ফাল্গুনী ঘোষ-এর গল্প

Spread This
Falguni Ghosh

ফাল্গুনী ঘোষ

ঐশ্বরিক

১।

অধুনা উড়িষ্যার অখ্যাত এক গ্রাম। এরকম গ্রামে সাধারণত আরো অখ্যাত কোনো অতীত মুখ ঢেকে থাকে নিদারুণ উপেক্ষায়। মাঝে মধ্যে কেবল বর্তমানের মেঘ, ঝড় , জল, হাসি, কান্না , প্রেম ভালোবাসা অতীতচারী করে তোলে সময়কে। মনে হয় হয়তো সেদিনও এরকম উজ্জ্বল কমলা অনিত্য সূর্যাস্ত ছিল। তাও কোন এক সামান্য কারণে চরাচর জুড়ে বয়ে গেছিলো বিষাদঝড়। অথচ তার কদিন আগেই তো ছিলো উজ্জ্বল দিনের আনাগোনা। ছিলো ঢেউয়ের উথাল পাতাল উপেক্ষা করে সময়কে টেক্কা দেওয়া কিশোরের দল, ছিলো তাদের ঠাট্টা মস্করা। আরো ছিলো গ্রামপ্রধানের স্নেহ- শাসনের সঠিক রসায়ন। আর এসব নিয়ে বেশ কেটে যেত এক শিল্পীর সংসার, শিল্পসম। প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে নয়, তার সখা হয়ে যেন জিতে নিত ভয়ের যা কিছু ,সব। সমুদ্রের তলদেশ থেকে গর্ভবতী মেঘ উঠে এলে ওরা মেনে নিত, এবার অসীমকে তার আপন রূপে ছেড়ে দিতে হবে। গুটিশুটি সবাই ঘরের পথ ধরত তখন, সঙ্গী হত বালিভরা মাঠে খেলতে খেলতে মুখ চুন করা ছেলেপিলের দল।
সেদিনও অমন পাতলা সরের মতো মেঘ সবে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। চিড়বিড়ে জ্বালা ধরানো রৌদ্রের সাথে আপস করে অক্ষয় বাচ্চা চিতার ক্ষিপ্রতায় দৌড়ায় ধর্মপদকে আটকানোর জন্য। তাকে কিছুতেই বৌ নিয়ে বাড়ি ঢুকতে দেওয়া চলবে না। সহসা দিলীপের নির্মল হাসি খানখান করে দেয় সে ক্ষিপ্রতা—
“ধর্মপদ ওর বৌকে সামলাতে পারবে না, আমরা ঠিক চুরি করে নেব। যেমন ওর বাবা হারিয়ে গেছে, মা সামলে রাখতে পারেনি!”
ঠিক এইজন্যই বহুচোরি খেলা ধর্মপদের একদম অপছন্দের। এর চেয়ে ঢের ভালো গুচিটান্ডু খেলা। এক দঙ্গল ছেলে হৈ হৈ করে ছোটো, বড় লাঠির টুকরো নিয়ে দাপাদাপি, লাঠালাঠি । মুহুর্মুহু এরকম কথার বাড়ি খেতে হয় না ধর্মকে। খেলা ছেড়ে দাঁতে দাঁত চেপে এক নিঃশ্বাসে বাড়ি ফেরে সে। বিক্ষুব্ধ সমুদ্র স্রোতের ঢেউ আছড়ে পড়ে মায়ের আঁচলে।
“কেন! বলো কেন! আমি কোনোদিন বাবাকে কেন দেখিনি! সবার বাবা বাড়িতে থাকে, আমার বাবা কোথায়???”
মুহুর্মুহু ফুঁসে ওঠা ক্ষোভের তোড়ে খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চায় ছেলের মা। তীক্ষ্ণদৃষ্টি তীব্র স্রোতসহ যেন চায় স্রোতের টান ভাঁটায় ফেরাতে—
“আবার ঐ পাজি ছেলেগুলোর কথায় চীৎকার করছিস! তোকে না কতবার বলেছি, তোর বাবা সাধারণ তষা নয়! সে শিল্পী! রাজদরবারের খাস শিল্পী……”
“মানি না ! তাহলে কেন রাজখানা খাই না আমরা! শুধু ঐ মন্ড পোল্লা রোজরোজ……”
গ্রাম মোড়লের ব্যবস্থাপনায় ধর্মপদের মা দু তিন গৃহস্থালীর ফসল কোটার পারিশ্রমিক পায় কলেই মহুলো, কূলথ, কেন্দু যা দিয়ে তৈরি মন্ড বাড়ির দুই সদস্যের একঘেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি মেটায়। ভাগ্যিস মোড়লের দয়া বর্ষিত হয়েছিলো শিশু ধর্মপদকে দেখে, ভাবে তার মা।

