পিউ মহাপাত্র-র গল্প

Spread This
Piu Mahapatra

পিউ মহাপাত্র

বড়ির টেবিল

বড়ির টেবিলের কোন চেয়ার নেই। চেয়ার থাকলেই মুশকিল। তখন টেবিলকে হয় এদিকের হতে হবে, নয় ওদিকের। তাছাড়া, বড়ির টেবিলটা বড় নিরীহ, হাল্কা অমনোযোগীও। কোন কিছুই ধরে রাখতে পারে না ঠিকঠাক। সকালের নরম রোদের সাথে, পর্দা ঠেলে একটু শীতের বাতাস ঢুকল কি না ঢুকল, ওমনি ওর বুকের ওপর রাখা কবিতার পাতারা পত পত করে ঘরময় এদিক ওদিক চড়ুই যেন। বড়িও কিছু বলে না। এমনিতে ওর কবিতাদের পা বেজায় ভারী, ডানা ছাঁটা, কেন্নোর মত গুটিয়ে গোল পাকিয়ে থাকাই স্বভাব। খানিক উড়তে দেখলে ওদের, মন্দ লাগে না বড়ির। চৌকো মত টেবিলটার বাদামি গায়, হাজার কাটাকুটি। পেন্সিল কাটার ছুরির পাতলা পাতলা নখের মত সরু দাগ সকালের ফর্সা রোদে কেমন রুপালি চুলের মত চকচক করে। টেবিলের বুকে গাল পেতে। চোখ মেললে মনে হয় কবেকার, কোন সুখা নদী তার শাখাপ্রশাখা নিয়ে এ টেবিলের কাণ্ডের গভীরে যেন বইতে বইতেই শুকিয়ে গ্যাছে হঠাৎ। ওদের চোখের জলের দাগ এখনো ওর বুকে ধরে রাখা। বড়ি ওর রুপালি বুকে আনমনে হাত বলায়। কবিতার পাতারা তখনো ঘরময় উড়ে উড়ে ক্লান্ত হয়ে টেবিলে ফিরে আসার জন্যে উন্মুখ ।

সোনাদাদা একগুচ্ছ সূর্যমুখী ফুল বড়ির হাতে ধরিয়ে বলেছিল, ‘ঠিক যখন কোনাকুনি রোদ পড়বে তখন আঁকবি, কেমন? পেন্সিলে মক্স করবি না খবরদার। সোজ্জা রঙ চাপাবি। পারবি?’ ‘পাতা নষ্ট হলে?’ ‘আঁক কাটলেই তো পাতা নষ্ট ! সাদা শাড়িতে কাদা লাগার মত। তুই দেওয়ালে আঁকিস বরং। ওই কোনাকুনি রোদ পড়লেই। কেমন?’ বলতে বলতে সোনাদাদা সকালের কড়া-মিঠে রোদে ঝিলমিলিয়ে মিলিয়ে যায়। বড়ি আঁকে ঠিকই, তবে টেবিলের গায়, ঠিক যেখানে কোনাকুনি রোদ পড়েছে, সেইখানে। টেবিলের কোন ঘেঁষে, পুরু পুরু রঙ চাপায় ও। গাঢ় হলুদ, লালচে কমলা পাপড়ির মাঝে ছোট্ট বাদামি বুক। ওমনি টেবিলটা কেমন করে যেন তাহিটির সমুদ্র ঘেরা সবুজ দ্বীপ হয়ে নড়ে ওঠে। বড়িও Gauguin মতোই কমলা সূর্যমুখীর মতো চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দেয় ওর বন্ধুর বাদামি বুক। বড়ির টেবিলটা বড় চুপচাপ। অনেকটা ওই গুটিয়ে নেওয়া চাকতি কেন্নোর মত। হাজার টোকায় , আরও গুটিয়ে যায় কেবলই। শুধু যখন বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ে আর মা যখন হাঁক দিয়ে বলেন, ‘বড়ি জানালা বন্ধ কর। বৃষ্টির ছাটে ঘর ভাসবে যে!!’ সেই নিয়ম ভাঙ্গা দিনে, বড়ির শান্ত টেবিলটা কেমন আবুঝ হয়ে ওঠে। ছাঁটে ছাঁটে দুজনেই ভেজে, বড়ি আর ওর টেবিল। আস্তে আস্তে পাকে পাকে জেগে ওঠে ও, ওর চক্রাকার বৃত্ত ছেড়ে । ছিটে ছিটে জল ওর সুখা রুপালি খালে বয়ে যায় , প্রাণ পায় ওরা। বড়িও।