গল্প-সিন্ধু সোম

Spread This
Sindhu Som

সিন্ধু সোম

শ্রীমালবিজয়
“রাসলীলারম্ভ ও বৃন্দাবনী সারং” (সর্গের অংশবিশেষ)
 
সময়টা শীতকাল। উত্তর থেকে আঁচল ছড়িয়ে ভেসে আসা হাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মুখে ছিটে আসছে রোদ্দুরের টুকরো! দিনের আকাশের তখন বড় দৈন্য দশা। না আছে তার শরতের ছেঁড়াখোঁড়া সফেন মেঘ, না আছে তার বর্ষার গাম্ভীর্য, এমনকি গ্রীষ্মের খর রোদের শেষে হঠাৎ করে ঘনিয়ে আসা কালবৈশাখীর ওয়াদাটুকুও নাই! এরকম একটা নিঃস্ব আকাশের নিচে আমাদের ছাদে দাঁড়িয়ে একদিন আমি রোদ মাখছিলাম। আমার সামনে খুলে রাখা কালিদাসের মেঘদূত। মণিদি বেশ কয়েকদিন ধরে বেপাত্তা। কোথায় গিয়েছে না গিয়েছে কিচ্ছু বলে যায় নাই। প্রথম খুব অভিমান হয়েছিল বটে কিন্তু সে অভিমান বেশিদিন ধোপে টেকে নাই। আর কেউ হলে হয়তো মাথা ঘামানোরও প্রয়োজন হত না, কিন্তু মণিদির ওপরে কাঁহাতক রাগ করে থাকা যায়! আমার মনের রাগ শান্ত হয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লে তার নিচে চাপা পড়া দেখা করার অদম্য ইচ্ছেটা দুরু দুরু পায়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে এবং বেরিয়েই সেটা এত প্রকট হয় আমি দিশেহারার মতো একখানা উপায় খুঁজতে তৎপর হয়ে উঠি। মেঘদূত শুনেছি মায়ের মুখে মুখে। তাই মেঘের ওপর বেশ খানিকটা ভরসা ছিল। কিন্তু এখন বই খুলে দেখি অক্ষরগুলো পিঁপড়ের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে গিয়ে কেবলই মণিদির মুখের আদল তৈরি করে! কাব্য কিছুই মাথায় ঢোকে না! উপরন্তু সে বড় শুখা সময়। কোঁচড়ে তার বৈচিত্র্যের পুঁজি প্রায় শেষ হয়ে এলে গাছেরা পাতা ঝেড়ে ফেলে তালুর শুখা চামড়ার মতো! সেই বৃদ্ধ পাতার কয়েকটা উত্তুরে হাওয়ায় নানা রকম আকার গঠনের ব্যর্থ চেষ্টা করলে আমার মনের জ্বলন কেউ যেন হঠাৎ জল ঢেলে নিভিয়ে দেয় এবং খুব কাছের কেউ আসার না খুশি না কান্না একটা ধূসর অনুভূতিতে আমি আনমনা হয়ে পড়ি। ঠিক এই সময় বাড়ির পিছন দিকে ধুন্দুলের লতায় ঢাকা বিরাট এক অর্জুন গাছের মাথার কাছে ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ করতে করতে অনেক গুলো টিয়া চিৎকার করে উড়তে থাকে। আমার ভারি অবাক বোধ হয়। নিশ্চয় সোনা ঢ্যামনা! পাখির বাচ্চা খেতে উঠেছে! কিন্তু এইসময়? যদিও এই মফস্‌সলের আশেপাশে ছোটো খাটো টিলা থাকায় পাথুরে অঞ্চল বলে সাপখোপের উৎপাত একটু বেশি, কিন্তু শীতকালে সাপটাপ খুব একটা দেখা যায় না। তবে? এ কথা ভাবতে ভাবতেই আমার মাথার পিছন থেকে শরীরের ওপর একটা ছায়া পড়লে আমি উত্তুরে হাওয়ার কাঁপুনি টের পেতে থাকি। সেই অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে দাঁড়ালে দেখি মণিদি নেমে আসছে। ভেজা চুল রোদে মেলে দিয়ে হাওয়ার উপর তার শুকোনোর ভার ছেড়ে দিলে সেই চুলের বাইরের গণ্ডিতে আমার পাল্টা ছায়া পড়ে। আমি নিজের ভিতরটা হাতড়ে দেখি পরতে পরতে সাজিয়ে রাখা নালিশ গুলো অভিমান সমেত এমন মুছে গিয়েছে যে বলার কথার অভাবে আমি মণিদির সামনে তোতলাতে শুরু করি! আমার আটকে যাওয়া জিভ ঠেলে বহু কষ্টে বেরায়, “ক্‌-ক্‌-ক্‌-ক্‌খ্‌-ওন এ-এলে?” মণিদি সেই তোতলানি দেখে ভুরু কুঁচকে বলে, “শালা, তোতলাস কেন রে? আমি কি এতটাই ভূত হয়ে গিয়েছি নাকি এই কদিনে? ওসব ন্যাকামো রাখ। এসেছি কাল রাত্রে!” এই সব সময় আমি মণিদিকে ভয় পাই। খুব ভয়। ভেতরটা সেই ভয়ে পাক দিয়ে দিয়ে অর্জুন গাছের ময়াল সাপটার মতো জড়িয়ে ধরতে থাকলে আমার চোখে মণিদি আরো সুন্দর হয়ে ওঠে! ওর চোখ দুইটা ধীরে ধীরে ভিজে জামরুলের মতো মিঠা হয়ে উঠলে তার আশে পাশে মাছির তীব্রতা নিয়ে আমার দৃষ্টি আটকে যায়। আমি এবার বেশ সপ্রতিভ ভাব এনে জিজ্ঞেস করি, “কোথায় যাওয়া হয়েছিল?” ইশ! আরেকটু হলেই চড় খেয়েছিলুম আর কি সেইদিন মণিদির কাছে। কানটা টেনে ধরে মণিদি বললে, “ছেলেটা জ্যাঠা হয়ে উঠেছে দেখেছো? যাওয়া হয়েছিল কী রে মদন? তুই আমার বাপ?” আশ্চর্য মণিদির কান টেনে ধরায় আমার কিন্তু আরাম লাগে। প্রথম কানে লাগবে ভয় হচ্ছিল তাই মুখ টুখ কুঁচকে ফেলেছিলাম, কিন্তু মণিদির হাতের চামড়া মাংস মন সেই আঙুলের স্পর্শের মধ্যে দিয়ে আমার কানের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়ে বুকে জমা হল ও ঘোঁট পাকিয়ে কলজেটাকে দুমদাম আছাড় মারতে শুরু করলো পাঁজরার দেয়ালে! আমার চোখ দেখে এবার মণিদি হেসে ফেলে! “দেখো, ড্যাবড্যাব করে দেখছে দেখো ধমক খেয়ে, যেন এক্ষুনি খুন করে ফেলবে!” মুখে যাই বলুক মণিদি যে এর মধ্যে একবার শিউরে উঠেছে তা আমি টের পেয়েছি। এবং সে শিউরানি ভয়ের নয়। কান ধরা হাতটা ছাড়িয়ে আমি নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে একটু চাপ দেই, বলি “খাওয়া হয়েছে?” মণিদি এতক্ষণে মিষ্টি হেসে ঘাড় নাড়ে! এই হাসি টুকু চুরি করে আগলে রাখার শখ আমার বহুদিনের। এখনও করে উঠতে পারি নাই! মণিদি সব কথাতেই হাসত কেবল! এমন কি ভীষণ রেগে গিয়ে যখন ভুরু টুরু কুঁচকে ফেলেছে তখনও ওর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি লেগে থাকত। যে হাসিতে হাসি নাই। যে হাসির পরতে পরতে সেই শীতের শুখা। দেখে ভয় হয় এই বুঝি লাগল দাবানল। ওকে আমি কখনও কাঁদতে দেখি নাই। অমানুষিক কষ্ট দেওয়ার পরেও তার ঠোঁট থেকে হাসিটি ঝেড়ে ফেলতে পারে নাই কেউ। চেষ্টা তো কম করে নাই! দুঃখ পেলে মণিদির