২।

ঘন নিশুত রাতের সঙ্গতে অভিমান গাঢ় হয় মায়ের। একতরফা বিদ্রোহে বিড়বিড় করে শিল্পীর বউ, ‘কেমন বাবা তুমি! একবারও সন্তানের মুখ দেখার ইচ্ছে হয় না! ‘ নাকি রাজ সম্পদের মোহ তোমার পৃথিবীর রঙ বদলে দিয়েছে! কুপির টিমটিমে আলোয় ঘুমন্ত ছেলের গালে শুকিয়ে যাওয়া জলের রেখায় আঙুল বুলিয়ে স্বামীর নাম লেখে । বুঝিবা এভাবেই স্বামীর স্পর্শ পায় সে। চাপধরা নোনা স্রোত দমক মারে বুকে, কাপড় চাপা দেওয়া ফুকরে ওঠা অধর বিদ্রোহ করে তার সাথে। গাল বেয়ে স্মৃতিরা অঝোর ঝরে বাইরের ঝড়ো হাওয়ার সাথী হয়ে। মায়ের দীর্ঘশ্বাসে চটক ভাঙে ছেলের, আবারও দুলে ওঠে কচি আবেগ,
“মা গো! ওরা যে তোমার নামে দোষ দেয়! “
পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুরক্ষার আধারে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে থাকে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা। রাতের তন্তুগুলি গাঢ় হয় সে আবেশে ফলত।
#
গ্রামটা তষাদের। এখানে তারাই উভয়ত রাজা এবং প্রজা । এসব মাটি, জল কাদা ঘাঁটা মানুষদের মধ্যেও দু একটা সৃষ্টিছাড়া মানুষ জন্মে যায়, কে জানে কার দোষে! মহাদেব তষা তেমনই এক ব্যাতিক্রম। ফসল বোনা, লাঙল চষা, ক্ষেতে জল দেওয়ার মতো নানাবিধ গায়ের জোর পরীক্ষার পরিশ্রমকে অন্যান্যরা যখন গানের আবেগ দিয়ে বেঁধে রাখে , তখন কোন এক নির্জন আলের ধারে একতাল বালি মাটির রূপদানে মহাদেব ভুলে থাকে সে পরিশ্রমের মুহুর্ত। ফুটে ওঠে জনপদজীবন, ক্ষেতি বাড়ি, প্রিয়তমার মুখ। অদ্ভুত ভাস্কর্য শৈলী ভর করে রেখায় রেখায়। এ এক আশ্চর্য ক্ষমতা। জ্ঞাতিবন্ধুদের তাকে নিয়ে বড় আশা যে, কোনো একদিন মহাদেব তষা অনেক বড় হবে। আর হাসিমুখে মহাদেব স্বপ্ন বোনে এই অনাগত ভবিষ্যতের যে, যুবতী বউকে আদর দিতে দিতে রক্ত মজ্জায় হয়ে উঠবে আগামীর ভাস্কর।
কিন্তু অনেক সময়ই নিয়তির অঙ্গুলিহেলনে আমাদের ভবিষ্যৎ দিনলিপি লেখা হয়, যেখানে নিজেদের ইচ্ছার দুয়ার ঈশ্বর আড়াল করে দাঁড়ান। সেকারণে সুখের দিনে বিচ্ছেদের ছায়া পড়ে। তৎকালীন উড়িষ্যা সমাজ সমষ্টির রাজার বিশেষ ইচ্ছে হয় নিজ কীর্তির দৃষ্টান্ত ধরাধামে স্থাপন করার। ফলত পেটানো ঢেড়ি বাতাসে, হাওয়ায় ভেসে এসে ধাক্কা দেয় এই অখ্যাত , ছোট্ট গ্রামেও। ৮৫৭ ফুট উঁচু বিজয় তোরণে পূজিত হবেন তেজদীপ্ত সূর্যদেব। সারাদিনভর সূর্যের আলো মেখে সময়রেখার তালে তোরণের ইঁট পাথরে রাজকীয় জীবন সাক্ষী হয়ে কালের মহিমা গাইবে। রাজার বিজয়রথের চাকা চলবে ঘর্ঘরিয়ে। সুতরাং গ্রাম্য মোড়লের ফতোয়া অনিবার্যভাবেই মহাদেব ও তার স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে সে অবস্থায়, যখন তার বউ পোয়াতি।
