সৌগত ভট্টাচার্য-র গল্প

Spread This
Sougata Bhattacharya

সৌগত ভট্টাচার্য

পুতুল খেলা

আজ সকালে মাল ঢুকেছে, মাল গুছিয়ে তবে কাজে হাত দিতে হবে। শরীরের সঙ্গে ঢাউস সাদা বস্তা গুলো লাগিয়ে পা দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে শান্তি বলে, “লোকটার কাজকাম দেখলে গা পিত্তি জ্বলে যায়, একটু সাইড করেও রাখতে পারে না মাল গুলা!” সত্যবতী সাইকেল থেকে টিফিন বক্সের ব্যাগ নিয়ে ঢুকছে। “এই সত্য ফ্যানের সুইচটা দিয়ে দে তো! শান্তি মাল সাইড করে মেঝেতে বসে সত্যবতীকে বলে। বাড়ির বাইরে দিকের টিন দিয়ে ঘেরা একটা ঘরে নিরঞ্জনের “ফ্যাক্টরি”। নিরঞ্জন একে “ফ্যাক্টরি” বললেও, পাড়ার সবাই বলে দুজন লোকের ফ্যাক্টরি। নিরঞ্জনের বাড়ি শহর লাগোয়া ফোর লেনের পাশে। হুস হুস করে সারাদিন “ইস্পিডে” গাড়ি চলে যাচ্ছে! কিন্তু কোথায় যে যায় গাড়ি গুলো!

 

হাতের তালুতে টিভির রিমোটটাকে তিনবার বাড়ি মেরে গায়ের জোরে রিমোটের নব টিপে টিভির চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে শান্তি সত্যবতীকে বলে,”আবার রিমোটটা বিগড়ালো!” সত্যবতী পুতুলের চোখ সেলাই করতে করতে শান্তিকে বলে, “ওই ‘সুর সঙ্গীত’ চ্যানেলটা দাও না, দেবের নতুন বইয়ের গান দেয় ওখানে!” “উঁউঁ শখ শোনো মাইয়ার!” শান্তি বলে। হাফ পাকা দেওয়াল বাকিটা টিনের ঘরের চারিদিকে মালের বস্তা ছড়ানো। রাফ ঢালাই করা মেঝেতে পা ফেলার জায়গা নেই। কাঠের তাকের ওপরে ছোট রঙিন টিভিতে সারাদিন হয় গান না হয় ‘বই’ চলতেই থাকে। শান্তির উত্তর শুনে সত্যবতী বলে “আমি বললেই চোপা দেখাও, নিজে সারাদিন ধরে যে টিভিটা অফই করো না!” “আমার টিভি আমি যা খুশি তাই করব, তোর কী রে?” শান্তি বলে। “তোমাকে বললাম কিছু টাকা হাওলাত দাও একটা ফোন কিনি, মাইনা থেকে কাইটে নিও, তার বেলায় নাই, শুধু মুখ ঝামটা!” শান্তি মালকিন হলেও বছর তেইশের সত্যবতীর সঙ্গে মালিক কর্মচারীর নয়, বহুদিনের স্নেহ ভালোবাসার সম্পর্ক।

 