হাসির রঙ টা আবার বদলে যেত। সে হাসি এত বেশি ভিজে, তাতে নোনা গন্ধ ধরত আমার গায়। হাতটা না ছাড়িয়ে মণিদি নিজের দীর্ঘ ছায়াটা একদিকে ঠেলে সরিয়ে আমার কাছে আসে। চুলে আরেকটা হাত ঢুকিয়ে বিলি কেটে দিলে সেই ছোঁয়ার চিঠি পৌঁছে যায় আমার চোখের নিবিড়তম কোণটিতে, তাতে চোখ গাভীন হয়, তার গভীরতার থই না পেয়ে কিঞ্চিৎ আদর মেশা গলায় অভিযোগ মিশিয়ে মণিদি বলে ওঠে, “তুই কী ছেলে রে, অ্যাঁ? তোর জন্যে কি আমি কোথাও যেতে পারবো না? দু দিন একটু মামাবাড়ি গিয়েছি, মামা খুব অসুস্থ তার খবরটা হট করেই এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে চলে যেতে হয়েছে, আর ছেলে এদিকে মুখ ফুলিয়ে গাল ভারী করে বসে আছে? হ্যাঁ রে তুই বড় হবি না কখনও?” মণিদির ঠোঁটে লেগে থাকা সেই আদরের স্বাদ নেওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা আমার শিরায় শিরায় ঘনিয়ে উঠে বাসা বাঁধে আমার ঠোঁটের চারপাশে। সেই ইচ্ছা কোনো অজ্ঞাত উপায়ে মণিদি ঠিক পড়তে পারে। মণিদি আমার সমস্ত শরীর পড়তে পারত মেঘদূতের মতন! মণিদি কল্পতরু। আমার ঠোঁটে তার নরম তুলতুলে ঠোঁট বেশ খানিকটা ঢুকে এসে বিঁধে থাকলে আমার বাড়তে থাকা নাকের ফুটো দিয়ে ওর গরম নিঃশ্বাস আমার মাথায়, ক্রমে মাথার থেকে বুকে ও শরীরের নিচ অবধি চারিয়ে যায়। আমি মণিদিকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলে মণিদি ঠোঁট সরায়, এবং এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই দৃষ্টির সামনে আমাকে ধাক্কা মেরে আমার শরীর থেকে বার করে দিলে আমি ছাদে বাতাসের মতো ভেসে বেড়াই, বাঁশঝাড়ের ওপরে খানিকটা ঘুরে আসি, অর্জুন গাছে প্রকাণ্ড ময়াল সাপের টিয়াপাখির বাচ্চা খাওয়া দেখি। যষ্ঠিমধু মিঠা সেই রোদ গায়ে মেখে আমি নিজেকে জারিয়ে নিতে থাকি। তখন শীতের জ্বর জ্বর ঘোর লাগা দুপুরের টানে দূরের মাঠ একা শুয়ে থাকে। তার ওপর দিয়ে পায়ে হাঁটা কাঁচা পথ ধরে এক গোয়ালা তার খালি দুধের ক্যানওয়ালা সাইকেল নিয়ে ফিরে আসে গোয়ালাপাড়ার দিকে। তার গায়ে পায়ে গোয়ালের বুনো গন্ধ লেগে থাকে। সেই গন্ধ ভেসে আসে আমার অশরীরী রুহে! সেই কাঁচা মাটির গন্ধ হজম করতে না করতে কতগুলি বক উড়ে যায় দক্ষিণ দিকে, ওই দিকে তালপুকুরের পাশে জলা জায়গায় তারা খাবার খুঁজতে নামবে। আকাশ জোড়া বিশাল শূন্যতার নিচে ঘুরে বেড়িয়ে আমার রুহ সম্পৃক্ততায় ফুলে ফুলে ওঠে এবং আবার এসে প্রবেশ করে মণিদির একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা আমার সেই শরীরের মধ্যে। ততক্ষণে পুরুষাঙ্গ আমার আবার নেতিয়ে পড়েছে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গমের পর। শুধু