“চল মহাদেব, তোকে যেতে হবে মন্দির তৈরির কাজে!”
“ছোটো খাটো তষা আমি, সেখানে কি কাজ আমার!”
“মন্দিরের গায়ে নকশা করতে হবে রে, নকশা! মহাদেব তোর থেকে ভালো নকশা আমাদের গ্রামে আর কেউ পারে না যে করতে! তুই ওখানে গিয়ে কাজ করলে আমাদের গ্রামের নাম হবে!” –
বলতে বলতে গ্রাম্য মোড়লের চকচকে চোখের উৎসাহ প্রবাহিত হয় বৃহৎ তরঙ্গের মতো । এক, দুই , তিন অঙ্কের সমারোহে গোষ্ঠীউল্লাস ভাসিয়ে দেয় মহাদেবকে। এই প্রত্যয় নিয়ে সে গ্রাম ছাড়ে, ‘কিছু করে দেখাতেই হবে!’ এ গ্রামের নাম যেন দেশ বিদেশের মানুষের মনে গেঁথে যায় আশার ছবি হয়ে।
#
পরদিন সকালে জীবন্ত স্মৃতিটুকরো সূর্যের আলোছায়ার খেলায় যেন পিতৃস্নেহের কর বুলিয়ে যায় ধর্মপদের কপালে। মায়ের বলে চলা উদাস গলা তাকে তার মাতৃগর্ভের আঁধার থেকে নতুন আলোর রাস্তা দেখায়। রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে দৃঢ় করে নিজের ইচ্ছে। বয়সের বাধা উড়িয়ে ‘বাবার কাছে যাবো’ এই চরম ঘোষণা একাকিনী মায়ের হৃদয়ের ভিত নড়িয়ে দেয়।
কিন্তু, “তোর বাবাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি, তোকে আর পারব না!” মায়ের এই হাহাকারও বিচলিত করতে পারেনা নবছরের বালক চিত্তকে। গ্রাম্য মোড়লকে সঙ্গী করে সে পথকে আপন করে নেয়, কারণ ঐ মোড়ল দাদুই তাকে তার বাবার গন্ধ চিনিয়ে দিতে পারবে।

৩।

রাজাদেশ অনুযায়ী কোথাও চিরাচরিত দেবতা সৌম্য মূর্তিতে বিরাজমান। কোথাও বা সিংহ রাজ আস্ফালনে কেশর ফুলিয়ে দন্ডায়মান। মৃদঙ্গ, করতাল, বীণায় মনোরঞ্জকের দল। আবার কোথাও যুদ্ধের দামামা বেজেছে। নিঁখুত চিত্রের রূপায়নে মহাদেব আজ সূর্যতোরণ নির্মাণকারী প্রধান শিল্পীদের একজন। কিন্তু একমাত্র এই পরিচয়ের আবডালে মাঝে মধ্যে পাথরের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লোহার শলাকা ঠুকে ফুলকি ছড়ায় পাথরকুচির আগুন। এক বালিকা বধূর স্মিত হাসি, তার আয়ত চোখের বিরহের আখ্যানে এসে জড়িয়ে ধরে শিশু সন্তানের কচি আঙুল— একের পর এক যখন জীবন লিখে রাখে শিল্পী মহাদেব, তখন দৃষ্টির অদূরে এসে দাঁড়ায় এক অখ্যাত গ্রামের গরীব কুঁড়ে ঘর।

