইয়ার। একেবারে বাবার বাধ্য ছেলে। যখন রাতে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে গেল, বাড়িতে ফোনেও সে জানাত না সেদিন রাতে আর ফিরবে কিনা, তখন থেকে ওর জন্য আর রাতের খাবার ঢাকা দেওয়া থাকত না। পকেটেও এতো পয়সা থাকত না তনুময়ের যাতে প্রতিদিন বাইরে খেয়ে নিতে পারে সে। তার প্রায় সমস্ত বন্ধুবান্ধব টিউশন করত। কিন্তু সে করত না। বলা ভালো টিউশন করতে গেলে যে ধারাবাহিকতা আর পরিশ্রম করে যাবার নিষ্ঠা লাগে তা তার গড়ে ওঠেনি কোনওকালেই। বাড়ি থেকে গোনাগুনতি টাকা ছাড়া একটাও বাড়তি পয়সা পেত না সে। ফলত বহুদিন সে রাত কাটাতে বাধ্য হত না খেয়ে। যেদিন বন্ধুদের বাড়িতে থাকত না, বিনা নোটিশে নিজের বাড়িতে ফিরত, সেই রাতগুলোয় তার খাবার জুটত না। অচিরেই গুরুতর আলসারের সমস্যা শুরু হল তার। এবং কোনও চিকিৎসা হল না। বাবা-মায়ের সঙ্গে সংঘাত আর মনোমালিন্য চরমে উঠল যখন সে তার চেয়ে দু-বছরের জুনিয়র মালিনীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের থার্ড স্ট্রিম লেফট সংগঠনের হয়ে ভোটে দাঁড়াল ক্ষমতাসীন বামপন্থী শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে। খবরটা বাবার কানে পৌঁছলে প্রায় ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের ধাঁচে বাড়িতে বিচারসভা বসল তার বিরুদ্ধে। বাবা, মা আর বিধবা পিসিমা ছিল সেই ট্রায়ালে বাদী পক্ষ। একতরফা ভর্ৎসনা আর অভিযোগের তীরে বিদ্ধ হতে হতে তনুময়ের মনে হয়েছিল এর চেয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাওয়াও শ্রেয়। বাবা কীভাবে খবর পেয়েছিল জানা নেই। কিন্তু সেইদিন থেকে তনুময়ের কাছে নিজের বাড়ি হয়ে দাঁড়াল পুরোদস্তুর একটা ডিটেনশন ক্যাম্প। যেখানে দাঁড়িয়ে সে দিয়ে চলেছে তার দণ্ডিত জীবনের সাক্ষ্য ? কিন্তু কার কাছে ? নিজের বাবা- মায়ের সামনে প্রতিনিয়ত সাক্ষ্য দিতে হয় অপরাধীর মতো ? কাকে দিতে হয় ? কেনই বা দিতে হয় ?
 
বাড়িটা পুরোপুরি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হয়ে উঠল যখন মালিনীর সঙ্গে সম্পর্কটা জানাজানি হল বাবা-মার কাছে। মালিনী ইসলাম। মুর্শিদাবাদের মেয়ে। মুসলিম। বাবা আর সহ্য করতে পারলেন না। এক রাতে পারিবারিক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাকে প্রায় ধুনে দিলেন বাবা। অভিশাপ দিলেন। বাকি জীবন এক মুহূর্তের জন্যও সুখী হবে না তনুময়। পূর্বপুরুষের পরম্পরাবাহিত অভিশাপ লাগবে তার জীবনে। সেই ছোট্টবেলা থেকেই যা কিছু নিষিদ্ধ, তার প্রতিই এক অমোঘ আকর্ষণ তনুময়ের। দাদা তখন চাকরি নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে। মা-বাবা কয়েকদিনের জন্য পিসিমাকে নিয়ে বর্ধমানের বাড়িতে গেছে। সেই সময় ফাঁকা বাড়িতে মালিনীকে নিয়ে আসে সে। এটা একুশ শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। বন্ধুবান্ধবের ফাঁকা ফ্ল্যাট। কমরেড অজয় ভাণ্ডারির কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের হোস্টেল রুম, কখনও কালেভদ্রে কলকাতার বাইরে দল বেঁধে বেড়াতে বা সংগঠনের কাজে গেলে শারীরিক মিলনের সুযোগ আসত। আজকের ছেলেমেয়েদের মতো সেফ হোটেলরুম বুক করার অঢেল আয়োজন ছিল না সাধারণ ঘরের ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টদের জন্য। মালিনী বাড়িতে ঢুকেছিল দুপুর নাগাদ। বেরিয়ে যায় সন্ধে সাতটার সময়। কিন্তু বরানগরের পুরোনো পাড়া আসলে একটা চণ্ডীমণ্ডপের আখড়া বললেও কম বলা হয়। ওখানে একশ্রেণির লোকের কাজই হল কে পাড়ায় ঢুকছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কখন বেরোচ্ছে, তার হদিশ রাখা। ফলত বাবার কানে কথাটা পৌঁছল। দেশের বাড়ি থেকে ফিরে এসে বাবা খুব ভদ্রভাবে তনুময়কে বললেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। সে কোনও পালটা দ্বিরুক্তি বা তর্কে যায়নি। সেটাই তার জীবনে প্রথমবার আশ্রয়চ্যুত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া…
 
রাণী রাসমণি রোডে সমাবেশটায় বেশ চোখে পড়ার মতো লোক হয়েছে। বাসগুমটির গায়ে যেখানে ব্যাগের দোকানগুলো পর পর, সেখানেই একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ভাঁড়ে চুমুক দিচ্ছিল তনুময়। একটা রোগা, গালে উস্কোখুস্কো দাড়ির লোক এসে দাঁড়াল সামনে। লোকটার চোখে অদ্ভুত মরিয়া আক্রোশ। হাত বাড়িয়ে ছোটো এক ভাঁড় চা নিল সে। এতোক্ষণে মঞ্চের উপরের ব্যানারটার দিকে চোখ যায় তনুময়ের। সারা বাংলা বন্ধ কারখানার অভুক্ত শ্রমিক কর্মচারীদের একটা যৌথ মঞ্চ এটা। প্রায় হাজার তিনেক লোক এই সমাবেশে। এই মুহূর্তে সামনের লোকটার সঙ্গে একাত্ম বোধ করে সে। খানিকক্ষণ ইতস্তত করার পর আচমকাই প্রশ্ন করে বসে লোকটাকে :
 
–কোন ফ্যাক্টরি আপনার ?
–হাওড়ায় । জুট মিল । সন্দিগ্ধ চোখে তাকায় লোকটা…
–কি নাম মিলের ?
–অন্নপূর্ণা জুট মিল। আপনি কি সাংবাদিক ?
–হ্যাঁ । ছিলাম। আমারও চাকরি নেই এই মুহূর্তে…গলা নামিয়ে বলে তনুময় ।
–কোন পেপার ?
–দৈনিক বাংলা। দেখেছেন কাগজটা ?
–হ্যাঁ। জানি। আমাদের ফ্যাক্টরির খবর দিত একসময়। আমাদের স্ট্রাইকের খবর।
–খবরগুলোর বেশিরভাগ আমিই করতাম।
 
