অমিতাভ প্রহরাজ-এর গল্প

Spread This
Amitava Praharaj

অমিতাভ প্রহরাজ

পুঁচকি গল্প-

“এ্যায় চাঁদ মুঝে আয়া হ্যায় নজর/ এ্যায় রাত যারা থম থমকে গুজর” গানটা প্রচণ্ড জোরে ঘাড়ের কাছটা ঘ্যাঁক করে কামড়ে ধরলো মানুষের। অন্ধকারে ঘাড়টা গায়ের জোরে নাড়িয়ে ছাড়িয়ে নেওয়া মাত্র লাফিয়ে উঠলো আবার “মেরি ভিগি ভিগি সি পলকো মে রহ গ্যায়ি” এবার গলার ওপর, ঠিক টুঁটিটা কামড়ে ধরলো, আবার গায়ের জোরে নিজেকে ছটকা দিয়ে ছাড়ালো মানুষ। অন্ধকারে একবার চোখটা খুলেই গেল বা, কিন্তু অন্ধকারে প্রথম চোখ খুললে চোখ খোলা বোঝা যায় না, যদি আলোর মধ্যে ওখানে চোখ বন্ধ করা হয়ে থাকে। তাই কিছু বুঝতে না পেরে চোখটা বন্ধ করলো, কিন্তু এবার ভিগি ভিগি সি গানটা কেমন যেন আগেরটার মতোই শেষ না হয়ে ক্যাঁই ক্যাঁই ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে মিলিয়ে গেল আরেকটা গানের মধ্যে “মুঝকো পিনা হ্যায় পিনে দো” সেটাও শেষ না হয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ঢুকে গেল আরেকটা গানের পেটে “মুঙডা মুঙডা ম্যায় গুড় কি কলি”। সমস্ত গানটা একটা বিরাট জায়ান্ট ব্ল্যাক প্যান্থারের মতো লাফিয়ে উঠলো মানুষের বুকে, ধপ করে বসলো পাঁজরার ওপরে, মট মট করে ভেঙে গেল মনে হলো দু চারটে হাড়, ফুসফুসের ওপর নেমে এলো ওজন। চারপাশটা এত অন্ধকার কেন? এটা কি তন্ত্রার ফ্লোর, ফাঁকা ধূধূ শুনশান হয়ে আছে, নেশার ঘোরে ফ্লোরের একপাশে কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে কমলা প্যান্ট কালো টি শার্ট আর লাল জুতো পরা একটা লোক। নিজের রাকস্যাকটাকে পাশবালিশের মায়ের মতো জড়িয়ে ধরে। দুজন গার্ড এসে বুকে লাঠির খোঁচা মারছে খুব জোর। তা তন্ত্রা কোথায়? বুকে এত লাগছে কেন? । গানটা প্রচণ্ড জোরে “ইয়াম্মা ইয়াম্মা ইয়াম্মা ইয়াম্মা” হয়ে “এক পল জিন্দেগানি/ এক পল কি হ্যায় জওয়ানি/ হো হো পেয়ার দো/ হো হো হো পেয়ার লো” আর ব্যকগ্রাউন্ডে এক লক্ষ মহিলার একসাথে উলু দেওয়ার আওয়াজ যা এক দানবিক খ্যালখ্যাল করে হাসির মতো লাগছে, ভয়েসগুলো মেটালিক হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে প্রচণ্ড আর একসাথে অনেক লোক কানের কাছে আরো ধাতব তীক্ষ্ণ চীৎকার করছে। ধাতুর স্প্লিন্টারগুলো “এক পল জিন্দেগানি/ (হুলুলুলুলুলুলুলু আওয়াজটা)/ হোঁশ মে রহনে না দো (হি ই ই ই ই ই ইই চীৎকারটা)/ হো ও ও পেয়ার দো/ হো ও ও ও পেয়ার লো” এক একটা লাইন হয়ে ফুসফুসে সটান ঘাপ ঘাপ করে গেঁথে যাচ্ছে। আর হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে বুক থেকে। না প্যান্থারটার পায়ের নখ। মানুষ বুঝতে পারছে না। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না সে, আর সেই লকলকে হাতছানি ওকে ডাকছে “আয় আয়”। তিন থেকে চারবার মাথা তুলে ধপাস করে মাথা ফেলে দিলো কোনো একটা ধাতব জিনিসে, ঠকাস করে লাগলো মাথায়। আবার মাথা তুলে হাতড়ে হাতড়ে খাতা আর পেন নিয়ে কয়েক লাইন লিখে ধপাস করে ফেলে দিলো, মাথাটাও ফেলে দিলো। গানটা “ডিং ডং ডিং এক দো তিন চার পাঁচ ছে সাত আট ন”। গানটা মাধুরি দীক্ষিত হয়ে গেছে তেজাবের। এক পা এগিয়ে এগিয়ে নাচছে মানুষটার পাঁজরভাঙ্গা ফুসফুসের ওপরে, এক এক পায়ের চাপে ফুসফুস দেবে যাচ্ছে কিছুটা কিছুটা। নিঃশ্বাস হারাতে হারাতে মানুষটা দেখতে পেলো একটা বাচ্চা ছেলে পুজো প্যান্ডেলের সামনে নাচছে। এক সাইডে, লুকিয়ে লুকিয়ে, তখন ব্রেকড্যান্সের যুগ। পুঁচকে একটা ছেলে খুব নাচছে। আর এক ঢাল কোঁকড়া চুল, তার মতোই পুঁচকে একটা মেয়ে তাকিয়ে আছে কেমন মুগ্ধ কিন্তু ফাঁকা ফাঁকা চোখে, তার গাল দুটো ঠোঁট দুটো ফোলা ফোলা এইটুকু একবার চোখ পড়তে বুঝতে পারলো। নাচের চোটে সারা গা থেকে ঘাম বেরোচ্ছে। দরদর করে ঘামছে। কানের কাছে মায়ের গলা হঠাৎ কোন ভেতর থেকে গর্জন করে উঠলো “বাবাই, বা-বা-ই”। মেয়েটা তাকিয়ে আছে ওর দিকে হাসি চোখেই, মায়ের হাত যখন কানে এসে পড়েছে পুঁচকে ছেলেটার। পুঁচকে শব্দটাতে……
…মৃত্যুপথযাত্রী শেষ নিঃশ্বাস যেভাবে নেয়, খাবি খেতে খেতে, সেইভাবে একটা শেষ টান দিয়ে গায়ের সমস্ত জোরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ধড়াম করে উঠে বসলো মানুষটা। ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার, শেষ যখন মনে আছে তখন বাইরে ঝমঝমে বৃষ্টি, দরজা জানালা বন্ধ, নেট নেই, তাই ল্যাপটপ আধবন্ধ করে আস্তে আস্তে ডুবে গেছিলো সেই লকলকে হাতছানির মধ্যে। “আয় আয়” বলে ডাকছিলো গত বারো দিন ওষুধ শেষ হয়ে গিয়ে ওষুধ না খাওয়া আর জমে জমে বাড়তে থাকা ডিপ্রেশন, স্ট্রেস। তাকে যে ওষুধভরোসে করেছে ডাক্তার তাকে ভয়ঙ্কর ঘেন্না করে মানুষটা। ওষুধ নেই, টাকা নেই দিনগুলোতে চিরকাল দাঁতে দাঁত চেপে ঘুমহীন দিনগুলো মনের জোরে কাটায়। বুঝতে পারছিলো ঘুমহীনতার সাথে সেই দানবের একটা মস্ত ছোবল আসতে চলেছে যেকোনো দিন। আজকে এইভাবে আসবে বোঝেনি। যখন দুপুরে অদ্ভূত ভাবে নেটটা কেটে গেল…… গতকালের অভিজ্ঞতা থেকে জানে এটা এখন আসবে না। ফোনে ব্যালেন্স নেই। একটা কি দুটো মেসেজ যাবে। আর যাবে না। ফোন করে যেন প্লিজ, চোখ বুজে বেশ কয়েকবার বললো। ভগবানে বিশ্বাস না করলেও খুব বাচ্চাদের মতো মুহূর্তে বিড়বিড় করে “হে ভগবান, হে ভগবান, হে ভগবান” বলে