কিন্তু শিল্পীর চাপা দীর্ঘশ্বাস কেউ শুনতে পায় না, হয়ত স্বয়ং ঈশ্বর একদিন শুনবেন বলেই তা ক্ষুদ্র মানবের কর্ণগোচর হয়নি । এক আধবার চেষ্টাও করেছে যদি তার সন্তানের মুখ সে দেখে আসতে পারে। কিন্তু রাজকীয় মেজাজের কাছে দরিদ্র পিতৃহৃদয় চিরকাল হেরোর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে , এটা বোধহয় চিরকালীন সত্য। সে সত্যের ব্যতিক্রম এখানেও হয় না। ফলত আরো মনোনিবেশ সহকারে নিঁখুত দক্ষতায় নির্মিত হয় স্থাপত্য, যেখানে ভবিষ্যতের মানুষ খুঁজে নেবে এক শিল্পীর সন্তানের ভাবী মুখচ্ছবি।

তবে ইদানীং মহাদেব কাজ অনেক গুটিয়ে এনেছে। শুধু একটা জায়গায় এসে ঠেকে গেছে তাদের গতি । রাজামশায়ের শেষতম খেয়াল অনুসরণ করে ঐ সুউচ্চ তোরণের শিখরে উঠে সোনার কলস প্রতিস্থাপন করার মানুষ খুঁজে পেলেই নির্মাণ সুসম্পন্ন হয়। স্বভাবতই মহাদেবের বিনিদ্র রাত্রিতে নিদ্রাদেবী প্রায়শ আনাগোনা করেন ইদানীং। মনে মনে আজকাল সে দেখতে পায় এরকম কোনো এক শিল্পীকে! আবছা কোমল তার মুখ। সকালবেলার কচি রোদের মতো চাউনি নিয়ে সে যেন হাসছে এক চঞ্চলতার হাসি। পাগল প্রতিপন্ন হওয়ার যন্ত্রণায় কাউকে এসব বলতেও পারে না।