লোকটা একটু অবাক চোখে তাকায় তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে একইসঙ্গে কিছুটা অবিশ্বাস আর ভয়।
 
–আপনাকে ছাঁটাই করেছে ?
–একসঙ্গে চব্বিশ জনকে।
–কেন ? কী করেছিলেন আপনারা ?
–কিছুই করিনি…এই সরল প্রশ্ন শুনে হাসি পায় তনুময়ের।
–এমনি এমনি তাড়িয়ে দিল ?
–আপনাদের মিল বন্ধ করল কেন মালিক ?
–মিথ্যে বলল মালিক। বলল প্রফিট হচ্ছে না। লসে চলছে কোম্পানি…
–আমাদেরও সেরকম কিছুই বলল দাদা। চলুন ওদিকটায় গিয়ে একটু ছায়ায় দাঁড়াই…
 
বাড়ি থেকে প্রায় স্বেচ্ছায়, খানিকটা বাধ্য হয়েও বটে, বেরিয়ে আসতে হয়েছিল তনুময়কে। মালিনীদের বাড়ি পার্ক সার্কাসের কাছে। একটা ফোর-রুম ফ্ল্যাট। ওর বাবা বেশ উঁচু র‍্যাঙ্কের পুলিশ অফিসার ছিলেন। মারা গেছেন কিছুদিন হল। মা হাউজওয়াইফ। দেখে মনে হত, প্রচলিত অর্থোডক্স নিয়মের বাঁধনে কোনওদিনই বড়ো হতে হয়নি মালিনীকে। ইউনিভার্সিটি শেষ করেই একটা নামী প্রাইভেট স্কুলে চাকরি পেয়ে যায় সে। পারিবারিক সোর্সে। সম্পর্কের গোড়া থেকেই তনুময় জানত তাদের এই রিলেশনশিপ আসলে চালিত হবে মালিনীর ইচ্ছে অনুযায়ী। কারণ, সে এক তীব্র রিপ্রেসিভ পরিবারের সন্তান। নিজের ফ্যামিলিতে তার একটুকরোও আশ্রয় নেই। প্রায় খড়কুটোর মতো সে আঁকড়ে ধরেছিল মালিনীকে। না সে খুব স্মার্ট, বলিয়ে-কইয়ে লোক, না সে খুব আকর্ষণীয় পুরুষ। প্রায় কোনও মেয়েই সেভাবে কোনওদিন স্থায়ী হয়নি তার জীবনে। আসেও নি সেইভাবে কেউ। প্রায় আকস্মিক ভাবে মালিনী এসেছিল তার জীবনে।একই ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তারা। তাও কিছুদিন বাদেই মালিনী সরে যায়। নিজের স্থাণু স্বভাব দোষে তনুময় আরও বেশ কিছুদিন জড়িয়েই থাকে ওই ক্ষুদ্র অতিবাম দলের সঙ্গে। ফলত মোটামুটি খারাপ রেজাল্ট না হলেও পিএইচডির সুযোগ হাতছাড়া হয়। স্কুল-কলেজের চাকরিও পায় না সে। সেসময় এই পুরো চেইনটা নিয়ন্ত্রিত হত রাজ্যের শাসকদলের হাত ধরে। ডিপার্টমেন্টে এবং গোটা অ্যাকাডেমিক সার্কিটে তাকে উদ্ধত, হঠকারী, আনস্টেবল চরিত্রের মানুষ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। ফলত স্থায়ী, সম্মানজনক চাকরির সম্ভাবনা গোড়াতেই চলে যায় তার জীবন থেকে। একটা প্রায়-চোখে না পড়ার মতো ছোটো চ্যানেলের চাকরিতে ঢোকে সে। খুব সামান্য মাইনে। বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় চুকে গেছে তখন তার। স্কুলের চাকরিটা পেয়েই মালিনী একদিন তাকে বলল :
 
–আমরা কবে থেকে একসঙ্গে থাকব ?
–আমার এই চাকরিতে বিয়ে-সংসার সম্ভব ?
–তুমি আজকাল এতো নেগেটিভ কেন তনু ?
–আমি নেগেটিভ নই । আমার পরিস্থিতি নেগেটিভ…
–সেটা তোমার ভাবনা তনু । এখন তো আস্তে আস্তে নিজেকে বদলাতে হবে তোমায়..
–বদলাতে হবে ? কেন ?
–আমি তোমার সঙ্গে থাকতে চাই তনু। আমি একটা ফ্যামিলি চাই।
–তুমি আমার পাশে মিছিলে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিতে একদিন, তাই না ?
–তাতে কী হয়েছে তনু ? সেটা অন্য জীবন, অন্য পরিস্থিতি ছিল। আজ তো আর স্টুডেন্ট নই আমরা। বলো ?
–আজ তুমি যা যা বলছ, সেটাই অন্য আর পাঁচটা মেয়ে বলবে মালিনী। তুমিও সেই একই ভাষায় কথা বলছ। আমি তোমায় আলাদা ভাবতে পারছি না !
–আলাদা ভাবতে চাইছই বা কেন ? আমি কি কোনওদিন বলেছি আমি আলাদা কিছু ?
–বলোনি। কিন্তু গড়পরতা মেয়েদের চেয়ে তুমি আলাদা। এটাই বুঝিয়ে এসেছ তুমি। বরাবর।
–আলাদা মাই ফুট। আমার সঙ্গে শুয়েছিলে কেন তুমি ? কী ভেবে শুয়েছিলে ?
–আমি তোমায় ঘেন্না করি মালিনী। আমি তোমার সঙ্গে শুয়েছিলাম মানে কী ? তুমি আমার সঙ্গে শোও নি ?
–আমি অতো বুঝতাম না। আমি তোমার দু’বছরের জুনিয়র ছিলাম।
–তাতে কী হল ? আমি তোমায় জোর করিনি। তুমি স্বেচ্ছায় এসেছিলে।
–কারণ সেদিন তোমার মধ্যে স্পার্ক দেখেছিলাম। আজ তোমায় দেখে আমার করুণা হয় তনু।
–তবে ছেড়ে যাও আমায়। তুমি চাকরি পেয়ে গেছ। আমি এখনও সেটলড নই।
–অতো সহজে পার পাবে না তুমি। আমাদের অত্যন্ত কনজারভেটিভ ফ্যামিলি। তোমায় বহুবার বলেছি !
–তোমার তাও একটা ফ্যামিলি আছে মালিনী। যেরকমই হোক, আছে। আমার কী আছে ? সব থেকেও কিছুই নেই আমার। কোন গ্রহ-নক্ষত্রের দোষে আমার জন্ম আমি জানি না।
–কেন এরকম ভাবছ তনু ? আমি তো আছি তোমার পাশে। আমার রোজগারে চালাব…একটু নরম হয় মালিনী।
–আমরা থাকব কোথায় ? আমার বাড়িতে ফিরব না আমি !
–আমার বাড়িতে থাকব আমরা তনু। আমার তো আর কোনও ভাইবোন নেই। কোনও সমস্যা হবে না…দেখো !
 
