সত্যবান বিশ্বাস-এর গল্প

Spread This
Satyaban Biswas

সত্যবান বিশ্বাস

মরণশৈলী শিক্ষায়তন

স্টেশনের পাশে রেলের ফাঁকা জমিতে একটি লম্বা দো-চালা টিনের ঘর। ভেতরে চল্লিশ-পঞ্চাশ জন লোক ঠেসেঠুসে বসতে পারে। চারপাশে ছড়ান-ছিটান কয়েকটা ইউক্যালেকটাস, একটা কৃষ্ণচূড়া আর দুটো আম গাছ। সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলেই, সেখানে একে একে এসে হাজির হয় সব বুড়োরা। ওদের ভাষায় রিটায়ার্ড ম্যান । অস্তগামী সূর্যের সাথে যাদের জীবনের মিল আছে , সূর্য তাদেরকে এখানে পৌঁছে দিয়েই নিজে অস্ত যায় । এমনই বুড়োদের নিয়ে তৈরি এই আড্ডার নামটাও অভিনব । ঢোকার মুখে ততোধিক পুরোনো একটি রংচটা টিনের সাইনবোর্ড দেওয়ালে গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলছে। তাতে লেখা, “মরণশৈলী শিক্ষায়তন”। আজ তার সেক্রেটারি পদে অভিষিক্ত হবেন অনিল বাবু ।

আঠারো বছর আগে চাকরি থেকে রিটায়ার্ড হওয়ার পর অনিল বাবু নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন এই আড্ডা। আজ এই আড্ডার সেক্রেটারি হতে যাচ্ছেন তিনি। সেক্রেটারি সহজে কেউ হতে চায় না। তাই নিয়ম মাফিক সব থেকে বয়স্ক ব্যক্তিকেই “মরণশৈলী শিক্ষায়তনের “সেক্রেটারি হতে হয়। এবং, সে যত দিন আড্ডায় উপস্থিত থাকতে পারে, তত দিন ওই পদ অধিকার করে থাকে। তবুও দুই-তিন বছরেই এই পদ ফাঁকা হয়ে যায়। আবার নতুন সেক্রেটারির প্রয়োজন পড়ে। মাঝে এক বছরই কেবল তিন বার সেক্রেটারি বদল হয়েছিল। দু’জনের ছিল হার্ট-অ্যাটাক, আর বাকি একজনের ফুসফুসে ক্যান্সার।

ক্যান্সার মনে আসতেই দেওয়ালে টানানো একটি ফটোর উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন অনিল বাবু। নামটি ফটোর নীচে এখনও জ্বলজ্বল করছে। শ্যামল হালদার। ছবিটা কেমো চালু হওয়ার আগে তোলা। তাই মাথা ভর্তি চুল। সব চুলই কেমো দেওয়ার পর উঠে গিয়েছিল শ্যামলের। শীতে সমস্ত পাতা ঝরিয়ে পর্ণমোচী গাছ যেমন ন্যাড়া-মাথা হয়ে যায়। প্রায় ছ’ফুট লম্বা সুন্দর চেহারার মানুষটি কয়েক দিনেই কেমন বাজ-পোড়া গাছের মত হয়ে গিয়েছিল। তবুও, অসম্ভব ছিল তার মনের জোর। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভেঙে পড়েনি কখনও।

আড্ডার সদস্য সংখ্যা এখন প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। একজন চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নতুন সদস্য হল তো, কেউ একজন পৃথিবী থেকেই অবসর নেয়। কাজেই এখন সংখ্যাটা কমবেশি পঞ্চাশের কাছাকাছিই ঘোরাঘুরি করে। সবাই এখানে যেন মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে আসে। একজন কেউ চিরতরে ছেড়ে গেলে, প্রত্যেকেই পরের জন নিজেকেই ভেবে নেয়। যেন লটারি কেটে বসে থাকা, কার নাম উঠবে তা কেউ জানেনা। প্রথম প্রথম মেনে নিতে একটু অসুবিধা হলেও, কিছুদিন টিকে গেলেই সে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মৃত্যুভয় একবার কেটে গেলেই এক অভূতপূর্ব আনন্দ অনূভুত হয় মনে। তবে সে স্তরে পৌঁছানও সহজ নয়।