“কিয়া নিরঞ্জন দা ইস মাহিনে মে ইতনা দের কিউ?” সুনীল অগ্রবাল নিরঞ্জনকে বলে। নিরঞ্জন ভাঙা হিন্দিতে উত্তর দেয়, “নেহি বারিশকে লিয়ে ট্রেন ঠিকঠাক নেহি চল রাহি থি, উস লিয়ে এ মাহিনা মে দের হো গ্যায়া!” বড়বাজার জুড়ে শুধু হিন্দি শব্দ। এত হিন্দি শব্দ একসাথে নিরঞ্জন মানুষের মুখে কোথাও শোনেনি। প্রথম প্রথম কানে অসুবিধা হলেও, এখন আর অসুবিধা হয়না। বড়বাজার থেকে ঘুরে ঘুরে খেলনা ও পুতুল বানানোর পাইকারি মাল কেনে নিরঞ্জন। পুতুল বানানোর ফারের কাপড়, সিনথেটিক তুলো, পুতুলের গয়না, কাপড়, কিছু গান হাসির ইলেকট্রনিক আইসি কেনে নিরঞ্জন। সেগুলো শান্তি আর সত্যবতী পুতুল বানিয়ে নানা রকম শব্দের আইসি সেট করে কথা বলা গান গাওয়া পুতুলের চেহারা দেয়। আগে শুধু পুতুল বানানোর কারবার ছিল নিরঞ্জনের। এখন পুতুলের সঙ্গে খেলনার পাইকারের থেকে সেন্সর লাগানো খেলনা রিমোটের গাড়ি বন্দুক স্টেনগান প্লাস্টিকের মুখোশ ট্যাংক তীর ধনুক তরোয়াল হেলিকপ্টার ট্রেন প্লেন এগুলোও নিয়ে আসে। এই খেলনার বাজারে “হেব্বি ডিমান্ড”। এগুলো নিরঞ্জনের “ফ্যাক্টরি”তে মেশিন ছাড়া বানানো সম্ভব না। পাইকারও আজকাল শুধু পুতুলের মাল বেচতে চায় না। শুধু গাড়ি বন্দুক হেলিকপ্টার প্লেন ট্যাংক এগুলো গছাতে চায়। বিরাট বিরাট খেলনা ভর্তি বস্তা নিয়ে বড়বাজার থেকে ধর্মতলার বাস স্ট্যান্ডে আসে নিরঞ্জন। বাসের মাথায় মাল তুলে ফুটপাথের ভাতের হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে নেয় সে। সারাদিন তো আর তেমন ভাবে খাওয়া হয় না। সেই সকালের ট্রেনের জেনারেল থেকে শিয়ালদায় নেমে নিরঞ্জন স্টেশনে বাথরুম পায়খানা করে যে দৌড় শুরু করে ফেরার বাসে না ওঠা অবধি রেস্ট নেই। সারাদিন কাজ করে ফেরার সময় ড্রাইভারের পাশে বাসের কেবিনে বসেই ঝিমোতে ঝিমোতে আসে। বাসের কেবিনে বসলে ভাড়া অনেক কম। মালের ভাড়ার সঙ্গে গড়ান হিসেব হয়। শুধু তাই না বাসে ফিরলে নিরঞ্জনের অনেক সুবিধা। বাড়ির দরজার সামনে মাল নামাতে পারে। কলকাতায় মালের দাম অনেক কম, তাই বাস ভাড়া খাওয়া খাটনি দিয়েও পরতা পরে। নিরঞ্জন মফস্বল শহর আর গ্রামের দোকানে দোকানে খেলনা সাপ্লাই করে। বড় মেলা বসলে মেলায় খেলনার দোকান দেয় নিরঞ্জন। তখন দিন কয়েকের জন্য নিরঞ্জন বাড়ি ছেড়ে মেলায়ই থাকে।

 

দিনের পর দিন মেলায় কাটানো নিরঞ্জনের কাছে নতুন কিছু না। যে বছর বন্যা হল, সেবার নিরঞ্জন রাসের মেলায় একুশ দিন কাটিয়ে আসে। শান্তি ভেবেছিল নিরঞ্জন আর ফিরবে না, তাকে আর ছেলে মেয়ে ফেলে রেখে নিরঞ্জন চলে গেছে। একুশদিন পর নিরঞ্জন সব খেলনা বিক্রি করে শান্তির জন্য একটা গরদের শাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল।

“মাটির খেলনার আর ডিমান্ড নাই মেলায় বুঝলি!” মেলা থেকে ফেরা ক্লান্ত নিরঞ্জন স্নান করে রাতে খেতে বসে শান্তিকে বলেছিল।

“আমাকে তোমার সঙ্গে একবার মেলায় নিয়ে যাবা!”

“আমি নিজেই আর মেলা করব কি না তার নাই ঠিক!”

“কেন কি হল?”

“এই মাটির ফুল ফল পাখি ঘট কেউ কিনতে চায় না আর”

“কেন এই গুলা তো সুন্দর বানাইছ তুমি, কি সুন্দর রং… অজ্জিনালের মত!”

“পেলাস্টিকের খেলনা গুলা আরো সুন্দর রং, দাম কম, কেন আমার মাটির খেলনা কিনবে!”

