পার্থপ্রতিম দাস-এর গল্প

Spread This
Partha pratim Das

পার্থপ্রতিম দাস

লক্ষ্মীর আসা যাওয়া

“ছেলেটোকে খঁয়ে, শঁয়ে দিছিস না কেনে? চিঁচায়ছে তখন থেকে”
দাওয়াতে হ্যারিকেনের আলোয় শনের দড়ি পাকাতে পাকাতে মধু হেঁকে ওঠে। পাশের রান্নাশালে তখনও মধুর বউ খুটুর খুটুর করছে। শব্দ আসছে।
“আখাটো নিভিনেই যেছি”
মধুর বউও চিঁচিয়ে সাড়া দেয়।
ছেলেকে খায়য়ে, ঘুম পাড়িয়ে, তারপর মধুর খাওয়া হলে, নিজে খেয়ে হেঁশেল নিকিয়ে, গুটিয়ে তবে শুতে যাবে লক্ষ্মী। ততক্ষন মধু দাওয়াতে বসে বিড়ি টানবে। হেঁশেলের পাশেই বাতাবি গাছে ফুল এসেছে। গন্ধ ছড়ায় রাতে। উঠোন জুড়ে।
একমনে গাছটার দিকে তাকিয়ে বিড়ি টানছিলো মধু। গোয়ালে গরুগুলার নড়াচড়ার শব্দ আসছে মাঝে মাঝে। মশা বসছে হয়তো গায়ে। সন্ধেবেলায় দেওয়া ধোঁয়ার তেজ শেষ হয়ে গিয়েছে অনেক্ষন।
লক্ষ্মী ঘরে ঢুকে বিছানা ঝাড়ছে। মশারি টাঙালে আরও খানিক পরে মধু হারিকেনটো কমিয়ে দিয়ে দরজার পাশে রেখে, দোর দিয়ে শুতে যাবে। লক্ষ্মী ঘুমিয়ে গেলে তাকে আর ডাকে না মধু। সকাল থেকে খাটে বেচারা। সেই ভোর থেকে গোবরজল ছিটিয়ে, দরজায় দরজায় মারুলী দিয়ে তবে শুরু হয় দিন। কি জারে কি খরায়। একই নিয়ম।
রাতে আলামারা হয়ে একটু ঘুমোয়, ঘুমোক। তার উপর যদি ছেলেটো জেগে যায় তাহলে তো উঠতেই হয়।
এতো খেটে, কোনো কোনো দিন না ঘুমিয়েও লক্ষ্মীর শরীর এখনো ভাঙেনি। এখনো বেশ ডাগরপারা আছে। লক্ষ্মীকে  দেখলে মধুর এখনো শরীরে ছটফটানি লাগে বৈকি। মন করে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিতে। কিন্তু মধু বোঝে। লক্ষ্মীর চাওয়া না চাওয়াকে গুরুত্ব দেয়। মধু ভালোবাসতে জানে।
বাতাবি ফুলের গন্ধ এখনো ভাসছে। উঠোনের জ্যোৎস্নায় আবছা ছায়া পড়েছে বাতাবি গাছটার। জ্যোৎস্নায় তিরতির কাঁপছে ছায়া।
খরার ধান এবছর লাগাতে পারবে কিনা জানে না মধু। হাতে টাকা পয়সা নাই। পাঁচবিঘা জমি একা চষতে পারবে না। বীজ যা আছে হয়ে যাবে হয়তো। কিন্তু মুনিষ যে লাগবে, সে পয়সা কই! তাছাড়া স্যালোর জলের লেগে ভাড়া দিতে হবে। টেনেটুনে নিজে দুবিঘা ধান করতে পারবে। কিন্তু বাকি তিনবিঘা!!! ভাগে দিলে যা ধান পাওয়া যাবে, তাতেও সারাবছরের চালে টান পড়ে। মরাইয়ের ধান তলানিতে। গেলবার দুবিঘা ধান বিচে হাতে টাকা বেশি আসেনি। কলাটো মুলোটো কিনতে কিনতে কতই বা আর বেঁচে থাকে !!! ওই সবজি টবজি লাগিয়ে, তা বিচে যা দু পয়সা আসে! চলে যায় বছর।
এবার টাকা পয়সার একটু টানাটানি আছে। কি করে বছর চলবে জানে না। খরার ধান না লাগালে ঘরের চালেও টান পড়বে। কাল একবার নিতাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। দুজনে মিলে যদি খরার ধানটো করতে পারে। একদিন বলছিল বটে নিতাই, ওরও নাকি টানাটানির হাল। যদি এবারে খরার ধানটো এক সঙ্গে করা যায়। মধু গা করেনি সেদিন। নিতাইয়ের তিন বিঘা জমি মাত্র। দুজনের মিলে আট বিঘা। আধা ভাগে হলে চার চার। কষ্ট করে হলেও বছরটো কেটে যাবে। ধান পোঁতা আর কাটার সময় কিছু ঠিকে লোক লাগালেই হবে।