সেই অর্জুন গাছের ঘনাতে থাকা ছায়ায় তাপমাত্রা কিছুটা পড়ে এলে আমার মনে হয় প্রতিদিন দেখি সেই একই দৃশ্য, অথচ প্রতিটা দিন নতুন, প্রতিদিন ওই একই গোয়ালা দুধ দিতে যায়, অথচ প্রতিদিন সেও নতুন হয়ে ওঠে। এই যে মহীরুহ অর্জুন গাছ, তার বাকলে বাকলে জমে আছে কত বছরের সময়, অথচ রোদ ওঠা, রোদ পড়া, অন্ধকার প্রতি মুহূর্তে এও নতুন হয়ে ওঠে। তবে কি এই এত  নতুনের মধ্যেই পুরোন বাস করে? মানুষ পুরোনো হলে, গাছ পুরোনো হলে, ডাইনীরা পুরোনো হলে তাকে বুড়ো কেন বলে? যে বুড়ো সেও কি রোজ নতুন না? মরে যাওয়ার আগে, মরে যাওয়ার পরে এই নতুনের বিন্দু বিন্দু থাকাটা রয়েই যায়, বয়েই চলে। স্রোত হয়ে ওঠে অজয়েরই মতো! তাই আজকের মণিদিকে এই মুহূর্তে আমার নতুন বোধ হয়। তার গা ঘেঁষে থাকতে ইচ্ছে করে শুধু। ওই ধুন্দুলের লতা যেমন অর্জুন গাছের চকচকে গা বেয়ে থাকে, আমিও মণিদির বুকের কাছে ঘেঁষে আসি। মণিদি আমার চোখের অনুসরণে পেকে ওঠা ধুন্দুল গুলোর দিকে চোখ ফিরালে ওর মুখে অদ্ভুত কচি একটা আনন্দ খেলে যায়। পিছন থেকে আমার গলা জড়িয়ে ঘাড়ে ভর দিয়ে মণিদি আঙুল তুলে বলে, “তাই তো বলি, ছোঁড়া ওদিকে কী দেখে! কত্ত ধুঁদুল পেকেছে রে! পাড়বি? চল পাড়ি।” আমি আপত্তি জানাই, “আরে সাপ উঠেছে গাছটায়! ইয়াব্বড় সোনাঢ্যামনা। সাপের কথায় মণিদি একটু থমকে যায়। তারপর বলে, “তুই দেখেছিস?” রুহ অবস্থায় দেখে ফেলার কথাটা একটা অপরাধ বোধে আমার গলায় এসেও আটকে যায়। জোরে দম টেনে আমি বলি, “না, তবে কত্তগুলো টিয়া উড়ে এলো হঠাৎ! খুব চেঁচাচ্ছিল জানো! সে তো তুমি দেখলে না! নিশ্চয় সাপ উঠেছে!” মণিদি মুখ ঝামটা দেয়, “খুব জানিস! জ্ঞানদা ফার্মেসি একেবারে! চল তো! সাপ কেন, তার বাপ পর্যন্ত ওদিক মাড়াবে না আমাকে দেখে! দুটো পাখি উড়েছে আর ভীতুর ডিম ধরে নিয়েছে সাপ উঠেছে! পাখি যেন এমনি এমনি ওড়ে না!” এই কথা বলতে বলতে মণিদির হ্যাঁচকা টানে আমি প্যারাপিট পেরিয়ে শূন্যে ভেসে পড়ি এবং পালকের গতিতে ধীরে সুস্থে ভেসে যাই অর্জুন গাছটার কাছাকাছি। মণিদি একহাতে আমার হাত ধরে আমাকে ভাসিয়ে রেখে অন্য হাতে ধুন্দুল ছেঁড়ে আর আমাকে ধরায়। সেই শুকনা ধুন্দুলের মেটে রঙের ভিতরে ছেড়ে আসা বীজেরা কোলাহল তুলে একদিক থেকে অন্যদিকে দৌড়ে গেলে আমার ভারি আমোদ হয়। কয়েকটা শুকনো ফল পেড়ে নেওয়ায় জায়গাটা শূন্য হয়ে ওঠে এবং শুধুমাত্র শুকনো চামড়ার নিচে বীজেদের সেই দৌড়াদৌড়ি একরকম যেন নিজেদের অস্তিত্ব বুঝিয়ে দিতে আকুল হয়ে পড়ে! ছাদে ফিরে এসে আমরা শুকনো চামড়া ছাড়িয়ে ছোবড়া বার করি। আমি মণিদিকে বলি, “এতগুলো পাড়লে কেন? কী হবে এতগুলো দিয়ে?” মণিদি একটু কপট বিরক্তিতে