যাওয়া এক বড়ো খিলখিলে অভ্যেস তার কবেকার। গত কয়েকদিন ধরেই হচ্ছে, কেন বলতে পারছে না, কেন চীৎকার করতে পারছে না হাঁউমাঁউ করে। একটা খাঁউ জুড়ে দিলেই অদ্ভূত হয়ে যেত না মিনিং টা, হিহি। এই এক হিহি আছে সম্বল, প্রাণ, বড়ো প্রাণ তার ভেতরে, এত প্রাণ কেন, এত নরম প্রাণ কেন। বোঝে না কিছুতেই, বোঝাতে পারে না। আর যত পারছে না, ততো বলতে গিয়ে কি বলতে কি হয়ে যাচ্ছে, পাগলী বলতে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে পাজী। বোঝো কান্ড এবার!!! কন্ঠস্বর ঢুকছে না বাক্যে বুঝতে পারছে। আর দমবন্ধ হচ্ছে তার ততো। আজকেই, কি বলতে গেছিলো, কি চেয়েছিলো, তার কানামাত্র, টুকুমাত্র বলার পর নেট কেটে গেল। আর বুঝলো কি সর্বনাশ ঘটিলো এবার। আইসবার্গের ওপরের এক অতি ভগ্নাংশ মাত্র বলেছে, এখনো বাকি আছে ওপরের সবটা আর তারপর নীচের আটগুণ বেশী লুকোনো অংশ। কি বলতে চাইছিলো একটি কালো মানুষ? খাতায় লেখা আছে

“কি হচ্ছে বল দেখি পুঁচকি কদিন ধরে? আমি কি বলতে যাচ্ছ তোকে আর কি বলে ফেলছি। এই যেমন কালকে তুই ঠিক ধরেছিলি, মন খারাপ না। কি প্রচণ্ড মোচড় দিয়ে উঠেছিলো তোর ঠোঁট ফেটে গেছে, হাত কেটে গেছে শুনে। এইরকম সময়গুলোতে দূরত্বের কাছে বড়ো অসহায় লাগে। কি ভয়ানক ইচ্ছে করে সমস্ত দিয়ে জড়িয়ে ধরি। একটা অতিশয় পুঁচকে, তার মস্তো ঘাঁটাপ্রবণ মাথা, খালি নিজের কিম্ভূত ভাবনাগুলোকে জড়িয়ে ধরে থাকে, আর শব্দ দেখে, লেখা দেখে চতুর্দিকে। আহা রে। তাকে কেউ কষ্ট দেয় এভাবে? কখনো? পাথর নাকি? ও তো এত জটিলভাবে ভাবতেই পারে না। ওর তো মাথা ঘেঁটে যাবে এইভাবে ভাবতে গেলে আমি জানি। কেন লোকে এত ভুল বুঝে ফেলে। কেন? । ওকে কিম্ভূত ভাবতে বলো, ঠিক পারবে। এত বাচ্চা, বলে কি না ”মাথায় উটের জ্যাম“। আমার সাধ্য থাকলে দুটো প্রকান্ড হাতের তালু দিয়ে ওকে ঘিরে রাখতাম। আর বলতাম, নে তুই যা খুশী যা ইচ্ছে করে বেড়া। যেমন খুশী ধুলোবালি মেখে পাগলী সাজ। ওই কোঁকড়া চুলে যেমন খুশী লণ্ডভণ্ড কর। যখন ঘেঁটে যাবি, আমার কাছে আসিস, আমি ঠিক করে খুলে দেবো, তারপর আবার খেলাধুলো করিস। যা খুশী লিখিস। যা ইচ্ছে তাই কর। ও তো কারোর ক্ষতি করে না, একফোঁটা বাচ্চাটা। কেন ওকে এত লাগবে। আমিও এক মহা গর্দভ। কালকে রাত্রে কথার মাঝখানে বলেছিলো “প্রচুর রক্ত বেরিয়ে ফর্সা হয়ে গেছি। মিছরি ভেবে খেয়ে নিতে পারো”, আমি কোথায় জিজ্ঞেস করতে যাবো যে কি হলো? কেন রক্ত বেরিয়েছে? প্রায় আঁৎকে উঠে, আর্তনাদ করে জিজ্ঞেস করে ফেলবো আর কি। তখন মাথার মধ্যে এক গম্ভীর কন্ঠস্বর বলে উঠলো “পিরিয়ড হয়েছে, এসব কেউ জিজ্ঞেস করে?”!!! বোঝো কান্ড!!!!!