তনুময় রাজি ছিল না। কিন্তু তার অন্য কোনও উপায়ও ছিল না। প্রত্যেক রাতে একটা স্থির নিশ্চিত ঘরে ফেরার আকুতি তার ভিতর ছিল মারাত্মক ভাবে। চ্যানেলের কাজ সেরে ফিরতে মাঝরাত হয়ে যেত। প্রায় সব দিনই নিউজ চ্যানেলের অফিসেই ঘুমিয়ে নিত সে। তার ভিতরের এক অত্যাশ্চর্য প্রতিস্পর্ধী মানসিকতা জীবনের পুরোটাই প্রতিকূল জেনেও নাছোড়বান্দা জেদে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার উদ্ভট দুঃসাহস জোগায় তাকে। কিন্তু সে জানে এই পৃথিবীতে তার মতো মানুষের জন্য মৃত্যু ছাড়া আর কোনও ভবিতব্য অপেক্ষা করে নেই। সে আগাগোড়া এই পৃথিবীর অনুপযুক্ত । আরও আগে, ছাত্র থাকাকালীন একটা অদম্য জেদ আর আশাবাদ ছিল তার ভিতরে , কিন্তু সামান্য দুয়েক বছরের মধ্যেই সেসব ধুয়ে-মুছে গেছে । একটা কবিতার বই বের করেছিল সে থার্ড ইয়ারে পড়াকালীন । বন্ধুবান্ধবদের অর্থসাহায্যে। আজ সেই কবিতা লেখা, রাতের বিছানায় শুয়ে বিভোর হয়ে কবিতা পড়া—সব কিছুই কীরকম অলীক মনে হয় । মনে হয় অন্য কারও জীবনে, অন্য কোনও জন্মে যেন এইসব ঘটেছিল । আজ কেবল এক মুহূর্তজীবীর ভূমিকায় বেঁচে আছে সে । জানে না পরক্ষণেই কোন অনিশ্চয়তা ঘিরে ফেলবে তাকে । বাবা-মা-দাদার সঙ্গে যোগাযোগ সে একরকম ইচ্ছে করেই রাখত না । মা ফোন করত মাঝে মাঝে । সে অধিকাংশ সময়েই ধরত না ফোন । ক্রমাগত কোণঠাসা হতে থাকার একটা মজা আছে । নিজেকে বিপন্ন করে তোলার নেশা । তলিয়ে যাবার নেশা । যেকোনও ড্রাগের চেয়েও বেশি মারাত্মক । সে বেশ ভালোই টের পাচ্ছিল একটা পারিবারিক রেজিমেন্টেশন ভেঙে বেরিয়ে আসার পর আর একটা খাঁচায় ঢুকতে চলেছে সে । এখনও সময় আছে । মালিনীর সঙ্গে সম্পর্কটা শেষ করে দিলেই হয় । কিন্তু আকৈশোর শিকড়হীন, মানসিক ভাবে আশ্রয়হীন তনুময়ের মনের গোপনে সযত্নে লালিত রয়েছে এক নীড় বাঁধার স্বপ্ন । সে খুব বেশিদূর অব্দি ভবিষ্যৎ পড়তে পারে না । সে ক্ষণিক মুহূর্তের পাঠ নিতে নিতে জীবনে এগোনোর কথাই ভাবে । যদিও সে জানত না সেইদিন ওই নীড় বাঁধার আজন্মলালিত স্বপ্নই তাকে শেষ অব্দি ধ্বংসের দিকে টেনে নেবে । নিয়তি অলঙ্ঘ্য হয়ে ওঠে কিছু কিছু মানুষের জীবনে । সেও নিয়তির বিষাক্ত সন্তান ! কিন্তু মানুষ তার স্বপ্নের অবশেষ খুঁজে পেতে গিয়ে মাঝে মাঝে নিয়তির বিপরীতেও দাঁড়ায় কখনও । তনুময় কোনওদিনই খুব বেশিদূর সামনে দেখতে পায় না । এবারও সে একই ভুল করল । যদিও সেই মুহূর্তে সে বুঝতেই পারেনি কী করতে চলেছে । তার সামনে বেটার কোনও অপশনও ছিল না ।
 
কিনারবাসী ! এক শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় তাকে । প্রথমদিকে সেরকম সমস্যা না হলেও খুব দ্রুত তনুময় টের পায় মালিনীদের ফ্ল্যাটেও সে কতোখানি বেমানান । এমনিতেই তার সামান্য চাকরি, চোখে না-পড়ার মতো স্ট্যাটাসহীন অস্তিত্ব নিয়ে মালিনীর মায়ের চাপা ক্ষোভের অন্ত ছিল না । আপাতদৃষ্টিতে ভদ্রমহিলা রীতিমতো সফিস্টিকেটেড । মুখে কিছুই বলতেন না । কিন্তু তার ওই শীতল ব্যবহার তাকে পীড়িত করত প্রত্যেক মুহূর্তে । সে দুয়েকবার মালিনীকে এই নিয়ে বলতেও গেছিল । কিন্তু প্রথমটায় তাকে ইগনোর করার পরামর্শ দিলেও মালিনী পরের দিকে বিরক্ত হত তার আচরণে । মালিনীর ফ্যামিলির শাখা-প্রশাখায় সকলেই খুবই উচ্চ-প্রতিষ্ঠিত । কিছুদিনের মধ্যেই তনুময় টের পায় তার এই অকিঞ্চিৎকর অস্তিত্ব নিয়ে মালিনীরও একটা চাপা ক্ষোভ আছে । সেটা মালিনী নিজের মুখে স্বীকার করে না । কিন্তু আছে যে, সেটা সত্যি । সবচেয়ে বড়ো কথা যে মেয়েটা তার পাশে দাঁড়িয়ে একদিন র‍্যাডিকাল ছাত্র সংগঠনের মিছিলে শ্লোগান দিত, তার মনের ভিতরটা যে এতোখানি অর্থোডক্স আর রক্ষণশীল তা সে আগে বিন্দুমাত্র টের পায়নি , মালিনীই টের পেতে দেয়নি । কোনও মানুষকেই তার স্বরূপে চেনা যায় না যতোক্ষণ না তার সঙ্গে একত্রবাস করা যায় । আসলে মানুষ জিততে চায় । মালিনী তার কাছ থেকে এক ধরনের নিঃশর্ত আনুগত্য পেত বরাবর । যেহেতু তনুময়ের বাড়ি বা পরিবার বলে কোনও সুস্থিত আশ্রয় ছিল না, তাই সেও বাধ্য হয়ে ওই সমর্পণটুকু দিত মালিনীকে । কিন্তু তার আন্তর্সত্তা এক প্রবল নৈরাজ্যের খনি, যেখানে ফুটছে তপ্ত ভিসুভিয়াস । জীবনের প্রায় সমস্ত উন্নতির রাস্তা বন্ধ জেনেও যে আগ্নেয়গিরির আগুন সে শত চেষ্টাতেও নেভাতে পারেনি কোনওদিন । এই ধরনের মানুষ জীবনের সব ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে বারবার । কারণ তার মন নত হতে শেখে না অথচ দর্পিত অহং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় । একই সমস্যা মালিনীদের ফ্ল্যাটেও হচ্ছিল তার । অধিকাংশ দিনই তার ফিরতে মাঝরাত হয়ে যেত । প্রথম কয়েকমাস মালিনী অপেক্ষা করত তার জন্য । কিন্তু অচিরেই তার অপেক্ষা শেষ হয় । সাধারণত তনুময়ের খাবার রাখা থাকত ডাইনিং টেবিলে । নিঃশব্দে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ঢুকে সে খেয়ে নিত । জামাকাপড় ছেড়ে সন্তর্পণে খাটে উঠে শুয়ে পড়ত ঘুমন্ত মালিনীর পাশে । হ্যাঁ । একটা সময়ের পর মালিনী আর জেগেও থাকত না । তার মতো মানুষের জন্য হয়তো কারও পক্ষেই জেগে থাকা সম্ভব নয় । এটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও তনুময়ের সামনে আর কোনও পথ নেই তখন ।
 