প্রথমে এই বুড়োদের জায়গা ছিল প্লাটফর্মের উপরেই। কিন্তু সদস্য সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের একটি জায়গার খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আড্ডায় রেলের কয়েকজন রিটায়ার্ড কর্মচারী থাকায়, এই জায়গাটি রেলকর্তাদের ধরেটরে তাঁরাই ব্যবস্থা করেছে। ঘরের মেঝটি সিমেন্টে বাঁধান। মূলিবাঁশের বেড়া দিয়ে শুরু হলেও, চারপাশে এখন পাকা ইটের দেওয়াল। দেওয়ালের এক পাশে বড়ো বড়ো করে লেখা রবীন্দ্রনাথের “মৃত্যুঞ্জয়” কবিতাটি। কারণ এখানকার সকল সদস্যদের মূলমন্ত্র এই কবিতারই একটা লাইন , ” আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়ো ! ” তাছাড়া দুটো শো-কেসে সাজান আছে বিভিন্ন ধরণের কিছু বই। গল্প-উপন্যাস-কবিতা থেকে শুরু করে ধর্মগ্রন্থ , সবই জায়গা করে নিয়েছে সেখানে।

কেউ সদস্য-পদ নিতে এলে সেই দিনই তার একটি ছবি তুলে রাখা হয়। আর সদস্য থাকাকালীন মারা গেলে সেই ছবিতেই মালা দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান হয়। এরকম তেরোটি ছবি দেওয়ালে টানানো আছে। সব ছবিতেই জন্ম-মৃত্যু সাল আর নাম লেখা। এরই একটা ছবির দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন অনিল বাবু। ছবিটি তার বাল্যবন্ধু কেশবের। তার মাত্র একমাস আগে রিটায়ার করেছিল কেশব। এই আড্ডা তৈরির সময় কেশব সাথি ছিল তার। তারপর এক সময় সে কিছুদিন ছেড়েও গিয়েছিল এই “মরণশৈলী শিক্ষায়তন”। সে হঠাৎ একদিন অনিল বাবুকে বলেছিল , ” তোদের এ মৃত্যু-পুরিতে আমি আর নেই। “
” কেন ? তোর আবার হঠাৎ কী হল ? “
” ওখানে গেলে নিজেকে যমপুরির খুব কাছাকাছি মনে হয়! নিজের মৃত্যুর ছায়া দেখতে পাই যেন ! “
” যার যখন সময় হবে , তখন তো যেতেই হবে! এ নিয়ে এত ভাবলে চলে ? “
” না না , ওখানে গেলে সময় আসার আগেই মৃত্যু-চিন্তা মনে বাসা বাঁধছে ! আমি আর তোদের সাথে নেই ! “
” পালিয়ে আর কোথায় যাবি ? আসলে গোটা দুনিয়াটাই একটা , মরণশৈলী শিক্ষায়তন! ” — কথাটা দার্শনিকের মতোই বলেছিলেন অনিল বাবু।

বড় মৃত্যু ভয় ছিল কেশবের। প্রেসারটা ছিল হাই। সেরিব্রাল অ্যাটাকের পর পনেরো দিন ছিল আই সি ইউতে। মৃত্যুকে বোঝার আর ক্ষমতা ছিল না শেষের দিনগুলোতে।

ছোটবেলা থেকেই সে ছিল সাহিত্য-রসিক। তাই নবীন সাহিত্যিকদের নিয়ে একটি লিটিল-ম্যাগাজিন করেছিল কেশব। অনিল বাবুকে একদিন বলেছিল, ” এই নবীনদের মাঝে থাকলে আমি একটু প্রাণ পাই। অনেক সবুজ পাতার মাঝে নিজের বিবর্ণ রংটা চোখে পড়েনা সব সময় । কিছুটা বাঁচার রসদ পাই। ” তাই একটু একটু করে দূরত্ব বেড়েছিল “মরণশৈলী শিক্ষায়তন” থেকে।

বেঁচে থাকলে আজ কেশবেরই সেক্রেটারি হওয়ার কথা ছিল। খুব ভালো কবিতা লিখত কেশব। কলকাতার দু’-তিনটি প্রকাশনী থেকে তার গোটাদশেক কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছিল। তার ঘরের একটি শোকেসে সে বইগুলো সাজিয়ে রেখেছিল। যাতে ঘরে যে কেউ এলেই বইগুলি তার চোখে পড়ে। একমাত্র ছেলে আর ইঞ্জিনিয়ার বৌমা তার এই সাহিত্য চর্চার কোনও গুরুত্বই দেয় নি কখনও। তাদের হাবভাবে কেশব বুঝেছিল, তাঁর মৃত্যুর পর তার এত সাধের সৃষ্টিরা আর এ ঘরে জায়গা পাবে না। এ সব তাদের কাছে জঞ্জাল ছাড়া আর কিছু নয়। কেজিদরে বিক্রি হয়ে যাবে সব।

তারপর বইগুলি নিয়ে একদিন এসে হাজির হয়েছিল এই “মরণশৈলী শিক্ষায়তনে”। সেদিন বন্ধুকে ফিরে পেয়ে খুবই আনন্দ হয়েছিল অনিল বাবুর। বন্ধুকে বলেছিলেন, “দেখিস এই বইই তোকে বাঁচিয়ে রাখবে। “বন্ধুর এটুকু কথায় সেদিন সত্যি সত্যিই মৃত্যুকে জয় করেছিল, কেশব। বুঝেছিল, নাম “মরণশৈলী শিক্ষায়তন “হলেও, মৃত্যুকে জয় করে প্রকৃত বেঁচে থাকতে শেখায় এই আড্ডা ।

টুপ করে কোনও সদস্য কিছুদিন ডুব দিলেই, ধরে নেওয়া হয় কোনও অঘটন ঘটেছে। সে এত গভীরে ডুবেছে যে , সেখান থেকে আর ফিরবে না ধরে নিয়েই আড্ডার লোকজন তার বাড়িতে পৌঁছে যায়। তারপর তার জন্য একদিন শোকসভা হয় । এবং অবশেষে হয় একটি শ্রদ্ধানুষ্ঠান। আড্ডার সকলেই শ্রদ্ধা নিবেদন করে মৃত-ব্যক্তির উদ্দেশ্যে। এই অনুষ্ঠানে আড্ডার সবার জন্য একদিন খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন থাকে। শুধু তাই নয়, হঠাৎ করে কেউ অসুস্থ হলে তাকে সাধ্যমত আর্থিক সাহায্যও করা হয় আড্ডা থেকে। আর আড্ডার এত সব খরচের জন্য প্রত্যেক সদস্যকে দিতে হয় একটা মাসিক-চাঁদা। দশ টাকা দিয়ে শুরু হলেও এখন তা বেড়ে বেড়ে একশ টাকা হয়েছে।

আসলে সবকিছুই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য। মৃত্যুর পরও আমরা সবাই বেঁচে থাকতে চাই। তাই এত কর্মপ্রচেষ্টা। মৃত্যুতেই সব শেষ, মেনে নিলে আমাদের দায়িত্ব, আমাদের কাজের স্পৃহা বোধ হয় অনেকটাই কমে যেত। মৃত্যুকে ভুলে থাকতে পারাটাও জীবনের এক বড় বৈশিষ্ট্য। অনিল বাবু ভাবেন , এই তো প্রায় আশির কাছাকাছি তার বয়স। আর দু’-চার বছরের মধ্যে এই পৃথিবীর মায়া কাটাতে হবে। তাঁর পায়ের একজোড়া জুতো বা গায়ের জামাটির থেকেও কম আয়ু নিয়ে এখন তার বেঁচে থাকা। তবুও একজোড়া জুতো কিনতে গিয়ে সেদিন দোকানদারের সাথে কতই না ঝামেলা হয়ে গেল। দোকানদার শেষমেশ তাঁকে বলেই ফেলল, ” ক’জোড়া জুতোই বা আর পায়ে দেবেন বাবু ! এই জোড়া নিয়ে যান এতেই আপনার এ জীবন কেটে যাবে।” কথাটি সেদিন ভালোভাবে না নিলেও, কিছু সময়ের জন্য দার্শনিক করে তুলেছিল তাঁকে।

” মরণশৈলী শিক্ষায়তনের ” সদস্যরা বলে সব দিক দিয়েই অনিল বাবু খুব সফল মানুষ। ছেলেটিকে ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। চাকরি সূত্রে ছেলে এখন আমেরিকাতে। মেয়েটিরও বিয়ে দিয়েছেন ভালো ঘরে। জামাই ব্যাঙ্গালোরে সেটেল্ড। নিজেও বড় চাকরি করে রিটায়ার্ড হয়েছেন। তাঁরা দু’জন বুড়ো-বুড়ি কেবল বাড়িতে। সন্ধেটা তাঁর এই আড্ডাতেই কেটে যায়। আর বউয়ের কাটে একটার পর একটা সিরিয়াল দেখে। যদিও কাজের মেয়েটির পছন্দ আর কানের উপরই সে আজকাল বেশি নির্ভরশীল। তবুও সময় কাটে। এই বুড়ো-সময়ের কীই বা আর দাম। মাঝে মাঝে খুব কাঁদে। ছেলেকে আমেরিকা পাঠানোর জন্য অনিল বাবুকে দায়ি করে কাঁদে। একটা নাতনি হয়েছে কিছুদিন। মোবাইলে নাতনিটার ছবি দেখে আর কাঁদে !

কোন সফলতার মাপকাঠিতে সবাই অনিল বাবুকে মাপে, তা ঠিক যেন বুঝে উঠে পারেন না তিনি। এখন চোখ বুঝলেই দেখতে পান , নিজের মৃতদেহ। যা আগলে বসে আছে তার বউ। চোখে তার জল শুকিয়ে গেছে। “মরণশৈলী শিক্ষায়তনের” সদস্যরা ঘিরে আছে চারিধার। কেউ তার স্মার্টফোনে ভিডিও কল করে ছেলকে শেষবারের মত মৃত-বাবার ছবি দেখাতে ব্যস্ত। মেয়ে খবর পেলেও এসে পৌঁছাতে পারেনি ঠিক সময়ে টিকিট না পাওয়ার জন্য। মোবাইলেই মাকে সান্ত্বনা দিয়ে ছেলে বলছে, ” তুমি চিন্তা করো না মা, আমিতো আছি। ” ছেলে কীভাবে মায়ের পাশে আছে, তা কিছুতেই বুঝতে পারছে না মা। তবুও সে কিছুতেই কাঁদছে না। সবাই মিলে তাঁকে কাঁদানোর চেষ্টা করছে। বলছে , ” না কাঁদলে এই বয়সে বুড়ি পাগল হয়ে যাবে ! “
তাঁকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য সব রকম তোড়জোড় সেরে ফেলেছে ” মরণশৈলী শিক্ষায়াতনের ” সদস্যরা ।

অনিল বাবুর মনে পড়ল , শ্যামলের কথা। ঘোরতর নাস্তিক ছিল সে। ক্যান্সার হওয়ার পরেও, কী অদ্ভুত মনের জোর ছিল শ্যামলের। বয়সে তাঁর চেয়ে ছোট শ্যামলকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলেন , “এত মনের জোর তুমি কোথা থেকে পাও শ্যামল?”
” আমার পিছনে তো ঈশ্বর নামক ব্যক্তিটি নেই , তাই মনের জোর তো আমাকেই রাখতে হয় , দাদা ! “
” তা ঠিকই বলেছ! “
” আর সে ব্যাটা যদি থাকেও , তাহলে সে আমাকে মারার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বারো বছর ধরে ! “
” বারো বছর হয়ে গেল এর মধ্যে ? “
” বারো বছর ধরে ঐ ব্যাটার বিরুদ্ধে লড়াই দিয়ে , আমি বেঁচে আছি। এর পরও তাঁর ক্ষমতায় আর কীভাবে বিশ্বাস রাখি বলো ! “