সত্যিইই, আমার মাথায় বুদ্ধির জাহাজ, বুদ্ধির ঢেঁকি,বুদ্ধির কপিকল এই গম্ভীরগলা লোকটাকে আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারি না। তাও মাঝে মাঝে জোর করে নেমে আসে। আহারে, আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম না কেন? কাল যখন অফ হলো আমি ভাবলাম আজকে সর্বস্ব দিয়ে ওর ঘুমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবো। আর লিখে ফেললাম  “তবে বললি কেন?”। আর এই মেসেঞ্জারের এক আশ্চর্য প্রযুক্তিগত মজা আছে। এখানে পাঠানো মেসেজ কারেকসান করা যায় না। ঠিক বলে ফেলা কথার মতো। ভালো, এই টেকনোলজিটা না রাখার টেকনোলজি যার মাথায় এসেছিলো সে জিনিয়াস। তাই লিখে কথা বলার মধ্যে কথা বলা কি পরিমাণ থাকে মস্তো মস্তো হয়ে যে লোকে কথা বলার সাথে গুলিয়েই ফেলে। এইসব হাবিজাবি বকে যাই আমি তোর সাথে অবিরাম। এইসব আবোল তাবোল বলে যেতেই আমি বড্ডো ভালোবাসি তোকে। আর ভালোবাসি তোর কান্ডকারখানা, কিম্ভূত চিন্তা ভাবনা অপলক হয়ে দেখতে। চুপচাপ তাকিয়ে থাকতে তোর দিকে। আর এই চুপচাপ তাকিয়ে থাকা থেকেই এই রিসেন্টের বদভ্যেস জন্ম নিয়েছে। না বলে বসে থাকা। ও ঠিক না বলা কথাগুলো বুঝে নেবে। অলস, ফাঁকিবাজ আমি, দি গ্রেট যাকে বলে। এই করে কি উৎকট গণ্ডগোলটাই পাকিয়ে তুলছি। তুই কথা বলিস যখন আমি ভোম্বলের মত তাকিয়ে থাকি তোর দিকে, সত্যি তাকিয়ে থাকি আর দু চোখ দিয়ে গিলি তোকে। কি যে হয় মনের মধ্যে, যেন উষ্ণ চকোলেটের প্রসবণ গলে গলে পড়ে। বড়ো স্নেহ, ভালোবাসা, আরো কি সব হয়, বলতে পারবো না বাপু। খালি অবাক হয়ে দেখি আর কথা বলতে ভুলে যাই। আর তুই বলিস যখন “কিছু জরুরী কাজ করছো বোধহয়?”। তখন সম্বিত ফেরে। সামনে থাকলে দেখিস, সেইসময় খালি এ্যাঁ এ্যাঁ মানে মানে করতাম, হিহিহিহিহি। এখানে হয় না। দুড়ুম করে কি বলে ফেলি। আর যত গোল বেধে যায়। তাই আজ আমি বসেছি, এক্কেবারে গম্ভীর লোকটাকে গলা টিপে মেরে ফেলে। যা বলতে ইচ্ছে করছে তাই বলবো, বলে যাবো, সকাল থেকে। ওই “তবে” দিয়ে কমেন্ট টা পাঠানোর পরেই, আবার সম্বিত ফিরে এ্যা এ্যাঁ করতে গিয়ে দেখি তুই আমার বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিস। আমি তোর কানে ফিসফিস করে কত্ত সরি বললাম, তুই শুনতে পাস নি। বললাম এই ভোম্বলটাকে ভুল বুঝিস না। ও তোকে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসে। আর ও তপোর চেয়েও মহা ঘাঁটা তুই জানিস না। হিহিহি। ঘুমোচ্ছিলি