“ও… “

“আগে কত গুলা মাথা নাড়া বুড়া বুড়ি বেচতাম জানিস! এখন প্রায় ওই খরচে কাস্টমার পেলাস্টিকের গান লাগানো কথা বলা পুতুল কেনে…”

“রাত হল অনেক…”

“আগে রাসের মেলায় এই মাল বেচতে সাত দিনও লাগত না, এইবার তিন হপ্তা লাগলো, মেলায় থাকে, খায়ে, মেলা কমিটিকে পয়সা দিয়ে কি করে পরতায় পোষায় ক’ দেখি!”

ফোরলেনে রাতের গাড়ি গুলো ঘন কুয়াশা ভেদ করে যেন আরো গতি বাড়িয়ে চলছে অন্ধকারের দিকে। ক্লান্ত নিরঞ্জনের চোখে ঘুম ধরে!

 

বাবলু প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে পিছে প্রকান্ড সব গাড়ি ট্যাংক মুখোশ পড়া বন্দুক স্টেনগান হাতে লোক তরোয়াল হাতে লোক বাবলুর পিছে ধাওয়া করেছে। আর বাবলু “মা মা” করে চিৎকার করছে। গোলা গুলি সাইরেন এর শব্দ। শান্তি কিছু বলতে চাইছে তবু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। বুকের ভেতর খুব কষ্ট হয় শান্তির। ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে যায় শান্তির। ঘুম ভাঙলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, মিষ্টু পাশে অকাতরে ঘুমাচ্ছে। নিরঞ্জন আর বাবলু ঘুমিয়ে আছে অন্য চৌকিতে। বাইরে আলো ফুটতে শুরু করেছে। চোখে মুখে জল দিয়ে বাড়ির উঠানে হাঁটাহাঁটি করতে করতে শান্তি ভাবে, এই আম জাম কাঁঠাল কলা দেখেই তো নিরঞ্জন মাটির খেলনা বানাতো। রেল লাইনের ধারে বাড়ি দেখে কুঁড়ে ঘর বানাত। প্রকৃতির মতোই এক রকমই রং দিত। নিরঞ্জনের হাতের কাজ বড় ভালো ছিল। এখন আর মাটির খেলনা না বানাতে বানাতে হাত বসে গেছে। হয়ত ভুলেই গেছে মাটির গোপাল ফল পয়সা ফেলার ঘট বাড়ি বানাতে। আর কি কখনো পারবে বানাতে! নিরঞ্জন এখন শহরে খেলনা সাপ্লাই দেয়। ভাবতে ভাবতে শান্তি বাড়ির বাইরের দিকে এসে দাঁড়ায়। সারাদিন ফোরলেন দিয়ে গাড়ি যায়। একটা ট্রাকের উপর বিরাট বড় একটা বুলডোজার নিয়ে যাচ্ছে দেখে শান্তির কাজের কথা মনে হয়, আজ শান্তিকে হেলিকপ্টার প্লেন ট্যাংক রেসিং গাড়ি ট্রাক গুলো সাপ্লাইয়ের জন্য আলাদা আলাদা প্যাকেট করতে হবে। এই খেলনা গুলোর আইসি ‘কাটা’ থাকে লাইট ‘কাটা’ থাকে প্রায়ই। সেগুলো খুলে নতুন করে লাগাতেও হয়। সেসব খুব ঝামেলার কাজ।

 