অমল বাবু ছিলেন , এর ঠিক উল্টো। তার ভালো-মন্দ , অসুখ-বিসুখ সবই ঈশ্বরের হাতে সমর্পন করে কেমন নিশ্চিন্ত জীবন-যাপন করতেন। হাতে থাকত একটি জপের মালা। আড্ডার সকলের চেয়ে ব্যতিক্রম। অনেকেই তার পিছনে লাগত। তবুও আড্ডায় আসতেন নিয়মিত। অমল বাবুর মতো এই সমর্পন বা শ্যামলের মতো ঘোর নাস্তিকতা কোনটিই অনিল বাবুর নেই। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলতায় দুলতে দুলতে তিনি আজ আশির দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছেন। এখনও ভাবেন , ঈশ্বর বলে সত্যিই যদি কিছু থাকে, পরপার, আত্মা বলে কিছু যদি থাকে, তার জন্য কিছু সম্বলও তো প্রয়োজন। কিন্তু , কোন পথে আসবে সেই সম্বল। তথাকথিত এই ব্যবসায়িক-ধর্মে তার বিশ্বাস জন্মেনি কখনও।

হঠাৎ বিধান বাবুর ডাকে ভাবনায় ছেদ পড়ল অনিল বাবুর —– ” সে কী আপনি এসে গেছেন অনিল দা ! “
আজ কেন জানি অনেকটা আগেই “মরণশৈলী শিক্ষায়তনে” পৌঁছেছেন অনিল বাবু। বললেন , ” কী আর করি , বাড়ি বসে বসে আর সময় কাটতে চায় না । “
” বেশ করেছেন ! ” বলতে বলতে ঘরে ঢুকে এলেন বিধান বাবু । পিছন পিছন আরও পাঁচ-ছয় জন। একজনের হাতে একটি ফুলের তোড়া আর অন্য একজনের হাতে একটি মিষ্টির প্যাকেট।
অনিল বাবু বুঝলেন , এরা সব প্রস্তুতি সেরেই এসেছে । দেখতে দেখতে ঘর ভরে গেল । ছোটখাটো একটি মঞ্চ তৈরি হল ঘরের একপাশে। টেবিলের উপর দুটো ফুলদানিতে রাখা হল, রজনীগন্ধার স্টিক। মঞ্চ যত সেজে উঠতে লাগল , ততই যেন অস্থির হয়ে উঠলেন অনিল বাবু। তার চোখে মুখে এক আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠতে লাগল। মুহূর্তে সমস্ত মঞ্চসজ্জা তার চোখে-মনে শ্মশান-সজ্জা হয়ে উঠল ।

বিধান বাবু ছিলেন শিক্ষক। ভালো বক্তাও। এসব অনুষ্ঠানে কিছু বলার দায়িত্ব তাঁরই থাকে। সবে তিনি বলতে শুরু করেছেন, ” আজ আমরা আড্ডার নিয়ম অনুসারে সব থেকে বয়স্ক, আমাদের সবার প্রিয় অনিল দাকে মরণশৈলী শিক্ষায়তনের সেক্রেটারি নির্বাচন করতে চলেছি। তাঁর হাতে গড়ে উঠা এই আড্ডার সেক্রেটারি পদে অনিলদা অভিষিক্ত হলে আমরাও গর্বিত হব। “

এতদূর সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। অনিল বাবুও চুপচাপ বসেই ছিলেন। হঠাৎ সবাইকে অবাক করে, চিৎকার করে বলে উঠলেন, “আমি তো এখনও মরিনি, তোরা আগেই আমাকে শ্মশানে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছিস কেন? সবাই তখন অনিল বাবুর দিকে তাকিয়ে। কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন তিনি।
বিধান বাবু ততক্ষণে এ্যাম্বুলেন্সে ফোন করেছেন। বলছেন, ” একেবারেই স্টেশনের কাছাকাছি, হ্যা হ্যা, “মরণশৈলী শিক্ষায়তন! “
পেছন থেকে কে একজন চিৎকার করে বলে উঠল, ” সোজা করে বসিয়ে ঘাড়ে-মাথায় জল দাও। খবরদার কিছুতেই শুইয়ে দিও না যেন। “বিধানবাবু দেখলেন, ভবেশ বাবু।” মরণশৈলী শিক্ষায়তনে”র পরবর্তী সেক্রেটারি।

****************