তাই কানে কানে বলেছি, তুই শুনতে পাস নি। তারপর তোকে জড়িয়ে ধরে খাতা খুলে লিখতে শুরু করেছি। আজকে আমি লিখে পাঠাবোই। পাঠাবোই, পাঠাবোই। নইলে বড্ড আটকে আসছে ভেতরে। কতো কি নিঃশ্বাস জড়িয়ে ধরছে…… আচ্ছা পুঁচকে ভালোবাসির পরের শব্দ কি হয়? কেন হয় না? নিশ্চয়ই হবে, আমি হওয়াবো। কোনো শব্দ পরম হতে পারে না। তার পরেও শব্দ হবে। আমি হওয়াবো তর জন্য একদিন দেখে নিস। যেদিন আমি তোকে ভালোবাসির থেকেও বেশি বলা যাবে এমন বাক্য লিখে ফেলবো। আবিষ্কার করে ফেলবো। তুই থাকলে নিশ্চয়ই পারবো। আমার তবে, টবে গুলো ভুল বুঝিস না। ওসব বহু কিছু কনসেন্ট্রেটেড হয়ে একটা উদ্ভট মেসেজ হয়ে বেরোয়। লালমোহনবাবু একবার ওই ছিন্নমস্তার অভিশাপ বইতে বোধহয়, রাজারাপ্পায় পিকনিকে জল মাটি আকাশ খেলছেন, ফেলুদা বুঝিয়ে দিয়েছে খেলার নিয়ম, যেকোনো একটা, জল, মাটি, আকাশের নধ্যে বললে দশ সেকেন্ডের মধ্যে তার একটা প্রাণীর নাম বলতে হবে। নিলীমা দেবী লালমোহনবাবুর তাকিয়ে বললেন “আকাশ, এক…… দুই…… তিন……”। লালমোহনবাবু “এ্যাঁ এ্যাঁ এ্যাঁ”। “চার……পাঁচ……ছয়”। লালমোহন বাবু বললেন “বেঙুর”। হিহিহিহি। ফেলুদা জানতে চাইলো বেঙুরটা কোন দেশের বা গ্রহের আকাশে ঘুরে বেড়ায়। তাতে লালমোহন বাবু বললেন উনি ব্যাঙ, ইঁদুর আর বেলুন ভেবে রেখেছিলেন, একসাথে বেঙুর বেরিয়েছে। আমার সেই বেঙুর দশা হয়েছে। দেখেছিস, তুই যখন ঘুমোস তখন এই মহা বকবকি অমিটা বেরিয়ে আসে, যে হাবিজাবি কতো কি বকে যায় তার বেস্ট বেস্ট বেস্ট বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে, মানে তুই। এই বেস্ট বেস্ট বেস্ট বেস্ট ফ্রেন্ডের রহস্য তুই আমার হিয়েরোগ্লিফিক নিয়ে লেখাটায় পাবি। হিহিহি”

“দেখ, আবার কি হলো। সকাল থেকে লিখছি তোকে খাতায় কতো কিছু। তুই তিনটে লেখা পাঠালি। পড়ে আমি কি সব গোলমাল হয়ে গেল মাথায়, বিশেষতঃ ওই তিন নম্বর লেখা পড়ে। হবে না? হিহিহি। আমি আছি এরকম লেখার মধ্যে তার মধ্যে হঠাৎ ওরকম বিকট রেগে একটা লেখা, তাতে আবার হোয়াটস্যাপ বেবস এইসব কি আছে। তুই বোধহয় জানিস না, আমাকে যারা বেবী ডাকে তারা ঘনিষ্ঠরা বেবস বলে ডাকে, কেতা আর কি। বেবী নামটা আমি ব্যবহার করি না দেখে থাকবি বহুদিন হলো। কারন আছে, ওই শব্দটা আমাকে অনন্যার দিনগুলোর একটা তেতো সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। অনন্যাও বেবস বলতো। তীর্থ মানে সোমতীর্থও বেবস বলে। ফলে আমি এই লেখার থেকে তোর