সকাল থেকে রান্না করে ঘর পরিষ্কার করে ছাড়া কাপড় কেচে ছেলে মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে শান্তি ফ্যাক্টরিতে ঢোকে। নিরঞ্জন আগেই লাইন করতে বেরিয়ে যায়। সত্যবতী কোনো কোনো দিন আগে এসে কারখানা খুলে গোছাতে থাকে। শান্তি আসলেই গান ‘বই’ শুরু হবে টিভিতে। রিমোটের অধিকার শান্তির। বাংলা বইয়ের গান চলবে না হিন্দি গান হবে এই নিয়ে দুজনের সারাদিন ঝগড়া লেগেই আছে। চ্যানেল পাল্টাতে গিয়ে যুদ্ধের একটা “বই” হচ্ছিল কোনও একটা চ্যানেলে। টিভির পর্দায় চোখ আটকায় সত্যবতীর। “কী এই মারামারি দেখিস রে!” বলে শান্তি চ্যানেল পাল্টায়। “যুদ্ধ তো সেই ঠাকুর-দেবতাদের যুগ থেকেই আছে গো! আমার ঠাকুমা আমাদের ভাইবোনদের মাঝে মাঝে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের গল্প বলত! সেই বইটার থেকেই তো আমার নাম দিসে সত্যবতী!” বলে কথা বলা পুতুলগুলো প্যাকেট করতে থাকে সত্য। কামান বন্দুক ট্যাংক তীর ধনুক তরোয়াল রেসিং গাড়ির প্যাকেট গুলোকে গোছায় শান্তি। খেলনা বানানোর সরকারি ট্রেনিং নিয়ে এসে, তিন মাসের কোর্সের পর ‘সরকারি সার্টিফিকেট’ পেয়েছে শান্তি।

 

মফস্বল শহর গুলোতে বড় বড় শপিং মল হওয়ায় সব ছোট ব্যবসার মত নিরঞ্জনের ব্যবসাও মার খেয়েছে। তবুও “ঠাকুরের আশীর্বাদে” বউ বাচ্চা নিয়ে ডাল ভাত খেয়ে ভালোই চলে যাচ্ছে। তবে মাটির খেলনা বেচে ইদানিং তেমন সংসার চলছিল না। নিরঞ্জনকে মেলায় মাটির জিনিস বেচা ছাড়াও সাইডে যখন যেমন জোটে তেমন নানা কাজ করতে হত সেই সময়। কিছু টাকা ‘লোন’ করে নিরঞ্জন এই সাপ্লাইয়ের ব্যবসা শুরু করে। দোকানগুলোর সঙ্গে আগেই চেনা পরিচিত ছিল তাঁর। আগে ওই সেগুলোতেই মাটির জিনিস সাপ্লাই করত। হালে সেই জিনিসের নাম হয়েছে ‘শো পিস’। নিরঞ্জন তো ‘শো পিস’ কী প্রথম প্রথম বুঝতোই না! এখন সেসব দোকানও আর মাটির ‘শো পিস’ রাখতে চায় না। শুধু প্লাস্টিক আর মেটালের জিনিস রাখে।

 

নিরঞ্জন আঁকার হাতও খুব সুন্দর। নিরঞ্জন মাঝে মাঝে শান্তিকে বলে, “আগে ফ্যাক্টরির পেছনের গাছপালা বাড়ি ফল বানাতাম রং করে বিক্রি করতাম, এখন ফ্যাক্টরির সামনের হাইরোড দিয়ে ইস্পিডে যাওয়া গাড়ি ঘোড়ার ম্যাশিনের খেলনা কিনে আইনে বিক্রি করি। নিজের হাতে মাল তৈরিতে যে সুখ ছিল সেইটা আর পাইনা রে শান্তি!” এখন সব খেলনার দোকানেই গাড়ি ট্যাংক প্লেন ট্রেন হেলিকপ্টার বন্দুক তীর ধনুকের তরোয়ালের চাহিদা। ছেলেদের জন্মদিনে সবাই এগুলোই উপহার দেয়, মেয়েদের জন্মদিনে পুতুল। তাই দুটোই এখন নিরঞ্জন সাপ্লাই করে। “বাজারে যেই খেলনার ডিমান্ড হাই, সেটাই তো করতে হবে।” শান্তি উত্তর দেয়। শিল্পী নিরঞ্জন উদাস হয়ে বলে,”দোকানদাররা কোনো দিন বলবে, ডিমান্ড আছে তাই গোটা আকাশটাই সাপ্লাই দাও!”

