অনুবাদ-শানু চৌধুরী

Shanu Chowdhury

শানু চৌধুরী

কাহলিল জিব্রানের কিছু রূপক কাহিনি ও বক্তব্যের অনুবাদ
 
পরিচিতি- কাহলিল জিবরান একজন লেবানিজ কবি, লেখক ও চিত্রশিল্পী। তাঁর জন্ম ১৮৮৩ সালের ৬ই জানুয়ারি মুতাশরিফাত নাম লেবাননের একটি জায়গায় এবং মৃত্যু ১০ ই এপ্রিল, ১৯৩১ সালের নিউ ইয়র্কে। তিনি কবিতা ও ছোটগল্পের পাশাপাশি প্যারাবল লিখেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তকে। সিম্বলিস্টদের দ্বারা যেমন রডিন এবং ব্রিটিশ কবি উইলিয়াম ব্লেক তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ধ্রুপদী সাহিত্যের ঘরানা ভেঙে দূরে এসে এক নতুন রোমান্টিক সাহিত্যের সূচনা করেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলি হল, ‘দ্য প্রফেট’, ‘ব্রোকেন উইংস’ প্রভৃতি। আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম তাঁর ” The wanderer, his parables and his sayings” থেকে কয়েকটা প্যারবল অনুবাদের চেষ্টা করেছি।
                                   
 
 ছায়া
জুন মাসের একদিনে একটা ঘাস এক বৃক্ষের ছায়াকে জিজ্ঞেস করলো, ” তুমি এমন নড়ে ওঠো, যে তোমার ছায়া আমার শান্তিকে বিরক্ত করে।”
 
এবং সেই ছায়া তাকে প্রত্যুত্তরে জানায়, ” আমি নই, আমি নই। আকাশের দিকে তাকাও। দ্যাখো ওই উঁচুতে একটা গাছ আছে। যেটা হাওয়ার সাথে সাথে পুবদিক থেকে পশ্চিমদিকে দুলে উঠছে, সূর্য আর পৃথিবীর মাঝে।”
 
এবং সেই ঘাস খুঁজছে তাদের। এবং প্রথমবার সে তখন গাছটিকে দেখল আর মনে মনে বললো, ” কেন তাকাব, ওইখানে আমার চেয়ে কিছু বড় ঘাস জন্ম নিয়েছে।”
এরপর ঘাসটি নিশ্চুপ হয়ে গেল।
 
তিমি এবং প্রজাপতি
 
এক সন্ধ্যায় একজন পুরুষ এবং একজন নারী নিজেদের খুঁজে পেল এক যাত্রীবাহী ঘোড়ার গাড়িতে। তারা আগেও মিলেছিল।
 
পুরুষটি ছিল এক কবি, সে নারীটির পাশে বসে নানান গল্প বলে তাকে খুশি করার চেষ্টা করছিল। যে গল্পগুলোর মধ্যে কিছু তার নিজের বোনা, কিছু তার নিজের নয়।
 
কিন্তু যখন সে নারীটিকে ঘুমোতে যাওয়ার কথা বললো,তখন হঠাৎ ঘোড়ার গাড়িটা ভেঙে পড়লো, এবং সে জেগে ওঠার পর বলল, ” আমি তোমার ‘জোনা ও তিমি’-র গল্পটির অনুভবের প্রশংসা করি।”
 
কবি প্রত্যুত্তরে জানায়, ” কিন্তু মহোদয়া, আমি আপনাকে আমার নিজের গল্পই বলেছিলাম। যেটা প্রজাপতি ও সাদা গোলাপের সম্পর্কে ছিল। একে অপরের আচরণের প্রতি।”
 
ভালবাসার গান
 
এক কবি একবার একটা সুন্দর ভালবাসার গান লিখেছিল। এবং গানটির অনেকগুলো প্রতিলিপি সে তার বন্ধু ও বান্ধবীদের পাঠিয়ে দিয়েছিল। এমনকি এই গান সে এমন একজন রমণীকে পাঠিয়েছিল যার সাথে একবার মাত্র সাক্ষাৎ হয়েছিল তার, যে থাকতো পাহাড়ের ওপারে।
দু’একদিন বাদে একজন বার্তাবাহক সেই কবির কাছে ওই রমণীর চিঠি নিয়ে আসে। সেই চিঠিতে রমণী লিখেছিল, ” আমি তোমাকে আশ্বস্ত করছি যে এই ভালবাসার গানটি আমাকে তীব্রভাবে ছুঁয়ে গেছে। যেটা তুমি আমার জন্য লিখেছ। এখুনি এসো, আমার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করো, এবং আমরা বিবাহের জন্য প্রস্তুত হই।”
 
কবি সেই চিঠির উত্তরে জানায়, ” বন্ধু আমার, এটি নিছক এক ভালবাসার গান, যা কবির হৃদয় থেকে এসেছে। যা সকল পুরুষ ও নারীর জন্য। “
 
তখন রমণীটি আবার তাকে চিঠি লিখে জানায়, ” ভণ্ড ও মিথ্যেবাদী তুমি! আজ থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমি সব কবিদের ঘৃণা করবো তোমার জন্য।”
 
 
নীলনদের ধারের এক সান্ধ্যকালীন স্রোতে একদিন একটা কুমির ও হায়নার দেখা হল এবং দেখা হতেই তারা একে অপরকে অভিবাদন জানালো।
 
হায়নাটি কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞেস করলো ” তোমার দিন আজ কেমন কাটলো?”
 
কুমিরটি তাকে জানায়, ” তার দিনগুলো খারাপ যাচ্ছে। অনেক সময় আমার দুঃখ ও ব্যথার কারণে কাঁদলেও বনের পশুরা সবসময়ই বলে, ‘ এ কুমিরের কান্না। ‘ এবং এই ক্ষতই আমাকে কষ্ট দেয় বারবার। “
 
তারপর হায়নাটি বলে, ” তুমি তোমার দুঃখ ও ব্যথার কথা বলছ, কিন্তু আমার দুঃখটুকু ভাবো একবার, একটু সময়ের জন্য। আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এই পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখেছি। যা অবাক করে এবং চমকে দেয়। নিছক আনন্দের বশে দিনের মতো হেসে ফেলি। তারপরেও জঙ্গলের লোকেরা বলে, ‘ এ হায়নার হাসি।”
 
 
 
 
 
শেয়ার করুন