ওই লেখাটা পড়ে দুড়ুম করে কোথায় গিয়ে পড়লাম, কোন তাঞ্জাহার থেকে তাকলামাকান, আর আমার সব ঘেঁটে ঘ হয়ে গেল। আর তোকে কি সব কিম্ভূত কিমাকার লিখে ফেললাম। তার উত্তরে তুইও ভারি কিম্ভূত কি সব লিখলি। “এখানে দিতাম না”। শুনে আমার কেমন বেড়েমজা হলো। তকে বলতে গেলাম, নিজেকে বেশ পত্রিকা পত্রিকা লাগছে, তুই আমাকে লেখা দিস নাকি, তারপর ভাবলাম এইরে মজাটা যদি না বোঝানো যায়, বড়ো মুশকিল হবে। তারপর লিখতে গেলাম, নিজেকে বেশ বাছা বাছা লাগছে। হিহিহিহি। বাচ্ছা বাচ্ছা টু বাছা বাছা। তারপর ভাবলাম এটাও যদি না বোঝানো যায় কন্ঠস্বর তাহলে অন্য কিছু হয়ে যেতে পারে। এই এক মহা সমস্যা হচ্ছে আমার। তারপর তো একটা কি বলে ফেললাম আর নেট কেটে গেল। ফোনে ব্যালেন্সও নেই। তুইও মহা বিচ্ছু, আমাকে ফোন করবি না, আমি জানি। বাকিটা বোঝাবো কি করে এবার? হলো তো মহারাজ অমি, তোমার এই বেশী ভাবনা চিন্তার ফসল। এখন পুঁচকেটাকে যতক্ষন না তুমি বলছো বাকিটুকু, ও কিসব ভাববে আর অদ্ভুত গোমড়া গোমড়া কিছু রেগে পাঠাবে। মহাবাচ্চা তো ও, কেন বোঝো না, বারবার তুমি ওকে কষ্ট দাও এইসব আধিঅধুরি হরকৎ করে। নিজেকে বলতে পারো না, অপদার্থ একটা। ঠিক করে কথাও বলতে শেখো নি। তোমাকে ঠাস ঠাস করে থাপ্পড় মারতে হয়………”

এইরকম অবস্থাতে, এমনিতে মানুষটার দশা তো এক ডবল এ্যাটলাসের মতো। মানে একদিকে যুদ্ধের পৃথিবী আরেকদিকে প্রেমের কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধ এইখানে শহরে। একটা মানুষ যার সাথে দূরত্ব চরমে পৌঁছেছে তার সাথে দাঁতে দাঁত চেপে সময়ের পর সময় কাটাতে হচ্ছে। আর সবচেয়ে গন্ডগোল হচ্ছে সে যখন অতিরিক্ত মিষ্টি হয়ে কাছে আসছে, পুজোর জামাকাপড় কিনে আনছে। এনে দেখাচ্ছে। ওর দেখতে ইচ্ছে করছে না, মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলে ফেলছে, “আমাকে দেখাচ্ছিস কেন?” “তুই দেখবি না, এত কষ্ট করে এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ব্যথা করে কিনে আনলাম”। তখন বিরক্তি প্রকাশের জন্য ভারি দুঃখবোধ হচ্ছে। আর তখন একটা ফাঁস নেমে এসে এঁটে বসছে গলায় আর সেই ফাঁসের হা হা হা হাসি শুনতে পাচ্ছে অদৃশ্যে। চীৎকার করতে ইচ্ছে করে। বাড়ি থেকে ফোন আসছে ধরছে না। মায়ের ফোন ধরছে না। কি ডিপ্রেশান, কি ডিপ্রেশান, কি চেপে ধয়ার দেওয়াল চারদিক থেকে। আর পারি না মাগো। অর্ঘ্য ফোন করছে, ধরছে না, প্রসেনজিৎ, ধরলো না। কেন পড়ে আছো তুমি