 

রাতে শান্তির ঘুমে ওই স্বপ্নটা বারবার ফিরে ফিরে আসে। কত গুলো বন্ধুকধারী লোক ট্যাংক হেলিকপ্টার গাড়ি নিয়ে বাবলু বা মিষ্টুকে তাড়া করছে। স্পষ্ট কিছুই দেখতে পায় না তারা কে! আর বাবলু মিষ্টুরা “মা মা” করে চিৎকার করছে। বিকট গোলাগুলি আর সাইরেনের শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই শান্তি চ্যানেল পাল্টে গানের আওয়াজ বাড়িয়ে দেয়। “দেবের বা সোহমের গানের আইসি পাওয়া যায় না শান্তি পিসি, পুতুল গুলোতে লাগাতাম” সত্যবতী জানতে চায়। “তালে তোর পিসাকে বল এইবার কলকাতায় গেলে দেবের সঙ্গে তোর বিয়াটা ঠিক করে আসতে, পুতুল ক্যান দেবই তোকে গান শুনাবে, তুই চাইলে নাচবেও।”
“মশকরা করো কেন পিসি!” সত্যবতী লাজুকের মত মাথা নামায়।

 

ভাদ্র মাস থেকে কাজের চাপ বেড়ে যায়। পূজার সময় খেলনা বিক্রি সবচেয়ে বেশি। নিরঞ্জন পাইকারের ঘর থেকে এই সময় বেশি করে মাল তোলে। এই দুই মাস শান্তি সত্যবতী নিরঞ্জনদের নাওয়া খাওয়ার সময় থাকেনা। গ্রাম থেকে শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত বিভিন্ন দোকানে নিরঞ্জন মাল সাপ্লাই দিয়ে বেড়ায়। এরই মাঝে নিরঞ্জনকে মাল আনতে কলকাতায় যেতে হয়েছিল। নতুন মালে ঘর বোঝাই।

 

নিরঞ্জনের ফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছিল। কয়েকদিন বন্ধ ছিল। পুজো শেষ, কাজের চাপ নেই তাই ফোন সারানোর গরজ করেনি নিরঞ্জন। আজ ফোন ঠিক হওয়ার পর থেকেই ফোনের পর ফোন আসছে নিরঞ্জনের। “আরে তুমি এতদিনের মাল সাপ্লাইয়ের লোক, আমাকে কি মাল দিস!” ফোনের ওই প্রান্ত থেকে রেখা স্টোর্স এর মালিক বলে। “তুমি আমাকে ডুবাইলা নিরঞ্জন দা, কাস্টমারদের শুধু কমপ্লেন খেলনা নিয়া! টাকা ফিরত চায়!” আবার ফোন আসে গিফট এম্পায়ার থেকে। একের পর এক ফোন আসতেই থাকে নিরঞ্জনের মোবাইলে। নিরঞ্জন ওর সব সাপ্লাইয়ের দোকানদারদের ফোনে বলে, “আচ্ছা দেখি কী করা যায়। কেন এমন হল”। ফোনের ও প্রান্ত থেকে বলে, “তুই ঢ্যামনামো করিস না, কেন এইরকম হল জানিস না! তোর অনেক তেল বাড়সে! এক পয়সাও পেমেন্ট পাবি না!” নিমেষে নিরঞ্জনের মুখে ছায়া নেমে আসে। শান্তি সেটা টের পেয়ে নিরঞ্জনের পাশে এসে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে, “কী হইছে গো?” নিরঞ্জন অসহায়ের মত বলে, “পূজার আগে যেই মাল দোকানে দোকানে সাপ্লাই দিছিলাম সেই গাড়ি বন্দুক ট্যাংক প্লেন হেলিকপ্টার সব কিছুর থেকেই গুলি সাইরেনের শব্দ না বার হয়ে নাকি গান এর আওয়াজ বারাচ্ছে, খুশিতে হাসির আওয়াজ বারাচ্ছে , ট্যাংক গুলো নাকি হা হা মা মা করে করে ডাকতেসে আর পুতুলগুলো টিপলে কোনো আওয়াজ বারাচ্ছে না।” শান্তি মাথা নিচু করে চুপ করে শোনে। নিরঞ্জন বলে যায়, “আমার ফোনটা খারাপ ছিল জন্য এই কয়দিন ফোনে পায় নাই আমাকে। পূজায় তো লাইন করতেও যাই নাই যে আমাকে ধরবে! অনেক কাস্টমার কিনতে এসেও ঘুরে গেছে বন্দুকে গানের আওয়াজ হাসির আওয়াজ মা মা ডাক শুনে…” শান্তি মাথা নিচু করে সব শুনে ঘামতে থাকে!