একটা অদ্ভুত ব্যাপার নিয়ে প্রথম বড়ো সমস্যাটা শুরু হয় । বাড়িতে পুডিং বানিয়েছিল মালিনীর মা । রাতের বেলা ঘরে ঢুকে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত তনুময় সেই পুডিং-এর বাটি থেকে খানিকটা তুলে খেয়ে নেয় । মালিনী তার আগে ঘুম থেকে ওঠে । তার অফিস একটু বেলায় শুরু হয় বলে তনুময় কিছুটা পরে উঠত ঘুম থেকে । সেদিন আচমকাই ঘুম ভেঙে যায় তার । সে স্পষ্ট শুনতে পায় শাশুড়ি তার সম্পর্কে বলছে একটা আগাছা বাড়িতে পুষলে এরকমই হয় । বিকেলে আত্মীয়রা আসবে বলে ওই পুডিংটুকু রাখা ছিল । সেটাও সাবাড় করে দিয়েছে ওই ছেলেটা । আরও আশ্চর্য লাগে তার যখন মালিনী মায়ের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলে না । সেদিন তার প্রাথমিক ভাবে যা লাগে তা হল এক মারাত্মক ভয় । পায়ের আঙুল থেকে শিরশিরে ভাব উঠে আসে কোমর অব্দি । তার নিজেকে এক চূড়ান্ত অপাংক্তেয় জীব বলে মনে হয় । যেন সে একটা নোংরা কেন্নো যে এই সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা নষ্ট করতে এসেছে । সেই মুহূর্ত থেকে সে নিজেকে মানসিক ভাবে সরিয়ে নেয় মালিনীর জীবন থেকে । মালিনী ততোদিনে বহুদূরের বাসিন্দা । কিন্তু তনুময় কোনওকালেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলে তার সব কাজেই একধরনের শ্লথতা আর দীর্ঘসূত্রিতা কাজ করে । আর অহংবোধ তার বরাবরই বেশি। নির্বোধের মতো সে জেদ ধরে বসে রইল এরপরও । যে পরিস্থিতি ছিল সেইসময়, অন্য যেকোনও মানুষ এই স্ত্রীর থেকে আলাদা হয়ে যেত । সেটা তনুময়ও যে ভাবত না তা নয় । তবে পরক্ষণেই এক অচেনা আতঙ্ক তার গলা টিপে ধরে কুঁকড়ে ধরত তাকে । এই খতরনাক পৃথিবীতে সে সম্পূর্ণ একা । বলা যায় এই তার স্বেচ্ছা-একাকিত্ব । একটু মানিয়ে-নেওয়া, মেনে-নেওয়ার মতো হলেই সে নিজের এই আমর্ম ধ্বংস এড়াতে পারত । নিজের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে সে ফিরবে না । এখানেও আর থাকাটা প্রায়-অসম্ভব হয়ে উঠছে দিন-কে-দিন…
 
শেষ-বিকেলের দিকে খবরের কাগজের অফিস থেকে বেরিয়ে চা খাওয়ার অভ্যেস তার বরাবরের । অফিসটা ওয়েলিংটনে । ‘দৈনিক বাংলা’ তার কাগজটার নাম । মেরেকেটে চল্লিশ হাজার সার্কুলেশন । তাও সেটা শনি আর রবিবারের হিসেব । মাইনে খুবই কম । বিরাট ওয়ার্কলোড নিতে হয় তাকে । একটু অন্যমনস্ক অবস্থায় ‘হিন্দ’ সিনেমার কাছে পৌঁছতেই প্রায় ইলেকট্রিক শক খাবার মতো চমকে ওঠে সে । এক অপরূপ পুরুষের হাত ধরে ‘হিন্দ আইনক্স’ থেকে বেরোচ্ছে মালিনী । ওরা যে আইনক্স থেকেই বেরোচ্ছে সেটা নিশ্চিত হয়ে গেল সে যখন একটু দূর থেকে সে দেখে মালিনী সিনেমা হলের টিকিট দুটো দলা পাকিয়ে ফুটপাতে ছুঁড়ে ফেলল । ওরা সামান্য কয়েক পা এগিয়ে একটা দামি গাড়িতে উঠল । মুহূর্তের মধ্যে চোখের আড়াল হয়ে গেল ওরা । সেদিন অফিসে ঢুকে সে আর কিছুতেই কম্পিউটরের সামনে বসে কাজ করতে পারছিল না । বিয়ের প্রথম বছরের মধ্যেই তার সঙ্গে মালিনীর শারীরিক সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে । গত দু’বছর সে মাঝরাতে বাড়ি ফিরে একচিলতে স্টোররুমে শোয়, কারণ, মালিনী সরাসরি সেই দিনের পর থেকে তার সঙ্গে এক বিছানায় শুতে অস্বীকার করেছিল । সেদিন সে অপ্রত্যাশিত ভাবেই রাত সাড়ে নটার মধ্যে ঘরে ফিরে আসে । কেউই তার সঙ্গে কোনও কথা বলছিল না । একটাই টেবিলে তারা তিনজন । একটা তীব্র দম-আটকানো জ্বালা কুরে কুরে খাচ্ছিল তনুময়কে । সে নিজেই নীরবতা ভাঙল :
 
–আজ কে ছিল তোমার সঙ্গে ?
–কে ছিল মানে?
–হিন্দ আইনক্স থেকে বেরোচ্ছিলে তুমি । সঙ্গে একজন ছিল । কে সে ?
কোনওদিন এইভাবে বার্স্ট করতে দেখেনি সে মালিনীকে । মালিনী শান্ত খুনির চোখে তাকাল একবার তার দিকে । মুহূর্তে ফল কাটার ছুরিটা চালিয়ে দিল তার গলা লক্ষ করে । এক সেকেন্ডের জন্য মাথাটা বাঁচিয়ে নিলেও কানের পাশ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করেছে তখন তনুময়ের । সেও পালটা আক্রোশে তাকাতে চাইল মালিনীর দিকে, কিন্তু মালিনী তখন হিংস্র শ্বাপদের স্বরে বলে ওঠে তাকে :
 
–বেশ করেছি । তোমার মতো হিজড়েকে জবাবদিহি করতে হবে আমায় ?
–আমি জেরা করিনি তোমায়…
–তবে কী করেছ ? তুমি কীসের জন্য আছো এই বাড়িতে ?
–এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয়…
–শুয়োরের বাচ্চা । আমাকে প্রশ্ন করার তুই কে? কী ভেবেছিলি ? শেষ করে দিবি আমার জীবন?
–এইভাবে বোলো না মালিনী !
–তবে কীভাবে বলব ? আমার পয়সায় তুই খাস হিজড়ের বাচ্চা । তিন কূলে কেউ আছে তোকে জায়গা দেবার ? একটা পরগাছার মতো এখানে পড়ে আছিস । লজ্জা করে না । ধ্বজ একটা !
 
এই ভাষা । মালিনী বলেছিল । মালিনী একদিন ছিল তার কমরেড । মিছিলে শ্লোগান দিত একসঙ্গে ।
 
তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে তনুময়ের জামা । সে খাওয়া ফেলে উঠে গিয়ে বাথরুমে ঢোকে । বোঝে এক্ষুনি তাকে এই রক্ত বন্ধ করতে হবে । খুব কাছেই একটা নার্সিং হোম আছে । সেখানে যাবে বলে সে পা বাড়ায় । জামাটা গলিয়ে নেয় গায়ে । আড়চোখে টের পায় কুটিল বিড়ালের মতো সামান্য একটা-দুটো ভাত মুখে তুলছে তার শাশুড়ি । টি-শার্ট রক্তে ভেসে যাচ্ছে । ফ্ল্যাটের দরজা খুলে টলতে টলতে হেঁটে চলে তনুময় । এক অপরিচিত রিক্সাওয়ালা তার জামায় রক্ত দেখে নিজে থেকেই দাঁড় করায় । তাকে রিক্সায় তুলে উন্মাদের মতো ছুটে চলে লোকটা । আর তনুময় সেইদিন রাতেই স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয় এবার নিজেকে শেষ করে দেবার সময় এসে গেছে তার জীবনে । পৃথিবীতে কেউই তার জন্য অপেক্ষা করে নেই । এই নার্সিং হোমে মূলত বার্নিং কেস আসে । তাই এটার নামই বার্ন ইউনিট । প্রায়ই বিভিন্ন বাড়ির বউদের পোড়া শরীরের চিকিৎসা হয় এখানে । আজ বেডে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থায় সিস্টার যখন স্টিচ করছিল, একটুও ব্যথা অনুভব করেনি সে । মালিনী স্পষ্টই চাইছে সে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাক । সেটা এতোদিন সে এরকম পরিষ্কার জানায়নি এর আগে । মালিনী ওই ছেলেটির সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে চাইছে কি ? আসলে মালিনী তাকে একদিন জয় করতে চেয়েছিল । নিজেরই নক্ষত্রের দোষে তনুময় কাউকেই পুরোটা সমর্পণ দিতে পারে না । শাকসব্জির মতো নিরীহ হয়ে থাকতে পারে না । এই সমস্যা তার জীবনে এক রাহুর মতো লেপ্টে থেকেছে । নিজের পরিবার, প্রথম দিকের দু’তিনটে চাকরি চলে গেছে এই কারণে । আজ মালিনীর সঙ্গে এই ভাঙাচোরা দাম্পত্যও শেষ হয়ে যেতে বসেছে তার এই অসম্ভব ঘাড়-না-নোয়ানো, অ্যারোগান্ট মানসিকতার জন্য । অথচ বাইরে থেকে চট করে দেখলে কেউ টের পাবে না তার এই তীব্র প্রতিস্পর্ধা আর লাগামছাড়া উন্নাসিক, আত্মগর্বী মানসিকতা । আপাতদৃষ্টিতে তার এই অহংবোধের কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও নেই । কেবল সে টের পেত নিজের বুকের ভিতরে এক আশ্চর্য ঝিনুকের মধ্যে মুক্তোর প্রাণস্পন্দন । যে মুক্তো তার নিজেরই অশ্রুবিন্দু দিয়ে গড়া । যার কোনও পরিণাম নেই । কোনও স্পষ্ট আকৃতি নেই । স্টিচ শেষ হলে সে যখন বেরিয়ে আসছে নার্সিং হোম থেকে, তার মাথার ভিতরটা বিলকুল ফাঁকা । সেই রাতে সে আর বাড়ি যায়নি । বাড়ির কাছেই একটা নতুন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসস্টপ হয়েছে । এমপি ল্যাডের টাকায় তৈরি যাত্রী প্রতীক্ষালয় । সেখানে যখন ঢুকল সে একটা কুকুর গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে ভিতরে । এসি চলছে । পাশাপাশি চারটে চেয়ার দখল করেই শুয়ে পড়ে সে । ঘুম আসে না । পরদিন সকালে উঠে আগে সামনের দোকান থেকে চা আর কচুরি খায় । যখন মালিনীদের ফ্ল্যাটে ফেরে, তার বউ বেরিয়ে গেছে । নিজের স্টোররুমের একচিলতে খাটে বসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিশ্চিত করে নেয় সে ।
 
এইসময় থেকেই তনুময় বেশ কয়েকটা আত্মহত্যা বিষয়ক পেপারব্যাক কিনে আনে এবং গভীর মনোযোগ সহ সেগুলো পড়তে শুরু করে । বারবার খুঁটিয়ে সে পড়ত দুই রুশ কবি সের্গেই এসেনিন আর ভ্লাদিমির মায়াকোভ্‌স্কির আত্মহত্যার বৃত্তান্ত । এসেনিনের মৃত্যু হয় ১৯২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর । আরও একবার সে ওই বইটি হাতে নিয়ে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাগুলো নাড়াচাড়া করতে থাকে । যাতে লেখা—‘আত্মরতি এসেনিনের পূর্ণমাত্রায় ছিল, কিন্তু যে-সমস্ত কবি বিপ্লব ও শ্রেণির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন এবং সামনে বিপুল আশার আলো দেখতে পেতেন তাঁদের প্রতি তাঁর খানিকটা ঈর্ষাও ছিল । এর ফলে এসেনিন নিজের প্রতি বিরক্তি এবং স্নায়বিক দুর্বলতায় ভুগতেন । আর সেটা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে অতিরিক্ত সুরাপান এবং আশেপাশের লোকজনের সঙ্গে প্রবল দুর্ব্যবহারের আকার ধারণ করে…ছিলেন কৃষক সন্তান, হলেন শহরবাসী । বিবাহ করেছিলেন ‘নারোদ্‌নিক’ জিনাইদা রেইখ্‌কে । কিছুকাল বাদে ‘নারোদ্‌নিক’ মত এবং সেই সঙ্গে স্ত্রীকেও পরিত্যাগ করে প্রবল ধর্মবিশ্বাস সত্ত্বেও বলশেভিকদের দলে ভিড়ে গেলেন । ১৯২২ সালের মে মাসে তাঁর চেয়ে সতেরো বছরের বড়ো মার্কিন নৃত্যশিল্পী ইসাদোরা ডানকানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন । এই বিবাহ স্থায়ী হয়েছিল বছর দেড়েক । ডানকানের সঙ্গে ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন পানশালায় ও নৃত্যশালায় বেশ কিছুকাল উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের পর কৃষক সন্তান দেশে ফিরে এলেন…এরপর তিনি বিয়ে করলেন লেভ তলস্তয়ের এক নাতনিকে । আবার শুরু হয়ে গেল তাঁর উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাত্রা । কবি সদর্পে ঘোষণা করলেন কবি না হলে তিনি হতেন দুর্বৃত্ত গুণ্ডা’।
 
এসেনিনের সঙ্গে মায়াকোভ্‌স্কির শেষ সাক্ষাৎকারটি ঘটেছিল এসেনিনের মৃত্যুর অল্প কয়েক দিন আগে । রাষ্ট্রীয় প্রকাশনালয়ের কাউন্টারের সামনে । “উচ্ছৃঙ্খল মদ্যপায়ীর চেহারা । দেখে চেনার উপায় নেই”। সেইদিনই সন্ধেবেলায় মায়াকোভ্‌স্কি তাঁর বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে পরামর্শ করেন কী করে এসেনিন-কে বাঁচানো যায় । কিন্তু কোনও সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হল না । এর কিছুদিন বাদে লেনিনগ্রাদের ছোট্ট হোটেলের একটি ঘরে এসেনিন যখন আত্মহত্যা করেন তখন তাঁর সেই পরিণতি মায়াকোভ্‌স্কির কাছে সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক ও অনিবার্য পরিণতি বলেই মনে হয়েছিল । মৃত্যুর আগে হাতের শিরা কেটে রক্তের অক্ষরে কবি লিখে যান আটছত্রের একটি বিদায়বার্তা…পরদিন সকালে সংবাদপত্রে কবির এই কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পর মায়াকোভ্‌স্কির প্রতিক্রিয়া—“এই ছত্রগুলি প্রকাশিত হওয়ার পর এসেনিনের মৃত্যু সাহিত্যের একটা ঘটনা হয়ে দাঁড়াল । সঙ্গে সঙ্গে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল এই জোরালো কবিতাটি—হ্যাঁ, আমি কবিতা বলেই আমি বলছি—এতো দ্বিধাসঙ্কুল মানুষকেই না উদ্বন্ধন ও রিভলবারের মুখে ঠেলে দিতে পারে ! কোনও পত্রপত্রিকার কোনও বিশ্লেষণ বা কোনও প্রবন্ধ দিয়েই এই কবিতাকে নস্যাৎ করা যাবে না । একমাত্র কবিতা দিয়েই এই কবিতার মোকাবিলা করা সম্ভব”।
 
এই লেখার প্রায় চার বছর বাদে মায়াকোভ্‌স্কি লিখবেন সেই বিখ্যাত কবিতা—‘সের্গেই এসেনিনের প্রতি’, যা তনুময় প্রথম পড়েছিল সেই ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় । মায়াকোভ্‌স্কির তিনমাস সময় লেগেছিল কবিতাটা শেষ করতে । লেখাটা খুঁটিয়ে পড়লে খুব স্পষ্ট টের পাওয়া যায় সূক্ষ্ম কথার মারপ্যাঁচে এই কবিতার জায়গায় জায়গায় নিজের আত্মহননের সম্ভাবনার কথাও লুকোনো আছে । এবং ‘এই ঘটনাও আকস্মিক নয়…বরং এর পিছনেও কবির দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ছিল । কবির ব্যক্তি চরিত্র, তাঁর চিরসঙ্গী বিষাদ, খেয়ালি প্রকৃতি এবং পারিপার্শ্বিক কিছু ঘটনা ও পরিস্থিতির যোগফল । অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা ও অস্থিরতার ফলে প্রেমের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, তাঁর প্রতি সরকারি আমলাতন্ত্রের বিরূপ মনোভাব এবং কণ্ঠনালির অসুস্থতার দরুণ তাঁর কবিতার ভক্ত শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের পথে প্রতিবন্ধকতা—এর কোনওটাই আপাতদৃষ্টিতে গৌণ নয়’। ১২ এপ্রিল, ১৯৩০, মৃত্যুর দুদিন আগে একটি চিঠি লিখেছিলেন মায়াকোভ্‌স্কি, নাম—‘সকলের উদ্দেশে’। পার্টির স্তালিনীয় শৃঙ্খলা আর রুশ পার্টি আমলাতন্ত্রের চাপে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত ছিলেন তিনি । ওই বার্তার এক জায়গায় লিখেছেন—‘VAPP-সদস্য কমরেডরা, আমাকে কাপুরুষ ভাববেন না’। VAPP হল সারা রাশিয়া প্রলেতারীয় লেখক সমিতি, ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত । চূড়ান্ত কিনারে দাঁড়িয়ে বিপ্লব-পরবর্তী অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি নিজেকে ‘কাপুরুষ নই’—এই ঘোষণা করতে বাধ্য হচ্ছেন । বোঝা যায় নিয়ম, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক নরম্যাটিভিটি তাঁকে কতোখানি মার্জিনাল করে দিয়েছিল, নিজের জীবনের মতোই । ১৪ এপ্রিল সকালে আত্মহত্যার অব্যবহিত আগের মুহূর্ত পর্যন্ত মায়াকোভ্‌স্কির ঘরে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সঙ্গিনী পলোন্‌স্কায়া । তিনি মুহূর্তের জন্য মায়াকোভ্‌স্কিকে ছেড়ে অন্য ঘরে পা রাখার মুহূর্তেই শুনতে পান গুলির আওয়াজ । কবি নিজের দিকেই তাক করেছিলেন রিভলবার । ওইদিনই সকালে দুটো ছোট্ট অসমাপ্ত কবিতা লেখেন মায়াকোভ্‌স্কি । তার একটিতে রয়েছে স্পষ্ট মৃত্যুর ছবি :
 
রাত একটা তো বেজে গেল । এতোক্ষণে পড়েছে ঘুমিয়ে
রাতের আকাশে ছায়াপথ—ওকা নদী—রজতের ধারা
এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম দিয়ে, তোমাকে জাগিয়ে
ব্যতিব্যস্ত করে তোলা—মানেই হয় না, তাই নেই কোনও তারা
যেমন বলা হয়—ঘটনার সব কাল শেষ এইখানে
প্রেমের তরণী চূর্ণ হল নিত্যকার জীবনের ঘাতে
তোমার আমার যতো মান অভিমান মন্দভাগ্য দুঃখতাপ
খতিয়ে দেখার আর নেই কোনও মানে
শোধবোধ হয়ে গেছে জীবনের সাথে ।
চেয়ে দেখ চরাচরে গাঢ় নীরবতা,
রাতের তারারা উপহার ঢেলে দিল আকাশের গায়ে
কতো যুগ, ইতিহাস, ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে কথা বলা
বলা যায়, উঠে এসো, এই তো সময়…*
 
শ্লোগানের আওয়াজে খানখান হয়ে গেল জায়গাটা—“ইনকিলাব জিন্দাবাদ…জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ…মজদুর মুক্তি করে পুকার…ইনকিলাব জিন্দাবাদ…সকল বন্ধ কারখানা অবিলম্বে খুলতে হবে…খুলতে হবে…”। তনুময় টের পায় রাণী রাসমণি রোডের সমাবেশটা ভাঙছে । গত পরশু অফিসের বস যখন ডেকে তার হাতে চাকরি ছাঁটাইয়ের নোটিশ ধরিয়ে দিল, তার প্রথমে কোনও রিয়্যাকশন হয়নি । যেন সে জানতই আজ হোক বা কাল এই ঘটনা নিয়তি-নির্দেশিত হিসেবে আসবেই তার জীবনে । বিগত দু’বছরে কলকাতার পেপারহাউজগুলো একধারসে কর্মী ছাঁটাই করেছে । সবচেয়ে বড়ো হাউস, যাদের হাতে ইংরেজি বাংলা মিলিয়ে প্রায় গোটা দশেক কাগজ আর ম্যাগাজিন, এক লপ্তে কেড়ে নিয়েছে প্রায় সাত-আটশ জনের চাকরি । সেই ধাক্কার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্য মাঝারি আর ছোটো কাগজগুলোও হয় মাইনে কমিয়েছে, ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রেখেছে, নয়তো ছাঁটাই করেছে। আর এই ক্রমাগত বদলে যেতে থাকা উন্নততর প্রযুক্তির সার্কিটে যেভাবে চাকরি বা আর্থিক সংস্থানের সুযোগ কমছে তাতে তনুময়ের মতো স্বল্প দক্ষতার কর্মীর পক্ষে বেশিদিন টিকে থাকা এই বাজারে সত্যিই অসম্ভব । তাও ছোটো কাগজ বলে তার এতোদিন চাকরি বজায় ছিল, এখানে ঢিলেঢালা ব্যাপারটা অনেক বেশি । ওই বিগহাউজে তার মতো দক্ষতার লোকেদের চাকরিই হত না কোনওদিন । সেটা জানতও সে। এবং প্রত্যেকটি ঘটনা, সে মনে করে নিয়তি-নির্দেশিত । শান্তভাবে সে টার্মিনেশনের চিঠি ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয় । বাড়িতে ফেরে । এটা গত পরশুর ঘটনা । মালিনীকে কিছুই বলেনি সে । আর বলার প্রয়োজনও হবে না । মালিনী তাকে বহুদিন ধরেই প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিয়েছে এই বাড়ি থেকে সে কেটে পড়ুক এটাই সে চায় । তাকে এতোটাই তুচ্ছ আর অকিঞ্চিৎকর মনে করে সে, যে, তনুময়কে যে একটা লিগ্যাল সেপারেশনের চিঠি বা অন্য কিছু ধরানোর দরকার আছে সেটাও সে বোধহয় মনে করে না । কারণ, মালিনী জানে ওর মতো পোকামাকড়ের কোনও মতামত বা বক্তব্য থাকতে পারে না । থাকার কথাও নয়…
 
গতকাল রাতে সে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে । খাবার টেবিলে মুখোমুখি হয় মালিনীর । কাল তার শাশুড়ি বাড়িতে ছিল না । তখন চোখমুখ অসম্ভব বিষাদগ্রস্ত ও গর্তে ঢুকে গেছে তার । কিন্তু সেটা খেয়ালও করেনি তার বউ । বরং খাওয়া শেষ হবার আগেই মালিনী খুব ঠাণ্ডা ধাতব স্বরে তাকে বলে এই ফ্ল্যাট ছেড়ে এইবার বেরিয়ে যেতে । তনুময় ক্রমাগত কোণঠাসা হতে হতে সেই মুহূর্তে হিংস্র সাপের মতো হয়ে যায় । খাওয়া তখনও শেষ হয়নি । এঁটো হাতে থাপ্পড় কষিয়ে দেয় মালিনীর গালে । যার কাছ থেকে আজীবন নিরঙ্কুশ বশ্যতা প্রায় কিছু না চেয়েই পেয়ে এসেছে মালিনী সেই চির-দুর্বল পুরুষের এই চকিত-আক্রমণে প্রাথমিক ভাবে হকচকিয়ে যায় সে । এরপর নিজেও খাওয়া ছেড়ে উঠে যায় । একটাও কথা বলে না । প্রায় নিঃশব্দে তনুময়ের স্টোররুমে গিয়ে ঢোকে । হাতের সামনে যা যা পায়, তনুময়ের ল্যাপটপ থেকে শুরু করে বইপত্র সশব্দে ভাঙতে শুরু করে, ছিঁড়ে ফেলে । একটা দুজনের জয়েন্ট ফোটো ফ্রেমে বাঁধানো ছিল । সেটা বিশেষ ভাবে আছড়ে ভাঙে । কাচ ভেঙে ছড়িয়ে দেয় মাটিতে । তনুময়ের যে সামান্য কয়েকটা বই ছিল ওখানে তার মধ্যে কয়েকটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে । ততোক্ষণে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তনুময় । সে নীরবে দেখে যায় এই ধ্বংসলীলা । সে যেন একটা আগে-থেকে-লেখা স্ক্রিপ্টের চিত্রনাট্য পড়ছে । যার সবটুকুই তার জানা । তনুময় ঘরে ঢুকে ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে পড়ে । প্রখর চোখে লক্ষ করে যায় মালিনীকে । যেন কিছুই ঘটেনি এরকম শান্ত, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় মালিনী । বেসিনে মুখ ধোয় । টাওয়েলে হাত-মুখ মোছে । তারপর ব্রাশ করে । এরপর যেটা করে সেটা আরও ভয়ানক । বাথরুম থেকে একবালতি জল টেনে এনে ভাসিয়ে দেয় স্টোররুমের মেঝে । ধীর পায়ে নিজের বেডরুমে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা লক করে দেয় । তনুময় ওঠে । ডাইনিং টেবিল থেকে এঁটো থালা-বাসন তোলে । ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখে অবশিষ্ট খাবার । রান্নাঘরের সিংকের নিচে রেখে দেয় বাসনগুলো । নিজে হাত-মুখ ধুয়ে আবার ফিরে আসে নিজের স্টোররুমে । কোনওক্রমে পায়ের নিচের জল বাঁচিয়ে ভিতরে ঢোকে । ওই ময়লা বিছানার চাদরের উপর বসে থাকে । একটা দুটো বই-ম্যাগাজিন তুলে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করে । অতঃপর শুয়ে পড়ে বিছানায় । এবং কী আশ্চর্য ! তার ঘুমও আসে একটু বাদে !
 
একবার তনুময় ভেবেছিল ওই ডালহৌসি চত্বরেই আর একটা নতুন নিউজপেপারের অফিসে একবার ঢুঁ মারবে । বার্তা বিভাগের প্রধান সইদুল্লা ভাই তার অনেকদিনের চেনা । প্যারাডাইস সিনেমার পিছনের গলিতে ওই পত্রিকার অফিসের কাঠের সিঁড়িতে একবার পা-ও রাখে সে । কিন্তু একতলা ওঠার পরই ফের নেমে আসে রাস্তায় । না । সে আর কারও কাছে কোনও কিছু ভিক্ষে করবে না । বরং এই পৃথিবীর কাছে কোনও কিছু ডিমান্ড না রেখে নিজেকে পুরোপুরি উইথড্র করে নেবার সিদ্ধান্ত সে ততোক্ষণে নিয়ে ফেলেছে । আরও একবার সে ফিরে এসেছে সেই ভলভো বাসস্ট্যান্ডে । চায়ের কাপটা শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ । তনুময় এইবার হাঁটতে শুরু করে । সোজা হেঁটে মেয়ো রোডের এপারের মুখে আসে সে । একটা খোলা পাবলিক ইউরিনালে শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন মনে পেচ্ছাপ করে । তারপর শান্ত ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করে । সে পেরিয়ে যায় একটার পর একটা স্পোর্টস ক্লাবের তাঁবু । পাশ দিয়ে রকেটের মতো ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যায় দামি দেশি-বিদেশি গাড়ি । অন্ধকার রাস্তা আর পাশের নিয়ন আলোর জ্যামিতি তার মাথার ভিতরে একটা মায়ার সূচনা করে । পার্ক স্ট্রিটের মুখে পৌঁছে সে রাস্তা ক্রস করে । জনারণ্য ঠেলে কেন জানে না হাঁটতে থাকে ময়দান মেট্রো স্টেশনের দিকে । একসময় স্টেশনের হাঁ-মুখে ঢুকে যায় সে । প্রথম সিঁড়িটায় থমকে দাঁড়ায় । একটু সময় ভাবে কিছু । পকেট থেকে সস্তা মোবাইল ফোন বের করে । মায়ের মোবাইল নম্বরটা ডায়াল করে । কেউ ধরে না । বাজতে বাজতে একসময় থেমে যায় ডায়ালটোন । মা নিশ্চয়ই ব্যস্ত বা ফোন ফেলে রেখে কোথাও গেছে । বয়স হয়েছে । মোবাইল বাজলেও শুনতে বা বুঝতে পারে না সবসময় । এইবার বরানগরের বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন করে সে । পরপর তিনবার । এবারও ফোন বেজে যায় । এবার নিশ্চিত তনুময় । বাবা-মা কেউই বাড়িতে নেই । হয়তো ওরা বর্ধমানের বাড়িতে গেছে । সে জানে না । তার জানার কথাও নয় । একটা নিশ্চিন্ত শ্বাস ফেলে সে । পরম যত্নে নিজের মোবাইল ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় সে সামনের বাসরাস্তায় । ভেঙে দু’টুকরো হয়ে যায় সেটা । আর একবারের জন্যও পিছনে না ফিরে মেট্রোর গর্ভে প্রবেশ করে সে । ধীর পায়ে হেঁটে আসে নিচে । মেট্রো কার্ড করাই আছে । টিকিট কাটার ঝামেলা নেই । কার্ড পাঞ্চ করে একেবারে প্ল্যাটফর্মের সামনের মুখে পৌঁছে যায় সে । রাত পৌনে দশটা এখন । স্টেশন তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই ফাঁকা । অল্প কিছু লোক আছে অবশ্য । শান্ত ভাবে দমদমগামী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে সে । দূর থেকে ট্রেনের হেডলাইটের মেদুর, উজ্জ্বল আলো দেখা যায়…
 
ট্রেন ছুটে এসে গহ্বরের মধ্যে লাইন বরাবর ছুটে আসে । একরাশ অস্পষ্ট মানুষের হই চই যেন কানে আসে তার । যেন কারা আর্তনাদ করে উঠল । ভয়ে, আতঙ্কে, কেউ কেউ বিরক্তিতেও বটে… সে এইবার নিজেকে পাখির মতো হাল্কা, নির্ভার করে নেয় । নিজেকে ভাসিয়ে দেয় ছুটন্ত আগুয়ান ট্রেনের দিকে । ট্রেন এই আকস্মিক অথচ ইদানীং প্রায়-নিয়মে পরিণত-হওয়া ঘটনাক্রমের সামনে বাধ্যতামূলক ভাবে থমকে যেতে থাকে । ড্রাইভার মেশিনে চাপ দেয় আপ্রাণ…একটা বিকট আওয়াজ আর বিপদঘণ্টির শব্দ কানে আসে । কিন্তু সে, তনুময়, নিজে ততোক্ষণে পাখি হয়ে গেছে…একটা ছোট্ট চড়াই পাখি…
 
তার শরীরটা যখন মেট্রোর চাকায় জড়িয়ে ছেঁচড়ে গর্তের ভিতরে অনেকটা ঢুকে গেছে, তখনও সে যেন অস্ফুট শুনতে পায় মেট্রোঘোষিকার ধাতব, ঠাণ্ডা কণ্ঠ । হ্যাঁ । এটাই তো নিয়ম । প্রত্যেক স্টেশনে এইভাবেই তো ঘোষণা হয় কোথায় এল ট্রেন, তার নাম…এখন সেই একঘেয়ে নিয়মমাফিক কণ্ঠস্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একদল যাত্রীর সমবেত উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর । কিন্তু তাদের সেই সমন্বয়ী কণ্ঠস্বরের কলরোল ছাপিয়ে তনুময়ের থেঁতলে যাওয়া আত্মা শুনতে পায়, ঘোষিকার নিয়মমাফিক সেই নির্দেশিকা, যা শুনে অসতর্ক, অন্যমনস্ক যাত্রীও সিট ছেড়ে উঠে পড়ে । দরজার মুখে এসে দাঁড়ায় । নামার তোড়জোড় করে…
 
“স্টেশন ময়দান…প্ল্যাটফর্ম ডানদিকে…”
 
 
*ঋণ : ‘ভ্লাদিমির মায়াকোভ্‌স্কি ও সের্গেই এসেনিন : দুটি আত্মহত্যা’, অরুণ সোম ।