কলকাতায়? কেন? কেন? যুদ্ধ করতে। সেই যুদ্ধ যে যুদ্ধ বহুকাল আগে শুরু হয়েছিলো। কলকাতার থেকে পালাবো না, অভাব থেকে পালাবো না, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লিখে তারপর বীরের মতো চলে যাবো। আর একটা কারন, একের পর এক মানুষের কথা দিয়ে কথা না রাখা। ছোটো ছোটো কথার ওপর কতো কি দাঁড়িয়ে থাকে, তারা বোঝে না এই মানুষটা কথাকে কথা বলে দেখে না, জ্যান্ত বলে দেখে। সে ভাবতে পারে না, কারোর উচ্ছ্বাস বানানো, কারোর আবেগ বানানো। প্রতিবার তাই হয়। মুখ থুবড়ে পড়ে, ফের ওঠে। ওর সম্বল আছে একটা পুঁচকি, যার সাথে যতক্ষণ থাকে কি পরিপূর্ণ আনন্দরূপ এক সময়!! আহা, ওই পুঁচকে মানুষটা কোনো ভান জানে না, কোনো নকল জানেই না, এত পবিত্র আর অদ্ভূত নরম একটা মানুষ, যাকে জড়িয়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে হয় সারাক্ষণ। পারে না, এই এদিকের উৎপাতের জন্য। নিজের ওপর রাগ হয় খুব, চেঁচিয়ে ঘুঁষি মেরে দেওয়াল ফাটিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। কাল ও টাকা তুলবে, সোমবার, আর পরশু পালাবে সেই বাড়ির কাছে, সমুদ্রের ধারে, আর পারছে না, ওই পুঁচকিটাকে বগলদাবা করে পালাবে সমুদ্রের ধারে। খালি অপেক্ষা করছে, সময় গুনছে তার। এইসব মানুষ তার জন্য নয়, পুঁচকেটার জন্যও নয়। এদের জন্য, এদের পাল্লায় পড়ে ওর মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে, কুলোতে পারছে না নিজেকে, আর পুঁচকেটাকে কি সব বলে কষ্ট দিয়ে ফেলছে। সেটা ভাবলেই ওর এক ছুট্টে এই পাঁচতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে হাউমাউ করে উঠতে ইচ্ছে করে। কেন? কেন? কেন? নিজেকে এক কথা বারবার বলে বলে মাথা ঝাঁকায় খালি। উত্তর পায় না, আরো ঝাঁকায়, উত্তর পায় না, আরো, আরো। তুই কোথায়? লাস্টে ভাঙা ভাঙা গলায় বলে নেটকাটা ল্যাপটপে মাথা দিয়ে শুয়ে পরে, আর সেই দানবীয় ডিপ্রেশান এসে ছোবলটা মারে মোক্ষম। এরকম ছোবলে বহুবার মরতে বসেছিলো সে আগে, জানে এর ক্ষমতা। এখন জাস্ট ওকে শুইয়ে দেবে আর দুঃস্বপ্নের মতো ঘোরে পাঠিয়ে দেবে। একের পর এক দুঃস্বপ্ন আছড়ে পড়বে, একের পর এক অট্টহাসি, খ্যালখ্যালে গলা, নকল মানুষ। আর ছটফট করবে ও বিছানায়, চাদর টেনে নেবে, খুব শীত করবে। খুউউব খুউউউব। উষ্ণতার স্পর্শ ও কতোদিন পায় নি। কবেকার পুরোনো কথা মনে পড়ে। ও কোন মানুষ, লাজুক লটারিদের ডায়েরী ধরে আছে। ভিক্টোরিয়া। “আমার ওরাল ভালো লাগে, এই কথাটা কি একটা বাঙ্গালী শীত নির্দেশ করে?”