 

পুজোর সপ্তাহ দুয়েক আগে অনেক রাত অবধি কারখানায় কাজ হয়েছে। পরের দিন সকাল থেকে দোকানে পুজোর মাল সাপ্লাই দেবে নিরঞ্জন। সেই রাতেই “মা মা মা…” আর্তনাদের সেই একই স্বপ্ন। শান্তির গলাটা যেন কেউ চেপে ধরেছে। বাবলু মিষ্টুকে বাঁচানোর জন্য হাত বাড়িয়েও সে হাত পৌঁছচ্ছে না ওদের কাছে। অস্থিরতায় অসহায় লাগছে শান্তির। অথচ গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের করতে পারছে না। চারিদিকে বিকট সাইরেন গোলাগুলির আওয়াজ, আকাশ কাঁপানো প্লেন হেলিকপ্টারের শব্দ। শান্তি ধড়ফড় করে ওঠে, ঘুম ভেঙে যায়। আশ্বিনের রাতে ঘেমে যায় শরীর। কপালের ঘাম শাড়ির আঁচলে মুছে বিছানা থেকে নেমে জল খায়। বুকের উত্থান পতনের শব্দ এই নিঃশব্দ রাতে শান্তি টের পায়। বাবলু মিষ্টু আর নিরঞ্জন তখন অকাতরে ঘুমাচ্ছে। বাইরে গভীর রাতের আকাশ তখন পরিষ্কার। ঘড়িতে আড়াইটার মত বাজে। শান্তি দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায়। ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগলে একটু আরাম লাগে শান্তির। আবার মনে হয় ট্যাংক বন্দুক রাইফেল নিয়ে বিকট শব্দ করে কারা যেন বাবলু মিষ্টুকে মারতে আসছে। তাদের মুখগুলো মুখোশে ঢাকা। । এ সব ভাবতে ভাবতে শান্তি কখন যে চাবি হাতে ফ্যাক্টরির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে নিজেরই খেয়াল নেই। ফ্যাক্টরির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে লাইট জ্বালানোর আগেই মেঝেতে পড়ে থাকা টিভির রিমোটটা শান্তির পায়ের চাপে ভেঙে যায়। শান্তি লাইট জ্বেলে একের পর এক ট্যাংক বন্দুক স্টেনগান প্লেন হেলিকপ্টার গাড়ি থেকে বিকট গোলাগুলি আর সাইরেনের শব্দের আইসি গুলো খুলে ফেলে । পুতুলের থেকে গানের, হাসির, খুশিতে “মা মা” ডাকের আইসি খুলে ট্যাংক বন্দুক স্টেনগান কামানের ভেতর লাগিয়ে দেয়। বদলাবদলির পর পুতুল গুলোর হাসি মুখ শান্তি স্পষ্ট দেখতে পায়। রিমোটের ভাঙা টুকরো আর বিকট গুলি আর সাইরেনের শব্দের আইসি গুলো সেই অন্ধকার আশ্বিনের রাতে যে কোথায় ফেলেছিল, শান্তির আর মনে পড়ে না!

 

উঠোনে ফোন হাতে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে নিরঞ্জনের পাশে এসে শান্তি দাঁড়ায়। মাথার ওপর দিয়ে একটা হেলিকপ্টার উড়ে যাচ্ছে। শান্তি আকাশে হেলিকপ্টারের দিকে তাকায়। বাবলু আর মিষ্টুর নিশ্চিন্ত ঘুমিয়ে থাকা মুখটা যেন স্পষ্ট দেখতে পায় শান্তি। আরো অনেক অনেক বাবলু মিষ্টুরা নিশ্চিন্তে ঘুমোক। হেলিকপ্টারের আওয়াজে ওদের ঘুম ভাঙছে না। ভাঙবেই বা কী করে! হেলিকপ্টার থেকে পরিষ্কার গানের শব্দ শুনতে পাচ্ছে শান্তি। শান্তির অসম্ভব কান্না পায়। নিরঞ্জনকে জড়িয়ে ধরে শান্তি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে।

হেমন্তের মেঘহীন আকাশে কালপুরুষ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে…