মৃণাল শতপথী-র গল্প

Spread This
Mrinal Satpathy

মৃণাল শতপথী

বিভুঁই

হল্ট স্টেশন। বাস রাস্তা থেকে নেমে অনেকটা হেঁটে, লাল ধুলো ওড়া কাঁকুরে রাস্তা। সারাদিন ধুলো ওড়ে দুধারে বাঁশের বনে। গাঢ় সবুজ বাঁশপাতায় জমে লাল মিহি ধুলোর স্তর। সারারাত হিমে ধুয়ে সকালের আলোয় সদ্যস্নাত, স্নিগ্ধ হয় পাতারা। ডগা গড়িয়ে তখনো ফোঁটা ফোঁটা হিম। আবার বিকেলে ফেরার সময় পাতার গায়ে বসে থাকা মিহি ধুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। রোজ এমন ইচ্ছে হয় না সুপর্ণার। যেদিন হাঁটতে হয়, সেদিন হনহনিয়ে হাঁটে স্টেশনের দিকে আর কবজিতে বাঁধা পানপাতাকৃতি ঘড়ির ছোট্ট নীল ডায়ালটা দেখে ঘন ঘন। পাঁচটা পনেরোর লোকালটা মিস হয়ে গেলে পরের ট্রেন এই হল্টে দাঁড়াবে সন্ধে সাতটার পর, বাড়ি পৌঁছতে আটটা বেজে যায়। সুবল রোজ সাইকেল নিয়ে থাকে না। লাল মোরামের ধারে ঘুপচি চায়ের দোকান। বাঁশের বেঞ্চিতে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে সুবল। তেলচিট ফুলপ্যান্ট, ফিকে রঙ গোলগলা গেঞ্জি। একধারে স্ট্যান্ড করা সাইকেল। আড্ডা দিতে আসে এখানে, হরিদার চিনি বেশি দেওয়া চা খায় আর আজেবাজে গল্প করে। রোজ বাস থেকে নেমে যখন একদল ছুটতে থাকে ট্রেন ধরবে বলে, চায়ে চুমুক দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে তাদের দেখে। তবে কোন বৃদ্ধ মানুষ, একা মহিলা দেখলে সাইকেলে বসিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসে। প্রথম যেবার তাকে হনহনিয়ে যেতে দেখে হাঁক দিয়েছিল, দিদিমণি,ও দিদিমণি! ফিরে তাকায়নি। উঠতি ছেলেছোকরা সব, গ্রামের স্কুলের নতুন শিক্ষিকাকেও আওয়াজ দিতে হবে! নাছোড় ছেলেটি সাইকেল নিয়ে পিছু ধাওয়া করছে দেখে সে চোখ পাকিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। থতমত খেয়ে বলেছে, চাপুন, স্টেশন পৌঁছে দিয়ে আসবো! গলা গম্ভীর করে বলেছে, না! ট্রেন মিস করেছে সেদিন। প্রবল বৃষ্টিতে পরের ট্রেন এসেছে ঘণ্টাখানেক লেটে। বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ঢুকতে রাত ন’টা। পরে তাড়া থাকলেও ছেলেটি আর ডাকে না। পেছনে কাউকে বসিয়ে তার পাশ দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেছে।
সেবার ফোনে খবর এল মা হাসপাতালে। স্কুল থেকে বেরিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটেছে। দশ মিনিটে একটা ট্রেন ঢুকবে। কী ভেবে ছেলেটা সাইকেল নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, তফাত রেখে চালিয়ে আসে। সুপর্ণা দাঁড়িয়ে পড়ে। ছেলেটির ভড়কে যাওয়া চোখে ধাতানি খাওয়ার আশঙ্কা। সুপর্ণা শুকনো হেসে চেপে বসে। ঝড়ের গতিতে চালিয়ে, তাকে ট্রেন ধরিয়ে হাঁফাতে থাকে হ্যা হ্যা করে।
‘তুমি সেদিন জানতে আমার খুব তাড়া ছিল?’
‘আমি লোকের হাঁটা দেখেই বুঝতে পারি ।’

২।
কর্কশ চেহারার স্টেশন মাস্টারনী খয়েরি রঙের কাপড় পরে রোজ সবুজ পতাকা নাড়ে। সন্ধে নামলে টর্চের সবুজ আলো। দু’একটা লোকাল থামে অনিচ্ছে নিয়ে। দু’চারজন যাত্রী। টিকিট পাঞ্চিং মেসিনে ঘটাং শব্দ হয়। সরু নোয়া পরা হাত বাড়িয়ে ধরে হলদে টিকিট। ঘাস গজানো মাটির প্লাটফর্মে জং ধরা লোহার বেঞ্চি, ট্রেনের অপেক্ষায় সেখানে বসে থাকতে থাকতে দেখে সুপর্ণা । সে এসে পৌঁছবার আগেই একটা পাগল বসে থাকে আর মহাবিশ্বকে গাল দেয়। ছাতিম গাছটার নিচে ঐ লোহার বেঞ্চির জায়গাটা সুপর্ণার বড় প্রিয়। একা বসে থেকে রেললাইনের ওপারে ফাঁকা, ধূসর জমিগুলোর দিকে চেয়ে থাকতে ভালো লাগে। নড়ায় ধরানো আগুনের ধোঁয়া সন্ধে নামলে জমির ওপর স্থির ভেসে থাকে। বেঞ্চিটাতে কেউ বসে থাকলে অসহায়ের মত তাকায়। পাগলটা কী ভাবে কে জানে। বকবক করতে করতে উঠে চলে যায়। রেললাইনের ফাঁক থেকে কাগজ কুড়োয়, ডাবের খোলা। ছেঁড়া চটের বস্তাতে সব ভরে ভরে রাখে, থলে ভরে উঠলেই একধারে সব ঢেলে দিয়ে চলে যায়। পরেরদিন আবার সেগুলোই কুড়োতে থাকে। ট্রেনের বাঁশি শোনা যায়। পাগলটা লাইন থেকে নড়ে না। ট্রেন কাছে চলে আসে, নড়ে না তবু । তীব্র উৎকণ্ঠায় সুপর্ণা উঠে দাঁড়ায়। পাগলটার দিকে তাকিয়ে নিরাসক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে স্টেশন মাস্টারনী। তাকে কখনো কথা বলতে দেখেনি। সবার দিকে এমন ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকে। ঠিক শেষ মুহূর্তে পাগলটা লাইন থেকে নেমে দাঁড়ায় আর ট্রেনটাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে।
আর এক খর্বাকৃতি বোবা বাঁশিওয়ালা। কোনদিন বেঞ্চিতে বসে না। প্লাটফর্মের ঘাসে উবু হয়ে বাঁশি বাজায়। গলায় সস্তা উলের মাফলার জড়িয়ে। কিছুজন জমলে তার ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বাজিয়ে চলে একের পর এক পুরনো হিন্দি, বাংলা গানের সুর। তার শ্রোতা আমলকি-ঝাল মটরের ফেরিওয়ালা, শালঝাঁটির বোঝা মাথায় দূর গ্রামের বউ, শীত-খসলা শাক আর লাল মুলোর ঝুড়ি মাথায় প্রৌঢ়া। লোকাল থেকে নেমে বাড়ি ফেরার পথে তারা জিরোয় । বাঁশি শোনে । জীর্ণ চাদর গায়ে বউটি ময়লা কাপড়ের খুঁট খুলে ততোধিক ময়লা পাঁচটাকার নোট রাখে। নোটের ওপর একটা দুটো কয়েন রাখে কেউ কেউ। সন্ধে নামে, সে থামে না। ফাঁকা মাটির প্লাটফর্মে বসে বাজিয়ে চলে। কাশ্মীরি শালটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে বসে সুপর্ণা শুনতে শুনতে আনমনা হয়।

৩।
‘মাঝে মাঝে কোথায় বেপাত্তা হয়ে যাও সুবল?’
‘কাজে যাই দিদিমণি।’
‘রোজ তো যাও না?’
‘আমার ইচ্ছে হলে যাই। টাকার দরকার পড়ে গেলে যাই। সাইকেল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে টাউন চলে যাই। নতুন বাড়ি উঠছে, মশলার কড়াই বয়ে দিলাম, ঘুরতে ঘুরতে কারও জমি পড়ল, ধান কাটা চলছে, লোক দরকার, হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে কাস্তে হাতে নেমে পড়লাম । ভেজা খড়ের গন্ধ নিয়েছেন?
‘না’
‘ধান কাটার ঘস ঘস শব্দ শুনেছেন?’
‘না ।’
‘নেশার মত লাগে। যেতে যেতে পাথর খাদান পড়ল, নেমে পড়ে ক’টা বোল্ডার ভেঙে দিলাম। পাথরের খাঁজে বারুদ গুঁজে পাথর ফাটানো দেখেছেন?’
‘না ।’
‘বারুদে আগুন দিয়েই সব ছুট এদিক ওদিক। এক দুই তিন চার পাঁচ, গুমগুম শব্দে মাটি কেঁপে ওঠে। পোড়া বারুদের ধোঁয়া আর গন্ধের মধ্যে দেখবেন মস্ত মস্ত চাঁই মাটি ফাটিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।’
যেবার তাড়া থাকে না তেমন, হাঁটতে ভালো লাগে সুপর্ণার। একটা ছোট পুল পেরোতে হয়, তার নিচ দিয়ে কুলকুল করে জল বয়ে যাবার শব্দ। জলের বাড়া কমায় শব্দও নানা সুর লয়ে ওঠে নামে। একটু দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনে। একমুখ হাসি নিয়ে পেরিয়ে যায় সুবল। তার ক্যারিয়ারে বসা কোনো বৃদ্ধ একপাশে পা ঝুলিয়ে বসে হাতের তালুতে খৈনি ডলতে ডলতে চলে যাচ্ছে। কোনদিন ঝাঁকা ধরে বসা বৃদ্ধা। তার সাইকেলের রড, ক্যারিয়ার ভর্তি করে একদঙ্গল প্রাইমারির ছেলেমেয়ে হই হই করতে করতে চলে যায় একেকদিন। টাকা দিতে চেয়েছে সুপর্ণা, মিষ্টি খেয়ো। স্কুল ছাত্রের মত দু কান ধরেছে সুবল ।
‘টাকা লাগে তো তোমার। এই যে লোকজনকে পৌঁছে দিচ্ছ, কিছু কিছু পয়সা নিলে পারো, একটা রোজগার হয়ে যায় ।’
‘টাইম পাস দিদিমণি। আনন্দ লাগে। যেতে আসতে দুটো সুখ দুঃখের কথা বলি মানুষজনের সাথে। মনটা ভালো থাকে। নতুন মানুষ হলে নতুন কথা, নতুন গল্প।’

৪।
নির্জন স্টেশন-কাউন্টারে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পাগল। কেউ টিকিট দেয় না তাকে। সে চটের থলে থেকে নোংরা ছেঁড়া কাগজ বের করে এগিয়ে ধরে টাকার মতো। জোরে জোরে তারের জালে চাপড় মারে। স্টেশন মাস্টারনী গম্ভীর মুখে এসে দাঁড়ালে পালায়। বাঁশিওয়ালা সুর তুললেই কাগজে হিসেব লিখতে বসে মাস্টারনী। লিখতে লিখতে থামে, সুপর্ণার কেবল মনে হয়, মহিলা বাঁশি শুনছে! তারপর লাল আর সবুজ দুটো পতাকা হাতে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় । রাজধানী এক্সপ্রেস ছুটে যায় । দুরন্ত গতি আর গর্জনে ঢাকা পড়ে যায় সুর। পতাকা হাতে স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে তার মুখে চাপা ক্রোধ আর হিংস্রতা ফুটে উঠতে দেখেছে সুপর্ণা। বাঁশি ফেলে বসে থাকে ঝাঁকড়া চুলের মাহাত যুবক। তারপর স্টেশন মাস্টারনীর কাছে জল চায় ইশারায়। না দিলে রেগে ওঠে। কথা বলতে চায় প্রাণপণে। গলার শিরা ফুলে ওঠে, নাক ফুঁসতে থাকে, বলতে না পারার যন্ত্রণায় শরীরের সমস্ত রক্ত জমা হয় মুখে। নির্লিপ্ত মহিলা হিসেব লিখে যায় একমনে। গুম মেরে মাটিতেই বসে পড়ে যুবক। সুপর্ণা ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করতে গিয়েও থমকে যায়। প্লাস্টিকের মগ থেকে জল ঢেলে দিচ্ছে মাস্টারনী, শরীর অল্প ঝুঁকিয়ে দুই হাত আঁজলা করে সর্বস্ব দিয়ে গ্রহণ করছে বাঁশিওয়ালা ।

৫।
একেকটা মানুষ একেকরকম হাঁটে। কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। কে আনন্দে আছে, কে দুঃখে, কার খুব জলদি, কার আবার ঘরে ফিরবার ইচ্ছে নেই মোটেই, সব এই স্টেশনের দিকে হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারে সুবল। তবে সবচেয়ে বোঝে দিদিমণিকে। আর সেটা মিলে গেলে কি খুশি যে লাগে!
‘কী দেখছো সুবল?’
‘আপনার হাতের ঘড়িটা, কি সুন্দর ছোট আর নীল ।’
‘আর হরিদার চা কেমন?’
‘গরম মিষ্টি জল!’
সুপর্ণা ক্যারিয়ারের একধারে পা ঝুলিয়ে যেতে যেতে ঝুঁকে থাকা বাঁশপাতার গোছা দেখে। ঝাঁকা মাথায় হেঁটে যাচ্ছে মেয়েরা স্টেশনের দিকে। তাদের দেখে খুশি খুশি মনে হয়। হাঁটা দেখে মানুষের মন বোঝা যায়? সুবল নাকি পারে। আচ্ছা বিষণ্ণ মানুষের হেঁটে যাওয়া কেমন, যার খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে সে কেমন পা ফেলবে?
‘বাড়িতে কে আছে তোমার সুবল?’
‘মা আছে দিদিমণি। মায়ের আমার বড় দেমাক, ছেলের রোজগার খাবে না। পাটশাক,মেথি শাক, কচু, ওল, পাতিলেবু নিয়ে মঙ্গলবারের হাটে বসে ।’
হরিদার খুব ইচ্ছে দিদিমনিকে চা খাওয়ায় । সুপর্ণা মাথা নেড়ে না বলে । দিদিমণির যেদিন হাঁটার মন হয়, সুবল আর হরি তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে । হরিদা খুনসুটি করে । দিদিমণিকে সাইকেলে বসিয়ে নিয়ে যাওয়ার মত কেমন ভাগ্য সুবলের! লাজুক হাসে সুবল । হরিদা বলে,
‘দিদিমণি এখনও বিয়ে করেনি কেন বলত?’
‘দিদিমণির মা খুব ভোগে । তাকে দেখবে কে? দিদিমণি তাই বিয়ে করবে না বলেছে ।’
কতজনকেই তো সুবল পেছনে বসিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু দিদিমণি বসলে তার গা থেকে আসা চমৎকার একটা গন্ধ নিয়ে সে সাইকেল চালায়। ঐ গুছিয়ে শাড়ি পরা, পরিপাটি বাঁধা চুল, কাঁধে চামড়ার সাইড ব্যাগ। পাতার মত কানের লতিতে আটকানো দুল, একেকদিন একেকরকম ! সাইকেলের দুলুনিতে সেগুলি নড়েচড়ে, বাতাসে ধাক্কা খেতে খেতে শোনা যায় না এমন সূক্ষ্ম ঝুন ঝুন, সুবল কান পেতে থাকে …।ইচ্ছে করেছে কতবার, মহাপুরুষের মেলায় ঘুরতে ঘুরতে কাঁচের শোকেসে সাজানো হরেক ঝুমকো, দুল দেখে কিনতে ইচ্ছে হয়েছে,পারেনি, কীসের আড়ষ্টতা, সিরসিরে ভয় যেন আচ্ছন্ন করে থাকে । অথচ দিদিমণি কেমন নির্দ্বিধায় বলেছে, ‘কি নোংরা করে রাখো প্যান্ট গেঞ্জি, দিনের পর দিন একটাই পরে থাকো!’আর কত সহজে পুজোয় জামা প্যান্ট দিয়েছে, না করতে পারেনি সুবল । পুজোর ছুটির পর দিদিমণি যখন প্রথমদিন স্কুলে এল, নতুন জামা প্যান্ট পরে, টেরি বাগিয়ে সে যখন সাইকেলটা নিয়ে সামনে দাঁড়ায়, দিদিমণি চোখ বড় আর হাঁ মুখ করে দেখেছে ! লজ্জা পেয়েছে সুবল । আর কথা । দিদিমণির কত যে কথা, সব সুবলকেই তো বলা চাই ।

৬।
বর্ষা নামে। একেকদিন স্কুল আসতে পারে না দিদিমণি । বাঁশের বেঞ্চিতে পা ঝুলিয়ে সুবল দূরের বাবলা গাছগুলোর ভেজা দেখে । হরিদার ঘুপচি চায়ের দোকানের পচা চাল বেয়ে জল ঝরে অবিরাম । বাঁশপাতা থেকে ঝরা জলে ভেজে স্টেশনে দিকে চলে যাওয়া মোরাম রাস্তাটা । সুবল তাকিয়ে থাকে। সসপ্যানে চায়ের জল ফোটাতে ফোটাতে সুবলকে দেখে হরি, চাপা শ্বাস ফেলে ।
‘কী দেখছো সুবল?’
‘নীল ঘড়িটা!’
‘আর হরিদার চা কেমন?’
‘হাহাহাহা!’
একটু চুপ থেকে সুপর্ণা বলে,
‘ট্রান্সফারের চিঠি এসেছে আমার জানো? ঘরের কাছে অন্য স্কুলে চলে যাবো ।’
খুশিতে উচ্ছ্ল, ক্যারিয়ারে বসে মৃদু পা দোলাতে দোলাতে বলে, ওহ কি যে আনন্দ হচ্ছে আমার !কত চেষ্টার পর হল জানো, রোজ এই জার্নির ধকল, বাড়িতে মা অসুস্থ, তার চিন্তা, একা একটা মেয়ের এই বিজন বিভূঁই দেশে চাকরি করা যে কি সমস্যার !
সাইকেলের প্যাডেলে জোর নেই । সুবল শোনে, নীরবে চালায় ।

৭।
শেষ ট্রেন চলে গেলে বড় নির্জন হয় স্টেশন। রোজকার একই রুটিনে ক্লান্ত মাস্টারনী এসে দাঁড়ায় বাঁশিওয়ালার কাছে । জুবুথুবু মাহাত যুবক দাঁত বের করে হাসে। বাঁশিটা তুলে নিতে চায়। স্টেশন মাস্টারনী আটকায় তাকে । খরখরে গলায় বলে,
‘বাঁশি না, কথা বল !’
সে ফ্যাল ফ্যাল তাকায়। তারপর হাসে আর গলা থেকে দুর্বোধ্য ঘড়ঘড়ে শব্দ বের করে। স্টেশন মাস্টারনীর ভালো লাগে হাবাগোবা ছেলেটার এই অর্থহীন গোঙানি। কিছু নেই কোথাও, কেউ নেই, তবু তো আছে, মানুষ, মানুষের শব্দ !স্টেশন মাস্টারনী কথা বলে যায় । ঝাঁকড়া চুল মাথা নাড়ায় যুবক ।
স্টেশনে কাউকে ছাড়তে এসে এখন ছাতিম গাছের নিচে জীর্ণ লোহার বেঞ্চিটাতে বসে থাকে সুবল । ট্রেনের আসা যাওয়া দেখে, বাঁশি শোনে । সন্ধে নামলে একা সাইকেল নিয়ে ফিরে যায় ধীরে । দুধারে ঘন বাঁশের বন নিয়ে পড়ে থাকে মোরামের পথ ।

৮।
পাগলটা মেয়াদ ফুরনো একটা হলদে টিকিট পেয়েছে, কেউ ফেলে গেছে। সেটা হাতে তুলে ধরে দেখতে দেখতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়ে বসে বেঞ্চটাতে। টিকিটটাতে বারবার চুমু খায়। তারপর তাকিয়ে থাকে দূরে, রেললাইন যেদিকে হারিয়ে গেছে, সিগন্যালের লাল আলোটা যেখানে চেয়ে থাকে।
পাগলটা ট্রেনের অপেক্ষা করে।