শুতে যায় মধু। বার ঘরে গিয়ে মুতে এসে হ্যারিকেন কমিয়ে দেয়। আলো কমে গেলে আলোর পোকারা ছটফট করে ওঠে। দোর দেয়। মশারি তুলে ঢুকে যায় মধু। ছেলেটো চুপটি করে শুয়ে আছে হাতপা মেলে। কাঁথাটো সরে গিয়েছে গা থেকে। মধু ঢেকে দেয় ঠিকঠাক। ওপাশে লক্ষ্মী ঘুমিয়ে কাদা। ছেলের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে। মানুষ ঘুমালে শিশুর মতো হয়ে যায়। আর শিশুরা ফুলের মতো…
যেদিন গরম সেদিন খুব গরম। নাহলে প্রতিদিনই প্রায় বৃষ্টি। দুপুর-বিকেল করে। সারা চোত- বোশেখ বৃষ্টি হোলো। পাকা ধান নষ্ট হোলো অনেক। মাঠে পড়ে পড়ে। যেকটা বেঁচে আছে ঘরে না তুললে কিছুই পাওয়া যাবেনা আর। এদিকে মুনিষ পাওয়া মুশকিল হচ্ছে। সবাই তাড়াহুড়ো করছে। কি নাকি নিম্নচাপ আসবে। প্রচুর বৃষ্টি হবে। হপ্তা ধরে। নিতাই কাল সন্ধ্যায় বলে গিয়েছে চারটে মুনিষ পেয়েছে। কিন্তু দুদিন পর থেকে লাগবে কাজে। এই দুদিনে জল হলেই মুশকিল।

বৃষ্টির জল খড়ের চাল বেয়ে ঝরছে উঠোনে। মরাই থেকেও ঝরছে জল। ছেলে কোলে লক্ষ্মী রান্নাশালে। ধান সব রাখা আছে খামারে গাদা করে। সব ঝাড়া হয়নি এখনও। বিড়িটো নিভে গিয়েছে মধুর আঙুলের ফাঁকেই। সেটা জ্বালতেও ইচ্ছে করছেনা এখন আর। ধান যা নষ্ট হয়েছে তাতে সাকুল্যে পাঁচবিঘার মতো পাবে। দুজনে ওই আড়াই আড়াই। বর্ষার ধান লাগানোর সময়ও এসে গেল। খুব খিচিবিচি লাগছে সব, এই বৃষ্টিতে। কুনো কাজ ঠিক মতো করা যেছে না।
মাথালি দিয়ে বউ দাওয়ায় উঠলো ছেলে নিয়ে। মাথালির জল লাগে মধুর গায়ে।
“ছেলেটোকে খানিক ধরতে পাচ্ছোনা? ” খানিক ঝাঁঝিয়ে উঠেই বলে লক্ষ্মী।
মধু মুখ তুলে তাকায়। কিছু না বলে হাতের বিড়িটো উঠোনে ছুঁড়ে দিয়ে হাত দুটো বাড়ায় ছেলের দিকে।
“আয়…”
লক্ষ্মী ছেলেকে মধুর কোলে দিয়ে আবার মাথালি মাথায় রান্নাশালের দিকে চলে যায়। নিভে যাওয়া বিড়িটো জলে ভাসতে ভাসতে চলে যায় বার ঘরের দিকের নালাতে।
লক্ষ্মীর আসা যাওয়ায় ভিজে পায়ের ছাপ পড়ে দাওয়াতে। মাটির দাওয়া ধরে রাখে লক্ষ্মীর  পায়ের ছাপ। ছেলেটা বাবার কোল পেয়ে একটা ভাঙা গাড়ি হাতে খেলছে। এবছর কেমন করে চলবে সেই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে মধুর। ছেলের মুখের দিকে তাকালে আশঙ্কা হয়। মধু তাকায় লক্ষ্মীর  ফেলে যাওয়া ভিজে পায়ের ছাপ গুলোর দিকে।
বৃষ্টির জোর বাড়ছে। জলের ছিটে এসে পড়ছে দাওয়ায়। ভিজে যাচ্ছে মাটির দাওয়া। দাওয়ার ভিজে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে লক্ষ্মীর ভিজে পায়ের ছাপ গুলো। হারিয়ে যাচ্ছে একে একে। লক্ষ্মীর  আসা যাওয়ার সব চিহ্ন মুছে দিচ্ছে বৃষ্টি। বৃষ্টির তেজ বাড়ছে খানিক খানিক করে… আরও।