রাজর্ষি পি. দাস-এর গল্প

Spread This
Rajarshi das

রাজর্ষি পি দাস

স্মরণে চেকভ

দুদিকে জল আর মাঝখান দিয়ে লাল মাটির সোজা রাস্তাটা সামনের একটা ছোট্ট পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে কোনদিকে গেছে জানি না। মাঝখানে কোনো গাছ বা দৃষ্টি রোধ করার উপকরণ নেই! একটা সরলরেখা গিয়ে এক বিশাল ত্রিভুজে  বিলীন হয়ে গেছে!

ওই ত্রিভুজ যেন অনেক প্রশ্নের সমাধান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কবে যাব তার কাছে? প্রশ্নগুলোও জানি না তো! তবে প্রশ্নের আভাস পুষে রাখতে এখনও ভালো লাগে।
একদিন হুহু গতিতে ত্রিভুজের সামনে গত দশ-বারো বছরের ভালোলাগা নিয়ে দাঁড়াব। না, দাঁড়ানোর আগে ঐ জার্নি, সরলরেখা ধরে – দৌড়তে দৌড়তে দুধারের জলরাশি ক্রমশঃ ডানা হয়ে উঠবে।

–শিশির

রিনির মিষ্টি ডাকে জেগে উঠে শিশির দেখল ও একটা ছুটন্ত গাড়ির জানলায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রিনি এক হাত স্টিয়ারিং থেকে তুলে সামনের দিকে দেখায়।
আরে, এতো সেই পাহাড়। সামনে লাল রাস্তা , দুদিকে জলের ডানা। অবাক চোখে শিশির তাকিয়ে থাকে ত্রিভুজের দিকে।
রিনি ঢং করে বলে ওঠে, আমিও আছি কিন্তু!

শিশির হাঁ করে তাকিয়েই থাকে। সারা শরীরে একটা আলতো করে হাত বুলিয়ে দেবার মতো ভালোলাগা। শূন্যে ভাসছে যেন।
কিন্তু পাহাড়টা বড়ো হচ্ছে না ক্যানো? ওরা তো ছুটছে! এরমধ্যে ফস্ করে রিনি সিগারেট ধরালো। শিশির রিনির দিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করে এতো সুন্দর রিনিকে কোনোদিন লাগে নি। রিনি না তাকিয়েই ঠোঁটে হাসি আনে।

হঠাৎ পেছন থেকে কেউ হর্ণ বাজানো শুরু করে। শিশির চমকে উঠে পিছনে তাকায়! 

এখন বেলা এগারোটা, ট্রাফিক জ্যামে আটকে আছে শিশির। কালিকাপুর থেকে সায়েন্স সিটির ব্রিজে আসতে ৪০ মিনিট। তারপর সায়েন্স সিটির ব্রিজের উপর দশমিনিট দাঁড়িয়ে ঘুমেয়ে পড়েছিল শিশির। পেছনের গাড়িটার হর্ন-এর সাথে আরো গাড়ির হর্ন শুরু হয়ে গেছে। শিশির গিয়ারে গাড়ি লাগাতেই আবার সেই ছোটো পাহাড়ের ভালোলাগা ফিরে আসে। চিবুকটা উঠে যায়। দেখতে চাইছে রাস্তা কতদূর অব্দি।

কি দেখতে চাইছে শিশির ট্রাফিক জ্যাম না লালমাটির রাস্তা!

শিশির কোনো চাকরি-বাকরি করে না। অফিস টাইমে গাড়ি চালিয়ে ঘুরে বেড়ানো শিশিরের শখ।

রিনি আর শিশির স্ত্রী-স্বামী। বিয়ে করেছে তিনবছর হল। ওরা শুরু করেছিল বাঁশের বেড়ার ঘর দিয়ে, দুবছরে দুকাঠা জমির উপর পাকা বাড়ি। যাদবপুরে। রিনি শিশিরের ভাষায় ডবকা মাল, ডাঁশা পেয়ারা, খানকির বোন — শিশির রিনির ভাষায় হেরো, কুত্তা — শুধু চাটে, কনডম-ফাটা মাল ইত্যাদি।

কিন্তু দুজনেই জানে ওরা সুখী।
শিশির রিনির দালাল। যাদবপুর ক্যাম্পাস, কফিহাউস থেকে ক্লায়েন্ট ধরে আনে, বিছানা সাজায়, রুম ফ্রেশনার ছড়ায়। মদের বোতল খুলে ক্লায়েন্ট-এর সাথে এক-দুপেগ ফাউ মাল খেয়ে বউকে ডাকে, পরিচয় করায় তারপর পাড়ার মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সজলদার সাথে কথা বলার জন্য।
রাত দশটা নাগাদ পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে রান্না করে। ক্লায়েন্ট সারারাতের হলে দরজা নক্ করে বউকে রেস্ট নেবার জন্য বাথরুম পাঠিয়ে ভগবানের সাথে আবার এক-আধ ফাউ পেগ গিলে রাতের খাবার ঢাকা দিয়ে রান্নাঘরে একটা মাদুর পেতে টানটান।

ভোরবেলা রিনি এসে পাশে শোয়। শিশিরকে জড়িয়ে ধরে।

কোনো কোনো দিন রিনি কেঁদে ফেলে। শিশির তখন উঠে রিনির কোমরে পায়ে ম্যাসাজ করে দেয়। স্তনের ক্ষতস্থানে গরম জল দিয়ে ধুয়ে রাম লাগিয়ে নিজেরা এক-দুপেগ খায়। তারপর জড়িয়ে শুয়ে পড়ে।

সারা বাড়িতে একটাও ঠাকুর দেবতার ফটো নেই। দেয়াল জুড়ে আছে নানা রং এর প্যাস্টেলে আঁকা বিচিত্র সব আকিবুঁকি। শিশুদের আঁকার মতো। যেদিন ক্লায়েন্ট থাকে না রিনি আর শিশির আঁকে, ভরপেট মাল খেয়ে লাইট অফ করে ভর করা মানুষ-মানুষীর মতো দেয়ালে আঁচড় কাটে।
শুরুতে যখন বাঁশের বেড়া ছিল, রিনি আর শিশির দুজনের খুব সমস্যা হতো। রিনি শীৎকার না করলে খদ্দের-এর চলে না ওদিকে রান্নাঘরে শিশির কতোটা রিঅ্যাক্ট করছে রিনি বুঝতে পারে না! উলটো দিকে শিশির বালিশে কান চাপা দিয়ে ভাবত এটা হিপোক্রেসি হয়ে যাচ্ছে নাতো!

এরমধ্যে বাজারে চাইনিজ মাল ঢুকল। শিশিরের এক স্কুলের বন্ধু , যে আবার ক্লায়েন্ট, বলল
তোর মোবাইলে গান বাজে!
না।
তাহলে একটা চাইনিজ মোবাইল কিনে নে, হেডফোন ফ্রি!
ব্যাস। প্রবলেম সল্ভড!
তারপর থেকে শিশির কানে হেডফোন লাগিয়ে ফুল ভ্যলুয়েম এ ফসিলস্ শুনত আর রিনি অনেস্ট শীৎকারে ফিরে গেল।
পাকাবাড়ি হয়েছে আটমাস। এখন আর হেডফোন লাগে না!

ওদের সকাল শুরু হয় বেলা দশটায়। রিনি বাজার করতে যায় আর শিশির গাড়ি নিয়ে বেরোয় যেন অফিস যাচ্ছে। গাড়ি কেনার আগেও শিশির স্নান-টান করে এগারোটার মধ্যে বেরিয়ে পড়ত। সোজা যাদবপুর কফি হাউস বা ক্যাম্পাস। তখন বন্ধুরাই ছিল ক্লায়েন্ট।

আজকাল সিস্টেম বদলে গেছে। নেট-এর দৌলতে রিনি এখন এসকর্ট। এতো ভালো ইংলিশ বলতে পারে যে। যাদবপুরে ইংলিশে অনার্স হাফডান! শিশির ফিল্ম- অ্যাপ্রিসিয়েসন-এ ওই হাফডান।

রিনি মন্দারমণি থেকে ফিরে এলে ওরা দুজনে ডুয়ার্স-এ একটা ভারজিন জোন-এ যাবে। হোম-স্টে। শিশির আর রিনি বাড়িতে যৌনতা করে না! নতুন জায়গা, নতুন বিছানা, নতুন রান্না না হলে ওদের জাগে না!

সামনের পাহাড়টা হঠাৎ বড়ো হতে শুরু করে, দ্রুত! রিনি বাঁ হাতে ঘুমগালে হাল্কা চাপড় মেরে শিশিরকে জাগায়। শিশির ধড়মড় করে উঠে দেখে ওর স্বপ্নের পাহাড়ের সামনে সরলরেখা আর মাত্র কয়েকশো পা!
জানলা দিয়ে শিশির দেখে একটা বিশাল সাদা ডানা! মুহূর্তের মধ্যে দেখে, স্বপ্নের পাহাড় পেরিয়ে ও ডানা নিয়ে শূন্যে উঠে যাচ্ছে। ত্রিভুজ বেয়ে সরলরেখা আকাশে উঠে গেছে। পাহাড়ে একজোড়া বিশাল ডানার ছায়া।

ছায়াটা মিলিয়ে যেতেই শিশির প্রশ্নগুলো ভুলে যায়। এমনকি আভাসটুকু পর্যন্ত মিলিয়ে যায় আকাশের মধ্যে। একটা চরম নির্লিপ্ততায় শরীর শিরশির করে ওঠে।
রিনি হেসে বলে
আকাশে বিছানা পাতা বারণ ক্যানো?