। প্রথম লাইন। “তোমার ওরাল ভালো লাগে?” বলে কোলের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে দেয় কেউ। গা বেয়ে শিহরণ ওঠে। কোমরের নীচে কোনো একটা অংশে উষ্ণ মুখের মধ্যে ঢুকে যায়। খুব শিউরে ওঠে সে। খানিকক্ষণ বাদে পারে না, সরিয়ে দিতে যায় “কি করছো?”, “আমি চলে আসবো তো”, “এসো, আমি নিয়ে নেবো”। মিষ্টি হেসে আবার একটা মুখ কোলে ডুবে যায় আর সারা শরীর শিউরে ওঠে। কেঁপে কেঁপে কি যেন বেরিয়ে যায় অনেক কিছু। কোথায় চলে যাচ্ছে তারা। কোথায় কোথায় কোথায়। কোনো মুখ ভাসে না সামনে। এক অজানা হাসি, মুখ থাকে না, চেনা? জানে না। ঘুমের মধ্যে নয়, ঘোরের মধ্যে, চাদরের মধ্যে আবার কেঁপে ঊঠে “কেন?কেন?কেন? কেন?” কেন এ্যাটাক চালু হয়। ঝম ঝমে বৃষ্টি, ঘরের দরজা জানালা বন্ধ কষে। একটুও হাওয়া ঢুকছে না। মাথা তুলে দেখে মাথা তুলতে পারছে না। অন্ধকার আঁধার হয়ে আরেক অন্ধকারে কনভার্ট হয়, মাথা ঘুরিয়ে দেখে নেট এসেছে কি না, আসে নি। মাথা ঘুরিয়ে সিগারেট ধরায় শুয়ে শুয়ে, টানে কয়েক টান, এ্যাস্ট্রেতে ফেলে রাখে, আবার ঘোরে তলিয়ে যায়…… ঘরে কার্বন মনোক্সাইড বাড়তে থাকে, এ্যাশট্রেতে সিগারেটটা জ্বলতে থাকে বদ্ধ ঘরে বলে।
তারপর গানের কামড়, বুকের ওপর ব্ল্যাক প্যান্থার। ফুসফুস ফেটে যাবে যেন। মাথায় চাপ চাপ যন্ত্রণা। ডিপ্রেশানের প্রবল কামড়ে তবু নড়তে পারে না। এরকম অবস্থা থেকে বহুবার হাসপাতালে ভর্ত্তি করার মতো অবস্থা হয়েছে। বহুবার দমবন্ধ হয়ে মরে যাবার মতো। গানের কামড় চলে। তারপর ওই ডিং ডং ডিং, এক দো তিন। আর পুজো প্যান্ডেলের সামনে নাচ আর একটা পুঁচকি হাসি মুখে দেখছে খাঁ খাঁ চোখে।
একটা পুঁচকি কে ধরে ডিপ্রেশানের দেওয়াল ফাটিয়ে চৌচির করে জেগে দাঁড়িয়ে পড়ে মানুষটা, জানলা খোলে, গণেশ চতুর্থীর লাইভ ডিজে চলছে। একটা পুঁচকিকে ধরে দেওয়াল ফাটিয়ে বহুদিন বাদে নিঃশ্বাস নেয় মানুষটা, আলো জ্বালে, লিখতে বসে। এভাবেই মানুষে জীবন ফিরে আসে। এক দুই তিনের মতো সরল কোনো পুঁচকির কিম্ভূত নরম হাতদুটো মুঠোর মধ্যে ধরে। এভাবেই লেখায় ফিরে আসে মানুষটা ফের।
আর একটা ফেরার সত্যি গল্প লেখা হয়। যাতে কিচ্ছু নেই, কিছুই নেই। জাস্ট একটা খামোখাঅপূর্ব নির্মাণ। একটা পুঁচকির হাত ধরে দেওয়াল ফাটিয়ে নিঃশ্বাস নিলো একটা মানুষ। এই একটা ছোট্ট ঘটনা বলার শুধু। একটা শুধু একত্র হিহি, একের ঘাড়ে অন্য।