৪।

আজ মহাদেবকে ঈশ্বর আশাতীত সুখ ঢেলে দিয়েছেন! অখ্যাত গ্রাম থেকে মোড়ল শুধু খবরই আনেনি, এনেছে তার আত্মজকে! একগাল হেসে বলেছে,
“এই নে মহাদেব, তোর ছেলে! জন্মইস্তক এই ছেলের মুখের দিকে তাকালে আমার খুব কষ্ট হতো রে! “
আরো আব্দার করেছে প্রৌঢ়, মুখ মিষ্টি করার। এটা প্রয়োজন ছিলো মহাদেবেরও, পিতা-পুত্রের দীর্ঘ অদর্শনের বাধা ভেঙে দেওয়ার উৎসবে সেদিন সন্ধ্যেয় সামিল হয়েছিলো রেঙ্গন চালের ভাত আর ঝাল ঝাল শামুকের ঝোল। নিশুত রাত্রে বুকে আত্মজর গন্ধ লেপ্টেও কি এক অস্বস্তিতে এপাশ ওপাশ করে মহাদেব। যদি আজই চলে যাওয়া যেত সেই অখ্যাত গ্রামে! আয়ের ঝোলা নেহাৎ হালকা নয়! কিন্তু রাজাদেশ কিভাবে অমান্য করে সে তাহলে যে গর্দান নিয়ে টানাটানি! এ ভাবনারা রাত্রের অন্ধকারের মতো ঘন হয় ততটাই, ঠিক যতটা মহাদেব চেপে ধরে ক্ষুদ্র প্রাণটিকে তার বুকের খাঁচায়।
মাঝরাত্তিরে মহাদেবকে এমন উশখুশ করতে দেখে মোড়ল বলে, “কি হয়েছে রে তোর! ছেলেকে দেখে এত আনন্দ যে ঘুম উড়ে গেলো! “
“না হে মোড়ল! আর এখানে মন টিকছে না!”
“তো চল আবার ছেলের সাথেই ফিরে চল! তোর বউটাও যে বড্ড কষ্টে আছে।“
“আর একটা কাজ যে বাকি কাকা! ঐ যে পেল্লায় তোরণ দেখলে, রাজার আদেশ তার মাথায় সোনার কলস বসাতে হবে। কিন্তু এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না যে ওখানে চড়ে সোনার কলস বসিয়ে আসবে! “
স্বভাবতই উচ্চতাকে সবার ভয়!
পরদিন সকালে শিল্পীর ছেলে দ্বিতীয়বার তোরণের সামনে গিয়ে উচ্চতা মাপে! মনে মনে ভাবে এইটুকু আটকে থাকা কাজের জন্য বাবা ফিরতে পারছে না! আগেরদিন তোরণের আনাচে কানাচের জীবন্ত পাথরগুলোতে হাত বুলোতে বুলোতে গর্বে ক্ষুদ্র হৃদপ্রকোষ্ঠ ভরপুর হয়ে উঠেছিলো ছেলেটার। কিন্তু আজ সকালের আলো মলিন হয়ে দেখা দিলো! তার বাবার প্রতি কত অভিমান বুকে নিয়ে সে দিনের পর দিন তীব্রতায় ঘেন্না করে গেছে বাবাকে। মা’কে কষ্ট দিয়েছে ভেবে বিদ্রোহ করে উঠেছে মন। আজ সে মন কিছুটা উদাসীন বুঝি! এতদিনের জমে থাকা বিদ্রোহ ‘বাবা’ নামক মানুষটার প্রতি মমতায় গলে আসছে নরম গাল বেয়ে।
বিড়বিড় করে সে ছেলে, সে কি পারে না বাবাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে! আরো নিঁখুত চোখে ঘুরে ঘুরে মন্দিরের স্থাপত্যকৌশল আয়ত্ত করে তার সজাগ দৃষ্টি। সকালের কচি রোদ তখন সাবালক। বুঝি আরেক সাবালকের দৃপ্ত পদক্ষেপ ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে রোদ টগবগে চনমনে প্রাণকে নিয়ে পৌঁছে যায় সর্বোচ্চ শিখরে । ক্ষিপ্র ধর্মপদ ততোধিক ক্ষিপ্রতায় মন্দির চূড়ায় সোনার কলস স্থাপন করে বিজয়ীর বেশে মাটিতে পা দেয়।
উল্লাসে মাতে শিল্পীরা। এবার ঈশ্বর নেমে আসবেন। পূজিত হবেন তোরণে। তাঁর আশীষ ধন্য হবে মানুষের দল। উচ্ছ্বাসে বাচ্চা ধর্মপদকে নিয়ে প্রায় একপ্রকার লোফালুফি শুরু করে তারা। শুরু হয় সমারোহ। এক সন্তানের পিতার বাবা হয়ে ওঠার সমারোহ। দীর্ঘ বিরহ যন্ত্রণার অবসানে স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার সমারোহ। বিদায়ী প্রার্থনা করে রাজার কাছে দরবার করে মহাদেব।