বলে, “আর পারি নে বাপু! জেরার পর জেরায় আমাকে নাজেহাল করে দিল ছোঁড়া! কী হবে দেখ না শালা! আগে দেখ! চোখ দুটোকেও একটু কাজ করতে দে! শুধু ঠোঁট দিয়ে কাজ করলে হবে?” বলে অদ্ভুতভাবে একটা চোখ টিপে বড় দেখে একটা শুকনো ছোবড়া তুলে নেয়। তার ভিতরে একটা জামডাল লম্বা করে গেঁথে দিলে সেটা পালতোলা জাহাজ-কাঠামোর আকার পায়! নিজের ওড়নার খানিকটা ছিঁড়ে মণিদি তার পাল করে। তার পর সেই জাহাজ এক হাতে তুলে ধরে মণিদি সারা ছাদে দৌড়ে বেড়ায়। পিছন পিছন দৌড়োই আমি! মণিদির হাত তার মধ্যেই ওঠে নামে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে মণিদির নাকের পাটা ফুলে ওঠে এবং চিৎকার করে মণিদি আমাকে বলে, “দেখ দেখ, এই ঢেউ উঠলো! এই ঢেউ নেমে গেল! প্রচণ্ড হাওয়ায় ফ্রান্সিসের জাহাজ তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। সোনার ঘণ্টা তাকে খুঁজে পেতেই হবে। এই দেখ, এই দেখ!” বলতে বলতে আমি অবাক হয়ে দেখি সেই শীতের দুপুরের উত্তুরে হাওয়া নিজের অঙ্গে পরে পালের কাপড়টা ফুলে উঠেছে খুব। তারপর একসময় মণিদির হাত থেকে হাওয়া কেটে জাহাজটা তিন চারটে পিঁপড়েকে তার পিঠে বসিয়ে তরতর করে উড়ে গেলে আমার গলা থেকে দলা পাকানো নৈরাশ্য দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে পড়ে, “চলে গেল!” আমার হঠাৎ করে ভারি হয়ে আসা গলায় মণিদি আশ্চর্য হয়ে আমার গা ঘেঁষে এলে আমার নাকে তার ঘামের মিঠা বুনো বোল ধরে! মণিদি আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে, “ক্ষ্যাপা ছেলে! কীসের জন্যে মন খারাপ তোর? ওই জাহাজটার জন্যে? ফ্রান্সিসকে ঘরে ফিরতে হবে না? ঘরে মারিয়া অপেক্ষা করছে যে! কয়দিন আমি আসি নি বলে তুই এত অধৈর্য হতে পারিস, আর ফ্রান্সিস কতদিন আগে ঘর থেকে বেরিয়েছে বল তো? এরপর ওরা যাবে তুষারের গুপ্তধন খুঁজতে! থেমে থাকলে ওদের চলে? বল?” মণিদির চুমু আমার চোখে বিশ্বাসের স্বপ্ন হয়ে নেমে এলে আমার মনে হয় ছোবড়ার ওপরে ওগুলো তবে কি ছোট ছোট মানুষই ছিল? আমিই কি তবে ভুল দেখলাম! হয়তো সত্যিই ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে আমাদের দেশে এসেছিল কোনো গুপ্তধন উদ্ধার করতে! আমরা তবে দৈত্য? এ কি দৈত্যের দেশ? কই আগে তো বুঝি নি! হয়তো মণিদিকে ও বলেছিল সাহায্য করার জন্য। মামার বাড়ি থেকে মণিদি কি ফ্রান্সিস কে নিয়ে এসেছিল তবে? এতক্ষণে ওদের ফেরত পাঠিয়ে কথা রাখলো? কিন্তু থেকে যেতে পারতো আর কয়েকদিন! আচ্ছা, আমাকে নিয়ে যেতে পারলো না! ইশশশ! আগে জানলে ফ্রান্সিসকে জানিয়ে রাখতাম আর্জিটা! এত তাড়াতাড়ি চলে গেল? এত বড় একখান অ্যাডভেঞ্চার আমার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার নিঃস্বতায় দুঃখে আমি নিজেকে আর সামলাতে পারি না। মণিদিকে বলে ফেলি, “তুমি আমাকে ছেড়ে কখনও যাবে না তো মণিদি?” আমার এই হঠাৎ ভিজে আসা নরম গলা গলা কথা মণিদির গায়ে যেন মাড়ের মতো ছ্যাঁকা দেয়! ও ওর সেই করুণ হাসিটা হাসে একবার! তারপর আমার ওপর ঝুঁকে গাঢ় করে একটা চুমু খেলে মনে হয় এই চুমুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ভাঁজে ভাঁজে তার অস্ফুট কোনও প্রতিশ্রুতি আছে। আমার কানের ওপর এলোমেলো হয়ে নেমে আসা চুল হাত দিয়ে সরিয়ে খুব কাছ থেকে আমার ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “বেশ! রেখে দে তবে তোর কাছে! তাহলে আর যাবো না কোত্থাও তোকে ছেড়ে!” এই সময়ে আমার আবেগে ভেসে যাওয়ার কথা। আপ্লুত হয়ে বলে ওঠার কথা কিছু একটা অসাধ্য ওয়াদা! কিন্তু কেন জানি না আমার মনের ভেতর আবার একটা ভয় পাক দিতে থাকে। এটা সেই মোহিতদার সঙ্গে কাটানো রাতের মতো নাছোড় একটা ভয়। ভেতর থেকে এ ভয় আমাকে গিলতে থাকে এবং গিলতে গিলতে এক সময় বাইরে এসে পড়লে আমার মনে হয়, কে এ? আমার নীরবতার ভাগ চায় কেন? আমার কী দায় পড়েছে একে নিজের কাছে রাখার! নিজের অস্তিত্ব ভাগ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক আমাকে নিষ্ঠুর করে তুললে আমি ব্যাকুল হয়ে বলে উঠি, “আমার কাছে নিজের জায়গা নাই, তোমায় রাখি তার জায়গা কই?” আশ্চর্য মণিদির রেগে যাওয়া উচিত ছিল। অদ্ভুত সেই অবজ্ঞার হাসিটা দিয়ে আমায় ফালা ফালা করে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ঔচিত্যের পাছায় একটা জোর লাথি কষিয়ে মণিদি এক ফোঁটাও রাগে না। ওর চোখে তখনও সেই করুণ প্রশ্রয়ের হাসি, “বোঝো! ছোঁড়া যেতেও দিব না, থাকতেও দিবি না, আমি তবে করবোটা কী, হ্যাঁ?” বলতে বলতে ওর স্বরগুলো কেমন জড়িয়ে আসে। আগে বুঝি বলেছি আমি ওকে কখনও কাঁদতে দেখি নাই? মিছা কথা! সেই একবার সবার অলক্ষ্যে আমার ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টির সম্মুখে আকুল আকুতি ও প্রত্যাখ্যানের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে সেই মণিদি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল। তখন মুছে আসা চরাচর কুঁদে ফুটিয়ে তোলা একটি মুখের ছায়ায় আমি এক নরম আশ্রয়ের বুকে মাথা গুঁজে বিকৃত ভাঙা গলায় বলি, “তার আমি কী জানি!” প্রাণপণে ঠোঁট দাঁত দিয়ে চাপতে চাপতে মণিদি উত্তর দেয়, “বেশ! যাবো না রে! এইখান থেকে, এই মুহূর্তটা মনে রাখিস, এই মুহূর্তের ,ওড়কে আমি তোর কাছে থেকে যাব। এখান থেকে যাবো না কোত্থাও, কোনদিন! কথা দিলাম! যে যাবে সে আমি না, অন্য কোন মুহূর্ত, অন্য আরো কেউ!”