৫।

আজ অদ্ভুত ভালো লাগায় ভর করেছে মহাদেব তষাকে। আজ সে বাড়ি যাবে দীর্ঘ বছর দশেক পর ! ভাবনা ও আনন্দ সমান্তরাল গতিপথে চোখের জল হয়ে গড়িয়ে আসছে তার। তপ্ত দুপুরে পেটে চাট্টি দিয়েই বেরিয়ে পড়বে পথে, অপেক্ষা শুধু রাজামশায়ের কাছ থেকে ইনাম পাওয়ার। অবশেষে সেই আশা আকঙ্খার ক্ষণ, আনন্দের বদলে বয়ে আনে তীব্র বিষাদ। খবর আসে রাজা বড্ড বিরক্ত হয়ে বলেছেন,
“যে সোনার কলস বসিয়েছে সে তো কোনো শিল্পী নয়! “
এরকম বেয়াক্কেলে কাজ করার জন্য প্রধান শিল্পীদলের সবাইকে তলব পাঠিয়েছেন। ফলত, ‘কিছু না কিছু শাস্তি দিতেই এই আবাহন’ —এরকম কিছু কথার ফোয়ারা ছোটে, যা কিনা গুজবের চেয়েও ঢের শক্তিশালী।
কাঁদো কাঁদো ধর্ম বাবাকে আঁকড়ে ধরে বলে “তুমি গিয়ে বলো, তোমাদের খুঁজে পাওয়া শিল্পীই কাজটি সম্পন্ন করেছে!”
“কিন্তু তুই তো এখানেই আছিস বেটা! তোকে তো ওরা দেখতেই পাবে! আর আমাকে তো শাস্তি দেবেই , সেই সাথে তোকেও ধরে রাখবে! রাজার চর তোকে দেখে নিয়েছে! তুই যদি এখানে না থাকতিস তাহলে আমি এত ভয় পেতাম না!”
বিষণ্ণ সূর্যরশ্মির শেষ বিকেলে আরো বিষাদ ঘনিয়ে আসে পিতা –পুত্রের মুখেচোখে ।
“এখন একটাই উপায় বাবা! ঐ চূড়ো থেকে কলসটা নামিয়ে দিই, তাহলে তো তোমাকে শাস্তি দিতে পারবে না! হয়ত তুমি বাড়ি যেতে পারবে না, কিন্তু শাস্তিও তো দিতে পারবে না!”
সেসময় সূর্য পশ্চিম আকাশে উজ্জ্বল এক কমলা টিপ যেন, সেদিকে তাকিয়ে তার মায়ের কপালের টিপের কথা মনে পড়ে যায় ধর্মর। আর মুহূর্ত বিলম্ব নয়! বাবার আপত্তি উপেক্ষা করে চূড়ান্ত ক্ষিপ্রতায় চূড়ার দিকে এগোয় সে। …… রাজদরবারের লোকগুলো তাকে ধরতে আসার আগেই কাজটা করতেই হবে! …… যত সে চূড়ার দিকে এগোতে থাকে ততই সিঁদুরবিন্দু আরো উজ্জ্বল হয়ে প্রতিভাত হয় বুঝিবা পশ্চিমাকাশে। সেখানে মা দাঁড়িয়ে যেন ম্লান হাসি হাসছে! এখন ধর্ম একেবারে চূড়ায়। নীচের কলকাকলি বর্তমানে স্তব্ধ তার কাছে। সোনার কলসের গায়ে একবার হাত বোলায় সে। মায়ের হাসি যেন কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল সন্তান গর্বে, এমনই বার্তা দেয় বাতাস তাকে। এইবার সে পারবে শূন্যে তার শরীরটাকে ভাসিয়ে দিতে। আর কোনো ভাবনা নেই!
#
আয়েশে চোখ বন্ধ করে মহাদেব তষার ন বছরের সন্তান সূর্যতোরণের শিখর থেকে সমস্ত শরীরের ভার ছেড়ে দিলো। শুধু পাখীর হালকা পালকের মতো ঘুরে ঘুরে মাধ্যাকর্ষণের টানে ভূমির আশ্রয় পেল যখন সে শরীর, তখন পশ্চিমাকাশে রক্তাক্ত সূর্য সবে অস্তাচলে গেছে!
–০—
(কোণার্ক মন্দির ও রঘুরাজপুরে পাওয়া লোকমুখে প্রচলিত গল্প কথা অবলম্বনে ‘ ঐশ্বরিক’ গল্পটি রচিত।)